মনটা_তারই_সুরে_অনুরাগিনী [ পর্ব-০৪ ] #মেহুলিনা_প্রাপ্তি

0
2

#মনটা_তারই_সুরে_অনুরাগিনী [ পর্ব-০৪ ]
#মেহুলিনা_প্রাপ্তি

” এই মেয়ে তাড়াতাড়ি রুমে এসো। নয়তো শ‍্যাওড়া গাছের পেত্নী এসে ঘাঢ় মটকে দিবে। ”
আহিয়ান এর কথটা শেষ হতে না হতেই দুই তলা বিল্ডিং এর করিডর ঘেঁষে দাড়িয়ে থাকা কদম গাছটার একটা ডাল মড়মড় শব্দ করে ঠাস করে ভেঙে পরলো। আহিয়ানের কথা গুলো বলার পরপর, হঠাৎ পূর্ব সংকেত বিহীন গাছের ডালটা ভেঙে পরতেই রোদেলা ভয় পেয়ে চিৎকার দিয়ে এক দৌড়ে বেলকনি থেকে আহিয়ানের রুমে এসে পরলো। রোদেলা ভয় পেয়ে দৌড়ে, বিছানায় আহিয়ানের পায়ের কাছে গিয়ে বসে পরলো।

রোদেলার এখনও ভয়ে অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছে।আহিয়ান রোদেলার চিৎকার শুনে,শুয়ে থেকেই বিরক্তিকে দুই কান চেপে ধরলো। আহিয়ান রোদেলার দিকে না তাকিয়ে তখনও বিছানায় উপুর হয়ে শুয়ে আছে।কিছুক্ষণ বাদেই আহিয়ান নিজের পায়ের পাতায় কোমল স্পর্শ আর উষ্ণতা খুঁজে পেয়ে মাথা তুলে এক পলক পিছনে ঘুরে দেখলো রোদলা ভয়ে কাচুমুচু হয়ে তার পায়ের কাছে বিড়াল ছানার মতো বসে আছে।আহিয়ান তা লক্ষ‍্য করে বিরক্ততে নাক মুখ কুঁচকে শুয়া থেকে উঠে বসলো।আহিয়ান উঠে বসার সময় তার পায়ের পাতা আবারও রোদেলার তুলতুলে উরুরতে গিয়ে ধাক্কা খেল।আহিয়ান তার পায়ে তালায় কেমন যেন একটা উষ্ণতা অনুভব করলো।আহিয়ানে মনে হলো এরকম উষ্ণতা তার এর আগে কখনও অনুভব হয়নি।রোদেলা আহিয়ানকে উঠে বসতে দেখে নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নিয়ে পিছনে সরে গেল।আহিয়ান নিজেও রোদেলার থেকে কিছুটা দূরে সরে বসে রোদেলার দিকে ভ্রুঁ কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে তাকালো।

রোদেলা সেই দৃষ্টি লক্ষ‍্য করেই আরও পিছিয়ে বসতে বসতে একদম বিছানার কর্ণারে চলে গেল। আহিয়ান রোদেলাকে এখনো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করে যাচ্ছে।রোদেলা আহিয়ানের দিকে তাকিয়ে আবার মাথা নুইয়ে নিল।আহিয়ান রোদেলাকে উঠতে না দেখে বিরক্ত হয়ে এক ধমক দিল,
” এই যাচ্ছো না কেন? এই রুমেই থাকার শখ জেগেছে বুঝি? ”

