প্রফেসরের_জেদিলতা #পর্ব_১৮

0
2

#প্রফেসরের_জেদিলতা
#পর্ব_১৮
#আরিবা_নাওশীন

হলের ভেতর তখন চরম উত্তেজনা। ওই বয়োবৃদ্ধ ট্রাস্টি মেম্বার মিস্টার হাবিবুল্লাহ রিমোট হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। আয়াজ এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন।

ঈনশু নিজের সিট থেকে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল, “আপনি! আপনিই সেই ব্যক্তি, যিনি আয়াজের ডায়েরিতে ‘গডফাদার’ হিসেবে পরিচিত!”

মিস্টার হাবিবুল্লাহ হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো মানবিকতা নেই, আছে এক ঠান্ডা নিষ্ঠুরতা। তিনি বললেন, “আয়াজ, তুমি খুব চালাক। তুমি ভেবেছিলে জামানকে বাগে আনলেই খেলা শেষ। কিন্তু তুমি ভুলে গেছ, আরিয়ান যখন বেঁচে ছিল, তখন সে শুধু ড্রাগ সিন্ডিকেট নয়, সে আমাদের পুরো বংশের গোপন আয়ের উৎসগুলো জেনে গিয়েছিল। আর সেই ভয় থেকেই তাকে সরানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমরা।”

আয়াজ হাতের মুঠো শক্ত করে বললেন, “আমাদের বংশ? তুমি আমাদের আত্মীয়ের মুখোশ পরে আমাদের পরিবারেই ছিলে?”

হাবিবুল্লাহ বাঁকা হাসলেন, “হ্যাঁ। আর তোমার এই সুন্দরী স্ত্রী, ঈনশু… সে কি জানে, তার বাবা অর্থাৎ তোমার আপন চাচা, এই সিন্ডিকেটের অন্যতম ফান্ডার ছিলেন?”

পুরো হলরুম নিস্তব্ধ। ঈনশু স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে তো জানত আয়াজ তার কাজিন, কিন্তু তার বাবা যে এই খ-ুনের সাথে পরোক্ষভাবে যুক্ত, এটা তার কল্পনার বাইরে।

ঈনশু কাঁপা গলায় বলল, “আপনি মিথ্যা বলছেন! আমার বাবা এসবের সাথে জড়িত হতে পারেন না!”

হাবিবুল্লাহ একটা ফাইল ছুঁড়ে মারলেন আয়াজের দিকে। “ফাইলটা খুলে দেখ আরশাদ। সেখানে তোমার বাবার সই করা কাগজ আছে, যেটা আরিয়ানের ম-ৃত্যুর পারমিশন দিয়েছিল।”

আয়াজ ফাইলটা খুলল না। সে চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখল। তাঁর চোখ দুটো দিয়ে এখন আর রাগের আগুন ঝরছে না, সেখানে নেমে এসেছে এক হিমশীতল প্রশান্তি। তিনি ঠান্ডা গলায় বললেন, “আমি জানি আমার বাবা কে। আর আমি এটাও জানি যে আরিয়ানকে মা-রার অর্ডারটা কে দিয়েছিল। আরশাদ খান আয়াজ আজ এই কনফারেন্সে কোনো প্রমাণ দেখাতে আসেনি, এসেছে একটা পুরো সাম্রাজ্য ধূলিসাৎ করতে।”

কনফারেন্সের মাঝখানের বিরতিতে ঈনশু আয়াজের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আয়াজ, এটা কি সত্যি? আমার বাবা… আর আপনার ভাই? আমাদের দুই পরিবারের সম্পর্কটা আসলে কী?”

আয়াজ ঈনশুর হাতটা শক্ত করে ধরল। তাঁর চোখে তখন এক গভীর মায়া। তিনি ফিসফিস করে বলল, “ঈনশু, আমাদের পরিবারে আরিয়ানের নাম নেওয়াটা একটা ট্যাবু ছিল। আমার বাবা আর তোমার বাবা দুজনেই চেয়েছিলেন অতীতের এই অন্ধকার ধুয়ে ফেলতে। আরিয়ান যখন মা-রা যায়, তখন তোমার বয়স ছিল মাত্র সাত। তোমায় এসব থেকে দূরে রাখার জন্য তোমার বাবা তোমাকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আর আমি? আমি লন্ডনে ছিলাম। আমি ফিরে এসে তোমাদের সাথে মিশে গেছি ঠিকই, কিন্তু আমার লক্ষ্য ছিল অন্য।”

ঈনশু অবাক হয়ে বলল, “মানে, আপনি আমাকে ভালোবেসে বিয়ে করেননি? আপনি কি শুধু আমার বাবার ওপর প্রতিশোধ নিতেই আমার কাছাকাছি এসেছিলেন?”

