#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৭৭
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
বুশরার দুনিয়া দুলছে। দুই বছর আগে বর্ষার বিয়েতেই তার বিয়ের কথা ওঠে। ছেলে বুশরাকে দেখে পরিবারকে জানাতেই ছেলের পরিবার বর্ষার বাবা মাকে দিয়ে প্রস্তাব রাখে। ছেলে সম্পর্কে বর্ষার চাচাতো দেবর। ছেলে দেখতে শুনতে ভালো, ফ্যামেলিতেও মানুষ কম। ঝামেলা হওয়ার সুযোগ নেই। সবদিক বিবেচনা করে তৎক্ষণাৎ প্রস্তাব নাকচ করার কোনো সুযোগ মিলেনি। ছেলে মাস্টার্স পড়ছে তখন। কথা হলো কয়েক বছর পর বিয়ে হবে। তাছাড়া বুশরার পরিবারও তখন কিছুতেই বিয়ে দিত না। পড়ালেখা শেষ না করে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে তাদের কারোরই নেই। তবে বছর কয়েক পরে বিয়ে হওয়ার কথা শুনে আর আপত্তি করেনি। কিন্তু এখন তারা চাচ্ছে ছেলে বাহিরে যাওয়ার আগে ঘরে বউ তুলতে। অন্তত আকদ যেন করিয়ে রাখা হয়। পরিবারের সকলে সেই নিয়ে কথা বলছে। বুশরার কানে সব যেতে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এত আগে নেওয়া হয়েছে, অথচ সে তা জানেই না।
অজান্তেই কখন কার্নিশ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল বুঝে উঠতে পারল না বুশরা। নিজেকে আজ তার বড্ড অসহায় লাগছে। মনে হচ্ছে সব থেকেও তার কেউ নেই। বুশরা কী করবে, কার কাছে যাবে ভেবে পেল না। হঠাৎ করে শরীর কাঁপতে লাগল, চোখের সামনে ভেসে উঠল আবছা অস্পষ্ট এক পুরুষালি অবয়ব। যার চোখে মুখে স্পষ্ট অসীম ক্রোধ। চোখ যেন জ্বলন্ত অগ্নি কুণ্ডলি। ঐ পুরুষের এত রাগ, ক্ষোভের কারণ যেন সে ই। বুশরা দুই হাতে চাদর চেপে ফুঁপিয়ে ওঠে। তার কান্নার আওয়াজ যেন ধীরে ধীরে আহাজারিতে বদলায়। কে শুনল না শুনল তার তোয়াক্কা করল না মোটেও। গলার ধারে কেমন রুদ্ধ অবস্থা। ক্ষীণ শ্বাস ফেলতেও বেগ পোহাতে হচ্ছে। তবুও চোখের পানি বাঁধ মানছে না। যেন এখন কাঁদতে পারলেই স্বস্তি মিলবে।
ভিড়ানো দরজার ধারে আসতে কান্নার শব্দ কানে এলো বর্ণের। দরজা ঠেলে রুমে ঢুকতেই দেখল বুশরা শুয়ে আছে। উল্টো ফিরে থাকলেও বুঝতে বাকি নেই বুশরা যে কাঁদছে। তবে এমন করে কান্না করার কারণ ঠিক বুঝল না বর্ণ। কিয়ৎক্ষণ নিশ্চুপে দাঁড়িয়ে থেকে একদৃষ্টে বোনের কান্না দেখে গেল।
পিঠে কারো হাতের ছোঁয়া পেয়ে পিছন ফিরে চাইল বুশরা। বর্ণের চোখে পড়ল বুশরার বিধ্বস্তভাব। চোখ দুটো ফুলে রয়েছে। চোখের পানিতে পাপড়ি ভিজে একটার সাথে আরেকটা লেগে রয়েছে। দু হাতে চোখ মুছার বৃথা চেষ্টা করল বুশরা। অথচ তখনও তার গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। বর্ণ নির্বিশেষ দেখে গেল বোনের আড়াল করার শত প্রয়াস।
হুটহাট অকারণে রেগে যাওয়া অধৈর্য বর্ণ আজ কেমন ধৈর্য ধরে বোনকে দেখে চলেছে। বর্ণ কতক্ষণ বোনের দিকে চেয়ে রইল। বুশরা দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। ভাইয়ের চোখে চোখ রাখার সাহস তার নেই। তবে বর্ণ তাকিয়েই রইল। সে দৃষ্টি পরিবর্তন করে না।
বুশরার কোনো হেলদোল নেই। সে অন্যদিকেই তাকিয়ে আছে। বর্ণ যে তাকে কিছু জিজ্ঞেস করছে সে খেয়াল তার নেই। খেয়াল থাকলেও ভাবাবেগ হলো না তেমন। যেন শুনেও শুনছে না। বুশরার এমন হেঁয়ালিতে রাগ হলো বর্ণের। দাঁত কিড়মিড় করে চোখ রাঙিয়ে তাকাল বুশরার দিকে। পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নেয়। এখন রেগে গেলে চলবে না। খানিকটা ধাতস্থ করে কিছুটা গম্ভীর স্বরে বলল,
– কী হয়েছে তোর? এভাবে কাঁদছিস কেন? কেউ কিছু বলেছে?
