#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৫৪
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
– কী করছ?
মেসেজটা দেখে বুশরার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। চাহনি কেমন নিষ্প্রাণ। চোখ বুজে বালিশে মাথা রাখে মেয়েটা। তার কী জিদানকে নিজের পরিচয় বলে দেওয়া উচিত। কিন্তু তার পরিচয় জেনে যদি জিদান কথা বলা বন্ধ করে দেয়। বুশরার ভিতরটা কেমন ধক করে উঠল। ছটফটিয়ে ওঠে মেয়েটা। ঐ লোক কথা বলা বন্ধ করলে সে থাকতে পারবে না। কয়েক মাসে লোকটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সকালে ঘুম থেকে উঠার পর আবার রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে মেসেজ না এলে হাঁসফাঁস লাগে। কেমন অস্থিরতা দেখা যায় তার মাঝে। তার এ অনুভূতি এই কয়েক মাস ধরে নয়। গ্রাম থেকে আসার পরই কেমন অদ্ভুত অনুভূতি হতো। চোখের সামনে ভেসে উঠল তাকে তিরস্কার করা লোকটার মুখাবয়ব। ছেলেটা তাকে নিয়ে মজা উড়িয়ে ছিল। তার মনে তো এই লোককে নিয়ে ক্ষোভ থাকার কথা। সেখানে কিনা সে ঐ লোকের জন্য পাগলপ্রায়। সর্বক্ষণ ঐ লোকের ভাবনায় মত্ত। জিদান নিশ্চয় ভুলেও তার কথা ভাবে না। মাস কয়েক ধরে তার অস্থিরতা তীব্রতর হচ্ছে। দাদার বাড়ি এসেও যেন অস্থিরতা কমছে না। বর্ষার বিয়েতে এসেছে। দু মাস পর বর্ষার বরের দেশে আসার কথা থাকলেও এসেছে পনেরো দিন হবে। একপ্রকার তড়িঘড়ি করে বিয়ের তারিখ ফেলা হয় শুক্রবার দেখে। এই যে বোনের বিয়েতে এসেও সে মনমরা হয়ে বসে আছে, চোখে মুখে খুশির ছটা নেই। কেমন একটা দমবন্ধকর অনুভূতি। এখন এই দমবন্ধকর অনুভূতি থেকে মুক্তি মিলবে কি করে।
বুশরা কাঁপা কাঁপা হাতে টাইপ করল,
– মাত্র গোসল সেরে বের হলাম। আপনি কি করছেন?
জিদান সময় দেখে নিল একবার। রাতের সাড়ে এগারোটা বাজে। এই মেয়ে এত রাতে গোসল কেন করেছে।
– এত রাতে কেন গোসল করেছ?
– হলুদে আমার এলার্জি। একজন ভুল করে হলুদ লাগিয়ে দিয়েছিল।
– যত্তসব ইরেস্পনসিবল মানুষ! ওরা জানে না তোমার হলুদে এলার্জি। তবুও কেন লাগিয়েছে?
– ছেলেপক্ষের লোক ছিল। তাদের তো জানার কথা নয়।
– ছেলে না মেয়ে?
