মেঘের মুলুকে চল’ আয়রা তাবাস্সুম পর্ব ৩১

0
2

‘মেঘের মুলুকে চল’
আয়রা তাবাস্সুম
পর্ব ৩১
______________________________

রাদ বোনকে দেখতে এসেছে আজ। প্রায় প্রতি সপ্তাহে বোনকে একটাবার চোখের দেখা না দেখে গেলে তার শান্তি মিলে না। তবে আজ অথৈ কে সাথে নিয়ে এসেছে। মেয়েটা কদিন ধরে বেশ জোর করছিল ননদকে দেখতে৷ অথৈ র বড় দুশ্চিন্তা হয় ননদের জন্য। তার থেকে ত দুয়েক বছর বয়স কম মেয়েটার। চব্বিশোর্ধ্ব বয়স হলেও স্বাস্থ্য খানিকটা রোগা৷ অথচ এখনই অমন রুগ্ন পাটখড়ির মতন শরীরে আবার এক বাচ্চার মা ও হয়ে যাবে! সেই দুশ্চিন্তায় মেয়েটার বড় ইচ্ছে হলো ননদকে দেখতে। তাই স্বামীর সাথে বগলদাবা হয়ে সেও গিয়ে পৌঁছুলো ননদের ফ্ল্যাটে। যাবার সময় নাওয়ার চৌধুরী ছেলেকে অবশ্য বারবার বললেন বোনকে বাড়ি নিয়ে আসতে। জামাইয়ের কানে কথাটা তুলতে৷ এরকম ছ মাসের গর্ভবতী শরীর নিয়ে হেলাফেলা করা ঠিক না৷ সারাদিন একা বাসায় থেকে খাওয়া ঘুমের অনিয়মে কোনো বিপদ আপদ ঘটলে!

রাদ স্ত্রী সমেত বোনের বাসায় গিয়ে পৌঁছাল বিকেল নাগাদ। দরজা আযানকে খুলতে দেখে বেশ অবাক হলো সে। এই ছেলের ত অফিসের কাজ শেষ হয় সন্ধ্যার দিকে তাহলে আজ এমন বিকেলে সে বাসায় কেন, এই ভাবনা মাথায় এলো৷ আযান অবশ্য এত কিছু খেয়াল করল না। সে নম্র হেসে কুশল বিনিময় করে তাদের বাসায় আসতে বলল। দুজনকে নাজিয়ার রুমের দিকে যেতে দেখে সে কিচেনের দিকে পা বাড়াল। চটজলদি টুকিটাকি কিছু নাশতা বানিয়ে দিবে এমন মনোবাসনায়। নাহলে দেখা যাবে বেকুব ফুলো পেটটা নিয়ে গুটি গুটি পায়ে রান্নাঘরে এসে হাজির হয়েছে যেন একেবারে পাকা গিন্নি সে। এসব ভাবতে ভাবতেই আযান পানিতে নুডলস ছেড়ে সিদ্ধ করতে বসিয়ে চপিং বোর্ডে দক্ষ হাতে পিয়াঁজ টমেটো কাটাকুটি করতে লাগল।

বোনকে দেখতেই রাদের চোখ জলে টলমল হয়ে এলো। নাজিয়া বিছানার হেডবোর্ডে বালিশ রেখে মাথা এলিয়ে শুয়েছিল। পাশের টেবিল ফ্যানের বাতাসে চুল উড়ে মুখে এসে পড়ছে তার। সিলিং ফ্যান টেবিল ফ্যান দুটোর বাতাস ই বহমান অথচ মেয়েটার হাবভাবে কেমন অস্থিরতা। কি একটা চেহারা যে হয়েছে মেয়েটার। চোখের নিচে দেবে গেছে একেবারে, বোধহয় রাতে ঘুমোতে পারে না তেমন। শোয়ার দরুন পরনে সালোয়ারের কিছুটা উপরে উঠে আসায় রাদ দেখতে পেল পায়ের অবস্থাও। পায়ে পানি জমেছে বোধহয়। রাদের বড় অসহায় লাগল৷ মা হওয়ার জার্নি এত কষ্টের! দুদিন আগেও তার মন আঁকুপাঁকু করছিল অথৈ কে বাচ্চা নেয়ার কথা বলতে। অথচ বোনের থেকে মুখ ফিরিয়ে মেয়েটাকে দেখল একবার। নাজিয়ার মতনই স্বাস্থ্য তার। বয়স দুয়েক বছর বেশি এই আর কি। তবুও রাদের মোটেও ইচ্ছে হলো না এক্ষুণি বাচ্চা নেয়ার কথা ভাবতে। আগে মেয়েটার খাওয়াদাওয়ার অভ্যেস ঠিক হোক। শরীর স্বাস্থ্যের উন্নতি হোক। বাকিটা পরে দেখা যাবে।

