মেঘের মুলুকে চল’ আয়রা তাবাস্সুম পর্ব ২৯

0
2

‘মেঘের মুলুকে চল’
আয়রা তাবাস্সুম
পর্ব ২৯
______________________________________

রাত তখন বারোটার কাছাকাছি। পুরো রুম গোলাপ রজনীগন্ধার ঘ্রাণে মৌ মৌ করছে। অথৈ বসে আছে একটা ধবধবে সাদা বেডশিটের বিছানায়। বেডশিটে আবার শতশত গোলাপের পাপড়ি। বিয়ের প্রথম রাত হিসেবে মেয়েটার মধ্যে ভয় অস্বস্তি কাজ করার কথা থাকলেও সেসব ঠিকঠাক সে অনুভব করতে পারছে না পেটে খিদের জ্বালায়। দুপুরে খাওয়ার পরে ফটোশ্যুট হয়েছে তাই সে ঠোঁটে মুখে লাগবে এমন ভেবে খুউব অল্প খেয়েছে। রাতে অবশ্য যত্নআত্তি নিয়ে ননদ তাকে পাতে এটাওটা তুলে দিয়ে ভাত মেখে খাইয়েছে। কিন্তু মাঝরাতে কিছু একটা মুখে চাবানো অথৈ র বদঅভ্যাস। বাপের বাড়িতে থাকতে হুটহাট সে একরম আধারাতে নুডলস বানিয়ে খেতো কিংবা চানাচুর চিবুত গালভর্তি। সেই অভ্যেস তার বহুদিনের। পরক্ষণেই মেয়েটার মনখারাপ হলো। শশুড়বাড়িতে এভাবে যদি গিয়ে মাঝরাতে খাবার খুঁজলে ব্যাপারটা কি যে বিশ্রী দেখাবে!

রাদকে নিয়ে তার বিশেষ ভাবনা নেই। লোকটা নিখাঁদ জেন্টেলম্যান। এই এক বছরে লোকটাকে যেটুকু চিনেছে তাতে এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই তার। এছাড়াও তাদের তো প্রেমের বিয়েও নয় যে লোকটা একদম সামলাতে পারবে না নিজেকে। নেহাৎ বাপ মায়ের কথায় তার অথৈ কে বিয়েটা করতে হয়েছে। তবুও অথৈ অপেক্ষা করল রাদের আসার। স্বামী তার। এভাবে অপেক্ষা না করে ঘুমিয়ে পড়লে কেমন জানি লাগবে বিষয়টা। মেয়েটার এসমস্ত ভাবনার অবসান ঘটল পাঁচ দশ মিনিট পরেই। রাদ কে রুমে ঢুকে দরজা লক করতে দেখেই মেয়েটা চটজলদি আধশোয়া থেকে উঠে পা গুটিয়ে বসল।

রাদ রুমে পা ফেলেই একপলক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল মেয়েটাকে৷ বিয়ের ভারী জামদানি গায়ে নেই৷ প্রসাধনীবিহীন মুখ, একটা সাদা নীল রংয়ের শাড়ি গায়ে৷ মুখটা দুর্বল কাচুমাঁচু বানিয়ে রেখেছে মেয়েটা। এই কদিনের ঘুমের অনিয়ম চোখের নিচে পড়া কালো আস্তর দেখে টের পাওয়া যাচ্ছে। রাদ চটজলদি চোখ সরিয়ে নিলো। সে টের পেয়েছে মেয়েটার অস্বস্তি। তাই মেয়েটার দিকে চোখ না রেখেই মাথা নিচু করে শেরওয়ানির বোতাম, হাতের ঘড়ি এসব খুলতে খুলতে একেবারে স্বাভাবিক গলায় কথার সুত্রপাত করল। যেন বহুবছর ধরে একসাথে সংসার করছে দুজনে।
‘রাতের খাবার খাওয়া হয়েছে ঠিকঠাক?’ রাদ উত্তর টা জানে তবুও প্রশ্নটা করল মেয়েটাকে স্বাভাবিক হবার সুযোগ দিতে।

