#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৮০
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
পাপ পূণ্যের সমযোগে চলতে থাকা জীবনে পাপ থেকে পরিত্রাণের উপায়? পাপের ভারে নিঃশেষ হতে চলেছে মানব জীবন। মনুষ্য জাতি সে সম্বন্ধে অজ্ঞ। তারা রাতের আঁধারে কিংবা দিনের আলোয় অবাধে পাপ কর্মে লিপ্ত! জীবদ্দশায় স্বীয় কৃতকর্মের মাশুল মানুষকে চুকাতেই হয়। পাপ থেকে নিস্তার পাওয়া যায় না কোনোভাবেই। ঘষে মেজে নিজেকে শুদ্ধ করলেও প্রতিটা লোমকূপে যেন পাপের আস্তরণ পড়ে থাকে।
অনুতাপে, আত্মগ্লানিতে ক্লিষ্ট লাবণ্যর ভগ্ন হৃদয়। কঠিন, দৃঢ় চিত্তের মানবীকে কেমন উদাস লাগে, অন্যমনস্ক দেখায় হুটহাট। সারাক্ষণ এক ধ্যানে শূন্যে চেয়ে কী যেন ভেবে চলে। কোনোকিছুই খেয়ালে থাকে না। বেমালুম ভুলে বসে সকল কিছু। নিজেকে নিয়ে যেন তার তীব্র সংশয়। হীনমন্যতায় ভোগে একপ্রকার। অল্পতেই চোখে জলের উদয়।
মাহাদের জরুরি একটা কাজ ছিল সেদিন। লাবণ্যকে বলেছিল তাকে যেন সকাল হতেই ডেকে দেয়। লাবণ্য সকাল সকাল উঠলেও মাহাদকে ডাকতে ভুলে যায় বেমালুম। মাহাদের ঘুম ভাঙে ঠিক আধ ঘণ্টা আগে। উঠে তড়িঘড়ি করে তৈরি হয়ে নাস্তা না করেই বেরিয়ে পড়তে হয়। মোবাইল হাতে নিয়ে দেখতে পায় ব্যাটারি ডাউন। অথচ রাতের বেলা দেখেছিল লাবণ্যকে ফোন চার্জে লাগাতে। মাহাদ ভ্রু কুঁচকে ফোনের দিকে চেয়ে থাকে। লাবণ্যর খামখেয়ালিতে মাহাদ যেন বিরক্ত। একটা মানুষ কাজের প্রতি বেখেয়ালি হলেই তার দ্বারা এমন অহরহ ভুল হবার সম্ভাবনা থাকে। লাবণ্য বোধহয় সংসার জীবনে অতিষ্ঠ। আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে দিনকে দিন। যার দরুন তার দ্বারা একের পর এক ভুল হয়েই চলেছে। একপ্রকার বিক্ষিপ্ত মেজাজে বাড়ি ফিরে মাহাদ। কিন্তু লাবণ্যকে দেখে তার রাগ পড়ে যায়। খাটের কোণায় পিঠ ঠেকিয়ে হাঁটুতে মাথা রেখে লাবণ্য ঘুমন্ত। মাহাদের সাদাটে চোখের মণি লাবণ্যর উপর। নিরেট, স্থির দৃষ্টি কেবল লাবণ্যর মুখ জুড়ে। কমলা রঙের শাড়ির আঁচল সরে উন্মুক্ত কাঁধের উপরিভাগ হতে ডান বাহুর খানিক অংশ। উদরের ভাঁজ যুক্ত অংশ শাড়ি সরে দৃশ্যমান। মাহাদ তীক্ষ্ণ নজরে চেয়ে দেখল গুনে গুনে তিন তিনটে ভাঁজ পড়েছে।
মেঝেতে পড়ে থাকা টর্চের আলো সিলিং ছুঁয়ে। টেবিলের সম্মুখে অর্ধ ভাঙা কাঁচের গ্লাস টর্চের আলোতে স্পষ্টতই। মাহাদের কপালে দৃঢ় ভাঁজ পড়ে। ঈগল চোখে পরখ করে পুরো কামরা। টেবিলের উপর পড়ে থাকা ঔষধের পাতা তার ধারালো, তীক্ষ্ণ চোখের নজর এড়ায় না। লাবণ্যর পানে কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টি ফেলে গ্লাস ভর্তি পানি ছুঁড়ে মারল লাবণ্যর মুখে। ঘুমন্ত লাবণ্য যেন কিছুটা হকচকিয়ে উঠে অকস্মাৎ পানি পড়াতে। হঠাৎ ঘুম ভাঙাতে মস্তিষ্ক নিশ্চল, চোখের অবুঝ চাহনি। এলোমেলো চুল ভিজে ঘাড়ে লেপ্টে। মুখের পানি গড়িয়ে ভিজতে লাগে গলদেশ, ব্লাউজের উপরিভাগ। পাতলা, মিহি ব্লাউজ ভিজতেই স্পষ্ট হয় আড়ালে থাকা বক্ষ বিভাজন। মাহাদ সেদিকে দৃষ্টি রেখে রাশভারী স্বরে প্রশ্ন ছুঁড়ে লাবণ্যকে।
– কখন খেয়েছ? তোমাকে মানা করা হয়নি? আমার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করো কোন সাহসে? এক মিনিট, আমি তো তোমাকে কোনো টাকা দিয়ে যাইনি। ইনফ্যাক্ট তোমার কাছেও কোনো টাকা নেই। তাহলে ট্যাবলেট কিনলে কীভাবে? এই বাড়ির বাহিরে গিয়েছিলে তুমি?