– ছেলে।
জিদান মোবাইলের স্ক্রিনে শান্ত চোখে চেয়ে আছে। পাওয়ার বাটন চেপে ধরে ফোন বন্ধ করে ছুঁড়ে ফেলল বিছানায়। বড়ো বড়ো কদম ফেলে বারান্দায় গেল সে। রাগে তার শরীর কাঁপছে। একটা ছেলে হলুদ লাগিয়েছে। এই মেয়ে আবার তাকে বলছে সে কথা। জিদানের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। ঘন ঘন শ্বাস ফেলে রাস্তায় নজর দিল। মালবাহী ট্রাক ছুটে চলেছে। চলন্ত ট্রাকের গতিবিধি লক্ষ্য করে জিদান খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে গেল।
অচেনা, অজানা মেয়ের জন্য এত অস্থিরতা কেন তার? তাকে অন্য কোনো ছেলে হলুদ লাগিয়েছে। এই কথা শুনে এত রাগ হলো কেন? তার মনে তো অন্য কেউ আছে। সেই মানুষটাকে চোখের সামনে অন্য কারো হতে দেখেও তো তার কিছু যায় আসেনি। তবে ঐ মেয়ের কথা শুনে এমন ক্রোধে অস্থির হয়ে উঠল কেন।
জিদান মোবাইল হাতে নিয়ে ডাটা অন করে দেখল কোনো মেসেজ এসেছে কিনা। লাইনে নেই ঐ মেয়ে। সে অফলাইনে যাওয়ার পরপরই অফলাইনে গিয়েছে। জিদান হাসল। এই মেয়ে সবসময় এমন করে। সারাদিন অনলাইনে আসবে না। অথচ তার ভার্সিটির ক্লাস শেষ হওয়ার সাথে সাথেই এই মেয়েকে অনলাইনে দেখা যাবে। অপেক্ষায় রাখে না তাকে। জিদানের মাঝেমধ্যে মনে হয় এই মেয়ে শুধু তার জন্যই অনলাইনে আসে। কারণ সে অফলাইনে থাকলে এ মেয়েকেও দেখা যায় না।
জিদান ভেবে পায় না অচেনা একটা মেয়ের জন্য অযাচিত ভাবনার কোনো মানে হয়। জিদান মাথামোটা নামটাই হাত ছোঁয়ায়। এ মেয়ের নাম জানে না, জানার ইচ্ছে নেই। এখন অবধি নাম জিজ্ঞেস করেনি। মাথামোটা বলেই ডাকে সে। এ মেয়ের সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক নেই। তবুও কেমন অদ্ভুত অনুভূতি অন্তর জুড়ে।
_
– রেডি না হয়ে এখনও বসে আসিস কেন? জলদি উঠে তৈরি হো। বের হব একটু পর।
মায়ের কণ্ঠ কানে আসতে বুশরা মাথা তুলে চায়। থমথমে গলায় বলল,
– আমি যাব না মা।
যাব না শুনেই বুশরার মা চিল্লিয়ে ওঠে। মেয়ের মন খারাপের বিন্দুমাত্র আভাস পেলেন না তিনি। কর্কশ স্বরে বলে উঠলেন,
– যাবি না মানে?
– মাথা ব্যথা করছে আমার।
– ব্যথার ট্যাবলেট দিচ্ছি। ব্যথা কমে যাবে।
বুশরা অসহায় চোখে চাইল। মাথা ব্যথায় অসহ্য লাগছে তার। তাছাড়া বিয়েতে যেতে ইচ্ছে না একেবারেই। রাতে ঘুম হয়নি ঠিকমতো। ভেবেছিল এখন একটু ঘুমাবে। বুজে আসা স্বরে বলল,
– তুমি আর আব্বু যাও। আমি যাব না।
