প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন #পর্বসংখ্যা_৭৪

0
2

#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৭৪
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা

অন্ধকার কামরায় উষ্ণ তপ্ত নিঃশ্বাসের প্রতিধ্বনি স্পষ্টতই কর্ণগোচর। নর নারীর শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ যেন সময়ের সাপেক্ষে প্রবলতর হচ্ছে, বাড়ছে হৃৎপিণ্ডের সবেগে উঠানামা। দ্বিধাহীন চিত্তে ছুঁয়ে চলেছে একে অন্যের দেহ।
নেই কোনো সংশয়, কুণ্ঠাবোধ। অসাড় দেহখানা কারো বাহুবন্ধনে আবেষ্টিত। উদরে খসখসে হাতের প্রগাঢ় ছোঁয়ায় উত্তপ্ত রমণীর পেলব কায়া। শুষ্ক ওষ্ঠাধর ভেজা স্পর্শে উন্মুখ। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত দেহ খানিকটা প্রশান্তির জন্য এলিয়ে দেয় রমণীর বক্ষে। দু হাতে ছোটো শরীরটা মিশিয়ে নিল নিজ দেহের সাথে। রমণীর দেহ যেন চাপা পড়ে পুরুষ দেহের তলে। রমণীর বাঁকানো কায়া ছুঁতে তৎপর পুরুষালি হাতখানা। মেয়েলি মৃদু আর্তনাদে ঘাড় উঁচিয়ে রমণীর মুখবিবরে দৃষ্টি নিক্ষেপিত করে। অন্ধকারে যদিও কিচ্ছুটি দেখার উপায়ান্তর নেই। তবুও খানিকটা প্রচেষ্টা চালাল মেয়েটার ব্যথায় কাতর বিবর্ণ মুখখানি দেখার জন্য।

আভিরার ঘাড়ে মুখ গুঁজে নাওয়াজ কণ্ঠ খাদে নামিয়ে জানতে চাইল,
– ঠিক আছেন?

আভিরা নিভু নিভু চোখে চেয়ে আছে। দাঁতে দাঁত চেপে মৃদু স্বরে জবাব দেয়,
– হু!

দুটো ঘর্মাক্ত বদন জড়িয়ে একে অপরের সহিত। স্বেদবারি নিঃসৃত বদনে লেপ্টে আছে আভিরা। স্বীয় তর্জনী দ্বারা আঁকিবুঁকি করছে নাওয়াজের লোমশ বুকে। নাওয়াজ নীরবে দেখে চলেছে আভিরার কাজ। মেয়েটা কিছু একটা বলতে চেয়েও যেন বলতে পারছে না। নাওয়াজ বুঝার চেষ্টা করল মেয়েটার না বলা কথা। তবে বুঝে উঠতে পারল না।

– কিছু বলবেন?

– হু।

– বলুন।

আভিরা আমতা আমতা করছে। হাঁসফাঁস অবস্থা তার। এমন কথা কী করে বলবে? লোকটার সামনে লজ্জায় না মাথা কাটা যায়।

– বাড়িতে সারাক্ষণ একা থাকতে ভালো লাগে না। সময় কাটে না আমার। যদি কেউ থাকত, মানে আম্মু বলছিল যদি একটা বাচ…

সামনে পড়ে থাকা চুলগুলো কানের পিছনে গুঁজে দিল নাওয়াজ। অযাচিত স্পর্শে আভিরা কেঁপে ওঠে। নাওয়াজ ফুঁ দেয় মেয়েটার চোখে মুখে। আভিরা আবেশে চোখ বন্ধ করে নেয়। নাওয়াজ মৃদু হাসল তা দেখে। কাঁপতে থাকা চোখের পাতায় ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
– কী যেন বলছিলেন? বাড়িতে একা থাকতে ভালো লাগে না। সঙ্গী প্রয়োজন আপনার?

– হ্যাঁ।

আভিরা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল।

– আচ্ছা একটা কাজের মেয়ে রেখে দেবো। ভার্সিটির ক্লাস শেষে যতক্ষণ বাড়িতে থাকবেন ঐ মেয়ে থাকবে আপনার সাথে। তখন আর একা লাগবে না। আর রাতের বেলা আমি তো আছিই। না কি দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা আমার সঙ্গ চাইছেন? এমন কিছু হলে বলে ফেলুন। আমি মোটেও আপনাকে সঙ্গ ছাড়া করব না। একেবারে মিশিয়ে রাখব নিজের সাথে, এখনকার মতো!