অথৈ মাথা উপর নিচ করে মৃদু গলায় হ্যাঁ বলল কেবল। ঘুমিয়ে পড়তে পারলে তার ভালো লাগত। সারাদিন ত কম ধকল যায় নি৷ কিন্তু সেটা মুখ ফুটে সে বলবে কিভাবে। লোকটা ভদ্র সেটা তার জানা। তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে তাকে জোরটোর করবে না সেই বিশ্বাসও আছে। তবুও লোকটারও যদি কোনো আবদার থাকে! মা চাচিরা ত কানের কাছে বারবার বলেছিল স্বামী কে ফিরিয়ে না দিতে। স্বামীরা বেজার হয় এতে। মুখ বাঁকিয়ে অথৈ র অবশ্য তখন খুউব বলতে ইচ্ছে হয়েছিল আমার স্বামী মোটেও অমন না৷ নিপাট ভদ্রলোক সে৷ আমি না বললে বেজার হবে না বরং আমার অসুবিধে বুঝবে৷ তবুও বলল না এসব কথা। মা চাচীর মতন মুরব্বিদের মুখে মুখে এত কথা বলা যায় না।

তার ভাবনা বেশিদূর গড়াতে পারল না রাদের গমগমে গলার আওয়াজ কানে আসায়।
‘জেগে থাকার দরকার নেই৷ ক্লান্ত আছো যখন ঘুমিয়ে পড়ো।’
স্রেফ দুটো বাক্য। অথচ অথৈ র মনে হলো ভাললাগা থেকে একেবারে ধাপ করে পা পিছলে লোকটার প্রেমে পড়ে গেল সে। ভালবাসা তৈরি হতে বোধহয় দেরি নেই। আজ যদি লোকটা কোনো আবদার করে বসত অথৈ তাকে ফেরাত না৷ মনের বিরুদ্ধে গিয়ে হলেও সমর্পণ করতো লোকটার হাতে নিজেকে।

কিন্তু লোকটা তাকে সেই অস্বস্তিতেই ফেলেনি, এমন পরিস্থিতি তৈরি করেনি যাতে অথৈকে শরীরের ক্লান্তদশা ভুলে না চাইলেও লোকটার পাওনা মেটাতে হতো। অপার কৃতজ্ঞতায় ভিজে এলো মেয়েটার মন৷ বারংবার শুকরিয়া আদায় করলো সে মনে মনে এই চমৎকার পুরুষ মানুষটাকে তার জীবনে আনার জন্য। দু দিন আগেও তার মনে হয়েছিল রাদ তেহযীব চৌধুরীর বউ যে হবে তার মতো ভাগ্যবান মেয়ে আর দুটো হবে না৷ অথচ স্রেফ সুভাগ্যের জোরে সেই চমৎকার লোকের বউ অন্য কেউ নই, বরং সে নিজেই!

রাদ ততক্ষণে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়েছে। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়েই দেখল মেয়েটা বেডের একপাশে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়েছে। সে একদৃষ্টে দৃশ্যটার দিকে চেয়ে রইল। কখনো সে কল্পনায়ও ভেবেছিল মেয়েটা এভাবে তার রুমে তার বেডে একেবারে তার পাশেই থাকবে৷ অথচ আজ বাস্তবতা সেটাই। মেয়েটা এরকম রোজ তার পাশে ঘুমোবে, রাদ ঘুম থেকে উঠেই তার মুখ দেখতে পাবে। আগের মত মেয়েটা একদিন অফিস মিস দিলেই রাদের তাকে দেখতে পাগলপারা হতে হবে না, অস্থিরতায় গোটা দিন পার করতে হবে না৷ পরক্ষণেই ছেলেটার অভিমানও হলো খানিকটা। মেয়েটা আদৌ কখনো জানবে এসব! কখনো জানবে ওয়াজিফা মেহনাজ অথৈ রাদ তেহযীব চৌধুরী র বহুদিনের চাওয়া, বহুদিনের মোনাজাতের ফল!

