মেঘের মুলুকে চল’ আয়রা তাবাস্সুম পর্ব ৩০

0
2

‘মেঘের মুলুকে চল’
আয়রা তাবাস্সুম
পর্ব ৩০
_______________________________

সময়ের পরিক্রমায় অতিবাহিত হয়েছে তিনটে মাস। আযান নাজিয়ার দাম্পত্য জীবন বেশ সহজ স্বাভাবিক হয়েছে আগের তুলনায়। এই ক মাসে বরের আদর আহলাদে মেয়েটা কিভাবে জানি বুঝে ফেলেছে বদ টার চোটপাট সব উপরে উপরে। ভিতরে ভিতরে নাজিয়াকে চোখে হারায় সে। ব্যস এই বিষয় ঠাহর করতেই আযানের বকাধমক কে সে গা করে না বিশেষ বরং দাঁত বের করে হেসে একেবারে দোস্ত ইয়ারদের মতন গাট্টা মারে তার বাহুতে৷ আযানের অবশ্য এখন সব গা সওয়া হয়ে গেছে। আযান ঠিকই ধরেছিল। বাঁদর যদি একবার বুঝে ফেলে আযান ভীষণ আদর করে তাকে তাহলে আযানের মাথার উপ্রে উঠে একেবারে বাঁদর নাচ নাচবে সে! এই ক মাসে বেকুব টা চালাক হয়ে ঠিক পড়ে ফেলেছে আযানের মনের খবর। তাই এমন বাদঁরামি শুরু হয়েছে তার।

আযানের ধারণা বিয়ের বছর গড়ালে দেখা যাবে আযান কে একেবারে সাপের পাঁচ পা দেখাচ্ছে মেয়েটা! আদর আহলাদে আযান মেয়েটাকে বাদঁর বানিয়েছে। আর বাদঁর থেকে বেয়াদবে প্রমোশন হয়েছে তার এই ক মাসে। আযান কে মান্য টান্য ত একেবারেই করে না বরং হাসিতামাশাও করে কথায় কথায়। এজন্য আযান বউ দের এত আদর আহলাদ দেখানোর পক্ষে ছিল না কখনো অথচ আহলাদ না দেখালে বেকুবের ঠোঁট ভেঙিয়ে আদুরে কান্না টা থামে না। সে কান্না আবার আযানের সহ্য হয় না! কি যে একটা বিপদে পড়ল সে! পরে অবশ্য আযান ভেবেছে বাদঁর বেয়াদব যা ই হোক আযানের ই ত বউ। আযান তার মন না রাখলে আর কার ঠেকা পড়েছে মেয়েটার মন রাখার!

তবুও মেয়েটার প্রতি এসব রাগ বিরক্তি আযানের অনায়াসে উবে যায় যখন রাতে ঘুমোতে গিয়ে বেকুব একদম আদুরে বাচ্চাটির মতন আযানকে পাশ ফিরে জড়িয়ে ধরে৷ আযানের বিরক্ত হবার ভান ছল কে উপেক্ষা করে রীতিমত জোর দেখিয়ে মাথা এলিয়ে দেয় তার বুকে। আযানের তখন কি যে অস্থির লাগে! ভয় হয় মেয়েটা বোধহয় শুনে ফেলবে তার বুকের অনবরত ধুকপুক শব্দ, ধরে ফেলবে তার অস্থিরতা। বুঝে ফেলবে আযান ইয়াসীর ভুইঁয়া একেবারে হাতের মুঠোয় তার৷ সে যেটা যেভাবে চাবে আযান সেটা সেভাবে হাজির করবে তার পায়ের কাছে৷ যেন মেয়েটা মুখ ফুটে চাঁদের আবদার করলে আযান চাঁদ এনে দিবে তার হাতের নাগালে!

