অভিমাননামা #md_shifu /৩য় পর্ব

0
2

#অভিমাননামা
#md_shifu /৩য় পর্ব

“বাপের ওই অহংকারী বোনের এখানে আমি থাকতে পারবো না। দরকার হলে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকবো!” সাজেদের উচ্চস্বরে বলা কথায় ঘরের পরিবেশটা মুহূর্তেই ভারী হয়ে উঠলো। রাহেলা দ্রুত সাবধানী স্বরে বলল
“ওর মেয়ে ঘরে আছে, আস্তে বল। মেয়েটা শুনলে কষ্ট পাবে। আর তোর ফুপি আগের মতো নাই, অনেকটাই বদলে গেছে।”
কথাটা সত্য হলেও সাজেদ সেটা মানতে রাজি না। তার বুকের ভেতর জমে থাকা পুরোনো অপমানগুলো এখনো তাজা ক্ষতের মতো জ্বলছে।
কিছু স্মৃতি মানুষ চাইলেও ভুলতে পারে না। সাজেদের কাছেও ব্যাপারটা তেমনই। শুধু একবার নয়, ছোট-বড় অসংখ্য ঘটনায় কোহিনূর তাদের অপমান করেছে। এমন ভাব করতো যেন মাটিতে পা-ই পড়ে না তার। সেই তাচ্ছিল্যভরা চোখ, কথার খোঁচা সবকিছু আজও সাজেদের মনে আছে স্পষ্ট।
সাজেদের এখনো মনে আছে, একবার রাহেলা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। বাধ্য হয়ে কয়েকদিনের জন্য তারা কোহিনূরদের বাসায় উঠেছিল। কিন্তু সেখানে শান্তিতে থাকা হয়নি। থাকার দুদিনের মাথায় সামান্য কথা কাটাকাটির জেরে কোহিনূর এমন ব্যবহার করেছিল, যা আজও সাজেদ ভুলতে পারেনি।
গভীর রাতে যখন রাহেলার শরীর জ্বরে কাঁপছে তখন কোহিনূর রাগের মাথায় সাজেদের বাবা-মাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল। কোনো দয়া মায়া করেনি। সেই রাতটার কথা মনে পড়লেই সাজেদের বুকের ভেতর আগুন জ্বলে ওঠে। রাহেলা হয়তো সময়ের সাথে সব ভুলে গেছে, কিন্তু সাজেদ পারেনি।
“ফুপি হয়তো এখন বদলে গেছে। অসুস্থতার জন্য হোক কিংবা সত্যি সত্যিই সুবুদ্ধি হওয়ার কারণে হোক। কিন্তু তাই বলে আগের করা কাজগুলো কি মুছে যাবে? তোমরা ভুলে যেতে পারো, আমি পারি না।” সাজেদের গলায় জমে থাকা ক্ষোভ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। কথাগুলো বলার সময় তার চোখেমুখে এক ধরনের কঠিন অভিমান ফুটে উঠলো। বহু বছর ধরে বুকের ভেতর চেপে রাখা অপমান যেন আবার নতুন করে নাড়া দিল তাকে।

রাহেলা ছেলের দিকে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইলো। সে জানে সাজেদ ভুল কিছু বলছে না। সেই রাতের অপমান সে নিজেও ভুলেনি। শুধু সংসার আর সম্পর্ক বাঁচানোর জন্য মুখ বুজে নিয়েছে সবকিছু। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত স্বরে বলল,
“আচ্ছা বাবা, তোকে ওদের সাথে থাকতে হবে না। কারো সাথে জোর করে কথা বলতেও হবে না। ওদের ছাদের উপরে যে চিলেকোঠার ঘরটা আছে, সেখানে থাক। দরকার হলে মাস শেষে থাকা-খাওয়ার টাকা দিয়ে দিস। না হয় নিজেই রান্না করে খেয়ে নিবি।” রাহেলার কণ্ঠে অনুরোধের সাথে অসহায়ত্বও মিশে ছিল। ছেলেটাকে সে ভালো করেই চেনে। আত্মসম্মানের কাছে সাজেদ কখনো মাথা নত করে না। সাজেদ কিছু বললো না। শুধু চোয়াল শক্ত করে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলো।