সমস্ত ভাবনার শেষে রাদ ঘোরের জগত থেকে বেরিয়ে বেডে গিয়ে শুয়ে পড়ল। পাশ ফিরে চেয়ে রইল মেয়েটার চেহারা বরাবর। আপাতদৃষ্টিতে ঘুমিয়ে আছে এমন চেহারা হলেও রাদ খেয়াল করল পিটপিট করছে মেয়েটার চোখের পাতা। হয়তো রাদ তার পাশে শুয়ে পড়েছে দেখেই মেয়েটা এমন মিছিমিছি ঘুমের ভান ধরেছে৷ ছেলেটারও ইচ্ছে হলো খানিকটা দুষ্টুমি করার। বউয়ের সাথে এত ভালমানুষি দেখাবে কেন সে! তাই কন্ঠ রাশভারি বানিয়ে প্রশ্ন করল, ‘অথৈ! ঘুমিয়ে পড়েছ?’ মেয়েটাও তৎক্ষনাৎ মাথা নেড়ে বুঝাল সে ঘুমিয়ে পড়েছে৷ রাদ হাসল এবারে৷ বোধবুদ্ধি একেবারে কম। এজন্যই বোধহয় অফিস মিস দিলে যুতসই বাহানা বানাতে পারত না, সত্যিটা বলে ফেলত।

‘ঘুমন্ত মানুষ আবার মাথা নেড়ে কিভাবে বলে সে ঘুম!’ রাদের মুখ থেকে বের হওয়া এমন কথা শুনে অথৈ চোখ দুটো খুলে দেখল তাকে। খেয়াল করল লোকটার ঠোঁটে ফিচেল হাসি একটা। মজা নিচ্ছে তার। অবাক হলো মেয়েটা। এই লোক অফিসে ত একদম গোমড়ামুখো হয়ে থাকত সারাটাদিন অথচ বউ কে পেতেই মুখের হাসি সরছে না তার। এমন ভাবনায় মেয়েটার আবার নিজেরও লজ্জা লাগল। বউ ত এখন সে৷ তাহলে তাকে পেয়েই লোকটার মুখে হাসি সরছে না এমন!

রাদ মেয়েটাকে এত ভাবনার সুযোগ দিলো না আর। যে কাজটা করার জন্য মন আকুঁপাকু করছিল সেটা করে বসল নিঃসংকোচে। আচমকা দুজনের মাঝের দুরুত্বটুকু মিটিয়ে মেয়েটাকে একেবারে নিজের বুকের মধ্যে নিয়ে এলো। মেয়েটার মাথা গিয়ে পড়ল তার বুকের বাঁ পাশে, যেখানে মেয়েটা তাকে দিবা স্বপ্ন জাগরণে জ্বালিয়েছে গোটা একটা বছর৷ এতদিনে স্বস্তি পেলো ছেলেটা। মেয়েটা তাতে যা ইচ্ছে ভাবুক। বন্যরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে আর এই পুতুল তার বুকে! ব্যস। আর কোনো কথা হবে না!

