#মনটা_তারই_সুরে_অনুরাগিনী [ পর্ব-০৮ ]
#মেহুলিনা_প্রাপ্তি
রোদেলাকে একই জায়গায় বসে থাকতে দেখে আহিয়ান বিরক্তিতে চোখ খুললো। কিন্তু এবার তার দৃষ্টি গিয়ে থামলো রোদেলার কপালের ফুলে ওঠা জায়গাটায়। কান্নার দাগে ভেজা মুখটা অদ্ভুত রকম নিশ্চুপ। একটু আগের সেই ছটফটে মেয়েটাকে এখন কেমন ভাঙা পুতুলের মতো লাগছে।
আহিয়ানের ভ্রু কুঁচকে গেল। রাগটা এখনও কমেনি, কিন্তু ভেতরে কোথাও এক ধরনের অস্বস্তি খোঁচা দিতে লাগলো।
রোদেলা ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকালো। কাঁপা গলায় বলল,
— “আপনি যদি আমাকে বিশ্বাস না করেন, আমি জোর
করবো না। কিন্তু আমি মিথ্যা বলিনি।”
তারপর ওড়নাটা তুলে নিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই একটু টলে গেল।আহিয়ান চোখ সরিয়ে নিল।
ঠিক তখনই দরজায় ঠক ঠক শব্দ হলো।
বাইরে থেকে আফিয়ার কণ্ঠ ভেসে এলো,
— “রোদেলা? তুই এখানে আছিস?”
রোদেলা আফিয়ার কণ্ঠ শুনে যেন হুঁশে ফিরলো। তাড়াহুড়ো করে চোখের পানি মুছে নিল। কাঁপা হাতে ওড়নাটা ঠিক করে নিয়ে মাথা নিচু করলো।
বাইরে আবার আফিয়া ডাক দিল,
” আহিয়ান তোর রুমে রোদেলা এসেছে নাকি? রোদালা,এই রোদেলা। মেয়াটা কথায় গিয়ে উধাও হলো”
আফিয়া আবার ডাকতেই রোদেলা দ্রুত একবার আহিয়ানের দিকে তাকালো। লোকটা এখনও বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় আছে, তবে তার দৃষ্টি স্থির রোদেলার দিকেই।মুখোভঙিমা গম্ভীর।রোদেলার বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। এই অবস্থায় আফিয়া যদি ভেতরে আসে, তাহলে কত প্রশ্ন করবে। কপালের ফুলে থাকা জায়গাটাও চোখ এড়াবে না হয়তো।
রোদেলা কোনো রকম নিজেকে সামলে নিয়ে দরজার দিকে পা বাড়ালো।ওড়না দিয়ে কপাল নিখ মুখ ভিলো করে ঢেকে ফেলল। রোদেলা দরজা খুলতেই আফিয়া ভ্রু কুঁচকে তাকালো,
“তুই এখানে? আমি তোকে রুমে খুঁজছিলাম।”
রোদেলা ঠোঁটের কোণে জোর করে ছোট্ট হাসি এনে বলল,
“ওই…নানুমনি তোমার নাতিকে কফি দিতে এসেছিলাম।”
আফিয়া সন্দেহভরা চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো।
“তোর গলা এমন শোনাচ্ছে কেন?”
রোদেলা এক মুহূর্ত থমকে গেল। তারপর দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে বলল,”কিছু না। একটু মাথা ধরেছে।”
আফিয়া আর কিছু বলার আগেই রোদেলা প্রায় তাড়াহুড়ো করেই সামনে হাঁটতে শুরু করলো।
পিছন থেকে আফিয়া অবাক হয়ে বলল,
“এই, দাঁড়া তো ছেড়ি! এমন পাগলের মতো ছুটছিস কেন?”
কিন্তু রোদেলা থামলো না।
তার চোখ দুটো আবারও টলমল করছে। শুধু একটাই চিন্তা মাথায় ঘুরছে—
“কেন আহিয়ান তাকে বিশ্বাস করছে না?”