নাজিয়া তখন ঘুমের ভান ধরেছিল৷ বেডসাইড টেবিলের প্লেটে একগাদা ফল কেটে রাখা। সেসব খাওয়া নিয়েই এতক্ষণ হাতাহাতি চলছিল তার আর বদ টার মধ্যে। নাজিয়া দুপুরে লোকটা কে ফোনে কথায় কথায় কোন কুক্ষণে যে বলে ফেলেছে তার মাথা ঘোরাচ্ছিল অমনি বদ টা অফিস কামাই করে বিকেলের মধ্যে বাসায় ফিরে তাকে ডাবের পানি ফলের রস এসব খাওয়াতে ঝামেলা শুরু করল। ঠিকসময়ে কলিংবেলের শব্দে নাজিয়া যেন এই ঝামেলা থেকে রেহাই পায় ৷ পরক্ষনেই পায়ের শব্দ আসতেই সে আযান ভেবে চোখ দুটো চটজলদি বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ার ভান ধরল। এ ক মাসে ঘুমের ভান ধরার ব্যাপারটায় একেবারে দক্ষ হয়ে উঠেছে সে। মাঝরাতে বমি-টমি করে যখন কোনোমতে বিছানায় পিঠ লাগায় তার পাঁচ ছ মিনিট পরেই সে অনুভব করে বদগরম লোকটা তাকে ঘুমে ঠাসা ভেবে চুপিচুপি নরম মোলায়েম সব চুমু দেয় তার পুরো মুখজুড়ে। নাজিয়াও আদর পাবার লোভে চোখ দুটো বন্ধ করে ঘুমের মতন পড়ে থাকে। এমনি জাগা অবস্থায় বদটা জীবনেও এত আদর আহলাদ দেখাবে তাকে! তখন ত স্রেফ বকাধমক দেয়।

রাদের গলার আওয়াজ কর্ণগোচর হতেই মেয়েটা চটজলদি ঘুমের ভান ছেড়ে চোখ দুটো খুলল৷ ভাই কে দেখে মুহুর্তেই আদরকাতুরে হয়ে গেল তার চেহারাটা৷ কথার ঝাপিঁ খুলে বসল মেয়েটা। এটাওটা সব বলতে শুরু করল ভাইকে। রাদ অথৈ দুজনেই নীরব শ্রোতা৷ তারা সুযোগ দিল মেয়েটাকে রাগ অভিমান ঝাড়ার। মেয়েটার কথাবার্তার বেশিরভাগই আযানকে নিয়ে। রাদ মনে মনে হাসল সেটায়। সে নিজেও বহুবার খেয়াল করেছে বোনকে একেবারে মাথায় চড়িয়ে রেখেছে তার বর। অথচ মেয়েটা কেমন গাল ফুলিয়ে এটাওটা নালিশ করছে বরের ব্যাপারে। এরকমই কথার প্রসঙ্গে মেয়েটা বলে বসল, ‘লোকটা আমার কথা একটুও শুনে না ভাইয়া। নিজের মনমর্জি মত সব কাজ করে। ভুলে কি বলে ফেলেছি আমার দুপুরে অসুস্থ লাগছিল অমনিই সে অফিস থেকে আর্লি লিভ নিয়ে চলে এসেছে। এগুলো কোনো বুদ্ধিমান মানুষের কাজ বলো? প্রেগন্যান্সিতে সবারই ত হুটহাট অসুস্থ লাগে। স্বাভাবিক সেটা। তবুও আমার কথা না শুনে অফিসের কাজ ফেলে এলো! রাগ উঠবে না আমার? উনি আসলে আমার কথার কোনো মুল্যায়ন করে না, আমাকে ভালোও বাসে না’

