#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৭৫
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
নীল রঙা স্লান আলো ছড়িয়ে পড়ছে ঘর জুড়ে। অস্পষ্টত মৃদু আলোয় স্পষ্ট দুটো অবয়ব। একে অপরের থেকে দূরত্ব রেখে নর নারী দুজন শায়িত। পাশে শুয়ে থাকা রমণীর অস্থিরতা টের পেয়ে তার দিকে ফিরে তাকাল।
– ছুঁবে না।
– আচ্ছা। তুমি ঘুমাও।
লাবণ্য মাথা রাখল বালিশে। হঠাৎ মাথায় ঠেকল কারো শক্ত হাতের ছোঁয়া। আস্তে ধীরে সে ছোঁয়া নমনীয় হলো। কেঁপে উঠল লাবণ্যর নারী সত্তা। মাহাদও যেন কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। মেয়েটা না আবার রেগে না যায়। যখন দেখল কিছু বলছে না, সেও হাত সরাল না। খানিক বাদে লাবণ্যর মাথা চেপে ধরল নিজের বুকের সাথে। যে মেয়েটার জন্য এত জনম অপেক্ষায় ছিল সেই মেয়েটা তার বুকে। মাহাদের যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। ইচ্ছে করছে লাবণ্যকে বুকের ভেতর ঢুকিয়ে ফেলতে। শূন্যতা অনুভব করতে থাকা অন্তস্তল যেন পরিতৃপ্ত।
লাবণ্য একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে মাহাদকে সরিয়ে দেয়। হঠাৎ ধাক্কাতে যেন মাহাদের হুঁশ ফিরে। ঝোঁকের বশে সে কী করে ফেলল। নিজের কাজে নিজেই যেন হতভম্ব, ধিক্কার জানাল নিজেই নিজেকে। মাহাদ লাবণ্যকে নিজের করা ভুল স্বীকার করে বলতে চাইল, সে লজ্জিত। তবে লাবণ্যর বলা কথায় একপ্রকার স্তব্ধ গেল।
– এ জন্য এ জন্যই বিয়ে করেছিলে তাই না? সেদিন তো খুব বলেছিলে আমি না চাইলে কাছে আসবে না, ছুঁবে না আমায়। কয়েক মাস যেতে না যেতেই কামুকতা জেগে উঠল।
সব চুপচাপ শুনে যাচ্ছিল মাহাদ। দোষটা তো তারই। সে ই নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি। মেয়েটাকে একটুখানি ছুঁয়ে যেন আরও গভীরভাবে ছোঁয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগে। তবে এ কথা যেন সহ্য হলো না। এটা সত্যি সে মেয়েটাকে কাছে চায়। তবে লাবণ্যর অনিচ্ছায় নয়। আজ এই নিস্তব্ধ, একাকী কামরায় মেয়েটাকে বুকে নেওয়ার ইচ্ছে দমিয়ে রাখতে পারেনি। তাই বলে তার শুদ্ধ ছোঁয়াকে কামুকতা বলবে? মাহাদ প্রতিক্রিয়াহীন অবিশ্বাস্য চোখে চেয়ে থেকে অনতিবিলম্বে কামরা ছাড়ল।
লাবণ্য সকাল হতেই ও বাড়ি চলে যায়। নাওয়াজ বোধহয় হাসপাতালে গিয়েছে, আভিরা ভার্সিটিতে। আর ইয়াজমীন ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে আছে। লাবণ্যর ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে এখানে না এলেই ভালো হতো। আভিরা এসেছে দুপুরের পর। লাবণ্য এসেছে শুনে সোজা লাবণ্যর ঘরে গেল। মেয়েটা জানালায় মাথা ঠেকিয়ে বাইরে চেয়ে রয়েছে। আভিরা দরজা থেকে তা দেখে আবার নিজের ঘরে চলে গেল। ফ্রেশ হয়ে এসেও লাবণ্যকে একই অবস্থায় বসে থাকতে দেখে আভিরা এগিয়ে গেল, গিয়ে বসল লাবণ্যর পাশে।
– কখন এলে আপু?
