প্রফেসরের_জেদিলতা #আরিবা_নাওশীন #পর্ব_৪

0
2

#প্রফেসরের_জেদিলতা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৪

কলেজ থেকে ফেরার পর থেকেই খান বাড়ির আবহাওয়া কেমন যেন একটু ভারী হয়ে উঠেছিল। ড্রয়িংরুমে বড়রা সবাই মিলে রাতের খাবারের তদারকি করছেন। শাপলা বেগম আর সুমি বেগম রান্নাঘরে ব্যস্ত। ইব্রাহিম খান আর ইছমাইল খান বারান্দায় বসে পুরোনো কোনো পারিবারিক দলিল নিয়ে মগ্ন। সায়েব নিজের ঘরে মুখ গুঁজে পড়ে আছে নাকচ হয়ে যাওয়া থিসিস পেপারের শোকে সে আজ সত্যি সত্যিই বই খাতা নিয়ে বসেছে, যদিও তার মন পড়ে আছে ল্যাপটপের গেমসে।

ঈনশু নিজের ঘরের বারান্দায় এসে দাঁড়াল। বিকেলের ম্লান আলো তখন মুছে যাচ্ছে, আকাশের কোণায় জমছে হালকা মেঘ। সে রেলিংয়ে হাত রেখে দাঁড়িয়ে ভাবছিল জীবনটা কত দ্রুত বদলে গেল। মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা আগেও সে ছিল রনির প্রেমিকা, আর এখন সে তার গম্ভীর, খড়খড়ে চাচাতো ভাই আরশাদ খান আয়াজের বিবাহিতা স্ত্রী!

হঠাৎ করেই পেছনের মৃদু পায়ের শব্দে ঈনশুর ভাবনায় ছেদ পড়ল। সে ভাবল আয়াজ এসেছে। মুখে সেই চিরচেনা জেদি আর ভন্ড ভাবটা ফুটিয়ে চট করে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, “কী ব্যাপার প্রফেসর সাহেব? আবার কোনো নতুন থিওরি মাথায় এলো নাকি”

কথাটা শেষ করতে পারল না ঈনশু। তার মুখের হাসির রেখা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। সামনে আয়াজ নেই, দাঁড়িয়ে আছে শওকত। মুখে সেই কুৎসিত, চাতুর্যভরা হাসি।

শওকত এক কদম এগিয়ে এসে বেশ রসিয়ে বলল, “কী রে ঈনশু শালীকা সাহেব, একা একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে কার কথা ভাবা হচ্ছে? প্রফেসর বরের, নাকি পুরোনো কোনো স্মৃতির?”

ঈনশুর পুরো শরীর রি রি করে উঠল। শওকতের এই বাঁকা চাউনি আর কথা বলার ধরন তার একদম সহ্য হয় না। সে নিজের জেদি ভাবটা বজায় রেখে শক্ত গলায় বলল, “শওকত ভাই, এটা আমার আর আয়াজ ভাইয়ের পার্সোনাল রুমের বারান্দা। আপনি এখানে কী করছেন? জেবা আপু কোথায়?”

শওকত একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে আরও এক কদম এগিয়ে এলো। ঈনশু অনিচ্ছা সত্ত্বেও এক পা পিছিয়ে গেল। শওকত নিচু স্বরে বলল, “জেবা তো নিচে আম্মাদের সাথে আছে। আমি ভাবলাম নতুন কনের খোঁজখবর নিয়ে আসি। তা, কাল রাতের হুট করে নেওয়া সিদ্ধান্তটার জন্য এখন আফসোস হচ্ছে না তো? রনির মতো স্মার্ট ছেলের জায়গা এখন ওই গম্ভীর প্রফেসরের চশমার পেছনে? চাইলে কিন্তু এখনো আমায় মনের কথা বলতে পারো, ঈনশু। আমি তো পর নই!”

ঈনশুর চোখ দুটো রাগে জ্বলে উঠল। সে কড়া গলায় বলতে যাবে, “মুখ সামলে কথা বলুন শওকত ভাই, নাহলে আমি ”

“নাহলে কী করবেন, মিস জেদিলতা?”
হঠাৎ একটা বজ্রগম্ভীর কণ্ঠস্বর বারান্দার দরজায় প্রতিধ্বনিত হলো। শওকত আর ঈনশু দুজনেই চমকে দরজার দিকে তাকাল।

দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন ড. আরশাদ খান আয়াজ। গায়ের শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটানো, চোখে চশমা নেই। কিন্তু তাঁর চোখের সেই চাউনি এতটাই শীতল আর ভয়ঙ্কর যে, এক পলকেই শওকতের মুখের চতুর হাসিটা গায়েব হয়ে গেল।

আয়াজ ধীর পায়ে বারান্দায় ঢুকলেন। তিনি শওকতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সরাসরি ঈনশুর পাশে এসে দাঁড়ালেন এবং খুব স্বাভাবিক, অথচ অধিকারবোধের সাথে ঈনশুর কাঁধে নিজের একটি হাত রাখলেন। তাঁর হাতের সেই উষ্ণ স্পর্শে ঈনশুর ভেতরের ভয়টা নিমেষেই উধাও হয়ে গেল।

আয়াজ শওকতের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বললেন, “শওকত, আমার ঘরে আমার স্ত্রীর সাথে তোমার কী এত জরুরি কথা, যা জেবাকে ছাড়া একান্তে বলতে হচ্ছে?”

