প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন #পর্বসংখ্যা_৬৯

0
7

#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৬৯
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা

ঘুটঘুটে আঁধারে ছেয়ে থাকা নিশীথ, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকে সোচ্চার। কালচে মেঘের আড়ালে ঢেকে আছে অম্বরে থাকা চন্দ্র। হালকা সমীরে গা হিম হয়ে আসে। মেঘমল্লার ভেসে চলেছে চাঁদের গা ছুঁয়ে। ক্ষণে ক্ষণে মেঘ ডাকছে। অথচ আকাশ একেবারে পরিষ্কার। মেঘপুঞ্জ গ্রাস করে কালচে আঁধার। বিষণ্ণ আকাশে গুটি কয়েক তারার দেখা মিলে। আস্তে ধীরে তারা শূন্য অম্বর জমাট বাঁধে ঠাসা তারকায়। অম্বর খেলে তারকারাজির সমাহারে। খানিক উজ্জ্বলতায় ছেয়ে ফের তলিয়ে যায় কৃষ্ণাঙ্গ মেঘমেদুরে। ঝুম বৃষ্টিতে স্নানরত মেদিনী। পত্র পল্লব বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে বড়ো বড়ো ফোঁটার বৃষ্টি কণা। তেড়ে ফুঁড়ে আসা বর্ষণে দুমরে মুচড়ে যাচ্ছে কিশলয়ের ডগা। অম্বর যেন মন খারাপের ক্লেশে মুদিত। থমথমে আকাশ গলিয়ে কান্না স্বরূপ জলরাশি ঝরছে। পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগে বৃষ্টির তোড়। কাঁপিয়ে তুলে ধরিত্রী।

অধরে অধর ছুঁয়ে, আশ্লেষে মত্ত যুগল। আবেশিত হয়ে চোখ বন্ধ করে আভিরা। ঝড়ো বাতাসে টেবিলে থাকা মোম গড়িয়ে পড়ে। সহসাই জ্বলে উঠল অগ্নি শিখা। আগুনের উত্তাপ পুড়িয়ে দিচ্ছে টেবিলের সাদা ফিনফিনে কাপড়। নর নারী কারোরই সে খেয়াল নেই। নাওয়াজ পাঁজাকোলা করে তুলে নেয় নিজের সহধর্মিণীকে। রমণী সলজ্জায় গুটিয়ে রইল অর্ধাঙ্গের বুকে। কাপড় পুড়ে ধোঁয়াটে হয়ে এলো সমস্ত অলিন্দ। ক্ষীণ অনুজ্জ্বল আগুনের শিখা এখনও দীপ্তিমান। খানিকটা পোড়া গন্ধে আচ্ছন্ন হয়ে উঠে কামরা।

বলিষ্ঠ দেহের ভারে চাপা পড়ে রমণীর দেহ। নিমীলিত তার নেত্র পল্লব। হাতের ছোঁয়ায় তটস্থ তনু। মাথা গোঁজ করে প্রশস্ত বক্ষপটে। ভারী হয়ে থাকা চোখের পাতা উন্মীলিত হলো নিমিষেই। আড়ষ্ট গা নেতিয়ে রইল কেমন। হাতের প্রগাঢ় ছোঁয়া শরীরের যত্রতত্র। বুজে আসা চোখ, নেতানো দেহ স্পর্শে আবেষ্টিত!