আহিয়ানের ধমকে রোদেলা ভয়ে ছটফট করে বিছানা থেকে উঠতে নিলেই বিছানার কর্ণারে বসে থাকায় ঠাস করে গিয়ে ফ্লোরের উপর পরলো। রোদেলা ফ্লোরে চিৎ হয়ে পড়েছে, কোমরে ব‍্যথা পেয়ে সাথে সাথে কেঁদে দিল।আহিয়ান বিরক্ত নিয়ে পুরো ব‍্যপারটা লক্ষ‍্য করে রাগে চোয়াল শক্ত করে বিছানা থেকে নেমে রোদেলার কাছে গিয়ে দাড়ালো।রোদেলা ফ্লোরে কোমর চেপে বসে কাঁদছে এখনও।বেচারি ব‍্যথায় আর লজ্জায় মাথা নুইয়ে সমানে আঁচলে চোখের পানি মুছছে। আহিয়ান রোদেলার সামনে দাড়িয়ে কিছুক্ষণ ভ্রুঁ কুচকে পরখ করলো মেয়েটাকে।রোদেলা নাক টেনে, চোখের পানি মুছে তাকালো আহিয়ানের দিকে।আহিয়ান নিজের ঘাঢ়ের দুই পাশে ম‍্যাসাজ করতে করতে তাকালো রোদেলার ফোলাফোলা গালের দিকে। আহিয়ান এক পলক রোদেলার কান্না মাখা মুখখানি দেখে নিয়ে গলা খাঁকাড়ি দিয়ে রোদেলার কোমরের দিকে ইশারা করে বলল,
” এই ছোট শরীরটা নিয়ে এতো লাফালাফি করো কেন মেয়ে? এখন যে উল্টে পরলে? ”

আহিয়ানের কথায় রোদেলা কিছু না বলে মাথা নুইয়ে নিল।আহিয়ান এটা দেখে বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে বলল,
” ধ‍্যাৎ! মুখে কথা নেই নাকি? ওঠো, আর যাও এই রুম থেকে। ”

রোদেলা আহিয়ানের ধমকানিতে নিজেকে আরও গুটিয়ে নিয়ে নিজের কোমর চেপে মৃদু স্বরে বলল,
” উঠতে পারছি না তো। একটু ধরুন না। ”

রোদেলার কথায় আহিয়ান বিরক্তিতে ঠোঁট বাকালো।যেন খুব বড় কিছু আশা করে ফেলছে রোদেলা তার থেকে।আহিয়ান দাড়িয়ে আছে নির্লিপ্ত ভাবে।রোদেলা তাই নিজেই বেডের কর্ণারে হাত চেপে কোমরটা ধরে কোনো রকম উঠে দাড়ালো।

আহিয়ান তার জিহ্বায় গাল ঠেলে পকেটে দুই হাত ধরে রোদেলার উঠে দাড়ানো দেখলো।রোদেলা উঠে দাড়াতেই আহিয়ান রোদেলাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত খুটিয়ে খুটিয় দেখে বলল,
” বয়স কত? ”

হঠাৎ এরকম প্রশ্নে রোদেলা ভড়কে গিয়ে মাথা নিচু করে বলল, ” মানে? ”

রোদেলা পুনরায় জানতে চাওয়াই, আহিয়ান বিরক্ত হলো।সে বিরক্তিতে ‘চ’ সূচক উচ্চারণ করলো।তার এক কথা দুইবার বলার অভ‍্যাস নেই।তাই কিছু না বলে আহিয়ান রোদেলার সামনে থেকে ঘুরে দাড়িয়ে নিজের বেডে গিয়ে ঠাস করে শুয়ে পরলো। রোদেলা আহিয়ানকে এভাবে প্রস্থান করতে দেখে, অপমানিত বোধ করলো।

আহিয়ান শুয়ার পরও রোদেলাকে খুটি মেরে দাড়িয়ে থাকতে দেখে আহিয়িন আবারও বিরক্ত হলো। কয়েক মিনিট পর আহিয়ান বিছানায় শুয়ার মধ‍্যেই নড়েচড়ে, মাথা কাত করে তাকাল‍ো রোদেলার দিকে।এবার আহিয়ানের রাগ মিশ্রিত গমগমে ধ্বনিতে কেঁপে উঠলো পুরো ঘর।
” এখনো দাড়িয়ে আছো? বিদায় হচ্ছো না কেন এই ঘরে থেকে? ”

রোদেলা তড়াক করে চোখ তুলল।আহিয়ানের গম্ভীর রাগে ফুঁসতে থাকা মুখটা দেখে তারও ভীষণ রাগ হলো তবে নিজের রাগ অভিমানটা নিজের ভিতরে রেখেই চুপচাপ মাথা নুইয়ে নিচে নেমে গেল রোদেলা।রোদেলার প্রস্থানের পর আহিয়ান ঘুমোবার চেষ্টা করেও ঘুমোতে পারছে না। আহিয়ান এবার বিরক্ত হয়ে সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো।ড্রয়িং রুমের লাইট অন করতেই দেখলো রোদেলা তার শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে ছোফার কোণায় পা তুলে বসে আছে।রোদেলার হাব ভাব দেখেই বোঝা যাচ্ছে মেয়েটা ভীষণ ভয় পেয়ে আছে। আহিয়ান বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকালো।

