‘মেঘের মুলুকে চল’
আয়রা তাবাস্সুম
পর্ব ২৭
__________________________________
ইশিতা তখন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে ভাইয়ের চেহারায়। ভাবি তো বলেছিল ভাইয়াকে ডাকেনি, ভাইয়া আসবেনা তাহলে কোত্থেকে হাজির হলো ছেলেটা! পরে অবশ্য মেয়েটা ঘটনা ঠাহর করতে পারলো। বিরহ সইতে না পেরেই বোধহয় তার ভাই এরকম স্বভাববিরুদ্ধ একটা কাজ করে বসেছে, নির্দ্বিধায় অনুষ্ঠান বাড়িতে এসে জুটেছে। ভাইকে ত ছোট থেকে দেখেছে মেয়েটা, একসাথে বড় হয়েছে দুজনে।সে তো জানে তার ভাইয়ের উৎসব আয়োজন নিয়ে এত মাথাব্যথা ছিল না কোনোকালেই, এসব নিয়ে এত মাথা ঘামায় না ছেলেটা।
অন্তর্মুখী গম্ভীর স্বভাবের হওয়ায় মানুষজনের ভীড় আর যেকোনো অকেশন থেকে সচরাচর দূরে থাকে সে। অথচ আজ নিজেদের কোনো কাছের আত্নীয়স্বজনের না বরং ভাবির ভাইয়ের মেহেদী অনুষ্ঠানের আয়োজনে এসে পড়েছে একদম ফুরফুরে মেজাজে। মেয়েটা মনে মনে হাসলো ভাইয়ের এই আমূল পরিবর্তনে। বুঝল সবটা ভাবির কামাল। যতই ভাই নীতি আওড়ে যাক বউকে মাথায় তুলে রাখা যাবে না, আদর আহলাদ দেখানো যাবে না। ভাই নিজের বলা নীতিবাক্য গুলো নিজেই ভুলে বসছে দিনদিন, চব্বিশ ঘন্টায় চব্বিশ বার বেকুব ডাকা বউয়ের প্রেমে একেবারে হাবুডুবু খাচ্ছে।
মেয়েটাকে এমন ভাবনায় মশগুল দেখে আযান আবারও মশকরা করে বলল, ‘কিরে! আসলেই তোদের মিটিং হচ্ছিল নাকি! এমন মহাগুরুত্বপূর্ণ মিটিং যে দশ বারো বার কলিংবেলের আওয়াজ শুনেও একটাও দরজা খুলতে গেলি না!’
বোনদের মধ্যে নিধি সাহসী বেশ। ছোটবেলায় আযানের বকাধমক কম শুনেনি। তাই রাগও তার বেশি আযানের উপর। তাই মুখের উপর জবাব দিল, ‘হ্যা! খুউব গুরুত্বপূর্ণ মিটিং চলছিল। তুমি এসে বাগড়া দিয়েছ।’ সুযোগ বুঝে চেপে রাখা রাগ ক্ষোভও উগড়ে দিতে ভুলল না। অপমান করার মোক্ষম সুযোগ পেয়ে বলে বসল, ‘আমাদের তো তবু ভাবি একদম যেচে পড়ে ডেকেছে। তোমাকে ডেকেছে? যে তুমি এভাবে এসেছ?’
আযান গায়ে মাখলোনা এমন অপমান টিটকারি। এরকম মাথা খারাপ বেকুব বউ যার তার এরকম অপমান টিটকারি ই ত প্রাপ্য! কি একটা চ্যাটিং গ্রুপ খুলেছে সারাক্ষণ সবকটা সেটায় মেসেজ দিয়ে হাহাহিহি করবে। বেকুব বোধহয় দিনে ক বার ওয়াশরুমে যায় সেটার হিসাবও দেয়। সব কথা বেয়াদব গুলো কে জানাতেই হবে ! নাহলে বেয়াদব গুলো জানবে কিভাবে যে আযানের আসার কথা না, বেকুব সাধে নি তাকে। কথার তোড়ে দমে যাওয়ার লোক সে মোটেও নই। তাই সমস্ত ভাবনা একপাশে রেখে আযান কৃত্রিম হামি তুলে একেবারে গা ছাড়া ভাব নিয়ে জবাব টা দিল।
‘আমাকে তোদের প্রিয় ভাবির আম্মা আসতে বলেছে। বলেছে সাথে করে একটা ডুগডুগিও নিয়ে আসতে। বাঁদর নাকি এখানে বাঁদর নাচ দেখাচ্ছে!’
