#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৭৮
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
নাওয়াজ আজকাল অনেক রাত করে বাড়ি ফিরে। ফিরতে ফিরতে তার রাতের দুইটা, তিনটে বেজে যায় কখনো কখনো। আভিরা ভেবে পায় না এত রাত অবধি নাওয়াজ বাইরে কি এমন করে।
আভিরার বুক কেঁপে উঠল। অজানা আশঙ্কায় চোখ মুখ থেতিয়ে ওঠে। নাওয়াজ আবার অন্য পুরুষদের মতো ঘরে বউ রেখে বাইরে…
ছিঃ ছিঃ এসব কী ভাবছে! তার চিন্তা ভাবনার এমন অবনতি কবে হলো। হাসপাতাল থেকে এক সপ্তাহের ছুটি কাটিয়ে ছিল। নাওয়াজ তাই বলেছিল। তারপর থেকেই দেরি করে ক্লান্ত দেহ নিয়ে বাড়ি ফিরে। আবার ভোর হতেই ব্যস্ততা দেখিয়ে বেরিয়ে যাবে। এখন নিশ্চয়ই এক্সট্রা ডিউটি করতে হচ্ছে, সে ই উল্টা পাল্টা ভাবছে। আভিরা এসব ভেবে নিজেই নিজেকে বুঝ দেয়। তবুও তার মন মানতে চায় না। অজানা ভয়ে কামড়ে ধরে বুকের নরম অংশ। আভিরা কোনোরকম দেয়ালে পিঠ ঠেকায়। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে, তলপেটে হাত রেখে জোরে জোরে শ্বাস ফেলতে থাকে।
ভারী দেহখানা কেউ সযত্নে দু হাতে তুলে নেয়। বিছানায় শুয়ে দিয়ে মাথার নিচে বালিশ টেনে দিল। রমণীর গালে শুকিয়ে থাকা জলের ছাপ দেখে পুরুষটার কপালে ভাঁজ পড়ে। তর্জনী দিয়ে ছুঁয়ে দেখল গালের ভাঁজ, গলার ধার। ঘুমন্ত আভিরা নড়েচড়ে উঠতে নাওয়াজ তৎপর সরে গেল। ঘর্মাক্ত দেহখানা থেকে টেনে খুলল ভেজা শার্ট। টাওয়াল হাতে গেল গোসলে। মনে হচ্ছে ধুলাবালিতে গিজগিজ করছে দেহ, সাথে ঘামের গন্ধ তো আছেই। শীতের রাতে ঠান্ডা পানিতে গোসল দেওয়া মুখের কথা নয়। নাওয়াজ ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে ভিজতে লাগল। বরফের ন্যায় জল কণা শীতল করতে লাগে দেহ। শুষে নিতে লাগল শরীরের সমস্ত উষ্ণতা, উত্তাপ।
বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে পাশ ফিরে চাইল নাওয়াজ। আভিরার পরনে থাকা জামা খানিকটা তুলে উন্মুক্ত করল উদর। ঠোঁট ছুঁইয়ে গভীর শ্বাস ফেলতে লাগে। নাক টেনে নিতে লাগল রমণীর গায়ের ঘ্রাণ। বাড়ন্ত পেটে মাথা রেখে অনুভব করতে লাগে নিজ অস্তিত্বকে।
– কখন এসেছেন?
ঘুম জড়ানো এলোমেলো কণ্ঠে কেউ বলে উঠতেই নিজের সাথে আরও নিবিড়ভাবে আভিরাকে জড়িয়ে নেয় নাওয়াজ। আভিরাও যেন মাঝের দূরত্ব কমিয়ে মিশে যেতে লাগল নাওয়াজের সঙ্গে। কিঞ্চিত পরিমাণ দূরত্ব নেই দুটো দেহের মাঝে। একে অপরের সাথে তারা আলিঙ্গীত!
– নড়ছেন কেন আঞ্জুম?
আভিরা খানিকটা নড়তে নাওয়াজ বলে উঠল। তার কণ্ঠে বিরক্তি প্রকাশ পাচ্ছে কেমন।
– উঠব।
– এখন উঠে আপনার কাজ?