আহিয়ান নিচের একটা রুমের দরজায় কয়েকবার ডাকাডাকি করতেই আহিয়ানের নানুমনি বের হলো।আহিয়ান যে ফিরে এসেছে তা তিনি জানতেন না।নাতনিকে দেখেই তিনি বিষ্ময়ে চোখ ছোট করে দেখতে দেখতে বলল,
” একি ভাই কখন আসলি তুই? শুনলাম রাগ করে চলে গিয়েছিলি। ”

আহিয়ান নিজের গায়ে থাকা সাদা স্লিভলেস গেঞ্জিটা গলার দিকে টানতে টানতে বলল,
” কাজ ছিল তাই চলে গিয়েছিলাম। ওহ!
নানুমনি শুনো। ”

আফিয়া নিজের চশমা ঠেলে দৃষ্টি আরও পরিষ্কারক করে নিয়ে বলল, ” হ‍্যাঁ বল।”

আহিয়ান লিভিং রুমে বসে থাকা রোদেলার দিকে দৃষ্টি তাক করে বলল,
” ওই যে মেয়েটা, ওকে দয়া করে নিজের সাথে নিয়ে রাখ তোমরা । আমার রুমে ওকে কেউ পাঠাবে না আর। ”
আহিয়ান কথাটা বলেই চলে যাচ্ছিল তখনি আফিয়া খানম বললেন,
” কিন্তু ও তো তোর বউ তোর ঘরে যাবে না,তো থাকবে কোথায়? ”

আহিয়ান আর নানি শ্বাশুড়ির কথা রোদেলার কানে পৌঁছাতেই সে ছোফা থেকে উঠে আস্তে আস্তে আফিয়ার কাছ ঘেঁষে দাড়িয়েছিল।আহিয়ান বউ কথাটা শুনে বিরক্ততে রাগে তাকালো রোদেলার দিকে।রোদেলার চোখে এখন পানি।আহিয়ান এই পানিটা দেখে এবার যেন অধিক বিরক্ত হয়ে ঝাঝালো গলায় বলল,
” এই বউ,বউ করে আমার সব কিছু এবার ধ্বংসের দ্বারে। এই বউ শব্দটা আর শুনতে চাই না নানু মনি।মমের এই মেয়েকে ছেলের বউ করার সাধ জেগেছিল।সেটা আমি পূরণ করেছি তো। এখন আমাকে আপাদত নিজের মতো থাকতে দাও তোমরা। আর হ‍্যাঁ,ভুলেও এই মেয়েকে আমি নিজের আশেপাশে দেখতে চাই না।”

আহিয়ান কথাগুলো বলে গটগট পায়ে দাম্ভিক ভঙিমায় উপরে নিজের রুমে চলে গেল। আফিয়া কি বলবেন ভেবে পেলেন না।তার নাত বউটার মাঝে তো কোনো সমস‍্যা নেই।খালি যা একটু বয়সটা কম।বর্তমান যুগের আধুনিক মেয়েদের মতো খুব চালাক স্বভাবের না হলেও বেশ নম্র,ভদ্র রোদেলা। আফিয়া দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রোদেলাকে বুকে টেনে নিয়ে চোখের পানি মুছে দিল।রোদেলা আহিয়ানের কথা গুলো শুনে সমানে নাক টেনে কাঁদছিল।আর চোখ মুছে যাচ্ছিল।কান্না লুকানোর বৃথা চেষ্টা করেও রোদেলা ধরা পড়ে গেল আফিয়ার কাছে।আফিয়া রোদেলাকে মাথায়ায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
” কাঁদিস না বোন।আমার নাতিটা একটু রাগী মানুষ।বুঝিসই তো ছেলেটা আর্মির মেজর বলে কথা।ওইসব রুলস ফুলসের ভিতরে চলতে চলতে একটু কাটখোট্টা হয়ে পরেছে।চিন্তা করিস না, এবার তোর মতো মিষ্টি বউ এর মুখ দেখতে দেখতে দেখবি সব তেতো থেকে মিষ্টি হয়ে যাবে। ”

