#প্রফেসরের_জেদিলতা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৬
বিকেলের নরম সোনাঝুরি রোদ তখন খান বাড়ির ছাদটাকে এক মায়াবী আলোয় ভরিয়ে দিয়েছে। ঈনশু যখন আয়াজের চওড়া বুকে মুখ লুকিয়েছিল, তখন তার মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল বুঝি এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু সেই পরম শান্তির মাঝেও তার স্বভাবজাত জেদি আর চতুর মনটা পুরোপুরি দমে যায়নি। সে একটু নড়েচড়ে উঠে আয়াজের বুক থেকে মুখ তুলল। তার গাল দুটো এখনো লজ্জায় লাল হয়ে আছে, কিন্তু চোখে সেই চিরচেনা দুষ্টুমির ঝিলিক।
সে আয়াজের পাঞ্জাবির বোতামটা আঙুল দিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “আচ্ছা প্রফেসর সাহেব, আপনি যে এত বড় বড় কথা বলছেন আমি আপনার খাঁচায় বন্দি, আপনার মনে আমি রাজত্ব করি এসব কি শুধু মুখের কথা? নাকি কোনো প্রমাণও আছে? আমি কিন্তু এক নাম্বারের চতুর মেয়ে, সহজে কাউকে বিশ্বাস করি না!”
আয়াজ ঈনশুর এই হুট করে মুড বদলে ফেলা আর জেদি চাউনি দেখে একচোট হাসলেন। চশমা ছাড়া তাঁর চোখ দুটো এই মুহূর্তে এতটাই সম্মোহনী যে ঈনশু চাইলেও নিজের চোখ সরিয়ে নিতে পারছিল না। আয়াজ রেলিংয়ে এক হাত রেখে ঈনশুর মুখের আরও কাছে ঝুঁকে এলেন। তাঁর উষ্ণ নিঃশ্বাস ঈনশুর কপালে আছড়ে পড়তেই ঈনশুর বুকটা আবার দুরুদুরু করে কাঁপতে লাগল।
“প্রমাণ চাও, মিসেস জেদিলতা?” আয়াজ নিচু, মায়াবী অথচ চূড়ান্ত এক পুরুষালি স্বরে বললেন, “ড. আরশাদ খান আয়াজ কখনো প্রমাণ ছাড়া কোনো থিওরি পাস করে না। এই সেদিন মাঝরাতে তুমি যখন রনির ওপর রাগ করে কাকার হাত ধরে কাঁদছিলে, আর কাকা যখন আমাদের বিয়ের কথা বললেন আমি কিন্তু চাইলে এক সেকেন্ডে ‘না’ বলে দিতে পারতাম। কাকা আমার কথা ফেলতেন না। কিন্তু আমি তা করিনি। উল্টো মনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেছি যে, অবশেষে আমার এই একগুঁয়ে জেদিলতা নিজের পায়ে হেঁটে আমার ডেরায় চলে এসেছে। এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী দেব বলো?”
ঈনশু একটু দমে গেল, কিন্তু তার ভেতরের ভন্ড রূপটা তাকে হার মানতে দিল না। সে মুখটা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, “হুহ! তার মানে আপনি আগে থেকেই ওত পেতে ছিলেন? আপনি আস্ত একটা ধুরন্ধর শিকারী, আয়াজ ভাই! দুনিয়ার সামনে কত বড় সাধু সেজে থাকেন, আর মনে মনে এত প্যাঁচ?”
“আবার ভাই?” আয়াজ এবার ঈনশুর কোমরে রাখা হাতটা একটু শক্ত করে তাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলেন, তবে তাঁর এই শক্ত করে ধরার মধ্যেও ছিল এক তীব্র শালীনতা আর গভীর সম্মান। তিনি ঈনশুর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “কয়বার বলেছি এই নামে আর ডাকবে না? ঘরে আর ছাদে আমি তোমার স্বামী, ঈনশু। আর প্যাঁচের কথা বলছ? একটা চরম জেদি আর চতুর মেয়েকে নিজের মনের খাঁচায় বন্দি করতে হলে একটু-আধটু প্যাঁচ তো জানতেই হয়। ওটাকে সাইকোলজির ভাষায় বলে ‘লাভিং ট্যাকটিক্স’।”
ঈনশু লজ্জায় আর কোনো যুক্তি খুঁজে পেল না। সে আয়াজের বুকের ওপর নিজের ছোট হাত দুটো রেখে আলতো করে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করল, “ছাড়ুন তো! কেউ দেখে ফেললে সত্যি কেলেঙ্কারি হবে। সায়েব যদি কোনোভাবে আমাদের এই অবস্থায় দেখে, তবে ও সারাজীবন আমাদের ব্ল্যাকমেইল করবে!”