শেষের কথাগুলো বলে আজান হেলে দুলে পা বাড়াল নাজিয়ার বেডরুমের উদ্দেশ্যে। ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নিবে খানিকটা। সারাটাদিন কত মাথা খাটাতে হয়েছে তার এখানে আসার ছুঁতো খুঁজতে। এখন একটু ব্রেইন কে রেস্ট দেয়া দরকার। তাছাড়া আর পাঁচটা মিনিটও সেখানে দাঁড়ালে হয়তো বেকুব ও রুম থেকে ছুটে এসে দুনিয়ার কথা শোনাতো তাকে। তারপর ছোট ছোট বোনগুলোর সামনে তার মাথা কাটা যেত। বেকুবের এমনিও যা মার্কামারা বোধ বুদ্ধি! কোন কথাগুলো বলতে হবে আর কোনগুলো না সেই কমনসেন্সও ত নেই।
ফ্রেশ হয়ে ডিনার সেরে আজান একচোট ঘুম দিয়েছে। আচমকা হঠাৎ ঘুম ভাঙতেই ফোনের স্ক্রিনে দেখল রাতের দেড়টা তখন। রুমের দরজ আধখোলা। লিভিং রুম থেকে সরু আলোর ছটাক আসছে। আযান চোখ ডলতে ডলতে ওয়াশরুমের দিকে তাকাল। দরজা বন্ধ৷ তার মানে বেকুব টা রুমে নেই। আযান ডিনার শেষে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়েছিল তাই অত খেয়াল করে নি তখন। ভেবেছিল বেকুব ঠিকই রাতে ঘুমোতে আসবে।
কিন্তু দেড়টা বাজে তবু মেয়েটার কোনো খবর নেই। মেয়েটা নিশ্চয় ঘুমোতেও আসে নি একবারও নাহলে বিছানার ওপাশের বেডশিট এমন টানটান থাকবে কেনো। আযানের এবার বড় বিরক্ত লাগলো। কাল সারারাতও মেয়েটা এটাওটা করে দেরিতে ঘুমিয়েছে। বাপের বাড়ি এসে অনুষ্ঠান করবে সেটা নিয়ে উৎসাহের কমতি ছিল না তার। আজকের পুরো দিনও নিশ্চয় ছুটাছুটির উপর গেছে। এখন কালকের দিনটাও বরের বোন হবার সুবাদে ব্যস্ততায় কাটবে তার।এভাবে দু-তিন দিন ঠিকঠাক না ঘুমিয়ে মেয়েটার শরীর মনমেজাজের কি অবস্থা হবে সে ভাবনায় দুশ্চিন্তা উঁকি দিল ছেলেটার মনে। বেকুবকে রুমে এসে ঘুমোতে বলার অভিপ্রায়ে ত্যক্তবিরক্ত মেজাজ নিয়ে আযান লিভিং রুমের দিকে পা বাড়াল।
লিভিং রুমের দিকে যেতেই তার চোখ বিস্ময়ে ছানাবড়া হয়ে এলো। দেখল জমজমাট আসর বসেছে একদম সেটাও এমন মাঝরাতে। এইসব মেয়েলি আচার অনুষ্ঠানে আযানের আগে কখনো আসা হয়নি সেজন্য আয়োজনের যে এতটা বাড়াবাড়ি হয় সেটা তার ধারণার বাইরে ছিল। আযান দেখল চার পাঁচটা মেয়ে কার্পেটে গোল হয়ে বসে মেহেদি দিচ্ছে একে অপরকে। আযানের অপরিচিত লাগল তাদের। তাই আযান সেদিকে পা বাড়ালো না বরং চোখ দুটো তার ইতিউতি করে খুঁজতে থাকলো বেকুবটাকে। বেকুব ও তাহলে না ঘুমিয়ে নিশ্চয় এসব আউল ফাউল বেকার কাজ করছে।