লাবণ্য নিশ্চুপ। এখনও অবুঝ চোখে তাকিয়ে আছে। মাহাদের মেজাজ বিগড়ে গেল। তেড়ে গেল লাবণ্যর দিকে। দু হাত মুষ্টিবদ্ধ করে কঠিন গলায় বলল,
– কথা বলছ না কেন? চুপ করে থেকো না। জবাব চাই আমার। ভেবো না তুমি চুপ করে থাকলে কিছু জানতে পারব না আমি। এসব জানা আমার জন্য অসম্ভব কিছু নয়।
লাবণ্যকে ভীত দেখাল খানিকটা। দৃষ্টি লুকানোর আপ্রাণ চেষ্টা। তোতলানো স্বরে কেবল বলে,
– আববব্ আমি বাইরে কোথাও যাইনি।
– তাহলে ঘুমের ট্যাবলেট কে দিল?
– দারোয়ান চাচা।
– তুমি চেয়েছিলে?
– ঘুম আসে না তো আমার।
বাচ্চামো কণ্ঠস্বর, অবোধ চাহনি, যেন বুঝহারা কোনো শিশু। এমন চাহনিতে যে কারোর মায়া লাগার কথা, তবে মাহাদের বিন্দুমাত্র মায়া লাগল না লাবণ্যর অসহায়ত্বে। বরং এবার কর্কশ গলায় চিল্লিয়ে উঠে,
– তাই বলে তুমি দারোয়ান চাচার কাছে ঔষধ চাইবে? উফ্ লাবণ্য, তোমাকে কী করব বলো তো?
– তোমাকে বলেছিলাম আমি ঘুমাতে পারি না। ঘুমের ট্যাবলেট এনে দাও। তুমি দাওনি বলেই তো দারোয়ান চাচার থেকে চাইতে হলো। আমার দোষ নেই।
– তোমার দোষ নেই? আর একটা কথা বললে খুন করব বলে দিলাম।
– আচ্ছা আর কথা বলব না। চাচার কাছেও ঔষধ চাইব না। ঠিক আছে?
– মনে থাকবে তো?
– থাকবে।
– এখানে ঘুমাচ্ছিলে কেন?
– চোখ লেগে গিয়েছিল।
– তাই বলে এভাবে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে যাবে।
– হু।
– কাল তোমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।
– কীসের অ্যাপয়েন্টমেন্ট? আমি কোথাও যাব না।
– দেখো লাবণ্য, তোমার কী মনে হচ্ছে না ইদানিং তুমি অস্বাভাবিক আচরণ করছ?
– না।
মাহাদ চোখ রাঙিয়ে তাকাল। এই মেয়ে তার মাথা খারাপ করে ছাড়বে অতি সত্বর। বলে কিনা অস্বাভাবিক আচরণ করছে না। এসব কী তার স্বাভাবিক আচরণ মনে হচ্ছে।
– তাহলে বলতে চাইছ তুমি শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ?