রোদেলা জানে আফিয়া যা বলছে তা এতো সহজ নয়। মেজর সাহেব তাকে দুই চোখে সহ‍্য করতে পারে না।রোদেলার মনে হয় এর থেকে তার সৎ মা ঢের ভালো ছিল।যদিও ওই মহিলাটা মারতো।তবে মেজর সাহেব এখনো তার গায়ে হাত তুলেনি।হাত তোলার অবশ‍্য প্রয়োজন নেই, মুখের কথাতেই তো রোদেলার ছোট বুকটা এফাড় ওফাড় করে দেয় তিনি।রোদেলা সব কিছু জেনেও চোখ মুছে একটা মলিন হাসি দিল।যদিও হাসিটা মিথ‍্যে ছিল।তবুও এই রাতে সে আর ঝামালে বাড়াতে না দিয়ে আফিয়া বেগমের বুক থেকে মাথা তুলে বলল,
” ও নানু চলো তো এবার। খুব ঘুম পেয়েছে চোখে।তোমার জল্লাদ নাতি আমাকে ঘুমাতে না দিয়ে তার
শার্ট ধুইয়েছে। ”

আফিয়া রোদেলার কথায় ভ্রু কুঁচকে বলল,
” সে কিরে?এতো রাতে শার্ট ধোয়ানোর প্রয়োজন পরলো কেন? ”

রোদেলা লজ্জিত হয়ে নিজের কর্মকান্ড খুলে বলল।আফিয়া সব শুনে হেসে লুটিপুটি খেল এই বয়সে। তিনি রোদেলার একটা হাত ধরে রুমের ভিতর নিয়ে যেতে যেতে বলল,
” আমার নাতিটা দেখি আসলেই ডেঞ্জারাস। একটা শার্ট ধোয়াতে তোকে কাঁধে করে,দুই তলায় তুলে নিয়ে গেল। ”

রোদেলা আফিয়ার কথা বলার ধরন বুঝে লজ্জায় মাথা নুইয়ে বলল,
” হুম ”

__________

সকাল নয়টা ব্রেকফাস্ট করতে সবাই টেবিলে হাজির হয়ে, জানতে পারলো আহিয়ান কাল রাতে বাড়ি ফিরে এসেছে।আহিয়ান এখন অবশ‍্য বাড়িতে নেই।সে সকাল সকাল কোথাও বেরিয়েছে।মাশরিফা মায়ের মুখে রাতের ঘটনা সব শুনেছে।আহিয়ানের এসব ছন্নছাড়া ভাব তার পছন্দ হচ্ছে না।সে ঠিক করেছে ছেলে ফিরলে সে ছেলের সাথে এই বিষয়ে কথা বলবেন।

জাবির সাহেব ছোফায় বসে আছে।রোদেলা চায়ের কাপ নিয়ে শশুরের সামনে দাড়ালো। জাবির পেপার থেকে চোখ তুলে এক পলক দেখলো সামনের ছোটখাটো মেয়েটাকে।মুখে কিছু না বলে আবার পেপারে মনোনিবেশ করতে নিলে রোদেলা আস্তে ধীরে বলল,
” বাবা আপনার চা ”

মেয়েলি রিনরিনে কন্ঠে বাবা ডাকটা ভেতর থেকে নাড়িয়ে
দিল জাবির আহমেদকে।তিনি মায়া ভরা চোখে তাকালো নিজের পুত্র বধূর দিকে।জাবির এর মুখে না চাইতেও এক চিলতে হাসি ফুটলো।তিনি হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপ নিয়ে রোদেলার মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
” সুখী হও মা ”

রোদেলার চোখ খুশিতে চিকচিক করে উঠলো।কত দিন পর বাবা নামক ছায়াটা আবার খুঁজে পেল যেন জাবির আহমেদের মধ‍্যে।রোদেলা শাড়ির আঁচলে চোখের জলটুকু মুছে নিয়ে বলল,
” দোয়া করবেন এই মেয়ের জন‍্য। ”