আয়াজ এবার হাসতে হাসতে ঈনশুকে ছেড়ে দিলেন। বুকপকেট থেকে চশমাটা বের করে চোখে পরে আবার সেই চেনা গম্ভীর প্রফেসরের রূপ ধারণ করলেন। তিনি ছাদের দরজার দিকে চোখ রেখে বললেন, “সায়েবের কথা যখন বললে, তখন একটা কথা মনে পড়ল। ওর ওই বাতিল হওয়া থিসিস পেপারটা কিন্তু আজ রাতের মধ্যে রি-সাবমিট করার লাস্ট ডেট। ও যদি আজ বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে রাত করে ফেরে, তবে কাল সকালে আমার ডিপার্টমেন্টে ওর কপালে বড়সড় ঝড় আছে।”
ঈনশু হেসে ফেলল। এই মানুষটা এক লহমায় কেমন করে রোমান্টিক প্রেমিক থেকে কড়া শিক্ষক হয়ে যায়, তা তার মাথায় ঢোকে না। সে রেলিং থেকে সরে এসে বলল, “আপনি আসলেই একটা অদ্ভুত মানুষ। চলুন, নিচে যাই। আম্মু আবার ভাববে নতুন বউ ছাদ থেকে লাফ দিল নাকি!”
বিকেলের পর সন্ধ্যা নামতেই খান বাড়িতে আবার চেনা ব্যস্ততা ফিরে এল। শাপলা বেগম আর সুমি বেগম রান্নাঘরে রাতের রান্নার তদারকি করছেন। ইব্রাহিম খান আর ইসমাইল খান ড্রয়িংরুমে বসে টিভির খবর দেখছেন।
ঠিক তখনই সায়েব বাইরে থেকে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকল। তার চুলগুলো উসকোখুসকো, পরনের শার্টের হাতা গুটানো। সে সোজা ড্রয়িংরুমে এসে তার বাবার পাশে বসে ধপ করে সোফায় হেলান দিল।
“কী রে সায়েব? এত হন্তদন্ত হয়ে কোত্থেকে আসলি? পড়াশোনার কোনো খবর আছে?” ইসমাইল খান কড়া চোখে নিজের ভাতিজার দিকে তাকিয়ে বললেন।
সায়েব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বড় আব্বু! পড়াশোনার কথা আর বলো না। তোমার ওই বড় ছেলে, মানে আমার নতুন দুলাভাই ক্লাসে এমন কড়াকড়ি শুরু করেছে যে আমাদের বাঁচাই দায়! এই যে দেখো, আজ দুপুর ১২টার মধ্যে একটা থিসিস জমা দেওয়ার কথা ছিল, উনি সেটা এক মিনিট লেটের জন্য বাতিল করে দিয়েছেন! এটা কোনো মানুষের কাজ বলো?”
ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছিল ঈনশু আর তার পেছনেই আসছিলেন আয়াজ। সায়েবের এই নালিশ আয়াজের কান এড়াল না। আয়াজ ড্রয়িংরুমে ঢুকে সোফার একপাশের সিটে বসলেন, পা-টার ওপর পা তুলে চশমাটা ঠিক করতে করতে অত্যন্ত শান্ত ও গম্ভীর গলায় বললেন, “সায়েব, নিয়মানুবর্তিতা একটা ছাত্রের জীবনের সবচেয়ে বড় গুণ। তুমি যদি বারোটার ডেডলাইন বারোটা একে পার করো, তবে সেটাকে অবহেলা বলা হয়। আর অবহেলার কোনো স্থান আমার ডিপার্টমেন্টে নেই।”
সায়েব ওমনি ঈনশুর দিকে তাকিয়ে কান্নার অভিনয় করে বলল, “ঈনশু! তুই একটু তোর বরের কানে পানি দে না রে! দেখছিস ও ঘরের মধ্যেও কেমন লেকচার ঝাড়ছে? তুই তো এক নাম্বারের জেদি, তোর জেদের কাছে তো পুরো দুনিয়া হারে, ওনাকে একটু লাইনে আন!”