প্রভাকর উদীয়মান। জ্বলন্ত লাভার ন্যায় উত্তাপ ছড়াতে তৎপর। হলদেটে সূর্যের কিরণ চোখে বিঁধে তীক্ষ্ণভাবে। তীর্যক আলোক ছটায় শরীর যেন জ্বলে যাচ্ছে। লহমায় পুড়িয়ে দিচ্ছে দেহের উপরিভাগ। হাতে পায়ে অসহ্য রকমের জ্বালা অনুভব হতেই তন্দ্রা ছুটে গেল আভিরার। উষ্ণ স্বেদবারি নিঃসৃত, ঘর্মাক্ত বদন। বা হাতের উল্টো পিঠে তৎপর গলদেশে এটে থাকা ঘাম মুছে নেয়। ফোঁস করে ঝড়ো নিঃশ্বাস ফেলে আভিরা। দিবাকরের উত্তপ্ততা যেন অসহনশীল। আভিরা ঝড়ের গতিতে বিছানা ছাড়ে। কাপড় দিয়ে ত্রস্ত পায়ে ওয়াশরুমে গেল। ঝর্ণার ঈষৎ উষ্ণ জলধারা গা ভিজিয়ে দেয় আভিরার। খানিকক্ষণে উষ্ণ ভাব ছাড়িয়ে ঝরতে লাগে শীতল জল। শাড়ি ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে। মুক্ত কেশ রাশি গ্রীবা ছুঁয়ে। গোসল সেরে মেয়েটা ভেজা চুল না শুকিয়ে বেরিয়ে গেল। মাথায় আলগোছে টেনে নেয় শাড়ির আঁচল। শশব্যস্ত হয়ে প্রাতরাশের তোড়জোড়ে হাত চালায়। আহার প্রস্তুত করে টেবিলে সাজিয়ে রাখে তা। একে একে জড়ো হতে থাকে আগত প্রত্যেকে। হুমড়ি খেয়ে পড়ে টেবিল দখল করে।

_

বুশরার ঈষৎ রক্তিম আঁখি জলে সিক্ত। নাক টেনে কান্না দমনের চেষ্টারত। বুশরার মা কটমট চোখে চেয়ে আছে মেয়ের পানে। মায়ের রোষানল চাহনি, বিরক্তভাব কিছুই তোয়াক্কা করে না বুশরা। বেয়ানের সামনে মেয়ের এমন অকস্মাৎ কান্নায় বড্ড বিপাকে পড়েন ভদ্রমহিলা। ইচ্ছে করছে কষিয়ে এক থাপ্পড় লাগাতে। যদিও সুরভীর এদিকে খুব একটা খেয়াল নেই। ইয়াজমীনের সাথে কথায় ব্যস্ত। তবে বুশরাকে বার কয়েক বলেছে কান্না থামাতে। তবুও বুশরা কেঁদেই চলেছে।

– এই কান্না থামা।

– কী হয়েছে মা? ধমকাচ্ছ কেন?

– কী হয়েছে? তোর বোন যে এসে থেকেই কান্না জুড়ে দিয়েছে দেখছিস না।

– না দেখছি না।

সম্মুখে ম্রিয়মাণ পুরুষটিকে দেখে বুশরার কান্না বন্ধ হয়ে গেল। লজ্জায় মুখ লুকানোর চেষ্টায় বোনের পিছনে আশ্রয় নেয়। জিদান এ সময়ে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করবে বুশরা ভাবতে পারেনি। কিন্তু যে পুরুষের থেকে সে আড়াল হতে মরিয়া সে পুরুষ একটিবার তাকালও না তার দিকে। মনঃক্ষুণ্ন হলো বুশরার। মুখ ভার করে বসে রইল বোনের সাথেই। তার মা চাপা স্বরে ধমকিয়ে যাচ্ছে তাকে। বিয়ে, বউভাত কোনোকিছুতে আসতে পারেনি সে। বুশরার বাবার কাজ পড়ে গিয়েছিল। যার দরুন কারোরই মাহাদের বিয়েতে আসা হয়নি। আজ এসেছে, এসেই কান্না জুড়ে দিয়েছে বুশরা। ‌বিয়েতে আসতে পারেনি, সে নিয়েই তার কান্না। মাকে বলেছিল তাকে আর বর্ণকে যেন আসতে দেয়। কিন্তু বুশরার মা তাতে রাজি হয়নি।‌ আর তাতেই রাগ হয় মেয়েটার। বোনকে পেয়েই রাগে দুঃখে কান্না করে দেয়। মেয়েটা রেগে গেলে কখনো চিৎকার চেঁচামেচি করে না। তার রাগের বহিঃপ্রকাশ এই কান্না।

