#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৫৩
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
ভোরের আলো ফোটেনি ঠিকঠাক। চারদিক তমসায় তলিয়ে। অন্ধকার গলিয়ে আবছা আলো ঠিকরে পড়ছে জানালার কপাট বেয়ে। ভোরের শীতল বাতাবরণে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। জানালায় লাগোয়া স্বচ্ছ পর্দা নড়ছে মৃদুমন্দ বাতাসের তোড়ে। আভিরার তন্দ্রা কেটেছে মিনিটখানেক হবে। চোখ মেলেনি সে। খানিকটা নড়েচড়ে ফের তলিয়ে যায় গভীর ঘুমে।
হাঁসফাঁস লাগছে আভিরার। অস্ফুটে বিড়বিড় করে নিজের বিরক্তি প্রকাশ করছে। প্রবল অনিহা নিয়ে চোখ মেলে আভিরা। ঘাড়ে হাত রাখতে বুঝল ঘেমে চটচটে হয়ে আছে। কারেন্ট নেই। কখন গিয়েছে কে জানে। ভোর সকাল হতেই কারেন্ট চলে যাবে। এমনিতেই গরমে নাজেহাল অবস্থা, তার উপর কারেন্ট থাকে না। সময় অসময়ে কারেন্ট চলে যায়। ঘণ্টাখানেকও কারেন্ট থাকবে না। গরমে অতিষ্ঠ হওয়ার জো। আভিরা চট জলদি বিছানা ছাড়ে। শুয়ে থাকা সম্ভব না তার পক্ষে।
চারপাশ দিনের আলোয় আলোকিত হতে শুরু করেছে। আভিরা এক নজর নিদ্রায় মগ্ন থাকা সুঠাম দেহের পুরুষকে দেখে নিল। বিরক্তিতে কপালে ভাঁজ পড়ে তার। তীক্ষ্ণ চোখে চাইল নাওয়াজের দিকে। এ লোক গভীর তন্দ্রায়। এমন গরমে কী করে ঘুমাচ্ছে। গরমকাল এ কারণে অপছন্দ আভিরার। শরীর ঘেমে অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে, জ্বালা অনুভব হয় সারা দেহে। অকারণে মেজাজও বিগড়ে থাকে।
গ্রীষ্মের শেষ। বর্ষাকাল আসবে কদিন বাদে। ভারী বর্ষণে ভিজিয়ে দিবে গ্রাম, শহর। গাঁয়ের আনাচে কানাচে পানি থই থই করবে। জলে টইটম্বুর হয়ে রবে খালবিল। বৃষ্টিপাতে এই উত্তাপ কমে যাবে, ভিজিয়ে দিবে শীতল বর্ষণে।
আভিরা দেয়াল ঘড়িতে সময় দেখে, ভোর পাঁচটা বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিট। চুলগুলো খোঁপা বেঁধে ওয়াশরুমে গেল ফ্রেশ হতে। অজু করে বেরিয়ে আসে আভিরা। মুখে তার জল কণা। অদ্ভুত স্নিগ্ধতা মুখশ্রীতে। এতক্ষণে হাঁসফাঁস করতে থাকা মেয়েটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে এবার। অজু করতেই এমন সতেজতা। জায়নামাজের ভাঁজ খুলে নামাজে দাঁড়ায় আভিরা। এ জায়নামাজ তার, ছোটো থেকেই সে ছাড়া অন্য কেউ সালাত আদায় করে না এ জায়নামাজে। সে শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার পরও কেউ হাত লাগায়নি এতে। আভিরা এ বাড়ি এলে এই জায়নামাজে নামাজ আদায় করবে। সে কারণে আনেসা সযত্নে তুলে রেখেছে। নামাজ শেষে মোনাজাত ধরতে চাপা কান্নায় ভেঙে পড়ে আভিরা। অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করছিল দিন চারেক যাবৎ। তার এমন অস্থিরতার কারণ নাওয়াজ। সেদিন যখন বাবার সাথে বেরিয়ে এসেছিল ঐ লোকের সামনে দিয়ে, তখন তো তাকে আটকায়নি। তবে এখন কেন এসেছে। এসে আবার এমন এড়িয়ে চলার মানে কী? তার দোষ কি আদৌ আছে? সব কী তার ভ্রান্ত ধারণা। লাবণ্যর কর্মকাণ্ড ঐ লোকের চোখে পড়ে না কেন? কেন বুঝে না লাবণ্য তাকে অন্য নজরে দেখে। আর লাবণ্যর এই নজরে আভিরার যত ভয়!