– এক থাপ্পড় দিয়ে দাঁত ফেলে দিব বেয়াদব। মাথা ব্যথা কী এই প্রথম হচ্ছে তোর। বললাম ট্যাবলেট খেলে কমে যাবে। তারপরও যাবি না বলছিস কেন? তুই না গেলে সবাই আমাকে হাজারটা প্রশ্ন করবে। তখন কী বলব আমি? মাথা ব্যথা করছে সেজন্য বিয়েতে আসেনি। এইটা কোনো কারণ হলো বিয়েতে না যাওয়ার। অন্য কারো বিয়ে হলে সমস্যা ছিল না। কিন্তু নিজের চাচাতো বোনের বিয়েতে না গেলে লোকে কী বলবে।
বুশরাকে নিরুত্তর দেখে উনি আলমারি খুলে বুশরার জামা বের করলেন। খাটের উপর রেখে বললেন,
– এই সেলোয়ার কামিজটা পরে দ্রুত আয়। আমি বাহিরে অপেক্ষা করছি। তোর বাবাও তৈরি হয়ে গিয়েছে। ঝামেলা করিস না।
বুশরা উঠে তৈরি হয়ে নিল। বের হতে হতে একবার ফোনের দিকে চাইল। না লাইনে নেই। সেই যে রাতে অফলাইনে গিয়েছে সারাদিনে আর লাইনে আসেনি।
বর্ষার ঘরে বসে আছে বুশরা। বর্ষা ফোনে কথা বলছে। একের পর এক কল এসেই যাচ্ছে। চেনা পরিচিত সকলে বিয়ের জন্য শুভ কামনা জানাচ্ছে তাকে। বুশরা চুপচাপ দেখে চলেছে সব। খানিক বাদে বাহিরে হৈ হুল্লোড় শুরু হয়ে গেল। ছোটো বাচ্চারা চিল্লিয়ে বলে যাচ্ছে বর এসেছে, বর এসেছে। বর্ষার রক্তিম মুখাবয়ব নজর এড়ায় না বুশরার। সে কিছুক্ষণ মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল বোনের দিকে।
বর্ষার ঘরেই বসে আছে বুশরা। না গেট ধরল আর না বরকে দেখতে গেল। অথচ হলুদের রাতে প্ল্যান করেছিল দশ হাজারের কমে এক টাকা দিলেও গেট ছাড়বে না। কতক্ষণ থম মেরে বসে থেকে বাহিরে গেল। পুরো বাড়িতে মানুষের আনাগোনা। উঠানের শেষ প্রান্তে চেয়ার টেনে বসল। বিয়ে শেষ হতেই দৌড়ে বাড়ি যাবে। ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে।
_
– আম্মু হয়েছে তোমার?
– হ্যাঁ, চল।
– শপিং ব্যাগগুলো নিয়েছ?
– না ভুলে গিয়েছি একেবারে। তুই দাঁড়া আমি নিয়ে আসছি।
আভিরা শাশুড়িকে বলল,
– আমি যাচ্ছি।
– তোমার যেতে হবে না। আমি দেখছি।
ড্রাইভিং সিটে নাওয়াজ বসেছে। তিন রমণী বসেছে পিছনে। মাঝে ইয়াজমীন, তার দু পাশে আভিরা আর লাবণ্য।
– এই আপনার সময় হলো আসার? বলেছিলাম দুদিন আগেই চলে আসবেন। আমার মেয়েটাকেও দিলেন না আসতে। বললেন একেবারে নিজেদের সাথে নিয়ে আসবেন। দুদিন আগে আসার কথা, এলেন আজ। তাও সন্ধ্যা গড়িয়ে।
ইয়াজমীন হেসে উঠল।
– আমার দোষ নেই আপা। বরাবরের মতোই দোষ আপনার মেয়ের জামাইয়ের। ছুটি নিয়েছিল। কিন্তু ইমার্জেন্সি পড়ে যায়। সেজন্য আবার হাসপাতালে যেতে হয়েছে। আমাদের বলেছিল আগে চলে আসতে। ও পরে আসবে। কিন্তু এবার ঝামেলা করে আপনার মেয়ে। বলে, সবাই একসাথে যাবে।অনুষ্ঠানের আগে গেলেই নাকি হবে।
আনেসা এক নজর মেয়ের দিকে তাকিয়ে সবার হাতে শরবতের গ্লাস তুলে দিল।
– বর্ণারা আসবে না?