_

সামনে খেলার মাঠ। উত্তর, পশ্চিম দুই পাশে বাউন্ডারি দেওয়া। পূর্ব পাশে বাঁশের ঝাড়। তার সামনে এক পুকুর। গ্রামের মহিলা, পুরুষ স্নান সারে এই পুকুরে। থালা বাসন, হাড়ি পাতিলও ধোয়া হয়। নিত্যদিনের রান্নার তরিতরকারিও পুকুরের পানিতে ধোয় বাড়ির কর্ত্রীরা। অনেকে আবার নিজ বাড়ির টিউবওয়েল, ট্যাপ ছেড়ে ধুয়ে থাকে। গোসলও করে বাড়ির ভিতরে, পুকুরে নামতে চায় না। তবে বাড়ির বুজুর্গ মহিলারা পুকুরের পানিতেই গোসল করে‌।

হালকা ঘোলাটে পানি, বাঁশ ঝাড়ের শুকনো পাতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে সেই পানিতে। নিজ নিজ বাড়ির সাথে লাগোয়া ঘাটলা করা হয়েছে পুকুরে নামার জন্য। অনেকে ইট সিমেন্টের পাকা ঘাটলা করলেও, কেউ আবার শুকনো কাঁচা বাঁশ দিয়ে মাচার মতো ঘাটলা পেতেছে। সেই ঘাটলা দিয়েই পুকুরে নামে। পানির উপরি স্তর গরম থাকলেও ভিতরে শীতল ভাব। সূর্যের তীর্যক আলো পানির উপরি ভাগে উষ্ণতা ছড়াতে পারলেও নিম্ন স্তরে প্রখরভাবে উত্তাপ ছড়াতে পারে না। যার দরুন গরমের দিনে গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ পুকুরের ঠান্ডা পানিতে গোসল করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

খেলার মাঠের পাশ ঘেঁষে দক্ষিণ দিকে পারিবারিক এক কবরস্থান। তার সাথে লাগোয়া মেইন রাস্তা। মেইন রাস্তার উল্টো দিকে বিশাল বড়ো দিঘি। পারাপারের জন্য মধ্যভাগে ব্রিজ করা হয়েছে। সেই ব্রিজে দাঁড়িয়ে আছে আভিরা, বর্ণা, লাবণ্য, বুশরা, জ্যোতি, বর্ণ, জিদান। নাওয়াজ, মাহাদের জন্য অপেক্ষা করছে সকলে। গরম গরম সিঙাড়া, পুরি নিয়ে এসেছে। সবার হাতে একটা করে সিঙাড়া আর পুরি দিল। সাথে শসা, কাঁচা মরিচ।
সিঙাড়া দেখে বর্ণের আগেরবারের কথা মনে পড়ে গেল।গরম সিঙাড়া মুখে দিয়ে মেয়েটা কেমন চাপা আর্তনাদ করে উঠেছিল। বর্ণ আড়চোখে একবার চাইল জ্যোতির দিকে। মেয়েটা উল্টো ফিরে সিঙাড়ায় কামড় বসিয়েছে। তবে এবার আর আগেরবারের মতো আর্তনাদ করে ওঠেনি।