লাবণ্য কিছুটা চমকাল বুঝি। থতমত খেয়ে বলল,
– এই তো সকালে এসেছি।
– অনেকক্ষণ হলো এসেছ তবে। মায়ের ঘরের দরজা বন্ধ দেখে এলাম। তোমার আসার খবর মা জানে না? তুমি ডাকলে না কেন?
লাবণ্য অনুভূতিহীন হয়ে তাকায়। সে এসেছে বিধায় ইয়াজমীন ঘরের দোর আটকে বসে আছে। লাবণ্যর নিজেকে কেমন অসহায় লাগল। লাবণ্যর নিশ্চুপতায় আভিরা হয়তো কিছুটা বুঝল। প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,
– এসে কিছু খাওনি হয়তো। খাবে চলো।
– তুমি খেয়ে নাও। আমার শরীরটা খারাপ লাগছে।
বলে লাবণ্য শুয়ে পড়ল। আভিরা আর ঘাটল না। একা থাকতে দেওয়া ভালো। সে না হয় পরে খাবার এনে রুমে দিয়ে যাবে। ইয়াজমীনের দুপুরে ঔষধ খেতে হবে। এখন খেতে না ডাকলে দেরি হয়ে যাবে। আভিরা আর দাঁড়িয়ে না থেকে ইয়াজমীনকে ডাকতে গেল। যাওয়ার আগে দরজাটা ভিড়িয়ে দিতে ভুলল না।
লাবণ্য নিজের ঘর থেকে দেখল ইয়াজমীন খেতে বসেছে। অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকল। ইয়াজমীন টেবিল ছেড়ে উঠে যেতেই লাবণ্যও দৃষ্টি ফেরায়। তার চোখ জ্বলছে। আগে কখনো ইয়াজমীন তাকে ছাড়া খেতে বসেনি। অথচ আজ। তার উপস্থিতি যেন ইয়াজমীনের উপর কোনো প্রভাব ফেলছে না। দিব্যি তাকে অদেখা করে চলছে। লাবণ্য আর এখানে থাকার কথা ভাবল না, সে চলে যাবে। খালার সুপ্ত রাগ সে টের পায়। শুধু নাওয়াজের জন্য কিছু বলতে পারে না। নয়তো এ বাড়ির দরজা কবেই তার জন্য বন্ধ হয়ে যেত। অবশ্য বন্ধের পথ তো সেই তৈরি করেছে।
বারোটার কাঁটা কবেই পেরিয়েছে। লাবণ্য অস্থির চিত্তে ঘরময় পায়চারী করছে। মাহাদ এখনও আসেনি। সচরাচর মাহাদ এত রাত করে বাড়ি ফিরে না। অজানা নয় মেয়েটার। কাল সারা রাত মাহাদ বাড়ি ফিরেনি। লাবণ্য ভেবেছিল এখানে এসে দেখবে মাহাদ ফিরে এসেছে। কিন্তু এ বাড়ি এসেই তার ভুল ভাঙল তার। অপেক্ষা করতে করতে কখন চোখ বন্ধ হয়ে গেল লাবণ্য টের পেল না। কাল সারা রাত ঘুম হয়নি তার। এক সেকেন্ডের জন্যও দু চোখের পাতা এক করতে পারেনি।
মাহাদ এলো বেশ রাত করে। বেল না বাজিয়ে ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজা খুলল। এত রাতে কারো জেগে থাকার কথা নয়। এখন বেল বাজানো মানে সকলের ঘুম ভাঙানো। আর প্রশ্নের তোপে পড়া।
_
সময় যেন নদীর স্রোতের ন্যায় প্রবাহমান। চলমান এই সময় বিধ্বংসী ঝড় বয়ে গেলেও থেমে থাকে না। সময় তার নির্দিষ্ট নিয়মে চলতে থাকে। মানব জীবনের চড়াই উতরাই কাটিয়ে সময়ের সাথে চলতে হচ্ছে আমাদেরও।
কেটে গেছে একটা বসন্ত। প্রকৃতির রূপ বদলের মতো থেমে নেই জনজীবনও। শুধু মাহাদ আর লাবণ্যর জীবন যেন সেই রাতেই থমকে গিয়েছে। দুজন দুজনকে খুব সন্তর্পণে এড়িয়ে চলে। এমনভাবে অদেখা করে যেন এ ধরাতে মাহাদ, লাবণ্য নামক কোনো মানব মানবীর অস্তিত্বই নেই।