– আপনার খাওয়া হয়নি। খাবেন চলুন।
– খেয়েছি।
– আমি জানি খাওয়া হয়নি।
– ভুল জানেন।
– ভুল নয়।
– কথা বাড়াবেন না। বললাম তো খেয়েছি আমি।
আভিরা কথা না বলে নাওয়াজের হাত ছাড়িয়ে বিছানা ছাড়ে। নাওয়াজও উঠে আভিরার সাথে গেল। রোজ রাতের কাহিনী এইটা। এই মেয়েকে বলেও কাজ হয় না। তার নিষেধ অমান্য করে এমন করবে।
প্রতি রাতে নাওয়াজ এসে দেখবে আভিরা গভীর ঘুমে। সে পাশে শুতেই কেমন করে যেন মেয়েটার ঘুম ভেঙে যায়। অথচ সে কত শত সতর্কতা অবলম্বন করে। সাবধানে থাকে কোনো শব্দ যেন না হয়, কোনোভাবে যেন আভিরার ঘুম না ভাঙে।
আভিরা ভাত বেড়ে নাওয়াজের পাশে দাঁড়িয়ে রইল। এই কাজ তার নিত্যদিনের। দুজন একসাথে খেতে বসবে। কিন্তু ইদানিং নাওয়াজের রাত করে ফেরা, আবার আভিরা এই অবস্থায় আগের মতো রাত জেগে থাকতে পারে না। যার দরুন একসাথে খাওয়া হয় না তাদের।
দিনের পুরোটা সময় নাওয়াজ বাহিরে থাকে। রাতেও ফিরে সময়, অসময়ে। কখনো আভিরাকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখবে, কখনো দেখে জেগে। রাত জেগে থাকলে মেয়েটা তার জন্য না খেয়েই বসে থাকে, সে নাওয়াজ যতই রাত করে বাড়ি ফিরুক না কেন। তবে ঘুমিয়ে গেলে সে ভিন্ন কথা। নাওয়াজ আসতেই উঠে খাবার দিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে।
– খেয়েছেন?
– অল্প।
– অল্প কেন?
– খাবারের গন্ধেই বমি চলে আসে।
– বমির উদ্রেক কমেছে?
– না।
– মেডিসিনগুলো সময়মতো খাচ্ছেন আপনি?
– দুপুরে খাওয়া হয়নি।
– এভাবে গাফিলতি করলে চলবে না। আপনি কিন্তু এখন একা নন আঞ্জুম। আমার সত্তা বেড়ে উঠছে আপনার মাঝে। এরপর থেকে যেন না শুনি কোনো বেলার মেডিসিন বাদ পড়েছে।
– ঔষধ খেতে ভালো লাগে না।
– খেতে হবে। এইখানে বসুন। দু লোকমা মুখে দিন।
– খাব না।
– অল্প একটু মুখে দিন।
দু লোকমা মুখে নিয়ে আভিরা আর খেতে পারল না। তার গা গুলিয়ে আসে। মুখের ভাতটুকু কোনোরকম চিবাতে চিবাতে জিজ্ঞেস করল,
– আপনি কী রোজ এমন রাত করে ফিরবেন?
নাওয়াজের চলতি হাত থামে। এক পলক আভিরার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
– ইদানিং কাজের চাপ একটু বেশি।
– কতদিন চলবে?
– দুই একদিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।
– এরপর থেকে আমাকে সময় দিতে পারবেন?
আভিরা কিছুটা আনমনে বলে উঠল। নাওয়াজের হাত পুনরায় থামে। এবার আর মুখে খাবারই তুলতে পারল না। নিঃশব্দে, নীরবতায় কাটতে লাগে প্রহর। দুজনের কেউই কোনো বাক্য বিনিময় করে না। মাঝ নদীতে আটকা পড়া কূল কিনারাহীনের মতো তারাও নিশ্চুপ!
