#প্রফেসরের_জেদিলতা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_১৭
ঘুটঘুটে অন্ধকারে ল্যাবের ভেতরের বাতাসটা এক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। মেইন পাওয়ার সুইচটা অফ করার পর ঈনশু দরজার আড়ালে নিজের শ্বাস চেপে দাঁড়িয়ে রইল। তার নিজের তৈরি করা এই অন্ধকারের চাতুর্য এবার কোন দিকে মোড় নেবে, সে নিজেও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
“কে? কে লাইট অফ করল? শমসের, ফায়ার কর!” জামানের কর্কশ গলা অন্ধকারে চিল্কার করে উঠল।
ঠিক তখনই ল্যাবের ভেতর থেকে একটা ভারী কিছু আছড়ে পড়ার শব্দ হলো, আর সেই সাথে একটা মানুষের গোঙানির আওয়াজ। অন্ধকারে গুন্ডা দুটো দিকভ্রান্ত হয়ে এলোপাথাড়ি আরও একটা গুলি চালাল, যা ল্যাবের কাঁচের জারগুলোতে লেগে ঝনঝন করে ভেঙে পড়ল। অ্যাসিড আর কেমিক্যালের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে।
“সাইকোলজির প্রথম পাঠ, মিস্টার জামান…” অন্ধকারে ভেসে এলো আয়াজের সেই বরফশীতল, শান্ত কণ্ঠস্বর। কিন্তু এবার সেই কণ্ঠটা স্টেজের এক কোণ থেকে নয়, একদম জামানের কানের পাশ থেকে শোনা গেল। “মানুষ যখন হঠাৎ আলো থেকে অন্ধকারে পড়ে, তখন তার চোখ সামঞ্জস্য করতে অন্তত চার সেকেন্ড সময় নেয়। আর একজন প্রফেশনাল রেসলারের জন্য ওই চার সেকেন্ডই যথেষ্ট।”
ঈনশু দরজার ফাঁক দিয়ে নিজের ফোনের ফ্ল্যাশলাইটটা জাস্ট এক সেকেন্ডের জন্য অন করেই অফ করে দিল। আর ওই এক সেকেন্ডের আলোতেই সে যা দেখল, তাতে তার গায়ের পশম খাড়া হয়ে গেল।
আয়াজ অন্ধকারে চশমা ছাড়াই নিখুঁত নিশানা করেছেন। একটা গুন্ডার হাত মুচড়ে সেটার রিভলভার অলরেডি ওনার নিজের কবজায়, আর অন্য গুন্ডাটা মেঝেতে ছটফট করছে তার চিবুকটা এক ঘুঁষিতে ডিসলোকেট করে দিয়েছেন প্রফেসর! যে মানুষটা কলম আর লেকচার শিট ছাড়া কিছু ধরে না, সে এতটা ভয়ঙ্করভাবে ফিজিক্যাল ফাইট করতে পারে, তা ঈনশুর কল্পনারও বাইরে ছিল।
“জামান সাহেব, পালানোর চেষ্টা করবেন না,” আয়াজ অন্ধকারের মধ্যেই জামানের কলারটা খামচে ধরলেন। “আরিয়ানকে যখন আপনারা এই ল্যাবে একা পেয়েছিলেন, ও তখন শুধু একজন ছাত্র ছিল। কিন্তু আমি ওর ভাই।”
ঠিক তখনই করিডোর দিয়ে বেশ কিছু ভারী বুটের আওয়াজ এগিয়ে আসতে শোনা গেল। টর্চের তীব্র আলো এসে পড়ল ল্যাবের দরজায়। সায়েব আর তার পেছনে কলেজের চার-পাঁচজন সিকিউরিটি গার্ড হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢুকল।
সায়েব টর্চের আলো আয়াজের ওপর ফেলে চেঁচিয়ে উঠল, “আয়াজ ভাই! তোমরা ঠিক আছ? ঈনশু… তুই এখানে কী করছিস?”
ঈনশু মেইন সুইচের ওখান থেকে বেরিয়ে এসে বুক ভরে একটা নিশ্বাস নিল। সে সায়েবের দিকে তাকিয়ে নিজের সেই চিরচেনা ভন্ড হাসিটা দিয়ে বলল, “আমি এখানে প্রফেসরের প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাস দেখতে এসেছিলাম রে সায়েব। তোর ভাই তো লাইট বন্ধ হতেই পুরো অ্যাকশন হিরো হয়ে গেল!”
