প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন #পর্বসংখ্যা_৭৬

0
3

#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৭৬
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা

কলরবে মুখরিত পরিবেশ যেন একটা কথায় নিস্তব্ধ, স্তব্ধ। সকলের ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিপাত। আভিরা এমন দৃষ্টিতে অস্বস্তি বোধ করে। মিইয়ে গিয়ে গুটিয়ে বসল নাওয়াজের গা ঘেঁষে। দাদির এমন কথায় সামিহা তেতে উঠল,
– সব জায়গায় তোমার ভুলভাল কথা না বললে হয় না?

– এই ছেমড়ি চুপ থাক। আমার জহুরির চোখ। দেখলেই কইতে পারি। ভুল হইতে যাইব কেন?

– বেশি কথা না বলে তোমার মুখ বন্ধ করো।

– ঠাঁটিয়ে লাগাব এক চড়। আমি বেশি কথা বলি?

– না আমি বলি।

– সামিহা এত কথা না বলে চুপচাপ খাওয়া শেষ করো।‌

বর্ণার কথায় সামিহা চুপ মেরে গেল। এই নিয়ে আর কেউ কিছু বলল না। নাওয়াজও একেবারে নিশ্চুপে শুনে গেল সব। একটা কথাও বলল না। আর না কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল।‌ আভিরাকে খাইয়ে দিয়ে উঠে চলে গেল। সবাই সে নিয়ে না ভাবলেও আভিরাকে ভীতু দেখাল খানিকটা।

_

সন্ধ্যা পেরিয়ে এখন রাতের বারোটা। নিশুতি রাতে যেখানে সকলে ঘুমে আচ্ছন্ন, সেখানে আভিরা অস্থির হয়ে ঘরময় পায়চারী করে চলেছে। তার পায়ের কদমের সাথে থেমে নেই ভিতরের অস্থিরতাও। দরজা খোলার আওয়াজে আভিরা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। তার ছলছল চোখের দৃষ্টি আটকে গেল কারো উদ্বেগ চোখে। ঝড়ের বেগে নাওয়াজ মেয়েটাকে জাপটে ধরল। আভিরার হাঁসফাঁস অবস্থা। ঘাড়ে নাক মুখ ঘষে বলল,
– ও কি সত্যি আপনার পেটে আছে আঞ্জুম?

এলোমেলো ছোঁয়ায় আভিরার বেহাল দশা। আড়ষ্ট ভঙ্গিতে মাথা নুইয়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে রইল নাওয়াজের জোরালো বাহুবন্ধনে।

– বলছেন না কেন? ও সত্যি আপনার উদরে?

আভিরার উদর ছুঁয়ে অধৈর্য হয়ে শুধাল। কথার ধাঁচে কেমন অধৈর্যতা!

– আআমি জানি না।

– জানেন না কেন? কতদিন ধরে চলছে এসব?

– মাহিরা আপুর বিয়ের পর থেকে।

– আপনি এমন একটা সিদ্ধান্ত কার অনুমতি নিয়ে নিয়েছেন? আমি নিষেধ করেছিলাম।

আভিরা কেঁপে উঠল। এই না লোকটা কত অধৈর্য হয়ে জানতে চেয়েছিল। এখন আবার কথার মাঝে এত বদল কেন?

– আমি…

– আপনি জানেন আপনার আর আমার বিয়ে আরও বছর তিনেক পর হওয়ার কথা ছিল। আপনার বাবা কথা দিয়েছিলেন আমাকে। চার বছর পর আপনাকে আমার হাতে তুলে দিবে। সেখানে সময়ের আগেই একপ্রকার বাধ্য হয়ে বিয়ে দিতে হয়েছে। এই বিয়েটা বাধ্যবাধকতা থেকেই দেওয়া হয়েছে। আপনি এ নিয়ে অবগত নন। কারণ আপনাকে কিছু জানানো হয়নি। কিন্তু আমি সব জেনেশুনে আপনাকে নিজের করে নিয়েছি। সে রাতের ঘটনা, আঞ্জুম এমন অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে আপনাকে আমি আমার করতে চাইনি। এই অবধি ঠিক ছিল, কিন্তু আপনি যা করলেন আঞ্জুম। আপনি বড্ড নাজুক ফুল, আমার ছোঁয়ার মতোই তার আসাতে দুমরে মুচড়ে না যান।

– ভয় দেখাচ্ছেন?

