#চোরাবালির_পিছুটানে (১৯)
#জেরিন_আক্তার
সাইমন তাড়াহুড়ো করে বলে,
“ভাই আমি জানি কি করবো। তু্ই যা বলার ফোনে বলে দিস। এখন তাড়াতাড়ি যা ভাই!”
রাদিফ ফোন পকেটে ভরে রুম থেকে বের হয়ে যায়। সাইমন রাদিফের রুম লক করে চলে যায়।
রাদিফ হনহন করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যেতে নিলে রাহা সামনে এসে দাড়িয়ে বলে,
“ভাইয়া কোথাও যাচ্ছো?”
“হুম।”
“কোথায় যাচ্ছো?”
“ওই সিফাত আসছে। ওর সাথে!”
“কেনো কিছু কি হয়েছে?”
রাদিফ তাড়াহুড়ো বসত রাহার সামনে একটু দাঁড়ায়। রাহার গালে হাত ছুঁইয়ে বলে,
“না কিচ্ছু হয়নি। কাজ আছে তাই যাচ্ছি!”
এই বলে রাদিফ চলে যায়। রাহা হাবার মতো ভাইয়ের পানে তাকিয়ে রইলো। কি বলে গেলো কাজ আছে, আবার আগে বললো সিফাত আসছে কিন্তু রাহা ওর কথা কিছু বুঝে উঠতে পারলো না। ভাবতে ভাবতে রাহা ডাইনিং টেবিলের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। গ্লাসে পানি ভরে খায়।
সাইমন জানে এখন নিচে গেলে রাজ নয় রাহা দুজনে ওকে প্রশ্ন করবে রাদিফ কোথায় গিয়েছে। সাইমন এখন এই প্রশ্নের সম্মুখীন বা এর উত্তর কোনোটাই দিতে চায় না।
________________
বিকেলে পার্লার থেকে মিষ্টিকে সাজিয়ে আনা হলো। মিষ্টি কেমন একটা গুমোট বেধে আছে। কাঁদতেও পারছে না। সব কেমন এলোমেলো লাগছে তার কাছে। রাদিফ শেষ পর্যন্ত কিছু করতে পারবে কিনা এই সন্দেহ। মিষ্টি সেজেগুঁজে নিজের রুমে বসে ছিলো। সাথে আছে তার দুই বান্ধবী। আর একটু পরপর মিষ্টিকে সায়মা চৌধুরী নয়তো রুমানা চৌধুরী আর নয়তো তার বাবা দেখে যাচ্ছে।
রাশেদ চৌধুরী তার বন্ধু সোহেল শিকদারকে কল দিয়েছিলেন। তারা রওনা দিয়েছেন, রাস্তায় আছেন।
সোহেল শিকদার নিজেদেরই দুইটা গাড়ি নিয়ে আসছেন। একটায় বলতে সে, তুহিন আর তুহিনের একটা বন্ধু। আর অন্য গাড়িতে তুহিনের চাচা, চাচি আর চাচাতো বোন।
মাঝ রাস্তায় এসে তুহিনের গাড়িটা ড্রাইভার থামায়। সোহেল শিকদার বলেন,
“কি হলো! ড্রাইভার গাড়ি থামালে কেনো?”
ড্রাইভার পেছনে ফিরে বলে,
“স্যার, আমার ওয়াইফ প্রেগন্যান্ট। ডেলিভারির আর তিনদিন আছে। সে নাকি এখন অসুস্থ হয়ে পড়েছে।আমার বোন ফোন দিয়ে বলছে আমার ওয়াইফকে নাকি হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছে। এখন বাড়িতে আর কোনো পুরুষ মানুষও নেই। এখন মনে হচ্ছে আমাকে যেতে হবে।”
সোহেল শিকদার বলেন,
“তাহলে এখন কি হবে? গাড়ি ড্রাইভ করবে কে?”