এতক্ষণ নীরব শ্রোতা হয়ে বোনের সব কথাবার্তা শুনতে থাকা রাদ আচমকা মুখ খুলল৷ দ্বিমত পোষণ করল বোনের বলা শেষ কথাটায়। একেবারে শান্ত মুখে বলল, ‘বুনি। কথাটা ভুল বললি তুই৷ আযান যদি তোকে ভালো না বাসে তাহলে বলতে হবে দুনিয়াতে কেউ তোকে ভালবাসে না৷ এমনকি আমরাও না৷’ সদা গম্ভীর ভাববেশে থাকা অন্তর্মুখী ভাইয়ের মুখে এমন রাখ ঢাকহীন কথা শুনে মুহুর্তেই লালিমা এসে ভর করল মেয়েটার দু গালে৷ অথৈ ননদের এমন রাগ অনুরাগ দেখে মিটমিট করে হাসছিল৷ বর বউয়ের প্রেমে কাবু তাই অনায়াসে এমন অফিস ফেলে এসেছে আর সেটা নিয়ে বউয়ের মান অভিমান। অথৈ র ভীষণ মিষ্টি লাগল দুজনের প্রেম। এত আদুরে দুজনেই!

বোনকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে বের করে আনতেই যেন রাদ এবার সম্পুর্ণ অন্য প্রসঙ্গে কথা শুরু করল৷ বলল সে যেন প্রেগন্যান্সির আগ পর্যন্ত বাকি দু তিন মাসে যে কটা দিন বাকি সেগুলো যেন বাপের বাড়ি গিয়ে কাটায়৷ অথৈও ননদকে বোঝাল শেষের মাসগুলোতে আচমকা যেকোনো কিছু হতে পারে। তাই সারাদিন ফ্ল্যাটে একা থাকার চেয়ে বাপের বাড়িতে গেলে তারা সবাই তাকে দেখেশুনে রাখতে পারবে। কথা শেষ করে অথৈ দেখল মেয়েটার হ্যাঁ না কোনো জবাব নেই। একেবারে মুখ ভার করে রেখেছে। রাদও খেয়াল করল বোনের চোখেমুখে থাকা এই বিষণ্নতা। এতক্ষণ একদম উঁচু গলায় বলে চলছিল বর কে মোটেও চায় না সে অথচ এখন বর কে ছেড়ে ক টা মাস দূরে থাকতে হবে সেই কথা শুনে মনভার মেয়ের। রাদ বুঝল মেয়েটা শরীরে গড়নে বড় হলেও এখনো অভ্যেস সব ছোটবেলার মতন। সহজে অনুভূতি লুকোতে পারে না। সবটা মুখে ভেসে উঠে তার।

বোনের এমন মনখারাপ দেখে রাদ আশ্বস্ত করল তাকে। বলল ‘ বুনি৷ মনখারাপ কেনো? আমি জানি আযান রোজ অফিস থেকে এসে দেখে যাবে তোকে। প্রয়োজনে আমি বলব প্রতি সপ্তাহে কটা দিন রাতে থেকেও যেতে।’ তবুও নাজিয়ার মনভার দূর হলো না। ইচ্ছে হচ্ছিল হাউমাউ করে কেঁদে ফেলতে৷ অই বদগরম লোকটার বুকে মাথা এলিয়ে না দিলে তার যে রাতের ঘুম ই হয় না। এই ক মাসে এমন বদঅভ্যেস হয়েছে তার বদ লোকটা মুখে তুলে খাইয়ে না দিলে খাবারও মুখে নিতে ইচ্ছে করে না। ভাই ভাবি সামনে থাকায় সে এমন ছেলেমানুষী কান্নাটা বহুকষ্টে রুখে দিল৷ বদ টাকে ভাই বললেই বদ টা নির্ঘাত রাজি হয়ে যাবে। এটা বুঝবে না যে নাজিয়ার তাকে ছাড়া একটুও ভাল লাগবে না সেখানে। বদ টা ত নাজিয়ার হাত থেকে নিস্তার চায় ব্যস। এমনিও কথায় কথায় ত বলে নাজিয়া তাকে খুউব জ্বালায়। মেয়েটার দু চোখ উপচে বেরিয়ে আসতে চাওয়া জল অথৈ র চোখ এড়াল না৷ তার নিজেরও মনখারাপ হলো ননদের জন্য। বুঝল মেকি রাগটাগ দেখালেও আদতে মেয়েটা ভীষণ ভালবাসে বর কে।