আয়াজের চোখে তখন এক মুহূর্তের দ্বিধা। তিনি বললেন, “শুরুতে তাই ভেবেছিলাম, জেদিলতা। ভেবেছিলাম তোমাকে ব্যবহার করে আমি তোমার বাবার গোপন কাগজগুলো পাব। কিন্তু তোমার জেদ, তোমার চতুরতা আর আমাদের এই দুই বছরের সংসার… আমি তোমাকে কখন ভালোবেসে ফেলেছি, সেটা আমি ব্যাখ্যা করতে পারবে না।”

ঈনশু তার বাবার বিশ্বাসঘাতকতার কথা জেনেও আয়াজের প্রতি তার টান অনুভব করল। কিন্তু এখন সময় আবেগের নয়, সময় সত্যের মুখোমুখি হওয়ার।

আয়াজ আবার স্টেজে উঠলেন। তিনি রিমোটটা হাবিবুল্লাহর হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেন না, বরং তিনি ল্যাপটপটা কানেক্ট করলেন।
“হাবিবুল্লাহ সাহেব, আপনি রিমোট দিয়ে ডাটা ডিলিট করার কথা ভাবছেন, কিন্তু আপনি জানতেন না যে আরিয়ান শুধু একজন ছাত্র ছিল না, সে একজন সাইবার এক্সপার্টও ছিল। সে ম-ারা যাওয়ার আগে তার ল্যাপটপের সব ডেটা অটো-ক্লাউড সার্ভারে আপলোড করে রেখেছিল, যা প্রতি সাত বছর অন্তর অটো-পাবলিশ হওয়ার কথা ছিল ঠিক আজকের এই দিনে!”

হাবিবুল্লাহর চোখ বড় বড় হয়ে গেল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল শত শত ভিডিও ক্লিপ, ব্যাংক ট্রানজেকশন আর ড্রাগ শিপমেন্টের ম্যাপ। পুরো হলরুমের সাংবাদিকরা ক্যামেরা তাক করল স্ক্রিনের দিকে।

হাবিবুল্লাহ পালাতে চাইলেন, কিন্তু পুলিশ অলরেডি হলরুমের সব দরজা লক করে দিয়েছে। পুলিশ কমিশনার সাহেব নিজেই এগিয়ে এলেন হাবিবুল্লাহর দিকে।

হাবিবুল্লাহ গর্জে উঠলেন, “তুমি জিতে গেছ আরশাদ! কিন্তু তুমি একটা কথা ভুলে গেছ আরিয়ান আর তোমার বাবার মৃ-ত্যুর দায় কিন্তু তোমার ওপরেই আসবে, কারণ তুমিই আইন হাতে তুলে নিয়েছ!”

আয়াজ হাসল। “আইন হাতে আমি তুলে নিইনি, সাহেব। আমি শুধু সত্যের মুখ খুলে দিয়েছি। আর আইনের প্রতি সম্মান রেখেই আজ আমি নিজেকে পুলিশের হাতে সঁপে দিচ্ছি, কারণ আমি চেয়েছিলাম এই বিচারটা সবার সামনে হোক।”

পুলিশ আয়াজকে হাতকড়া পরাতে এল। ঈনশু সামনে এগিয়ে এল। সে আয়াজের হাতকড়া পরা হাত দুটো নিজের হাতে নিল। সবার সামনে, ক্যামেরা আর সাংবাদিকদের চোখের সামনে ঈনশু ফিসফিস করে বলল, “আমি জানি না কাল কী হবে, কিন্তু একজন জেদি আর চতুর স্ত্রী হিসেবে, আমি তোমাকে এত সহজে এই লড়াইয়ে হারতে দেব না।”

আয়াজ ঈনশুর দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো হাসল। সেই হাসিতে কোনো রহস্য নেই, আছে এক পরম শান্তি।

পুলিশ গাড়ি চলতে শুরু করল। ঈনশু রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।

চলবে,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here