বর্ণের প্রশ্নে বুশরা বর্ণের দিকে ফিরে তাকাল। তার চোখে জল টলমল করছে। হুট করে পেট জড়িয়ে ধরল বর্ণের। সে যেন এইটুকু সাহারার জন্য ব্যাকুল হয়েছিল। ভাইকে পেয়ে তার কান্নার বাঁধ ভাঙে। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে গেল বুশরার। দিশেহারা বর্ণ বোনের পিঠে হাত বুলাতে লাগল।
– কান্না থামিয়ে আমাকে বল কী হয়েছে? নয়তো মার লাগাব বুশু। অনেকক্ষণ ধরে জিজ্ঞেস করে চলেছি।
– আব্বু আম্মু কী বলছে এসব? আমার বিয়ে, আমি বিয়ে করব না ভাইয়া।
বলেই বুশরা কাঁদতে লাগল। বিয়ের কথা শুনেই বর্ণের মেজাজ বিগড়ে গেল। দুদিন বাড়িতে ছিল না সে। সন্ধ্যায় আসতেই শুনতে পেল বুশরার বিয়ের কথা। সব শুনে মেজাজ খারাপ হলেও বলেছিল বিয়ের ব্যাপারটা যেন বুশরা অবধি না যায়। সে আগে আলাদাভাবে বোনের সাথে কথা বলবে। যদি মনে হয় বুশরার আপত্তি নেই তবেই কথা আগাবে। নয়তো এখানেই শেষ, যতই তারা কথা দিয়ে রাখুক না কেন।
– বিয়েতে কী সমস্যা? বিয়ে করব না বললে তো হবে না।আজ হোক বা কাল বিয়ে করতেই হবে। তোর কি কোন সম্পর্ক আছে? থাকলে আমায় বল। আমি বাবা মায়ের সাথে কথা বলে নেব।
– নেই।
– তাহলে? বিয়ে করতে চাইছিস না কেন?
– আমি পড়তে চাই।
– বাবা মাকে কী মনে হয় তোর? হেলায় ফেলায় যার তার হাতে তুলে দিচ্ছে তোকে? ছেলের ব্যাকগ্রাউন্ড আমি চেক করেছি। হায়ার এডুকেডেট, ভালো ফ্যামেলি থেকে বিলং করে। তাদের কেউ নিশ্চয় তোর পড়ালেখায় বাধা দেবে না। তাছাড়া সব জেনেশুনেই আমি আব্বু আম্মুকে কথা বলতে বলেছি।
বর্ণের কথায় বুশরা আঁতকে ওঠে। কথা বলতে বলেছে মানে? তার শেষ ভরসাই তো ছিল বর্ণ। এখন সেও বাকি সবার মতোই তাকে বিয়ের জন্য রাজি হতে বলছে। বুশরা নির্নিমেষ দৃষ্টি ফেলে আহত কণ্ঠে বলল,
– ভাইয়া!
– দেখ বুশু বাবা মা কিংবা আমি, আমরা কেউই তোর খারাপ চাই না। বাবা মার কথা না হয় বাদ দে। আমার উপর ভরসা নেই তোর?
বুশরা কোনোরকম মাথা হেলায়। অযথায় সারাক্ষণ বকাঝকা করলেও তার উপর সামান্য আঁচ লাগলেও দুনিয়া ওলট পালট করে দিতে দু বার ভাববে না বর্ণ। বুশরা তা ভালো করেই জানে। ভাই সবসময় তাকে আগলে রেখেছে। অন্যদের কাছে যা বলতে পারত না বর্ণের কাছে নির্দ্বিধায় বলে ফেলত তা। আজও যেন বলতে কোনো দ্বিধা নেই।
– তাহলে আর আপত্তি করিস না।
বুশরা অবুঝের ন্যায় ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। তারপর আচমকা দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে বলে উঠল,
– আআমি একজনকে পছন্দ করি, আব্ পছন্দ না ভালোবাসি তাকে।
বর্ণ মৃদু হাসে। সে যা সন্দেহ করেছিল তাই। পড়ালেখার জন্য বুশরা বিয়ে করতে চাইছে না, তা যে বাহানা কেবল বুঝতে অসুবিধা হয়নি বর্ণের। সেজন্য বিয়ের কথা বলেছে যেন বুশরা নিজ থেকে সব বলে তাকে।
– কে সে?