– হ্যাঁ।
– তাহলে কালকে থেকে প্রোপার ঘুম দিবে। খাওয়া দাওয়ায় যেন কোনো খামতি না দেখি। হুটহাট অন্যমনস্ক হয়ে আজেবাজে চিন্তা করা যাবে না।
– আচ্ছা।
কয়েক দিন যাবৎ লাবণ্যর অদ্ভুত আচরণ মাহাদ দেখেও নজর আন্দাজ করে। মেয়েটা কেমন ভাবনায় বুঁদ হয়ে থাকে, মেজাজের বদল হয় অযথাই। বিষণ্ণতা, উদাসীনতা আঁকড়ে ধরেছে একপ্রকার।
_
কিছুটা আনমনা হয়ে খাবার শেষে সবকিছু গুছিয়ে রাখছিল লাবণ্য। এর মাঝে সুরভীর কথা শুনে তার হাত থেমে গেল।
– বুশরা দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
পরক্ষণেই মুখ কিছুটা বিকৃত করে বলল,
– ছোটো ছোটো বাচ্চা মেয়েগুলো বিয়ে করতে না করতেই মা হয়ে যাচ্ছে। আর এদিকে দেখো, মনে হয় না এ জনমে আমার নাতিপুতির মুখ দেখা হবে।
সুরভী উঠে গেল। থেমে রইল লাবণ্যর হাত, থমকে রইল সে। সুরভী এমনিতেই লাবণ্যকে দেখতে পারে না। বিয়ের পূর্ব থেকে লাবণ্যকে তার অপছন্দ। আগে যা ও একটু আধটু সহানুভূতি ছিল লাবণ্যর প্রতি, বিয়ের পর যেন তা পুরোপুরিই শেষ। লাবণ্যর প্রতি সুরভীর ব্যবহার কারো অজানা নয়। নিজের পূত্র বধূর এমন নিন্দনীয় আচরণে মাহাদের দাদি বড়ই রুষ্ট। মাহাদের দাদি অতিষ্ঠ হয়ে একপর্যায়ে লাবণ্যকে বলেছিল, শুনো নাতবৌ তাড়াতাড়ি বাচ্চা নিয়ে নাও। দেখবে বাচ্চা এলে সুরভী আর এমন মুখ ফিরিয়ে থাকবে না।
প্রত্যাশার ক্ষীণ আলো দেখতে পেলে মানুষ কাল ক্ষণ বাছবিচার না করে সেই পথই ধরে। বহুদিন ধরে পথ ভোলা পথিককে নিজ গন্তব্য পেয়েও যদি নিরাশ হতে হয়, মুখ থুবড়ে পড়তে হয়, তবে গন্তব্যে পৌঁছানোর পূর্বেই সে উদ্ভ্রান্তের ন্যায় বেদিশা হয়ে হতাশায় মরে। আশাহত, ভঙ্গুর হৃদয়ে কেবল আঁকড়ে ধরে ব্যর্থতা।
লাবণ্যর ক্ষেত্রেও যেন তেমনই হয়েছে। ধৈর্য ধারণ করতে গিয়ে সে বরাবরের মতোই বড্ড অধৈর্য। নৈরাশ্যে নিমগ্ন হৃদয় কেবল বিভ্রান্ত, কান্নায় ভেঙে পড়ে আড়ালে।
মাহাদ ঘুমিয়ে ছিল। কান্নার শব্দে তার ঘুম ভাঙে। কেউ মৃদু স্বরে কান্না করছে। ঘাড় বেঁকিয়ে উল্টো ফিরে চোখ মেলে চাইল। ঘর জুড়ে অন্ধকার। আবছা আলোয় কেবল দেখল ফ্লোরে জায়নামাজ বিছিয়ে কেউ তাতে মাথা ঠেকিয়ে রেখেছে। কয়েক পল তাকিয়ে থেকে অর্ধ নগ্ন দেহে উঠে দাঁড়ায়। নিশ্চুপে, নিঃশব্দে কান্নারত রমণীকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
– কাঁদতে নিষেধ করেছিলাম। স্বামীর কথার অবাধ্য হয়ে খোদার কাছে আর্জি জানালে তা কবুল হবে ভেবেছ?
