প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন #পর্বসংখ্যা_৭৯

0
2

#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৭৯
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা

বুশরার নিষ্প্রভ, নির্নিমেষ দৃষ্টি ফোনের স্ক্রিনে নিবদ্ধ। দৃষ্টি জুড়ে কেবল শূন্যতা! খানিক বাদে বাদে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে কেমন। বালিশে মুখ গুঁজে নিঃশব্দে, নীরবে পড়ে রইল। শব্দহীন কামরায় যেন শুধু ফ্যানের শব্দ অবশিষ্ট। শীতলতা কমে ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হতে থাকে কামরা। শরীর ঘামতে লাগল বুশরার। হাত পা কেমন অসাড় হয়ে আসে। কাঁপতে লাগে নিরন্তর। সুগভীর, হরিণী চোখের দৃষ্টি বুজে আসে নিমিষেই।

অসাড়, নির্জীব দেহখান চাদরের আড়ালে। সুতির কামিজ ভিজে আঁটসাঁটভাবে মসৃণ পিঠের সাথে লেপ্টে আছে। জিদান শরীর ছুঁয়ে হতবুদ্ধি! যেন এ দেহ প্রাণহীন! নিথর হয়ে গুটানো দেহ বিছানায় পড়ে। জিদান আলতো হাতে ছুঁয়ে দেখল ললাট, পেলব গাল, শুকনো ওষ্ঠাধর, গলদেশের মধ্যভাগ। গ্রীবা ছুঁতেই উষ্ণতা অনুভব হতে লাগে। সমস্ত দেহেই কেমন অল্পস্বল্প উত্তপ্ততা, শীতলভাব।

জিদানের ভ্রু কিঞ্চিত গুটানো। সরু চোখের নিরেট চাহনি বুশরার শরীরময়। নমনীয় হাতের স্পর্শ কেমন রূঢ় হতে লাগে সময়ে। শক্ত হাতে চোয়াল চেপে দেহের ভার ছেড়ে দেয় বুশরার উপর। ছোটো শরীরটা মিলিয়ে যেতে লাগল ভারী দেহের তলে।

অনবরত ছটফটানিতে জিদান সরে গেল অনতিবিলম্বে। বুশরার দৃষ্টিগোচর হওয়ার আগেই ঘর ছাড়ে তৎক্ষণাৎ। জিদান যেতেই নড়চড় বন্ধ হয় বুশরার। অক্ষিগোলকে ভিড়তে লাগে নোনাজল। অস্পষ্ট, রাশভারী কটাক্ষ স্বর কানে বাজতে লাগে অতিশয়।

– যা আড়ালে ছিল তা আড়ালেই থেকে যেত। রহস্য উন্মেষ হয়ে ঘৃণার মাত্রা কেন বাড়াতে গেল? তোমার মুখটা দেখলেই আমার অসহ্য লাগে, ক্রোধ বাড়ে। ট্রাস্ট মি বুশু, আমি তোমায় ঘৃণায় রাখতে চাই না। আমার তুমিকে আমার মতো করে ভালোবাসতে চাই আমি।

_

আনন্দ উল্লাসে মুখরিত কামরা অকস্মাৎ ক্রন্দনরত আর্তনাদে নিস্তব্ধ। সকলের হতভম্বি দৃষ্টিপাত! আভিরা উদরে হাত রেখে ঠোঁট কামড়ে কান্না দমনের অদম্য প্রয়াসে। কার্নিশ ঘেঁষে অবিরাম ধারায় গড়িয়ে চলেছে বিষাদের অশ্রু। হাত পা ঝিম মেরে, শরীরে খিঁচুনি উঠে তীব্রভাবে! ঝাপসা চোখের দৃষ্টিতে কাঙ্ক্ষিত মানবকে খুঁজে চলেছে বারংবার। তিরতির করে কাঁপতে থাকা ওষ্ঠাধর সামান্য ছাড়িয়ে কিছু একটা বলার চেষ্টায় উন্মুখ!

সম্মুখে ম্রিয়মাণ মানবকে দেখে কান্নারা দলা পাকিয়ে আসে। নাওয়াজ এক মুহূর্তও অতিব্যয় করে না। দু হাতে তুলে নেয় আভিরার ভারী দেহ। আলগোছে রুক্ষ, শুষ্ক ঠোঁট ছোঁয়ায় ললাটে। সুদীর্ঘ চুম্বন আঁকে সযত্নে। তার অব্যক্ত সকল অনুরক্তি ব্যক্তকরণের মাধ্যম যেন এই সামান্য ওষ্ঠের স্পর্শ!

