#মনটা_তারই_সুরে_অনুরাগিনী [ পর্ব – ০৭ ]
#মেহুলিনা_প্রাপ্তি
রোদেলা ছটফট করে পিছনে তাকাতেই আহিয়ানের সাথে তার চোখাচোখি হলো। রোদেলা লজ্জায় ছিটকে সরে যেতে নিল।তবে আহিয়ান সেই সুযোগ আর দিল না।রোদেলার ঘাঢ়ে রাখা আহিয়ানের হাতের থাবা আরও শক্ত হলো।এক টানে রোদেলাকে সে নিজের রুমে নিয়ে এলো।হঠাৎ আক্রমনে দুইজনেই অনেকটা কাছাকাছি চলে আসায় রোদেলার পায়ের পাতা আহিয়ানের পা স্পর্শ করতেই রোদেলা বরফের মতো জমে গেল। রোদেলা তাড়াতাড়ি নিজের পা টা সরিয়ে নিল। আহিয়ান রোদেলাকে নিজের কাছাকাছি দাড় করিয়ে রোদেলার ঘাঢ়ের উপর থেকে হাত সরিয়ে নিজের আর্মি কাট করে রাখা চুলে হাত বুলিয়ে একটু দূরে সরে দাড়ালো।রোদেলার দিকে ভ্রুঁ নাচিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
” আমার রুমে উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছিলে কেন ? ”
রোদেলা আহিয়ানের কথায় লজ্জা পেয়ে ওড়নায় অহেতুক আঙুল পেঁচাতে লাগলো।লোকটা বালিশে মুখ গুজে উপুর হয়ে পড়ে থেকেও তাকে কিভাবে দেখে ফেলল সে বুঝতে পারছে না। রোদেলার চোখ না চাইতেও বারবার আহিয়ানের অনাবৃত শক্ত পিটানো বুকের দিকে চলে যাচ্ছে। রোদেলা দৃষ্টি সংযত করে আমতা আমতা করে বলল,
” কই নাতো।আমি তো এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম শুধু। ”
আহিয়ান রোদেলার কথায় ঠোঁট বাকিয়ে মুখ খুললো,
” আহহা! মেয়েটা মিথ্যা কথা বলছে, তাও আবার আমার সাথে?বাই দ্য ওয়ে আমাকে নিজের মতো গর্দভ ভাবো? ”
রোদেলা আহিয়ানের কথায় তড়াক করে চোখ তুলে আহিয়ানের দিকে তাকালো।রোদেলা চোখ বড় বড় করে পলক ঝাপটে বলল,
” কই না তো।আমি গর্দভ কে বলেছে? ”
আহিয়ান এবার বাঁকা হেসে রোদেলার কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে একটা ক্রিম কালার এর টিশার্ট গায়ে জড়িয়ে নিতে নিতে বললো,
” তুমি শুধুই গর্দভ নও সাথে মহা বেয়াদব।একজনের রুমে উঁকি ঝুঁকি মারাটা কোনো মহৎ কাজ নয় নিশ্চই? আজ প্রথম তাই বেঁচে গেলে। নেক্সট টাইম এভাবে আমার রুমে উঁকি ঝুঁকি মারলে খবর আছে বলে
দিলাম। ”
আহিয়ানের কথায় রোদেলা বেশ লজ্জিত আর অপমানিত বোধ করলো।সে তো বিষ্ময়ে নিজেকে আটকাতে না পেরে উঁকি দিয়ে ছিল তাই বলে লোকটা এতো কড়া কথা শুনাবে।রোদেলা গাল ফুলিয়ে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছে।আহিয়ান নিজের কথা শেষ করে পুনরায় বিছানার দিকে যেতে বলল,
” দাড়িয়ে আছো কেন? এখানেই থাকার প্ল্যান করে ফেলেছো নাকি?