লাবণ্য কিছু বলল না। তার ভেতরের সমস্ত আর্তনাদ চোখের কোটর ছাপিয়ে গড়াতে লাগে। মাথা তুলতেই মাহাদ উল্টো ঘুরিয়ে পেট জড়িয়ে শুয়ে পড়ল।
– মায়ের কথায় কাঁদলে হবে? মায়ের বয়স হয়েছে। এখন কথা একটু এদিক সেদিক হবেই। মা যাই বলুক না কেন কান্না করা যাবে না।
– আমাকে এমন জঘন্য শাস্তি কেন পেতে হলো? আর কত শাস্তি পেতে হবে আমাকে মাহাদ ভাই। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। এত অসহ্য লাগে আমার। আমার পাপ মার্জনা হবে না? আমার মতো পাপিষ্ঠ কেউ নেই।
– পৃথিবীতে সকলেই কোনো না কোনো পাপে লিপ্ত! তোমার থেকেও নিকৃষ্ট পাপিষ্ঠ আছে পৃথিবীতে। যাদের ভেতরে সামান্য অনুশোচনা নেই, অন্তর কলুষিত! সবর করো, তোমার কান্না বৃথা যাবে না।
– আর কত ধৈর্য ধরব। আমি আর পারছি না। এমন শাস্তি আমি চাই না। আমি সত্যি অনুতপ্ত, তুমি আমাকে বিশ্বাস করো তো মাহাদ ভাই?
কান্নার তোড়ে শব্দেরা অস্পষ্ট, এলোমেলো। কথা কেমন জড়িয়ে আসছে। মনস্তাপে মস্তিষ্ক নিশ্চল, অসাড় দেহে মাহাদকে আঁকড়ে ধরে। মাহাদের নিরেট চাহনি নিস্পৃহ। তাকে আপাতত দৃষ্টিতে শান্ত দেখালেও ভেতরে যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে। অঝোরে কাঁদতে থাকা রমণীর কান্না দেখা তার পক্ষে অসম্ভব। ক্রন্দনরত এই রমণীকে কীভাবে আশ্বস্ত করলে তার কান্না থামবে?
_
দীর্ঘদিন ধরে প্রেগন্যান্সি প্ল্যানিং করলেও ফলাফল শূন্য! ডাক্তার দেখিয়েও তেমন কোনো সুরাহা মিলে না। তাদের দুজনের কারোরই তেমন কোনো সমস্যা নেই। লাবণ্য, মাহাদ ভাবনাহীন অপেক্ষারত। ধৈর্যহারা হয় না এমন সময়েও। বছর কয়েক বাদে লাবণ্য অনুভব করে নিজের উদরে বেড়ে উঠা অস্তিত্বকে। তবে তাকে স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য হয়ে উঠেনি হতভাগা রমণীর। মিসক্যারেজ হয় লাবণ্যর। অনাগত সন্তানের দেখা হলো না এ ধরণী, তার মায়ের নিষ্ঠুর অশ্রুর বিষাদের রেখা!
সমস্ত আশা আকাঙ্ক্ষা নিমিষেই নিঃশেষ। নতুন অতিথির অপেক্ষায় থাকা দম্পতি হঠাৎ করেই কেমন ভেঙে পড়ে। গুমরে গুমরে মরতে লাগে নীরবে নিভৃতে। গর্ভপাতের পরে অস্বাভাবিক রক্তপাত, শারীরিক দুর্বলতা, ক্লান্তির থেকেও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত লাবণ্য। অদৃশ্য রক্তক্ষরণ ঘটে তার ভেতর। নিজের সত্তাকে দেখতে না পাওয়ার এক অপ্রাপ্তি যেন গলায় কাঁটা হয়ে বিঁধে প্রতিনিয়ত।
সেই থেকে লাবণ্যর দুরবস্থা স্বচক্ষে দেখা মাহাদের। নিজ অংশ ছিন্নই লাবণ্যকে অধৈর্য করতে যথেষ্ট। মাতৃত্বের স্বাদ পেতে লাবণ্য যেন মরিয়া। বিধ্বংস দশায় সুরভীর অবাঞ্ছিত কথা সহনীয় নয়। লাবণ্যর মনে হচ্ছে পূর্বে করা কাজের জন্য তার এ শাস্তি। মেয়েটা একটু একটু করে নিজেকে কেমন গুটিয়ে নেয়। দূরত্ব বাড়ে সকলের সাথে। একলা একাকী সময় কাটতে লাগে। তবে কেউ একজন যেন তার সঙ্গ ছাড়ে না। প্রতিটা মুহূর্তে তাকে আগলে রেখেছে, সেই প্রথম থেকেই।
দ্বিধাদ্বন্দ্ব লাবণ্য মাথা রাখে মাহাদের বুকে। দু হাতে জড়িয়ে ধরতে যেন তীব্র সংকোচ। তবুও কোনোকিছু না ভেবে মাহাদের সাথে মিশে গেল। লাবণ্যর শ্বাস ক্ষীণ হতে লাগে। উন্মুক্ত নেত্র পল্লব আস্তে ধীরে বুজে আসে। যেন ধীরে ধীরে পৌঁছে যাচ্ছে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে, মরণাপন্ন অবস্থায় কেবল কান্নার শব্দ!