_
রাতের শেষ প্রহর। ভোরের আলো ফুটবে তখন। আভিরা ভারী শরীরটা টেনে কোনোরকম বিছানা ছাড়ে। উঠতেই চোখে পড়ল খাটের কিনারায় রাখা ল্যাপটপে। শাট ডাউন করা হয়নি। শেষ রাতে শুয়েছে নাওয়াজ। আভিরা একটু আধটু টের পেলেও ফের ঘুমে তলিয়ে গিয়েছে। ল্যাপটপ অন রেখেই যে ঘুমিয়ে গিয়েছে তা নিয়ে নাওয়াজ হয়তো বেমালুম।
আভিরা ল্যাপটপ অফ করতে গেলে একটা মেইল চোখে পড়ে। হসপিটালের অথরিটি থেকে মেইলটা পাঠিয়েছে।
রেজিগনেশন লেটার সাবমিট করেছিল নাওয়াজ। তাকে পুনরায় জয়েনিং দেওয়ার জন্য মেইল পাঠিয়েছে মূলত। নাওয়াজের হয়তো মেইল চেক করার পর ল্যাপটপ অফ করতেই খেয়াল ছিল না।
আভিরা অবোধের মতো মেইলের দিকে তাকিয়ে একবার ঘুমন্ত নাওয়াজের মুখপানে চাইল। অপেক্ষায় রইল নাওয়াজের ঘুম ভাঙার। দ্বিধাদ্বন্দ্ব মনে ভেবে চলেছে জিজ্ঞেস করবে কি করবে না। নাওয়াজ তো তাকে এখন অবধি কিছু বলেনি। নিশ্চয় জানাতে চাইছে না তাকে। নয়তো হসপিটাল থেকে চাকরিচ্যুতের ব্যাপারে তাকে অন্তত বলত।
আভিরা ঘামতে লাগে! কত ধরনের অসংলগ্ন চিন্তা ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে তার মাথায়। নাওয়াজের হঠাৎ চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কারণ বুঝে উঠতে পারছে না। তার থেকে বড়ো কথা এতদিন তাকে এ বিষয়ে জানায়নি অবধি। তাকে না বলার কারণ কী হতে পারে? আভিরা ভেবে পাচ্ছে না কিছুই। নিরুপায়ের মতো নাওয়াজের না বলা পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হবে।
নাওয়াজের ঘুম ভাঙে সাতটা নাগাদ। শীতের সকাল, কুয়াশায় আচ্ছন্ন প্রকৃতি। ঠান্ডা আমেজ চারদিকে। নাওয়াজ ব্ল্যাঙ্কেট সরিয়ে উঠে দাঁড়ায়। তার অর্ধ নগ্ন পেটানো দৈহিক গঠন যেকোনো রমণীকে আকর্ষিত করে প্রবলভাবে। মোহাচ্ছন্ন হয়ে কামুকতার দৃষ্টি ফেলে এমন নারীর অভাব নেই। তবে সে সেসব নারীর দৃষ্টি চেয়েও দেখে না। তার ঘরের একজোড়া চোখের অধিকারিণীর নিষ্পলক দৃষ্টিতেই সে আকৃষ্ট!
আরশিতে প্রতীয়মান রমণী সদ্য স্নান সেরে ভেজা কেশে তোয়ালে প্যাঁচাতে ব্যস্ত। নাওয়াজ রমণীর লতানো কায়া, শাড়ির বাঁকে দৃশ্যমান সুডৌল কোমর থেকে নজর সরিয়ে মুখাবয়বে দৃষ্টি ফেলে। গৌর আননে কেমন কালসিটে ছাপ। কয়েক দিনেই উজ্জ্বলতা হারিয়ে চোখ মুখের বেহাল দশা। ভারী দেহ, শুকনো মুখশ্রী, বিষণ্ণ চাহনি, মনমরা, দিশেহারা চিত্তও যেন রমণীর সৌন্দর্যে কমতি আনতে ব্যর্থ। নাওয়াজ হাঁটু গেড়ে বসে রমণীর সম্মুখে। আভিরা চোখ তুলে চায়। নাওয়াজকে দেখেই মলিন হাসে। তার নির্ঘুম রাতের ফলস্বরূপ চোখের নিচের কালো দাগ দৃষ্টিগোচর। গোলগাল মুখটা শুকিয়ে কেমন চুপসে গিয়েছে। যার উচ্ছল হাসিতে মুক্তা ঝরে, আজ তার হাসিতে প্রাণ নেই। নিষ্প্রাণ, নির্নিমেষ দৃষ্টি তার। তবুও চোখ দুটোতে আকৃষ্টতা। তৃষ্ণার্ত করে তুলে নাওয়াজকে প্রতিনিয়ত। নাওয়াজ তার কাঁপা হাতে ছুঁয়ে দেখে রমণীর ফুলো পেট। এই উদরেই নাকি বেড়ে উঠছে তার অনাগত সন্তান, তার সত্তা।
– আপনার কী কিছু হয়েছে আঞ্জুম?