তুহিনের একটা বন্ধু ছিলো গাড়িতে। নাম নয়ন। সে বলে,
“আমি করছি আঙ্কেল। আর ড্রাইভার ভাই আপনি হসপিটালে যান। আপনাকে এখন ওই খানে বেশি প্রয়োজন।”
ড্রাইভার বলে,
“হুম। তবে আপনাদের কাউকে ড্রাইভ করতে হবে না। আমার একটা বন্ধু আসছে। ওউ একজন ড্রাইভার।”
তুহিন বলে,
“ঠিক আছে। তবে তার আসতে কতক্ষন লাগবে?”
“এই এসে পড়লো বলে। এসে পড়েছে।”
বলতে বলতে ড্রাইভার গাড়িতে থেকে নেমে গেলো। এবং সাথে সাথে আরেকজন ছেলে এসে গাড়িতে উঠে বসে। ছেলেটা মাস্ক পড়েছে। শরীরের গঠনের দিক থেকে বেশ হ্যান্ডসম। পোশাক-আশাক দেখে কারো মনে হচ্ছে না এই ছেলে ড্রাইভার। মনে হচ্ছে কোনো বড়লোক পরিবারের সন্তান। ছেলেটা কোনো কথা ছাড়াই গাড়ি ড্রাইভ শুরু করলো।
সোহেল শিকদার ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শেষে বলেই ফেলেন,
“বাবা, তোমার নাম কি?”
“আঙ্কেল আমার নাম রায়হান!”
“ওহ। তোমাকে একটা কথা বলবো!”
“জি বলুন!”
“তুমি কত বছর ধরে গাড়ি চালাও!”
“আঙ্কেল আমি যখন কলেজে উঠি তখনই বাবার থেকে গাড়ি চালানো শিখি। এরপরে থেকে চালাচ্ছি। তবে ভয় পাবেন না আমি এক্সিডেন্ট করবো না।”
সোহেল চৌধুরী মাথা নাড়িয়ে বলেন,
“না না, বাবা আমি সেটা বলছি না। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে না তুমি ড্রাইভার। আসলে তোমার সাথে এই ড্রাইভার যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে কোনো বড়লোক বাবা-মায়ের সন্তান।”
ছেলেটা বাকা হেসে বলে,
“আঙ্কেল আমাকে দেখে মনে হচ্ছে না যে আমি ড্রাইভার, বড়লোকের ছেলে তাইনা! শুধু দেখতে থাকুন আরও অনেক কিছুই মনে হবে।”
ছেলেটার কথা কিছুই বুঝতে পেরে উঠলো না কেউ। হঠাৎ সোহেল শিকদার ছেলেটাকে বলে উঠেন,
“তুমি এই রাস্তা দিয়ে গেলে না যে? অন্য রাস্তা দিয়ে ঢুকছো কেনো?”
ছেলেটা বলে,
“আঙ্কেল আজ এই রাস্তা দিয়ে জ্যাম পড়বে। তাই এই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি।”
সোহেল শিকদার বলেন,
“এই রাস্তা দিয়ে কখনও ওই বাড়িতে যাইনি। তাই বলতে পারলাম না। তবে সন্ধ্যা হয়ে আসছে তুমি একটু তাড়াতাড়ি নিয়ে যাও!”
“ঠিক আছে আঙ্কেল!”
সন্ধ্যা হয়ে গেলো। চারিদিকে ভালোমতোই অন্ধকার হয়ে উঠেছে। সবাই রাস্তার আশেপাশে তাকিয়ে বুঝতে পারছে না এই খানে দিয়ে আদৌ রাশেদ চৌধুরীর বাড়িতে যাওয়া যাবে কিনা। সবার মনে হচ্ছে এটা ভুল রাস্তা।
ছেলেটার উপরে বিশ্বাস করেই কেউই কিছুই বলছে না। ছেলেটা কাউকে মেসেজ করতে করতে গাড়ির স্প্রিড বাড়ালো। আশেপাশে কেমন গাছগাছালি দেখা যাচ্ছে। এমন সময় হুট্ করে ব্রেক করে ছেলেটা। সোহেল শিকদার বলেন,
“কি হলো!”
“আঙ্কেল সামনে দেখুন!”