_
চিরাচরিত নিস্তব্ধতা কাটিয়ে লন জুড়ে কলরবের গুঞ্জন। স্লিভলেস ব্লাউজের সাথে জর্জেটের শাড়ি, ফর্সা নারী দেহের অর্ধেকাংশ দৃশ্যমান। মাঝবয়সী নারীরা গোল হয়ে বসে আছে লনের এক সাইডে। তাদের হাসি তামাশা থেমে যায় কারো শান্ত শীতল কণ্ঠে।
– আপনার বাড়িতে এতগুলো মেইড থাকতে বুশুর কেন কাজ করতে হবে? যেখানে আপনি নিজে পায়ের উপর পা তুলে খাচ্ছেন, সেখানে আমার ওয়াইফকে অর্ডার দেওয়ার আপনি কে? আপনাকে অধিকার কে দিয়েছে?
জিদানের অনাহুত আগমন, অযাচিত কথাবার্তায় মিসেস সারওয়ার অপমান বোধ করে ভীষণ। ঘাবড়ে যাওয়ার ছাপ নেই। বরং জিদানের শান্ত কণ্ঠের বিপরীতে তেতে উঠে একপ্রকার।
– মুখ সামলে কথা বলো জিদান। কী সব ম্যানারলেসদের মতো ব্যবহার করছ তুমি!
জিদান আমলে নেয় না কোনো কথা। তার ভাবভঙ্গি এমন যে এই মুহূর্তে সে ছাড়া আর কেউ কিছু বলেইনি। শান্ত গলায় হুঁশিয়ারি করে।
– আমার আড়ালে বুশুকে দিয়ে এটা ওটা করানো বাদ দিন। জিদান সারওয়ারের ওয়াইফ ও, আপনার ব্যক্তিগত দাসী বানানোর বৃথা চেষ্টা থেকে বিরত থাকুন। নয়তো ভালো হবে না। আর আমি আমার খারাপ রূপটা আপনাকে দেখাতে চাইছি না মোটেও।
– কী করবে তুমি? আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে আমার সাথেই সমানে অভদ্রতা করে যাচ্ছ। খাচ্ছ তো বাবার টাকায়। বউকে খাওয়ানোর সামর্থ্য অবধি নেই। আবার বলছ, তোমার বউকে দিয়ে যেন কাজ না করানো হয়?
– বুশু আপনার হাজব্যান্ডের নয় আমার ইনকামে চলে। তাই পরেরবার থেকে ওকে দিয়ে কাজ করানোর আগে দু বার ভাববেন। হ্যাল্পিং হ্যান্ড আছে বাড়িতে, আপনাদের কার কী প্রয়োজন তাদের বলুন।
বলেই জিদান বুশরার হাত ধরে বেরিয়ে গেল। বুশরা একবার জিদানের ধরে রাখা তার হাতের দিকে তাকাচ্ছে তো আরেকবার জিদানের মুখাবয়বে গভীর দৃষ্টি ফেলছে। তার ভেতরে অদ্ভুত এক সুখানুভূতি আলোড়ন সৃষ্টি করে।
বুশরাকে তেমন একটা পছন্দ না মিসেস সারওয়ারের। মিডেল ক্লাস ফ্যামেলির একটা মেয়ে এই বাড়ির একমাত্র ছেলের বউ সেটা তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। আক্রোশে সকলের অগোচরে বুশরাকে দিয়ে এটা ওটা করাবে। জিদানের কানে এমন কথা গেলেও সে আমলে নেয়নি। আজ স্বচক্ষে দেখার পর নিজের রাগ দমাতে পারেনি। সংখ্যায় দশ, বারোজন হবে। এতজনের জন্য কিনা একলা হাতে বুশরাকে স্ন্যাকস বানাতে হবে। তাও এমন অবস্থায়। যেখানে সে তার বাচ্চার মাকে রাণীর মতো রাখে সেখানে এই মহিলা তারই বাড়িতে তার বউকে খাটিয়ে নিজের ক্ষোভ মেটাতে চাইছে।
– ওঠো।
জিদানের কথায় ধ্যান ভঙ্গ হয় বুশরার। অসহায় চোখে সামনে তাকাল। বুশরার চাহনি দেখে জিদান আড়ালে হাসে। থমথমে গলায় বলল,
– কাঁদতে হবে না। প্রাইভেট কারে যাব না আমরা।
– কীসে করে যাব তাহলে?