রোদেলা আহিয়ানের কথায় সমানে মাথা নাড়িয়ে না জানাতে লাগলো।আহিয়ানের এরকম মুখের উপর কথা বলার ধরনে রোদেলার ছোট বুকে দ্রিমদ্রিম আওয়াজ হচ্ছে।শরীরটাও লজ্জায় নুইয়ে আসছে।রোদেলা নিজের মাথার ঘোমটা তুলে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই,
আহিয়ান গলা খাঁকাড়ি দিয়ে বলল,
” দাড়াও এসেছই যেহেতু,তাহলে এক মগ কফি দিয়ে যাও। ”
রোদেলা মাথা নাড়িয়ে ভদ্রভাবে বলল,
” নিয়ে আসছি ”
রোদেলা আর দাড়ালো না।নিচে নেমে সোজা সোজা কিচেনে চলে গেল।
____________
রাফতান রশিদ মেয়েকে অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে বার্থ ডে পার্টির জন্য রাজি করিয়েছে।রামিশা কোনো রকম কেক কেটে, ফর্মালিটি মেইন্টেন করে বাসায় চলে এসেছে।আহিয়ানের উপর তার ভীষণ অভিমান জমা হয়েছে। কত বার করে বলে দিল আসতেই হবে তাকে।তবুও আসলো না আহিয়ান।আহিয়ানের থেকে একটু গুরুত্ব পাওয়ার জন্য সে কি কম কিছু করেছ?মেডিকেলে চান্স পাওয়ার পরও নিজের স্বপ্ন বিসর্জণ দিয়ে,কেবল আহিয়ানের কাছাকাছি থাকার জন্য রামিশা আর্মিতে জয়েন করেছিল।এতো কিছুর পরেও আহিয়ান আজ অবধি তাকে একটুও গুরুত্ব দিল না।রামিশার ভীষণ কান্না পাচ্ছে।যেখানে রামিশা সবাইকে এড়িয়ে চলে,আহিয়ানকে নিজের ফিউচার ভেবে।সেখানে আহিয়ানের প্রতিটি আচরণ তাকে মনে করিয়ে দেয় –
” এ তুমি কার পিছনে ছুটছো এতো মরিচীকা। ”
তবুও রামিশার অবুঝ মনের কাছে সে বারবার পরাজিত হয়ে ছুটে যায় গম্ভীর পুরুষের কাছে।
মেয়ে চেলে গেলে রাফতান আর তার স্ত্রীও সবাইকে এক রকম বুঝিয়ে চলে গিয়েছে।তবে পার্টিতে কোনো কমতি রাখা হয়নি। আমন্ত্রিত গেস্টরা নিজেদের মতো পার্টি উপভোগ করছে।
–
‘মেজর শায়ান শিবলী’ দূর থেকে রাফতান রশিদের পুরো পরিবারের কাহিনী দেখে শয়তানি হাসি দিচ্ছে।তার সঙ্গীরাও তার তালে মিলাচ্ছে।আহিয়ানকে একটু অপদস্ত করে যা শান্তি মিলে তা সে কোনো কিছুতে খুঁজে পায় না।
শায়ান শিবলী তারষবলিষ্ঠ লম্বা দেহটা নিয়ে উঠে দাড়ালো।চোখে তার এক ধরনের দৃপ্তি।শ্যাম বর্ণের গায়ের সাথে ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি উচ্চতায় তাকে বেশ মানিয়েছে।ক্লিন সেভ চোয়াল,তীক্ষ্ণ নাক,চঞ্চল চাহনি সবই যেন তাকে পার্টিতে আসা লোকদের থেকে তাকে আলাদা করে রেখেছে।শিবলী দাড়িয়ে তার শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে ডিজের দায়িত্বে থাকা লোকটাকে বলল একটা গান চালাতে।শরীরে বেশ জোস পাচ্ছে আজ।একটু নেচে নেওয়া যাক।
তখনি একটা গান বেজে উঠলো,
কি নেশা ঢাইলা দিলি গেলাসে,
মাইনাসে না পেলাসে?
কোমড় ঘুরাই ঢুংকা দিলে,
পুরাই দেশী ফিল আছে…
কি নেশা ঢাইলা দিলি গেলাসে,
মাইনাসে না পেলাসে?