– আসবে।
– কবে আসবে? অনুষ্ঠান তো কালকে।
– কালকে সকালে আসবে।
ইয়াজমীন উঠে আভিরার দাদির কাছে গেলেন। প্রৌঢ়া মহিলা সোফায় বসে আছেন। ওনার সাথে কুশল বিনিময় করে শপিং ব্যাগ তুলে দিলেন। উনি সামান্য হাসার চেষ্টা করে বললেন,
– আবার শাড়ি কেন? এসবের কোনো দরকার ছিল না।
– আপনার নাত জামাই নিয়ে এলো। বিয়ের পর তো তেমন কিছু দেওয়া হয়নি আপনাদের। বাড়ির সবাই জন্যই এনেছে।
ইয়াজমীন একেবারে সবার হাতে যার যার শপিং ব্যাগ তুলে দেয়। আনেসা ব্যাগগুলো নিয়ে বলল,
– হয়েছে। এখন রুমে গিয়ে রেস্ট করুন। পরে দেওয়া যাবে এসব।
ফজরের নামাজ আদায় করে ভোরের খানিকটা আলো ফুটতেই শ্বশুর জামাই দুজন বেরিয়ে গেল। আনেসা তিন চারটা বাজারের ব্যাগ ধরিয়ে দিয়েছে তোফায়েল আহমেদের হাতে। নয়তো দেখা যাবে বাজার করে আবার টাকা খরচ করে বাজারের ব্যাগ কিনতে হচ্ছে। সময়ে পঞ্চাশ টাকা অনেক কাজে লাগে। ঘরে এত এত ব্যাগ থাকতে আবার কেন কিনবে। শুধু শুধু ব্যাগ জমবে বাড়িতে।
শ্বশুর জামাই বাজার ঘুরে ঘুরে টাটকা মাছ, হাড্ডি কম দেখে গোরুর গোশ, গোরুর পা, শসা, কাঁচা মরিচ আর কয়েক জাতের সবজি কিনল। আভিরার দাদার মৃত্যু বার্ষিকী আজ। ছোটো পরিসরে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আত্মীয় স্বজন বাদেও মাদ্রাসার বাচ্চাদের খাওয়াবে। মহল্লার প্রতি ঘরে একজন একজন করে বলা হয়েছে। গ্রামে কোনো অনুষ্ঠান আড়ম্বরের আয়োজন করা হলে সমাজের প্রত্যেক ঘরে জন প্রতি একজন করে হলেও দাওয়াত দিতে হবে। বাজার সদাই আনার পরে ঘরের মহিলারা কাজে হাত লাগায়। বাজারের ব্যাগ থেকে সব নামিয়ে লিস্টের সাথে মিলিয়ে দেখে নিলেন সব ঠিকঠাক আনা হয়েছে কিনা। নয়তো পরে আবার বাজারে পাঠাতে হবে।
– বাদ পড়েনি কোনোকিছু। লিস্টে যা লেখা ছিল সব আনা হয়েছে।
তোফায়েল আহমেদের কথা যেন কেউ শুনেও শুনল না। আনেসা একে একে সব বের করল। দেখল সব ঠিকঠাকই আনা হয়েছে। তোফায়েল আহমেদ তপ্ত শ্বাস ফেলে। এ মহিলা তার কথা শুনে না কোনোকালে। বলল, সব আনা হয়েছে। তারপরও সব দেখে ক্ষ্যান্ত হলো। বড়ো বড়ো ডিশে মাছ নামিয়ে কাটতে বসেছে সবাই। কাজের জন্য কোনো লোক রাখা হয়নি। এসব তারাই করতে পারবে। শুধু রান্নার জন্য একজন লোক বলে রেখেছেন।
– আম্মু শসা কী এখন কাটব? না কি পরে?
– এখন কাটতে হবে না। রেখে দে।
– আচ্ছা। তাহলে বেগুনগুলো এদিকে দাও। কেটে দেই। বেগুন তো ভাজা হবে। তাই না?
– হ্যাঁ।
– চাক চাক করে কাটব?
– বেশি মোটা যেন না হয় দেখিস।
মা, চাচিদের সাথে আভিরাও হাত লাগিয়েছে। বসার ঘরে আপাতত পা ফেলার জায়গা নেই। এদিকে ওদিকে এটা ওটা ছড়ানো ছিটানো।
আনেসা কাজ করতে করতে বলল,
– লাবণ্য কোথায় রে?
– রুমে।
– রুমে কী করছে? ওকে ডেকে নিয়ে আয়।
– আপু আসবে না।
– কেন?