মাহাদদের বাড়ির বসার ঘরে ময়মুরুব্বি সকলে বৈঠক বসিয়েছে। সামাদ আর মাহিরার বিয়ে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে মূলত। বিয়ের ডেইট আগেই ফিক্সড করা হয়েছে। আসছে বৃহস্পতিবার শুভ কাজ সেরে ফেলবে। ছেলের বাড়ি থেকে চারশজন আসবে বলেছে। সামাদদের আত্মীয় পরিজন বিশাল। তাছাড়া আত্মীয় স্বজন বাদেও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গদের বিয়েতে না বললেই নয়। চেনা পরিচিত মানুষসহ হিসেব করলে বরযাত্রী সংখ্যায় হাজার ছাড়িয়ে যায়। তাই অনেক ভেবেচিন্তে যাদের না বললেই নয় শুধু তাদের বলা হয়েছে। মাহাদদের আত্মীয় স্বজনসহ সমাজের ঘর প্রতি একজন করে বলা হবে। সকলে বসে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলো। লোকসংখ্যা হিসেব করলে ছয়শর মতো। আর মাত্র চার দিন সময় আছে। আত্মীয় স্বজনদের আগেই বলা হয়ে গিয়েছে। এখন শুধু সমাজের লোকদের বলা বাকি। আলোচনা শেষ করে সমাজের লোকদের দাওয়াত দিয়ে ফেলবে। কেনাকাটা যা আছে কাল করবে, আর বিয়ের একদিন আগে বাজার সদাই। প্রায় ছয়, সাত লাখ টাকার মতো খরচ হবে। সবকিছুর যা দাম। এত লোকের খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করতে গিয়েই মোটা অঙ্কের টাকা খরচ হবে। তারপর বিয়ের গেট, বরের স্টেজ সাজানো তো আছেই। অল্পের মধ্যে বিয়ের কাজ শেষ করতে চাইলেও টাকার অঙ্কটা বিশাল। সব খরচ যাচ্ছে মাহাদ, সামাদের পকেট থেকে। একটা মাত্র বোন তাদের। কোনো কমতি রাখতে চাইছে না। টাকা খরচ হোক। তবে মান যেন থাকে। কেউ যেন কটাক্ষ করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে তৎপর দু ভাই।
মাহাদ উপরে উঠতে চোখাচোখি হলো লাবণ্য মাহাদের। মাহাদ কোনোরকম পাশ কাটিয়ে রুমে চলে গেল। লাবণ্যও এক নজর তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিয়েছে। আজকাল মাহাদের চোখে চোখ রাখতে পারে না। ঐ চোখ দুটোতে তাকালেই তীব্র অপরাধবোধ জেগে ওঠে। নিভৃতে জর্জর হয় অনুতাপে। লাবণ্য নিজেকে স্বাভাবিক রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করলেও ভিতরে ভিতরে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। বিয়ে নামক পবিত্র বন্ধনটাকে কালিমা লেপন করতে দ্বিধা করেনি তখন। এখন অনুশোচনায় গুমড়ে মরলেই কী!
_
জরুরি তলবে বাড়ি আসতে হয়েছে সামিহার। মেয়েটা ক্লাস করছিল তখন। মায়ের ফোন পেয়ে কোনোরকম দুটো ক্লাস করেই তড়িঘড়ি করে বাড়িতে এসেছে। বসার ঘরে অপরিচিত মানুষ দেখে ঘাবড়ে গেল কেমন। ওকে দেখে সকলের মুখে হাসির দেখা মিলে। যেন তাদের অপেক্ষার শেষ হয়েছে তার আসাতে। সামিহা অপ্রস্তুত কণ্ঠে সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করে নিজের রুমে গিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। কিন্তু তার মায়ের কারণে ফের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম।
– বাড়িতে এত মানুষ কেন এসেছে?