আনমনে ভাবনায় ডুবে থাকা আভিরা কেমন ভড়কে চায়। তার ফ্যালফ্যালে দৃষ্টি বোঝার চেষ্টারত নাওয়াজ। মেয়েটার চেহারা আজকাল কেমন ফ্যাকাশে, বিবর্ণতায় ছেয়ে থাকে।
আচানক আভিরা পেটে হাত রেখে ফুঁপিয়ে ওঠে। ব্যথায় চোখ মুখ নীল হয়ে এসেছে। নাওয়াজ ব্যতিব্যস্ত হয়ে আভিরাকে আগলে নেয়। এক হাতে মেয়েটার বাহু আঁকড়ে অন্য হাত রাখে পিষ্টদেশে। কাঁধের ধারে সূক্ষ্ম ব্যথা অনুভব হতেই চোখ মুখ খিঁচিয়ে নেয় নাওয়াজ। প্রতিবার ব্যথা সহনশীলতার সীমা অতিক্রম করতেই আভিরা এমন করবে। আভিরা না সরে যাওয়া অবধি নাওয়াজও দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে। কখনো আভিরাকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার প্রয়াস অবধি করে না। আভিরা এত ব্যথা, যন্ত্রণা সহ্য করতে পারলে সে এই সামান্য কামড়ের ব্যথাও সইতে পারবে। আভিরা সরে যেতেই নাওয়াজ তপ্ত শ্বাস ফেলে। ক্ষীণ স্বরে জড়ানো কণ্ঠে বলল,
– তারা কী খুব বেশি জ্বালাতন করছে? আর মাত্র কয়েকটা দিন, সব যন্ত্রণার নিঃশেষ হবে।
– হু।
– খাবেন চলুন। আমাকে বের হতে হবে।
কয়েক দিন যাবৎ নাওয়াজ স্থির হচ্ছে না। সকাল হতেই বেরিয়ে যেতে হবে কেন আভিরা বুঝে না। হসপিটালের চাকরিও তো নেই। তবে এত তাড়াহুড়া কীসের?
– এখন?
– হ্যাঁ। ক্লিনিকের কাজটা শেষ হতে চলেছে। এরপর থেকে এত প্যারা নেই। আপনাকে সময় দেওয়া যাবে তখন।
ক্লিনিকের কথা শুনতেই নাওয়াজের এত রাত করে বাড়ি ফেরার কারণ ধরতে পারল আভিরা। নিজের অযাচিত সব ভাবান্তরে লজ্জিতও হলো বটে।
এলাকার আদি আমলের সরকারি ক্লিনিক প্রায় বন্ধের দ্বারপ্রান্তে। প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত চিকিৎসকের অভাবে বন্ধ হতে চলেছে। দুই জন কেয়ার টেকার ছাড়া আদি অন্ত কেউ নেই। নাওয়াজ জানতে পেরেই মাহাদের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে ক্লিনিকটা নিজ আওতাধীন নেওয়ার প্রস্তাব রাখে। সবটা ঠিক হতে আভিরাকেও জানায় সে বিষয়ে। আভিরারই খেয়াল নেই। বেখেয়ালি কত কী ভেবে বসল। এমনকি নাওয়াজের চরিত্র নিয়েও নেতিবাচক ভাবনা ভাবতে দ্বিধা বোধ করেনি। আড়ষ্ট ভঙ্গিতে নতজানু আভিরাকে হীনমন্যতা আঁকড়ে ধরে একপ্রকার!