জায়নামাজ ভাঁজ করে আরেক দফা নাওয়াজের দিকে চাইল আভিরা। ঘুমের মধ্যে নড়েচড়ে উঠছে বারবার। আভিরা জানালার পর্দা টেনে দিতেই পুরো ঘর আঁধারে ডুবে যায়। দরজা ভিড়িয়ে বাইরে পা রাখে আভিরা। মায়ের রুমে নজর যেতে দেখল তার মা কুরআন তেলাওয়াত করছে। রুমের দরজা হাট করে মেলে রাখা। বাবা ঘরে নেই।
মসজিদে গিয়েছে নিশ্চয়। আভিরা সদর দরজা খুলে বাইরে বের হলো। প্রকৃতিতে বাতাসের দেখা নেই, সূর্যোদয় হয়েছে পূর্ব আকাশে। কেমন একটা গুমোট ভাব। উষ্ণতা নেই। তবে রোদের তীব্রতা প্রখর। বেলা গড়াতে গরমে নাজেহাল হতে হবে। আভিরা পায়ের জুতা খুলে বাড়ির আঙিনায় পা রাখে। হাঁটতে হাঁটতে গেটের সামনে গিয়ে থামে। দু পাশে সারি সারি গাছ লাগানো। নানান ধরনের ফুল গাছের সাথে জাত বিজাতের উদ্ভিদের মেল। আভিরা একটা গন্ধরাজ ফুল ছিঁড়ে ঘ্রাণ নেয়। এ ফুলের সুবাসে কেমন মাতোয়ারা হয়ে যায় সে। কানের কাছে গুঁজে দিল।
_
একেবারে নিঃশব্দে মায়ের পিছনে দাঁড়ায় আভিরা। আনেসা পেঁয়াজ কাটতে কাটতে জানতে চাইল,
– কী লাগবে?
আভিরা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। মেয়ের এমন হাসিতে আনেসা অবাক হয়। হাত থামে তার, অদ্ভুতভাবে ঘাড় বেঁকিয়ে মেয়েকে এক নজর দেখে নিল। তার মুখে এখনও হাসির ছটা। আভিরাকে এমনভাবে হাসতে দেখা যায়নি কখনো। সে হাসে নিঃশব্দে। আজ তার হাসির শব্দে যেন ঝংকার তুলছে।
আনেসা কিছুটা বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করল,
– কী হলো? এভাবে হাসছিস কেন তুই?
মায়ের প্রশ্নে আভিরা থতমত খায়, মুখের হাসি বিলীন হয় তার। আমতা আমতা করে প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,
– কী রান্না করবে?
– দেশি মুরগি ভুনা আর সাথে পরোটা।
– আমার জন্য ডিম পোচ, হাঁসের ডিম কিন্তু।
মেয়ের এমন বায়নায় হেসে উঠল আনেসা। ডিম পোচ ছাড়া অন্যভাবে ভেজে দিলে খেতে চায় না আভিরা। তবে ভুনার মধ্যে ডিম ছেড়ে দিলে সেটা খাবে। ডিমের সাদা অংশ খায় না আভিরা, কুসুমটাই খায়।
– নাওয়াজ উঠেছে?
নাওয়াজের কথা উঠতে মুখের ভাবভঙ্গি পরিবর্তন হয় আভিরার। মন্থর গলায় বলল,
– ঘুমাচ্ছেন উনি। তুমি রুমে যাও। বাবা এসে গিয়েছে হয়তো। বাকিটা আমি দেখছি।
– তোর বাবা ফিরেনি এখনও। রুমে যা তুই। তোকে কাজে হাত লাগাতে হবে না।
– রুমে গিয়ে কী করব আমি, তার থেকে ভালো তোমাকে সাহায্য করি। তাড়াতাড়ি কাজ শেষ হয়ে যাবে।
আনেসা কথা বাড়ায় না। সাতটা বেজে গিয়েছে বোধহয়। মেয়ের জামাই আছে বাড়িতে। সকালের নাস্তা দেরি করে দেওয়াটা লজ্জাজনক।
– ফ্রিজ থেকে মশলার বাটি বের কর। পেঁয়াজ রসুন বাটা আছে।
– আর কিছু?
– কাঁচা মরিচ আর ডিম বের করিস তিনটা।
– তিনটা কেন?