ওদিকে এমন অতর্কিত হামলায় বেসামাল অথৈ র শরীর মন। মেয়েটা ভেবে পেলো না এই লোক আচমকা এমন ভোল পাল্টাল কেন। কিছু বলবে তার আগেই কানে এলো রাদের গমগমে গলার আদেশ, ‘চুপচাপ ঘুমাও। বউ সাজিয়ে রাখতে বিয়ে করি নি। এখন থেকে রোজ এভাবে আমার বুকেই ঘুমোতে হবে। তাই অভ্যেস করে নাও।’বেহায়া লোকটার এমন ঠোঁটকাটা কথাবার্তা শুনে মেয়েটার আর কিছু বলার অবকাশ পেলো না। শুধু যে লোকটা বেহায়া তা না, বেহায়া অথৈ র মনটাও। নাহলে তারও কেনো ইচ্ছে হলো না মোচড়ামুচড়ি করে লোকটার কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে। বরং মেয়েটা একেবারে আদুরে নেওড়া বিড়ালটির মতন আরো মুখ গুঁজে দিল বরের বুকে। এভাবে গুটিসুটি মেরে থাকতে থাকতে কখন যে চোখের পাতায় ঘুম নামল খবরও হলো না মেয়েটার।

__________________

রাদের বিয়েতে আযান বাবাকে দেখলেও খেয়াল করল মা বিয়েটা অ্যাটেন্ড ই করে নি। তার বড় দুঃখ লাগল। বুঝে পেল না তার মা এমন কি রাগ এখনো ছেলের বউয়ের উপর জিইয়ে রেখেছে যে তার পরিবারের একটা অনুষ্ঠানেই অনুপস্থিত থেকেছে পুরোটা সময়৷ ব্যাপারটা নিয়ে ইশিতার কাছ থেকে আদ্যোপান্ত জানতে চাইলে শুনল কিছু অপ্রিয় কথা। মনখারাপ আরো বাড়ল তার।

ইশিতা বাসায় থাকার সুবাদে যেটুকু জানে সবটা বলল ভাই কে।
‘আম্মু মাঝেমধ্যেই ইমান ভাইকে কল দেয়। বড়ভাইয়া কখনো কখনো রিসিভ করে কল তবে বেশিরভাগ সময় করে না। কেনো করে না সেটা অবশ্য আমি বুঝি। ও যেমন স্বার্থপর, দরকার বাদে আম্মুকে ত আর তেল মারবে না৷ যখন দরকার হবে তখন পা ধরে বসে থাকবে আর কি। কিন্তু এই সিম্পল জিনিসটা আফসোস আম্মু বুঝতে পারছে না এখনো। ছেলের মায়ায় এমন কাতর রাগটা গিয়ে পড়ছে নাজিয়া ভাবির উপরে। আম্মু ভাবছে ওইদিনের ঘটনা টা না ঘটলে তোমরা ভাইয়ে ভাইয়ে হাতাহাতি না করলে ইমান ভাইকে আব্বু বাড়ি ছাড়তে বলত না। আর ইমান ভাইও এরকম আম্মুর উপর রাগ মান অভিমান করে থাকত না, আম্মু র সাথে কথা বলা অফ করত না ৷

এরপরে যখন তোমরা বাড়ি ছাড়লে আম্মুর রাগ ভাবির উপরে আরো বেড়েছে। আমি বহুবার বুঝিয়েছি তবুও আম্মু ভাবছে ভাবির বুদ্ধিতে তুমি আব্বুর কথায় এই সিদ্ধান্তে রাজি হয়েছ। সবমিলিয়ে আম্মু এখনো ভাবির উপরে রাগ জিইয়ে রেখেছে। ভাবি ত প্রায়ই কল দেয় আম্মুকে। আম্মু দেখেও রিসিভ করে না। সেটা ভাবি বলে নি তোমায়?
তখন আমার এত রাগ লাগে আম্মুর এসব আচরণে কি যে বলবো!’