– এত হৈ হুল্লোড় পছন্দ করে না।
– এখানে তো হৈ হুল্লোড় হচ্ছে না। নিয়ে আয় ওকে। একা একা রুমে কী করছে না করছে।
– আসবে না আম্মু।
আনেসা হাতের কাজ রেখে তীক্ষ্ণ চোখে চাইল মেয়ের দিকে। লাবণ্য মেয়েটা কাল এসে যে রুমে গিয়েছে খাওয়ার সময় বাদে আর বের হয়নি। এখনও রুমে বসে আছে। প্রথমে ভেবেছিল অপরিচিত মানুষ দেখে হয়তো অস্বস্তি হচ্ছে। সেজন্য রুম থেকে বের হচ্ছে না। কিন্তু মেয়ের কথায় যা বুঝলেন মেয়ের সাথেও লাবণ্যর অত সখ্যতা নেই। নয়তো লাবণ্যর নাম শুনেই তার মেয়ের মুখে এমন আঁধার নেমে আসবে কেন।
গোরুর পা দিয়ে বুটের ডাল রান্না করা হয়েছে ঘন করে। মাছ ভর্তা, গোরুর গোশ রান্না হয়েছে আলু দিয়ে, সাথে সাদা ভাত আর বেগুন ভাজা। ছোটো বাচ্চাদের জন্য আলাদা করে মাছ ভাজা করা হয়েছে। বাড়ির পুরুষরা এখন ব্যস্ত। অবশ্য তারা সকাল থেকেই কাজের উপরে। দু দণ্ড বসার সময় পায়নি কেউ। নাওয়াজ শাহিদারি করছে খুব দক্ষতার সাথে। বাড়িয়ে ভাত, তরকারি দিচ্ছে না কারো প্লেটে। প্রথমে মাছ ভর্তা দিয়েছে সবার পাতে, বাচ্চাদের পাতে পাতে ভাজা মাছ। একেবারে শেষে ডাল দেওয়া হবে।
ঠিকঠাক তদারকি করার পরও খাবার নষ্ট হয়েছে অনেক। মাদ্রাসার বাচ্চাগুলোই নষ্ট করেছে। বাচ্চাগুলোকে রেখে দেওয়া হবে। এদেরকে রাতের খাবার খাইয়ে পরে পাঠাবে। বাকি বাচ্চারা খেয়ে উঠে গেলেও কয়েকটা বাচ্চার খাওয়া শেষ হয়নি এখনও। এদের শেষ হলে এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠ মুরব্বিরা খেতে বসবে। নাওয়াজ দাঁড়িয়ে রইল। সবার খাওয়া শেষ হলে গোসলে যাবে সে। সকালে গোসল সেরে নিয়েছিল। কাজের জন্য আজ সারাদিন যে গোসল করার সময় পাবে না, তা জানত। সেজন্য আগেই গোসল সেরেছে। কিন্তু এখন আবার গোসল করতে হবে। গায়ে ডাল পড়েছে। তাও আবার গরম। নাওয়াজ ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে রইল।
_
জিদানকে একবার ডাইনিং তো আরেকবার রুমে যেতে দেখে আভিরা বেরিয়ে এলো।
– কিছু লাগবে?
আভিরাকে দেখেই জিদান মাথা নামিয়ে নেয়। যেন এই মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকালেও তার পাপ হবে। অথচ
এই মেয়ের দিকে একসময় প্রেমময় নজরে তাকাত সে। আজ সে মেয়েকে দেখেই চোখ ফেরাতে হচ্ছে।
এই মেয়ে এখন অন্য কারো স্ত্রী। সে নিশ্চয়ই কারো বউয়ের দিকে অন্য নজরে তাকাতে পারে না। যা অনুভূতি ছিল সব একপাক্ষিক। সে তো মেয়েটাকে নিজের অনুভূতি সম্পর্কেও অবগত করতে পারেনি। অনুভূতি জানান দেওয়ার আগেই অন্য কারো অর্ধাঙ্গী হয়ে গিয়েছে। সময়ের সাথে তার অনুভূতিও মিলিয়ে যাচ্ছে। হয়তো বছর যেতেই আভিরাকে ভুলে যাবে সে। এখন তার মনে অন্য রমণী নিজের অস্তিত্ব বিরাজ করতে ব্যস্ত। ভাগ্যে থাকলে ভবিষ্যৎ এ সেই রমণীর আধিপত্য চলবে তার হৃদয় জুড়ে।
জিদান নিজেকে সামলে বলল,
– ফোনের ব্যাটারি ডাউন। চার্জ দেওয়া লাগবে। লাগেজ খুঁজে চার্জার পেলাম না। হয়তো বাড়িতে ফেলে এসেছি।
– টাইপ?