হাসপাতালের পরিবেশ কোলাহল পূর্ণ। নিকটাত্মীয়ের আহাজারিতে ভারী চারপাশ। স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মৃতদেহ! এত কান্না, যাতনা কোনোকিছুই অদেখা করছে না নাওয়াজ। নির্নিমেষ দৃষ্টি ফেলে দেখে চলেছে আপনজন হারিয়ে বেদনায় কাতর প্রত্যেককে!

– যেভাবে ভিতরে পাঠাচ্ছি সেভাবেই ফিরে আসবেন আমার কাছে। বাচ্চাদের দেখার জন্য তাদের বাবা অপেক্ষায় আছে।

আভিরা মৃদু হাসার চেষ্টা করে। তার চোখে হারিয়ে ফেলার শঙ্কা! নির্নিমেষ, নিস্পৃহ চোখে দেখে চলেছে তার একান্ত ব্যক্তিগত পুরুষকে। মনে হচ্ছে এই পুরুষকে দেখা হবে না তার। এই দেখায় যেন শেষ দেখা। আভিরার ভয়াল চাহনি অগোচর হয় না নাওয়াজের। সে একেক পা করে পিছিয়ে যেতে লাগে। আভিরা কাতর চোখে দেখতে লাগল তার পুরুষের মিলিয়ে যাওয়া। মুহূর্তেই দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল নাওয়াজের অবয়ব। আভিরা উদ্বেগ চোখে খুঁজতে লাগে নাওয়াজকে। একটুখানি দেখা পাওয়ার প্রত্যাশায়! কিন্তু নির্দয় পুরুষ দেখা দেয় না। আড়াল থেকে দেখতে লাগে তার রমণীর অসহায়ত্ব, ব্যাকুলতা!

নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রসব ব্যথা শুরু হয় আভিরার‌। দিন কয়েক ধরে হালকা ব্যথার সাথে পানি ভাঙে। বিবর্ণ, হালকা হলদেটে পাতলা তরলে ভিজতে লাগে পরনের পায়জামা। সময়ের সাথে তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগে ব্যথা। নাওয়াজ বাড়িতে ছিল না তখন। মায়ের ফোনকলে পাগলপ্রায় ছুটে আসে। আভিরার নীলাভ, ফ্যাকাশে মুখ দেখে ভেতর কেমন মুচড়ে উঠে, নিঃশ্বাস ফেলাও দুঃসাধ্য!

সপ্তাহখানেক বাদে সি সেকশন বিধায় ধারের কাছের সকলেই এসেছিল। উল্লাসে ফেটে পড়ে নিস্তব্ধতায় ছেয়ে থাকা চার দেয়াল। নতুন অতিথিকে দেখার তরে সকলে অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান! আকস্মিক অনাহূত আর্ত চিৎকারে সকলে বিহ্বল!

_

মাতৃত্ব অপ্রতিম অনুভূতি, পূর্ণ করে নারী সত্তাকে। মাতৃত্ব অনুভূতের জন্যে সত্তা জর্জর হয় অসহনীয় যন্ত্রণায়। প্রসবের ব্যথা হাড় ভাঙার সমতুল্য। অসহিষ্ণু ব্যথা সহন করে নিজের অস্তিত্বকে বক্ষ বিভাজনে দেখেই সকল ব্যথা ভুলে যায় অনায়াসে। ক্ষুদ্র হাতের আঙুল, কুটকুট করে দেওয়া দন্তহীন মাড়ির কামড়, কুটুস কুটুস চাহনির নিকট প্রসব ব্যথাও যেন তুচ্ছ!