লিভিং রুমের কোনায় থাকা ডিভানে ইশিতাকে পিঠ ফিরিয়ে পা গুটিয়ে বসতে দেখে আজান সেদিকে পা বাড়াল। সেখানে গিয়ে দেখলো নোভা তৃষা তাশফি সবকটা ফোনে মেহেদীর ডিজাইন চ্যুজ করছে, তার বাদঁরটারও খুব উৎসাহ চোখেমুখে। ননদদের সাথে মিলে সেসব দেখছে। চোখের পলকে আযান কে কল্লার উপর দাঁড়ানো দেখে মেয়েটার চোখেমুখে যেন বিস্ময় খাবি খেলো।
‘অ্যাই আপনি ঘুমাননি? আমি তো দেখে আসলাম আপনি ঘুমিয়ে ছিলেন। আবার উঠে আসলেন কেন? চেচাঁমেচিঁ তে কি ঘুম হচ্ছিল না আপনার? আমি তো সেজন্য একশ বার বলেছিলাম আপনাকে এই বাড়িতে না আসতে।’
আযান অবশ্য এসব কথা গা করে নি৷ একধ্যানে ইশিতার কার্যকলাপ দেখছিল সে। অর্কমণ্য টা এমনি বাসায় কোন কাজটাজ করতে পারে না অথচ এখন কিভাবে এক্সপার্টের মতন নিধিকে দুহাত ভর্তি মেহেদি দিয়ে দিচ্ছে। অকাজ করতে এই মেয়ের জুড়ি মেলা ভার। বেয়াক্কল টা এত মনোযোগ পড়াশোনায় যদি দিতো তাহলে হয়তো এতদিনে ভালো উন্নতি হতো তার। রিটেক খেয়ে খেয়ে এক একটা সেমিস্টার টানতে হতো না৷
এসব ভেবে আযান বড়সড় দীর্ঘশ্বাসটুকু চেপে গেল। বাসা ভর্তি মানুষজন তাই ইশিতাকে দুটো ঠেশ মেরে কথা শোনানোর জন্য আনচান করা জবান টাকে বহু কষ্টে দমালো। মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কণ্ঠ প্রায় খাদে নামিয়ে নাজিয়াকে বলল, ‘যথেষ্ট করেছ আজ সারাদিন। এখন ঘুমোতে আসো। রাতের দেড়টা বাজে।’
মেয়েটা পাত্তা দিল না আযানের কথা। বরং দুনিয়ার উল্লাস নিয়ে বলে বসলো, ‘না না! আজকে কোন ঘুম টুম হবে না। আমি মেহেদি দিবো তো। এখনো দিই নি। ইশিতা কি ভালো মেহেদি দিয়ে দিচ্ছে দেখেন! আমি দুই নাম্বার সিরিয়ালে আছি এখন। নিধির পর তাশফি তারপর আমার হাতে দিবে।
আপনি বরং ঘুমোতে চলে যান। আমার ভাইয়ের মেহেদী অনুষ্ঠান অথচ আমি ই মেহেদি দিব না সেটা কিভাবে হয়!’
আযানের বড় বিরক্ত লাগলো এরকম কথাবার্তা শুনে। মেহেদী না দিলে আবার বিয়ে হয় না নাকি! আবার বেকুব নিজেও তো বলছে তার ভাইয়ের অনুষ্ঠান এটা। তাহলে বেকুবের এত মাথাব্যথা কেনো সেটাই আযান বুঝে পেল না। মেয়েটার নিজের বিয়ের অনুষ্ঠান হলে একটা কথা ছিল নাহয়। একেই বলে যার বিয়ে তার হুঁশ নেই, পাড়াপড়শির ঘুম নেই। তবু ছেলেটা সমস্ত বিরক্তি চেপে কোনোমতে এক বাক্যে জিজ্ঞেস করল
‘এসব হাতে দিয়ে কি হবে?’
‘যা হবে হবে। এসব মেয়েদের বিষয়। আপনার মাথা না ঘামালেও চলবে।’ মেয়েটার এমন ত্যাড়া গলার কথা শুনে আযানের মেজাজ যেন মুহূর্তেই চটে গেল।
‘মাথা আমি ঘামাতাম না যদি তুমি ঘুমোতে না এসে রীতিমতো এখানে লাইনে দাঁড়িয়ে হাতে এসব ভংচং দেয়ার জন্য হেদিয়েঁ মরতে। রাতের দেড়টা বাজে কোন স্টুপিড এসবের জন্য ঘুম বরবাদ করে ?’