শওকত ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলল, “না… মানে আয়াজ ভাই… আমি তো জাস্ট ঈনশুকে জিজ্ঞেস করছিলাম ওর কলেজ কেমন কাটল আজ…”

“কলেজ কেমন কেটেছে, সেটা জানার জন্য আমি ওর লাইফ-পার্টনার আর প্রফেসর হিসেবে যথেষ্ট।” আয়াজের কণ্ঠস্বর এবার আরও নিচু কিন্তু তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল, “আমার ঘরের সীমানা কোথায় শেষ আর কোথায় শুরু, সেটা আশা করি তোমাকে নতুন করে বোঝাতে হবে না। নিচে বাবা ডাকছেন তোমাকে, যাও।”

শওকত আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ানোর সাহস পেল না। সে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে প্রায় পালিয়ে বাঁচল।
শওকত চলে যেতেই ঈনশু একটা লম্বা শ্বাস নিল। সে আয়াজের দিকে তাকিয়ে মুখটা একটু বাঁকিয়ে বলল, “এতক্ষণ কোথায় ছিলেন? লোকটা যেভাবে কথা বলছিল…”

আয়াজ চট করে ঈনশুর কাঁধ থেকে হাতটা সরিয়ে তার দুই গাল নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিলেন। তাঁর চোখে তখন রাগ মুছে এক পরম নিশ্চিন্ততা আর ভালোবাসার আলো। তিনি নিচু স্বরে বললেন, “আমি তো দরজার বাইরেই ছিলাম, ঈনশু। আমি দেখতে চাচ্ছিলাম আমার এই এক নাম্বারের জেদি আর চতুর বউটা একা পরিস্থিতি কতটা সামলাতে পারে। কিন্তু যখন দেখলাম ওই লোকটা নিজের সীমানা পার করার চেষ্টা করছে, তখন কি আর প্রফেসরের পক্ষে চুপ থাকা সম্ভব?”

ঈনশু চোখ বড় বড় করে বলল, “তার মানে আপনি ইচ্ছা করে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিলেন?”

“তামাশা নয়, পাহারা দিচ্ছিলাম।” আয়াজ একটু ফানি হেসে বললেন, “আমার এই অমূল্য সম্পত্তিটাকে দুনিয়ার সব কুদৃষ্টি থেকে পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব তো এখন আমারই, তাই না? তবে শোনো ঈনশু, এই শওকত লোকটার উদ্দেশ্য সত্যিই খুব খারাপ। ও বাড়ির জামাই বলে কাকা-আব্বা কিছু বলেন না, কিন্তু আমি ওকে খুব ভালো করেই চিনি। এরপর থেকে ও সামনে এলে একদম পাত্তা দেবে না, আর আমাকে সঙ্গে সঙ্গে জানাবে। মনে থাকবে?”

ঈনশু আয়াজের চোখের দিকে তাকিয়ে আলতো করে মাথা নাড়ল। এই প্রথম তার মনে হলো, আয়াজের এই শাসনটার মধ্যে একটা অদ্ভুত শান্তি লুকিয়ে আছে।

রাত সাড়ে ১০টা। রাতের খাবার শেষ করে সবাই যে যাঁর ঘরে চলে গেছেন। আয়াজ আর ঈনশুর ঘরের বাতি নেভানো, শুধু কোণার নাইট ল্যাম্পের হালকা নীল আলো ছড়াচ্ছে পুরো ঘরে।

ঈনশু বিছানার বাম পাশে দুটো কোলবালিশ মাঝখানে দিয়ে একটা নিখুঁত বর্ডার লাইন তৈরি করেছে। সে নিজে দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে আছে, গায়ে একটা পাতলা চাদর।

আয়াজ ওয়াশরুম থেকে চেঞ্জ করে ঘরে ঢুকলেন। পরনে তাঁর আরামদায়ক ট্রাউজার আর টি-শার্ট। বিছানায় এসে যখন তিনি ডান পাশে বসলেন, তখন মাঝখানের কোলবালিশের পাহাড় দেখে তাঁর ঠোঁটের কোণায় এক চিলতে কৌতুকী হাসি ফুটে উঠল।

তিনি বিছানায় শুয়ে পড়ে ঈনশুর পিঠের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মিস ঈনশু? এই কোলবালিশের বর্ডারটা দেওয়ার কারণ কী জানতে পারি? এটা কি ভারত-বাংলাদেশ বর্ডার নাকি?”