কোমড় ঘুরাই ঢুংকা দিলে,
পুরাই দেশী ফিল আছে…
শিবলী সহ তার দলের সবাই এখন এই গানের তালে উড়া ধুরা ডান্স করছে।
_______
রোদেলা চুলায় গরম পানি বসিয়ে নিজের রুমের সামনে এসে দরজার কাছে দাড়ালো। ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখলো আফিয়া বিছানার এক কর্ণারে শুয়ে আছে।রোদেলার জায়গাটা ফাঁকা পড়ে আছে।রোদেলা ঘুরে কিচেনে যেতে নিচ্ছিল তখনি রোদেলার বাটন ফোনটা বেজে উঠলো।রোদেলা ফোনে কলের শব্দে বিষ্ময়ে চমকে তাকালো। মাশরিফা রোদেলাকে এখানে নিয়ে আসার পর বাইরে গেলে যোগাযোগের জন্য এই ফোন কিনে দিয়েছিল।বেশি দিন হয়নি।এই ফোনে কেবল মাশরিফার,আর রোদেলার দুই বান্ধবী তানিয়া, ইনায়ার নাম্বারই সেট করা। রোদালা ভ্রুঁ কুচকে নিয়ে বিড়বিড়ালো,
” এই সময়ে আম্মু তো ফোন দিবে না? তানিয়া,ইনায়া দেয়নি তো? ”
রোদেলা রুমে দ্রুত ঢুকে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো অচেনা নাম্বার থেকে আসা পাঁচটা মিসড কল ভেসে আছে।রোদলা অচেনা নাম্বারটা দেখে ভ্রঁ কুচকে নিল।তার নাম্বার তো কারো জানার কথা না।তবে কে হতে পারে এটা।রোদেলার চিন্তা ভাবনার মাঝে আবার কল এলো। রোদেলা কাঁপা হাতে কলটা রিসিভ করে কানে তুলল,কিন্তু কোনো কথা বলতে পারলো না। অপর পাশেও নিরবতা।কেউ কোনো কথা বলছে না।রোদেলার ভেতরে অস্বস্তিটা দরদর করে বেড়ে চলেছে।তাই বিরক্তি আর জড়তায় রোদেলা কলটা দ্রুত কেটে দিল।তারপর কিচেনে গরম পানি বসিয়ে এসেছে মনে পরতেই এক দৌড়ে ফোন হাতে নিয়েই কিচেনে চলে গেল।রোদেলা হাতের ফোনটা এক পাশে রেখে কফি বানানো শেষ করে নিল। তারপর যেই আহিয়ানের রুমের দিকে কফির মগ হাতে পা বাড়ালো তখনি আবার ফোনটা বেজে উঠলো।রোদেলা কাঁপা হাতে ফোন তুললো।এসব আন-নোন নাম্বার থেকে কল আসাটা অনেকটা স্বাভাবিক হলেও তার কাছে বিষয়টি মোটেও স্বাভাবিক লাগছে না।এর কারণ সে পারসোনাল ফোন ব্যবহার করে অভ্যস্ত নয়। তাই ফোনে অপরিচিত নাম্বার থেকে কল আসাটা তার জন্য এক প্রকার আতঙ্কই বলা চলে।রোদেলা দু পা পিছেয়ে ফোনটা হাতে তুলে নিল।তারপর নাম্বারটা দেখে নিয়ে বিরক্তিতে পুনরায় কল কেটে দিল। বাটন ফোনটা হাতেই উপরে গেল সে।রোদেলার এক হাতে ফোন। সে সেই হাতটা ওড়নার ভিতরে ভাজ করা রেখেছে। ফোন দেখা যাচ্ছে না তাই।রোদেলার অপর হাতে আহিয়ানের জন্য মগ ভর্তি কফি।
রোদেলা আহিয়ানের দরজার সামনে এসে টোকা দিয়ে মানমিনে সুরে বলল,
” আসবো। ”
আহিয়ান বারান্দায় বসে আছে।রোদেলার মিনমিনে আওয়াজ বারান্দা পর্যন্ত পৌঁছালো কিনা জানা নেই। তবে ভিতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া গেল না।রোদেলা আরও কয়েক বার দরজায় শব্দ করে মাথা ঢুকিয়ে উঁকি দিল।আহিয়ানের একটু আগে বলা কড়া কথা গুলো বারবার মনে পড়ছিল তার এই কাজ করতে গিয়ে।রুমের ভেতরে আহিয়ানকে দেখতে না পেয়ে,রোদেলা ভাবলো কফি বেড সাইডের ডেস্কে রেখে চলে যাবে।