– উহু, সতর্ক করছি। মা হওয়ার মতো অভূতপূর্ব অনুভূতি আর কিছুতে নেই। এই দুর্লভ অনুভূতি অনুভব করার মতো সহনশীল নন আপনি। হুট করে বিয়ের মতো একটা সম্পর্কে জড়িয়েছেন, তাই বলে সেও এভাবে আসবে? তাকে আমি এভাবে চাইনি।

আভিরার বুক ধক করে উঠল। ভয়ে অসাড় হয়ে আসে দেহ। চোখের এলোমেলো চাহনিতে একরাশ আতঙ্ক। গর্ভে বাড়ন্ত ভ্রূণ বিচ্ছুরণের আশঙ্কায় দিশেহারা চিত্ত। অসহায় দৃষ্টি ফেলতেও যেন অপরাগ ভীরু রমণী। আতঙ্কে ছেয়ে থাকা আঁখিতে নাওয়াজ নজর মেলায়। মেয়েটার কাতর চোখ যেন আকুতি মিনতি করে চলেছে তার নিকট। নাওয়াজের নিজেকে কেমন নিকৃষ্ট মানুষ মনে হচ্ছে। এই মেয়ে এমন অসহায় দৃষ্টি ফেলে কী বুঝাতে চাইছে? সে তার নিজের অংশকে নিঃশেষ করে ফেলবে।

মেয়েটার ভয়ের কারণ বুঝে উঠতেই চোয়াল শক্ত হয়ে এলো নাওয়াজের। আভিরার গাল শক্ত হাতে চেপে মেয়েটার মুখের সামনে মুখ নিয়ে বলল,
– আমাকে কি অমানুষ মনে হয় আপনার? নিজের সন্তানকে মেরে ফেলার মতো জঘন্য কাজ করব?

ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে আভিরা। তবে নাওয়াজের মাঝে ব্যথা প্রশমনের প্রয়াস নেই। আভিরা এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল নাওয়াজের দৃঢ় কঠিন রাগান্বিত মুখে। নাওয়াজের দৃষ্টিও মেয়েটার মুখপানেই ছিল। মিলিত হতেই নিগূঢ় চোখ জোড়ার দৃষ্টি আটকে যায়। গোলগাল গোলাপি আভায় আরক্ত মুখশ্রীর রমণীর প্রতি কঠোর চাহনি বদলে মুগ্ধতা ভিড় করে। নাওয়াজ নিজের প্রতি বিরক্ত হলো। চেষ্টা করল পূর্বের ন্যায় কঠোর দৃষ্টি ফেলতে আভিরার চেহারায়। মেয়েটা এত বড়ো একটা কাণ্ড ঘটিয়ে এখন কেমন নির্ভয়ে, নির্বিঘ্নে তার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। তার দৃষ্টিতে এই মেয়ে ভয় পাচ্ছে না না কি?

নাওয়াজ তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে দেখল আভিরার চোখ মুখে ভয়ের কোনো ছাপ নেই। অদ্ভুতভাবে মেয়েটার ভীতিহীন চোখের দৃষ্টি নাওয়াজকে আকর্ষণ করে। কয়েক পল চেয়ে থেকে নাওয়াজ মেয়েটার ঠোঁট কামড়ে ধরে। আভিরাকে আর্তনাদ করার সুযোগ দিল না। ধপ করে পড়ল গুছানো বিছানায়। মুহূর্তে মিলেমিশে গেল দুটো মানব দেহ। আশ্লেষে জড়িয়ে বিলীন হতে লাগে একে অপরের মাঝে।

_

রাগে দুঃখে লাবণ্যর ইচ্ছে করছে নিজের মাথার চুল নিজে ছিঁড়তে। বিছানায় বসে দু হাতে মুখ চেপে ধরল। চোখের সামনে স্পষ্ট হতে লাগল একটু আগে দেখা দৃশ্য।