সিকিউরিটি গার্ডরা মেঝেতে পড়ে থাকা গুন্ডা দুটোকে চেপে ধরল। মিস্টার জামান তখন আয়াজের হাতের মুঠোয় কাঁপছেন। তাঁর সেই ডিরেক্টরের অহংকার এখন ধুলোয় মিশে গেছে।
ল্যাবরেটরির ওই ঘটনার পর পুলিশ ডাকা হলো না। আয়াজ নিজেই সিকিউরিটিদের বললেন জামান আর তার গুন্ডাদের আপাতত কলেজের একটা সিক্রেট রুমে আটকে রাখতে। কারণ, আগামীকালকের কনফারেন্সের আগে তিনি কোনো আইনি ঝামেলায় গিয়ে জামানকে জামিন পাওয়ার সুযোগ দিতে চান না।
রাত তখন ১২টা ৩০ মিনিট।
আয়াজের সাদা রঙের গাড়িটা এখন হাইওয়ে দিয়ে ছুটে চলছে। ড্রাইভ করছেন স্বয়ং আয়াজ, তাঁর চোখে সেই কড়া ফ্রেমের চশমাটা আবার ফিরে এসেছে। আর পাশের সিটে বসে আছে ঈনশু।
“তুমি আজ লালবাগের করিম চাচার ওখানে গিয়েছিলে কেন, ঈনশু?” আয়াজ সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়েই খুব শান্ত, গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন। ওনার কণ্ঠস্বরে রাগ নেই, কিন্তু একটা প্রচ্ছন্ন অনুশাসন আছে।
ঈনশু একটু দমে না গিয়ে নিজের সিটবেল্টটা ঠিক করতে করতে চতুর গলায় বলল, “না গেলে তো জানতেই পারতাম না যে আমার বরটা একটা আস্ত গোয়েন্দা! আর তাছাড়া, আমি না থাকলে আজ ল্যাবের লাইটটা কে অফ করত শুনি? আপনার ওই চার সেকেন্ডের থিওরি তো আমার এই এক সেকেন্ডের সুইচের ওপর বেস করে কাজ করেছে, প্রফেসর সাহেব!”
আয়াজ গাড়ির স্পিডটা একটু কমাল। একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বাঁকা চোখে ঈনশুকে দেখলেন। চশমার আড়ালে তাঁর চোখে এখন এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি একদিকে ঈনশুর এই বিপদের মুখে চলে আসার ওপর রাগ, অন্যদিকে তার এই অসামান্য চতুর বুদ্ধির প্রতি এক গভীর মুগ্ধতা।
“তুমি বড্ড জেদি, ঈনশু। কিন্তু তুমি বুঝতে পারছ না, জামান স্রেফ একটা চাল মাত্র। এই ড্রাগ সিন্ডিকেটের মেইন মাথা কিন্তু জামান নয়,” আয়াজ স্টিয়ারিংয়ে চাপ দিয়ে বললেন, “আজ করিম চাচা তোমাকে পুরো সত্যটা বলেনি। আরিয়ানের ডায়েরির যে ফাইলগুলো করিম চাচার কাছে আছে, ওটার মেইন পাসওয়ার্ডটা আছে এই কলেজেরই এমন একজনের কাছে, যাকে আমরা প্রতিদিন দেখি কিন্তু সন্দেহ করার কথা ভাবতেও পারি না।”
ঈনশুর বুকটা আবার ধক করে উঠল। “কে সে?”