তাদের আলাপচারিতায় ছেদ পড়ল আযানের আগমনে। সে তাদের অনুরোধ করল ড্রয়িংরুমে এসে বসতে। সামান্য নাশতার আয়োজন করেছে সে। রাদ অথৈ রুম থেকে বেরুতেই আযানও অতিথি অভ্যর্থনার জন্য বেরিয়ে যাবে এমন সময়ই তার নজর পড়ল চেহারা একেবারে চিবুকের কাছে নামিয়ে রাখা মেয়েটার উপরে। ভাই ভাবিকে দেখেও মেয়েটার এমন মুখভার কেন সেই দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠল ছেলেটার মন। ভাবল মেয়েটার দুপুরের মত আবার কোনো অসুস্থতা অসুবিধা হচ্ছে কিনা। সেই ভাবনায় সে চটজলদি বিছানায় গিয়ে গা ঘেঁষে বসল তার। পেটে কপালে হাত দিয়ে অনবরত প্রশ্ন করতে লাগল, ‘আরমিইইন! অ্যাই মেয়ে! আবার শরীর খারাপ লাগছে তোমার? পেটে ব্যথা হচ্ছে?’
বাকি কথা বলার সুযোগ সে পেল না আচমকা মেয়েটার দুটো হাতের দৃঢ় আলিঙ্গনে। খেয়াল করল মেয়েটা তাকে জড়িয়ে ধরে বুকে মুখ গুঁজে ফোঁপাচ্ছে একনাগাড়ে। আযানের বুক ফাঁকা হয়ে এলো একদম। মেয়েটাকে কাঁদতে দেখলে সবসময়ই এতো কষ্ট লাগে তার! তাই তড়িঘড়ি করে দূর করতে চাইল মেয়েটার মনখারাপ। মেয়েটার মাথার চুলে হাত বুলাতে বুলাতে জানতে চাইল এমন কান্নার কারণ। কোথায় কষ্ট হচ্ছে তার।

নাজিয়া একনাগাড়ে বলে গেল নিজের মনের কথা। কান্নার তোড়ে তার গলার স্বর অস্পষ্ট হলেও আযানের অসুবিধে হলো না কথাগুলো শুনতে, বুঝতে। নাজিয়া তখন বলে চলেছে, ‘আমি আপনাকে ছেড়ে ভাইয়ার সাথে যাব না প্লিইইজ। ভাইয়া আপনাকে বললেও আপনি মানা করে দেবেন। বলবেন বউকে যেতে দেবেন না আপনি। আপনাকে ফেলে আমার সেখানে কিচ্ছু ভালো লাগবে না। আপনি মানা করলে ভাইয়া আমাকে বাপের বাড়ি নিতে জোর করতে পারবে না। আপনি যে রাগী সেটা সবাই জানে। আপনার কথার উপরে ওরা কথা বলবে না আর। প্লিইজ আপনি গিয়ে মানা করে দেন ওদের’।

