প্রফেসরের_জেদিলতা #পর্ব_১৬

0
1

#প্রফেসরের_জেদিলতা
#পর্ব_১৬
#আরিবা_নাওশীন

সেমিনার শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে গাড়িতে কেউ কোনো কথা বলল না। আয়াজ গভীর মনোযোগ দিয়ে ড্রাইভ করছিলেন, আর ঈনশু কোলে ঘুমন্ত আয়াতকে নিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। দুজনের মাঝখানের এই নীরবতাটা যেন বাইরের পিচঢালা রাস্তার চেয়েও অনেক বেশি দীর্ঘ আর ধূসর।

রাতে খাবার টেবিলে সায়েব যথারীতি নিজের মনে বকবক করে গেল, কিন্তু আয়াজ আর ঈনশু দুজনই কেমন যেন যান্ত্রিকভাবে খেয়ে ওপরে চলে এলো।

রাত একটা। চারপাশ নিস্তব্ধ। আয়াজ ওয়াশরুমে গেছে চেঞ্জ করতে। ঈনশু বিছানায় বসে ছটফট করছিল। তার মগজ তাকে শান্তিতে ঘুমাতে দিচ্ছে না।

সে ধীর পায়ে আবার আয়াজের স্টাডি রুমে ঢুকল। আজ আর ড্রয়ার লক করা নেই। আয়াজ হয়তো জানেন, চিলতে পাখি খাঁচার গোপন পথ চিনে ফেলেছে, তাই আর লুকানোর চেষ্টা করেননি। ঈনশু ড্রয়ার থেকে সেই পুরোনো ডায়েরিটা আবার বের করল।

এবার সে পাতাগুলো আরও খুঁটিয়ে উল্টাতে লাগল। আরিয়ানের হাতের লেখার নিচেই একটা জায়গায় ছোট করে একটা মোবাইল নাম্বার আর একটা ঠিকানা লেখা আছে “পুরোনো ঢাকা, লালবাগ, ৪৪/এ।” নিচে লেখা ‘সাক্ষী-২, ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট করিম।’

করিম! তার মানে আরিয়ানের মৃ-ত্যুর একমাত্র জীবিত সাক্ষী এই করিম, যে হয়তো এখনো কোথাও লুকিয়ে আছে। আয়াজ কি এই করিমের খোঁজ পেয়েছেন? নাকি আয়াজ একাই জামানের বিরুদ্ধে লড়ছেন?
ঠিক তখনই ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো। ঈনশু চট করে ডায়েরির ওই পাতার একটা ছবি নিজের ফোনে তুলে নিল। তারপর ডায়েরিটা যথাস্থানে রেখে দ্রুত নিজের ঘরে ফিরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ার ভান করল।

আয়াজ ঘরে ঢুকে ঈনশুর দিকে একবার তাকাল। চশমাটা টেবিলের ওপর রাখার সময় তাঁর ঠোঁটের কোণায় এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। তিনি নিচু স্বরে বললেন, “সবাই ভাবে তারা খুব ভালো অভিনয় করতে পারে, কিন্তু চোখ কখনো মিথ্যে বলে না, ঈনশু।”

ঈনশু চোখ বন্ধ করেই মনে মনে বলল, “এবার প্রফেসরের সাইকোলজি এই জেদিলতার চাতুর্যের কাছে হার মানবে, দেখে নেবেন!”

পরদিন সকাল ১০টা। আয়াজ তখন কলেজে তাঁর রেগুলার ক্লাসে ব্যস্ত। ঈনশু এই সুযোগটা হাতছাড়া করল না। সে আয়াতকে সুমি বেগমের কাছে রেখে, নিজের পার্পল রঙের একটা সাধারণ সুতির থ্রি-পিস পরে, মাথায় ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল। কাউকে কিছু না বলে সে সোজা একটা সিএনজি নিয়ে রওনা হলো পুরোনো ঢাকার লালবাগের উদ্দেশ্যে।