মেয়েটা বাতাসের বেগে ফট করে জবাব দিয়ে ফেলল। ‘আমি করি। আমার সাথে সংসার করতে হলে এসব মেনে নিয়ে করতে হবে।’
ননদ নামের সাঙ্গপাঙ্গ গুলোকে পেলেই মেয়েটার মুখে কথার ফোয়ারা ছুটে। সেটা আযান বহুবার খেয়াল করেছে। সেটা বাদেও বেকুব এমনিও তাকে মোটেও মান্য করে না ইদানীং। রাতের বেলা আযান যে মেয়েটার চোখেমুখে শতশত আদুরে চুমু খায়, দুনিয়ার আদর আহলাদ দেখায়, বুকে জড়িয়ে ধরে ঘুম পাড়ায় সবকিছুর ফল সে এখন হাতেনাতে পাচ্ছে। আযানের প্রতি মেয়েটার ভয়ডর একেবারে কমে এসেছে। কথায় কথায় মুখ ঝামটাও দেয়।এই যেমন এখনও মুখের উপর জবাব দিচ্ছে!
বউয়ের উপর রাগ দেখাতে না পেরে আযানের যত রাগ সব গিয়ে পড়লেই ইশিতার উপর। গর্জে উঠে বলল, ‘অ্যাই ইশি ! এসব কাজ আরো আগে শুরু করিস নি কেনো। আর তোর ভাবিকে আগে দিয়ে দিতি নাহয়। ওর ঘুমোতে হবে তো।’
ঈশিতা তখন মনোযোগ দিয়ে মেহেদি দিয়ে দিচ্ছে। তাই কাজের মধ্যে এত কথাবার্তা বিরক্ত লাগল তার। বিরক্তির তোড়ে ভুলে বসল সামনের মানুষটা কে। মুখ ফসকে ভুলে বলে ফেলল কিছু কথা। নাহলে সচরাচর ভাইয়ের সামনে এরকম টিটকারি মেরে ডাবল মিনিং কথাবার্তা সে কখনো বলে নি, মুখে আসলেও চেপে গেছে বরাবর। ভাইয়ের রাগের ফিরিস্তি তো মেয়েটার জানা।
‘ওমাহ আমি কিভাবে জানতাম উপ্রে উপ্রে চোটপাট দেখিয়ে ভাবিকে রুমে নিয়ে যেতে ভিতরে ভিতরে তোমার এত তাড়া।’
আযান এবারে যেন মেজাজ একেবারে হারিয়ে বসলো। প্রথমে তার বাদঁরটা মুখের উপর জবাব চ্যাটাং চ্যাটাং জবাব দিয়েছে তাকে আর এখন আবার ইশি বেয়াদবটা বেয়াদবি করছে। কেমন বিশ্রী কথা বলল মেয়েটা। কত বড় সাহস! আযান গর্জে উঠে বলে গেল, ‘অ্যাই বেয়াদপ৷ চড় মেরে মুখ আজকে আমি ভেঙে ফেলব তোর৷ তারপর দেখব বড়ভাইয়ের সাথে এসব ডিজগাস্টিং কথাবার্তা কিভাবে বলিস তুই। গতকাল রাতেও এসব প্ল্যানিং ফ্ল্যানিং করতে গিয়ে কম ঘুমিয়েছে ও। আজকেও এমন কম ঘুমোলে শরীর ঠিক থাকবে ওর?
কাল বিয়ে যেহেতু সারাদিন ও ছুটোছুটি করবে। এরকম দু তিন ঘুমের এত অনিয়মে অসুস্থ হলে কে ওর দেখাশোনা করবে। তোরা করবি? ভাবি কে আলগা দরদ ত খুব দেখাস!’