রোদেলা ভেতরে ঢুকে ডেস্কে কফির মগটা যেই রাখতে যাবে তখনি হুট করেই সেই ফোনটা আবার বেজে উঠলো।রোদেলা ফোনটা চোখের সামনে এনে নাম্বারটা দেখে দ্রুত কল কেটে দিল।কি বিপদ হলো তার। কে এমন করছে? চিন্তায় সে জমে যাচ্ছে।রোদেলা কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা মুঠোই নিয়ে হাতটা আবার ওড়নার নিচে নিয়ে নিল। তারপর কফির মগটা রেখে যেই পিছনে ঘুরলো তখনি শক্তপক্ত শরীরের সাথে ধাক্কা খেয়ে ভয়ে কয়েক কদম ছিটকে সরে গেল।আহিয়ান রোদেলার কান্ডে বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকে নিল।অদ্ভুত ভাবে তাকালো রোদেলার দিকে।যেন রোদেলাকে তার কাছে নরমাল মানুষ বলে মনে হচ্ছে না।রোদেলা আহিয়ানের দৃষ্টি দেখে জমে গেল।আহিয়ান রোদেলার সামনে এখনও দৃঢ় ভাবে দুই পকেটে হাত গুজে দাড়িয়ে আছে।
আহিয়ান তখন তার রুমে ফোনের শব্দ শুনেই রুমে এসেছিল।এসেই রোদেলার হাতে বাটন ফোন দেখেছিল।আহিয়ানের উপস্থিতি রোদেলা অবশ্য টের পায়নি।
রোদেলা আহিয়ানের দিকে তাকিয়ে কিউট করে হাসি দিল।আহিয়ান তা দেখে নিজের কপালে দুই আঙুল ঘোঁষে ডেস্কে রাখা কফির মগের দিকে তাকালো।রোদেলাও আহিয়ানের দৃষ্টি লক্ষ্য করে সেদিকে তাকিয়ে আবার কিউট একটা হাসি দিয়ে বলল,
” আপনার কফি মেজর সাহেব । ”
মিষ্টি রিনরিনে কন্ঠে অল্প হাসি তারপর আবার ‘মেজর সাহেব’ সম্মোধনে আহিয়ান আড়চোখে রোদেলার দিকে তাকিয়ে ভ্রঁ কুঁচকে নিল।বিরক্তিতে গম্ভীর আওয়াজে বলল,
” তুমি কি স্বাভাবিক আচরণ করতে পারো না?যখনি দেখি উষ্ঠা খাও। এখন আবার এভাবে একটু পরপর হাবার মতো হাসি দিচ্ছ কেন? এখানে কি ক্লোজ-আপ হাসির প্রতিযোগিতা চলছে? যে দাঁত বের করে হাসি দিয়ে তোমার সাদা দাঁতের ঝিলিক দেখাতে হবে ? ”
আহিয়ানের কথায় রোদেলার কিউট হাসিটা মিলিয়ে গিয়ে মুখটা কিছুটা বিষ্ময়ে ঝুলে গেল।একটা মানুষ এতো কাঠখোট্টা হতে পারে তা রোদেলার জানা ছিল না।রোদেলার দমিয়ে রাখা রাগটা আহিয়ানের জন্য আবার তরতর করে বেড়ে গেল।কোনো কৃতজ্ঞতা নেই লোকটার মাঝে।রোদেলা মনে মনে বলল,
” খবিশ লোক কোথাকার। তোর জন্য চা করে আনলাম। কিউট করে ক্লোজ-আপ হাসি দিলাম আর তুই আমার হাসির অপমান করলি। ভালো হয়েছে তোকে সাসপেন্ড করেছে।গম্ভীর মুখো বাঁদর কোথাকার ? ”
রোদেলা নিজের মতো দাড়িয়ে দাড়িয়ে মনে মনে এসব বলে যাচ্ছিল।আহিয়ান অবশ্য তার সামনে দাড়িয়ে নেই।সে কফির মগটা হাতে নিয়ে চুমুক দিচ্ছে।তখনি রোদেলার বাটন ফোনটা পুনরায় বেজে উঠলো।রোদেলা সেই শব্দে ঘোর থেকে বেরিয়ে ধরফর করে উঠলো।আহিয়ান ফোনের শব্দে নির্লিপ্ত ভাবে নিজের থেকে একটু দূরে দাড়িয়ে থাকা রোদেলার দিকে তাকালো।
