মেঘের মুলুকে চল’ আয়রা তাবাস্সুম পর্ব ২৬

0
2

‘মেঘের মুলুকে চল’
আয়রা তাবাস্সুম
পর্ব ২৬
______________________________________

আযান খেয়াল করেছে দুদিন ধরে বাঁদরের মনমেজাজ বেশ ফুরফুরে হয়ে আছে। আযানের টিটকারি তেমন গায়ে মাখছে না৷ ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষ্যে বেকুব মহাখুশি। তার মতন উৎসাহ আগ্রহ আর কারো নেই, বিয়েটা যার তারও নেই! আযানের বদ্ধমুল ধারণা বিয়েটা নিয়ে মেয়েটার সাংঘাতিক আগ্রহ! আর তার সেই ধারণাকে সঠিক করতেই যেন মেয়েটা উঠেপড়ে লাগল। ঘোষণা দিলো বাপেরবাড়ি গিয়ে একেবারে দায়িত্ব নিয়ে ভাইয়ের মেহেদী সন্ধ্যা করবে সে।

রেজওয়ান চৌধুরী আর রাদ দুজনেই নিজেদের ব্যবসা আর অফিসের কাজে ভীষণ ব্যস্ত থাকায় কালক্ষেপণ না করে অতিসত্বর বিয়ের ডেইট ঠিক করা হয়েছে। রাদ অন্তর্মুখী স্বভাবের ছেলে। এত আড়ম্বর জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের আয়োজন পছন্দ ছিল না তার। তাই নাজিয়াকে বেশ কয়েকবার বুঝিয়েছেও মেহেদি সন্ধ্যার মতন আচার অনুষ্ঠান না করতে। বিয়েটা হলেই ত হলো! পরে বোনের আধাঁর চোখমুখ দেখে ছেলেটা সায় দিলো। ছোট থেকেই নাজিয়াকে ভীষণ আদর যত্নে বড় করেছে তারা বাড়ির সবাই, তাই মেয়েটা আহ্লাদীও হয়েছে বেশ৷ রাদ পারতপক্ষে চায় না বোনের কোনো আবদার ফেলে রাখতে। তাই নাজিয়াকে অনুমতি দিল নিজের ইচ্ছেমতন সবকিছু করতে৷ আর সেই সুযোগে মেয়েটা ঘরোয়াভাবে এটাওটা আয়োজন করেছে তার কাজিনদের সাথে মিলে।

নিজের মনমতন সবকিছু করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মেয়েটা ঘোষণা দিলো মেহেদীসন্ধ্যার পুরোটা দিন সে তার বাপের বাড়িতে থাকবে। রাতভর সেখানে হইচই করে পরদিন একেবারে বিয়ের ভেন্যু থেকে ফ্ল্যাটে ফিরবে। আযান দীর্ঘশ্বাস চেপে বাঁদরের বাঁদরামি দেখে গেল দুদিন ধরে। দুদিন আগেও কেঁদেকেটে দুনিয়া একাকার করেছে আযানের তার প্রতি টান নেই এটাওটা বলে৷ অথচ তার নিজের আযানের প্রতি কোনো টান আছে! থাকলে আযানের কথা বেমালুম ভুলে এভাবে বাপের বাড়ি থেকে যাবার পায়ঁতারা করতো! একটা বারও আযান কে সেধেছে তার সাথে যেতে!

আযানের বড় অভিমান হলো৷ ছেলেটার মন ত জানে মেয়েটাকে সে কেমন চোখে হারায়। সেখানে ঘন্টাখানেক না, একটা গোটা দিনের বিরহ! একটা গোটা রাত মেয়েটা তার পাশের বালিশে মুখ ডুবিয়ে হাতপা ছড়িয়ে ঘুমোবে না! বাদঁর টা পাশে না ঘুমোলে আযানের চোখে আদৌ ঘুম নামবে! কি বিশ্রী সব বদঅভ্যাস যে হয়েছে তার এই একটা মাসে! নিজের উপর ছেলেটা নিজেই বিরক্ত। বাঁদর টা কে নিয়ে তার হয়েছে যত জ্বালা। স্বভাবসুলভ গম্ভীরতার কারণে না পারে মুখ ফুটে কিছু বলতে আর না পারবে এমন বিরহ সইতে৷ সেই অভিপ্রায়ে ছেলেটা বহু ভেবেচিন্তে রাতের বেলা অবসরে প্রসঙ্গ টা তুলল নিজে থেকেই। আশা করল মেয়েটা নিজেই তার হাতেপায়ে ধরবে আযান যেন কালকের দিন টা তার সাথে তার বাপের বাড়ি তেই থাকে। তারপর আযানও নাহয় মেকি বিরক্তির ভান ধরে রাজি হয়ে যাবে।