– তোমাকে দেখতে এসেছে।
আতঙ্কিত সামিহা দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে চিল্লিয়ে উঠল,
– মানে?
– আস্তে। ওনারা শুনতে পাবেন।
সহসাই সামিহার মুখাবয়ব কঠিন হয়ে এলো। একপ্রকার ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল,
– এ জন্যই দাদির অসুস্থতার কথা বলে আমায় এনেছ।
– এ কথা না বললে তুমি আসতে না কখনোই।
এবার সামিহা থেমে গেল। সেই যে মাহাদের বিয়ের কথা শুনে এত বড়ো কাণ্ড ঘটিয়ে বাড়ি থেকে গিয়েছিল। তারপর আর বাড়ি আসা হয়নি। বাড়ি থেকে কল দিয়ে আসার কথা বললেও প্রেজেন্টেশন, এক্সামের ব্যস্ততা দেখিয়ে নাকচ করে দিত। তার এই বাহানা দেওয়াটা যেন মা বুঝে গিয়েছে। সেজন্য অন্যবারের মতো বাড়ি আসার কথা না বলে মিথ্যা বলে আনিয়েছে।
– তাই বলে তোমরা আমাকে না জানিয়ে ছেলেপক্ষকে আসতে বলবে? আবার আমাকে মিথ্যে বলে আনিয়েছ।
– এসব আমাকে না বলে তোমার বাবাকে বলো। তোমার বাবাই আসতে বলেছে ওনাদের।
বিস্ময়ে হতবাক সামিহা কথা বলতেই ভুলে গেল যেন।
– বাবা আসতে বলেছে ওনাদের?
– হ্যাঁ।
– না গেলে হয় না?
– কী ধরনের বাচ্চামো এগুলো? ওনারা অনেকক্ষণ ধরে তোমার অপেক্ষায় বসে আছেন। এভাবে তাদের বসিয়ে রাখা কি ঠিক, তুমিই বলো।
সামিহাকে এবার অসহায় দেখাল। অসহায় চোখে তাকাল মায়ের দিকে। কিন্তু ভদ্রমহিলা সে দৃষ্টিতে খুব একটা তোয়াক্কা করলেন না। একে একে সাজগোজের সকল সরঞ্জাম বের করে রাখছেন। মায়ের এমন দায়সারা ভাবে সামিহার রাগ হলেও চুপ থাকায় শ্রেয় মনে হলো। এখন অযথা রাগ দেখালেও খুব একটা সুবিধা হবে না।
– আচ্ছা ওনাদের সামনে যাব। কিন্তু সবটা যেন আমার যাওয়াতেই শেষ হয়।
– পছন্দ হলে আংটি পরিয়ে যাবে। সেই প্রস্তুতি নিয়েই তাদের সামনে যেতে বলব তোমাকে।
_
– সারপ্রাইজ কেমন লাগল?
– ফোন দিয়েছেন কেন আপনি?
ইফাজ এমন কর্কশ কণ্ঠে কান থেকে ফোন নামিয়ে দেখল ভুল নাম্বারে কল গেল কিনা। না সঠিক নাম্বারেই কল দিয়েছে সে। তবে ফোনের ওপাশ থেকে এমন কর্কশ কণ্ঠ কেন ভেসে আসছে? ইফাজ গলা খাঁকারি দিয়ে নরম সুরে ডাকল,
– সামিহা।
– কথা বলবেন না আপনি। আরেকটু হলে জান বেরিয়ে যেত আমার।
বলতে বলতেই মেয়েটা কান্না করে দিল। ইফাজ মৃদু হাসে। প্যান্টের পকেটে এক হাত রেখে সটান দাঁড়িয়ে বাইরে নজর দিল। এদিক সেদিক চোখ ঘুরিয়ে কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,
– কী হয়েছে? কাঁদছ কেন?