– তুমি তাকে চিনো।
– আমি তো অনেককেই চিনি। এখন তুই কি আমার চেনা পরিচিত সব ছেলেকেই ভালোবাসিস?
– ছিঃ! সব ছেলেকে ভালোবাসতে যাব কেন? আমি শুধু তাকেই ভালোবাসি।
– কাকে?
জিদানের নাম শুনে বর্ণ থমকাল। কয়েক পল বোনের ক্রন্দনরত চেহারার দিকে তাকিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
– দেখ বুশু এমন অন্যায় আবদার করিস না। অন্য কোনো ছেলে হলে ভেবে দেখা যেত। কিন্তু জিদান? অসম্ভব। বাবা
মায়ের পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করে নে।
– অসম্ভব কেন?
বর্ণ বলতে পারল না যে, জিদানের মনে অন্য কেউ আছে।আভিরার বিয়েতে জিদানের সেই চাহনি দেখে যা বুঝার বুঝে গিয়েছিল। সে জেনেশুনে এমন ছেলের হাতে কি করে বোনকে তুলে দিবে। শুধু কিছুটা কঠিন স্বরে বলল,
– সে তোর না জানলেও চলবে। শুধু আমি যা বললাম তা মাথায় রাখ।
– পারব না আমি। তুমি বললেই আমার শুনতে হবে? আমি শুনব না তোমার কথা।
– ঠাঁটিয়ে এক চড় মারব বেয়াদব। দিন দিন সাহস বেড়ে যাচ্ছে তোর? আদর দিয়ে মাথায় তুলেছি তাই না? আম্মু অযথাই বেয়াদব বলে না তোকে। তুই আসলেই একটা বেয়াদব। তোর বেয়াদবি কী করে বের করতে হয় তা জানা আছে আমার। আমার কথার বাইরে একটা কথাও বলবি না। যা বলেছি তার হেরফের হবে না কোনো।
_
বর্ণ হতভম্ব হয়ে বোনের দিকে তাকায়। চোখ রাঙিয়ে বলল,
– হাত ছাড়। কী করছিস? মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোর? উঠ বলছি।
– উঠব না। আমি কিছু জানতেও চাই না, আমার ওনাকে লাগবে। প্লিজ ভাইয়া। আমি ওনাকে অনেক ভালোবাসি। তুমি এমন করলে আমি কার কাছে যাব। আমায় একটু বুঝার চেষ্টা করো প্লিজ।
কী আকুতি মিনতি করে চলেছে মেয়েটা। যার জন্য এত অসহায়ত্ব তার খবরই নেই। তার জন্য একটা মেয়ে ভাইয়ের পায়ে অবধি লুটিয়ে পড়তে ভাবছে না। অথচ সে বেখবর।
– তোর লজ্জা করছে না বড়ো ভাইয়ের কাছে এভাবে প্রেমিকের কথা বলতে। এত অধঃপতন হলো কীভাবে? প্রেমে পড়লে মানুষ এমন নির্লজ্জ হয়ে যায় না কি?
বুশরা মাথা নুইয়ে ফেলে। কাঁদতে কাঁদতে ফ্লোরে মাথা ঠেকায়। নিরস্ত্র, আহত বাঘিনীর মতো কাতর চোখে চেয়ে থেকে বলল,
– আআমি…
অশ্রু জলে ভেজা মুখখানি দেখে বর্ণের ভিতরটা কেমন ধক করে উঠল। বোনটাকে ছোটো থেকে শাসনে রেখেছে সে। তবুও কেন যেন বুশরার সব আবদার তার কাছেই। এমনকি চকলেট খাওয়ার জন্যও তার কাছে এসে বায়না করবে। সে এনে না দিলে কেঁদেকেটে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেয়। চকলেট না এনে দেওয়া অবধি কথাও বলে না তার সাথে। চকলেটের জন্য বায়না ধরা সেই মেয়েটা কি না আজ তার কাছে আস্ত একটা মানুষ চাইছে? তাও যার মনে কিনা তার জন্য কোনো অনুভূতিই নেই। আসলেই কি নেই? একপাক্ষিক হলে কী বুশরার মতো মেয়ে কারো জন্য এত আহাজারি, আর্তনাদ করে বেড়ায়?