আযানের বড় দুঃখ লাগল। বেকুব তাকে কিছুই বলে না। বলল আযান তাকে মানা করতো। যেচে পড়ে এত অপমান মাথায় নেওয়ার দরকার কি। পরক্ষণেই মন খারাপও হলো তার৷ মেয়েটা তার বউ দেখেই তার মায়ের এমন একতরফা আচরণ। মেয়েটা ইমান ইতরটার বউ হলে নিশ্চয়ই মা মাথায় তুলে রাখত তাকে। তার কারণেই হয়তো মেয়েটার আজ এত অপমান, এত অনাদর। আযানের নিজের চেয়েও বেশি কষ্ট লাগল বেকুবের জন্য। সেই কষ্টের তোড়ে সে নিয়ে ফেলল হঠকারী এক সিদ্ধান্ত। রাতে বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়েই কল দিলো মাকে৷ মনস্থির করল খোলাখুলি সব বলে ভুল বোঝাবুঝি মেটাবে। এভাবে আর কতদিন মা তাদের দুজনকে ভুল বুঝবে! নাজিয়া তখন ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়েছে। আযান অপেক্ষায় ছিল এই সুযোগের। মেয়েটা সামনে থাকলে এত কথা বলতে আযানের অস্বস্তি হতো খানিকটা।

যতটা আগ্রহ আশা নিয়ে আযান কল করেছিল কল রিসিভ হতেই ততটা আশাহত হলো সে। রেহনুমা ভুইঁয়া ফোন রিসিভ করে তার কোনো কথা শুনার আগেই বলে গেলেন নিজের কথা৷ ছেলেকে শুনালেন কিছু কড়া তিক্ত বাক্য
‘তোমার বউয়ের বাপেরবাড়ির অনুষ্ঠানে কেনো গেলাম না সেটার বিষয়ে কথা বলতে চাইলে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই৷ এই প্রশ্নের উত্তর তোমার বাপ বোন আমার কাছ থেকে জেনেছে। তাদের কাছ থেকে জেনে নিও। তোমাদের সবার কাছে ত আমার চেয়ে ওই মেয়ের মুল্যায়ন বেশি৷ যাক আর কিছু বলব না। তুমি আশা করি তোমার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছ। আর কিছু বলবে?’

আযানের ইচ্ছে হলো না টুঁ শব্দটিও বের করতে। দীর্ঘশ্বাস চেপে সে দ্বিরুক্তি না করে ফোনটা কেটে দিল। চোখের সামনে ভেসে উঠল বহুবছর আগের পুরনো একটা দৃশ্য। তখন তারা দু ভাই একসাথে স্কুলে যেত। স্রেফ বছর দুয়েকের ব্যবধান তাদের। এরকমই একদিন দুই ভাইয়ের মধ্যে কোন একটা কথার সুত্রপাত থেকে মারামারি হতে ই দুজনেই ভালো জখম হলো। অথচ ইমান মায়ের কাছে পুরো ব্যাপারটা এভাবে উপস্থাপন করল যেন আযান একচেটিয়া মেরেছে তাকে। আযানের ছোটবেলা থেকেই ভীষণ অভিমান। তাই তার ইচ্ছেও হলো না পুরো ব্যাপারটা মাকে খোলাসা করে বলতে। মায়ের ত জানার কথা তার কোন বাচ্চা কেমন। তাহলে তিনি আযানকে স্রেফ ইমানের কথার জের ধরে ভুল বুঝলেন কি করে! এমন ভাবনায় ছেলেটা মাকে কিছু বলতো না আর। তার মনে হতো যারা তাকে ভালবাসবে তারা তাকে ভুল বুঝবেই বা কেনো!