নিজের এমন ভাবনা আযানের নিজেরই অদ্ভুত লাগে৷ এই অদ্ভুত অনুভূতি টাই কি ভালবাসা! ভালবাসার অনুভূতি এত অন্যরকম! হঠাৎ করে জীবনে আসা একজন কিচ্ছুটি না করেই গোটা জীবন জুড়ে থাকে! আবার দুনিয়ার সেই নির্দিষ্ট একজন টা চোখের সামনে থাকলে পুরো দুনিয়ার খবর থাকে না আর! আযানের মনে হয় মেয়েটা তার জীবনে না আসলে কি যে হতো তার! অমন মরে মরে বেঁচে থাকত সে একটা গোটা জীবন!

ইদানীং যদিও মেয়েটার আচরণে মাঝেমধ্যে ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যায় তার। বহুকষ্টে সে নিজেকে শান্ত রাখে। এমন জ্বালা হয়েছে তার দুটো কটু কথাও শুনাতে পারে না! বেকুব তার কথা শুনে ঠোঁট ভেঙিয়ে কাঁদতে কাঁদতে তার বুকে মাথা রেখে তার ব্যাপারেই নালিশ করে তার কাছে! এমন কান্নায় আযানের রাগ গলে জল হয়ে যায়। তবুও আজ সে মনস্থির করেছে বেকুব কেঁদেকুটে দুনিয়া ভাসিয়ে দিলেও সে কিছু বকা ত দিবেই! অন্তত একটা জোরেসোরে ধমক ত তার প্রাপ্যই! আযানের বারবার বলা কথা সে অমান্য করে কোন সাহসে! আযান রোজ সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে দেখে গতরাতের রান্না সব ফ্রিজে ৷ বেয়াদব টা সকালে ত খেয়ে যায় না আবার দুপুরে ভার্সিটির ক্লাস শেষে টিএসসিতে খালিপেটে দুনিয়ার অখাদ্য কুখাদ্য সব গিলে। সবচেয়ে বেশি গিলে ফুচকা। আযান বহুবার তাকে মানা করেছে খালিপেটে এসব খেতে । পইপই করে বলেছে বদহজম গ্যাস্ট্রিক সব একসাথে হবে। মেয়েটা তার কথা শুনলে তো!

আর সেই ছাইপাঁশ গিলার ধারাবাহিকতায় আযান দুদিন ধরে খেয়াল করছে বেকুব রাতের খাবার একটু মুখে না দিতেই বমি বমি ভাব হচ্ছে বলেই গলগল করে বমি করে। সেজন্য আযানের রাগ আজ তুঙ্গে। রাতের খাবার খেতে গড়িমসি করতেই আযান তাকে দিয়ে বসল প্রচন্ড এক ধমক। মেয়েটা মুহূর্তেই চেহারা কাঁদোকাদোঁ বানিয়ে ফেলল। এই এক বিশেষ প্রতিভা তার। মেয়েটা নিজে থেকেই বলল, ‘আজ ফুচকা খাই নি তো। সত্যিইই! তবুও বমি বমি ভাব হচ্ছে।’
‘তা আজ এমন ব্যতিক্রম কেন?’ আযান গলায় গমগমে ভাব এনে প্রশ্নটা করল৷ মেয়েটা মহা অবাধ্য। আযানের মোটেও বিশ্বাস হলো না তার কথা শুনে মেয়েটা ফুচকা খাওয়া বন্ধ করেছে। নিশ্চয় অন্য কোনো কারণ আছে৷
এবার জবাব টা এলো একেবারে নিভুনিভু শব্দে। ‘ফুচকা মামা বসে নাই আজকে তাই। নাহলে খেতাম।’