– জামাইয়ের পাতে ডিম না দিলে হবে। আর তাযীমের সামনে তুই ডিম পোচ খাবি ও কী চুপ করে বসে থাকবে।
– তোমার আর বাবার জন্যও বের করি তাহলে?
– আমাদের জন্য বের করতে হবে না। তোকে যা বলেছি তা কর।
মা মেয়ে মিলে ঝটপট নাস্তা বানিয়ে ফেলে। আভিরার কামিজ ভিজে পিঠের সাথে একেবারে লেপ্টে গিয়েছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। বারবার ঢোক গিলে গলা ভেজানোর প্রচেষ্টায় ব্যর্থ। হাত বাড়িয়ে টেবিল থেকে পানির গ্লাস তুলে নিল। এক ঢোকে অর্ধেক পানি শেষ করে গ্লাস রাখে টেবিলে। খালি পেটে পানি খাওয়ার দরুন মুহূর্তেই যেন গা গুলিয়ে এলো। সারাদিনে আধ লিটার পানিও খাবে না। ঐ ভাত খাওয়ার সময় যাই একটু পানি খায়। এছাড়া সারাদিনে আর পানি খায় না। এ নিয়ে আনেসার কাছে সারাক্ষণ ঝাড়ের উপর থাকতে হতো। কিন্তু তার অভ্যাসে পরিবর্তন আসেনি।
– যা নাওয়াজকে ডেকে তোল।
কাজ করতে থাকা আভিরার হাত থামে। আড়চোখে এক পলক চাইল মায়ের দিকে। চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বলল,
– দুদিন হাসপাতালে ছিল আম্মু। ঘুমাতে পারেনি একেবারে। এত তাড়াতাড়ি উঠবেন না।
– তাহলে আর ডাকার দরকার নেই। তুই খেতে বস।
– এখন খাব না।
বলেই রুমের দিকে পা বাড়ায় আভিরা। নাওয়াজ এখনও তন্দ্রায় মগ্ন। পুরো খাট তার দখলে। আভিরা নাওয়াজের গা ঘেঁষে শোয়। একেবারে গুটিসুটি মেরে শুয়েছে মেয়েটা। তীব্র অস্বস্তি নিয়ে নাওয়াজের পিঠে হাত রাখে। সহসাই লজ্জায় হাঁসফাঁস করতে লাগল। তড়িৎ গতিতে চোখ বুজে জোরালো শ্বাস ফেলে।
দিবাকরের তীর্যক আলো চোখে বিঁধতে আভিরা পাশে শুয়ে থাকা পুরুষটার বুকে মুখ গুঁজে। যার সাথে নীরবে অভিমানের এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করেছে। রোদের আড়াল হতে ঘুমের ঘোরে সেই কাঠখোট্টা পুরুষের সান্নিধ্যে আসে সে। নিজের অজান্তেই পুরুষটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে একেবারে। কেশ রাশি মুখের উপর পড়তেই নাওয়াজের ঘুম ভেঙে যায়। চোখে পড়ল তন্দ্রায় নিমগ্ন রমণী। যে তার বুকে ঘাপটি মেরে শুয়ে আছে। এলোমেলোভাবে খোলা চুল পড়ে আছে পুরো মুখ জুড়ে। সেজন্য চেহারাও দেখা যাচ্ছে না ভালো করে। নাওয়াজ হাত বাড়িয়ে মুখের উপর পড়ে থাকা চুল সরিয়ে দিতে লাগে একটা একটা করে। চুল সরাতে নজরে এলো আভিরার তৈলাক্ত ত্বক। তেল চিটচিটে আনন। রোদের আলো পড়াতে ঈষৎ উজ্জ্বলতার ভাব। মৃসণ ত্বকে কোনো দাগের মেল নেই। কপালে গুটি কয়েক ব্রণের দেখা মিলেছে। নাওয়াজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল রমণীর ঘুমন্ত মুখশ্রী। কপাল কুঁচকে আসে তার। এই মেয়ের মুখে ব্রণ হচ্ছে কেন? চোখের নিচেও কেমন কালচে দাগ। ঠিকঠাক ঘুমায়নি এ দুদিন। তার মতোই কী নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে। এ জন্যই কী চোখ মুখের এমন বেহাল দশা। নাওয়াজ মেয়েটার মুখশ্রী ছুঁয়ে দেয়। থুতনি ধরে রুক্ষ ওষ্ঠ ছোঁয়ায়। ঘুমের মধ্যে আভিরা ঈষৎ কেঁপে ওঠে। খামচে ধরে নাওয়াজের টি-শার্ট।