চোখ মেলতেই অভিনব দৃশ্য নীরবে প্রত্যক্ষ করতে লাগে আভিরা। একজন চুকচুক শব্দ করে মায়ের দুগ্ধ পানে মত্ত, আর অন্যজন অনাবৃত, উন্মুক্ত বক্ষে গাল ডাবিয়ে নিশ্চুপে মিশে আছে। আভিরা জ্বলজ্বল চোখে সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া সন্তানদের দেখে চলেছে। অদ্ভুত রকমের তৃপ্তির হাসি তার মুখ জুড়ে বিরাজমান।
আভিরা মুখ নামিয়ে আলগোছে চুমু আঁকে তার নাড়ি ছেঁড়া নক্ষত্রদের ললাটে। অজান্তে, অকারণে অশ্রু ঝরতে লাগে অক্ষিকোটর ভেদ করে। আভিরার কান্না ভেজা চোখে অন্যরকম খুশির ঝলক। অমূল্য কিছু পাওয়ায় আত্মহারা প্রায়।

কাঙ্ক্ষিত মানবকে দেখতে না পেয়ে অস্থিরতা ঘিরে ধরে আভিরাকে। প্রগাঢ় ঘোলাটে চোখের মণি এদিক ওদিক ঘূর্ণন। মধ্যাহ্নের সময় পেরিয়ে গোধূলি লগ্ন। অম্বর কালো করে মেঘ জমতে লাগে, বইতে লাগে ঝড়ো হাওয়া। বড়ো বড়ো ফোঁটায় আকাশ চিরে ঝমঝমিয়ে নামে বৃষ্টির পানি।
আভিরা হাত বাড়িয়ে সরিয়ে দেয় সফেদ পর্দা। দৃষ্টিগোচর হয় রাস্তার অপর পাশের দৃশ্য। কুঁচকানো ধূসর রঙের শার্ট ভিজে জবজবে হয়ে লেপ্টে সুঠাম দেহে। বৃষ্টির ফোঁটা ওষ্ঠ ছুঁয়ে চিবুক গড়িয়ে পড়তেই আভিরা ঢোক গিলে। তার ঈর্ষান্বিত নজর পুরুষটার ওষ্ঠে নিবদ্ধ। এলোমেলো লেপ্টে থাকা চুল রুক্ষ হাতে পিছনে ঠেলে দেওয়ার দৃশ্য দেখে আশপাশ পরখ করে নেয় তীক্ষ্ণ চোখে। অদূর থেকে এক মেয়েলি চোখের দৃষ্টি তার পুরুষেই নিবদ্ধ। আভিরা মূঢ় বনে কেবল নাওয়াজের অপেক্ষমান।

নিস্তব্ধ নিশীথে কান্নার গুঞ্জনে তন্দ্রা ছুটে যায় ঘুমন্ত রমণীর। একরাশ বিরক্তিকর চাহনি ফেলতেই মুহূর্তে শিথিল হয়ে আসে চোখের দৃষ্টি। দৃষ্টিতে কেমন মুগ্ধতা! মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় চেয়ে রইল পলকহীন।
রক্তিম ঠোঁট জোড়া ফাঁক করে কান্নায় ভেঙে পড়েছে নবজাতক। চোখ ফেটে অঝোরে পড়ছে অশ্রু জল। কান্নার দরুন হাত পা মৃদুভাবে নড়ছে, কাঁপছে ছোট্ট শরীরটা।

বক্ষ বিভাজনে পুরুষালি হাতের ছোঁয়ায় আভিরার হৃদয় ছলকে ওঠে। নাওয়াজ একটানে জামার চেইন খুলে উন্মুক্ত করে বক্ষঃস্থল। রাশভারী স্বরে কেবল বলে উঠল,
– ফিডিং করান ওদের, ক্ষুধায় কাঁদছে।

আভিরা বাবুকে দু হাতে তুলে নেয়। অসম্ভবভাবে কাঁপতে লাগে দু হাত। ভীতু আভিরা হাত ছেড়ে দিতে নিলেই নিজের হাতের নিচে দৃঢ় দু হাতের অস্তিত্ব অনুভব করে। আতঙ্কিত, ভয়ে আড়ষ্ট আভিরা কেঁদেই ফেলে। আরেকটু হলে কী অঘটনটাই ঘটে যেত। আভিরার শরীরের কম্পন বুঝে উঠতেই নাওয়াজ জড়িয়ে ধরে। পিষ্টদেশে হাত রেখে নীরবে আশ্বস্ত করে।