রোদেলা কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা ওড়নার নিচ থেকে বেরে দ্রুত নাম্বারটা দেখেই কেটে দিল।আহিয়ান আড়চোখে রোদালার কাজ কর্ম দেখে নিয়ে কফিতে চুমুক দিতে নিল।তখনি আবার রোদেলর ফোনটা বেজে উঠলো।রোদেলা অতিরিক্ত নার্ভাস হয়ে কল কেটে দিতে গিয়ে কল রিসিভ করে ফেলেছে।ফোন রিসিভ হতেই এবার ফোনের বিপরীত পাশের লোকটি এবার আর আগের মতো চুপ করে থাকলো না।ফোনের বিপরীত পাশ থেকে এক অধৈর্য্য পুরুষের আকুলতা মিশ্রিত বাণী শোনা গেল,
” রোদ পাখি! জান আই মিস ইউ সো মাচ।তুমি এখন কথায় আছো জান? ইউ নো,আমি এই কদিনে তোমাকে কত খুঁজেছি? ”
ফোনের লাউড স্পিকার অন করায় ছিল।বিধায় আহিয়ান আর রোদেলা দুজনেই অচেনা পুরুষটার কথা গুলো শুনতে পেয়েছে।রোদালা অচেনা পুরুষের মুখে নিজের নামের এরকম আদুরে ডাক শুনে বিষ্ময়ে হতোবাক হয়ে দাড়িয়ে আছে।আহিয়ানের লোকটার কথাগলো শুনেই ধক করে রাগ উঠে গিয়েছে।কেন রাগ লাগছে তা আহিয়ানেরও জানা নেই।আহিয়ান চোয়াল শক্ত করে উঠে দাড়িয়ে পরলো।এক হাত রাগে শক্ত করে মুঠো করে ধরে রাখা।অপর হাতে কফির মগ।আহিয়ান রোদালের দিকে কাঁচা চিবিয়ে খাওয়ার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
রোদেলা নিজের ঘোর কাটাতে না কাটাতেই ফোনের বিপরীত পাশ থেকে আবারও সেই আকুলতা মিশ্রিত কন্ঠ শোনা গেল,
” কি হলো কথা বলছো না কেন রোদ পাখি? তুমি কোথায় আছো?একটি বার শুধু বলো।আমি তোমাকে এক্ষুনি নিতে আসবো। ”
রোদেলা লোকটার কথায় কয়েক বার ঢোক গিলল।আহিয়ানের রাগ চরম পর্যায়ে পৌঁছে যেন।আহিয়ান হাতের মগটা ঠাস করে ফ্লোরে ছুড়ে মারতেই রোদেলা আঁতকে উঠলো।রোদার মাথায় কিছু ঢুকতেই সে ভয়ে ঢুক গিলতে গিলতে আহিয়ানের দিকে তাকালো। আহিয়ান রোদেলার দিকে চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত কিরমির করতে করতে রাগে ফুঁসছে।অতিরিক্ত রাগের কারণে আহিয়ানের চোখ দুইটা রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে।আহিয়ানের জান কাঁপানো দৃষ্টিতে রোদেলার দৃষ্টি মিলিত হতেই রোদেলার হাত থেকে ঠাস করে ফোনটা পড়ে গেল ফ্লোরে।
ফোনের বিপরীত পাশের পুরুষালী কন্ঠটা এবার আরও আকুল আর চিন্তিত শোনাল,
” রোদপাখি তুমি কথা কেন বলছো না?আর ইউ ওকে বেবি? রোদপাখি,রোদপা…. ”
আর শোনা গেল না সেই অধৈর্য্য পুরুষের কন্ঠস্বর।আহিয়ানের এক আছাড়ে ফোনটা ভেঙে চুড়ে লন্ড ভন্ড করে হয়েছে।ফোনটা ঠিক কয় টুকরো হলো গনে বলা ছাড়া উপায় নেই।আহিয়ান হঠাৎ ফোনটা আচড়ে ফেলতেই রোদেলা ভয় পেয়ে ছিটকে কয়েক কদম দূরে সরে গিয়ে চোখ বুজে দাড়িয়ে পরলো।অতিরিক্ত ভয়ে মেয়েটার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। আহিয়ান ফোনটাকে এক আছাড় মেরে কয়েক খন্ডে বিভক্ত করেও শান্ত হলো না। ঘরের কোথা থেকে এক হাতুড়ি জোগার করে নিয়ে এলো সে।ফোনের বেঁচে যাওয়া বড় অংশটাকে এক জায়গায় রেখে কয়েক বার হাতুড়ি দিয়ে সেটাকে আঘত করে ভেঙে গুড়ো গুড়ো করে উঠে দাড়ালো।আহিয়ানকে দেখে মনে হচ্ছে, সে কেবল ফোনটাকে গুড়ো করেনি, ফোনের বিপরীত পাশের আস্ত মানুষটাকেই ভেঙে ধ্বংস করে উঠে দাড়িয়েছে।