নাওয়াজ ধীমি আওয়াজে আভিরাকে ডাকল। বেলা হয়েছে অনেক। বারোটা বাজতে চলল। এত সময় ধরে ঘুমিয়েছে ভেবে নাওয়াজ বিব্রত বোধ করে। সাথে এ মেয়েও পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে।
– আঞ্জুম, উঠুন।
আভিরা কিছুটা নড়েচড়ে উল্টো ফিরে শোয়। নাওয়াজ বুঝল এভাবে ডাকলে এ মেয়ে কোনোভাবেই উঠবে না। নাওয়াজ এত না ভেবেই কোলে তুলে নেয় আভিরাকে। ওয়াশরুমে গিয়ে ঝর্ণা ছেড়ে দিল। ঝিরঝির পানি গায়ে পড়তে আভিরার ঘুম ছুটে যায়। হকচকিয়ে চাইল সে। সহসাই বুঝে এলো না কোনোকিছু। থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল ঝর্ণার নিচে। একটু একটু করে গা ভিজতে সচেতন হলো সে। বড়ো বড়ো চোখ মেলে একবার নাওয়াজকে তো একবার নিজেকে দেখল। গায়ে তার ওড়না নেই। এতটুকু দেখেই দম আটকে এলো। ওয়াশরুম থেকে বের হওয়ার কথাও যেন ভুলে গেল। নাওয়াজ দেখল আভিরার অবস্থা। নিজেই এগিয়ে গিয়ে ঝর্ণা বন্ধ করে। আভিরা যেন হুঁশে আসে। দৌড়ে গেল রুমে। খাটের উপর থেকে ওড়না তুলে গায়ে প্যাঁচায়। তার শরীর অর্ধেক ভিজে গিয়েছে ইতোমধ্যে।
নাওয়াজ টাওয়াল এনে আভিরার হাতে দেয়। আভিরা টাওয়াল তো নিলই না উল্টো রাগ দেখিয়ে ছিটকে ফেলে দেয়। মেজাজ খারাপ হয়ে আছে তার। এমন কেউ করে।
নাওয়াজ ঠোঁট কামড়ে হাসল। হাত বাড়িয়ে মেঝে থেকে টাওয়াল তুলে। নিজ দায়িত্বে মেয়েটার চুল মুছতে লাগে। আভিরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে তো। ছিটকে দূরে সরে গেল। নাওয়াজ রাগ দেখায় না। এক হাতে কোমর জড়িয়ে কাছে টানে মেয়েটাকে।
– এমন করতে চাইনি। আপনি উঠছিলেন না সেজন্য…
আভিরা রোষ পূর্ণ চাহনি নিক্ষেপ করে। উঠছিল না মানে। এ লোক তাকে ডেকেছে বলে তো মনে হয় না। একবারের বেশি দু বার ডাকতে হয় না তাকে। আর এ লোক বলছে, ডাকার পরও ওঠেনি।
– আপনি ডেকে ছিলেন আমাকে?
– হ্যাঁ তো, বারবার ডাকার পরও উঠছিলেন না। উল্টো আমাকে আরও জাপটে ধরে রেখেছিলেন। নিজেও উঠছিলেন না আমাকেও উঠতে দিচ্ছিলেন না।
আভিরা লজ্জা পেল হঠাৎ। রোষানল চাহনি বদলে দু চোখে অদ্ভুত লাজ। মাথা নামিয়ে নেয়। নাওয়াজের চোখে চোখ রাখতে পারছে না কেন জানি। কেমন অস্বস্তি ঘিরে ধরেছে তাকে। নাওয়াজের রসিকতা বুঝে এলো না আভিরার। অযথাই লাজে রাঙা হলো মুখশ্রী।
_
– তাযীম কোথায়? ও তৈরি হয়েছে?