বর্ণ মাথার চুল পিছনে ঠেলে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে। ফের এক নজর বুশরার কান্না ভেজা মুখটা দেখে হাত টেনে দাঁড় করায়। নত মস্তকে দাঁড়িয়ে থাকা বুশরার উদ্দেশ্যে বলল,
– দেখ আমি শুধু তার অবধি খবর পৌঁছে দিব। এর বেশি কিছু করতে পারব না।
_
সামনাসামনি দুটো চেয়ারে বসে আছে বর্ণ আর জিদান। জিদানের নজর ফোনে থাকলেও বর্ণ বেশ কিছুক্ষণ ধরে জিদানকেই দেখে চলেছে। মোবাইলে নজর রেখেই জিদান বলে উঠল,
– কিছু অর্ডার দাও। অনেকক্ষণ হলো বসে আছি।
হঠাৎ জিদানের বলা কথায় বর্ণের সম্বিৎ ফিরে। রেস্টুরেন্টে এসে বসার পর থেকে তাদের মধ্যে কোনো কথা নেই। দুজনেই ভিন্ন কোনো এক কারণে নিশ্চুপ। বর্ণ এক পলক জিদানকে দেখে বলল,
– তোমার সাথে কিছু কথা ছিল।
জিদান শান্ত চোখে তাকাল। তার চোখ যেন বলে দিচ্ছে বর্ণ যে কিছু বলার জন্যই তার সাথে দেখা করার কথা বলেছে তা সে বর্ণের মেসেজ পেয়েই বুঝেছে।
– বলো।
বলেই জিদান খানিকটা হেলান দিয়ে বসে। তার চোখ বর্ণের উপর স্থির। বর্ণেরও তেমন।
– বুশরার ব্যাপারে।
– তার ব্যাপারে আমার সাথে কী কথা থাকতে পারে তোমার?
– ওর বিয়ে ঠিক হয়েছে।
– ওহ্। তুমি কি আমাকে বিয়েতে ইনভাইট করার জন্য এভাবে পার্সোনালি ডেকে পাঠিয়েছ?
বর্ণকে এমন কথার ধাঁচে খুব একটা অবাক হতে দেখা গেল না। জিদানের এই ধরনের গা ছাড়া ভাবে সে পূর্ব পরিচিত। বিয়ের কয়েক দিনেই বুঝা হয়ে গিয়েছে তার।
– তেমনই বলতে পারো। তবে আমার কিছু জানার ছিল।
– আমার কাছে তোমার কিছু জানার আছে বলে মনে হয় না। তবুও বলো কী জানতে চাও?
– বুশরার সাথে তোমার কতদিনের সম্পর্ক?
– মানে?
জিদান এমন প্রশ্নের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না।
– দেখো বুশুকে আমার চেনা আছে। সম্পর্ক বিহীন একটা মানুষের জন্য বুশরা এমন পাগলামি কখনোই করবে না। যদি একপাক্ষিক কোনোকিছু হতো তাহলে ও আমায় বলত না।
– এসব বলতে আমায় আসতে বলেছ? দেখো তোমার বোন তোমাকে কী বলেছে আমার জানা নেই। জানার প্রয়োজন মনে করছি না। যাইহোক উঠছি আমি।
– তার মানে সম্পর্ক ছিল তোমাদের?
জিদান কিছুটা থমকালেও পিছনে ফিরল না। বর্ণ উঠে দাঁড়ায়। জিদানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলতে লাগল,
– তোমাদের মধ্যে কী হয়েছে আমার জানা নেই। তবে গুরুত্বর কিছুই হবে হয়তো। আগে আন্দাজ করতে পারলে এমন অনিশ্চিত কোনো সম্পর্কে ওকে জড়াতে দিতাম না আমি। কিন্তু সবটা এখন হাতের বাইরে। বুশু পাগলামি করছে অনেক। সেজন্যই এখানে আসা। তুমি চাইলে আমি বাবা মায়ের সাথে কথা বলব। তবে দেখো তোমার অতীতের প্রভাব যেন এখন না পড়ে। তোমার অতীত নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নেই। তবে বুশু আমার বোন বিধায় এই বিষয়ে আমার কথা বলতে হচ্ছে। আর তুমি না চাইলে যেই কথা চলছে সেইটাই হবে।
_
শব্দ করে অনবরত ঘুরতে থাকা ঘড়ির কাঁটা যেন জানান দিচ্ছে সময় থেমে নেই। ঘুমে তলিয়ে আছে বুশরা। বর্ণ বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকেই নিদ্রিত। তার নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটে কারো ডাক কর্ণগোচর হতেই। বুজে থাকা চোখের পাতা কোনোরকম মেলে চায় বুশরা। তার মাকে ঝুঁকে থাকতে দেখে কেমন ভড়কে গেল।
– এভাবে মেঝেতে পড়েছিলি কেন?