আযান যেমন রাগটাগ সবাইকে দেখায় তেমন এই মেয়েকে দেখাতে পারলে একটা চড় মেয়েটা খেতোই! একে ত আযানের অবাধ্যতা করে আবার কেমন বড় মুখে বলছে ফুচকাওয়ালা বসেনি দেখে সে খেতে পারে নি নাহলে খেতোই! আযান রাগ টুকু গিলতে একটা বড়সড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘কালকে রাতে একটা গ্যাস্ট্রোএন্টোরলজিস্ট দেখিয়ে আনব৷ যেসব খাবার গিলতে থাকো আলসার টালসার হয়েছে বোধহয়।’ বলেই সে কৃত্রিম হামি তুলে মেয়েটাকে দেখল একপলক। ভয়ে চেহারাটা কাহিল হয়ে গেছে একেবারে। আযান নিজেও জানে আলসার হওয়ার সম্ভাবনা কম। হয়তো গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হয়েছে খাবারের অনিয়মে। তবুও ইচ্ছে করে বাড়িয়ে বলল। এটা বেকুবের শাস্তি। একটু ভয় পাক৷ ভয় পেয়ে এসব হাবিজাবি গেলা বন্ধ করুক!

পরদিন গোটা সময় নাজিয়ার কাটল দুশ্চিন্তায়। মেয়েটা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল একবার ভালো হয়ে গেলে ফুচকা খাবে না সে রোজ। সাতদিনে চারদিন খাবে। এর বেশি না! ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকতেই দুশ্চিন্তা যেন আরো জাকিঁয়ে বসল তাকে। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার স্রেফ বমির উপসর্গ শুনে গুরুতর কিছু ভাবলেন না। প্রেসক্রিপশনে মিসেস লেখা দেখে প্রশ্ন করে বসলেন আরো কিছু। শেষ পিরিয়ডের সম্ভাব্য ডেইট সহ আরো কিছু ব্যাপার জেনে দুটো টেস্ট দিলেন৷ ইউরিন প্রেগন্যান্সি টেস্ট এবং পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাফি৷ নাজিয়া অবশ্য আন্দাজ করে ফেলল ডাক্তারের সন্দেহ। তবুও তার নিজের বিশ্বাস হচ্ছিল না বিষয়টা। যদি সত্যিই ব্যাপারটা তেমন হয়ে থাকে তাহলে বদ টার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে স্রেফ এই ভাবনায় ঘুরপাক খাচ্ছিল মেয়েটার মাথায়। মনস্থির করল রিপোর্ট না দেখে লোকটা কে আগবাড়িয়ে কিছু বলবে না।

নাজিয়া যেমনটা আকাশপাতাল ভেবেছিল আযান অবশ্য তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। চেম্বারে ডাক্তার যখন রিপোর্ট দেখে তাকে জানাল তার ওয়াইফ পাঁচ সপ্তাহের গর্ভবতী, পেটের অসুখের কোনো সিম্পটম নেই বরং প্রেগন্যান্সিজনিত বমি বমি ভাব এসব। তখন আযান স্রেফ থ মেরে বসে ছিল। নাজিয়া অবশ্য পুরোটা সময় ভীষণ অস্থিরতায় ভুগেছে। লোকটা প্রথম কথা কি বলবে তাকে, ভীষণ খুশি হবে নিশ্চয়ই! অথচ সেসব কিছু হলো না৷ মেয়েটাকে আশাহত করে দিয়ে আযান বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো একেবারে। ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে চুপচাপ বাসায় ফিরে বিস্ময়ের ঘোর থেকে বেরিয়ে স্রেফ একটা বাক্য বলল। মেয়েটার গাল দুটো আলতো হাতে চেপে একেবারে বাচ্চা ছেলের মতন বিস্ময় নিয়ে প্রশ্নটা করল যেন তখনো পুরো ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল তার।
‘আরমিইইন! তোমার পেটে বাবু আছে? আমি সত্যিই বাবা হয়ে গেলাম?’