ছেলেটার এমন পরিকল্পনা অবশ্য সফল হলো না। প্রসঙ্গটা উঠতেই মেয়েটা শুরুতেই নিজের কথা বলে ফেলল, ‘আপনাকে আসতে বলছি না কারণ অফিস টফিস করে ক্লান্ত হয়ে ওখানে যাবেন। পরে দেখা যাবে চেঁচামেচি হৈ-হুল্লোড়ে ঘুম হচ্ছে না আপনার। আমি তো এমনিও রাত জাগব। তাই ভালো হবে যদি আপনি ফ্ল্যাটে এসেই ঘুমিয়ে পড়েন আর একেবারে পরদিন বিয়ের ভেন্যুতে আসেন।’ মুখে একেবারে ভালোমানুষের ভান ধরে নাজিয়া কথাগুলো বললেও মনে মনে বিড়বিড় করল, ‘মাথামোটা তো আমি! আপনাকে যেচে পড়ে আমার সাথে আসতে বলি আর আপনি সেখানে থেকে আমার আনন্দ পন্ড করেন! এতো সোজা! এমন বেকুব আমি নাজিয়া মোটেও নই! হুহ!’

আযানের মুখ বিরক্তিতে তেতো হয়ে আসল। মেয়েটা নিজের কথা বলে ফেলে আযান যে কোনো একটা ছুতোয় কথাটা আবার তুলবে সেই পথও তো খোলা রাখল না। আরে বাপ আযান নাহয় একবার বলেছে কথাপ্রসঙ্গে যে তার অন্যে কারোর বাসায় কিংবা নিজের বেড বাদে আরামের ঘুম হয় না৷ তাই বলে বেকুবের সেই কথাটা মাথায় একেবারে সেঁটে রাখতে হবে! বেয়াক্কল মেয়ে একটা! আযানের চোখমুখ দেখে কি বুঝে না নাকি আযানের আরামের ঘুম তখন হয় যখন সে মেয়েটাকে পাশবালিশের মতন জড়িয়ে ঘুমোতে পারে।
মেয়েটা পাশে না থাকলে আরামের ঘুম বাদ আযানের চোখের পাতায় এমনি ঘুম নামবে কিনা সন্দেহ! আযান মনেমনে এসমস্ত কিছু ভেবে ফেললেও মেয়েটাকে বলল না কিছুই। বেকুব যদি তাকে ভুলে আনন্দ করতে পারে করুক! আযান একদম ঠিক ধরেছে৷ বেকুবের আযানের প্রতি টান মায়া সব মুখে মুখে, মিছিমিছি! মনের টান থাকলে কি বুঝত না আযানের মনের ভাবনা! বুঝত না, সে না থাকলে স্রেফ একটা দিনের বিরহবেদনা আযানের একটা গোটা বছরের সমান লাগবে!

পরদিন আযান অফিস যেতেই নাজিয়া মহা আনন্দে ননদদের ফ্ল্যাটে আসতে বলে সবাই মিলে তার বাপের বাড়ি গেল। ইশিতা তৃষা তাশফি নিধি নোভা সবকটা ভীষণ খুশি৷ অকেশন মানেই তো নতুন আউটফিট মনের মতন মেকআপ করার মহাসুযোগ! মেয়েমানুষ এমন সুযোগ থোড়াই মিস করে!

বাড়িভর্তি আত্নীয়স্বজন। তাই নাওয়ার চৌধুরী মেয়েকে আড়ালে নিয়ে খুউব বকাঝকা করলেন যখন জানলেন মেয়েটা বরকে রাতে আসার জন্য তেমন সাধেনি। মহিলা অবশ্য জানেন মেয়ের স্বভাব। পাড়াবেড়ানি মেয়েটা উৎসব আয়োজনে মত্ত হয়ে গেলে দুনিয়া ভুলে যাবার অভ্যেস তার। তাই নাজিয়াকে আর জোরটোর করলেন না আযানকে কল দিয়ে আসতে বলার ব্যাপারে৷ মনস্থির করে ফেললেন নিজেই কথা বলবেন মেয়ে জামাইয়ের সাথে। ছেলেটাকে ত তিনি দেখেছেন সেবার। কথাবার্তা কম বললেও কেমন নম্র ভদ্র বিনয়ী৷ তিনি আন্তরিকভাবে নিমন্ত্রণ করলে নিশ্চয়ই আসবে। যেই ছেলে তার এমন ফুড়ুৎ স্বভাবের মেয়েকে নির্দ্বিধায় সহ্য করে নিচ্ছে সেই ছেলের আদব কায়দা ভদ্রতাজ্ঞান নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই মহিলার৷