ব্রিজের এক পাশে ফুচকা, ঝাল মুড়ি নিয়ে বসেছে মাঝবয়সী এক লোক। বড়ো ফুচকার সাথে ভেলপুরি। সবাই ফুচকা খেলেও আভিরা ভেলপুরি খাচ্ছে।‌ অত স্বাদ না হলেও খেতে খুব একটা মন্দ লাগছে না। আভিরা তিন তিনটে ভেলপুরি খেল। মেয়েরা ফুচকা খেলেও ছেলেরা খাচ্ছে ঝাল মুড়ি। বেশ ঝাল দিয়ে মুড়ি খাচ্ছে জিদান। বাকিরা অত ঝাল দেয়নি। জিদান একেবারে ব্রিজের কিনারায় গিয়ে দাঁড়াল। দিঘির পানি অনেকটা কমে এসেছে। অপর পাশে থাকা খাল প্রায় শুকিয়ে মৃতপ্রায়। এ খালে পূর্বে নৌ চলাচল করলেও বসতি স্থাপনের পর তা বন্ধ। খালবিলের বাড়ন্ত পানিও অনেকটা কমে এসেছে। চাষের জমির পানি শুকিয়ে চৌচির। খাল ভর্তি কচুরিপানা। পানির দেখা মেলা দুরূহ।

ক্রিকেট খেলতে থাকা ছেলেপেলের দিকে তাকাল জিদান। খেলার মাঝে একদল আরেক দলের সাথে লেগে গেল। একজন আরেকজনকে আক্রমণ করার চেষ্টায় মুখিয়ে আছে। এমন ভাব আজ এর একদিন তো আমার একদিন। চাপার দাঁত ভেঙে রেখে দেব। অথচ অল্প বয়সী ছেলেপেলে সব। কোনো কোনোটা হবে বয়স দশের। আর এদের অবস্থা দেখো। আটকে ধরে রাখা যাচ্ছে না। তেড়ে যাচ্ছে মারার জন্য। হঠাৎ এক ছেলে হাতে থাকা বল ছুঁড়ে মারে। কপালে এসে বল লাগতে হ্যাংলা পাতলা গড়নের ছেলেটা মাটিতে পড়ল। সেই দলের একজন বল ছুঁড়ে মারা ছেলেটার গেঞ্জি টেনে ধরে। মুহূর্তেই হাতাহাতি লেগে গেল। একজন আরেকজনকে আক্রমণ করতে ছাড়ছে না। কিল, ঘুষি যা পারছে দিয়ে যাচ্ছে। আশেপাশের লোকজনও থামাতে পারছে না এদের। ঘুষি মেরে নাক ফাটিয়ে দিয়েছে একজনের। গলগলিয়ে রক্ত পড়তে লাগল।

বুশরা আঁতকে ওঠে। চেঁচিয়ে উঠল অস্পষ্ট স্বরে। সন্নিকটে চাপা আওয়াজ শুনে জিদান ঘাড় বেঁকিয়ে চাইল। বুশরাকে দেখে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না সেখানে। দ্রুত কদমে প্রস্থান করে। বুশরার মনে হলো দাম্ভিক ছেলেটার আপাদমস্তক আত্ম অহমিকায় পূর্ণ। তাকে দেখে এভাবে চলে যেতে হবে কেন? বুশরা নাক ফুলিয়ে কয়েকটা গালি দিল জিদানকে। জিদানের এমন উপেক্ষায় খারাপ লাগলেও একদিক দিয়ে ভালো লাগা কাজ করল বুশরার। জিদানের এমন দায়সারা দাম্ভিক মনোভাবের জন্যই এত ভালো লাগে বুশরার। কিছু ছেলে আছে সুযোগ সন্ধানী। মেয়ে দেখলেই সুযোগ নিতে চায়। অথচ জিদান মোটেও এমন না। তাছাড়া জিদান তো জানেই না সে কে? জানলে নিশ্চয় এমন মুখ ফিরিয়ে যাবে না।