– শান্ত হোন। কান্না করার মতো কিছু হয়নি।

– আরেকটু হলে পড়েই যেত। আমি এমন জ্ঞানহীনের মতো কাজ কীভাবে করলাম।

– বাদ দিন। ওদের খাওয়ান আপনি। পরেরবার থেকে একটু সাবধানে থাকতে হবে।

আভিরার কান্না তবুও থামে না। শরীরে কাঁপন ধরে গেল কেমন। নাওয়াজ হাতের বাঁধন শিথিল করে ছেলেকে নিজের কাছে নিয়ে শুইয়ে দেয় আভিরার বক্ষে। বুকের সাথে ছোটো একটা মুখের ঘষা লাগতেই কান্না কেমন আপনাআপনি বন্ধ হয়ে আসে। আভিরা টলমল চোখে তাকায় ছোটো মুখপানে। সে এখন মায়ের বুকের দুগ্ধ পানে ব্যস্ত।

একজন দুগ্ধ পান করে ভরপেট, আর অন্যজন সন্ধ্যা থেকে ঘুমিয়ে। জাগবে হয়তো শেষ রাতে। নতুবা পুরো রাত ঘুমিয়েই কাটাবে। মায়ের বুকে লেপ্টে থেকেই ঘুমে তলিয়ে গেল বাচ্চাটা। আভিরা সাবধানে শুয়ে দেয়। উল্টো ফিরতেই দেখল নিগূঢ় চোখ জোড়া তার দিকেই তাকিয়ে। আভিরা সলজ্জায় গুটিয়ে গেল কেমন। ওড়না দিয়ে আড়াল করে উন্মুক্ত বুকের খাঁজ।

– আপনার প্যাড চেঞ্জ করতে হবে? ব্লিডিং হচ্ছে কেমন? সন্ধ্যার পর চেঞ্জ করেছিলেন?

অনবরত প্রশ্নে আভিরা ভড়কে চায়।‌ দৃষ্টিতে অপ্রস্তুতভাব, তীব্র সংকোচবোধ। দৃষ্টি সরিয়ে অন্যত্র দৃষ্টি ফেলে। পাশ ফিরে না তাকিয়েও বুঝতে পারে নাওয়াজের প্রখর দৃষ্টি।

– কথা বলছেন না কেন?

পুনর্বার রাশভারী কণ্ঠ কানে আসতে আভিরা কুঁকড়ে গেল।‌ শক্ত হাতে চেপে ধরে জামার একাংশ। জড়ানো কণ্ঠে বলল,
– হু।

– এখন চেঞ্জ করতে হবে?

– হ্যাঁ।

– আচ্ছা আমি চেঞ্জ করে দিচ্ছি।

আভিরা আঁতকে ওঠে। আতঙ্ক ছেয়ে যায় সুশ্রী মুখশ্রীতে। তোতলানো সুরে কোনোরকম বলে উঠল,
– আম্মুকে ডেকে দিন। আম্মু চেঞ্জ করে দিবে।

– আপনার আম্মু ঘুমিয়ে গিয়েছে। ওনাকে এখন ডেকে তুলব? তার থেকে বরং আমিই চেঞ্জ করে দেই‌। আজ থেকে যতদিন রক্তক্ষরণ হবে আমিই চেঞ্জ করব।

সাদা স্বচ্ছ প্যাড রক্তে মাখামাখি। প্রসবের প্রথম দিন রক্তক্ষরণ ঘটে অত্যধিক। তারপর ধীরে ধীরে রক্তক্ষরণ কমতে লাগে, এবং সপ্তাহ ছয়েকের মাঝে একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। প্রসবের পর রক্তক্ষরণ স্বাভাবিক। গর্ভে বাড়ন্ত ভ্রূণ পরিপূর্ণভাবে ভূমিষ্ঠ হবার পর শুরু হয় রক্তপাত।

নাওয়াজ প্যাড চেঞ্জ করে খুব স্বাভাবিকভাবে চেয়ার টেনে বসল। আভিরার বাহু আঁকড়ে ধরে শুইয়ে দিতে দিতে বলল,
– চোখ বন্ধ করুন।

– আপনি ঘুমাবেন না?

– ঘুমাব।

– আসুন তাহলে।

– কোথায় আসব আঞ্জুম? এই ছোটো বেডে জায়গা হবে না। বাবুদের নড়চড়ে সমস্যা হবে। তাছাড়া আপনার বুকে মাথা রেখেও ঘুমানো যাবে না এখন। বাড়িতে না যাওয়া অবধি আলাদাই থাকতে হবে।

– বাবুদের দেখেছেন আপনি?