– মেট্রোতে।
বুশরা পারে না খুশিতে লাফিয়ে উঠতে। বাসে চড়তে পারে না সে। প্রাইভেট কার, হাইসে উঠলেও বমি করবে। আগে কোথাও গেলে বাস, প্রাইভেট কার এড়িয়ে চলত। কিন্তু বিয়ের দিন তো আর প্রাইভেট কারে না উঠে উপায় নেই। যার দরুন তার নাজেহাল অবস্থা হয়েছিল, পুরো রাস্তা জার্নি করে নেতিয়ে পড়েছিল একেবারে। জিদান সে দিকে খেয়াল রেখেছে ভেবে বুশরা আপ্লুত, খুশিতে আত্মহারা।
দুদিন আগেই বুঝতে পেরেছে। প্রেগন্যান্সি টেস্ট করিয়েই শিওর হয়েছে একেবারে। এমন একটা খুশির মুহূর্তে বাবা মার কাছে যেতে পারবে না শুনেই দুদিন ধরে তার কান্না। জিদানকে শেষমেশ রাজি হতে হলো। রাজি না হয়েই বা উপায় কী? নয়তো দেখা যাবে কেঁদেকেটে এই মেয়ে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে।
_
উঠে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। দু কদম এগোতেই ধপ করে পড়বে মেঝেতে। পুরো ঘরের মেঝেতে ফোম ছড়িয়ে ছিটিয়ে, ঘরের এক পাশে ম্যাট্রেস বিছানো। সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখলেও হঠাৎ যদি পড়ে যায়, সেই আতঙ্কে আভিরা অস্থির। স্থির হতে পারে না এক মুহূর্তের জন্যও। ছেলে দুটো এখন তার উঠে দাঁড়াতে পারে। যদিও দাঁড়াতে দাঁড়াতেই ধুপ করে পড়ে যাবে। তবুও উল্টে পড়লে মাথায় আঘাত লাগবে। এমনকি মাথা ফেটে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এ ভয়েই আভিরা নাওয়াজকে বলে পুরো ঘরে এমন করিয়েছে।
পানির ঝপঝপ শব্দ ভেসে আসছে সমানতালে। পানির ঝাপটায় গায়ের জামা ভিজে একাকার। তবুও যেন তার উচ্ছ্বাসের শেষ নেই। মায়ের জামা ভিজাতে পেরে উল্লাস যেন দ্বিগুণ। হাত পা নাড়িয়ে ঝপঝপ শব্দ করেই যাচ্ছে অনবরত। তার খিলখিল হাসির ফলে বাম গালের গর্ত দৃশ্যমান। ছোটো ছোটো চোখ দুটো যেন আরও ক্ষুদ্র লাগছে। নাযীরের চোখ দুটো ছোটো ছোটো হলেও নুরেনের চোখ কিছুটা বড়ো আকৃতির। নাওয়াজের চোখের ন্যায় নাযীরের চোখ, বাদামি রঙের। আভিরার কাছে বেশ আকর্ষণীয় লাগে ছেলের দুটো চোখ। আভিরা ঠেসে ছেলের গালে চুমু খেতেই হাত পা ছুড়তে থাকা নাযীরের মুখের রঙ পাল্টে যায়। আভিরারও হাত থেমে গেল। মলিন হয়ে এলো হাস্যোজ্জ্বল মুখ। ছেলেটা তার গালে চুমু খাওয়া একেবারেই পছন্দ করে না। চুমু খেলেই ঠোঁট ভেঙে কেঁদে ফেলে। ছেলে তার হয়েছে অবিকল বাবার মতো। সেজন্যই তো হাসির ছিটেফোঁটা দেখা যায় না। তবে গোসলের সময় আনন্দের সীমা থাকে না। পুরো ভিন্ন এক নাযীরের দেখা মিলে তখন।