– তখন এত মানুষ দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আর আম্মু বলেছিল পছন্দ হলে আংটি পরিয়ে যাবে।
– আন্টি বলল, আর তুমি ভয় পেয়ে গেলে। আমার উপর বিশ্বাস নেই তোমার?
– আছে।
– তাহলে কাঁদছ কেন?
– বললাম তো ভয় পেয়েছিলাম।
– ভয় পেয়েছিলে কেন?
– মনে হচ্ছিল সব শেষ।
ইফাজ এবারও মৃদু হাসল। মেয়েটার এত ভয়, উৎকণ্ঠা, অস্থিরতা তাকে হারানোর জন্য নয় কী!
– হাতের আংটিটা কোথায় সামিহা?
সামিহা হকচকায়। একবার হাতের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
– ও ওটা রুমে এসেই খুলে ফেলেছিলাম।
– পরে নাও। তুমি যে ইফাজের বাগদত্তা এই আংটি যেন তার প্রমাণ হিসেবে সবসময় আঙুলে থাকে।
_
বিষণ্ণ বিকেলের ন্যায় পুরো দিবস যেন আজ বিষণ্ণতায় কাতর। কোথাও যেন মন খারাপের আভাস। কারো মন কেমন করছে কী? লাবণ্য ঘরের সাথে লাগোয়া বারান্দায় একাকী দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে দক্ষিণ দিকে তাকিয়ে আছে। তার উদাসী, বেখেয়ালি দৃষ্টি যেন এক মানবের উপর নিবদ্ধ। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের পুরুষটার টানটান কপাল, বাঁকানো জোড়া ভ্রু, কালো কুচকুচে চোখের মণি, সরু নাক, পুরু কালচে ঠোঁট, বাম গালে থাকা কাটা দাগ সবই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। ঠোঁটের কোণে তার মৃদু হাসি ফুটে ওঠে।
– ওদের দুজনকে একসাথেই মানায় তাই না বলো? ভাইজানকে বলেছিলাম আমার মেয়েটাকে তার বাড়ির বউ করে নিয়ে আসতে। কিন্তু আপনজনদের সাথে আত্মীয়তা করবে না বলে নাকচ করে দিল। এতে নাকি সম্পর্কে বিরূপ প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে। ভাইজানের সিদ্ধান্তের উপর তো আর আমার জোর নেই। কিন্তু মেয়েটা আমার শুনলে তো, মাহাদ বলতে পাগল। এই দেখো না এসে থেকেই মাহাদের পাশ থেকে সরছেই না। আর মাহাদও কাছ ছাড়া করছে না আমার মেয়েটাকে।
লাবণ্য নিশ্চুপে শুনে গেল। কী ভেবে যেন হাসলও। তার হাসিতে স্পষ্ট তাচ্ছিল্য। মাহাদের ফুফু খেয়াল করল না তা। খেয়াল করলে বুঝত যে উদ্দেশ্যে নিজের মেয়েকে নিয়ে মিথ্যাচার করে গেল তা সফল হওয়ার নয়।
লাবণ্য চোখ মুখ স্বাভাবিক রেখে চায়ের কাপে চুমুক দিল। মাহাদের ছোটো ফুফুর মেয়ে তামান্না। মাহাদের থেকে বছর পাঁচেকের ছোটো বয়সে। কয়েক বছর আগে তামান্না আর মাহাদের বিয়ের কথা শুনেছিল সে। তবে সেটা বাস্তবে রূপ নেইনি। ওদের দুজনকে একসাথে দেখে লাবণ্যর মনে হচ্ছে এদের বিয়ে হলে মন্দ হতো না। বরঞ্চ জীবনসঙ্গী হিসেবে মাহাদের এই অসাধারণ ঘরকন্যাকে পাওয়া হতো। তামান্না ছোটো হলেও সম্পর্কের মূল্যায়ন করতে জানে। যেটা লাবণ্যর মতো মেয়েরা জানে না। এরা না সম্পর্কের মান রাখতে জানে, আর না জানে অর্ধাঙ্গকে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে।
_
সকাল থেকেই রোদের দেখা নেই। অন্যান্য দিন সকাল সাতটা বাজতেই রোদের তীব্র ঝলকানিতে বিছানায় শুয়ে থাকা দায় হয়ে যায়। আর এখন বেলা এগারোটা। তবুও না রোদ আর না মেঘলা ভাব।
আভিরা বোরকা পরে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো। নাওয়াজ হলরুমে বসে আভিরার জন্য অপেক্ষা করছিল। মেয়েটা আসতেই উঠে দাঁড়ায়। আপাদমস্তক এক পলক আভিরাকে দেখে মেয়েটার সন্নিকটে গিয়ে দাঁড়াল। গায়ের সাথে গা মিশিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
– ওদের সাথে না গেলেই নয়। এমনি কাল সারা রাত ঘুমাতে পারেননি।
– আমি না গেলে মাহিরা আপু রাগ করবে। তাছাড়া কয়েক ঘণ্টায় তো। চিন্তা করবেন না।
– আপনি আমাকে নিশ্চিন্তে থাকতে দিচ্ছেন কোথায় আঞ্জুম। অসুস্থ শরীর নিয়ে কেন বাহিরে যেতে হবে। দিন দিন এত জেদ করেন।
– আমি জেদ করি, না কি আপনি অযথা দুশ্চিন্তা করেন?