– সি। আছে?
– আমারটা বি টাইপ। ওনার সি টাইপ। আমি এনে দিচ্ছি।
– আনতে হবে না। তুমি চার্জে দিয়ে দিও।
_
আভিরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। খাওয়া শেষের দিকে। মহল্লার সকলেই খেয়ে চলে গিয়েছে। বাড়িতে আত্মীয় স্বজন ছাড়া বাইরের কেউ নেই। মেয়েটা এদিক ওদিক চোখ ঘুরিয়ে কাউকে খুঁজে যাচ্ছে। কেউ নেই। হঠাৎ শব্দ পেয়ে পিছনে তাকায়। দেখল তাযীম শসার বোল নিয়ে বাইরে যাচ্ছে। আভিরা ভাইকে ডাকল।
– কী হয়েছে? ডাকছ কেন? তাড়াতাড়ি বলো। কাজ আছে আমার।
আভিরা ভাইয়ের এত তাড়া দেখে হাসল। সারাদিন শুয়ে বসে থাকা ছেলেটা কিনা তাকে কাজ দেখাচ্ছে।
– ওনাকে একটু ডেকে দে তো।
– কাকে?
– তোর ভাইয়াকে…
– কোন ভাইয়া?
আভিরা জবাবে হিমশিম খেল। কোন ভাইয়া মানে। এই ছেলে বুঝতে পারছে না সে কার কথা বলছে। বোনকে এমন থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাযীম বলল,
– নাওয়াজ ভাইয়ার কথা বলছ?
– হ্…হ্যাঁ।
– ভাইয়াকে দিয়ে কী কাজ?
– তোর জানতে হবে না। তুই ডেকে দে। বল গিয়ে আমি ডাকছি।
_
– আঞ্জুম।
– জি।
– আসতে বলেছিলেন?
– হ্যাঁ।
– কেন?
– একটু দাঁড়ান, আমি আসছি।
আভিরা বরফের ট্রে নিয়ে ফিরে এলো। পেশীবহুল উন্মুক্ত বাহু খানিকটা লালচে হয়ে আছে। নাওয়াজ এক দৃষ্টিতে আভিরাকে দেখে গেল। তার হাতে যে ডাল পড়েছিল এই মেয়ে তা দেখেছে।
– দেখেছিলেন আপনি?
– হ্যাঁ।
– কীভাবে দেখলেন?
– বারান্দা থেকে।
থমথমে গলায় প্রশ্ন করল,
– বারান্দায় কেন দাঁড়িয়ে ছিলেন? বাড়িতে আজ বাহিরের মানুষ ছিল।
– বারান্দার পর্দা টেনে রেখেছিলাম আমি।
আভিরা ছোটো করে জবাব দিল। নাওয়াজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। আভিরার সচেতনতা দেখে প্রসন্ন হাসল সে। মেয়েটা নিজেকে লোক চক্ষুর আড়ালে রাখতে জানে।
– রুমেই থাকুন। কিছুক্ষণের মধ্যে কাজ শেষ হয়ে যাবে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখার দরকার নেই। সারাদিন সামনে থাকার পরও চোখ তুলে তাকান না। অথচ আড়ালে ঠিকই দেখে বেড়ান।
_
– রিয়াদ আসেনি আম্মু?
– এসেছে।
– কোথায় ও? চলে গিয়েছে?