রোদেলা এক কোণে দাড়িয়ে আহিয়ানের এরকম ভয়ানক রূপ দেখে জমে গেল।আপনা আপনি তার চোখ দিয়ে টলটল করে পানি পড়তে লাগলো।কান্নার বেগ বাড়তেই রোদেলা ফুঁফিয়ে শব্দ করে কেঁদে দিল।আহিয়ান সেই শব্দে তড়াক করে তাকালো রোদেলার দিকে।আহিয়ানের দৃষ্টিতে এবার কোনো কোমলতার রেশ মাত্রও দেখা গেল না। আহিয়ান চোখের পলকে ধেয়ে এসে রোদেলার গলাটা শক্ত করে চেপে ধরলো। রোদেলার চোখ দিয়ে টলটল করে পানি গড়িয়ে পড়ছে।ব্যথায় রোদেলার সুন্দর মুখখানা নীল হয়ে উঠছে।এতো কোমল শরীরে এর শক্ত দানবের মতো হাতের থাবা আর চাপে তার দম ফুরিয়ে আসছে। আহিয়ান তার হাতের চাপ থামানোর বদলে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।চোখ দুটো তার রক্তিম রক্তের ন্যায় জ্বলছে।আহিয়ানের এই রূপটা রোদেলার কাছে হিংস্র দানবের মতো মনে হলো।রোদেলা আর সহ্য করতে না পেরে ছটফট করে মুখ দিয়ে অস্ফুষ্ট গুঙিয়ে আহিয়ানের হাতটা নিজের দুই হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে নখ বিধিয়ে দিল।আহিয়ানের মাঝে তবুও কোনো হেলদোল নেই।রোদেলার মুখশ্রীতে সুক্ষ্ণ ঘামের ছোট ছোট কণা জমা হচ্ছে।চোখ দুটো অস্বাভাবিক ভাবে বড় হয়ে যাচ্ছে।
আহিয়ান রোদেলার ছটফট করতে থাকা মুখটা বিতৃষ্ণা মিশ্রিত নয়নে দেখে নিয়ে রোদেলার গলা থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিয়ে রোদেলাকে এক ধাক্কা দিয়ে নিজের সামনে থেকে দূরে সরিয়ে দিল।রোদেলা দূর্বল শরীরে নিজেকে সামলাতে না পের আলমারির কোণায় গিয়ে পড়লো। রোদেলা কপালে আঘাত পেতেই সাথে সাথে কপালটা ফুলে উঁচু হয়ে গেল।আহিয়ান বিরক্ত মাখা দৃষ্টিতে রোদেলাকে দেখে নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
” কু*ত্তার বাচ্চা! এই তোর ভালো মানুষি।আমার স্ত্রী হয়ে আমার বাড়িতে থেকে অন্য পুরুষের সাথে প্রেম করিস?তোকে আমি মানি,না মানি তুই আমার নামের সাথে জড়িত থাকা অবস্থায় অন্য পুরুষের কাছ থেকে ভালোবাসা গ্রহণ করবি, আর এটা আমি মেনে
নিব ভেবেছিস? ”
আহিয়ানের কথা গুলো রোদেলার বুকটা ফালা ফালা করে দিচ্ছে।গায়ের ব্যথার চাইতেও চরিত্রের দাগ বেশি বেশি ব্যথা দিচ্ছে তাকে। রোদেলা কোনো রকম নিজের মাথা চেপে আহিয়ানের দিকে ফিরে বসলো ফ্লোরে।আহিয়ান আবারও তেড়ে গিয়ে রোদেলার থুতনিটা শক্ত করে চেপে ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে বললো,
” খুব কষ্ট হচ্ছে বুঝি তোর নাগরের জন্য?ফোন ভেঙে ফেলেছি তো,কথা বলবি কি করে?
