প্রফেসরের_জেদিলতা #আরিবা_নাওশীন #পর্ব_২১

0
2

#প্রফেসরের_জেদিলতা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_২১

মেঝেতে পড়ে থাকা চিরকুটটার দিকে তাকিয়ে ঈনশুর শ্বাসপ্রশ্বাস যেন এক মুহূর্তের জন্য আটকে গেল। “বড্ড কাছের কেউ” এই তিনটে শব্দ তার মগজের কোষে কোষে হাতুড়ির মতো পিটছে। সায়েব বোকার মতো চিঠিটার দিকে তাকিয়ে বলল, “কী রে ঈনশু? কুরিয়ারের চিঠি নাকি? ওমন ভূত দেখার মতো করছিস কেন?”

ঈনশু সায়েবকে উত্তর দেওয়ার আগেই আয়াজ সিঁড়ির শেষ ধাপটা পেরিয়ে এসে দাঁড়াল। ওার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এক সেকেন্ডে মেঝের কাগজটা আর ঈনশুর ফ্যাকাশে মুখের সমীকরণটা পড়ে ফেলল। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে কাগজটা কুড়িয়ে নিল। চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে লাইনের ওপর চোখ বুলাল।

ঈনশু ভাবল আয়াজ হয়তো আবার সেই কাল রাতের মতো হিংস্র বা চিন্তিত হয়ে পড়বে। কিন্তু অবাক কাণ্ড! আয়াজের মুখে কোনো ভয়ের রেখা ফুটল না, বরং ওনার ঠোঁটের কোণায় সেই পরিচিত, চতুর বাঁকা হাসিটা আরও স্পষ্ট হলো।

তিনি কাগজটা ভাঁজ করে নিজের পকেটে পুরতে পুরতে সায়েবকে বলল, “সায়েব, নিচে মার কাছে যাও, বলো আমার জন্য এক কাপ ব্ল্যাক কফি ওপরে পাঠিয়ে দিতে।”

সায়েব পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না, সোজা রান্নাঘরের দিকে কেটে পড়ল।
আয়াজ এবার ঈনশুর মুখোমুখি হল। ওর একটা হাত ঈনশুর কোমরে লক হয়ে তাকে নিজের একটু কাছে টেনে নিল। ওনার শরীরের সেই চেনা, পুরুষালি সুবাস এক নিমেষে ঈনশুর ভেতরের ভয়টাকে কিছুটা থিতু করল।

“আমার চতুর জেদিলতা কি শুধু দুটো টাইপ করা লাইন দেখেই দমে গেল?” আয়াজ নিচু, মায়াবী স্বরে বললেন।

ঈনশু ওনার শার্টের বোতামটা আঙুল দিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে জেদি গলায় বলল, “ঠাট্টা করবেন না, আয়াজ! এই চিঠিতে যা লেখা আছে, তার মানে বোঝেন? হাবিবুল্লাহর চেয়েও বড় কেউ আছে, আর সে নাকি আমাদের খুব কাছের! আমার বাবার নাম তো অলরেডি হাবিবুল্লাহ নিয়েছিল… তবে কি…?”

আয়াজ ঈনশুর কপালে নিজের ঠোঁট দুটো আলতো করে ছুঁইয়ে ওনার অস্থিরতা শান্ত করলেন। তারপর চশমাটা ঠিক করে গম্ভীর গলায় বললেন, “ভয়কে তখনই জয় করা যায় যখন তুমি শত্রুর চেয়ে এক কদম এগিয়ে ভাবো। এই চিঠিটা হাবিবুল্লাহ বা জামানের কোনো বিশ্বস্ত লোক পাঠিয়েছে, যাতে আমরা নিজেদের ভেতরের মানুষকে সন্দেহ করে নিজেদের পরিবারটাকে ধ্বংস করে দিই। এটা শুধু একটা মেন্টাল গেম, ঈনশু।”