ঈনশু চট করে ঘুরে বসল। নীল আলোয় তার চোখ দুটো চকচক করছে। সে জেদি গলায় বলল, “হ্যাঁ, এটা ইন্টারন্যাশনাল বর্ডার। আপনি আপনার সীমানার মধ্যে থাকবেন, প্রফেসর সাহেব। দিনের বেলা ক্লাসে যেমন হিটলারগিরি দেখান, রাতের বেলাও তেমন নিজের জায়গায় সোজা হয়ে শুয়ে থাকুন।”

আয়াজ একটু কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে মাথাটা তুললেন। চশমা ছাড়া তাঁর চোখ দুটো এই আবছা আলোয় আরও বেশি গভীর আর আকর্ষণীয় দেখাচ্ছে। তিনি ফানি সুরে বললেন, “কিন্তু সাইকোলজি তো বলে, বিবাহিত জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনো বর্ডার থাকা উচিত নয়। এটা তো ডাইরেক্ট থিওরির বিরোধী!”

“আপনার থিওরি আপনি নিজের ক্লাসে গিয়ে ছাত্রদের বোঝাবেন, আমাকে নয়!” ঈনশু মুখটা ঘুরিয়ে বলল, যদিও তার বুকের ভেতর আবার সেই পরিচিত তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে।

আয়াজ আচমকাই মাঝখানের একটা কোলবালিশ টেনে বিছানার নিচে ফেলে দিলেন।

“এই! কী করছেন কী আপনি?” ঈনশু চমকে উঠে বলল।

আয়াজ আর এক ইঞ্চি এগিয়ে এলেন। তিনি কোনো রকম অশালীনতা না করে, অত্যন্ত নিখাদ আর মিষ্টি এক ভালোবাসার টানে ঈনশুর চাদরের ওপর দিয়েই তার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিলেন। তাঁর আঙুলের আলতো চাপ ঈনশুকে স্থির করে দিল।

আয়াজ নিচু, মায়াবী স্বরে বললেন, “আমি জানি ঈনশু, তুমি রনির ওপর জেদ করে এই বিয়েটা করেছ। কিন্তু আমি তো কোনো জেদ করে কবুল বলিনি। আমি তোমাকে আমার এই শান্ত, একঘেয়ে জীবনে এক টুকরো ঝড় হিসেবে চেয়েছিলাম। তোমার এই জেদ, এই ভন্ডামি, এই চতুর রূপ সবকিছু নিয়েই আমি তোমাকে ভালোবেসেছি। তাই আমার সামনে নিজেকে আড়াল করার এই মেকি চেষ্টাটা বন্ধ করো।”

ঈনশু নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ঘরের ভেতরের নীল আলোয় আয়াজের মুখটা কেমন যেন এক স্বপ্নের মতো দেখাচ্ছে। সে মৃদু স্বরে বলল, “আপনি বড্ড বেশি কথা বলেন, আয়াজ ভাই।”

“আবার ভাই?” আয়াজ এবার ঈনশুর কপালে নিজের হাতটা রেখে ফিসফিস করে বললেন, “কাল থেকে যদি কাকা-কাকিমার সামনে আমাকে ভুল করেও ‘ভাই’ বলে ডেকেছ, তবে কিন্তু কলেজের পুরো ডিপার্টমেন্টের সামনে তোমাকে স্পেশাল পানিশমেন্ট দেব। মনে থাকে যেন, ইনশিরাহ খান!”

ঈনশু লজ্জায় নিজের মুখটা চাদরের নিচে লুকিয়ে ফেলল। চাদরের আড়াল থেকেই সে শুনতে পেল আয়াজের সেই মৃদু, মনকাড়া হাসির শব্দ। দুনিয়ার সব মানুষের কাছে সে যতই জেদি আর অহংকারী হোক না কেন, এই একটা মানুষের ভালোবাসার শাসনের সামনে সে চিরকালই বড্ড অসহায়, বড্ড বেশি বাধ্য।

বাইরে তখন ঝুমঝুম করে বৃষ্টি নামল, আর সেই বৃষ্টির শব্দের মাঝে খান বাড়ির এক কোণায়, প্রফেসরের গম্ভীর বুকে মাথা রেখে এক নাম্বারের জেদি মেয়ে ঈনশু নিজের অজান্তেই খুঁজে পেল তার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ ও মধুর আশ্রয়।

চলবে,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here