নাজিয়া জবাব কি দেবে। এতক্ষণ মরিয়া ছিল সে লোকটার কথা শুনার। অথচ এমন আদুরে কথাটা শুনে মেয়েটা মুহুর্তেই কান্নায় ভেঙে পড়ল। নাটুকে কান্নার বদলে সত্যিকারের কান্না কাঁদল সে। একটা বিয়ে যেটাকে শুরুতে তার গলার ফাঁস বাদে কিচ্ছু মনে হয়নি, একটা বদ লোক যাকে তার দুচোখে সহ্য হতো না। সময়ের পরিক্রমায় আজ সেই বিয়েটা তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ঘটনা, বদ ভাবা সেই লোকের বাচ্চা তার গর্ভে! যেই বিয়ের পর তার মনে হয়েছিল জীবন শেষ, সেই বিয়ের বদৌলতে জীবনের সবচেয়ে চমৎকার সময়টা এসেছে তার। এত খুশি মেয়েটা কোথায় রাখবে। খুশির তোড়ে দুই চোখে জলের ফোয়ারা নেমেছে তার।

আযান অবশ্য এতকিছু ভাবার অবকাশ পেলো না। তার বড় বিরক্ত লাগল। এমন আনন্দ ক্ষণে তার কিনা বেকুবকে বুকে জড়িয়ে রেখে তার কান্না থামাতে হচ্ছে! তার নিজেরও ত কিছুক্ষণ খুশিতে কান্না করা দরকার। কিন্তু বেকুবের জন্য সেই অবসর সে পাচ্ছে কই! কোনোমতে মেয়েটার অঝোর কান্না সে থামিয়ে বাপ মা শশুড় শাশুড়িকে খবরটা দিল। কল দিতে গিয়ে খুশিতে হাতঁ কাঁপছিল তার৷ বিশ্বাস হচ্ছিল না একটা ছোট প্রাণ যোগ হবে তার জীবনে, তাকে বাবা বলে ডাকবে! চটজলদি সে খোদাতায়ালার নিকট শুকরিয়া আদায় করল। একজীবনে তার বহু না পাওয়া খোদা যেন বিয়েটার বদৌলতে তাকে মিটিয়ে দিলেন! পরক্ষণেই ভাবনার অতল থেকে বেরিয়ে মুখ ঘুরিয়ে মেয়েটাকে দেখল সে। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঘুরেটুরে নিজের পেট দেখছে মেয়েটা। আযানের হঠাৎ মনে হলো এই চমৎকার মেয়েটা তার জীবনে না এলে কতকিছু না পাওয়া থেকো যেতো তার! ভাগ্যিস মেয়েটা তার জীবনে এসেছিল!

_____________

চোখের পলকে কেটে গেল লম্বা সময়। মা হবার জার্নির শুরুতে নাজিয়ার যতটা উৎসাহ ছিলো প্রেগন্যান্সির ছ মাস পেরুতেই তার সব উৎসাহে যেন ভাটা পড়ল৷ মেয়েটা বড্ড ঘুমকাতুরে। তবে রাতের বেলায় দু চোখে ঘুম উপচে পড়লেও ঘুম হবার জো নেই তার। শরীর ম্যাজম্যাজ করে, গলায় খাবার আটকে থাকে, বমিবমি ভাব তো আছেই। তার উপর মেয়েটার আজীবন হাতপা ছড়িয়ে ঘুমোনোর অভ্যেস অথচ ভারী ফুলো পেট নিয়ে আরামসে উপুড় হয়ে ঘুমোতে পারে না সে৷ পাশাপাশি হরমোনাল পরিবর্তনের জন্য অহেতুক মনখারাপ কান্নাকাটি রাগ অভিমান সব তো আছেই৷