ইশিতা ভেবে পেল না এমন কথার প্রতিত্তোরে কি জবাব দেবে। তবে মেয়েটার ভালো লাগল এটা দেখে তার গোঁয়ার গম্ভীর ভাই কেমন চোখে হারায় বউ কে, কত সামান্য ব্যাপারও মাথায় রাখে ভাবির বিষয়ে। তার ভাবনার মাঝে কানে এলো আযানের বলা রাশভারি গলার আদেশ।
‘নিধি র হাত ফ্যাল৷ তোর ভাবি কে আগে দিয়ে দে।’
জবাবটা ইশিতা দেয়ার আগে নিধি ফট করে মুখ খুলল। ‘ওমা! বললেই হলো৷ ইশি আপু আমার হাতে স্পেসিফিক একটা ডিজাইনে মেহেদি টা লাগাচ্ছে আযান ভাই। এখন হুট করে আবার কিছুক্ষণ পর শুরু করলে ইশি আপুর বরাবর এই ডিজাইন টা ই মাথায় থাকবে নাকি? ভুলভাল করে ফেলবে তো! আবার বাঁ হাতও পুরোটা খালি আমার। অন্তত আর আধ এক ঘন্টা টাইম দাও।’
‘এক ঘন্টা তোর মাথা দিবো!’ মহা রেগে গিয়ে একবাক্যের কথাটা বলেই আযান নাজিয়ার ডান হাতের কবজি চেপে ধরে মেয়েটার কোনো হা হুতাশ না শুনেই রুমের দিকে পা বাড়াল৷ যেতে যেতেই একটা মেহেদীর কোন তুলে নিয়ে ট্রাওজারের পকেটে পুরল সবার অগোচরে।
‘বদ লোক। আমায় নিয়ে এসেছেন কেনো! কত কষ্টে আমি দুই নাম্বার সিরিয়ালে ছিলাম জানেন? আমার পরে তৃশা তাসনুভা ওরা ছিলো। এখন আমার সিরিয়াল টা আমি হারিয়ে ফেললাম৷ সব আপনার জন্য আপনাকে আমি….’
কথা থেমে গেল আযানের বাজখাঁই গলার ধমক শুনে৷
‘একদম চুপ! মুখ বন্ধ!যাও খাটে বসো গিয়ে৷ আমিও দেখি রাতবিরেতে মেহেদী দিয়ে এমন কি দুনিয়া উদ্ধার করবে তুমি৷’
অমন গমগমে গলার আওয়াজ টা শুনে নাজিয়ার মুখ চালানোর আর সাহস হলো না। খাটের কিনারায় গিয়ে মুখ ফুলিয়ে বসে পড়ল। আযানের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে মনস্থির করে ফেলল একটাও কথা বলবে না সে৷ এভাবে ধমকে চুপ থাকতে যখন বলেছে চুপ ই থাকবে সে! দুনিয়া উল্টে গেলেও সে মুখ খুলবে না!
তবে দু মিনিটও নিজের এই সিদ্ধান্তে অবিচল থাকতে পারল না মেয়েটা যখন দেখল বজ্জাত টা হাটু গেঁড়ে মেঝেতে বসেছে তার সামনে। ট্রাউজারের পকেট থেকে বের করছে সবার অগোচরে আনা মেহেদীর কোন টা৷ মেয়েটা বিস্ময়ের আতিশয্যে উচ্চস্বরে প্রশ্নটা করে বসল, ‘এটা কি!’