– আমি অযথা দুশ্চিন্তা করি?
– তা নয়তো কী!
– ফিরে এসে আপনার এমন জোর যেন থাকে। যদি অসুস্থ হয়ে পড়েন তাহলে আমার থেকে খারাপ আর কেউ হবে না। আপনাকে কঠিন হতে বাধ্য করবেন না।
_
কর্মজীবীদের জন্য মেঘ বাদলের দিন সবচেয়ে বিরক্তের যেন। কর্মজীবী ছাড়াও সাধারণ মানুষেরাও হুটহাট বৃষ্টিতে বেকায়দায় পড়ে যায়। সকাল থেকে সামিহার অনুনয়, অনুযোগে বিরক্ত ইফাজ। মেয়েটা এক সেকেন্ডের জন্যও রেহাই দেয় না তাকে। আজকে তো অতিরিক্তই করছে।
– দেখো সামিহা বারবার এক কথা বলে মাথা খারাপ না করে কাজ করতে দাও। বৃষ্টি কমলে হসপিটালে যেতে হবে আমাকে।
এতক্ষণ শান্তভাবে অনুরোধ করতে থাকা সামিহা যেন হাসপাতালে যাওয়ার কথা শুনেই তেতে উঠল,
– হাসপাতালে যাবে মানে কী?
– রাতে অপারেশন আছে আমার।
– সেটা তো রাতের বেলা। এখন হসপিটালে কী কাজ? এই কোন নার্সের সাথে চক্কর চলছে তোমার? সেদিন এই কারণেই তোমার শার্টে লিপস্টিকের দাগ দেখেছিলাম আমি। তখন এতটাও গুরুত্ব দেইনি। কিন্তু এখন সব পরিষ্কার আমার কাছে। এর জন্যই এই তুমুল বৃষ্টিতে হসপিটালে যেতে হবে তোমার। ও বুঝেছি। রোমান্টিক ওয়েদার দেখে প্রেম জেগে উঠেছে। সেজন্য বৃষ্টি মাথায় নিয়ে তোমার সো কল্ড নার্সদের সাথে রঙ্গলীলা করতে যেতে চাইছ। কিন্তু তোমার জেনে রাখা উচিত আমি এমনটা কখনোই হতে দেবো না।
সামিহার একনাগাড়ে বলতে থাকা কথায় শুনে যাচ্ছিল ইফাজ। কিন্তু শেষের কথাগুলো শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। তার শার্টে লিপস্টিকের দাগ! পাগল মেয়ে কী সব বলছে! সামিহাকে মিটিমিটি হাসতে দেখে ইফাজ ঠোঁট কামড়ে হাসল। বদ মেয়ে ইচ্ছে করেই ঘোল খাওয়াচ্ছে তাকে। এই সব যে মাহাদদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য করছে তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। তাদের বিয়ের তিন মাস পেরিয়েছে। সামাদ আর মাহিরার সাথে সেদিন তাদেরও বিয়ে হয়েছিল। আজ মাহাদদের বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল তাদের। কিন্তু সকাল থেকেই তুমুল বৃষ্টি। এই বৃষ্টিতে বের হওয়ার উপায় নেই। সকলে কাঁথা মুড়িয়ে ঘুমাচ্ছে নিশ্চয়। আর মেয়েটা জেদ ধরেছে এই বৃষ্টি মাথায় নিয়েই নাকি যাবে। সে না বলাতে মুখ ফুলিয়ে বসে আছে। তবে তার অনুনয়, অনুযোগ থেমে নেই মোটেও।
– এই ধানি লঙ্কা সমস্যা কী তোমার? বাজে বকছ কেন? ঘরে এমন আগুন সুন্দরী বউ রেখে আমি বাইরে নজর দিতে যাব কেন?