সকাল থেকে অফিসে আযানের মনভার। ছেলেটার মন তখনও মানছিল না বেকুব তাকে রেখে এরকম আনন্দ আয়োজন করতে পারবে! নিজের এমন ছেলেমানুষি ভাবনায় দোটানায় ছিল তার মন৷ এই বয়সে এসব মানঅভিমান তাকে মানায়! আবার অবচেতন মন বলছিল বেকুব তার কথা একটুও ভাবে না। মনের এই দোলাচল তার কাটল একটা ফোনকলে।

বিকেলের দিকে নাওয়ার চৌধুরী ফোন দিলেন আযানকে। কন্ঠে ভীষণ আন্তরিকতা ঢেলে তিনি তাকে নিমন্ত্রণ জানালেন৷ অফিস থেকে সোজা বাসায় আসতে অনুরোধ করলেন। আযান স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্য রেখে রাজি হলেও মনে তার খুশির ফোয়ারা নামল। এবার সে ওই বাড়িতে গিয়ে দেখব বেকুব কোথাকার এমন হনু হয়েছে! এমন কি রাজ্যের আয়োজন সে একা হাতে করছে যে বরকে ভুলে বসল একেবারে! আসতে সাধাসাধি না করুক সারাটাদিন একটা কলও করলো না! বেয়াদব একটা! মিনিমাম ভদ্রতাবোধ জানে না। সে একবার কল করে ডাকলেই কি আযান ছ্যাঁচড়ার মতন সুড়সুড় করে চলে যেতো নাকি! হুহ! যদিও ছেলেটার অবচেতন মন ধরে ফেলল এমন মেকি হম্বিতম্বি। বলে বসল, চুপ ব্যাটা! তুই একেবারে নাচতে নাচতে যেতি।

সন্ধ্যে নাগাদ বাড়িতে হইহই রব পড়ে গেলো। নাজিয়ার কাজিনেরা আমুদে স্বভাবের। ইশিতা তৃষা তাশফিদের সাথে জমিয়ে আড্ডা বসালো। নাজিয়া একা হাতে সব করবে ভাবলেও শেষমেশ সবাই নিজেরাই উৎসাহ নিয়ে সবটা করে ফেলল। লিভিং রুম ডেকোরেশন থেকে শুরু করে ডেজার্ট নাশতার প্রিপারেশন মেহেদীর কোনের ব্যবস্থা সব কমপ্লিট হয়ে গেল অল্পসময়ের মধ্যেই। নাজিয়ার তখন খুশিতে গদগদ অবস্থা। এমন আনন্দ উৎসবে মেয়েটার অন্য কিছুর হুঁশ থাকে না। তবে তার আনন্দে ভাটা পড়ল হুট করে আসা কলিংবেলের শব্দে। লিভিং রুমে তখন জমজমাট আড্ডার আসর বসেছে৷ নাজিয়ার মোটেও ইচ্ছে করছিল না আড্ডা ছেড়ে আসতে। দরজার ওপারে দাঁড়ানো মানুষটার উপর বিরক্তিও কাজ করলো। তার বাপ ভাই তো আরো রাত করে ফেরার কথা। তাই মেয়েটা আন্দাজ করতে পারলো না কলিংবেল চাপা মানুষটা কে হতে পারে!

তাই চোখেমুখে রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে মেয়েটা দরজা খুলতে গেল। আর দরজা খুলতেই তার বিরক্তি আরো একধাপ বাড়ল। কোথায় সে ভেবেছিল আজকে ইচ্ছেমতন আনন্দ বাদঁরামি করবে সে, বদটাও তার উপর ছড়ি ঘুরাবার সুযোগ পাবে না সেই আশায় গুড়েঁ বালি! মেয়েটা তো প্রাণপণে চেষ্টা করেছে বদ টাকে বাপের বাড়ি না আনার। অথচ নাজিয়ার এমন মার্কামারা কপাল, তার আনন্দে বাগড়া দিতে আযাবের বাচ্চা টা ঠিকই এসে হাজির হয়েছে! আবার কেমন রাগী চোখমুখ পাকিয়ে দেখছেও নাজিয়াকে যেন নাজিয়া বড়সড় কোনো অপরাধ করে ফেলেছে! অথচ নাজিয়ার সাথে তার কথাবার্তাও হয়নি সারাদিন। নাজিয়া তাকে জ্বালাতনও করেনি একটুও!
অথচ মেয়েটা যদি জানত, সে যে তাকে বিরক্ত করে নি গোটাদিন সেটাই আযান ইয়াসীর ভুইঁয়ার সারাদিনের ত্যক্তবিরক্ত মেজাজের প্রধান কারণ! কি অদ্ভুত মানুষের মন!