আযান বুঝতে পারল আগাগোড়া ঘটনা। তার নিজেরও খুউব মনখারাপ হলো। শুধু কি বেকুবের, তার নিজেরও ত ভীষণ কষ্ট হবে বেকুবকে ছেড়ে থাকতে। মনে পড়ল কেবলমাত্র বেকুবের সাথে থাকবে বলে কত পাঁয়তারা করে সে শশুরবাড়ি গিয়ে উঠেছিল ক মাস আগেও। করেছিল নিজের স্বভাববিরুদ্ধ সব আচরণ। তবে এমন ভাবনা বেশিক্ষণ থাকল না ছেলেটার। আচমকা মাথায় আসলো মেয়েটার ভিতরে এখন আরেকটা প্রাণ৷ আযানের আবেগের খামখেয়ালিপনায় বেকুবের কোনো ক্ষতি হলে সে নিজেকে আদৌ কোনোদিন ক্ষমা করতে পারবে! এমনিও সারাদিন অফিসে তার নিজেরও সময়টা কাটে দুশ্চিন্তায়। তার চেয়ে বরং আযান বুকে পাথর চেপে এই বিরহ সয়ে নিবে। অন্তত এটুকু ত নিশ্চিত থাকবে যে বেকুব বাপের বাড়িতে নিরাপদে থাকবে, সুস্থ থাকবে।

এসব মাথায় আসতেই ছেলেটা নিজের চোখমুখ স্বাভাবিক বানিয়ে ফেলল তৎক্ষনাৎ। লুকিয়ে ফেলল নিজের সমস্ত বিষণ্ণতা মনখারাপ। তাকে এমন ভগ্নকাতুরে দেখলে বেকুবটা সাহস পেয়ে বসবে। নিজের জেদে অনড় থাকবে৷ দেখা যাবে গোঁ ধরে বসে থাকবে বাপের বাড়ি যাবে না বলে। এমন ভাবনায় আযান মনজুড়ে থাকা রাজ্যের কাতরতা গিলে গলায় জোর করে নিরাসক্ত ভাব এনে বলল, ‘আমি মানা করব না আরমিন। মানা করার প্রশ্ন ই উঠে না। শরীরের এরকম অবস্থায় বাপের বাড়িতে যত্নআত্তিতে থাকলেই তুমি ভাল থাকবে। আমি ত তোমার এত যত্ন নিতে পারি না। তাই আমার নিজেরও দুশ্চিন্তা হয় তুমি বাড়িতে ঠিক আছ কিনা সার…. ‘

আযান কথা শেষ করতে পারল না আচমকা মেয়েটার গলার উচ্চস্বরে। দেখল বেকুবটা ফোপাঁতে ফোঁপাতে কান্নার মধ্যেই চোখেমুখে তীব্র রাগ নিয়ে বলছে, ‘সেটাই ত। আপনি ত চাইবেন ই আমি চলে যাই। আপনার দুশ্চিন্তা তাহলে কমবে। আমি ত আপনার জন্য স্রেফ দুশ্চিন্তা ই! এত বেহায়া আমিই! এমন একজনের জন্য কেঁদেকুটে মরছি যার কাছে আমি কেবলমাত্র দুশ্চিন্তার বস্তু।’ এসব বলে মেয়েটা আবার ফোঁপাতে শুরু করল। আযান আর কিচ্ছুটি না বলে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরল কেবল। তার প্রথমবার মনে হলো শুরু থেকেই বেকুবের সাথে ভীষণ রুঢ হওয়া উচিত ছিল তার। আদর আহলাদ দেখানো ঠিক হয়নি৷ তাহলে নিশ্চয়ই মেয়েটা তার মায়ায় এতটা জড়িয়ে যেতো না। তাকে ছেড়ে থাকতে হবে এই দুঃখে কাতর হতো না, এমন তীব্র কষ্ট পেতো না! এখন সে বেকুবের এই কষ্ট কমাবে কি করে!