সামনে দুটো আরোয়ান ফাইভ বাইক নিয়ে দাড়িয়ে আছে তিনজন ছেলে। ড্রাইভার ছেলেটা বলে,
“মনে হচ্ছে ওরা ওখানে বসে আড্ডা দিচ্ছে। আমি এক্ষুনি ওদের গাড়ি সাইড করতে বলছি!”
“হুম, তাড়াতাড়ি যাও!”
ছেলেটা নেমে যায়। ছেলেটাকে দেখে তিনজন ছেলে এগিয়ে আসে। এরপরে ছেলেটা কি যেনো বলে ওদের। তিনজন ছেলেই চলে যায় নিজেদের বাইকের কাছে।একটা বাইকে দুইজন বসে। আরেকটায় একজন বসে, বাইক স্টার্ট দিয়ে ছেলেটার কাছে এসে পেছনে দাঁড়ায়।
গাড়ির ভিতরে থাকা সবাই গাড়ির আলোতে সবটা দেখতে পাচ্ছে। ছেলেটা হঠাৎ করে গাড়ির সামনে এসে নিজের মাস্ক খুলে। এরপরে নিজের কোমরে গুজে রাখা রিভলবার বের করে গাড়ির সামনের দুটো চাকা পাংচার করে দেয়। সবাই হা হয়ে তাকিয়ে দেখছে। এরপরে বসে থাকতে না পেরে সাথে সাথে গাড়ি থেকে নেমে যায়। তুহিন ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলে,
“এভাবে গাড়ির চাকা পাংচার করলে কেনো?”
ছেলেটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বাকি ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বলে,
“কিরে এতো দেখি, জামাই গাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছে যে! সাথে আবার সবাই। আমিতো ভেবেছি ভয়ে গাড়ি থেকে নামবেই না। কি বলিস তোরা?”
সাথে সাথে পেছনে থাকা ছেলেগুলো হাসতে থাকে। এই শুনে তুহিন চোয়ালে শক্ত করে বলে,
“এবার বুঝতে পারছি, এগুলো সব প্ল্যান করে করা হয়েছে।”
ছেলেটা বাঁকা হেসে বলে,
“বুঝতেই যখন পারছিস তাহলে থাক! যদি জায়গা টা কোথায় বুঝতে পারিস তারপর কাউকে বলে গাড়ি নিয়ে আসতে বলিস। নিয়ে যাবে তোদের। আর বিয়ের চিন্তা মাথায় থেকে বের করে বসে বসে মশা মার!”
এই বলে ছেলেটা তপ্ত শ্বাস ফেললো। এরপরে গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলে উঠে,
“আসছে বিয়ে করবে! সারাবছর দেখেশুনে রাখবে একজন আর তিনি মাঝখানে থেকে বিয়ে করে নেবে!”
যেই বাইকে একজন ছিলো, সেই বাইকে উঠে বসে ছেলেটা। এরপরে দুইটা বাইক হাওয়ার বেগে ওদের সামনে দিয়ে চলে যায়।
তুহিন গাড়ির মধ্যে পা দিয়ে লাথি মেরে বলে উঠে,
“ওহ শেট, কেনো যে এই ছেলের পাল্লায় পড়তে গেলাম। এই ছেলে বাকিদের মতো সাধারণ কেউ ছিলো না। এই বিয়েটা আটকাতে চাইছে ছেলেটা।”
সোহেল শিকদার রাগে কিছু বলার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না। নয়ন তুহিনকে বলে,
“কি করবি এখন ওদের কল দিয়ে জানাবি!”
তুহিন রেগে গিয়ে বলে,
“কি জানাবো এখন! আর আমাদের অনেক বড় একটা ভুল হয়ে গিয়েছে। তু্ই যদি গাড়িতে বসে এই দৃশ্যটা ভিডিওও করতি তাহলেও কাজে দিতো। তবে যাই হোক এই ছেলেকে তো আমি ছাড়বো না।”
সোহেল শিকদার ভাবুক গলায় বলে উঠেন,
“তুহিন তোর ওই ছেলের শেষ কথা শুনে কি মনে হচ্ছে, মিষ্টির কি ওই ছেলের সাথে কোনো সম্পর্ক আছে!”