ঈষৎ হলদেটে দিবাকর গাঢ় কমলা রঙ ধারণ করে। বেলা শেষে তলিয়ে যেতে লাগল। ধীরে ধীরে অস্তিত্ব বিলীন ঘটে সারা বেলা তপ্ততা ছড়িয়ে দেওয়া দিবাকরের। অন্ধকার গ্রাস করে দিনের আলো। ঘন কৃষ্ণাভ আঁধারে নিমজ্জিত হয় ধরণী। বাড়ি বাড়ি জ্বলে উঠে কৃত্রিম লাইটের আলো। ঘরের আঁধার কাটাতে সক্ষম হলেও পথঘাটের ঘুটঘুটে আঁধার কাটাতে ব্যর্থকাম। এমনকি বাড়ির আঙিনা অবধি অন্ধকারে ডুবে। উঠানে লাইট লাগাতেও যেন তাদের ঢের আপত্তি। মাগরিবের আজানের ধ্বনি আলোড়িত হয় দূর অদূরের মসজিদ প্রাঙ্গণ হতে। মোয়াজ্জিন সমস্বরে উচ্চারিত করে আজানের প্রতিটি আয়াত, আহ্বান করছে আল্লাহর পথে ধাবিত হওয়ার জন্য। বাড়ির পুরুষেরা একজোট হয়ে মসজিদে গেল সালাত আদায়ের জন্য। মহিলারা যে যার কক্ষে জায়নামাজ বিছিয়ে আল্লাহর দরবারে মাথা নত করে। ভিতরে চাপা আহাজারি, ক্ষোভ, আর্তনাদ, অসহায়ত্ব জাহির করতে লাগে খোদা তায়ালার নিকট। সান্নিধ্য কায়েম করে অতীব দয়ালু মহান রাব্বুল আলামীনের। দু হাত তুলে কান্নায় ভেঙে পড়ে, যেন তাদের থেকে অসহায় কেউ নেই। খোদা তায়ালা দয়া না দেখালে তাদের ধ্বংস নিশ্চিত।

দ্রুত কদমে রুমে গিয়ে মাগরিবের সালাত আদায় করে আভিরা। জায়নামাজ গুছিয়ে রান্নাঘরে গেল সন্ধ্যাভোজের তৈয়ারে। সকলের জন্য ক্ষীরের পাটিসাপটা বানালো আভিরা। ক্ষীরের পাটিসাপটা নাওয়াজের ভীষণ পছন্দের। যদিও এসব মিষ্টি জাতীয় খাবার আভিরা অত একটা খেতে পারে না। তবে এই পাটিসাপটার প্রতি তারও দুর্বলতা রয়েছে। গরম গরম পাটিসাপটা মুখে নিল না আভিরা। একেবারে ঠান্ডা হবার পর মুখে দিয়েছে। নাওয়াজ আর বাড়ির মহিলা, পুরুষ বাদে বাকি সকলের জন্য দুধ চা বানানো হয়েছে। আলাদাভাবে ছয় কাপ রং চা করা হয়েছে। আভিরা নাওয়াজকে চা দিয়ে শাশুড়ি মায়ের ঘরে গেল। বুজুর্গ সকলে তার শাশুড়ির ঘরেরই বসে আছে। আভিরা সকলকে চা দিয়ে নিজের চা হাতে নেয়। কয়েক চুমুকে শেষ করল তা। চা তার অত একটা পছন্দ না। সে কফি খেতে বেশ পছন্দ করলেও আজ সকলের সাথে চায়ের কাপে চুমুক দিয়েছে।

নৈশভোজ সেরে সকলে হলরুমে আসন পেতে বসে। অথচ হলরুমে থাকা সোফা সম্পূর্ণ খালি। সেখানে কেউ বসেনি। মেঝেতে যে যার মতো বসে রয়েছে। দেয়ালে সেট করা টেলিভিশনে চলছে হরর মুভি। পুরো হলরুমের বাতি নিভানো। অদূরে দুটো মোম জ্বলেছে। তাও নিভু নিভু প্রায়। ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে আছে একেকজন। কেউ চোখ খিঁচে বন্ধ করে রাখলেও, কেউ কেউ দু আঙুলের ফাঁক দিয়ে দেখে চলেছে। মেয়েগুলোর একটু পরপর করা চিৎকার চেঁচামেচিতে মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে বাকি সবার। জিদান চোখ মুখ কুঁচকে চাইল বুশরার দিকে। হালকা টিমটিমে আলোয়ও বুঝতে অসুবিধা হলো না মেয়েটার দেহের মৃদু কম্পন। সহানুভূতির বদলে যেন একরাশ বিরক্তি ঘিরে ধরে তাকে। ভয় পেলে এসব দেখতে হবে কেন? যত্তসব আজাইরা তামাশা।