__________
এদিকে পার্টির পরিবেশ এখনও জমজমাট। চারদিকে আলো ঝলমল করছে। ডিজের শব্দে পুরো জায়গাটা মুখর হয়ে আছে। তবে এসবের মাঝেও মেজর শায়ান শিবলীর মুখে আজ অদ্ভুত এক তৃপ্তির ছাপ।হাতে জুসের গ্লাস নিয়ে এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে সে। তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে তার কয়েকজন সহকর্মী। সবাই নিজেদের মধ্যে গল্পে ব্যস্ত হলেও শিবলীর চোখে যেন অন্য চিন্তা খেলা করছে।
ল্যাফটেন্ট রাফসান পাশ থেকে হেসে বলল,
— “কি ব্যাপার স্যার ? হঠাৎ এতো চুপচাপ হয়ে গেলেন যে? একটু আগেও তো পুরো ফ্লোর কাঁপিয়ে নাচছিলেন।”
শিবলী ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে গ্লাসে চুমুক দিল।
— “কিছু না।”
রাফসান ভ্রু নাচিয়ে বলল,
— “আসলে ঠিক মেনে নিতে পারছি না! আপনার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে মাথায় কিছু পাকাচ্ছেন।”
শিবলী এবার মাথা নিচু করে হালকা হেসে ফেললো।
অনেক বছর ধরেই আহিয়ান আর শিবলীর মধ্যে এক ধরনের নীরব প্রতিযোগিতা চলছে। ট্রেনিং হোক কিংবা দায়িত্ব — প্রায় প্রতিটা জায়গাতেই আহিয়ান,শিবলীর থেকে এক ধাপ এগিয়ে থেকেছে। বিষয়টা শিবলী কখনও মুখে প্রকাশ না করলেও ভেতরে ভেতরে সেটা তাকে অদ্ভুতভাবে পোড়াতো।
শিবলী আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
— “সবসময় প্রথম হওয়া যায় না, মেজর আহিয়ান অভ্র।”
তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত ঝিলিক ফুটে উঠলো।ঠিক তখনই শিবলীর ফোনটা কেঁপে উঠলো।
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।অচেনা নাম্বার।কয়েক সেকেন্ড ফোনের দিকে তাকিয়ে থেকে শিবলী কলটা রিসিভ করলো।
অপর পাশ থেকে কেউ কিছু বললো না।
তারপর হঠাৎ একটা শান্ত কণ্ঠ ভেসে এলো—
— “খেলা তো সবে শুরু হয়েছে, মেজর শায়ান শিবলী…”
শিবলীর মুখের হাসিটা এক মুহূর্তে চওড়া হয়ে আবার মিলিয়ে গেল।
_____________
শহরের আরেকটা দিক এখনও রাতের অন্ধকারে ডুবে আছে। যেখানে শুধু ফিসফিসিয়ে কথা বলা কিছু ভয় আর প্রভাবশালী ছায়ার অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে।
শহরের পুরনো এক বিল্ডিংয়ের নিচতলায় বড় লিভিং এড়িয়া জুড়ে বিরাজ করছে এক নিস্তব্ধতা।এখানে আলোটাও খুব কম। মোটা কাঁচের দরজার ওপারে বসে আছে এক বলিষ্ঠ দেহের সুপুরুষ। তার নাম কেউ সরাসরি নেয় না, সবাই শুধু তাকে আমেরিকার ‘ ব্ল্যাক ভাইপার ইউনিট ‘ ভিলেন গোষ্ঠীর ডেভিল ড্যাড বা বস বলে সম্মোধন করে।আন্ডারওয়ার্ল্ডে তার পরিচয় একটাই—সবচেয়ে ঠান্ডা মাথার খিলারি।একই সাথে প্রাণঘাতী এক মরণাস্ত্র । দুনিয়ার সামনে এক ক্ষমতাধারী নিকৃষ্ট এক গ্যাংস্টার সে। এই ক্ষতাধারী কালো জগথের রাজার নাম
‘ ইভান রেইনহার্ট ‘ ।
যার নামের অর্থ ‘অটল শক্তির অধিকারী’ এমন বোঝায়।
_____
ইভান রেইনহার্ট নামধারী লোকটা এখন বাংলাদেশে অবস্থান করছে।লিভিং রুমের পরিবেশ হঠাৎই বদলে গিয়েছে। আগের সেই ঠান্ডা নীরবতার জায়গায় এবার একটা ভারী উপস্থিতি যেন বাতাসে ঝুলে রইল।