__

আহিয়িনের জন‍্য অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে মাশরিফার জোরাজোরিতে আহিয়ানের দুই দুলাভাই আর বোনেরা নাস্তা সেড়ে নিল।আহিয়ানের ফোনে অন্বেষার স্বামী জুনাইদ আরশাদ কল করেছিল অনেকবার।কিন্তু বারবার বন্ধ বলছে।মাশরিফা ছেলের চিন্তায় আর সকালের নাস্তা করলেন না।রোদেলা সবটা নিবিড় ভাবে দেখে গেল কেবল।রোদেলার মনে একটা কথা খচখচ করছে,
” লোকটা তার প্রতি বিরক্ত হয়ে, বাড়ি থেকে আবারও কোথাও চলে গেল না তো? ”

_______

অন্বেষা,অবন্তির তিন ছেলে মেয়ে বাগানে খেলা করছে।অবন্তির হাতে খিচুড়ি।জয় তা না খেয়ে অন্ত আর অন‍ন‍্যার সাথে দৌড়াদৌড়ি করছে।অন্বেষা বাগানে ছাতার মতো করে তৈরি করা ছাউনিটায় একটা বেতের চেয়ারে বসে ঠ‍্যাং নাড়াচ্ছে।তখনি রোদেলা একটা ট্রে হাতে কাঁচা আমের জুস নিয়ে হাজির হলো সেখানে।জুসটা রোদেলায় নিজের হাতে তৈরি করেছে।আহিয়ানদের বাসাটা অনেকটা জায়গার উপর।বাগানের দিকে বেশ কয়েকটা মাঝারি সাইজের আম গাছ আছে।সেখানে বেশ আম ধরেছে। রোদেলা সেখান থেকেই আম পেরে এনে জুস বানিয়েছে।

অন্বেষা আর অবন্তির ছোট ভাইয়ের বউকে মন্দ লাগেনি।বরং একটু বেশিই ভালো লেগেছে।এরই মধ‍্যে মেয়েটা কেমন তাদের সাথে মিশে গিয়েছে।অন্ত,অনন‍্যা আর জয় তো মামি জপে যাচ্ছে আসছে থেকেই।রোদেলাকে জুস হাতে আসতে দেখে অন্ত,অনন‍্যা ছুটে এলো।জয়ের বয়স মাত্র তিন।সে দৌড়ে এলেও একটু পরে পৌঁছালো।রোদেলা মিষ্টি কালার একটা সুতির থ্রিপিস পরেছে।মাথায় ওড়নাটা সুন্দর করে টানা। অন্ত মামির কাছে ছুটে এসেই বলল,
” মামী আমাকে আগে দাও। ”

অনন‍্যা বলল,
” না মামী আমাকে আগে ”

জয় দুই আঙুলে ভর দিয়ে একটু উঁচু হয়ে নিজের অবস্থান জানান দেওয়ার চেষ্টা করে আদো স্বরে বলল,
” না আমাতে দাও আদে ”

রোদেলা একদিক ওদিক সবদিকে তাকিয়ে সবার কথা শুনে বললল,
” ঠিক আছে,ঠিক আছে। সবাইকে দিচ্ছি। ”
রোদেলা বাচ্চাদের হাতে ছোট গ্লাস গুলো ধরিয়ে দিয়ে বড় গ্লাস দুইটা অন্বেষা আর অবন্তির হাতে দিল।তারা তৃপ্তি সহকারে জুসটুকু শেষ করে বেশ প্রশংসা করলো।অবন্তি আর অন্বেষা ভেতরে চলে গেল।অনন‍্যা,অন্ত আর জয় তাদের মামিকে ভেতরে যেতে দেয়নি।তাদের মনে হয় তাদের মামিও তাদের খেলার পার্টনার। বিধায় এই তিন পুঁচকের ভীরে আরেক কিশোরী যুক্ত হয়েছে আজকে।