রুমের লাইট জ্বলতে অন্ধকারে আচ্ছন্ন থাকা কামরায় রোশনাই ছড়িয়ে পড়ে। এক ছটা আলোক রশ্মি চোখে বিঁধতে আভিরা চোখ মুখ কুঁচকে চাইল। অপ্রসন্ন, বিবশ কণ্ঠে বলে উঠল,
– লাইটটা অফ করুন।

নাওয়াজ কথা না বলে মেয়েটার শিয়রে গিয়ে বসে। আভিরা দু হাতে নাওয়াজের কোমর জড়িয়ে মুখ গুঁজে রইল। একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে মিশে রইল নাওয়াজের সাথে। অবশ তনু শিরশির করে পুরুষালি ঘ্রাণে। মেয়েটাকে এমন নিশ্চুপ হয়ে থাকতে দেখে নাওয়াজ তপ্ত শ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করল,
– কী হয়েছে? ক্লান্ত লাগছে?

– উহু।

– তাহলে?

আভিরা আরও গুটিয়ে ঠেসে রইল তার একান্ত ব্যক্তিগত লোকটার সাথে। নাওয়াজ হাত গলিয়ে দিল চুলের ভাঁজে। চুমু খেল এলোমেলো খোলা কেশে। অবাধ্য চুলগুলো প্রেয়সীর মুখে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। নাওয়াজ হাত দিয়ে সরিয়ে দিল অবাধ্য কেশ। দু হাতে মলিন মুখটা আঁজলায় নিয়ে চুমু আঁকে ললাটে, চোখে, দু কপোলে। সবশেষে অধরে অধর চেপে ধরল। অবসাদগ্রস্ত রমণী সহসাই শিউরে ওঠে। নাওয়াজ খানিকটা দূরে সরে বলল,
– নিচে চলুন। সবাই মুভি দেখছে।

– আমি যাব না।

– কেন?

আভিরা মুখ ফুলিয়ে বলল,
– ভয় লাগে।

নাওয়াজ মৃদু হাসে। জানত এই মেয়ে এ কারণেই ঘরে ঘাপটি মেরে বসে আছে। নাওয়াজ মেয়েটার হাত টেনে দাঁড় করায়। হাত ধরে পা বাড়ায় রুমের বাইরে। অপ্রস্তুত আভিরা কোনোরকম হাত বাড়িয়ে ওড়না নেয় বিছানা থেকে। অকস্মাৎ কাজের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। নাওয়াজের হাত ছাড়িয়ে রাগত স্বরে খানিকটা চেঁচিয়ে উঠল।

– কোথাও নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে?

– ছাদে।

ছাদে যাওয়ার কথা শুনে আভিরা নিশ্চুপ হয়ে গেল। সে ভেবেছিল নাওয়াজ হয়তো তাকে হলরুমে নিয়ে যাবে। নাওয়াজের আগে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল আভিরা। অসীম আসমানে গোলাকার রজনীকান্ত। নিশুতি রাতে এ চন্দ্রমা লালিত হয় আকাশের বুকে। দিনের আলোয় এ দুর্লভ চন্দ্রের দেখা মেলে না। একে দেখার জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয় ধরণী আঁধারে ডুব দেওয়া অবধি।

আভিরার কাঁধে নাওয়াজ চিবুক ঠেকায়। আভিরা সামান্য কেঁপে উঠলেও ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। বাতাসে তার ওড়নার কিনারা উড়ছে। মেয়েটা এক হাতে ওড়না টেনে পড়ে যাওয়া থেকে আটকায়। নাওয়াজ গাঢ় স্বরে বলে উঠল,
– নিশুতি রাতের প্রদীপ্ত চাঁদের আলো আমার বুকে লেপ্টে থাকা চন্দ্রমার নিকট বড্ড ফিকে।