আমার মমকে এভাবে ঠকালি তুই? ”
আহিয়ান হাতের চাপ আরও বাড়িয়ে শক্ত কর ধরলো রোদেলার থুতনি।রোদালার গায়ের ওড়না খুলে মাটিতে লুটিয়ে আছে।চুল গুলো খুলে পিঠে ছড়িয়ে পরেছে।আহিয়ানের কবলে পড়ে সে প্রায় এক রকম কাহিল হয়েই পরেছে।অতিরিক্ত কান্নার ফলে চোখ গুলো ফুলে গিয়েছে রোদেলার।
আহিয়ানের বিতৃষ্ণায় ঘা ঘিনঘিন করছে।এই মুহুর্তে রোদেলাকে তার কাছে ডাস্টবিনের ময়লা মনে হচ্ছে। অচেনা পুরুষটার আকুলতা আর আদর মিশ্রিত রোদপাখি,জান সম্মোধন গুলো তার মাথায় বারবার ঘুরেফিরে বেজে যাচ্ছে।আহিয়ান চোয়াল শক্ত করে রোদেলার মুখটা এক হাতে টেনে আরও কাছাকাছি নিয়ে বলল,
” সত্যি করে বল,ঐ বাস্টার্ড কে? ওর নাম কি?ও তোকে জান বলে ডাকলো কেন? ও তোকে ছুঁয়েছেও? ”
আহিয়ানের চোখে রোদেলার প্রতি ঘৃণা রিরি করে বাড়তে লাগলো।
রোদেলা কথা বলতে পারছে না।আহিয়ান রোদেলার থুতনি থেকে হাত সরিয়ে গাল শক্ত করে চেপে ধরলো।রোদেলা আহিয়ানের টিশার্টে খামচে ধরলো শরীরে সব শক্তি দিয়ে।তারপর আহিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
” আমি সত্যি বলছি মেজর সাহেব,আমি জানি না ওই লোকটা কে? আপনি বিশ্বাস করুন। আমি আপনার মমকে ঠকায়নি। না আপনাকে ঠকিয়েছি।গরীব হতে পারি,তাই বলে ছলনাময়ী নই। ”
আহিয়ান রোদেলার কথা গুলো শুনে রোদেলাকে এক প্রকার নিজের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ে নিজেও উঠে দাড়িয়ে পরলো।গম্ভীর গলায় কড়মড় করে বলল,
” মিথ্যে বলবি না। ওই বাস্টার্ডটা তোকে নিতে আসতে চাইছিল।নিশ্চই তুই ওর সাথে প্রেম করতি তাই না। এখন আমার মান সম্মান ডুবিয়ে প্রেমিকার সাথে পালিয়ে যাবি? ”
আহিয়ানের কথায় রোদেলার মাথায় আকাশ ভেঙে পরলো।রোদেলা নিজের ফোনের বিপরীত পাশের লোকটাকে চিন্তেও পারেনি,সেখানে সে ওই লোকের সাথে পালাবে কি করে? রোদেলা নিজেকে শক্ত করে উঠে দাড়ালো।আহিয়ান বিপরীত দিকে ফিরে দাড়িয়ে আছে।রোদেলা সাহস করে নিজের বিধ্বস্ত শরীরটা টেনে নিয়ে গেল আহিয়ানের কাছে। রোদেলা আহিয়ানের পিছনের টিশার্টের অংশ টুকু চেপে ধরলো।আহিয়ান বিরক্তিতে চোখ বুজে মুখ ঘুরিয়েই রাখলো।আহিয়ানকে ফিরতে না দেখে রোদেলা বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কেঁদে কেঁদে বলতে লাগলো,
” বিশ্বাস করুন আমি তেমন মেয়ে নই,আপনি যাকে আমার প্রেমিক ভাবছেন তাকে আমি চিনিও না।হয়তো প্রাঙ্ক করছে।
আহিয়ান রোদেলার কথা শুনে বিরক্তিতে দূরে সরে গেল।রোদালা আহিয়ানকে টিশার্ট খামচে আটকে রাখতে যেয়ে হাতে ব্যথাও পেয়েছে।আহিয়ান দূরে সরে বলল,