আযান মেয়েটার এমন তীক্ষ্ণ উচ্চস্বরের প্রশ্নটায় খুউব বিরক্ত হলো। বেকুব যেমন চিল্লিয়ে কথাটা বলছে বাইরের বেয়াদব চারটার একটার কানে গেলেও হবে! আযানকে নিয়ে তখন দুনিয়ার হাসি তামাশা করবে তারা! আর বেকুবেরও ত কমনসেন্স কম৷ হয়তো রসিয়ে রসিয়ে বলবে বর তার মনরক্ষার্থে কেমন নিজ হাতে মেহেদি দিয়েছে তার হাতে। এমন চিন্তাভাবনা যাতে মেয়েটার মাথায় না আসতে পারে সেই অভিপ্রায়ে আযান মেয়েটাকে দিয়ে বসল এক ধমক।
‘অ্যাই! এত চোখ বড় বড় করে দেখবার মত কিছু হয়নি। হেঁদিয়ে মরছিলে মেহেদী দিতে তাই তোমার শখ আমি বার করছি! ডিজাইন দেখাও। আমিও দেখি এমন কি হাতিঘোড়া দিতে ইশি র পা ধরে বসেছিলে তুমি।’
‘মোটেও পা ধরে বসে থাকিনি আমি! আর আপনার হাতে থেকে মেহেদী আমি দিবোই না! ভংচং কি ডিজাইন দিবেন পরে হাত দুটো আমার লুকিয়ে রাখতে হবে কাল বিয়ের পুরো প্রোগ্রামজুড়ে ৷ সে ঝামেলায় আমি নেই৷ তার চেয়ে ভালো আমি মেহেদী ই দিবো না৷’ মেয়েটাও জেদ ধরে বলে ফেলল৷ হাত দুটো লুকিয়ে ফেলল ওড়নার নিচে।
‘তোমার বাপ ও মেহেদী দিবে! হাত পাতো বলছি! এতক্ষণ মরে যাচ্ছিলে যেহেতু মেহেদী দেয়ার জন্য মেহেদী তুমি দিবেই। দেয়ার পর কি হবে সে আমার মাথাব্যথা না৷’ বলতে বলতে আযান মেয়েটার কামিজের ওড়নায় গুঁজে রাখা হাত দুটো জোর করে বের করে আনল।
নাজিয়ার বড় অসহায় লাগলো। বদ টার তো কোনো বিশ্বাস নাই! কি থেকে কি ডিজাইনে মেহেদি দিয়ে দিবে, পরে সবাই তার হাত দেখে যদি হাসাহাসি করে কালকে! সেই ভয়ে চটজলদি পিন্টারেস্ট অ্যাপ থেকে একটা মেহেদি ডিজাইন দেখিয়ে মেয়েটা বলল, ‘অ্যাই! আপনি নিজে নিজে কাবিলতি করে দিয়েন না। এই ডিজাইন টা দেখে দেখে দিন। অন্তত দশে চার পাওয়ার মত হবে তখন। আল্লাহ জানে কি হাতির ডিম ঘোড়ার ডিম আপনি ডিজাইন দিবেন।’
শেষের কথাটা বিড়বিড় করে বলে মুখ ভেংচাল মেয়েটা। ভীষণ রাগ লাগছিল তার। কত সুন্দর করে ইশিতা মেহেদি দিয়ে দিচ্ছিল সবাইকে! তখন সিরিয়ালে থাকলে এমন কি বা হতো! রাতের তিনটা বাজুক চারটা বাজুক তার নিজের তো সমস্যা নেই তাহলে বদের এত সমস্যা হবে কেনো! নাজিয়ার হয়েছে দুনিয়ার জ্বালা! আফসোস এমন একটা লোককে ভালোবেসে ফেলেছে যার মধ্যে কোন রসকষ নেই। বলে কিনা মেহেদী দেওয়ার কি প্রয়োজন! এসব হাতে দিয়ে কি হবে! কথার কেমন ছিরি দেখো! বদ একটা!
আযান তখন নিবিষ্ট ধ্যানে বেকুবের হাতের তালু জোড়ে মেহেদির ডিজাইনের ছকটা কষে ফেলল মনে মনে। আর্কিটেক্ট হওয়ার এই একটা সুবিধে। একটা ডিজাইন ড্রয়িং বা সেটআপ মাথায় গেথেঁ নিলে সেটা সহজে মাথা থেকে বেরোয় না। অনায়াসে ডিজাইন টা ফেলতে পারে।এই কথাটা অবশ্য সে বড় মুখ করে মেয়েটাকে বলবে না। নিজের ব্যাপারে কিছু বলতে আযানের বড়ই অনাগ্রহ। তবুও প্রথমবার ছেলেটার মনে হল এই সাবজেক্টে পড়াশোনা করাটা সার্থক হয়েছে তার। বেকুব নিশ্চয় মনে মনে ভেবে রেখেছে আযান ফেইল মারবে এই কাজে। কিন্তু সে চমৎকার করে মেহেদী দিয়ে মেয়েটাকে চমকে দিবে একেবারে। আযানের বড় হাসি পেল মনে মনে৷ মেয়েটা ভীষণ আতংকে আছে। চোখমুখ দেখেই আযান ধরে ফেলেছে সেটা। যেমন চোখ মুখ বানিয়ে রেখেছে যেন আযান তার হাতে এটম বোমা রেখেছে। সুযোগ পেলে সে তক্ষুনি হাতটা সরিয়ে ফেলবে!