– না। বসার ঘরে আছে।
বসার ঘরে গিয়ে দেখল রিয়াদ এক কোণায় চুপটি করে বসে আছে। বাকি সব বাচ্চারা হাসাহাসিতে মগ্ন থাকলেও সে একেবারে নিশ্চুপ। আভিরার ঠোঁট প্রসারিত হলো হাসিতে। ছেলেটাকে ডাকল ইশারায়। আভিরার ইশারায় রিয়াদ উঠে আসে।
– এসো আমার সাথে।
আভিরার সাথে গেল ছেলেটা।
– খাওয়া হয়েছে তোমার?
– জি।
আভিরা খুশি হলো। কথায় কী নম্রতা। আদবের সাথে কথা বলে সর্বদা। আলমারি থেকে একটা প্যাকেট বের করে রিয়াদকে দিল।
– কী আছে?
– খুলে দেখো।
রিয়াদ শপিং ব্যাগ খুলে দেখল ছাই কালারের একটা পাঞ্জাবি, সাথে টুপিও আছে।
– পছন্দ হয়েছে?
– জি। এখন আমি যাই?
– যাও।
রিয়াদের জায়গায় অন্য কোনো বাচ্চা এমন উপহার পেলে নিশ্চয় আনন্দে আত্মহারা হয়ে যেত। উপহার উপঢৌকন পেলে কার না আনন্দ হয়। কিন্তু এ ছেলের মুখে সামান্য হাসিও দেখা গেল না। আভিরা এ ছেলেকে চিনে দু বছর হবে। তাদের এলাকার হাফেজিয়া মাদ্রাসায় থাকে চাচার সাথে। রিয়াদের বাবা মানসিক ভারসাম্যহীন। ওর মা দেশের বাইরে থাকে। ছোটো ছেলেটার দায়িত্ব তার চাচা নিয়েছে। ছোটো থেকে বাচ্চা ছেলেটা বাবা মায়ের আদর যত্ন থেকে বঞ্চিত। বাবা তো মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন। মা থেকেও মাকে কাছে পায়নি কখনো। বড়ো একটা বোন আছে ওর। সেই বোনকে ওর খালা নিয়ে গিয়েছে। আপন বোনের সাথে দেখাও করতে পারে না। বাবা মা থাকার পরও ওদের দুই ভাইবোনের দায়িত্ব চাচা, খালা নিয়ে রেখেছে। ছোটো থেকে অনাদরে বড়ো হয়ে ছেলেটার মধ্যে উৎফুল্লতা নেই। কেমন একটা ভীতিভাব। এ বয়সের ছেলেরা কত চঞ্চল প্রকৃতির হয়। সেই জায়গায় রিয়াদ যেন সারাক্ষণ আতঙ্কে গুটিয়ে থাকে।
আভিরার মায়া লাগে ছেলেটাকে দেখলে। তোফায়েল আহমেদ আর আনেসাও স্নেহ করে রিয়াদকে। তোফায়েল আহমেদ আর আনেসা রিয়াদকে নিজেদের সাথে রাখবেন বলে ভেবে নিয়েছিলেন। কিন্তু রিয়াদের চাচা সম্মতি দেয়নি। ভাইয়ের ছেলেকে নিজের কাছেই রাখবেন তিনি। অন্য কারো দায়িত্বে দিবেন না।
_
– আঞ্জুম উঠুন।
আভিরা নড়েচড়ে বলে উঠল,
– এখন উঠে কী করব?
– বাহিরে যাব।
– এখন?