লালবাগের ওই সরু গলি আর জ্যাম ঠেলে ৪৪/এ নম্বর বাড়িটা খুঁজে পেতে ঈনশুর প্রায় দুই ঘণ্টা লেগে গেল। বাড়িটা বড্ড পুরোনো, দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়ছে। ভাঙা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতেই একটা জরাজীর্ণ ঘরের সামনে এসে সে থামল। দরজায় নক করতেই ভেতর থেকে এক বৃদ্ধ মানুষ দরজা খুলে দিলেন। চোখ দুটো কোটরাগত, দেখলেই বোঝা যায় মানুষটা এক চরম আতঙ্কে দিন কাটায়।

“কে আপনি?” বৃদ্ধ কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন।
ঈনশু চারপাশটা দেখে নিয়ে বলল, “আপনিই কি মেডিকেল কলেজের সাবেক ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট করিম সাহেব? আমি আরিয়ান খানের ব্যাপারে কথা বলতে এসেছি।”

‘আরিয়ান’ নামটা শুনতেই বৃদ্ধের মুখটা ভয়ে নীল হয়ে গেল। সে ওমনি দরজাটা বন্ধ করে দিতে চাইল, কিন্তু ঈনশু নিজের জেদি পা-টা দরজার ফাঁকে গলিয়ে দিয়ে চতুর গলায় বলল, “দরজা বন্ধ করবেন না চাচা! আমি আরিয়ানের যমজ ভাই আরশাদের স্ত্রী। আমি জানি আরিয়ান আত্মহ-ত্যা করেনি, তাকে খু-ন করা হয়েছিল। মিস্টার জামান আর প্রিন্সিপাল মিলে ওকে মে-রেছে, তাই না?”

করিম চাচা কাঁপতে কাঁপতে ঈনশুকে ঘরের ভেতর টেনে নিলেন এবং দরজাটা লক করে দিলেন। তিনি ফিসফিস করে বললেন, “মা, তুমি এখানে কেন এসেছ? আরশাদ সাহেব তো আমাকে কঠোরভাবে বারণ করেছিলেন ওনার পরিবারের কেউ যেন এই ঠিকানায় না আসে! ওনারা বড্ড বিপজ্জনক মানুষ!”

ঈনশু চোখ বড় বড় করে বলল, “তার মানে আয়াজ… আই মিন আরশাদ আপনার খোঁজ অলরেডি জানে?”

“হ্যাঁ!” করিম চাচা বললেন, “বিগত পাঁচ বছর ধরে আরশাদ সাহেব আমাকে আগলে রেখেছেন, এই ঘরের খরচ দিচ্ছেন। আরিয়ানের খু-নের সব আসল অডিও ক্লিপ আর ল্যাবের সেই ড্রাগ সিন্ডিকেটের অরিজিনাল ফাইলগুলো আমার কাছেই গচ্ছিত আছে। আরশাদ সাহেব বলেছেন, আগামীকাল কলেজের কনফারেন্সে ওগুলো জামানের সামনে ওপেন করা হবে। কিন্তু…”

“কিন্তু কী চাচা?” ঈনশু উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল।

“কিন্তু জামান সাহেব বড্ড চতুর লোক। ওনারা অলরেডি টের পেয়ে গেছেন যে কলেজের ভেতরে কোনো একজন প্রফেসরের ছদ্মবেশে আরিয়ান খানের ভাই লুকিয়ে আছে। ওনারা আজ রাতেই ওই কলেজের ল্যাবে একটা বড়সড় অঘটন ঘটানোর প্ল্যান করছেন, যাতে আগামীকালকের কনফারেন্সটাই ক্যানসেল হয়ে যায়! আরশাদ সাহেব আজ রাতে একাই ওই ল্যাবে যাচ্ছেন প্রমাণগুলো ডাবল চেক করতে। ওনার জীবন বড্ড ঝুঁকিতে, মা!”

ঈনশুর মাথার ভেতর যেন একটা টাইম বম টিকটিক করে জ্বলতে শুরু করল। তার মানে, আগামীকালকের কনফারেন্স নয়, আসল খেলাটা জমবে আজ রাতেই কলেজের সেই অন্ধকার ল্যাবরেটরিতে!