– হ্যাঁ, বাহিরে আছে ও।
– চলুন বের হয় তাহলে।
– আপনি নিকাব বেঁধেছেন কেন? নিকাব বাঁধলে যে আপনার শ্বাস নিতে সমস্যা হয় তা মাথায় নেই।
নাওয়াজের কথায় আভিরা থমকে দাঁড়ায়। নিকাব বাঁধলে সে ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারে না। এটা তো নাওয়াজের জানার কথা না। এ লোকের সামনে এমন পরিস্থিতিতে কখনো পড়েনি আভিরা। তাহলে কী করে জানল? আভিরা খেয়াল করেছে নাওয়াজ তার ব্যাপারে ছোটো বড়ো সব কথায় জানে। এত কিছু নাওয়াজ কীভাবে জানে তার ব্যাপারে। কে বলেছে এসব? তার বাবা। বাবা নিশ্চয় এসব বলবে না। নাওয়াজের ডাকে ভাবনাচ্যুত হলো।
– নিকাব বেঁধে যেতে হবে না। এইটা খুলুন।
আভিরা বুঝল নাওয়াজের এ কথার মানে। কোনোভাবে এই নিকাব বাঁধার কারণে শ্বাস ফেলতে যেন সমস্যা না হয় সেজন্য খুলতে বলছে।
– কিছু হবে না। কয়েক ঘণ্টার ব্যাপার। আর প্রথম প্রথম যখন নিকাব বেঁধে বের হতাম তখন শ্বাস ফেলতে সমস্যা হতো। এখন এমন হয় না।
– শিওর, সমস্যা হবে না তো?
– জি, কিছু হবে না। চলুন বের হয়। তাযীম দাঁড়িয়ে আছে অনেকক্ষণ ধরে।
ড্রয়িংরুমে যেতে দেখল তাযীম সোফায় বসে আছে। হাতে তার রিমোট। টিভিতে কার্টুন দেখছে। আভিরা আর নাওয়াজকে দেখে দৌড়ে এলো সে। আভিরা মাকে খুঁজল। আনেসা নিজের রুমে শুয়ে আছে। আভিরা দরজায় কড়া নাড়ে।
– ভিতরে আয়।
– তুমিও চলো আমাদের সাথে।
– তোদের সাথে আমি গিয়ে কী করব। তোরা গিয়ে ঘুরে আয়।
– ঘুরবে কে? আমরা তো খেতে যাচ্ছি। তুমি আর বাবা চলো আমাদের সাথে।
– তোর বাবা যাবে না। আর আমিও যাব না। নয়টা বাজে। দেরি করিস না আর। পরে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যাবে।
_
– রিকশা নিয়ে নিব।
– রেস্তোরাঁ তো সামনেই, রিকশা নিতে হবে না।
নাওয়াজ মেনু কার্ড বাড়িয়ে দেয় আভিরার দিকে।
– নিন অর্ডার করুন। খবরদার এইটা বলবেন না যে, আপনার যা ভালো লাগে অর্ডার করুন।
আভিরা মুচকি হাসে। নিজের জন্য ফ্রাইড রাইস, চাউমিন আর ভাইয়ের জন্য পিজা, বার্গার অর্ডার দিল। সাথে নাওয়াজের জন্য পোলাও রোস্ট আর গোরুর মাংস।
ওয়েটারকে বিরিয়ানি প্যাকেট করার কথা বলতে আভিরা খাওয়া থামিয়ে নাওয়াজের দিকে চাইল। বাড়ি গিয়ে তো আর কেউ খাবে না। তবে বিরিয়ানি কার জন্য নিতে চাইছে।
– বিরিয়ানি কার জন্য?
– আপনার বাবা মায়ের জন্য।
আভিরা খাওয়া থামিয়ে থম মেরে বসে আছে। এ লোকের এত দিকে খেয়াল থাকে কী করে? কই এমন চিন্তা তো তার মাথায় আসেনি একবারের জন্যও।
_
আভিরা গাড়িতেই ঘুমিয়ে গেছে। নাওয়াজ পাঁজাকোলা করে নেয় মেয়েটাকে। পুরো দু রাত শ্বশুর বাড়িতে কাটিয়েছে সে। আর সম্ভব না। এই দুদিন হসপিটালে যায়নি। কাল না গেলে ঝামেলা হবে। সেজন্য বাড়ি ফিরে এলো। মেয়েকে এত তাড়াতাড়ি ছাড়তে চায়নি আনেসা। নাওয়াজ অনেক বুঝিয়ে রাজি করায়। এও বলে সামনের মাসে আবার যাবে।
লাবণ্য নাওয়াজের কোলে আভিরাকে দেখে অবাক হলেও কিছু বলেনি। নির্বাক দাঁড়িয়ে নাওয়াজের যাওয়া দেখল কেবল।