আন্ডারওয়ার্ল্ডে তাকে সবাই ইভান রেইনহার্টকে “মিরর কন্ট্রোলার” নামে চেনে। কারণ সে শুধু মানুষ না,তাদের সিদ্ধান্ত, সম্পর্ক আর দুর্বলতাকেও নিজের মতো করে “প্রতিফলন” বানিয়ে ফেলতে পারে।
ইভান রেইনহার্ট ৩৩ বছরের বলিষ্ঠ গড়ন এর অধিকারী সুপুরুষ। দেখতে লম্বা ও শক্তপোক্ত ধাচের সে।কিন্তু অতিরিক্ত পেশীবহুল না—বরং এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ উপস্থিতি, যেটা দেখলে মনে হয় সে সবসময় হিসেব করে শরীর এমন ফিট রেখেছে। তার গায়ের রং গাঢ় শ্যামলা, আর মুখে হালকা দাড়ির ছায়া তাকে আরও কঠিন, সংযত লুক দেয়।
চুল ছোট করে সেট করা, সামান্য এলোমেলো ভাব থাকলেও সেটা ইচ্ছাকৃত বলেই মনে হয়। চোখ দুটো ধূসর-বাদামি—ঠান্ডা, স্থির, আর অস্বাভাবিকভাবে মনোযোগী। সেই চোখে কারও দিকে তাকালে মনে হয়, সে শুধু মানুষটা না, সেই মানুষটার পেছনের গল্পটাও পড়ে ফেলছে।
ইভানের সামনে টেবিলে রাখা আছে রোদেলার একটি ছবি।সে ছবিটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। কোনো তাড়াহুড়ো নেই তার, কোনো আবেগও নেই—শুধু গভীর পর্যবেক্ষণ। তার আঙুল ধীরে ধীরে ছবির ওপর বুলিয়ে গেল, যেন সে কোনো বাস্তব মানুষকে ছুঁয়ে দেখছে না—বরং একটা গুরুত্বপূর্ণ আত্মিক অস্তিত্বে ছুঁয়ে দেখছে।
পাশে দাড়িয়ে থাকা একজন নিচু স্বরে বলল,
“স্যার, মেয়েটা এখনো সাধারণ জীবনেই আছে। ও জানেও না আপনি….”
ইভান মাঝপথে লোকটাকে থামিয়ে দিল।সে আবার রোদেলার ছবির দিকে তাকাল। এবার তার চোখে সামান্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল। একটা পরিকল্পনার ছায়া।
ইভান রেইনহার্ট ছবিটা টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়াল। জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকাল।
শহরের আলো ঝলমল করছিল, কিন্তু তার চোখে কোনো অনুভূতি দেখা গেল না।পেছনে টেবিলে রোদেলার ছবিটা পড়ে রইল নীরব, অজানায়।
_______________
আজকের সকালটা নরম রোদের মতো শান্ত। জানালার কাচে সূর্যের আলো এসে পড়তেই ঘরটা ধীরে ধীরে উষ্ণ হয়ে উঠছিল। রোদেলা তখনও বিছানার এক কোণে গুটিসুটি মেরে ছিল। রোদেলার চুল এলোমেলো, চোখে ঘুমের ভার, কিন্তু মুখে অদ্ভুত এক নীরবতা।
বাইরে পাখির ডাক শোনা যাচ্ছিল। দূরের গাছ-পালার পাতায় হালকা বাতাস দুলে উঠছে। এরকম একটা সকাল, দেখেই মনে হয় যেন সব কিছু ঠিক হয়ে যেতে পারে হয়তোবা।
রোদেলা ধীরে ধীরে চোখ খুলল। প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। তারপর স্মৃতিগুলো ধীরে ধীরে ফিরে এলো—গতকালের কথা, ভাঙা মনটা, আর সেই নিঃশব্দ ক্লান্তি।
সে বিছানা থেকে নামল না। শুধু বসে জানালার দিকে তাকিয়ে রইল।আফিয়া আগেই উঠে পড়েছিল।
হঠাৎ দরজার ওপাশে হালকা শব্দ হলো। কারও পায়ের শব্দ খুব ধীর ভাবে শুনতে পেল রোদেলা।রোদেলার মনে হলো কেউ তার রুমের দরজার আড়ালে অনেক্ষণ দাড়িয়ে ছিল।তারপর এখন নিরবে প্রস্থান করছে যেন।
রোদেলার মনে হলো সে ভুলভাল কল্পনা করছে।মাথা থেকে এসব ঝেড়ে উঠতে নিলেই।মাশরিফাকে তার রুমে নাস্তা হাতে ভেতরে ঢুকতে দেখলো।রোদেলা দ্রুত ওড়না খুঁজে গায়ে জড়িয়ে গলা আর কপাল ঢেকে নিল।মাশরিফা বলল,
” হ্যাঁ রে রোদেলা,তোর গায়ে জ্বরটর আসেনি তো?