– হু।

– ওদের কাজল লাগাতে হবে বুঝলেন। অন্যদের নজর কী লাগবে, আমারই না নজর লেগে যায়। ওদের দেখার পর থেকে নজর ফেরানো দায় হয়ে গিয়েছে। মাশাআল্লাহ আল্লাহর অনন্য সৃষ্টি আমাদের ছেলেরা। মনে হচ্ছে খোদা তায়ালার সবচেয়ে দুর্লভ সৃষ্টি আমার দেখা হয়ে গিয়েছে।

নাওয়াজ নিঃশব্দে উপভোগ করতে লাগে সদ্য মা হওয়া রমণীর উচ্ছ্বাস। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ছড়িয়ে ক্ষীণ স্বরে বলতে লাগল,
– ক্ষণে ক্ষণে সুন্দরতম মুহূর্ত প্রত্যক্ষ করার জন্য প্রস্তুত হন নাযীর, নুরেনের আম্মি!

_

একাধিক কলরব কর্ণকুহরে যেতে আভিরা মুদিত নজর মেলে চাইল। তার একদিনের বাচ্চাদের নিয়ে টানাটানি লাগিয়ে দিয়েছে সকলে। একজন ইতোমধ্যে উচ্চ শব্দে কান্না জুড়লেও অন্যজন মার্বেল আকৃতির চোখ মেলে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে।

– যা তোমার ঘুম ভেঙে গেল। আমার দোষ নেই কিন্তু। নাওয়াজ ভাইয়া নিষেধ করার পর আমি কোনো শব্দ করিনি। সব তোমার ছেলের দোষ। সে ই কান্না জুড়ে দিয়েছে তখন থেকে।

পুরোটা রাত নির্ঘুম কেটেছে আভিরার। ছেলে দুটো সারা রাত কান্না করেছে। না নিজেরা ঘুমিয়েছে আর না মাকে নিশ্চিন্তে চোখ বুজতে দিয়েছে একদণ্ড। একজন কাঁদতে কাঁদতে চোখ মুখ লাল করে ফেলেছিল। রক্তিম মুখ দেখে আভিরা পাগলপ্রায়। উচ্চ শব্দে কেঁদে ফেলে নাওয়াজকে আঁকড়ে ধরে। নাওয়াজ কোনোমতে বুঝিয়ে শান্ত করে মেয়েটাকে। চোখটা লেগেছিল ঘণ্টাখানেক আগে। এর মাঝে সকলে এসে হাজির। সকলে পারেনি রাতেই চলে আসতে। বর্ণা, নাওয়াজ আর মাহাদ হাসপাতালে নিয়ে এসেছিল আভিরাকে। আনেসা এসেছে আভিরাকে কেবিনে নেওয়ার পর। তাযীম আসতে চাইলেও নিয়ে আসা হয়নি। হাসপাতালের ঝঞ্ঝাটপূর্ণ পরিবেশে ওকে নিয়ে আসা মানে অযথা হয়রানি। আভিরাকে বাড়িতে না নেওয়া অবধি তার দেখা হবে না দু ভাগ্নেকে।

– ওকে আমার কাছে দাও।

– আমার কাছে রাখি না একটু। কী সুন্দর হয়েছে মাশাআল্লাহ। পুরো ভাইয়ার মতো দেখতে হয়েছে।

– লাবণ্যর নাক পেয়েছে ও!

হঠাৎ নাওয়াজের বলা কথায় সকলে লাবণ্যর পানে চায়। লাবণ্য অপ্রস্তুত হাসে। কিছুটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মিলাতে লাগে কান্নারত বাচ্চার সাথে নিজেকে। তার নাকের মতো অবিকল নাক পেয়েছে। কিছুটা সরু, লম্বাটে।

– যার মতোই হোক না কেন, বাবুদের নাম কিন্তু আমি রাখব প্লিজ।

– আচ্ছা রেখো।

– এইটা পাজি হবে ভীষণ! আর এই নাকবোচাটা হবে তোমার মতো শান্ত স্বভাবের! দেখো কখন থেকে মুখে আঙুল পুরে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে।

বোচা নাকটাই আঙুল ছুঁয়ে আহ্লাদী সুরে বলল,
– এই পুচু সোনা কী দেখো তুমি? এই যে আমি তোমার আন্টি, বলো আন্টি।