_
আভিরার উদর স্বাভাবিকের তুলনায় অত্যধিক বাড়ন্ত। দুটো অস্তিত্ব লালিত হচ্ছে তার ভিতর। একটু কিছু হতেই আতঙ্কিত হতে দেখা যায় নাওয়াজকে। সকাল হতেই পেটে পেইন হচ্ছে আভিরার। নাওয়াজ ব্যতিব্যস্ত হয়ে চেকআপের জন্য নিয়ে আসে। করিডোরে বসে নাওয়াজের অপেক্ষায় ছিল আভিরা। নাওয়াজ ভিতরে চিকিৎসকের সাথে কথা বলছে। তন্মধ্যে চোখের সামনে ইতিকাকে দেখে ভারি অবাক হলো আভিরা। এখানে ইতিকার থাকার কথা নয়, তাও আবার নার্সিং ড্রেস পরিধান করে। তবে কি ইতিকা এই হসপিটালে চাকরি নিয়েছে? একই সাথে ডাক্তার আর তার সহযোগীর এভাবে হসপিটাল ছাড়ার কারণ কী হতে পারে? আভিরা আর কোনোকিছু না ভেবে ইতিকাকে পিছু ডাকে।
শেরিনকে নাওয়াজের কেবিন থেকে বের হতে সে রাতে অনেকেই দেখেছিল। নার্সসহ কয়েকজন পেশেন্টও বাঁকা চোখে তাকিয়ে ছিল।
ইতিকা সে রাতে কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে সব শুনেছিল। এমনকি ভিতরে ঘটে যাওয়া সব ঘটনায় স্বচক্ষে দেখা হয়েছে তার। কী ভেবে মোবাইলে অস্পষ্টভাবে ধারণ করে নিয়েছিল তা। কিন্তু মেয়েটা চাকরি যাবে এই ভয়ে কাউকে কিছু বলেনি তখন। তবে নাওয়াজকে যখন পুরো হসপিটালের সামনে অপমান, অপদস্থ করা হলো মেয়েটা চুপ করে থাকতে পারেনি, বিবেকে বাঁধে তার। সে তো জানে এ পুরুষের চরিত্র কেমন। সবটা মাহাদকে জানায়। মাহাদ ভিডিওটা নাওয়াজকে দেখালেও ছেলেটা কোনোরূপ প্রতিক্রিয়া করেনি। মাহাদ সে নিয়ে কথা বলেনি আর। কিছু বলে লাভ নেই। যেখানে নাওয়াজ নির্বিকার, নিশ্চুপ সেখানে তার খবরদারি মানায় না।
নাওয়াজ মস্তিষ্ক শূন্য হয়ে পড়েছিল। বারবার কর্ণগোচর হচ্ছিল শেরিনের বলা মলেস্টের কথা। সকলের মতো তার আঞ্জুমও তাকে অবিশ্বাস করবে। লাবণ্যর ঘটনার সময় স্বচক্ষে দেখেছিল, কিন্তু এইবার তো কিছু দেখেনি। তাকে বিশ্বাস কেন করবে? নিশ্চল, অকার্যকর মস্তিষ্কে কেবল ঘটে যাওয়া ঘটনা আভিরা থেকে আড়াল করার ব্যাপারে সায় দেয়। উপায়ান্তর না পেয়ে নাওয়াজ তাই করে।
স্তব্ধ, ক্রুদ্ধ আভিরা সব শুনে থরথর করে কাঁপতে লাগে। অবিশ্বাস্য চাহনি ফেলে দেখতে লাগল ডাক্তারের কেবিন থেকে বের হতে থাকা নাওয়াজকে। কার্নিশ বেয়ে জল গড়াতে সম্বিৎ ফিরে। আলগোছে চট জলদি নাওয়াজের অগোচরে মুছে নেয় চোখের জল। নিজেকে সামলে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে। তবে সে যেন ব্যর্থকাম।অন্তঃকরণের দহন যেন অক্ষিপটে স্পষ্ট। চোখ দুটো জলে টলমল করলেও ভিতর কেবল ক্রোধিত! অনুশোচনায়, অনুতপ্ততায় দগ্ধ হৃদয়!
নাওয়াজ ঝড়ের গতিতে এসে অকস্মাৎ আভিরাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়। তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে ক্ষীণ স্বরে বলে,
– এক নারীতে আসক্ত হওয়া পুরুষের জন্য পরনারীর দেওয়া মিথ্যে অপবাদ কতটা রক্তক্ষরণ ঘটায় আপনি জানেন না আঞ্জুম!