____________________

রেহনুমা ভুইঁয়া কিচেন থেকে বেরিয়ে বেডরুমের দরজার আগল ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন৷ ছেলে বাপের সাথে কথা বলছে। কিছুক্ষণ পর কিচেনে এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকবে। তার সাথে দুয়েকটা কথা বলে শরীরস্বাস্থ্যের খোজখঁবর নিয়ে বেরিয়ে যাবে৷ বহুদিন ধরে ছেলেটার এই রুটিন যখন থেকে বউসমেত ফ্ল্যাটে গিয়ে উঠেছে। সপ্তাহে দু তিন দিন অফিস ফিরতি পথে বাপ মা কে দেখে যাবে। শুরুতে তেমন গুরুত্ব না দিলেও এই ক মাসে ছেলের এই অভ্যেসে রেহনুমা ভুইঁয়ার ভীষণ অপরাধবোধ হয়৷

বড় ছেলেকে তিনি কলের উপর কল করলে সে বেশিরভাগ সময় ফোন রিসিভ করে না৷ কিংবা করলেও কোনো না কোনোভাবে ছোট ভাইয়ের প্রসঙ্গ তুলে রাগ ঝাড়ে তার কাছে। অথচ রেহনুমা ভুইঁয়া খেয়াল করলেন এতদিনে এতবার আসাযাওয়ার পরেও আযান কোনোদিন ভাইয়ের বিষয়ে কিছু বলে নি তাকে। না ভালো না মন্দ কথা। কেবল বাপ মায়ের খবর নিয়েই ক্ষান্ত হয় সে। যেন কারো প্রতি কোনো অভিযোগ নেই তার। ছেলের বউয়ের ফোনও ইদানিং রিসিভ করেন তিনি। মেয়েটার উপর আর রাগ জিইয়ে রাখতে পারেন নি। যখন ইশিতার কথায় এই বুঝ এসেছিল তার যে মেয়েটার আগাগোড়া ঘটনায় বিন্দুমাত্র হাত নেই। একটা মেয়ে যার বিয়েটা ভাঙতে বসেছিল তার বড় ছেলের কল্যাণে পুরো ঘটনায় মেয়েটাই ত ভুক্তভোগী, দোষ যদি কারো হয় সেটা তার বড় ছেলের। মেয়েটার না৷

রেহনুমা ভুইঁয়া এটাও বুঝেছেন দোষ তার নিজেরও। তিনি বড় ছেলের প্ররোচনায় অন্ধ হয়ে একতরফাভাবে ছোট ছেলে আর তার বউকে ভুল বুঝেছেন এতকাল। অথচ সেই বড় ছেলে এখন পারতপক্ষে যোগাযোগ রাখে না তার সাথে। যেন মায়ের প্রয়োজন নেই তার। রেহনুমা ভুইঁয়ার বাড়িটা ফাঁকা লাগে ইদানীং। ইশিতাও সুযোগ মিললে ভাইয়ের ফ্ল্যাটে গিয়ে থাকে সপ্তাহখানেক। আরমান ভুঁইয়াও স্ত্রীকে এতটা সমীহ করে চলেন না আগেরমতন৷ প্রয়োজনে যতটুকু কথাবার্তা হয় এটুকুই। রেহনুমা ভুইঁয়ার বড় ইচ্ছে হয় ছেলেকে মুখ ফুটে বলতে যেন সে স্ত্রী সমেত ফিরে আসে৷ তবে আজীবন নিজেকেই ঠিক ভাবা অহংকার তাকে সায় দেয় না ছেলের কাছে এমন আবদার রাখতে, নিজের ভুল স্বীকার করতে।

তবে দরজার আগলে দাঁড়িয়ে যখন শুনলেন ছেলে বউকে বাপের বাড়ি দিয়ে আসবে কারণ দেখাশোনা করার মতন কেউ নেই তক্ষুনি মহিলা নিজের ইগোর বিরুদ্ধে গিয়ে কথাটা বলে বসলেন। ‘আযান। তুমি নাজিয়াকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে এসো৷ মায়ের কথাটা রাখো৷ ও কে বাপের বাড়ি দিয়ে আসতে হবে না। আমি ত সারাদিন বাড়িতেই আছি৷ ও কে দেখে রাখব। আর ইশি নিজেও ওর যত্নআত্তি করতে চায়। তাই ওর দেখাশোনায় সমস্যা হবে না।’ ঠান্ডা গলায় দরজা আগলে দাঁড়িয়েই কথাগুলো বলে তিনি সরে গেলেন৷ যদিও মনে মনে খুউব চাইলেন ছেলে যাতে তার কথাটা রাখে। ছেলে ছেলের বউয়ের প্রতি করা তার অন্যায়ের অন্তত এটুকু প্রায়শ্চিত্ত তিনি করতে চাইলেন৷