জ্যোতির পাগলামিতে তীব্র হাসির ধুম পড়ে গেল বদ্ধ কামরায়। মৃদু হাসির গুঞ্জন কামরা জুড়ে। জ্যোতির হাস্যোজ্জ্বল মুখের পানে কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বর্ণ। বুশরার দৃষ্টিগোচর হতেই মৃদু হাসে। ভাইয়ের চাহনি যেন আর নিকট স্বচ্ছ জলের ন্যায় স্পষ্ট। তন্মধ্যে জিদানের চোখে চোখ পড়তেই মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। অভিমানী দৃষ্টি সরিয়ে মুহূর্তে অন্যদিকে ফিরে চায়।

সকলে হাসি তামাশায় মেতে থাকলেও আভিরা ঠোঁট চেপে হাতের কাঁথাগুলো দেখতে লাগল। আভিরাকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে লাবণ্য এগিয়ে আসে। মৃদু হেসে জানতে চাইল,
– পছন্দ হয়েছে?

– হ্যাঁ। চমৎকার নকশা তুলতে পারো তুমি।

– খালার থেকে শিখেছি।

লাবণ্যর নিপুণ হাতের বুনন। ইয়াজমীনের সব গুণই যেন রপ্ত করেছে অনায়েসে। নৈপুণ্যে ভরপুর পুরো কাঁথায়, দৃষ্টি নন্দিত শৈল্পিক কারুকাজ। আভিরা মুগ্ধ চোখে অবলোকন করে নকশা খচিত কাঁথা।

– মা কখন আসবে আপু?

– বিকেলে আসবে। এগুলো এখন রাখো। তোমার জন্য খাবার পাঠিয়েছে খালা। বলেছে এসেই যেন আগে তোমাকে খাওয়ানো হয়। অভুক্ত থাকা যাবে না কোনোমতে।

খাবার দেখে আভিরা চোখ উল্টে ফেলে। জাউ ভাত রান্না করে পাঠিয়েছে তার জন্য। সবজিও কেমন যেন তেল, মশলা ছাড়া। নাক মুখ কুঁচকে সহসাই বলল,
– আমি এসব খাব না।

– খাব না বললে হবে না। এখন এসবই খেতে হবে।

– আপু প্লিজ খেতে পারব না। বমি করে ফেলব।

– বমি আসবে না। খেয়ে দেখো।

আভিরা কোনোরকম কয়েক লোকমা খেয়ে রেখে দিল।‌চাহনি এমন যেন খাবারের প্রতি তার একরাশ অনিহা, বিতৃষ্ণা। তবুও রেহাই মিলে না। আরও কয়েক লোকমা গিলতে হয় অনিচ্ছা সত্ত্বেও। আধ কাঁচা আধ পাকা পেঁপে, মাল্টার স্লাইস, আমলকীও খেতে হলো তাকে।

– এভাবে নাক মুখ কুঁচকালে হবে আঞ্জুম? আগের মতো না খেলে চলবে না এখন। খেতে হবে আপনাকে। বাচ্চাদের জন্য হলেও খেতে হবে। টকজাতীয় ফলমূল বেশি খেলে ঘা শুকাবে দ্রুত। আর সেলাই না কাটা অবধি নরম খাবার খেতে হবে। কয়েকটা দিন কষ্ট করুন। আমি জানি আপনি পারবেন। দশ মাসের অসহনীয় যন্ত্রণার কাছে এইটা তো সামান্য। মায়েদের একটু স্যাক্রিফাইস করতেই হয়। বিনিময়ে দুর্লভ সুখানুভূতি পাবেন।

– বাবুরা আমার মতো দেখতে কেন হয়নি?

নাওয়াজ এক পলক চেয়ে নজর ফেরায়। মাথা ঝাঁকিয়ে কেমন অদ্ভুতভাবে হাসে। আভিরা মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে থাকে হাস্যরত মানবের দিকে।

– কারণ সে হবে আপনার মতো দেখতে।

– কে?