ভিতরে ভিতরে সে বুঝতে পারছে, মায়ের কথাগুলো অযৌক্তিক না। কিন্তু মন নামের জিনিসটা যুক্তির কথা সবসময় শুনতে চায় না। বিশেষ করে সেখানে যদি পুরোনো অপমানের দাগ লেগে থাকে।
গতবার যে ইন্টারভিউটা দিয়েছিল সাজেদ, সেটা থেকে কোনো খবর না আসায় শেষমেশ ঢাকার একটা কোম্পানিতে আবার ইন্টারভিউ দেয় সে। ভাগ্য ভালো, এবার আর হতাশ হতে হয়নি। কয়েকদিন পরই ফোন আসে চাকরিটা হয়ে গেছে। খবরটা শুনে প্রথমে বিশ্বাসই হচ্ছিল না সাজেদের। এতদিনের দৌড়ঝাঁপ, হতাশা আর অপেক্ষার পর অবশেষে একটা চাকরি। রাহেলার চোখেও সেদিন স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠেছিল। ছেলের মুখে অনেকদিন পর একটু হাসি দেখেছিল সে। কিন্তু আনন্দের সাথে সাথেই নতুন একটা সমস্যাও সামনে এসে দাঁড়ায় ঢাকায় থাকবে কোথায়? আত্মীয়স্বজন বলতে সেখানে শুধু কোহিনূরই আছে। আর এই কথাটা শুনার পর থেকেই সাজেদ রাগে ফেটে পড়ছে। কিছুতেই সে ওই বাড়িতে থাকতে রাজি না। বারবার চিৎকার করে বলছে অন্য কোথাও ব্যবস্থা করবে।
তবে শেষ পর্যন্ত অনেক ভেবেচিন্তে সাজেদ বুঝে গেল, বাস্তবতা শুধু রাগ আর আত্মসম্মান দিয়ে চলে না। নতুন চাকরি,আবার ঢাকার মতো শহরে হুট করে বাসা নেওয়াও সহজ না। সবদিক হিসাব করে শেষমেশ সে মেনে নিল আপাতত ফুপির বাসা ছাড়া তার সামনে আর কোনো উপায় নেই।
তবুও নিজের আত্মসম্মানের জায়গাটা ছাড়তে রাজি না সে।
মনে মনে ঠিক করে নিল, যদি থাকতেই হয় তাহলে কারো দয়ায় না। মাস শেষে থাকা-খাওয়ার পুরো খরচ সে নিজেই দিবে। দরকার হলে আলাদা রান্না করে খাবে, তবুও যেন পরে কেউ তাকে নিয়ে কোনো কথা বলতে না পারে।
…………
সাজেদের ঢাকায় যাওয়ার কথা শুনে চাঁদ ভীষণ খুশি হয়েছে। খবরটা শোনার পর থেকেই তার মুখে লুকানো হাসি লেগে আছে। যদিও সবার সামনে খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে, তবুও ভেতরের উত্তেজনাটা সে ঠিকই অনুভব করছে।
সকালে সাজেদ বের হওয়ার সময়ও তাই ইচ্ছে করেই সামনে যায়নি চাঁদ। অন্যদিন হলে কোনো না কোনো অজুহাতে বিরক্ত করতো, দুই একটা খোঁচা মেরে কথা বলতো। কিন্তু আজকে করেনি।
কারণ সে জানে, সাজেদের মেজাজ এখন এমনিতেই খারাপ। এই সময় বেশি বিরক্ত করলে উল্টো রেগে যেতে পারে।
তবে চাঁদ মনে মনে একটা পরিকল্পনা ঠিক করেই রেখেছে।
বিকেলে সাজেদ ফিরে আসার পর যদি সত্যিই ঢাকায় যাওয়ার ব্যাপারে রাজি হয়ে যায়, তাহলে যাওয়ার আগে একবার ঠিকই তাকে বিরক্ত করবে। দীর্ঘদিন কাছাকাছি থাকবে এই ভাবনাটাই কেন যেন চাঁদের মন ভালো করে দিচ্ছে।

আজ সারাদিন ধরেই সাজেয়া একটা বিষয় খুব ভালোভাবে লক্ষ্য করছে।
সাজেদের ঢাকায় যাওয়ার কথা শোনার পর থেকেই চাঁদ অস্বাভাবিক রকম খুশি। মুখের হাসিটা যেন কিছুতেই থামছে না। কখনো একা একা হাসছে, কখনো আবার মোবাইল হাতে নিয়ে কী যেন ভাবছে।
প্রথমে বিষয়টা গুরুত্ব না দিলেও ধীরে ধীরে সাজেয়ার মনে সন্দেহ জাগতে শুরু করল।
বিকেলের দিকে সুযোগ বুঝে সে হঠাৎ চাঁদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর আন্দাজে ঢিল ছুঁড়ে বলল,
“এই চাঁদ, তুই কি আমার ভাইকে পছন্দ করস?”