যদিও তার সবচেয়ে বড় দুঃখ সে ফুচকা ভেলপুরি এসব খেতে পায় না বহু মাস। প্রথম প্রথম ভার্সিটিতে গিয়ে এসব খাওয়ার সুযোগ মিললেও পাচঁ মাসে পা পড়তেই আযান তার ভার্সিটি যাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। বেশি গ্যাপ পড়ে গেলে প্রয়োজনে ইয়ার ড্রপ দিবে। মেয়েটা অবশ্য এমন সিদ্ধান্তে প্রথমে খুউব খুশি হলেও এখন আফসোসে মরে যাচ্ছে ফুচকা চটপটি গেলার এমন সুযোগ বেহাত হওয়ায়। আযানের ধারণা বাইরের অপরিষ্কার এসব জিনিস খেয়ে দেখা যাবে হেপাটাইটিস হয়ে মা বাচ্চা দুটোর জান নিয়ে টানাটানি চলবে। তবুও মেয়েটার জোরাজুরি তে আযান কদিন আগে ইউটিউব দেখেটেখে বহু কসরত করে বাড়িতেই ফুচকা চটপটি বানিয়ে তাকে খাইয়েছে। খেয়ে অবশ্য সেটা পেটে থাকে নি বেশিক্ষণ। মেয়েটা গলগল বমি করে সবটা বের করে দিয়ে ফ্রেশ হয়ে আযানের বুকে একচোট ঘুমিয়েছে। ঘুম থেকে উঠে আবার বেশ প্রশংসাও করেছে আযানের৷

আযান অবশ্য এসব প্রশংসায় খুশিতে গদগদ হয় না৷ জানে কিছুক্ষণ পরে আবার খারাপ লোক বদ লোক এটাওটা বলে গালির নহর ছুটবে বেকুবের মুখ থেকে। আযান সেসব গায়ে মাখে না যদিও৷ প্রেগন্যান্সির সময় এমন মুড পরিবর্তন স্বাভাবিক৷ তাই সে ধৈর্য্য ধরে মেয়েটার নালিশ অভিযোগ অভিমান সব শুনে। সারাদিন তার অফিসে কাটে৷ আর মেয়েটা বাসায় একা। নিশ্চয়ই মন খারাপ হয় তার৷ সেই মনখারাপ যদি আযানের উপর ঝাড়ে তাতে মেয়েটার বিশেষ দোষ নেই।

তবে সমস্যা তখন শুরু হয় যখন মেয়েটা কুইজ কুইজ খেলা শুরু করে। এই এক নতুন ঝামেলা শুরু হয়েছে রোজ রাতে। আধারাত অব্দি জেগে নিজে ঘুমোতে না পারলে আযানকেও ঠেলেঠুলে উঠিয়ে দুনিয়ার আবোলতাবোল প্রশ্ন করে সে।
‘বাচ্চা ডেলিভারির সময় আমি মরে টরে গেলে আপনি আরেকটা বিয়ে করবেন?’
‘হ্যাঁ। একটা না দুটো করব। যাতে একটার পেটে বাচ্চা আসলে আরেকটা তার সেবাযত্ন করতে পারে।আমিও একটু আরামে থাকবো।’
সবকিছু সহ্য করলেও মাঝরাত্তিরে এসব আউলফাউল প্রশ্নের যুতসই জবাব দিতে আযানের মোটেও ইচ্ছে হয় না। আর ত্যাড়াঁমি তো তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে! তাই এমন ট্যারা জবাব দিতে মুখ আঁকুপাঁকু করে তার।

পরবর্তী ঘটনার জন্য আযান প্রস্তুত ছিল। জানত এমন কিছুই হবে। দেখল মেয়েটা ঠোঁট ভেঙে কাঁদার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আযানের এত মান টান ভাঙানোর ধৈর্য্য রইল না আর। তাই মেয়েটা তারস্বরে কান্না জুড়ার আগেই সে আচমকা তার গাল দুটো চেপে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে দিলো মোলায়েম নরম আদর। মেয়েটার কান্না বন্ধ হলো আচমকা। সাথে লাল আভা এসে ভর করল তার দু গাল জুড়ে৷ কোনোমতে সরে এসে মুখ ফিরিয়ে বলল, ‘এসব করে আমাকে ভুলাতে পারবেন না। আমাকে কাল বাপের বাড়ি দিয়ে আসবেন। তারপর দুটো তিনটে দশটে যতটা ইচ্ছে বউ নিয়ে সংসার করবেন। আমিও দেখি তারা আপনার সংসার করে কিভাবে। সবাই কি আর আমি!’
তারপর থেমে থেমে যোগ করল, ‘আপনার হয়েছে বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালার মতন অবস্থা। তাই আমার কদর বুঝতে পারছেন না!’

