প্রফেসরের_জেদিলতা #আরিবা_নাওশীন #পর্ব_৫

0
2

#প্রফেসরের_জেদিলতা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৫

রাতের ওই ঝুমঝুম বৃষ্টির শব্দ আর আয়াজের সেই মায়াবী শাসনের আবেশ কাটতে না কাটতেই সকালের আলো ফুটল। ঈনশু যখন চোখ খুলল, দেখল বিছানার অন্যপাশটা একদম খালি। আয়াজ ইতিমধ্যে উঠে পড়েছে। মাঝরাত থেকে যে কোলবালিশটা নিচে পড়ে ছিল, সেটা যথাস্থানে পরিপাটি করে রাখা। ঈনশু বিছানায় উঠে বসে নিজের চুলগুলো ঠিক করতে করতে মনে মনে হাসল, “লোকটা আসলেই একটা পারফেক্ট প্রফেসর। সময়ের এক ফোঁটা নড়চড় নেই!”

সে ফ্রেশ হয়ে নিচে নামতেই দেখল ডাইনিং টেবিলে অলরেডি সকালের নাস্তার আসর বসে গেছে। আজ শাপলা বেগম আর সুমি বেগম দুজনেই খুব খুশ মেজাজে আছেন। ইব্রাহিম খান পেপার পড়ছেন আর ইসমাইল খান চায়ে চুমুক দিচ্ছেন।

ঈনশু টেবিলে আসতেই সায়েব ওমনি চোখ টিপে বলল, “কী রে ঈনশু? আজ তো তোকে বেশ শান্ত দেখাচ্ছে। কাল রাতে প্রফেসরের কোনো বিশেষ সাইকোলজি ক্লাস ছিল নাকি?”

ঈনশু টেবিল থেকে একটা পরোটা সায়েবের প্লেটে ছুঁড়ে মে-রে বলল, “আম্মু, দেখেছ? সায়েব সকাল সকাল আমার পেছনে লাগছে। আমি তো কাল রাতে খুব ভালো করে পড়াশোনা করেছি, তাই না আয়াজ ভাই… মানে, উনি জানেন।”

আয়াজ তখন পেপার থেকে চোখ সরিয়ে ঈনশুর দিকে তাকালেন। চশমার আড়ালে তাঁর চোখ দুটোতে এক চিলতে দুষ্টুমি খেলে গেল। তিনি গম্ভীর মুখে বললেন, “হুম, পড়াশোনা ভালোই হয়েছে। তবে সিলেবাসটা বেশ বড়, শেষ করতে আরও অনেক রাতের প্রয়োজন।”

আয়াজের এই দ্ব্যর্থবোধক মন্তব্যে ঈনশুর গাল দুটো মুহূর্তেই টমেটোর মতো লাল হয়ে গেল। সে চট করে চায়ের কাপে মনোযোগ দিল যাতে কেউ তার লজ্জাটা ধরতে না পারে। সুমি বেগম আর শাপলা বেগম অবশ্য এই কথার ভেতরের মিষ্টি রসায়নটা বুঝে মনে মনে বেশ খুশিই হলেন।

ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের দিক থেকে শওকত আর জেবা খেতে এলো। শওকতের মুখে কাল সন্ধ্যার সেই অপমানের পর আজ কেমন একটা থমথমে ভাব। সে আয়াজের দিকে সরাসরি তাকাতে সাহস পাচ্ছিল না, কিন্তু তার চোখ দুটো যে এখনো ঈনশুকে আড়চোখে মাপছে, তা ঈনশু স্পষ্ট বুঝতে পারল।

জেবা টেবিলে বসে বলল, “বড় আব্বু, শওকত বলছিল আজ বিকেলেই আমাদের একটু গ্রামের বাড়িতে যেতে হবে। ওখানে ওর একটা জরুরি কাজ আছে।”

ইসমাইল খান বললেন, “আচ্ছা, কাজ থাকলে তো যেতেই হবে। তবে সাবধানে যেও।”

আয়াজ শওকতের দিকে তাকিয়ে খুব ঠান্ডা কিন্তু স্পষ্ট গলায় বললেন, “যাওয়ার আগে নিজের জিনিসপত্র সব চেক করে নিও শওকত। অন্য কারও জিনিসে বা অন্য কারও সীমানায় যেন ভুল করেও হাত না পড়ে, সেটা খেয়াল রাখা ভালো।”

আয়াজের এই ডাবল মিনিং কথার অন্তর্নিহিত হুমকিটা শওকত ঠিকই বুঝল। সে একটা শুকনো হাসি দিয়ে বলল, “হ্যাঁ আয়াজ ভাই, আমি আমার সীমানা খুব ভালো করেই চিনি।”

দুপুরের পর শওকত আর জেবা বিদায় নিল। শওকত চলে যাওয়ায় ঈনশু যেন একটা বড়সড় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সায়েবও বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে বাইরে গেছে। বাড়িতে এখন এক অদ্ভুত নীরবতা।

ঈনশু একা একা ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। দুপুরের কড়া রোদ এখন নরম হয়ে এসেছে। হালকা বাতাস বইছে। হুট করে হওয়া এই বিয়েটা যে তার জীবনে এত বড় একটা পরিবর্তন আনবে, সে কখনো ভাবেনি। রনির ওপর জেদ করে সে যে চালটা চেলেছিল, সেই চালে সে নিজেই এখন ড. আরশাদ খান আয়াজের কাছে কিস্তিমাত হয়ে গেছে।

হঠাৎ পেছন থেকে দুটো হাত এসে ঈনশুর চোখ দুটো আলতো করে চেপে ধরল। হাতের সেই পরিচিত স্পর্শ আর পুরুষালি সুবাসে ঈনশুর বুঝতে বাকি রইল না যে এটা কে।

“বলুন তো আমি কে, মিস জেদিলতা?” আয়াজ ঈনশুর কানের খুব কাছে এসে নিচু ও মায়াবী স্বরে ফিসফিস করলেন।

ঈনশু একটু হাসল, কিন্তু নিজের স্বভাবজাত জেদটা বজায় রেখে বলল, “আমাদের কলেজের এক নাম্বারের খড়খড়ে, গম্ভীর আর হিটলার প্রফেসর!”