সন্ধ্যা হতেই একে একে জ্বলে উঠে বাড়ির সব লাইট। আঁধার কাটিয়ে আলোকিত হতে সময় লাগে সেকেন্ড কয়েক। বাউন্ডারিতে লাগানো লাল, নীল আলো জ্বলতেই হইহই কলরব করে মুহূর্তেই ছোটোছুটি লাগিয়ে দেয়। লাবণ্য চেয়ে দেখছিল খুদে বাচ্চাদের দূরন্তপনা। কী এক উল্লাস নিয়ে পাখির মতো ছুটে চলেছে তারা। তাদের হৈ হুল্লোড়ে পথঘাটের পথচারী ঘাড় ঘুরিয়ে এক পলক উল্টো ফিরে চাইছে। লাবণ্যও চেয়ে রইল। সময়ের সাথে তাদের এই উল্লাস, উৎফুল্লতা মিলিয়ে আটকা পড়বে দায়িত্বের বেড়াজালে। সম্মুখীন হতে হবে কঠিন বাস্তবতার সাথে। এরাই তখন কঠিন মুখে দাঁড়িয়ে পরবর্তী প্রজন্মের উল্লাস দেখবে, কখনো বা সহাস্যে মত্ত হবে শৈশবের স্মৃতিচারণে।

তামান্না আর মাহাদ একসাথে দাঁড়িয়ে বাচ্চাদের দেখে চলেছে। মাহাদ নিশ্চুপে দাঁড়িয়ে রইলেও তামান্না থেমে নেই। ক্ষণে ক্ষণে বাচ্চাদের সতর্ক করছে যেন আস্তে দৌড়ায়, পড়ে ব্যথা পাবে। কিন্তু তার কথা কে শুনে। নিজেদের মতো এদিক ওদিক ছুটতে ব্যস্ত। দৌড়াতে দৌড়াতে সবগুলো গিয়ে পড়ল মাহাদের উপর। অকস্মাৎ কাজে মাহাদ ভারসাম্য হারিয়ে পাশে থাকা তামান্নাকে নিয়ে পড়ে।
লাবণ্য উপর থেকে দেখছিল সব। হঠাৎ কাজে সে হতবাক হলেও ততক্ষণাৎ সামলে নেয় নিজেকে। তবে সময়ে যেন তার ভিতরে ঝড় বয়ে যায়। ছটফট করতে থাকে অসাড়, ক্লান্ত দেহধারী রমণী। শ্বাস ফেলাও যেন কষ্টদায়ক! গলার ধারে কেউ শক্ত হাতে চেপে ধরেছে। শ্বাস আটকে আসে লাবণ্যর। থম মেরে খাটের এক কোণায় সেভাবেই বসে রইল। চোখের পলক অবধি ফেলে না। একদৃষ্টে শূন্যে চেয়ে থাকে। অজান্তে গাল বেয়ে টপটপ করে ঝরতে লাগে অশ্রু জল!

মাহাদকে দেখে লাবণ্যর কান্না উগলে ওঠে। ইচ্ছে করল বাচ্চাদের মতো কেঁদেকেটে মাহাদের বুক ভাসাতে। রুগ্ন, অসহায়, নিরাশ্রয়, দিশেহারা পথিকের ন্যায় একটুখানি আশ্রয়ের জন্যে মরিয়া হয়ে উঠল লাবণ্যর বুঝহারা মন। লাবণ্যর কাতর দৃষ্টি মাহাদের নজরে আসে না। আসলেও উপেক্ষা করে অনতিবিলম্বে। তার এই অবজ্ঞা, উপেক্ষা, অবহেলা আজ হঠাৎ নয়, চলছে বিগত কয়েক মাস যাবৎ। লাবণ্য নির্নিমেষ চেয়ে থেকে মাথা নুইয়ে ফেলে। অস্ফুট স্বরে ডাকল,
– মাহাদ ভাই।