পনেরো বিশ মিনিট পার হতেই মেয়েটা হাতের অবস্থা দেখতে গেলে বিস্ময়ে তার চোখ দুটো রসগোল্লা সাইজের হয়ে গেলো। ইশিতার মেহেদি দেয়া দেখে সে এতক্ষণ আফসোসে মরে যাচ্ছিল কেনো বদটা তার হাতে মেহেদী দিচ্ছে৷ অথচ তার বিস্ময়ের মাত্রা আকাশ ছুলোঁ যখন দেখলো চমৎকার ভাবে তার হাতের তালুতে ডিজাইন শেষ করে এখন আঙ্গুলে মেহেদীর আকাবাঁকা প্রলেপ লাগাচ্ছে লোকটা৷ মানতে পারল না মেয়েটার মন ছেলেটার এমন কারুকার্য এমন দক্ষতা। সে মেয়ে হয়েও কিনা এত ভালো মেহেদী দিতে পারেনা অথচ বদটা এত ভালো মেহেদি দিয়ে দিচ্ছে! দিতে পারে! আহারে লোকটার বউ হিসেবে নাজিয়া ত একেবারেই বেমানান তাহলে! না জানে মেহেদী দিতে না পারে ভালো রান্না। আবার পড়াশোনায়ও একেবারে ল্যাবাছ্যাবা! এসব ভাবনা আসতেই হতাশায় মেয়েটার চেহারা মুহূর্তেই কাঁদো কাঁদো হয়ে এলো।
আযানের ধ্যান মেয়েটার হাতের তালুতে নিবিষ্ট থাকলেও তার এমন মন খারাপ চোখে এড়ালো না।
বুঝতে পারল না হঠাৎ কি এমন নিয়ে মেয়েটা মন খারাপ করে ফেলেছে। মেহেদি ডিজাইন কি পছন্দ হচ্ছে না তার। সেই ভাবনার আযান প্রশ্ন করে বসলো, ‘আবার কি হলো? ডিজাইন খারাপ হয়েছে বেশি?’ নাজিয়া সে প্রশ্নের উত্তর দিল না। কিভাবে বলবে যে নাজিয়া তার সাথে বেমানান সেজন্য তার কষ্ট হচ্ছে। তাই প্রসঙ্গ পাল্টাতে বলে ফেললে আরেকটা কথা। কাঁদো কাঁদো ভাবটা আড়াল করতেই যেন দেখালো মেকি হম্বিতম্বি। ‘সেসব বাদ দেন! মেহেদির রং যদি গাঢ় না হয় আপনাকে কিন্তু আমি ধরবো। আমি ফিল্মে দেখেছি গাঢ় তাদের হয় যাদের হাসবেন্ড তাদেরকে নাকি অনেক ভালোবাসে। যদি দেখেছি এটা গাঢ় না হয় তাহলে বুঝবো আপনার সব মুখে মুখে, মনে কোন টান-ফান কিচ্ছু নেই। আমি বলে দিলাম কিন্তু।’
আযান গা করলো না মেয়েটার এরকম হম্বিতম্বি। মনে মনে ভাবল মেহেদীর রং গাঢ় আসুক না আসুক আযানের মন ত জানে মেয়েটাকে সে কেমন চোখে হারায়, ভালোটালোও বাসে হয়তো। মেহেদির রঙে কি যায় আসবে এমন!
চল্লিশ পয়ঁতাল্লিশ মিনিটের মধ্যে আযান মেয়েটার দুহাত ভর্তি মেহেদি দিয়ে দিল। কাজটা শেষ করে যেই না একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে ছেলেটা আরেক বিপাকে পড়ল৷ শুনল বেকুব কাচুমাঁচু মুখ বানিয়ে বলছে এরকম মেহেদী হাতে দিয়ে ঘুমোতে পারবে না সে। তার জেগে থাকতে হবে ঘন্টাখানেক। আযানের বড় বিরক্ত লাগল। আশ্চর্য! এটা কেমন কথা!