আভিরার রাগ হলো। ইচ্ছে করছে লোকটার গলা চেপে ধরতে। কিন্তু সে এমনটা কখনোই পারবে না। মুখ ফুলিয়ে লোকটার বুক থেকে সরে যেতে চাইল‌। তবে নাওয়াজ তা হতে দিল না। শক্ত হাতে কোমর জড়িয়ে মুখ গুঁজে আভিরার ঘাড়ে। রাগে দুঃখে চোখের পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল আভিরার। নাওয়াজ বুঝেও কিছু বলল না। মেয়েটা কী বলতে চেয়েছিল বুঝতে মোটেও অসুবিধা হয়নি তার। বুঝে উঠতে পেরেই তৎক্ষণাৎ কথা ঘুরিয়ে ফেলল। এখনও সময় হয়নি। সময় হলে সে নিজেই নিঃসঙ্গতা কাটিয়ে তুলবে এই মেয়ের। সঙ্গী হিসেবে ছোটো আঞ্জুম এনে দিবে।

_

ফুটপাত ঘেঁষে হেঁটে চলেছে সাদা সেলোয়ার কামিজ গায়ে জড়ানো এক রমণী। কাঁধের ব্যাগটা উপর নিচ করে হাতের উল্টো পিঠে গ্রীবাদেশ গলিয়ে থাকা ঘাম মুছে নেয়। মাথার উপর থাকা দিবাকর ভালোই দীপ্তি ছড়াচ্ছে।‌ রোদে পুড়ে চামড়া জ্বলে যাওয়ার উপক্রম। হাতে থাকা বই দিয়ে রোদের আড়াল করার চেষ্টা করল নিজেকে। সক্ষমও হলো তাতে। লালচে মুখটাই হাসি ফুটে উঠল এবার। অদূরে চলন্ত বাস দেখে একপ্রকার ছুটে গেল।

কোলাহল, ঝঞ্ঝাট যেন অস্থিতিশীল করে তুলেছে পরিবেশ। গাড়ির তীব্র হর্নে বিরক্তি বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। হাত দিয়ে চলন্ত গাড়ি থামিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে দল বেঁধে। কেউ আবার পিছনে পড়ে যাচ্ছে। কেউ সুযোগ করে দিচ্ছে না মেয়েটিকে।কাউকে দেখছেও না, যার সাথে রাস্তার এপার থেকে ওপারে যেতে পারবে। একটার পর একটা যানবাহন ছুটে চলেছে। কপালের ঘাম মুছে কিছুটা সাহস জুগিয়ে পা বাড়াল। এক কদম ফেলতেই থামতে হয় তাকে। অনবরত গাড়ি ছুটে আসছে। কান্না পায় মেয়েটার, অসহায় চোখে আশেপাশে তাকাল। দূরে অদূরে যানবাহন ছাড়া কিছুই লক্ষিত হলো না। কোনোরকম হাত তুলে দিল এক দৌড়।

লোকজনের ভিড় ঠেলে কোনোরকম লোকাল বাসে চড়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সামিহা। দম ফেলার ফুরসত পেল না। তার আগেই একপ্রকার ধাক্কা খেল। পিছন থেকে লোকজন ক্রমান্বয়ে ঠেলে যাচ্ছে খানিকটা জায়গা করে দাঁড়ানোর জন্য। সামিহা পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচতে সামনে থাকা এক লোকের শার্টের কোণা খামচে ধরে। আকস্মিক পিষ্ঠদেশে ধারালো নখ বিঁধতেই ইফাজ চোখ মুখ কুঁচকে নিল। ঘাড় বেঁকিয়ে এক পলক চাইল আনত মুখে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীর দিকে। রমণী মাথা তুলে চাইতে চোখাচোখি হলো দুজনের। জলে টলটল করছে চোখজোড়া। ইফাজের চোখ আটকে গেল জলে সিক্ত টলমলে চোখে। মেয়েটাকে চেনা চেনা লাগছে তার। আগে কোথাও দেখেছে এই মেয়েকে। একটু ভালো করে লক্ষ্য করতেই খেয়ালে এলো এটা তো হসপিটালে বালিশ ছুঁড়ে মারা সেই রাগান্বিত মেয়েটা। তবে এই মেয়ের চোখ মুখের এমন অবস্থা কেন? চোখে মুখে স্পষ্টতই অস্বস্তির ছাপ। ইফাজ মেয়েটার চোখে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টারত। সামিহার কী সমস্যা আপাতত না বুঝলেও এই মেয়ে যে লোকাল বাসে চড়ে অভ্যস্ত নয়, তা ঠিকই বুঝে এসেছে। কিছুটা নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
– কী সমস্যা?