“সেটা আগামীকাল সকাল ৯টার কনফারেন্সেই পরিষ্কার হবে,” আয়াজ গাড়িটা খান বাড়ির গেটের সামনে ব্রেক কষলেন। “তবে মনে রেখো ঈনশু, কালকের খেলাটা আজ রাতের চেয়েও অনেক বেশি মনস্তাত্ত্বিক। সেখানে কোনো অন্ধকার থাকবে না, থাকবে তীব্র আলো। আর সেই আলোর নিচেই মুখোশটা খুলবে।”
পরদিন সকাল ৮টা ৪৫ মিনিট।
কলেজের অডিটোরিয়াম হল এখন লোকে লোকারণ্য। ট্রাস্টি বোর্ডের মেম্বার, শহরের নামকরা ডাক্তার, আর পুলিশের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ভিআইপি সারিতে বসে আছেন। মিস্টার জামানের চেয়ারটা ফাঁকা দেখে অনেকেই ফিসফিস করছে, কিন্তু প্রিন্সিপাল সাহেব সবাইকে আশ্বস্ত করে বলছেন, “ডিরেক্টর সাহেব একটু অসুস্থ, ওনার আসতে দেরি হবে।”
ঈনশু আজ একটা নেভি ব্লু শাড়ি পরে কনফারেন্স হলের মাঝখানের সারিতে বসে আছে। তার পাশে সায়েব বসে বারবার ঘাম মুছছে। সায়েব ফিসফিস করে বলল, “ঈনশু, আমার কেন যেন মনে হচ্ছে আজ কলেজে বড় কোনো কেয়ামত হবে। আয়াজ ভাইয়ের চেহারা দেখেছিস? সকাল থেকে একটা কথাও বলেনি।”
ঈনশু কোনো উত্তর দিল না। তার চোখ স্টেজের ওপর রাখা প্রজেক্টরের দিকে।
ঠিক সকাল ৯টায় ড. আরশাদ খান আয়াজ স্টেজে উঠলেন। পরনে তাঁর ব্ল্যাক স্যুট, চোখে চশমা। হলরুমের সমস্ত কোলাহল এক নিমেষে শান্ত হয়ে গেল।
“শুভ সকাল সবাইকে,” আয়াজ মাইকটা হাতে নিয়ে বললেন, “আজকের এই অ্যানুয়াল কনফারেন্সে আমরা আমাদের কলেজের গত সাত বছরের কিছু ‘গোপন’ কেরিয়ার গ্রাফ নিয়ে আলোচনা করব। বিশেষ করে… আমাদের কলেজের ল্যাবরেটরিতে তৈরি হওয়া কিছু স্পেশাল কেমিক্যাল ফর্মুলা, যা সমাজের আড়ালে সাপ্লাই করা হতো।”
প্রিন্সিপাল সাহেব ওমনি নিজের সিট থেকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তাঁর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তিনি রাগত স্বরে বললেন, “ড. আরশাদ! এটা মেডিকেল রিসার্চের কনফারেন্স, এখানে আপনি এসব কী উল্টোপাল্টা বলছেন? জামান সাহেব নেই বলে কি আপনি যা ইচ্ছে তাই করবেন?”
আয়াজ একটু হাসলেন। চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে তিনি সরাসরি প্রিন্সিপালের দিকে তাকালেন।
“আমি জানি জামান সাহেব কেন নেই, প্রিন্সিপাল স্যার,” আয়াজ রিমোটের বোতাম চাপলেন। প্রজেক্টর স্ক্রিনে ভেসে উঠল মিস্টার জামানের একটা লাইভ ভিডিও, যেখানে দেখা যাচ্ছে সে কলেজের একটা অন্ধকার রুমে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় চেয়ারে বসে আছে!
পুরো হলে এক লহমায় হুলস্থুল পড়ে গেল। সবাই সিট ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
ঠিক তখনই প্রিন্সিপাল সাহেবের পাশে বসা একজন বয়োবৃদ্ধ ট্রাস্টি মেম্বার, যিনি এতক্ষণ খুব শান্তভাবে চাদর গায়ে দিয়ে বসে ছিলেন, তিনি মৃদু হাসলেন। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “চমৎকার চাল আরশাদ! আরিয়ানের ভাই হিসেবে তুমি বেশ ভালোই জাল বুনেছ। কিন্তু তুমি কি জানো, করিম চাচার কাছে যে ফাইলটা আছে, ওটার অরিজিনাল ডিলিট বাটনটা কার হাতের রিমোটে আছে?”
ভদ্রলোক নিজের চাদরের নিচ থেকে একটা ছোট রিমোট কন্ট্রোল ডিভাইস বের করলেন।
ঈনশু পেছনের সিট থেকে ভদ্রলোকের দিকে তাকাল। তার চতুর মগজ ওমনি একটা জিনিস ক্লিক করল। এই লোকটাই তো আরিয়ানের ডায়েরিতে লেখা সেই ‘সাক্ষী-১’, যে আসলে কোনো সাক্ষী নয় বরং এই পুরো সিন্ডিকেটের গডফাদার!
চলবে,,,,