সকলে ঘুমে আচ্ছন্ন। হলরুমের মেঝেতে ঘুমিয়ে পড়েছে সবাই। বুশরা সোফায় মাথা ঠেকিয়ে গভীর তন্দ্রায় নিমগ্ন। জিদান ভলিউম কমিয়ে মোবাইলে কিছু একটা টাইপ করল। টুং টাং শব্দ হতে না চাইতেও চোখ গেল মেঝেতে পড়ে থাকা বুশরার ফোনের দিকে।

_

সকাল থেকে বুশরার দু চোখ হন্যে হয়ে জিদানকে খোঁজে চলেছে। ঘুম ভাঙতে নিজেকে হলরুমে পেয়েছিল সে। বাকি সবাই সেখানে থাকলেও জিদান কোথাও নেই। এমনকি খাবার টেবিলেও দেখেনি সে। বর্ণও ছিল না তখন। ভেবেছিল বর্ণের সাথে হয়তো বাহিরে গিয়েছে। কিন্তু না, বর্ণ ফিরে এলো একা। হঠাৎ বুশরা অস্থির হয়ে পড়ল জিদানকে না দেখে। অস্থির বুশরা বুঝে উঠল না কার কাছে জানতে চাইবে, জিদান কোথায়? হঠাৎ করে জিদানের খোঁজ করলে কে কীভাবে নিবে বিষয়টা? দোলাচলে ভুগতে থাকা বুশরার হঠাৎ জ্যোতির কথা মাথায় আসে। ছুটে গেল জ্যোতির রুমে। জ্যোতি তখন ফোনে কথা বলছিল। হঠাৎ করে বুশরাকে দেখে তড়িঘড়ি করে ফোন কাটে। অস্থির বুশরার সে খেয়াল নেই। সে নিজেকে সামলে কিছুটা দ্বিধা নিয়ে প্রশ্ন করল,
– তোমার ভাই কোথায়?

জ্যোতি কপাল সংকুচিত করে চাইল। নির্নিমেষ বুশরার দিকে নজর রেখে জিজ্ঞেস করল,
– কেন?

হঠাৎ প্রশ্নে বুশরা হকচকায়। আমতা আমতা করে বলল,
– আম্মু ভাইয়াকে খুঁজছে। তোমার ভাইয়ার সাথে আছে হয়তো। একটু কল দিয়ে বলবে আম্মু ওকে আসতে বলেছে।

– ভাইয়া তো নেই।

– নেই মানে?

– ঢাকা গিয়েছে।

– কখন গেল?

– ভোরে। সকালে ঘুম থেকে ডেকে বলল, ফিরে যাচ্ছে। কিছুদিন পরে এসে আমাকে নিয়ে যাবে।

– ওহ্।

কথাটা কেমন যেন প্রাণহীন ঠেকল জ্যোতির নিকট।‌ তীক্ষ্ণ চোখে চাইল বুশরার দিকে। মেয়েটা কেমন অন্যমনস্ক হয়ে ভাবনায় বিভোর। হঠাৎ এক পা দু পা পিছিয়ে রুমের বাইরে চলে গেল বুশরা। ভিতরটা তার হাজারও প্রশ্নে জর্জরিত। এবার জিদান অনেক দিন থাকবে এখানে, এমনটাই বলেছিল তাকে। সেজন্য বিয়েতে আসতে না পেরে কান্নাকাটি করেছিল সে। হঠাৎ কী এমন হলো যে ভোর সকালে ফিরতে হলো তাকে। হঠাৎ বুশরার কান্না পেল। চোখ নামিয়ে মেয়েটা রুমে গিয়ে ফোন হাতে নেয়। ফ্যালফ্যাল করে অবিশ্বাস্য দৃষ্টি নিপাত করে মোবাইলের স্ক্রিনে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here