নাওয়াজ আভিরার কানের ধারে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলতে লাগে,
– আপনার মেয়ে।

আভিরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো আওড়ায়,
– আমার মেয়ে।

– হু। আপনার আমার মেয়ে, আমিরা।

উত্তপ্ত নিঃশ্বাস আছড়ে পড়তে নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে আভিরার। অসাড়, বিবশ প্রায় শুনতে লাগে নাওয়াজের বাক্যালাপ।

– খুব শীঘ্রই ছোট্ট আঞ্জুম আসতে চলেছে আমাদের মাঝে।
এই পুঁচকে দুটো আপনার মেয়ের ঢাল হবে, রক্ষা করবে সকল বিপদাপদ থেকে।
_

গুনগুনিয়ে কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। কেমন অদ্ভুতুড়ে শোনাচ্ছে। অস্পষ্ট, মুদৃ গোঙানিতে গা ছমছম করতে লাগে বুশরার। পাশের জনের সাথে গা ঘেঁষে মিশে যেতে লাগল একদম। আচমকা ধমকে কেমন কেঁপে উঠে সত্তা।

– সমস্যা কী তোমার? সারাক্ষণ এমন গা ঘেঁষাঘেঁষি করো কেন?

মিথ্যা অপবাদে তেতে উঠে বুশরা। কিছু বলতে গিয়েও কথা গিলে ফেলে। এখন মেজাজ দেখানো মানে নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনা। কোনোরকম রাতটা কাটতেই এর শোধ তুলবে। এখন টু শব্দটিও করা যাবে না। দাঁতে দাঁত চেপে সয়ে যেতে হবে।

বুশরাকে এমন অনড় অবস্থায় দেখে জিদান রক্তিম চোখে তাকায়। বুশরা এমন দৃষ্টি দেখেও দেখে না। উল্টো ফিরে একইভাবে পড়ে রইল। বুশরার এমন হেঁয়ালিতে দাঁত কিড়মিড় করে রাগ সামলানোর চেষ্টা করে জিদান। চেয়েও রাগ দেখাতে না পারায় ক্রোধ বাড়ে অস্বাভাবিকভাবে। আবছা আলোতে মেয়েটার ভীত চোখের দৃষ্টি স্পষ্ট। এ দৃষ্টিই যেন তার রাগ ধামাচাপা পড়ার একমাত্র কারণ।

হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে বমি করে যা তা অবস্থা করেছিল। পুরোটা রাস্তা তার ঊরুর উপর মাথা রেখে মৃতের ন্যায় পড়ে থাকে। বিয়ের দিনও এমনটাই করেছিল এই মেয়ে। জিদানের মায়া লাগলেও ছুঁয়েও দেখেনি। তবে আজ যেন ত্রাসিত চোখের চাহনি উপেক্ষা করতে পারছে না কোনোভাবে। জিদান চোয়াল শক্ত করে বিছানা ছাড়ে। কোনোদিকে না তাকিয়ে জ্যোতির রুমে গেল। প্রতি রাতেই বোনের রুমে যাওয়া অনিবার্য।

দরজা খোলার শব্দে চকিত তাকায়। অন্ধকার হয়ে থাকা কামরায় আলো জ্বলতেই উত্তপ্ত চোখের দৃষ্টি নিভে আসে। রক্তিম চোখ দুটোতে জল টলমল করছে। দু এক ফোঁটা জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অবহেলায়। কাতর চোখের দৃষ্টি জিদানের উপর পড়তেই জিদান চোখ বুজে নেয়। দু হাত মুষ্টিবদ্ধ করে জ্বলন্ত চোখে তাকায় জ্যোতির দিকে।

জ্যোতির গা ছুঁতেই তৎক্ষণাৎ হাত সরিয়ে ফেলে বুশরা। উত্তপ্ত গায়ে হাত রাখা দায়। কিছুটা অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে দেখতে থাকে জ্যোতিকে। মেয়েটা কেমন স্থির হয়ে শুয়ে আছে। জ্যোতিকে এভাবে স্থির হয়ে থাকতে দেখে হতভম্ব প্রায় বুশরা। গায়ে এমন আগুন জ্বর নিয়ে কেউ এভাবে পড়ে থাকে কীভাবে? বুশরা সময় ব্যয় না করে প্যারাসিটামল খাইয়ে দেয়। টুকরো কাপড় ভিজিয়ে জলপট্টি দিতে লাগে।

আচমকা উদরে উষ্ণ হাতের ছোঁয়ায় বুশরা ভড়কে গেল। কেমন নিস্পৃহ চাহনি জ্যোতির। চোখে আকুলতা, মিনতি। একরাশ অসহায়ত্ব নিয়ে খানিকটা স্নেহের আশায় চেয়ে আছে। বুশরা কেবল নীরবে, নিঃশব্দে, নির্নিমেষ দেখতে লাগল জ্যোতির চোখ বেয়ে অনবরত পড়তে থাকা চোখের পানি।

– একটু হাত বুলিয়ে দাও ভাবি। তোমার গা থেকে কেমন মা মা ঘ্রাণ আসছে। অনেক বছর ধরে মায়ের একটু আদরমাখা ছোঁয়া জুটে না ভাগ্যে!