অস্পষ্ট ডাক কর্ণগোচর হতেই মাহাদ চকিত ফিরে চাইল। দৃষ্টিতে একরাশ কৌতূহল। মেয়েটার চোখ যেন ভিন্ন কথা বলছে। মাহাদ বুঝতে পারছে না সে না বলা ভাষা। কিছুটা রাশভারী কণ্ঠে বলল,
– বলো।

চাতকের ন্যায় এক ফোটা পানির জন্য হাহাকার করতে থাকা লাবণ্য যেন প্রাণ ফিরে পেল। কাল বিলম্ব না করে ঝাপিয়ে পড়ে মাহাদের বুকে। হতভম্ব মাহাদকে অবাক করে দিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
– মাহাদ ভাই, আমাকে আগলে নাও। তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই।

_

এ মনোরম পরিবেশ যেন গোধূলি লগ্নে উপভোগ্য। বেলা গড়িয়ে প্রকৃতি কেবল অন্ধকারে ডুবে। অস্তমিত দিবাকরের আলো স্লান হয়ে মিলিয়ে যায় জলের স্রোতে। প্রকৃতি আঁধারে ছেয়ে গেলেও রঙ বেরঙের লাইটের আলোতে স্পষ্টতই একজোড়া কপোত কপোতী। হাতের ভাঁজে হাত রেখে হেঁটে চলেছে আভিরা, নাওয়াজ। গন্তব্য তাদের অজানা, পিচঢালা পথের মতোই। গন্তব্যহীন পথে উদ্দেশ্য বিহীন গমন যেন অজানায় নিয়ে চলে। নির্জন, জনশূন্য সড়কের ধারে দাঁড়িয়ে অসীম রহস্যের আকাশে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। আশেপাশের কোথাও ইট পাথরের দালান নেই। চারদিকে সবুজের সমারোহ। বিশাল বট বৃক্ষ যেন ছায়া প্রদানের অন্যতম মাধ্যম। বট বৃক্ষের থেকে খানিকটা দূরত্ব রেখে দাঁড়াল আভিরারা। মাথার উপর দাঁড়িয়ে আছে বিশাল ইউক্যালিপটাস গাছ। চিকন, সরু পত্র পল্লব সমীরণের ছোঁয়ায় নড়ছে অনবরত। প্রকৃতিতে আজ শীতল, উষ্ণ ভাব। ঠান্ডা, গরম কোনোটাই অনুভব হচ্ছে না ঠিকঠাক। নিস্তব্ধ, থম মেরে থাকা প্রকৃতির হালকা বাতাস গায়ে লাগাতে তৎপর।

– আঞ্জুম দেখুন তো ওর ঠিক হবে কি না?

আভিরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে এলোমেলো টাল হয়ে থাকা ছোটো বাচ্চাদের কাপড়ের স্তুপের দিকে তাকিয়ে আছে। ফুটপাত ঘেঁষে দুই তিনটা ভ্যানের মধ্যে বাচ্চাদের কাপড় সাজানো। নাওয়াজের হাতে হালকা গোলাপি রঙের গোল জামা। আভিরা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে এখনও। তার দৃষ্টিতে বিস্ময়ভাব, অবাকতা। যে আসেইনি, যাকে চায়নি, তার জন্য এই লোক তাকে টেনে এনে কাপড় দেখার জন্য দাঁড় করিয়েছে।

– বলছেন না কেন? ওর সাইজের হবে এইটা? বড়ো হবে মনে হচ্ছে।

আভিরা কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। দেড় বছরের বাচ্চার জামা হাতে নিয়ে বলছে এই সাইজের জামা হবে কিনা। নাওয়াজের পাগলামি দেখে আভিরা মৃদু হাসল। আভিরা স্বস্তি বোধ করে। নাওয়াজ বাচ্চাটাকে আদৌতেও মেনে নিবে কিনা সেই ভয়ে ছিল। নাওয়াজ প্রকাশ না করলেও তার কাজে আভিরার বুঝতে বাকি নেই বাচ্চাটার কথা শুনে সে কতটা খুশি। আভিরা কিছুটা চাপা স্বরে বলল,
– এখন এসব দেখছেন কেন? সে তো এখনও আসেনি।