ঈনশু ড্রয়িংরুমের সবার সামনে নিজের মেকি নিরীহ ভাবটা ফুটিয়ে তুলল। সে সুমি বেগমের পাশে গিয়ে বসে খুব মিষ্টি গলায় বলল, “সায়েব, আয়াজ… মানে উনি তো ঠিকই বলেছেন। তুই পড়াশোনায় ফাঁকিবাজি করিস বলেই তো উনি তোকে শাসন করেন। বড় আম্মু, তুমিই বলো, সায়েবের কি একটু পড়াশোনা করা উচিত না?”
সুমি বেগম ঈনশুর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “একদম ঠিক বলেছিস মা। সায়েবটা দিন দিন বখাটে হয়ে যাচ্ছে। আয়াজ, তুমি ওকে একদম ছাড় দেবে না। প্রজেক্ট জমা না দিলে ফেল করিয়ে দাও!”
সায়েব কপালে হাত দিয়ে বলল, “হায় রে ভাগ্য! কাল রাত থেকে যে বোন আমার সাথে মিলে বাজি ধরত, সে আজ প্রফেসরের পাশে বসে আমার বিরুদ্ধেই ওকালতি করছে! একেই বলে ঘরের শত্রু বিভীষণ! তোরা দুই ভাইবোন মিলে আমার পকেট আর ক্যারিয়ার দুটোই শেষ করবি!”
ড্রয়িংরুমের সবাই সায়েবের এই ছদ্ম-কান্না দেখে হেসে উঠলেন। ঈনশু আড়চোখে আয়াজের দিকে তাকাল। আয়াজও পেপারের আড়াল থেকে ঈনশুকে দেখে একটা চোখ টিপলেন। এই গোপন ইশারাটা শুধু ঈনশুই দেখল, আর তার বুকের ভেতর আবার একটা মিষ্টি তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। সে মনে মনে ভাবল, “বাড়ির সবার সামনে এই লোকটা কত বড় বিচারক, আর আড়ালে গেলেই আস্ত একটা চোর!”
রাতের খাবার শেষ করে সবাই যখন যার যার ঘরে চলে গেল, ঈনশু তখন ড্রয়িংরুমের টেবিলটা গুছাচ্ছিল। শাপলা বেগম আর সুমি বেগম আগেই ওপরে চলে গেছেন। সায়েবও নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে, হয়তো প্রফেসরের ভয়ে আজ রাতে সত্যি সত্যিই পড়তে বসেছে।
ঈনশু ডাইনিং টেবিলের ওপর থেকে পানির গ্লাসগুলো তোলার সময় হঠাৎ দেখল, টেবিলের এক কোণায় একটা ছোট কাগজ ভাঁজ করে রাখা আছে। কাগজটা বেশ চেনা চেনা লাগল তার। ভালো করে লক্ষ্য করতেই তার মনে হলো, এটা তো শওকত ভাই যেখানে বসেছিলেন, ঠিক তার পাশেই পড়ে ছিল।
ঈনশু কৌতূহলবশত কাগজটা হাতে নিয়ে খুলল। কাগজের ভেতরে কাঁচা হাতের লেখায় কিছু একটা লেখা আছে। লেখাটা পড়তেই ঈনশুর পুরো শরীর রাগে আর ঘৃণায় শিউরে উঠল।
সেখানে লেখা:
“ঈনশু, তুমি ভাবছ ওই গম্ভীর প্রফেসরের গলায় মালা দিয়ে তুমি খুব নিরাপদে আছ? তোমার এই রূপ আর এই জেদ ওই খড়খড়ে শিক্ষকের জন্য নয়। রনি তো একটা বোকা ছিল, তাই তোমাকে চিনতে পারেনি। কিন্তু আমি তোমাকে খুব ভালো করেই চিনি। খুব শীঘ্রই আমি আবার আসব, আর তখন তোমার এই জেদ আমি কেমন করে ভাঙি, সেটা তুমি নিজেই দেখবে। তোমার ওই বর তোমাকে আমার হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না।”
ঈনশুর হাত দুটো কাঁপতে লাগল। শওকত লোকটা যে এত বড় একটা নিচ আর নোংরা চরিত্রের, সে ভাবতেও পারেনি। জেবা আপুর মতো একটা সরল মেয়ের স্বামী হয়ে সে নিজের শ্যালিকার দিকে এভাবে নজর দেয়! ঈনশুর ইচ্ছা করল এখনই গিয়ে চিঠিটা বড় আব্বু আর আব্বুকে দেখায়। কিন্তু সে ভালো করেই জানে, কোনো প্রমাণ ছাড়া বাড়ির জামাইয়ের বিরুদ্ধে এত বড় কথা বললে পুরো পরিবারে একটা ঝড় উঠে যাবে। জেবা আপুর সংসারটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে।