” সব কিছুকে প্রাঙ্ক বলে চালিয়ে দিলেই,আমি আহিয়ান অভ্র তা বিশ্বাস করে নিব? এতোই যখন অপরিচিত ছিল তখন আমাকে দেখে ফোনটা বারবার লুকানো
হচ্ছিল কেন? ”
রোদেলা ভীতু হরিণীর ন্যায় আর দাড়িয়ে রইলো না আহিয়ানের সামনে এসে দাড়ালো।আহিয়ানের চোখের দিকে আজ বেশ সাহস নিয়ে দেখলো।আহিয়ান বিরক্তিতে রোদেলাকে সরিয়ে দিতে চাইলে,রোদেলা খপ করে আহিয়ানের হাতটি ধরে ফেলল।আহিয়ান রোদেলার সাহস দেখে আজ চমকাচ্ছে।আহিয়ান নিজের হাতটা এবার নিষ্ঠুর ভাবে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
” এসব তেল বাজিতে কাজ হবে না। ”
আহিয়ানের শক্ত কথায় রোদেলার বুকটা ধকধক করতে লাগলো। রোদেলা চোখের পানি মুছে ফ্লোরে আহিয়ানের সামনে ধপ করে বসে পরলো।আহিয়ান এক আড় চোখে বিরক্তিতে রোদেলাকে দেখে নিয়ে ঘুরে চলে যেতে নিলেই রোদেরার ডুকরে কান্নার আওয়াজে থেমে গেল।আহিয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,
” আমার রুমে বসে বসে আর ড্রামা করতে হবে না।দ্রুতই ডিবোর্সের ব্যবস্থা করছি,সো লোক দেখানো নাটকের দরকার নেই। ”
ব্যাস আহিয়ানের এই কথাটায় রোদেলা পাথরের মতো জমে গেল।রোদেলা নিজের মান সম্মানের খুব পরোয়া করে, তাই তো আহিয়ানের বলা কথা গুলো সে মানতে পারছে না।সে বুঝাতে চাইছে সে এসবের কিছুই জানে না।
আহিয়ান ধপ করে গিয়ে নিজের বিছানায় গা এলিয়ে দিল।অর্ধেক শরীর তার বেডের বাইরে।বিরক্তিতে সে নিজের কপাল চেপে ধরে রাখলো।এই মেয়টাকে তার মম কত ভরসা করলো,আর মেয়েটা করলো কি এসবে ভেবে যাচ্ছে সে।এই মেয়ের জন্য নিজের ক্যারিয়ারেও দাগ বসলো তার আর এই মেয়েকে দেখো কত অকৃতজ্ঞ।আহিয়ান বিরক্তিতে এবার হাতটা নিজের চোখের উপর চেপে ধরলো। কিছু ভালো লাগছে পা তার।৩২ বছরের জবনে আজকেই জীবনটাকে বড্ড বিষাদময় অনুভব করলো সে।কাঠখোট্টা,একরোখা আহিয়ান আজ কিছুতেই আজকের ঘটনা মেনে নিতে পারছে না।তার স্ত্রী অন্য পুরুষের ‘ জান ‘ , আহিয়ান আর ভাবতে পারছে না।বিরক্তিতে শোয়া থেকে মাথা তুলে রোদেলাকে দেখে নিয়ে বলল,
” আমার রুম থেকে যাওয়া হোক। নয়তো আগের চেয়ে বেশি খেসারত দিতে হবে । ”
আহিয়ানের কথায় রোদেলা চোখের পানি মুছতে মুছতে আহিয়ানের দিকে তাকালো।আহিয়ান আর রোদেলার দূর্বোধ্য এক দৃষ্টি বিনিময় হলো।রোদেলা উঠলো না।তব্দা মেরে বসে আছে।আজকে আহিয়ানের সামনে সে যেন একটু বেশিই সাহস পেয়ে বসেছে।রোদেলাকে উঠতে না দেখে আহিয়ানের এবার মাথায় রক্ত উঠে যাচ্ছে।আর সহ্য হচ্ছে না রোদেলাকে তার।
চলবে….