আয়াজ চোখ থেকে হাত সরিয়ে নিলেন, কিন্তু ঈনশুকে ছেড়ে দিলেন না। তিনি ঈনশুর ঠিক পেছনে এসে দাঁড়ালেন এবং দুই হাত দিয়ে রেলিংটা ধরে ঈনশুকে নিজের বাহুবন্ধনে অবরুদ্ধ করে ফেললেন। ঈনশু পিঠ দিয়ে আয়াজের শক্ত বুকের ধুকপুকানি স্পষ্ট টের পাচ্ছিল।

আয়াজ ঈনশুর চুলে নিজের মুখটা ডুবিয়ে দিয়ে এক গভীর শ্বাস নিয়ে বললেন, “আর এই হিটলার প্রফেসরের মনটা যে কাল রাত থেকে একটা চতুর আর ভন্ড মেয়ের কাছে বন্দি হয়ে আছে, সেটা বুঝি মনে নেই?”

ঈনশু ঘুরে দাঁড়িয়ে আয়াজের মুখোমুখি হলো। আয়াজের চোখে এখন কোনো চশমা নেই, ধবধবে সাদা পাঞ্জাবিতে তাকে দেখতে দারুণ হ্যান্ডসাম লাগছে। ঈনশু আয়াজের কলারটা আলতো করে টেনে ধরে নিজের ঠোঁটকাটা গলায় বলল, “আচ্ছা, আপনি ক্লাসের মধ্যে এত গম্ভীর কী করে থাকেন বলুন তো? আর এই যে এখন আমার সামনে এসে আস্ত একটা রোমান্টিক কবি বনে যান, এই ভন্ডামিটা কোথা থেকে শিখেছেন?”

আয়াজ ঈনশুর এই সাহসী আর জেদি রূপটা দেখে মুগ্ধ হলেন। তিনি ঈনশুর কোমরে আলতো করে হাত রেখে তাকে নিজের আরও একটু কাছে টেনে নিলেন। তাদের মাঝখানের দূরত্বটা এখন এতটাই কম যে, দুজনের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস একে অপরের গালে আছড়ে পড়ছে। কিন্তু এই তীব্র রোমান্সের মধ্যেও এক ফোটা অশালীনতা নেই, আছে শুধু এক পবিত্র অধিকারবোধ।

আয়াজ ঈনশুর চোখের দিকে তাকিয়ে খুব নরম গলায় বললেন, “এটা ভন্ডামি নয়, ঈনশু। এটাকে বলে সারভাইভাল স্ট্র্যাটেজি। দুনিয়ার সামনে বাঘ না সাজলে এই প্রফেশন চালানো যায় না। কিন্তু তোমার সামনে এলে আমার সব বাঘগিরি গলে পানি হয়ে যায়। কারণ আমার এই মনে শুধু একজনই রাজত্ব করে, আর সে হলো আমার এই জেদিলতা।”

ঈনশুর বুকের ভেতর তখন এক হাজারটা বসন্তের ফুল একসাথে ফুটে উঠল। সে আর নিজের জেদ ধরে রাখতে পারল না। সে আলতো করে নিজের মাথাটা আয়াজের চওড়া বুকে রাখল। আয়াজও খুব যত্নে তাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন।

বিকেলের সেই নরম আলোয়, ফাঁকা ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে দুই ভাইবোনের চাচাতো সম্পর্কের দেয়াল ভেঙে তারা এখন এক সুতোয় বাঁধা দুটি প্রাণ। ঈনশু মনে মনে ভাবল, রনির দেওয়া আঘাতটা হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল, কিন্তু সেই ভুলের উসিলায় সে যে আজ নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য আর খাঁটি ভালোবাসাটাকে খুঁজে পেয়েছে, তার জন্য সে বিধাতার কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবে।

ঠিক তখনই ছাদের দরজায় কার যেন পায়ের শব্দ শোনা গেল। ঈনশু চমকে উঠে আয়াজকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে চাইল, “ছাড়ুন! কেউ আসছে!”

আয়াজ কিন্তু তাকে ছাড়লেন না, উল্টো আরও শক্ত করে ধরে বাঁকা হেসে বললেন, “আসুক গে! দুনিয়ার সব ছাত্রের সামনে আমি বুক ফুলিয়ে বলতে পারি আমি আমার নিজের বিবাহিতা বউকে ভালোবাসছি, এতে কারও কোনো অবজেকশন থাকার কথা নয়!”

ঈনশু লজ্জায় আর পারল না, সে নিজের মুখটা আয়াজের বুকেই লুকিয়ে ফেলল, আর ছাদের বাতাসে ভেসে বেড়াতে লাগল প্রফেসরের সেই চেনা মিষ্টি হাসির শব্দ।

(চলবে…)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here