– হ্যাঁ। সবাই বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে। তাড়াতাড়ি উঠুন।
আভিরা উঠে ফ্রেশ হয়ে তৈরি হয়ে নিল। বাহিরে গিয়ে দেখল বর্ণা, মাহিরা, বর্ণ, বুশরা, জিদান, জ্যোতি, তাযীম দাঁড়িয়ে আছে। সৌভিক রাতেই চলে গিয়েছে। মাহাদ গিয়েছে সকালবেলা। ডিউটি আছে তার। রাতে আসবে আবার। সবাই থাকলেও লাবণ্য নেই। আভিরা তপ্ত শ্বাস ফেলে।
আভিরাদের বাড়ির রাস্তার সাথেই খাল। পানি বেড়ে রাস্তায় উঠে গিয়েছে। আভিরা জুতা খুলে খালি পায়ে পানি মাড়িয়ে সামনে এগোয়। ওর দেখাদেখি বর্ণা, মাহিরা, জ্যোতি, বুশরাও জুতা হাতে নিল। ছেলেরা পায়ের কাছটাই প্যান্ট কিছুটা ভাঁজ করে নিয়েছে। নয়তো প্যান্ট ভিজে যাবে। অথচ এই পানিতে আভিরার সেলোয়ার ভিজে চলেছে। সেলোয়ার খানিকটা উঁচু করে ধরার তাগিদ দেখা গেল না তার মাঝে। ঠান্ডা পানি পায়ে লাগতে দেহ কেমন শিরশির করে উঠছে। দুটো নৌকা নেওয়া হয়েছে। নৌকায় চড়ে পুরো খাল ঘুরবে তারা। আভিরা যখন ছোটো ছিল বর্ষাকালে নৌকার চড়ে বিলে যেত শাপলা তুলতে। সময়ের সাথে এখন আর তার নৌকায় চড়া হয় না। অনেক বছর পর আজ নৌকায় চড়বে। কেমন একটা উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে তার আনন জুড়ে।
বর্ণ বাড়ানো হাত গুটিয়ে নেয়। হাত বাড়িয়ে নিজেই যেন লজ্জা পেল। বুশরার হাত ধরে সে ই তুলে ছিল নৌকায়। সে হিসেবে জ্যোতির দিকে হাত বাড়িয়েছে। কিন্তু মেয়েটা ধরল না। বর্ণ কিছুটা সরে গিয়ে উঠার সুযোগ দিল জ্যোতিকে। নৌকা চলতেই জ্যোতি নৌকার ধার ধরে বসল শক্ত হাতে। আত্মা বেরিয়ে এলো তার। আগে কখনো নৌকায় চড়া হয়নি। মনে হচ্ছে এই বুঝি নৌকা ডুবে যাবে। জ্যোতির মুখাবয়বে আতঙ্ক ছেয়ে গেলেও বুশরার চোখে মুখে অদ্ভুত এক উচ্ছ্বাস। তার একদম সামনে জিদান বসেছে। মেয়েটার চোখ ঘুরেফিরে জিদানের দিকে। আনন্দের সাথে কেমন অপরাধবোধ চোখে মুখে।
বেগুনি রঙের শাপলা দেখে জ্যোতি কিছুটা অবাক হলো। লাল, সাদা শাপলা দেখা হলেও বেগুনি রঙের শাপলা এই প্রথম দেখা হলো। ভাইকে বলল,
– ফুল তুলে দাও ভাইয়া।
জিদান মুঠো ভর্তি শাপলা তুলে দিল বোনের হাতে। রঙ বেরঙের শাপলা ফুল দিয়ে মেয়েটার দু হাত ভর্তি। মুখে হাসির ফোয়ারা। ওর হাসি দেখে অজান্তে বর্ণও হেসে উঠল। সামান্য ফুল পেয়ে কেউ এত খুশি হতে পারে জানা ছিল না ওর। জিদান বুশরাকেও কয়েকটা শাপলা ফুল তুলে দিল। চোখে পড়ল মেয়েটার লাজুক হাসি। জিদান বিব্রত বোধ করে। মনে হলো, ফুল তুলে দিয়ে ভুল করেছে। এ মেয়েটাকে দেখলেই কেমন অস্বস্তি হয়। আগেরবার বাড়ি ফেরার সময় এই মেয়ের চাহনিই তার এমন অস্বস্তির কারণ। কেমন করে যেন তাকায়। এই চোখের ভাষা বুঝতে অসুবিধা হয় না তার।
টুং টাং শব্দে জ্যোতি মোবাইলে মগ্ন হলো। এক লাইনের বার্তা পাঠিয়েছে কেউ।
– স্নিগ্ধতায় মোড়ানো কন্যার হাতে জলে ডুবে থাকা স্নিগ্ধ ফুল!