হঠাৎ এমন প্রশ্ন শুনে চাঁদ স্পষ্টই ঘাবড়ে গেল। চোখ বড় বড় করে কয়েক সেকেন্ড সাজেয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। মুখে কিছু বলার আগেই তার অপ্রস্তুত ভাবটাই সব বলে দিল। আর সেটাই যথেষ্ট ছিল সাজেয়ার জন্য।
মুখে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলল,
“ওহহ! তাইলে আমার সন্দেহই ঠিক ছিল!”
“কি যে বলিস না তুই”
চাঁদ দ্রুত অন্যদিকে তাকানোর চেষ্টা করল। কিন্তু সাজেয়া এবার ছাড়ার পাত্রী না। সে একের পর এক প্রশ্ন করতেই লাগল। সত্যিটা বের না করা পর্যন্ত যেন শান্তি নেই তার।
প্রথমে চাঁদ কিছুতেই স্বীকার করতে চাইলো না। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, সাজেয়া তার ভাই বলতে অজ্ঞান। ভুল কিছু বুঝলে গিয়ে সাজেদকে সব বলে দিতেও পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাজেয়ার জোরাজুরির কাছে হার মানতেই হলো তাকে।
তবে একটা শর্তে।
“দেখ, আমি যদি কিছু বলিও, তুই কিন্তু সাজেদ ভাইকে কিছু বলতে পারবি না যতক্ষণ না আমি নিজে বলি।”
সাজেয়া সঙ্গে সঙ্গেই বলল,
“আচ্ছা বাবা, প্রমিস! এখন বল।”
চাঁদ একটু ইতস্তত করে শেষমেশ মাথা নিচু করে নিজের অনুভূতির কথা স্বীকার করল।
আর সেটা শুনে সাজেয়ার মুখে বিশাল হাসি ফুটে উঠলো।
“সব বুঝলাম। কিন্তু একটা কথা বল তো, আমার ভাইয়ের প্রেমে পিছলে পড়লি কিভাবে?”
চাঁদ ঠোঁট কামড়ে হালকা লজ্জা পাওয়ার ভান করে বলল,
“সে অনেক কাহিনি। আগে আমাকে একটু ‘ভাবি’ ডেকে দিলটা খুশি করে দে!”
কথাটা বলেই সে মুখ লুকানোর অভিনয় করল। তা দেখে সাজেয়া হেসে উঠলো। তার দেখাদেখি চাঁদ ও হেসে দিলো
…………..
“আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। আর সাজেদ ভাই মনে হয় অনার্স তৃতীয় বর্ষে নাকি চতুর্থ, ঠিক মনে নাই। ঈদের দিন আব্বুর সাথে তোদের বাসায় বেড়াতে আসছিলাম। প্রায় তিন বছর পর এসেছিলাম সেবার।” চাঁদ একটু থামল। যেন পুরোনো স্মৃতিগুলো আবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
“তখন সাজেদ ভাই আসরের নামাজ পড়তে গেছিল। আমরা সবাই বসে নাস্তা করতেছিলাম। হঠাৎ দেখি উনি বাসায় ঢুকলো”
কথা বলতে বলতেই চাঁদের ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠলো।
“পড়নে ছিল কালো পাঞ্জাবি।” এইটুকু বলেই সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর মাথা নিচু করে আস্তে করে বলল,
“আর তখনই প্রেমে পিছলা খেলাম। সেই যে খেলাম আর উঠতেই পারতেছি না।” কথাগুলো বলে চাঁদ নিজেই লজ্জা পেয়ে গেল।
আজ বিকেলেই তো রাহেলা জানিয়েছে, সাজেদ যেতে রাজি হয়েছে । আর সেই খবর শোনার পর থেকেই চাঁদের আনন্দ যেন লুকানোই যাচ্ছে না। তাই আর না পেরে সাজেয়াকে সব খুলে বলল সে।
কথা শুনে সাজেয়া চোখ বড় বড় করে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
“ওরে বাবা! এটা তো দেখি একদম লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট!” বলেই হো হো করে হেসে উঠলো সে। সাজেয়ার এমন পচানো দেখে চাঁদের গাল মুহূর্তেই লাল হয়ে গেল। সে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে ফেলল। আর সেটা দেখেই সাজেয়া আরও জোরে হাসতে লাগল। হাসতে হাসতেই বলল,
“ওমা! ভাবি দেখি লজ্জাও পায়!”
“চুপ কর তো!” চাঁদ লজ্জায় প্রায় চিৎকার করেই বলল। তারপর আর দাঁড়াতে না পেরে দ্রুত রুম থেকে বের হয়ে গেল। আর পেছনে বসে সাজেয়া তখনো হাসতেই থাকল।
……………..
রাতে সবাই একসাথে ভাত খাওয়ার সময় ঠিক হলো, কাল সকালের ট্রেনেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিবে তারা।
রাহেলা বলল,
“যেহেতু চাঁদেরও সামনে ক্লাস শুরু হবে, তাই ওকেও এখনই পাঠাই দেই। পরে আবার আলাদা করে কাউকে দিয়ে পাঠাতে হবে।”
কথাটা শুনে চাঁদ রাজি হয়ে গেল।
আসলে কথাটা শুনে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছে চাঁদ নিজেই। যদিও বাইরে থেকে খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে, ভেতরে ভেতরে সে যেন আনন্দে লাফাচ্ছে।
প্রথমবার এত দীর্ঘ সময় একসাথে জার্নি করবে তারা। তাও আবার ট্রেনে!
এই ভাবনাটাই বারবার মাথায় ঘুরতে লাগল চাঁদের। কখনো ভাবছে জানালার পাশে বসে বাইরে দেখবে, কখনো ভাবছে সাজেদ যদি পাশে বসে আবার পরক্ষণেই নিজের এমন চিন্তাভাবনায় লজ্জা পেয়ে যাচ্ছে।
রাত যত বাড়ছে, চাঁদের মাথার ভিতর কল্পনাও তত বাড়ছে।
ফলে ঘুম আসতে বেশ দেরি হয়ে গেল তার।
কখন যে রাত গভীর হয়ে গেছে, নিজেও বুঝতে পারেনি।
আর তার ফল হলো সকালে।
ঘুম থেকে উঠতেই মনে হলো চোখই খুলতে চায় না। শরীরজুড়ে আলসেমি। তবুও আজকে দেরি করার উপায় নেই।
অনেক কষ্টে বিছানা ছাড়ল চাঁদ। আধোঘুম চোখে ফ্রেশ হয়ে দ্রুত রেডি হয়ে নিল।
রেডি হওয়ার সময় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকবার নিজেকে দেখলও। কেন যেন আজকে নিজের চেহারাটা একটু বেশি ঠিকঠাক রাখতে ইচ্ছে করছে তার।
নাস্তা শেষ করেই সবাই বের হয়ে গেল স্টেশনের উদ্দেশ্যে।
ভোরের ঠান্ডা বাতাসে চারপাশ তখনো পুরোপুরি ব্যস্ত হয়ে ওঠেনি। কিন্তু চাঁদের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক উত্তেজনা কাজ করছে।
আর কয়েক ঘণ্টা পর থেকেই শুরু হবে নতুন এক যাত্রা।
ঢাকার পথে আর হয়তো তার অনুভূতির মানুষটার আরও একটু কাছাকাছি যাওয়ার পথেও।

চলবে………
[সবাই রেসপন্স করিয়েন ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here