বহুবছর পরে একই মনব্যথার পুনরাবৃত্তি হলো। রুমের লাইট নিভিয়ে সে শুয়ে পড়ল। চোখে জল টলমল করছিল আযানের। মায়ের প্রতি থাকা বহুবছর আগের পুরনো অভিমান ফিরে এলো তার। মা কিভাবে পারল তার কোনো কথাবার্তা না শুনে একতরফা ভাবে নিজের কথাগুলো বলে যেতে। আযান ত বলত তার নিজের কথা, ভুল বোঝাবুঝি মেটানোর কথা অথচ মা নিজের ধারণায় অনড় থেকে তাকে ভুল বুঝে গেল। এভাবে কথা বলল যেন আযান মা কে মুল্যায়ন করে নি কোনোদিন। অথচ বহুবছর আযান ভিতরে ভিতরে মরেছে মায়ের অনাদর অবহেলা অবিশ্বাসে! এসব ভাবনায় স্থান কাল পাত্র ভুলে চোখ কপাল হাত দিয়ে ঢেকে নিঃশব্দে শুয়ে থাকল ছেলেটা। সরু জলের রেখা আপনাআপনি গড়িয়ে পড়ছিল তার চোখের কোনা বেয়ে। কান্নার দমকে হালকা কেঁপে উঠছিল তার শরীর। তার মনে হচ্ছিল সে উনত্রিশ বছর বয়সী দামড়া পুরুষমানুষ টা নই বরং এগারো বছরের সেই বাচ্চা ছেলেটা যে মায়ের অনাদর অবহেলায় রুম অন্ধকার করে একনাগাড়ে কেঁদে যেত একলা।

দু তিনদিনের ঘুমের অনিয়মে নাজিয়ার শরীর ক্লান্তপ্রায়। ফ্রেশ হয়ে কোনোমতে মাথা মুছতে মুছতে সে সটান বেডে শুয়ে পড়ল। এতকিছু খেয়াল করে নি প্রথমে। তবে বেডসাইড টেবিল ল্যাম্প জ্বালাতেই আযানের মুখ চোখে পড়ল তার। হুট করেই দুশ্চিন্তা এসে ভর করল মেয়েটার মনে। বুঝে পেল না লোকটা কি অসুস্থ যে এভাবে কপালে হাত রেখে চোখমুখ ঢেকে ঘুমোচ্ছে! জ্বর টর হয়েছে নাকি এই ভাবনায় সে গিয়ে আযানের কপালে হাত রাখবে তখনই চোখে পড়ল চোখের কোনা বেয়ে জলের দাগ। কান্নার দমকে হালকা কেঁপে উঠছে শরীর টা। নাজিয়া হতবিহ্বল হয়ে পড়ল প্রথমে। বুঝতে পারল না এমন কি হয়েছে যে লোকটা এমন নিঃশব্দে কাঁদছে। পুরুষমানুষ নাকি সহজে কাঁদে না। তাই মেয়েটা আন্দাজ করল নিশ্চয় বড়সড় কোনো দুঃখে লোকটা কাঁদছে এভাবে। আযান তখন নিজের খেয়ালে বিভোর। তাই ঠাহর করতে পারে নি মেয়েটার এমন নজর।

নাজিয়া আস্তেধীরে সরে এসে তার পাশ ঘেঁষে শুয়ে পড়ল। তার নিজেরও কেন জানি এত কষ্ট হচ্ছিল। গলায় দলা পাকানো কান্নারা বেরিয়ে আসতে চাচ্ছিল শব্দ করে কেঁদে। বুঝতে পারল লোকটার কষ্ট হলে তারও ভীষণ কষ্ট হয়। জাদুবলে কিছু করা সম্ভব হলে সে তক্ষুণি লোকটার কষ্ট কমিয়ে দিতো। সেই ক্ষমতা যেহেতু তার নেই তাই মনে মনে আওড়াল, ‘আল্লাহ, আমি মাঝেমধ্যে নামাজ মিস দিই। কখনো কখনো কাজাও আদায় করি না জানি। তবুও প্লিজ তুমি আমার এই দোয়াটা কবুল করো। বদ টার কষ্ট দূর করে দাও প্লিইজ। মানুষটার মনের সব কষ্ট সব দুঃখ তুমি ভুলিয়ে দাও৷ প্রয়োজনে তার দুঃখ বিপদ কষ্ট সব আমার মাথায় দাও মাবুদ! মানুষটা তো আমাকে কখনো কষ্ট পেতে দেই নি তুমিও তাকে কষ্ট পেতে দিও না। তার কষ্ট হলে যে আমারও খুউব কষ্ট হয়!’