আভিরা ছেলেকে শুয়ে গায়ে বেবি লোশন মেখে দিল। পাতলা জামা পরিয়ে মাথার চুল আঁচড়ে দেয়। নাযীরের মাথার চুল বেশ ঘনভাবে উঠেছে। আভিরা ছেলের চুল প্রায় হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করে। সিল্কি হালকা লালচে চুল দেখতে দারুণ লাগে, ভিনদেশি একটা লুক।
শক্তপোক্ত দু হাতে আবদ্ধ হতেই আভিরা চোখ রাঙিয়ে তাকাল। খানিকটা চাপা স্বরে হিসহিসিয়ে বলল,
– ছাড়ুন।
শিথিল হওয়ার পরিবর্তে হাতের বাঁধন আরও দৃঢ় হলো। আভিরা মোচড়ানো শুরু করে ছাড়া পাওয়ার জন্য। তার শরীর ভেজা। ভেজা কাপড়ে থাকতে পারে না সে। কেমন গা ঘিনঘিন করে। এমন অবস্থায় আবার কারো হাতের বাঁধনে আটকা থাকা যায়।
ঘাড়ের ধারের চুল সরিয়ে আলতো স্পর্শ আঁকে নাওয়াজ। আভিরা কেঁপে ওঠে। ভারসাম্য রাখতে খামচে ধরে নাওয়াজের হাত। দুজনে আরও ঘনিষ্ঠ হতে লাগে।
– নুরেন কোথায় আঞ্জুম?
আভিরা কিছুটা সরে দাঁড়ায়। আটকে আসা শ্বাসে জড়ানো কণ্ঠে বলল,
– মায়ের রুমে।
– খাইয়েছেন ওদের?
– হ্যাঁ। নুরেনকে একটু নিয়ে আসুন না। সেই যে সকালে ঘুম থেকে উঠেছে, তারপর আর ঘুমায়নি।
– মায়ের কাছে কিছুক্ষণ থাকুক। নিয়ে আসব।
কথার মাঝেই ইয়াজমীনের চিৎকার ভেসে আসে। হঠাৎ চিৎকারে আভিরার ভেতর ছলকে ওঠে। দৌড়ে গেল ইয়াজমীনের ঘরে। নুরেন ঠোঁট উল্টে কাঁদছে। ভাঙা ভাঙা স্বরে কী যেন বলার প্রচেষ্টা। ছেলের এ হাল দেখে ঝরঝর করে পানি পড়তে লাগল আভিরার দু চোখ বেয়ে। নুরেনের ঠোঁট কেটে রক্ত বেরোচ্ছে। খাটের সাইডে বাড়ি লেগেছিল। ইয়াজমীন যে ধরবে সে সুযোগটুকু পায়নি। তার আগেই নরম শরীরটাতে শক্ত আঘাত পেয়ে বসে।
নাওয়াজ আলতো হাতে ছেলের ঠোঁটের কোণার রক্ত পরিষ্কার করে দেয়। আভিরাকে যতটা না অস্থির লাগছে নাওয়াজকে তার থেকে বেশি শান্ত দেখাচ্ছে। বাচ্চারা এই বয়সে এমন আঘাত পাবেই। এসবের থেকেও মারাত্মক জখম হয়।
ছেলের রক্তিম ঠোঁটের দিকে চেয়ে নাওয়াজ নিজের অর্ধাঙ্গীর দিকে তাকায়। কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটার অবস্থা করুণ। নাওয়াজ আলগোছে আগলে নেয় অর্ধাঙ্গীকে। চুমু আঁকে স্ত্রীর কপালে। দৃঢ় স্বরে বলে,
– এভাবে কাঁদবেন না। আপনাকে কান্না করা মানায় না।আপনি সামান্য কেউ নন, আঞ্জুম। আমার শেহজাদাদের মা আপনি। নিজেকে শক্ত করুন। আর কখনোই কাঁদবেন না। ছেলেদের সামনে তো ভুলেও নয়। আপনাকে দেখেই তারা শিখবে। মা এমন ছিঁচকাদুনে হলে ছেলেরা কেমন হবে আমার সন্দেহ হচ্ছে।
অভিমানী আভিরা দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। এমন একটা মুহূর্তে এসব কথা না বললে নয় কী! নাওয়াজ শব্দ করে হাসতে লাগে। হঠাৎ দরদ মেশানো কণ্ঠে বলে উঠে,
– যদি সাধ্য থাকত, তামাম দুনিয়ার সুখ এনে আপনার চরণে ফেলতাম!