“তার মানে আপনি বলতে চান আমাদের কাছের কেউ জড়িত নয়?” ঈনশু চোখ সরু করে শুধাল।

“জড়িত থাকুক বা না থাকুক, ড. আরশাদ খান আয়াজ কোনো বেনামী চিঠির হুমকিতে নিজের ঘর ভাঙতে দেবে না,” আয়াজ ঈনশুর গালে আলতো টোকা দিয়ে ফানি সুরে বলল, “এখন এই চিঠি নিয়ে থিসিস করা বন্ধ করে চলো, আয়াতকে ঘুম থেকে তোলার সময় হয়েছে। প্রফেসরের মেয়ে বেশি ঘুমালে কিন্তু তার আইকিউ (IQ) কমে যাবে!”

পরদিন সকাল। খান বাড়ির আবহাওয়া আবার আগের মতো চঞ্চল। বিশেষ করে সায়েব আজ সকাল সকাল খুব পরিপাটি হয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে আছে। গায়ের শার্টে অতিরিক্ত পারফিউমের গন্ধ ছড়াচ্ছে, আর সে ঘনঘন ফোনের স্ক্রিন দেখছে।

ঈনশু চায়ের কাপ টেবিলে নামিয়ে রাখতে রাখতে সায়েবকে পর্যবেক্ষণ করল। তার চতুর চোখ সায়েবের এই ‘অতি-ভদ্র’ রূপের পেছনের কাহিনিটা এক সেকেন্ডে ধরে ফেলল।

“কী রে সায়েব? আজ যে বড় সুগন্ধি ছড়িয়ে বসে আছিস? কলেজ তো পরশু খুলবে, আজ কার সাথে প্রজেক্ট ডিফেন্স করতে যাচ্ছিস শুনি?” ঈনশু টেবিলে বসতে বসতে বাঁকা হেসে বলল।

সায়েব ওমনি আমতা আমতা করে বলল, “আরে না… মানে… আমার ওই ডিপার্টমেন্টের ফ্রেন্ড নীলিমা আছে না? ওর কিছু সাইকোলজির নোটস লাগবে। ভাবলাম আয়াজ ভাইয়ের ল্যাব থেকে যদি কটা বই নিয়ে ওকে হেল্প করা যায়…”

সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই আয়াজের গম্ভীর গলা শোনা গেল, “আমার পার্সোনাল ল্যাবের বই অন্য ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্টকে দেওয়ার নিয়ম ডায়েরিতে লেখা নেই, মিস্টার সায়েব।”

সায়েব ওমনি সোফায় সোজা হয়ে বসে জিব কাটল। আয়াজ এসে চেয়ারে বসল, ওর পরনে যথারীতি ইস্ত্রি করা ফরমাল শার্ট। সে চশমাটা ঠিক করে সায়েবের দিকে তাকিয়ে বললেন, “নীলিমা মেয়েটি মেধাবী, কিন্তু তার প্রজেক্ট পার্টনার যদি অলস হয়, তবে সেই সম্পর্কের কেরিয়ার গ্রাফ বড্ড নিচের দিকে নামবে। বই নিতে পারো, কিন্তু বিকেলের মধ্যে ওটা টেবিলে ফেরত চাই।”

সায়েব এক গাল হেসে বলল, “ধন্যবাদ আয়াজ ভাই! তুমি যে এত বড় দিলের মানুষ, আমি আজ নীলিমাকে গিয়ে বলব!” বলেই সে পরোটাটা মুখে পুরে ব্যাগ নিয়ে এক ছুটে বেরিয়ে গেল।

ঈনশু আয়াজের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, “প্রফেসর সাহেব তো বেশ রোমান্টিক ডিল করছেন! সায়েবের প্রেম রোগটা বেশ ভালোই ধরতে পেরেছেন।”

আয়াজ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ঈনশুর দিকে তাকাল। ওনার চোখ দুটো আজ বড্ড গভীর। “অন্যের প্রেম রোগ ধরা সহজ, ঈনশু। কিন্তু নিজের ঘরের জেদিলতা যখন সব জেনেও মুখ ফুটে কিছু বলে না, তখন প্রফেসরের থিওরিও থমকে যায়।”