_
নাওয়াজের বিয়ের কয়েক বছর বাদেই পারিবারিক চাপে পড়ে একপ্রকার বাধ্য হয়েই বিয়ের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত সম্পর্কে জড়াতে হয় শেরিনকে। প্রথম পর্যায়ে সাংসারিক জীবন ভালো চললেও সময় যেতেই অনুভব করে সে নাওয়াজের প্রতি তার অনুভূতি এখনও প্রথম দিনের মতোই রয়েছে। চেষ্টা করেও নাওয়াজকে ভুলতে সক্ষম হয়নি। তার অবহেলা, দায়সারা ভাবে অবনতি ঘটতে থাকে সদ্য গড়ে উঠা সম্পর্কে। নিত্যদিনের কলহ, ঝঞ্ঝাট থেকে পরিত্রাণের জন্যে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয় দুজন। নিজের সংসার ভেঙে নাওয়াজের সুখকর সংসার দেখা কোনোভাবে সহ্যকর নয় শেরিনের জন্য। নাওয়াজের সংসার ভাঙতেই সে রাতে নাওয়াজের কেবিন থেকে বেরিয়ে নিজেকে বিধ্বস্তভাবে মেলে ধরে সকলের সম্মুখে।
কাঁধের ধারে ব্লাউজের ছেঁড়া, উন্মুক্ত অংশে সদ্য নখের আঁচড় স্পষ্ট। দু হাতে আড়াআড়িভাবে বক্ষ বিভাজন লোকচক্ষুর আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা। এলোমেলো শাড়ির আঁচল গড়িয়ে ফ্লোর ছুঁয়ে। কার্নিশে জমে থাকা জলের ধারা গাল বেয়ে বইতে লাগে নিরন্তর। অক্ষিপটে খেলে চলেছে ভীতিকর ভাব! দুর্বল, নিথর দেহখানা টেনে কোনোরকম দাঁড়িয়ে আছে সর্ব সম্মুখে!
অপ্রস্তুত, অবিচল সকলে এমতাবস্থায় ভড়কে গেল। চক্ষু সম্মুখে ম্রিয়মাণ নারীর এমন বিধ্বস্ত অবস্থা মোটেও কাম্য নয়। কোনো মেয়ে নিজের সম্মানহানির অভিনয় করবে না নিশ্চয়ই। সে রাতে শেরিনের কথায় বিশ্বাস করেছিল সকলে। বাকরুদ্ধ নাওয়াজ চোখ মুখ খিঁচে ঠাঁয় শুনে গিয়েছিল তার বিরুদ্ধে আরোপিত সকল অপবাদ!
_
ঈর্ষা, প্রতিশোধস্পৃহা মনোভাব মানুষের মনস্তত্ত্ব বিকৃত করে তোলে। ঈর্ষান্বিত হয়ে শেরিন নিজের সতীত্ব, সম্ভ্রম হারানোর মতো নিকৃষ্ট পন্থা অবলম্বন করে।
অবাক মিশ্রিত চাহনি ফেলে সকলে একজোড়া রক্তিম চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। নাওয়াজকেও খানিকটা অবাক হতে দেখা গেল। এ চোখের দৃষ্টি একেবারে অচেনা। নমনীয় চোখ দুটোতে কেবল ঘৃণ্য চাহনি! চোখ মুখে অদ্ভুত দৃঢ়তা।
শেরিন যেন কোনোক্রমে স্বীকার করবে না। সে রাতে যা ঘটেছিল সবটাই সত্য। আভিরা একদৃষ্টে চেয়ে থেকে হঠাৎ সার্জিক্যাল নাইফ হাতের তালুতে গেঁথে দেয়। আচমকা ঘটে যাওয়া কাণ্ডে সকলে হতভম্ব!