‘ঠিক বলেছ৷ বাঁদর টা তুমি! আর আমি তোমার গলায় মুক্তোর মালা’ ফিচেল হেসে কথাগুলো বলতে বলতে আযান সটান শুয়ে পড়ল। হাতের আলতো টানে মেয়েটাকেও নিয়ে এলো বুকের মাঝখানে। সুযোগ দিল না মেয়েটাকে তার বলা কথার বিপরীতে কোনো প্রতিবাদ করার, বাড়তি কথা বলার। নাজিয়া গাল ফুলিয়ে ত্যাছড়া চোখে তাকে দেখতেই আযান মেয়েটার মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দিল। গমগমে গলায় আদেশ দিল ঘুমোতে।
‘আরমিইইন! যথেষ্ট হয়েছে কুইজ কুইজ খেলা। এবার চুপচাপ ঘুমোবে তুমি। হাত পা ব্যথা করলে বলো। আমি টিপে দিই তাহলে’

___________________

ইশিতার দিনদুনিয়া ভাল লাগে না এতো। ভাইয়ের বাচ্চা হবে, সে ফুপি হবে এই খবর পাওয়ার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ সে খুশিতে দাপিয়ে বেড়িয়েছে। রাত দিনের ঠিক নেই আযানদের ফ্ল্যাটে গিয়ে পড়ে থেকেছে। তবে এখন সেই সুযোগ তার কই। জীবনে একটু সুখের মুখ দেখলেই তার সেমিস্টার ফাইনালের ডেইট পড়ে যায়। এই ঝামেলা আর ভালো লাগে না তার। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে এক্সামের রুটিন দেখতে দেখতে মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো তার। আফসোসও হলো খানিকটা। ভন্ড কে সে কিভাবে বলেছিল বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসতে! ঠিক সময়ে ভন্ড তাকে বিয়ে করে নিলে আজ সে বউ হয়ে পড়াশোনা গোল্লায় তুলে রাখতে পারত। ভাবীও ত কি আনন্দে ভার্সিটি মিস দিচ্ছে! এতসব ভাবনায় মেয়েটা খেয়াল করল না কবে থেকে তার ফোনের রিংটোন বেজে চলছে। কলার স্ক্রিনে ভন্ডের নাম দেখে রাগ আরো বেড়ে গেল তার। সব তো হয়েছে ভন্ড টার জন্যই!

‘সমস্যা কি? ফোন দিয়েছ কেন? এত কল টল দিবে না। আমার সেমিস্টার ফাইনাল শুরু হবে। পড়াশোনা করা লাগবে। আফটারল একজন ত কথায় কথায় আমাকে গাধি ডাকার কোনো সুযোগ ছাড়ে না।’ ফোনের ওপাশে তুষার ঠোঁট চেপে হাসল। বাহ! তার কথা তাকেই শুনাচ্ছে মেয়েটা। তবুও গলায় নিরাসক্ত ভাব এনে বলল, ‘অহ আচ্ছা। তাহলে বরং তুই পড়াশোনা কর। আমি আরো তোর সমস্যার সমাধান বলতেই কল দিয়েছিলাম তোকে। এখন তোর যেহেতু শুনার মতন সময় নাই তাহলে বাদ দে।’
‘মানে? কি বিষয়ে’ মুহূর্তের মনে ফিরতি উত্তর আসল মেয়েটার।