অনন‍্যা জেদ ধরলো,তাকে দড়ি দিয়ে একটা ঝুলন্ত দোলনা বানিয়ে দিতে হবে।বাকি সবাই একই সুরে আর্জি জানালো। রোদেলা এদের কথায়, কোথা থেকে খুঁজে যেন একটা দড়ি নিয়ে এলো।বহু কষ্টে সেটা রোদেলা পেয়ারা গাছে উঠে বেঁধে দিল।দোলনা দেখে অন্ত,অনন‍্যা আর জয় অনেক খুশি হয়েছে। দোলনাটায় পর্যায়ক্রমে প্রথমে জয় দোল খেল,তারপর অনন‍্যা।এরপর অন্ত দোল খেয়ে নামতেই তিন জন মিলে তারা তাদের মামিকে জোর করে বসিয়ে দিল।রোদেলা বসলো ভয়ে ভয়ে কারণ দড়িটা তেমন মজবুত নয়।বাচ্চাদের ওয়েট নিতে পারলেও সে বসলে সেটা আগের মতো থাকবে কিনা তাতে তার সন্দেহ আছে। তবুও বাচ্চাদের জোরাজুরিতে নিজের ভিতরে বাচ্চা সুলভ সত্তাটার দেখা পেল রোদেলা।তাই সেও একটু খুশি হয়ে চড়ে বসলো সেটায়। অন্ত,অনন‍্যা আর জয় তারা পিছনে দাড়িয়ে তাদের ছোট ছোট হাতে তাদের মামীকে পিঠে ধাক্কা দিয়ে দোল দিতে লাগলো। দোলের তালে রোদেলার মাথার ওড়না পড়ে গিয়েছে।ওড়না মাথা থেকে সরে যাওয়ায় রোদেলার মাথার হাত খোপা করে রাখা লম্বা চুলগুলো বাঁধন মুক্ত হয়ে, মুক্ত বাতাসে দোলের তালে তালে উপর নিচ হয়ে এলোমেলো উড়তে লাগলো।রোদেলার ঠোঁটে স্নিগ্ধ এক মায়া মাখা হাসি।

তখনি বাড়ির গেইট পেরিয়ে প্রবেশ করলো গম্ভীর স্বভাব সুলভ মেজর সাহেব আহিয়ান আহমেদ অভ্র।কাজের ক্ষেত্রে অবশ‍্য সে আহিয়ান অভ্র নামেই বেশি পরিচিত।আহিয়ান বাগানের দিক থেকে আসা খিলখিলে মেয়েলি হাসির আওয়াজ শুনতে পেল।আহিয়ান নিজের অজান্তেই এই রিনরিনে মিষ্টি হাসির মালিকে দেখার জন‍্য পা বাড়ালো বাগানের দিকে।একটু সামনে এগোতেই সেই অপার মায়া মাখা দৃশ‍্যটা চোখে পরলো আহিয়ানের।তবে তা তার কাছে কতটুকু মুগ্ধকর লাগলো তা কারো জানা নেই। আহিয়ান দেখলো একটা কিশোরি কন‍্যা তার বিশাল কেশরাশি ছেড়ে দিয়ে খিলখিল করে দোলনায় দোল করছে।মুখে তার বিশ্বজয়ের হাসি।পিছনেই ছোট ছোট তিনটা ছেলে মেয়ে তাদের ছোট ছোট হাতে সেই কিশোরিকে মুক্ত হাওয়াই দোল খেতে, বল প্রয়োগ করে সামনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।ছলে মেয়ে তিনটা কিশোরি কন‍্যাটার খুশিতে যেন আরও দ্বিগুণ খুশি।

আহিয়ানের তীক্ষ্ণ চোখে মুহূর্তেই একটা কোমলতা নেমে এসেছে।রোদেলার বাচ্চামোতে তার বিরক্তি লাগার কথা কিন্তু সেই বিরক্তিটা কোথাও যেন লুকিয়ে পরেছে হুট করেই।দোল খাওয়ার এক পর্যায়ে হুট করেই পেছন থেকে বরারবরের মতো একটা ধাক্কা এলো। ঠিক তখনি ফড়ফড় করে দোলনাটার দড়ি ছিড়ে গেল।দোলনা ছিড়ে পরতেই রোদেলা উপর থেকে নাক মুখ থুবড়ে মাটিতে ছিটকে পড়ে,
” আহ্ ” করে আর্তনাদ করে উঠলো।

মুহুর্তেই একটু দূরে দাড়িয়ে থাকা গম্ভীর পুরুষটির চোখের কোমলতা মিলিয়ে সেখানে রাগের দেখা মিলল। মুহুর্তেই আহিয়ানের রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।ধপধপ পা ফেলে এগিয়ে গেল কিশোরীর নিকট।

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here