– আসবে তো। সে আসার পর কেনার সময় না পেলে? আমার মেয়ে তখন তার বাবার খামখেয়ালিপনায় রেগে যাবে। আমি চাইছি না মেয়ে এসেই তার বাবার সাথে অযথা চোটপাট করুক।

আভিরা বিস্ময়ে হতবাক! মেয়ে? লোকটা এত দূর কল্পনা করে ফেলেছে। আর সে কিনা ভেবেছিল তার অনাগত সন্তানকে এ লোক মেনে নিবে না। নিজের ঘৃণ্য চিন্তা ভাবনায় রাগ হয় আভিরার। তার অনুতপ্ততার রেশ যেন চোখে মুখে স্পষ্ট। সে এমন ভাবনা ভেবে নাওয়াজকে বেশি আঘাত করে ফেলেছে কী? কিন্তু লোকটা যে তখন কিছু বলেনি। আভিরা চুপসে গেল কেমন। নির্নিমেষ চেয়ে দেখে গেল সদ্য বাবা হবার কথা শুনে প্রাপ্ত বয়স্ক এক পুরুষের বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাস।

_

প্রভাকর যেন আজ আলাদা কিরণ দিতে ব্যতিব্যস্ত। তার মতোই এমন আলাদা রূপ সদ্য স্নান সেরে আসা রমণীর চোখ মুখে। বিছানায় চোখ পড়তে লাবণ্যর কদম থামে। কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে থেকে আরশিতে থাকা নিজ প্রতিবিম্বে দৃষ্টি ফেলে। চোখ মুখে তার লাজ নেই, তবে অন্যরকম এক অনুভূতিতে অন্তঃকরণে চাঞ্চল্যতা। অশান্ত হৃদয়ে দামাদা বেজে চলেছে বিরামহীন। হৃৎস্পন্দন যেন তার দ্রুততার সাথে বেড়েই চলেছে। লাবণ্য ঘাড় বেঁকিয়ে বিছানায় শায়িত মাহাদের দিকে স্থির দৃষ্টি ফেলে। ঘড়ির দিকে তাকাতে চোখ বেরিয়ে আসার উপক্রম। ঘড়ির কাঁটা বারোটা পেরিয়ে একটার কাঁটায় ঘুরতে চলেছে। লাবণ্য আর কিছু না ভেবেই মাথায় আঁচল টেনে দ্রুত নিচে নামে। নিচে যেতেই হাঁসফাঁস করতে লাগল। সুরভী চেয়ারে বসে আছে। পাশেই বর্ণা অনবরত কথা বলে মেয়েকে খাওয়াতে ব্যস্ত। বাড়ির পুরুষেরা কেউ ঘরে নেই। যার যার কাজে বেরিয়ে পড়েছে সকলে। শুধু এক পুরুষ নিদ্রায় মগ্ন। লাবণ্য কোনোদিকে না তাকিয়ে রান্নাঘরে চলে গেল। প্লেটে ভাত বেড়ে নিয়ে এসে বসল সুরভীর পাশে। খানিকটা রয়েসয়ে জিজ্ঞেস করল,
– মা খাওয়া হয়েছে আপনার?

– মাহাদ কোথায়? বেলা হয়েছে। উঠবে না না কী? নাস্তা করার সময় নেই কারো। এত বেলা অবধি কেউ পড়ে পড়ে ঘুমায়।

লাবণ্য নিশ্চুপে সব শুনে গেল।‌ হাতের প্লেট শক্ত হাতে চেপে ধরে উপরে ওঠে। জোরালো শ্বাস ফেলে ডাকতে লাগল মাহাদকে।

– মাহাদ ভাই ওঠো।

এমন নিচু স্বর মাহাদের কানে গেলে তো? নিদ্রায় নিমগ্ন মানবকে জাগাতে লাবণ্যর কণ্ঠস্বর যেন ব্যর্থকাম। লাবণ্য খানিকটা এগিয়ে গিয়ে পুনরায় ডাকল,
– তুমি কি উঠবে না? খাবার নিয়ে এসেছি।‌ উঠো, খেয়ে নিবে।