এত ঝামেলা সয়ে বেকুবের হাতে সে মেহেদি দিয়েছে নিজেই যাতে মেয়েটা চটজলদি ঘুমিয়ে পড়তে পারে। অথচ মেয়েটা এখন দুনিয়ার প্যাঁচাল শুনাচ্ছে। বলছে যে মেহেদী হাতে দিয়ে ঘুমোতে পারবে না সে। কোথাও লেগে যাবে কিংবা ঘুমের মধ্যেই সে এবড়োথেবড়ো করে মুখেটুখে লাগিয়ে ফেলবে। এমনিও তার ঘুমানোর ধরণ সুন্দর না। তাই বেকুব বুদ্ধিমানের মতন মনস্থির করেছে সে অন্তত আর দুই ঘন্টা জেগে থাকবে। মেহেদী শুকিয়ে এলে ধুয়েমুছে ঘুমোবে! বাহ। দারুণ বুদ্ধি!
আযান রাগ এবারে আর চেপে রাখতে পারল না। একটা বাজঁখাই ধমক দিয়ে বলে বসলো, ‘অ্যাই! এত কথা কে বলতে বলেছে তোমাকে। ঘুমোতে বলেছি চুপচাপ ঘুমোবে। প্রয়োজনে মেহেদি শুকিয়ে এলে আমি ওয়াশরুম থেকে মগে করে পানি এনে হাত ধুয়ে দিবো। ঘুম ভারী তোমার, টের পাবে না। তাই তুমি ঘুমিয়ে পড়ো এখন। কালকে সারাদিন এমনিও অনেক ধকল যাবে’।
মেয়েটা আযানের এমন কথা শুনে একদৃষ্টে তার চেহারায় তাকিয়ে থাকল। তাকে আরামে ঘুমোতে দেয়ার জন্য লোকটা এত কষ্ট করবে! প্রয়োজনে নিজে জেগে থেকে হাতদুটো ধুয়ে দিবে! এত ভালো বর তার! বদ টার প্রতি তার চেপে রাখা ভালবাসা যেন বহুগুণে বেড়ে গেল৷ মনও মানতে পারল না তার জন্য লোকটা এত কষ্ট করবে! তাই মুহুর্তেই নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসল মেয়েটা। বলে বসল,’ আপনি আমার জন্য নিজের ঘুম ফেলে এভাবে জেগে থাকবেন না প্লিইজ৷ মেহেদির কালার আমার লাগবে না। আপনিও ঘুমিয়ে পড়ুন আমিও ঘুমিয়ে পড়বো। আর দশ পনেরো মিনিট পর আমি বরং হাতটা ধুয়ে আসবো। এত ঝামেলার কী দরকার!’
‘আরমিইইন! এত কথা বলতে বলেছি আমি তোমাকে? যেটা বলছি সেটা করো৷ মেহেদী হাতেই শুয়ে পড়ো। এত শখ করে হাতে লাগালে রং না আসতেই কেনো ধুয়ে ফেলবে? আর আমি যথেষ্ট ঘুমিয়েছি আমার আর ঘুমোতে হবে না। আমি ত আর তোমার মত সারাদিন বাদঁরামি করে বেড়াই নি যে আমার আরো কয়েকঘন্টা ঘুমিয়ে শরীরের ক্লান্তি দূর করতে হবে!’
নাজিয়া গায়ে মাখল না তার শেষের টিটকারি টা। মেয়েটা তখন নিজের ভাবনায় বুদঁ৷ হাতের মেহেদীর দিকে একপলক তাকিয়ে মনে মনে ভেবে ফেলল, মেহেদির রং গাঢ় আসুক না আসুক৷ একটা বিষয় ত পরিষ্কার। বদ টা তাকে ভালোবাসে, একদম অন্যরকম ভাবে ভালোবাসে। পৃথিবীতে আর কেউ পারবে না তাকে বদটার মতন এরকম গোপনে স্বযত্নে ভালোবাসতে! এরকম ভালবাসতে স্রেফ বদ লোকটা ই পারবে!
[ প্রতিদিন যে সাইজের পর্ব দিই সেটার ডাবল সাইজের পর্ব দিয়েছি আজ। আপনারা সবাই মন্তব্য করবেন, ওকে? আযান নাজিয়াকে কি বোরিং লাগছে? ]