সে যখন ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে একা একা কাঁপছিল, ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা শক্ত আর উষ্ণ হাত তার কাঁধের ওপর এসে বসল।
ঈনশু চমকে উঠে পেছনে তাকাল। ড. আরশাদ খান আয়াজ দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি ঈনশুর হাতের কাঁপানো কাগজটা এক টানে নিজের হাতে নিয়ে নিলেন।
আয়াজ দ্রুত চোখ বুলিয়ে চিঠিটা পড়লেন। চিঠিটা পড়ার সাথে সাথেই তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, কপালে একটা নীল রগ ভেসে উঠল। তাঁর ভেতরের সেই ভয়ঙ্কর প্রফেসরের রূপটা, যা দেখে কলেজের বড় বড় গুণ্ডারাও ভয় পায়, তা এই মুহূর্তে বেরিয়ে এসেছে।
ঈনশু ভয় পেয়ে আয়াজের হাতটা ধরে বলল, “আয়াজ… আমি বুঝতে পারছি না শওকত ভাই এমনটা কী করে লিখতে পারলেন! আমরা যদি এটা আব্বুকে বলি, তবে জেবা আপুর জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে। আমি কী করব বুঝতে পারছি না!”
আয়াজ চিঠিটা নিজের পকেটে পুরে নিলেন। তারপর ঈনশুর দুই হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে খুব শক্ত করে ধরলেন। তাঁর হাতের সেই শক্ত বাঁধন ঈনশুকে এক লহমায় শান্ত করে দিল।
আয়াজ ঈনশুর চোখের দিকে তাকিয়ে একদম নিচু, কিন্তু ইস্পাত-কঠিন স্বরে বললেন, “ঈনশু, তুমি কি ভুলে গেছ তুমি কার স্ত্রী? ড. আরশাদ খান আয়াজ শুধু ক্লাসরুমে খাতা কাটে না, নিজের সীমানায় কেউ কুদৃষ্টি দিলে তার হাত কেটে দেওয়ার ক্ষমতাও সে রাখে। এই চিঠিটার কথা বাড়ির কাউকে বলার দরকার নেই। জেবার সংসার ভাঙারও কোনো প্রয়োজন পড়বে না।”
“তাহলে আপনি কী করবেন?” ঈনশু উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল।
আয়াজ এক চিলতে ভয়ঙ্কর অথচ আত্মবিশ্বাসী হাসি দিয়ে বললেন, “আমি আগামীকালই শওকতের গ্রামে যাচ্ছি। ও ভেবেছে ও খুব চতুর, কিন্তু ও জানে না ও কার সাথে পাঙ্গা নিয়েছে। প্রফেসরের স্পেশাল ক্লাস কেমন হয়, তা কাল শওকত নিজের হাড়েমজ্জায় টের পাবে। তুমি শুধু একটা কাজ করবে, ঈনশু।”
“কী কাজ?”
“নিজের এই জেদ আর এই চতুর মনটা শুধু আমার জন্যই জমিয়ে রাখবে। দুনিয়ার কোনো বিষাক্ত ছায়া যেন আমার এই জেদিলতাকে ছুঁতে না পারে, তার জন্য আমি একাই একশো।” আয়াজ ঈনশুর কপালে নিজের ঠোঁট দুটো আলতো করে ছোঁয়ালেন। এই ছোঁয়াটা এবার আর শুধু ভালোবাসার ছিল না, এটা ছিল এক অতন্দ্র প্রহরীর সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি।
ঈনশু আয়াজের বুকে নিজের মুখটা চেপে ধরল। এই মানুষটা বাইরে যতই গম্ভীর আর খড়খড়ে হোক না কেন, তার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক অতন্দ্র বাঘ, যে নিজের ভালোবাসাকে আগলে রাখার জন্য পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে একাই যুদ্ধ করতে পারে। প্রফেসরের এই জেদিলতার গল্পে এবার এক নতুন এবং রোমাঞ্চকর মোড় আসতে চলেছে!
চলবে,,,,,,