পরকীয়া, সামান্য এই শব্দ নাশ করে অসংখ্য মানুষের জীবন। বাবা মায়ের পাপাচারের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয় অবুঝ, নিষ্পাপ বাচ্চাগুলোকে।

ভালোবেসে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেও একসময় আসক্ত হয়ে পড়ে পরনারীতে। বিয়ের এত বছর পর স্বামীর এমন বিশ্বাসঘাতকতা কোনোভাবেই মানতে পারেনি জ্যোতির মা। স্বামীর অনৈতিক সম্পর্ক, প্রতারণা এতটাই বিভ্রান্ত করে যে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে আত্মাহুতি করে সবশেষে।

জিদান সবে ক্রিকেট খেলে রুমে ফিরেছিল তখন। কপাল চুঁইয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। ভেজা শার্ট খুলে উন্মুক্ত দেহে দখল করে সোফা। আয়েশ করে গা এলিয়ে দিতেই কান্নার শব্দে হুড়মুড়িয়ে ওঠে। মায়ের রুমের দরজা খুলে ভিতরে যেতেই তীব্র ঝাঁকুনিতে পিছিয়ে গেল কয়েক কদম। তার অবিশ্বাস্য চোখের দৃষ্টি মায়ের ঝুলন্ত দেহে। গা কাঁপুনিতে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না জিদান। ভারসাম্য হারিয়ে ধপ করে পড়ে মেঝেতে। সেভাবেই দেয়াল ঘেঁষে বসে রইল। হাতের পিঠে জল গড়িয়ে পড়তেই খেয়ালে আসে বোনের কথা। চোখ তুলে তাকাতেই দেখল জ্যোতির ফোলা ফোলা চোখের অসহায় দৃষ্টি। অবুঝ জ্যোতি কেবল মা, মা বুলি আওড়াচ্ছে বারংবার!

বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী তাদের কটাক্ষ না করলেও কখনো কাছেও টেনে নেয়নি। প্রথম থেকেই তাদের সাথে দূরত্ব রেখে চলে এসেছে। বাড়িতে যেন তিনি ছাড়া দ্বিতীয় কেউ নেই। নিজের খেয়াল খুশি মতো চলাফেরা করেন, একেবারে স্বাধীনচেতা মনোভাব। এমনকি জিদান, জ্যোতির কোনো বিষয়ে কখনো হস্তক্ষেপ করে না। অথচ জ্যোতি এমনটা‌ কখনোই চায়নি। তার চাওয়া যেন অতি সামান্য। ঐ একটুখানি মায়ের মতো স্নেহ, ভুল করলে শাসন, না খেয়ে থাকলে জোর করে খাওয়ানো কিংবা মাঝরাতে গা কাঁপিয়ে জ্বর এলে যেন মায়ের অভাববোধ না হয়। কৃপা করে হলেও যেন কেউ মায়ের মতো একটু স্নেহের হাত রাখে। অথচ কেউ ফিরেও চাইল না, এই সামান্য চাওয়াটুকু ভাগ্যে জুটল না তার।
জিদান নিজেকে সামলে নিতে পারলেও জ্যোতি যেন এত বছরেও নিজের মাঝে পরিবর্তন আনতে পারেনি। তার মাঝে একটুখানি স্নেহের, যত্ন পাবার বড্ড লোভ।

বুশরা স্তব্ধ হয়ে শুনে গেল। হাসিখুশি মেয়েটাকে তার এমন অসহায়ের মতো দেখতে হবে কেন? খানিকটা স্নেহের আশায় তাকেই বা কেন আঁকড়ে ধরবে? সে কী মায়ের মতো আদুরে ছোঁয়া আঁকতে পারবে? কী করবে বুঝে উঠতে না পেরে নির্বোধ বুশরা জিদানের দিকে তাকায়। জিদান ইশারা করতেই অনতিবিলম্বে হাত রাখে জ্যোতির মাথায়। অর্ধ অচেতন প্রায় জ্যোতি বিড়বিড়ায়,
– মানুষ মরে মানুষের অভাবে, অনাদরে, অযত্নে!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here