মনে মনে এসব আওড়াতে আওড়াতে মেয়েটার নিজের চোখ দুটোও ভিজে আসছিল। তবুও বহুকষ্টে চোখ দুটো বন্ধ করে রাখল সে৷ বদ টাকে কখনো কাঁদতে দেখে নি সে আগে। অথচ আজ কেমন নিঃশব্দে চেখের কোন বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে তার৷ নিশ্চয়ই কিছু নিয়ে খুউব আঘাত পেয়েছে লোকটা৷ মনে প্রাণপণ ইচ্ছে হলেও মেয়েটা বহুকষ্টে নিজেকে দমিয়ে রাখল পাশ ফিরে লেকটার চোখের জল আলতো হাতে মুছিয়ে দেয়ার, মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দেয়ার। এই লোক যেমন ইগোস্টিক! যদি একবার জানে নাজিয়া তাকে কান্না করতে দেখে ফেলেছে তাহলে মুখটা তক্ষুনি গম্ভীর বানিয়ে ঘুমিয়ে পড়ার ভান ধরবে। তার চেয়ে কিছুক্ষণ কান্নাটান্না করে মনের দুঃখ হালকা করুক৷ কিছুক্ষণ পরে সে নাহয় বুদ্ধি করে তাকে নিজের কায়দায় আদর করে দিবে। ঘুমের ভান ধরে তাকে জাপটে ধরবে!

পাঁচ দশ মিনিট পর আযান আপনাআপনি শান্ত হয়ে এলো যখন আচমকা একটা শীর্ণকায় হাত এসে তার পেট জড়িয়ে ধরে মাথা গলিয়ে দিল তার বুকে। তখনি নিজের ভাবনার জগত থেকে বের হয়ে আযানের নজর পড়ল তার বুকের কাছে থাকা আলুথালু বেশের মেয়েটাকে। সারাদিন বড় বড় চোখ দুটো পাকিয়ে তাকে রাগ দেখাতে চাওয়া মেয়েটার চোখ দুটো বন্ধ তখন৷ আযানের শক্তপোক্ত বুকে দেবে গেছে তার ফোলা আদুরে গালের একপাশ। আযান তাকে দেখতেই থাকল নিষ্পলক।

আচমকা আযানের সমস্ত দোলাচল কেটে গেল। এতক্ষণ কেঁদে উজাড় করা ছেলেটার হঠাৎ মনে হলো সে আর এগারো বছরের একলা বাচ্চা ছেলেটা নই, যাকে তার মায়ের অনাদর অবহেলা কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়েছে বছরের পর বছর। যে সমস্ত দুঃখের কথা আচমকা মনে পড়ায় সে এভাবে প্রাণমন খুলে কেঁদেছিল বহুবছর পর। এখন তার দুনিয়ায় আরেকটা মানুষ আছে, যার দুনিয়া খোদ আযান নিজেই। আযানের ধারণা তার একজীবনে না পাওয়া সমস্ত আদর ভালবাসা মেটাতেই বোধহয় সৃষ্টিকর্তা মেয়েটাকে তার জীবনে পাঠিয়েছেন। ঘুমের ঘোরে মেয়েটার হাতের বাধঁন আরো জোরদার হতেই আযানের হঠাৎ মনে হলো, মেয়েটা তার জীবনে না এলে সে এভাবে দম বন্ধ হয়ে বাঁচতে বাঁচতে কবেই মরে যেতো! ভাগ্যিস বিয়েটা যেরকমভাবে হউক হয়েছিল! ভাগ্যিস মেয়েটা তার জীবনে এসেছিল!

[ মানুষজন! আপনাদের সুন্দর সুন্দর মন্তব্যের অপেক্ষায় আছি। আর পরশু আমার সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট কোর্সের এক্সাম। ক্রিটিকাল একটা কোর্স। বেশি করে দোয়া করবেন সবাই ওকে! ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here