‘আমাদের বিয়ের বিষয়ে’ তুষারের জবাব কানে আসতেই চোখদুটো কোটর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম ইশিতার। সেকেন্ডের মাথায় ভুলে বসল এক্সামের টেনশন। কোনোমতে শব্দ জুড়ে বলল, ‘কি সব বলছ? খালামনি আম্মুর সাথে কথা বলে ফেলেছে? সবটা জানে?’
‘না। আযান ভাইকে জানিয়েছি শুধু। বলেছি তোর অনার্স শেষে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাব বাসায়। ততদিন যেন ভাই যাতে সামলে নেয় সব। তোর বাসায় যাতে তোর বিয়ের কথাবার্তা না উঠে। এটুক…’
তুষার কথা শেষ করতে পারল না আচমকা ফোনের ওপাশ থেকে আসা মেয়েলি আহাজারি তে। বড় বিরক্ত লাগল তার। এই মেয়ে কথাটা শুনে এমন ভাব ধরছে অথচ এতদিন বিয়ের কথা বলে বলে জ্বালিয়ে মারছিল তাকে।

ওদিকে ইশিতা তখন একনাগাড়ে হড়বড়িয়ে বলে যাচ্ছে নিজের কথা, ‘আরে বাপ। আমাকে আগে একবার জানাতে এই কাজ করার আগে। আর মানুষ পাও নি তুমি! ছোটভাইয়া কে বলতে গেলে! চড় মেরে আমার মুখ ভেঙে দেবে ও। ভাববে তোমার সাথে প্রেম করতে করতে পড়াশোনায় এমন ল্যাবাছ্যাবা হয়েছি আমি। আর কি কি বলেছ তুমি? এটাও কি বলে ফেলেছ আমিই তোমাকে প্রপোজ করেছিলাম সেটাও কলেজে থাকতে’

তুষারের বড় অসহায় লাগল। এই মেয়েকে বেয়াক্কল সে এমনে ডাকে না। আযান ভাইয়ের রাগ কি তার অজানা যে জেনেশুনে মেয়েটাকে বাঘের মুখে ফেলবে! তবুও বিরক্তি দমিয়ে বলল, ‘তোর মতন মাথামোটা ত আমি! তুই আমার সাথে প্রেম করেছিস এসবের কিচ্ছু বলি নি। শুধু বলেছি তোকে আমার পছন্দ, ভাললাগাটা শুধু আমার তরফ থেকে। বিয়ে করতে চাই তোকে। তবে সেটা তোর পড়াশোনা শেষ হবার পর। প্রথমে রাজি হয়নি তোর দজ্জাল ভাই । পরে বোধহয় ভেবেছে তার এমন মাথামোটা বেয়াক্কল গাধী বোনকে এমন যেচে পড়ে কে বিয়ে করতে চাবে! তাই যে চাচ্ছে তার গলায় ঝুলিয়ে দিক! তাই শেষে মেনে নিয়েছে আমার কথা।’

মুখে মেয়েটাকে এমন মেকি হম্বিতম্বি দেখালেও ছেলেটা আলগোছে চেপে গেলে কিভাবে সে রীতিমতন হাতেপায়ে ধরে আযানকে রাজি করিয়েছে বোনের হাত তার হাতে তুলে দেয়ার বিষয়ে। পুরো বিষয়টা মোটেও এমন সহজ ছিল না। কথাটা শুনার পর আযান একবাক্যে না করে দিয়েছিল। আত্মীয়দের মধ্যে বিয়েটিয়ে মোটেও পছন্দ নই তার এমন যুতসই কারণও দেখিয়েছিল। তবে সেও হার মানার পাত্র না৷ মেয়েটা তার বহু অপেক্ষার, বহু আকাঙ্ক্ষার। সে মোটেও বরদাস্ত করবে না মেয়েটাকে অন্য কারোর সাথে দেখতে। মেনে নিবে না তার মাথামোটা টা অন্য কারো মাথা চিবিয়ে খেলে৷ তার চেয়ে বরং মাথামোটা টা তার মাথাই চিবিয়ে খাক আজীবন!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here