মা বলল তোর শরীরটা নাকি ভালো না।কি হয়েছে?গায়ে জ্বর জ্বর ভাব আছে কি? ”
রোদেলা মাশরিফার কথায় মৃদু হাসি টেনে মাথা নাড়িয়ে বলল,
” না তেমন কিছু নঋ আম্মু। হঠাৎ আজকে খুব ভালো ঘুম হলো। তাইতো উঠতেই পারছিলাম না। ”
মাশরিফা রোদেলার মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে দিল।
” আচ্ছা ঠিক আছে।এখন যা তাড়াতাড়ি খেয়ে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে নে। কয়টা বাজে সে খেয়াল কি রেখেছিস?কোচিং এর সময় হয়ে যাচ্ছে যে। ”
রোদেলা মাশরিফার কথায় তড়াক করে তাকলো ঘড়িটার দিকে।দেখলো নয়টা বেজে গিয়েছে।দশটায় কোচিং শুরু হবে তার।এস.এস.সি পরিক্ষার্থী হওয়ায় এখন আর তাকে স্কুলে ক্লাস করতে হয়না। বাইরে শুধু একটা কোচিং করতে যায় সে।রোদেলা সময় দেখে মাথায় হাত দিল।তারপর দৌড়ে চলে যেতে বলল,
” হায় খোদা! এতো দেরি হয়ে গেল। আম্মু তুমি খাবার রেখে দাও, আমি খেয়ে নিব। ”
মাশরিফা রোদেলার কথা শুনলেন না।তিনি খাবার নিয়ে বসেই রইলেন।রোদেলা হাত-মুখ ধুয়ে এসে দেখলো তার শাশুড়ি এখনও বসে আছেন।রোদেলা আসতেই মাশরিফা মেয়েকে কাছে টেনে নিলেন।রোদেলা মায়া মায়া চোখে তাকিয়ে হাসি দিতেই।মাশরিফা হঠাৎ রোদেলার কপালের উপর থেকে ওড়নাটা সরিয়ে দিতেই, রোদেলার কপালে খয়েরী হয়ে ওঠা ফুলো জায়গাটা দেখে আঁতকে উঠলো তিনি।
মাশরিফা রোদেলার কপালের ফুলে ওঠা জায়গাই হাত দিয়ে বলল,
” এখানে কি হয়েছে? কতটা ফুলে আছে। আমাকে দেখালি না কেন ? ”
রোদেলা আমতা আমতা করে বলল,
” কাল রাতে বাথরুমে স্লিপ খেয়ে পড়ে গিয়েছিলাম আম্মু।চিন্তা করো না ব্যথা কমেছে এখন। ”
মাশরিফা রোদেলার কথায় রোদেলার দিকে অনেকক্ষণ শক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো।তারপর কিছু না বলে,একটা মলম এনে রোদেলাকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে যত্ন করে কপালে মলম লাগিয়ে দিল।
রোদেলা মনে মনে হাসলো।
” ছেলে আঘাত করে ক্ষত বানায়, আর মা সেই ক্ষতে মলম লাগিয়ে দেয়।কি অদ্ভুত তাই না? ”
_________
কোচিং এ তানিয়া আর ইনায়া অনেক আগেই চলে এসেছে।এখন তারা বসে বসে রোদেলার জন্য অপেক্ষা করছে। রোদেলার বিয়ের পর তাদের এক দুবার ফোনে কথা হয়েছে।আজকে অনেকদিন পর আবার তারা সবাই রোদেলার সাথে দেখা করবে বলে মুখিয়ে আছে।তাদের সাথে যোগ দিয়েছে আরও দুইজন ছেলে তানভীর আর তাশিন।এরা দুজন জমজ ভাই।এখন এরা অন্য স্কুলে পড়লেও প্রাইমারি পর্যন্ত পাঁচজন এক সাথেই পড়েছে।তাই তো ছোট বেলার বন্ধুত্ব এখনও রইয়ে গিয়েছে।