ঈনশু চোখ নামিয়ে চায়ের কাপে চামচ নাড়তে লাগল। সে জানে, আয়াজ কিসের ইঙ্গিত করছেন। সে এখনো ওকে সরাসরি “ভালোবাসি” শব্দটা মুখে বলেনি, সবটাই শুধু চাতুর্য আর ইশারায় চলে।

বিকেলের দিকে ঘরের পরিবেশটা একদম বদলে গেল। আয়াতকে বারান্দার মেঝেতে দাঁড় করিয়ে সুমি বেগম আর শাপলা বেগম হাততালি দিচ্ছিল। আয়াত তার ছোট্ট দুটো পায়ে ভর দিয়ে টলমল করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।

ঈনশু বারান্দার এক কোণায় দাঁড়িয়ে দেখছিল। ঠিক তখনই আয়াজ এসে ওর পেছনে দাঁড়াল। ওর চওড়া বুকটার সাথে ঈনশুর পিঠটা আবার লেপ্টে গেল। আয়াজ নিজের দুটো হাত ঈনশুর পেটের ওপর জড়িয়ে ধরল। ওনার এই অতর্কিত রোমান্টিক আক্রমণে ঈনশু একটু কেঁপে উঠলেও নিজেকে সরাল না।

“বাবা… বা-বা…” আয়াত হঠাৎ আয়াজকে দেখে এক পা, দু পা করে গুটিগুটি পায়ে হেঁটে এসে আয়াজের পা জড়িয়ে ধরল।

আয়াজ ওমনি নিচু হয়ে নিজের কলিজার টুকরো মেয়েকে কোলে তুলে নিল। ওর মুখে তখন এক পরম সুখী বাবার হাসি। তিনি আয়াতকে কোলে নিয়ে ঈনশুর মুখের খুব কাছে নিজের মুখটা আনল। ওনার উষ্ণ নিঃশ্বাস ঈনশুর গালে লাগছিল।

“দেখো ঈনশু,” আয়াজ খুব নিচু ও মায়াবী স্বরে বললেন, “আমাদের মেয়ে আজ প্রথম হাঁটতে শিখল। দুনিয়ার কোনো বেনামী চিঠি, কোনো অতীত রহস্য আমাদের এই সুখ কেড়ে নিতে পারবে না। আমি থাকতে তোমার আর আমাদের বাচ্চার ওপর কোনো আঁচ আসতে দেব না।”

ঈনশু আয়াজের চোখের দিকে তাকাল। চশমার আড়ালে সেই চোখ দুটো আজ শুধু সুরক্ষার ভরসা দিচ্ছিল। ঈনশু আর নিজের চতুরতা ধরে রাখতে পারল না। সে আয়াজের শার্টের কলারটা আলতো করে ধরে ওনার গালে নিজের ঠোঁট দুটো ছুঁইয়ে দিল।
“আমি জানি, আয়াজ,” ঈনশু ফিসফিস করে বলল, “আপনার এই জেদিলতা এখন পুরোপুরি আপনার ঘেরাটোপেই বন্দী।”

আয়াজ মৃদু হাসল। কিন্তু ঠিক তখনই ওনার পকেটে থাকা ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। আয়াজ ফোনটা বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই ওনার মুখের সেই রোমান্টিক হাসিটা এক সেকেন্ডে মিলিয়ে গেল। স্ক্রিনে একটা আননোন নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছে:
“আজ রাতের ফ্লাইটে একজন বিশেষ অতিথি ঢাকা নামছেন, আরশাদ। তোমার বাবার পুরোনো ডায়েরিটা একবার চেক করে নিও।”

আয়াজ ফোনটা পকেটে পুরে নিলেন। ওার চোখ দুটো আবার সেই তীক্ষ্ণ প্রফেসরের রূপে ফিরে গেল। রহস্যটা যেন কিছুতেই তাদের পিছু ছাড়ছে না, বরং প্রতিটা শান্ত মুহূর্তের পর একটা করে নতুন চাল সামনে আসছে।
(চলবে…)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here