সাড়া শব্দ নেই কোনো। লাবণ্য ফের ডাকতেই তাকে টেনে কেউ বিছানায় ফেলে। ধড়ফড় করতে থাকা হৃৎপিণ্ডের বেগ কমতে লাগে তৎক্ষণাৎ। আঁতকে উঠে সম্মুখে থাকা মানবের দিকে চাইল। ঘাড় গলিয়ে শক্তপোক্ত হাতখানা পিঠে ঠেকে। পুরুষালি হাতের ছোঁয়ায় লাবণ্যর চিত্ত অসাড় প্রায়। ভাবনাহীন ক্লান্ত দেহখানা হেলিয়ে দেয় মাহাদের বুকে।

– লাবণ্য।

মাহাদের কণ্ঠে কী যেন ছিল, লাবণ্যর নিঃশ্বাস আটকে আসে। নিঃশব্দে, নিস্তব্ধতায় কেটে গেল কয়েক প্রহর।

– বেশি করে ঝাল দিয়ে কাঁচা আমের ভর্তা করো তো।

লাবণ্য অবাক হলেও মাথা তুলে তাকায় না। লাবণ্য ভেবেছিল মাহাদ হয়তো তাকে লজ্জায় ফেলে দিবে। কিন্তু মাহাদ এমন কিছুই করল না। তার হাবভাব স্বাভাবিক। যেন এমনটা হওয়ারই ছিল। লাবণ্য খানিকক্ষণ নিশ্চুপ থেকে জিজ্ঞেস করল,
– এখন?

– হ্যাঁ।

– ভাত খাবে না?

– খেতে ইচ্ছে করছে না।

বাড়ির উঠানে মোড়ায় বসে আম কাটছে কয়েকজন। খানিকটা দূরে মাহাদ চেয়ার পেতে বসে আছে। তার সাথেই দাঁড়িয়ে আছে লাবণ্য। দৃষ্টি তার মাটিতে। মৃদু কম্পনরত ওষ্ঠাধর চেপে শক্ত হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে। উষ্ণ তরল রক্তের স্রোত বয়ে গেল শিরদাঁড়া বেয়ে। শরীরে অদ্ভুত শিহরণ। মাহাদের হাতের মুঠোয় থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয় সতর্কতার সাথে। হাত ছাড়িয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। এতক্ষণ যেন শ্বাস ফেলাও অসম্ভব ছিল।

– মুখে নাও।

লাবণ্য চুপচাপ মুখে নিল। না চিবিয়ে গলাধঃকরণ করল সবটা। তবুও যেন টক স্বাদে ভরে যায় পুরো মুখ। চোখ মুখ কুঁচকে বাটিতে থাকা আমের ভর্তা পুরোটাই শেষ করল। মাহাদ সবটাই দেখল। লাবণ্যর কুঁচকানো চোখ মুখ দেখে অগোচরে হাসল সে।

_

তপ্ততায় মুদে দ্বিপ্রহরের ক্ষণ। লাবণ্য কেবল রান্না শেষ করে রুমে এসেছে। ক্লান্তিতে মুদে থাকা দেহখানা কোনোরকম টেনে গোসলে গেল। গোসল সেরে বের হতেই ভড়কে গেল। মাহাদ বিছানায় বসে আছে। লাবণ্য চোখ মুখ স্বাভাবিক রেখে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মাহাদকে অদেখা করে চুল আঁচড়ে মাথায় ঘোমটা টানে। মাহাদ সবটাই চুপচাপ দেখে গেল। আচমকা উদরে শীতল হাতের স্পর্শে কেঁপে উঠল লাবণ্য। সহসাই চোখ বুজে শরীর হেলিয়ে দেয়। লাবণ্যর পিঠ ঠেকে মাহাদের বুকে। উষ্ণ নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ে গলার ধারে। উদরে থাকা মাহাদের হাত খামচে ধরে লাবণ্য। ধারালো নখ বিঁধতেই মাহাদ হাত সরিয়ে নেয়। রক্ত বেরিয়ে এসেছে। মাহাদ লাবণ্যর চুল হাতের মুঠোয় পেঁচিয়ে ধরে। লাবণ্য আর্তনাদ করার পরও ছাড়ল না। শক্ত হাতে ধরে রাখল।