_______
রোদেলা পার্পেল কালার থ্রিপিসের সাথে গোল্ডেন কালার এর হিজাব পরে বেরিয়েছে।রোদেলা বাইরে আসার সময় অন্ত,অনন্যা আর জয় খুব বায়না করছিল তার সাথে আসার জন্য।অন্ত আর অনন্যাকে সবাই একরকম বুঝিয়ে মানাতে পারলেও ছোট জয় কিছুই মানছিল না।সে মামির সাথে মামির কোচিং এ যাবে মানে যাবেই।পরে অবশ্য ছেলেটাকে কাঁদিয়েই বের হতে হয়েছে তাকে।
রোদেলা কোচিং এ এসে বন্ধু মহলকে দেখেতেই তার চোখ খুশিতে চকচক করে উঠলো।কতদিন পর দেখলো এদের।রোদেলা হিজাবের চারপাশটা হাতে ঠিক করতে করতে সামনে এগোতে থাকলো।মুখে লেপ্টে আছে স্নিগ্ধ সরল এক হাসি।রোদেলা দুই কদম কি তিন কদম এগিয়েছে তখনি বন্ধু মহলের সবার কন্ঠে একটা গান এর লিরিক্স শুনে সে এক জায়গায় বিষ্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকালো।
রোদেলার চার বন্ধু বান্ধবী রোদেলার দিকে শয়তানি দৃষ্টিতে তাকিয়ে মুখে হাসি নিয়ে গলা মিলিয়ে গায়ছে,
আরে ফুলকলি রে ফুলকলি
Fool বানাইয়া কই গেলি?
গন্ধ পাইয়া টাকার নেশায়,
আমাদের থুইয়া দৌড় দিলি।
চোখেতে ধুলা দিয়া বড়লোক করলা বিয়া।
এই জ্বালাতো মিটাবো আমরা,
ডিজে গানের বেজ দিয়া।
আর বলবো,
আইজ আমাদের বান্ধীর বিয়া…
Hhu!
আইজ আমাদের বান্ধবীর বিয়া…
রোদেলা চোখ বড় করে তেড়ে গেল সব গুলোর কাছে।
” এই বজ্জাতের খাদিরা! ইবলিশের দল চুপ কর।কোচিং এ কি আমার মান সম্মান খোয়াবি তোরা? ”
রোদেলার কথায় সবই চুপ করে গেলেও অহেতুক হাসতে থাকলো।ইনায়া বললো,
” আমাদের বড়লোক মেজর দুলাভাই আসে নাই তোর সাথে? ”
রোদেলা আহিয়ানের নাম শুনে মুখটাকে এইটুকু করে নিয়ে বলল,
” না আসে নি। এখন সর আমাকে জায়গা দে। ”
তানিয়া আর ইনায়া ব্যাগ সরিয়ে রোদেলাকে বসার জন্য মাঝখানে জায়গা করে দিল।তানভীর তাশিন পিছনে বসেছে।রোদেলা বসতেই তানিয়ে মুখ বাকিয়ে বলল,
” কই ভাবলাম আজ বড়লোক দুলাভাই এর থেকে ট্রিট নিব সবাই মিলে।আর এখন দেখছি উনি আসলেনি না। ”
তাশিন আর তানভীর বলল,
” তাতে কি? একজন তো এসেছে।ওকেই আজ ট্রিট দিতে হবে। ”
রোদেলা কিছু বলবে তখনি একজন টিচার রুমে প্রবেশ করলো।সব স্টুডেন্টরা দাড়িয়ে পড়লো।গনিত ক্লাসে আজ ইংরেজি টিচারকে ক্লাস নিতে আসতে দেখে রোদেলাদের গ্রুপ সহ সবাই চমকালো।রায়ান স্যার বলল আজকে অর্ণব স্যার এখনও আসেনি তাই রায়ান স্যার এই সময়ে তার ক্লাসটা নিবেন।ইংরেজি ক্লাস শেষে কেমিস্ট্রি ক্লাস শুরু হলো।অর্নব স্যার আজকে না আসায় গনিত আপাদত আজ অফ থাকলো।