গমগমে পুরুষালি কণ্ঠে সামিহা নিজের হাত সরিয়ে নেয়। তীব্র অস্বস্তি নিয়ে বলল,
– দুঃখিত।

আচমকা মেয়েটা আর্তনাদ করে উঠল। ইফাজ হতভম্ব হয়ে চাইল সামিহার পানে। সামিহা দৃষ্টি নত করে পায়ে ফেলে। অস্ফুট স্বরে বলল,
– আহ আমার পা!

ইফাজ চোখ সরিয়ে সামিহার পায়ের দিকে তাকাল। মেয়েটার পা চাপা পড়েছে বুট পরিহিত পায়ের তলে। ইফাজ মেয়েটার বাহু আঁকড়ে সামনে নিয়ে এলো। সামিহার পিছনে দাঁড়িয়ে বলল,
– বেশি ব্যথা পেয়েছেন?

– ঠিক আছি।

– বাসে উঠতে গেলেন কেন?

সামিহা সংকোচ নিয়ে তাকাল। আজ উঠতে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছিল তার। লোক না হলে সিএনজিও ছাড়বে না। এখন সিএনজির জন্য বসে থাকলে ক্লাস করতে হবে না আজ। সেজন্য বাসে উঠতে হয়েছে। এর আগেও বেশ কয়েকবার বাসে চড়া হয়েছে তার। তবে তখন সাথে রুমমেট ছিল। কলেজ হোস্টেল ছেড়ে কয়েকজন মিলে সাবলেট বাসা ভাড়া নিয়েছে। এখন আর হোস্টেলে থাকা হয় না। হোস্টেলে থাকলে এমন ঝামেলায় পড়তে হতো না। বাড়ি থেকে এসেই হোস্টেল ছেড়েছিল। কলেজ থেকে অনেকটা দূরে বাসা ভাড়া নিয়েছে। যার দরুন রোজ যাতায়াতে সিএনজি করে যেতে হয়। বাসে খুব একটা উঠে না সে। এসব ভিড়ভাট্টা সর্বদা এড়িয়ে চলে।

– ক্লাসের দেরি হয়ে যাবে। সেজন্য বাসে উঠেছি।

– সিএনজি নিলেই তো হতো।

– লোক না হলে তো আমার একার জন্য সিএনজি ছাড়বে না।

ইফাজ কয়েক পল মেয়েটার দিকে তাকিয়ে খানিকটা দূরত্ব রেখে দাঁড়াল। পাশের সিট আঁকড়ে কোনোরকম ব্যালেন্স রেখে দাঁড়িয়ে আছে সামিহা। ধাক্কা লাগার সম্ভাবনা না থাকলেও দুটো শক্তপোক্ত হাত মেয়েটাকে আগলে রাখতে তৎপর।

কলেজ গেটের সামনে বাস থামতে তড়িঘড়ি করে নেমে গেল সামিহা। ইফাজ মেয়েটার যাওয়ার পানে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। যতক্ষণ মেয়েটার অস্তিত্বের দেখা মিলে। মেয়েটাকে বেশ কয়েক দিন ধরে নজরে নজরে রাখছে সে। কেন রাখছে জানে না। হাসপাতালের সেই ঘটনার পর এই মেয়েটাকে রাস্তায় একদিন আনমনা হয়ে হাঁটতে দেখেছিল। ফুটপাত ছেড়ে রাস্তার কিনার ঘেঁষে হাঁটছিল। একজন পথচারী হাত টেনে ধরেছিল। নয়তো চাপা পড়ত গাড়ির নিচে। সেই থেকে প্রায় সময় এই মেয়েকে চোখে চোখে রাখছে। বোকা মেয়ের ধরতেই পারেনি। অথচ সে জানে না সামিহা সেই প্রথম দিন থেকেই তার কাণ্ড কারখানা দেখে আসছে। নয়তো সম্পূর্ণ অপরিচিত এক পুরুষের কথার প্রত্যুত্তর করতে যেত না।