– দূরে সরুন। আপনাদের মতো পুরুষদের ভালো করেই চেনা আছে আমার। ঘরের বউকে ভালো লাগে না আপনাদের। সেজন্যই তো এমন রোমান্টিক ওয়েদার দেখে হসপিটালে যাওয়ার জন্য তর সইছে না।
– আসলেই রোমান্টিক ওয়েদার। আমার প্রেম প্রেম পাচ্ছে, কী করি বলো তো?
বলেই ধাক্কা দিয়ে সোফায় ফেলে দিল সামিহাকে।
– সরুন, অসভ্য লোক।
– একটু অসভ্যতামি করে নেই আগে।
_
ছয় চেয়ারের ডাইনিং টেবিলে একসাথে এত মানুষের খাওয়া সম্ভব নয়। দাওয়াতে আসা বয়োজ্যেষ্ঠ, মাঝবয়সী পুরুষ লোক, মহিলারা উঠে যেতেই বর্ণা হলরুমের মেঝেতে পাটি বিছিয়ে দিল। সবাই একসাথে পাটিতে বসেই খাবে। মাছের গন্ধে গা গুলিয়ে আসছে আভিরার। অতি কষ্টে দু লোকমা ভাত মুখে তুলল। তবে গিলতে পারল না। তড়িঘড়ি করে উঠে দৌড় লাগাল। কোনোরকম বেসিনের সামনে গিয়ে পেটের সব বমি করে বের করে দেয়। আভিরার এমন ছুটে যাওয়াতে সবাই খাবার ছেড়ে ওর যাওয়ার পানে তাকিয়ে আছে। নাওয়াজ উঠে সেই কখন মেয়েটার কাছে গিয়েছে।
– ঠিক আছেন?
– হু!
আভিরা কোনোরকম দুর্বল কণ্ঠে বলল। মনে হচ্ছে পেটের নাড়িভুঁড়ি সব বেরিয়ে আসবে। কয়েক দিন ধরে এমন হচ্ছে। মাছের গন্ধ একেবারেই সহ্য হচ্ছে না। নাকে গন্ধ গেলেই পেট গুলিয়ে আসে।
– কালকে আমার সাথে হসপিটালে যাবেন আপনি। আপনার কোনো কথা শুনব না। এখন আসুন আমার সাথে। খাবেন চলুন।
– খাব না আমি। খেলে আবার বমি করব।
– মাছ খেতে হবে না। ডিম দিয়ে খাবেন।
– ডিমের গন্ধেও গা গুলিয়ে আসে।
কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল আভিরা। লোকটা নিশ্চয় এখন ধমকে উঠবে তাকে। কিন্তু আভিরাকে অবাক করে দিয়ে নাওয়াজ কিছুই বলল না। পাতলা ডাল দিয়ে ভাত মাখিয়ে আভিরার মুখের সামনে তুলে ধরল। আভিরা চুপচাপ খেয়ে নেয়।
সামাদের দাদি তীক্ষ্ণ চোখে আভিরার দিকে তাকিয়ে আছে। ভরা ঘরে ওনার বলা কথায় যেন বিস্ফোরণ ঘটে।
– কি গো জামাই, তোমার বউ কী পোয়াতি!