রাত ৯টা ৩০ মিনিট।
কলেজ ক্যাম্পাস এখন একদম জনমানবহীন। নিরাপত্তারক্ষীরা মেইন গেটে ঘুমাচ্ছে। ঈনশু একটা কালো চাদর গায়ে জড়িয়ে পেছনের পাঁচিল টপকে ভেতরে ঢুকল। কলেজের এই চত্বরে সে চার বছর ধরে ক্লাস করেছে, এখানকার প্রতিটা কোণ তার নখদর্পণে। তার চতুর আর জেদি মন আজ এক চরম সাহসের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে।

সে পা টিপে টিপে তিনতলার সেই ওল্ড মেডিকেল ল্যাবের সামনে এসে দাঁড়াল। ল্যাবের দরজাটা সামান্য ফাঁকা, ভেতর থেকে আবছা একটা নীল আলো আসছে।

ঈনশু দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি ম-ারল। ভেতরে ল্যাবের টেবিলের ওপর ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করছেন ড. আরশাদ খান আয়াজ। তাঁর চোখে চশমা নেই, কপালে চিন্তার ভাঁজ। তিনি খুব দ্রুত কোনো একটা ড্রাইভ থেকে ডেটা কপি করছেন।

ঠিক তখনই ল্যাবের পেছনের অন্ধকার কোণ থেকে একটা খিলখিল হাসির শব্দ শোনা গেল।
“আমি জানতাম, প্রফেসরের এই মুখোশের আড়ালে আসলে আরিয়ানের ওই ম-রা ভাইটাই লুকিয়ে আছে!”
ঈনশু চমকে উঠে দেখল, অন্ধকার থেকে বের হয়ে এলেন স্বয়ং মিস্টার জামান! আর তাঁর ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে দুজন হট্টকট গুন্ডা, যাদের হাতে চকচকে রিভলভার।

আয়াজ কিন্তু একটুও চমকালেন না। তিনি ল্যাপটপটা বন্ধ করে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর সেই শীতল, বাঘের মতো চাউনিটা আবার ফিরে এলো। তিনি অত্যন্ত শান্ত গলায় বললেন, “মিস্টার জামান, আপনি এত দেরিতে আমার ফাঁদে পা দেবেন, তা আমি ভাবিনি। অপরাধী যতই চতুর হোক না কেন, নিজের পাপের প্রমাণ লোপাট করতে সে একবার হলেও অকুস্থলে ফিরে আসে।”

জামান একটা বিকট হাসি দিয়ে বললেন, “এই ল্যাবরেটরির ভেতরেই তোর ভাই আরিয়ান ঝুলছিল, আর আজ তোকেও এই ল্যাবেই শেষ করে দেওয়া হবে। আগামীকালকের কনফারেন্সে তুই কিসের প্রমাণ দেখাবি শুনি? এই গুন্ডা দুটো তোকে আর তোর এই ল্যাপটপকে পুড়িয়ে ছাই বানিয়ে দেবে। তারপর পুলিশ ভাববে, শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লেগে প্রফেসর আয়াজ মারা গেছেন!”

গুন্ডা দুটো রিভলভার তাক করল আয়াজের দিকে।
ঈনশুর বুকের ভেতরটা তখন কাঁপছে। এখন আর লুকানোর সময় নেই। সে ল্যাবের দরজার পাশে থাকা মেইন পাওয়ার সাপ্লাইয়ের বড় লাল সুইচটার দিকে তাকাল।

তার ঠোঁটের কোণায় এক চিরচেনা, চতুর আর জেদি হাসি ফুটে উঠল। সে মনে মনে বলল, “প্রফেসর সাহেব, আপনার থিওরি আজ আমার এই প্র্যাক্টিক্যালের কাছে ফেল করবে!”

এক, দুই, তিন… ঈনশু এক ঝটকায় মেইন পাওয়ারের সুইচটা নিচে নামিয়ে দিল!

পুরো ল্যাবরেটরি মুহূর্তের মধ্যে ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে গেল! আর সাথে সাথেই ল্যাবের ভেতর থেকে একটা গুলির আওয়াজ আর জামানের চিৎকার শোনা গেল “কে? কে লাইট বন্ধ করল? ধর ওটাকে!”

(চলবে…)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here