নাজিয়ার তখন মেজাজ চড়ে আছে। আনন্দ পন্ড হবে এমন ভাবনায় মেয়েটা ভুলে বসল হুঁশজ্ঞান৷ আযানকে দরজার বাইরে দাঁড় করিয়েই প্রশ্নটা করে ফেলল বিরস গলায়, ‘কি আশ্চর্য! আপনি ফ্ল্যাটে না গিয়ে এখানে কেনো!’
আযান গা করল না মেয়েটার এমন রুঢ আচরণ। ঠিক ধরেছে সে। মেয়েটা মুক্ত পাখির মতন ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ উড়বে, দুনিয়ার বাঁদরামি এক রাতেই করে ফেলবে সেসবের জন্যই ত আযানকে নিয়ে আসতে তার এত অনীহা! আযান বের করবে বেকুবের এত আনন্দ! সেই ভাবনায় মেয়েটাকে ঠেলে বাসায় ঢুকতে ঢুকতে ছেলেটা মুহূর্তে চেহারায় রাগী ভাব এনে গমগমে গলায় বলল, ‘বাব্বাহ! এত বিরক্তি! আমি আসায় তোমার খুউব অসুবিধে হলো দেখছি! আরেকটু দেরি করলে এলে বোধহয় বাঁদরের বাদঁরনাচ দেখতে পেতাম, তাই না!’

এমন নিম্নমানের রসিকতায় মেয়েটার চড়ে যাওয়া মেজাজ মুহূর্তেই বিগড়াল৷ নেহাৎ নাজিয়ার বর হয় বজ্জাত টা নাহলে সে কবেই মুখের উপর জবাব দিয়ে ফেলতো, আরে ব্যাটা আমি নাজিয়া বাঁদর হলে তুই তো গরিলা একটা! যেমন গরিলার মতন তোর শরীর তেমন গরিলার মতন তোর আচরণ। গলার আওয়াজ তো মিলেই! বুকে বারি মেরে আউআ করলে একেবারে খাপেখাপ হবে!
এসব কথা বলতে না পারার রাগে দুঃখে মেয়েটার ইচ্ছে হলো নিজের মাথার চুল ছিঁড়তে। গরম আগুনে ঘি ঢালার মতন রাগ আরো বাড়ল লিভিং রুম থেকে তার কানে আসা আযানের বলা আরেকটা নিম্নমানের রসিকতায়!

‘ওরেব্বাস! বাংলাদেশ ব পার্টির মিটিং হচ্ছে তাহলে! বাঁদর বেকুব বেয়াক্কল বেয়াদব সবকটা একসাথে জুটেছে! তা লিডার টা কে এই পার্টির? তোদের মাননীয় ভাবিমনি?’
নাজিয়ার কাজিনেরা তখন কিচেনে তার মাকে টুকটাক হেল্প করে দিচ্ছে। ইশিতারা চাইলেও নাওয়ার চৌধুরী তাদের লিভিং রুমে বসিয়ে গেলেন তারা মেহমান হবার সুবাদে। তাই লিভিং রুমেই আড্ডায় মত্ত ছিল ইশিতা সহ নিধি নোভা তৃষা তাশফিরা। আযানের জানা ছিল না তারাও থাকবে। তাই হঠাৎ করে পাঁচ মাথাকে একত্রে দেখে ছেলেটা মশকরা করে বসল। আর আযানের কোনো টিটকারি মশকরায় যে বেকুবের উল্লেখ থাকবে না তা কি করে হয়!

[ বিয়ে মেহেদী এসব চার পাঁচটা পর্বে না টেনে দু তিনটে পর্বে শেষ করে ফেলার ইচ্ছে আছে। এতগুলো বর্ণনা একটা পর্বে গুছিয়ে আনতে বেশ বেগ পোহাতে হয়েছে আমার। তাই যতজন ই পড়বেন এমনকি সাইলেন্ট রিডার রাও সবাই মন্তব্য জানালে খুশি হবো৷ আযান নাজিয়া আমার খুউব আদরের৷ ওদের আপনারাও আদর করলে আমার ভালো লাগে। ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here