আযান ফ্ল্যাটে ফিরল নির্ভারমনে। মায়ের ভালবাসার জন্য কাতর ছেলেটার মন মায়ের এটুকু পরিবর্তনেই খুশিতে পাগলপারা হলো। তবুও দ্বিধা দুশ্চিন্তা উঁকি দিচ্ছিল তার মনে৷ বেকুব আদৌ রাজি হবে ত শশুরবাড়ি পুনরায় গিয়ে উঠতে। তার মা মেয়েটার সাথে কেমন আচরণ করেছিল সেসবও তার মনে পড়ল আচমকা। তাই মনস্থির করল মেয়েটাকে জোর করবে না সে। মায়ের অমন আচরণের পর মেয়েটা যদি শরীরের এমন নাজুক দশায় শশুরবাড়ি গিয়ে উঠতে না চায় সেটাই স্বাভাবিক। আযানের জোর করার মুখও নেই। মা ত মেয়েটার সাথে বাড়াবাড়ি রকমের খারাপ আচরণ করেছিল। তবুও সে ভাবল মেয়েটার থেকে জানতে চাইবে। মেয়েটা যেটা সিদ্ধান্ত নিবে আযান সেটাই মেনে নিবে অনায়াসে।

ডিনার শেষে দুজনে বিছানায় গিয়ে শুতেই নাজিয়া অভ্যেশবশত আবদার করল, ‘বুকে নিন। ঘুমোব’ আযান তাকে বুকের মাঝে নিয়ে এসে গালে আলতো হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়াতে পাড়াতেই প্রশ্নটা করল, ‘আরমিইন! যদি তোমার কাছে এখন দুটো অপশন থাকে তুমি কোনটা নিবে? বাপের বাড়ি যাবে নাকি শশুরবাড়ি?’
সেকেন্ডের মাঝে মেয়েটা উত্তর দিল। ‘শশুরবাড়ি’।
এমন উত্তরে আযান হতবিহ্বল হলো একদম। সে ভেবেই বসেছিল মেয়েটা প্রথম অপশন টা নিবে কিংবা শশুরবাড়িতে কেন যাবো ডেকেছে কিনা এরকম তিন চারটে প্রশ্ন করবে। অথচ বেকুব কেমন চিন্তাভাবনা ছাড়াই ফট করে উত্তর দিলো শশুরবাড়িতে যাবে। আযানের মন আঁকুপাঁকু করল মেয়েটার এমন উত্তরের কারণ জানতে।

আযান কৌতুহল বশত ‘শশুরবাড়ি কেন’ এমন প্রশ্নটা করতেই আবারও সেকেন্ডের মধ্যেই উত্তর টা আসলো মেয়েটার কাছ থেকে। পুনরায় কোনো ভাবনাচিন্তা ছাড়াই। মেয়েটা উত্তর দিলো, ‘কারণ সেখানে আপনি থাকবেন! বাপের বাড়িতে ত আর আপনি থাকবেন না।’ তারপর সে থেমে থেমে যোগ করল আরেকটা বাক্য, ‘আমার আপনাকে ছাড়া কোথাও কিচ্ছু ভাল লাগে না এখন’

[ বাসায় মেহমান এলে একজায়গায় নিরালায় বসে লিখা যায় না আসলে। আর মনমতন না হওয়া পর্যন্ত আমি টাইপ করে কাটাকুটি করতে থাকি। তাই অনেক সময় লাগল। দুঃখিত দেরিতে দেয়ার জন্য। এত সময় পরিশ্রম ভাবনা এসব গায়ে লাগে না, অপচয় মনে হয় না যখন আপনারা গল্প পড়ো মন্তব্য জানান। তাই মন্তব্য জানাতে কার্পণ্য করবেন না, ওকে?]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here