– মিসেস ইয়াজিদ আপনি কিন্তু এবার সীমা লঙ্ঘন করছেন। জোর করে প্রমাণ করাতে চাইছেন আপনার স্বামী নির্দোষ। সে রাতে আমরা সকলেই ছিলাম। আপনি এভাবে আমার হসপিটালের একজন ডাক্তারকে আঘাত করতে পারেন না।
আভিরা সকলের কড়া দৃষ্টি উপেক্ষা করে শেরিনের বরাবর গিয়ে দাঁড়াল। শীতল দৃষ্টি ফেলে দেখতে লাগে আপাদমস্তক। শেরিনের গা হিম হয়ে আসে। রক্তাক্ত হাতের দিকে চেয়ে পুনর্বার আভিরার দিকে চাইতে চোখ মুখ খিঁচে নেয়। তার আঘাতপ্রাপ্ত হাত আভিরা শক্ত হাতে চেপে ধরেছে। ব্যথায় কাতর শেরিন আর্তনাদ করে উঠল।
– সে রাতে যা ঘটেছিল সবটাই ইচ্ছাকৃত ছিল? আমার স্বামী নাওয়াজ ইয়াজিদকে ইচ্ছে করে ফাঁসিয়েছেন আপনি।
– আআমি কেন ফাঁসাতে যাব? তোমার স্বামী আমার সতীত্ব হরণ করার চেষ্টা করেছিল। তুমি জানো না তোমার স্বামী কতটা দুশ্চরিত্র…
– ইউ ব্লাডি বিচ, আর একটা কথা বললে জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব। আমার হাজব্যান্ডের চরিত্র কেমন তা তোর মতো স্লাটের কাছ থেকে জানতে হবে?
স্রোতহীন জলধারার ন্যায় আভিরার কণ্ঠস্বরও যেন শান্ত, শব্দহীন! তবুও শেরিন কেঁপে ওঠে। তার ভীতিকর দৃষ্টি সকলের দৃষ্টিগোচর। আভিরা কালবিলম্ব না করে পুনর্বার আঘাতপ্রাপ্ত হাতে আঘাত হানে। অক্ষিকোটর থেকে চোখ বেরিয়ে আসার উপক্রম। শেরিন কাতরাতে কাতরাতে মেঝেতে বসে পড়ে। হাত থেকে গলগলিয়ে পড়ে চলেছে রক্তের স্রোত। রক্তের ধারায় ভেসে যাচ্ছে সাদা টাইলস।
আভিরা ভারী পেটে হাত রেখে কিছুটা ঝুঁকে পড়ে সম্মুখে। শেরিনের আঘাতে জর্জরিত মুখপানে দৃষ্টি ফেলে অদ্ভুত ভাবে হাসতে লাগে। চাপা স্বরে হিসহিসিয়ে বলতে লাগল,
– আমার সামনে, আমার পুরুষকে কেউ দুশ্চরিত্র বললে তার জবান বন্ধ করতে দু বার ভাবব না।
আভিরা সোজা হয়ে দাঁড়ায়। এভাবে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না সে। জোরালো শ্বাস ফেলে চেয়ার টেনে বসল। ওড়নায় ঘাম মুছে কয়েক ঢোক পানি গিলে গলা ভেজায়। তেষ্টায় গলা শুকিয়ে এসেছে তার।
সকালে নিঃশব্দে আভিরার কাণ্ড দেখে যাচ্ছে। কেউ আর প্রতিবাদ করার সাহস দেখাচ্ছে না। শান্তশিষ্ট স্বভাবের আড়ালে এমন ভয়ঙ্কর রূপ লুকায়িত তা সকলের ধারণাতীত যেন!
– মিস শেরিন আমাকে যেতে হবে। বাবুদের খিদে পেয়েছে। আপনি যদি সবটা স্বীকার করে নেন তাহলে আমার জন্য সুবিধা হবে। একটু কোঅপারেট করুন। আপনার ট্রিটমেন্ট ফ্রিতে করিয়ে দিব আই প্রমিজ। নয়তো পরেরবার ছুরি হাতে নয়, গলায় চালাব।
শেরিন এবার ভড়কে গেল। আভিরার আচরণ মোটেও স্বাভাবিক নয়। এমন শান্ত স্বরে কেউ গলায় ছুরি চালানোর কথা বলে। চোখ মুখ খিঁচে কান্না গিলে কোনোরকম স্বীকারোক্তি দেয়,
– সে রাতে আমার সাথে কিছু হয়নি। আমি ইচ্ছে করে করেছি সব।
_
লাবণ্যকে অপলক তাকিয়ে থাকতে দেখে আভিরা মৃদু হাসে। লাবণ্যর না বলা কথা যেন তার চোখ বলে দিচ্ছে। শেরিন আর সে, দুজনই একই কাজ করেছে। তবে তার বেলায় ভিন্ন রূপ কেন?
– ঘাতক আপনজন হলে তাকে আঘাত করা দুষ্কর।