– আব্ ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম।
– আচ্ছা ওঠ।
বুশরা উঠে বিছানায় যেতে নিলেই ওর মা ধমকে উঠল,
– ঐদিকে যাচ্ছিস কেন?
– ঘুমাব না?
– আমার সাথে আয়। এখন ঘুমানোর দরকার নেই।
– মা প্লিজ, প্রচুর ঘুম পাচ্ছে।
বলেই বুশরা হাত পা ছাড়িয়ে বিছানায় চিৎ হয়ে পড়ে। বুশরার মা কড়া চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাত টেনে উঠাল। বুশরার দৃষ্টি বুজে আসে, চোখ মেলা দায়। মায়ের এমন কাজে সে বেজায় বিরক্ত। চোখে মুখে ফুটে উঠেছে সেই বিরক্তিভাব। বুশরার মা হাত ধরে বুশরাকে টেনে বের করল। সোজা নিয়ে গেলেন তাদের শোবার ঘরে। বিছানায় ছড়িয়ে থাকা বেনারসি নজরে আসতেই শরীর টলতে লাগে। ঘোলাটে চোখের মণি কেমন নির্জীব। নিথর দেহখানা এই লুটিয়ে পড়ল বুঝি। তবে বুশরা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল। তার চাহনি স্থির। বার কয়েক আওড়াল তার শঙ্কা যেন বাস্তবে রূপ না নেয়। দোলাচলে ভুগতে থাকা হৃদয় অজানা আশঙ্কায় অস্থির।
– দাঁড়িয়ে না থেকে এখানে এসে বস।
বুশরা কাঠ পুতুলের মতো গিয়ে বসল বিছানার এক পাশে। ব্যস্ত হাতে কেউ মেকআপের আস্তরণ বসাতে লাগল তার কোমল গালে। মুখশ্রী সাজিয়ে তুলে ভারী মেকআপে। অল্প সময়ে গায়ে জড়িয়ে দেয় লাল, খয়েরী বেনারসি। ঘুমে ঢুলতে থাকা বুশরা বুজে আসা চোখে স্বাক্ষর করে রেজিস্ট্রার খাতায়।
_
গাঁদা, গোলাপ, রজনীগন্ধার বাহার রুম জুড়ে। সুবাসিত রুমটাও কেমন অসহ্য ঠেকছে বুশরার নিকট। বুকের বা পাশে যেন রক্তক্ষরণ ঘটছে। হাত পা কাঁপছে অনবরত, ঝিম ধরে গিয়েছে মস্তিষ্কে। কাউকে হারানোর ভয়ে দেহ যেন বেঁচে থাকতে সায় দিচ্ছে না, সাদরে গ্রহণ করতে চাইছে মৃত্যুকে। পিঞ্জিরায় বন্দি থাকা পাখির ন্যায় ছটফট করতে থাকল রুহ!
দীর্ঘ দেহের অধিকারী এক মানব দেহের ছায়া মূর্তি দেয়ালে স্পষ্ট। বাক বিতণ্ডা চলছে বেশ সময় ধরে। এই রাতের বেলা ফুল জোগাড় করে বাসর ঘর সাজিয়েছে তারা, অথচ পারিশ্রমিক দিবে না। হাজার টাকার কয়েকটা নোট পেতেই হুড়মুড় করে বেরিয়ে গেল রুম ছেড়ে। সকলে যেতেই বন্ধ হয় রুমের দরজা। কেউ বুশরার দিকেই এগিয়ে আসছে। বুঝতে পেরেই শ্বাস প্রশ্বাস ক্ষীণ হয়ে আসে। স্পর্শ বিহীন কারো দু হাতের মাঝে আটকা পড়েছে সে। হিসহিসিয়ে চাপা স্বরের পুরুষালি রুক্ষ কণ্ঠ কানে বাজে।
– আমি সেই অপরিচিত, অজানা, অদেখা, রহস্যময় মেয়েটাকে ভালোবেসে ছিলাম। অতি পরিচিত বুশরাকে নয়।