ক্লাস শেষে রোদেলারা সবাই এক সাথে বের হলো।বিচ্ছু দলকে পেয়ে আজ তার একটু ভালো লাগছে।ঠিক করা হলো সবাই মিলে কাছে কোথাও রেস্টুরেন্টে যাবে।রোদেলায় ট্রিট দিবে আজ এই বিচ্ছু দলকে।তার হাতে টাকা আছে।আহিয়ানের বোনেরা,দুলাভাইরা,নানুমনি তাকে নতুন অবস্থায় দেখে হাতে যে টাকা দিয়েছিল সেগুলো সে সেভাবেই রেখে দিয়ে ছিল।পাঁচ জন মিলে যাওয়ার জন্য অটো ফুরাবে ঠিক করা হলো।তাশিন আর তানভীর অটো দেখছে।তাদের থেকে একটু দূরে রোদেলা,ইনায়া আর তানিয়া দাড়িয়ে আছে।
রোদেলারা অটো দেখার জন্য সামনে তাকাতেই দেখলো অর্ণব স্যার কেমন তাড়াহুড়ো করে ছুটে আসছে তাদের দিকে।পাঁচ জনই তাকে দেখে বিষ্মিত হলো,
স্যার তো তাদের ক্লাস নিতে আসলো না।তবে এখন কোথা থেকে এলো।দেখতেও কেমন যেন বিধ্বস্ত লাগছে।চোখ গুলো অতিরিক্ত লাল হয়ে আছে। শার্টের উপরের বোতাম কয়েকটা খোলা।চুল গুলোও এলোমেলো।
অর্নব কোনো জড়তা না রেখে দ্রুত রোদেলার সামনা সামনি এসে দাড়ালো।রোদেলা অর্ণব স্যারকে দেখে পিছিয়ে সরে দাড়ালো।তার মাথায় ঢুকলো না স্যারের এমন আচরণ এর কারণ।অর্ণব ছিপছিপে লম্বা শ্যামবর্ণ গড়নের।চেহারায় একটা আলাদা মায়া আছে।এমন অবস্থায়ও বেশ সুশ্রী দেখাচ্ছে তাকে।
অর্নব তৃষ্ণার্ত কাকের মতো রোদেলার দিকে তাকিয়ে নিজের তৃষ্ণা মিটাতে লাগলো।অর্ণবের এমন দৃষ্টিতে রোদেলা আরও পিছিয়ে গেল।
অর্ণব শার্টের হাতায় মুখ মুছে চুলে হাত বুলিয়ে চুল ঠিক করে রোদেলাকে সোজাসুজি জিঙ্গেস করলো,
” কেমন আছো? ”
রোদেলার চোখ ছোটছোট হয়ে গেল।বাকিরাও একি ভাবে অর্ণবকে দেখছে।রোদেলা স্বভাব সুলভ মার্জিত ভাবে বলল,
” জ্বী! আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। ”
রোদেলার কথার বিপরীতে অর্ণব বলল,
” তুমি ভালো আছো।কিন্তু আমি তো ভালো নেই। কেন এতো দিন আসোনি। ”
অর্ণবের কন্ঠে আকুলতা।সবার বিষ্ময়ে কপোল ঝুলে যাচ্ছে।রোদেলা হতোভাগ হয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকালো অর্ণবের দিকে।রোদেলার দৃষ্টি বেশিক্ষণ অর্ণবের দিকে স্থির হলো না তার আগেই দেখলো আহিয়ান প্রচন্ড ক্ষুদ্ধ ভাবে বাইকে করে তাদের দিকে ধেয়ে আসছে। লোকটাকে দেখেই রোদেলা আঁতকে উঠলো।আসন্ন বিপদ উপলব্ধি করতে পেরে রোদেলার আপনা আপনি মুখে হাত চলে গেল।
চলবে…….
[ পরবর্তী পর্ব প্রথমে ‘প্রাপ্তির কল্পরাজ্য’ গ্রুপে আপলোড করা হবে।তাই সবাই গ্রুপে এড হয়ে থাকেন। ]
#মনটা_তারই_সুরে_অনুরাগিনী লিংক –
https://www.facebook.com/61581445095817/posts/122135154681048169/
সবাই গ্রুপে জয়েন হয়ে গল্প সম্পর্কে মতামত জানাবেন।
গ্রুপ লিংক- https://facebook.com/groups/2493488501095403/