_

চঞ্চলা হরিণীর ন্যায় কাশবনের মাঝে দৌড়ে বেড়াচ্ছে ষোড়শী কন্যা। দূর থেকে একজোড়া চোখ তাকে দেখে চলেছে। মেয়েটা হঠাৎ পিছন ফিরে চাইল। সহসাই দৃষ্টি মিলিত হলো দুজনার। মুচকি হেসে ফের মিলিয়ে গেল কাশফুলের ভিড়ে। ছেলেটা দূর থেকেই সেই হাসিতে সঙ্গ দেয়।

দিয়াবাড়ির এক পাশে কাশফুলের মেলা। আর অন্য ধারে জলধারা। লেকের বাঁধানো পাড় জুড়ে ফুটে রয়েছে সারি সারি কাশফুল। শরৎ এর রূপ বর্ধিত করে শুভ্র কাশফুল।
শুভ্র কোমল কাশফুলেরা ছুঁয়ে চলেছে ষোড়শী কন্যার বদন। জলধারার স্বচ্ছ জলে পা ডুবিয়ে দিল জ্যোতি। শুভ্র জলে পা জোড়া যেন স্পষ্টত দৃশ্যমান। পা জোড়া অল্পস্বল্প দোল খাওয়াতে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ ভেসে আসে কর্ণকুহরে। কলকল শব্দে মুখরিত স্বচ্ছ নদীর জল। জ্যোতি হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিল। পড়ন্ত বিকেলে পশ্চিমে হেলে পড়ে দিবাকর। লেকের স্বচ্ছ জলে ডুবন্ত সূর্য যেন শুভ্র কাশবনে লালচে ছোঁয়া এঁকে দেয়।

পালাক্রমে রূপ বদল হচ্ছে প্রকৃতির। দু মাস অন্তর অন্তর প্রকৃতি যেন চিরচেনা রূপ বদলিয়ে ধরা দেয় ভিন্ন রূপে। কখনো গরমে নাজেহাল করে জনজীবন, কখনো বা এক পশলা বর্ষণে দূর করে নিত্যকার হাহাকার। হারহামেশাই প্রকৃতি সাজে নিজস্ব রূপে। মৌসুম ভেদে তাতে যোগ হয় ভিন্নতা। শরৎ শেষে হেমন্তকাল দোরগোড়ায় থাকলেও দিয়াবাড়িতে ফুটে আছে নয়নাভিরাম কাশফুল। স্বচ্ছ জলের সাথে ঢেউ খেলে যাচ্ছে কিনারে ফুটে থাকা কাশফুলেরা।

অপার্থিব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে দৃষ্টি নন্দিত দিয়াবাড়ি। কর্ম ব্যস্ততায় থাকা নগরবাসী সমস্ত অবসাদ কাটাতে ছুটে আসে দিয়াবাড়িতে। তেমনিভাবে এক যুগল ছুটে এসেছে। তবে তাদের এখানে আসার কারণ যেন অন্য সবার থেকে ভিন্ন।

বট বৃক্ষের ছায়াতলে চিত্রায়িত হয় নাট্যকলা দৃশ্য। দুই পাশের রাস্তার মাঝে ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক বট বৃক্ষ। রোদে অতিষ্ঠ হয়ে বট বৃক্ষের ছায়াতলে ঠাঁই নিয়েছে এক যুগল। ছোটাছুটি করে যেন ষোড়শী কন্যা বড্ড ক্লান্ত। ক্ষীণ শ্বাস ফেলছে। শ্বাস ফেলতেও বড্ড বেগ পোহাতে হচ্ছে।

– খারাপ লাগছে?

– উহু!

– পানি খাবে?

– হুম।

আব্দুল্লাহ জ্যোতির ব্যাগ থেকে পানির বোতল নিয়ে ছিপি খুলে ধরিয়ে দিল জ্যোতির হাতে। ঢকঢক করে পানি গিলে শুকিয়ে থাকা গলা ভিজিয়ে নেয়। চোখে মুখেও পানির ছিটা দিল।

– চলো এবার যেতে হবে আমাদের।

– আরেকটু থাকি।

আব্দুল্লাহ এক পলক মোবাইলে সময় দেখে নিল। দুইটার উপরে বাজে। এখন বাড়িতে না ফিরলেই নয়। এই মেয়ের বাড়ি যেতে যেতে চারটা বাজে। চারটার আগে ফিরতে হবে তাদের। নয়তো ঝামেলা বেঁধে যাবে।

– ফুচকা খাবে?