– মাহাদ ভাই ছাড়ো। লাগছে আমার।

মাহাদ ছাড়ে না। অনবরত প্যাঁচাতে লাগল দীঘল কেশ। লাবণ্যর চোখে জল জমে। তবুও টু শব্দটি করে না। একপর্যায়ে মাহাদ আস্তে ধীরে আলগা করে হাতের বাঁধন। ছেড়ে দেয় মুঠোয় থাকা চুলের গোছা। এক পলক লাবণ্যকে দেখে আলমারি থেকে গাঢ় কমলা রঙের শাড়ি বের করে।

– এটা পরে নাও।

– এখন আবার চেঞ্জ করব?

– হুম।

– অযথায়?

– হ্যাঁ।

– কারণ?

– আমি বলেছি তাই। তুমি চেঞ্জ করবে না কি আমার করাতে হবে।

লাবণ্য শাড়ি হাতে ছুটে ওয়াশরুমে গেল। কাঁধে আঁচল তুলতে তুলতে বের হলো ব্যতিব্যস্ত হয়ে। তার হাতের মুঠোয় থাকা চুল ছড়িয়ে পড়ে কারো চোখে চোখ আটকাতে। একজোড়া নেশাক্ত তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি তার দিকেই নিবদ্ধ। মাহাদের চোখে মুগ্ধতার ছড়াছড়ি। লাবণ্য অন্যদিকে ফিরে চুল বাঁধে আলগোছে। চোখে গাঢ় করে কাজল টেনে, হালকা লিপস্টিকের ছোঁয়া আঁকে ওষ্ঠে।

– হয়েছে?

– হ্যাঁ।

– চলো তবে।

গরমে প্রাণ ওষ্ঠাগত। তবুও হুড তোলার তাড়া নেই কারো মাঝে। যেন আজ উত্তপ্ততায় ঝলসে গেলেও যায় আসে না। দ্বিধাহীন চিত্তে লাবণ্যর হাত মুঠোয় নেয় মাহাদ। এমন একটা দিনেই মেয়েটার পড়ে যাওয়া রোধ করতে বাহু আঁকড়ে ধরেছিল শত দ্বিধা নিয়ে। আজ কোনো সংকোচ নেই। নির্দ্বিধায় হাত দুটো আঁকড়ে ধরতে পারে, আধিপত্য চালাতে পারে সারা দেহে। লাবণ্যর হৃদ কোণে ছটফটে ভাব। কিশোরী বয়সে কারো প্রেমে পড়েছিল সে। বোধ হারা মেয়েটা কারো ব্যক্তিত্বে আটকে গিয়েছিল বাজেভাবে। ধীরে ধীরে সেই পুরুষ দখল করে মন মস্তিষ্ক। সেই পুরুষ বাদে অন্য পুরুষ যেন তার জন্য নিষিদ্ধ। ভিন্ন এক পুরুষের সান্নিধ্যে এসে সেই পুরুষ আজ নিষিদ্ধ তার জন্য। লাবণ্য সকল ভাবনা বাদ দিয়ে মাহাদের দিকে তাকায়। তার হাত এখনও মাহাদের হাতের মুঠোয়। আজ মনে হচ্ছে না মনের সব অনুভূতি যার জন্য তার ছোঁয়া ছাড়া অন্য পুরুষের ছোঁয়া শরীরে রাখা যাবে না। বরং মনে হচ্ছে সেই পুরুষের ভাবনাও তার জন্য পাপের। মাহাদের কথায় লাবণ্য ভাবনাচ্যুত হলো।

– গোপনে থাকা তোমার সত্তা আমার সামনে উন্মুক্ত। উন্মুখ চাহনিতে যেন সায়রের রহস্যতা। অজানাকে জানার মতোই জানতে বাকি নেই তোমাকে। এই সত্তা, এই মন কেবল আমার দখলদারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here