জ্যোতি আনমনা হয়ে এদিক সেদিক চাইছে আর পা দুলিয়ে যাচ্ছে। ক্ষণে ক্ষণে ছেলেমানুষী কাণ্ড করছে এই মেয়ে। এমন উড়ন্ত পাখির ন্যায় ডানা ঝাপটে উড়ার সুযোগ মেলে না কখনোই। আজ সুযোগ পেয়ে আকাশে ডানা মেলে উড়তে চাইছে। মেয়েটার হৃষ্টতায় প্রকৃতিও যেন সঙ্গ দিচ্ছে সমানতালে। আব্দুল্লাহর কথায় ঘাড় বেঁকিয়ে চেয়ে নজর ফেরায়। পা দোলাতে দোলাতে বলল,
– না।

আব্দুল্লাহ উঠে দাঁড়াল। ঝাল ঝাল ছোটো ফুচকা এই মেয়ের কতটা পছন্দ তা অজানা নয়। এই ফুচকা চোখের সামনে পেলে না খেয়েও থাকে না। বিশেষ করে তার কাছেই ছোটো ফুচকা খাওয়ার জন্য বায়না ধরবে। আজ খেতে না চাওয়ার কারণটাও বুঝতে পেরেছে। দিয়াবাড়ি আসার পুরো খরচ সে তার পকেট থেকে দিয়েছে। সেজন্য মেয়েটা এখন দশটা টাকাও বাড়তি খরচ করাতে চাইছে না। আব্দুল্লাহ পকেট হাতড়ে দেখল দুইশ টাকার একটা নোট আছে শুধু। দীর্ঘশ্বাস ফেলে এক প্লেট ফুচকা হাতে মেয়েটার পাশে গিয়ে বসল।

– নাও।

– খাব না বলেছিলাম তো।

বলেই দু আঙুলের মাঝে ফুচকা নিয়ে মুখে পুরে। সহসাই চোখ বুজে ফেলল। মেয়েটার বন্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল আব্দুল্লাহ। জ্যোতি ফট করে ঘুরে আব্দুল্লাহর মুখে ফুচকা পুরে দেয়। ফুচকা পছন্দ না হলেও চিবিয়ে গলাধঃকরণ করল আব্দুল্লাহ। গলা দিয়ে নামতে পেট জ্বলতে লাগল তার। চোখ মুখ কুঁচকে মেয়েটার ধরে রাখা আরেকটা ফুচকা মুখে নেয়। তার মুখের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে কোনো অখাদ্য গলাধঃকরণ করছে। আব্দুল্লাহকে জব্দ করতে পেরে জ্যোতি খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। আব্দুল্লাহকে সচরাচর মুগ্ধতা গ্রাস করতে পারে না। তবে এই মেয়েটাকে দেখলে সে ক্ষণে ক্ষণে মুগ্ধতায় বুঁদ হয়।

– প্রাণ!

– তুমি আমার সাথে সুখী তো?

– নিঃসন্দেহে।

বলেই মনমাতানো হাসি হাসল। মেয়েটার অগোছালো এলোমেলো চুলগুলো বাতাসের বেগে দুলছে। আব্দুল্লাহ কানের পিঠে গুঁজে দিল। আলতো করে চুমু খেল মাথায়।

চেনা পরিচিত মানুষটাকে এমন জায়গায় দেখে বর্ণ এগিয়ে যেতে চাইল। হঠাৎ মেয়েটার পাশে কাউকে দেখে তার টনক নড়ে। হাতের ভাঁজে হাত দেখে নৌকায় উঠার ঘটনা যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সে হাত বাড়িয়ে দেওয়ার পরও মেয়েটা আঁকড়ে ধরেনি। বর্ণের কাছে যেন সব জলের মতো স্বচ্ছ। বর্ণ স্লান চোখে দেখে যেমন এগিয়ে ছিল তেমন পিছিয়ে গেল। একেবারে ধোঁয়াশার ন্যায় মিলিয়ে গেল সে!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here