_________
জাপানে,,,
সারাদিন পার হয়ে গেলো, রাদিফ বাড়িতে নেই। সেই যে রাতে কাজ আছে বলে চলে গিয়েছে। এখনও আসেনি। রাহা আর রাজ চিন্তিত হয়ে বসে আছে ড্রইং রুমে। পাশে দাড়িয়ে আছে মেইড। সাইমনও বাড়িতে নেই। সকালে অফিসে গিয়েছে। আসেনি এখনও। রাজ দুপুরে থেকে কল দিচ্ছে কিন্তু ফোন বন্ধ বলছে।
রাহা চিন্তিত কণ্ঠে বলে উঠে,
“আমার না কেমন যেনো যেনো খটকা লাগছে। ভাইয়া হুট্ করে কোথায় চলে গেলো। বলে গেলো কাজে গিয়েছে। কি কাজে গিয়েছে সেটাও বলেনি।এখন আবার কোনো যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। কোনো বিপদ হলো নাকি তাও তো জানতে পারছি না। আর সাইমন ভাইয়াকে সারাদিনে কাছে পায়নি যে জিজ্ঞাসা করবো। ফোনও ধরছে না।”
রাজ ভাবুক গলায় বলে,
“রাহা ভেবে দেখো, রাদিফ দেশে চলে যায়নি তো!”
রাহা চট করে রাজের দিকে তাকিয়ে বলে,
“এইটা তো ভাবিনি! আমারও এখন তাই মনে হচ্ছে। কিন্তু আমাদের কাউকে বলে গেলো না কেনো? না, না, যদি দেশে না গিয়ে থাকে তখন?”
রাজ বলে,
“দেশেই গিয়েছে। দেশে না গিয়ে এখন ওর কি বা কাজ থাকবে! আমার দৃঢ় বিশ্বাস ও দেশেই চলে গিয়েছে। আর সাইমন ভাইয়াকে আমাদের বলতে না করেছে।”
রাহা গভীর গলায় বলে,
“আসুক, সাইমন ভাইয়া, উনাকে শক্তপোক্ত করে ধরতে হবে। তাহলেই কথা বেরোবে।”
রাজও সম্মতি জানিয়ে বলে,
“ঠিক বলেছো! তোমার কথাই হবে!”
___________
সোহেল শিকদার অলরেডি রাশেদ চৌধুরীকে সবটাই জানিয়েছে। লোকেশন বের করে জানায় তারা কোথায় আছে। রাশেদ চৌধুরী তাদের আনতে গাড়ি পাঠিয়েছেন। গাড়ি ওদের কাছে পৌঁছাতে আর ওদের আসতে প্রায় দুই-তিন ঘন্টার মতো দেরি হবে।
এগুলো শুনে মিষ্টি কিছুটা আচ করতে পেরেছে। মনে মনে আল্লাহকে বলছে,, রাদিফ যেনো ফিরে আসে।
মিনিট বিশেক পরে চৌধুরী বাড়ির সামনে সেই দুটো বাইক নিয়ে আসে চারটে ছেলে। একজনের মাথায় শুধু হেলমেট। বাইক দুটো এসে ঠেকে চৌধুরী বাড়ির মেইন দরজা বরাবর। সবার নজর ওইদিকে শব্দ করে আসা বাইক দুটোর দিকে। রাশেদ চৌধুরী, রুবেল চৌধুরী, সায়মা চৌধুরী আর রুমানা চৌধুরী সামনে এগিয়ে যায়। পেছনে বাকি আত্মীয়রা।
হেলমেট পড়া ছেলেটা আগে আসে। পেছনে বাকি তিনটা ছেলে। ড্রইং রুমে পা রাখতে রাখতে হেলমেট পড়া ছেলেটা হেলমেট খুলে। ছেলেটার মুখ খুলতেই সবার চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। হিরোর মতো এগিয়ে আসা ছেলেটা আর কেউ নয় রাদিফ।
চলবে….
পরবর্তী পর্ব কালকে সন্ধ্যায় আসবে। এর আগে কোনো পর্ব আসবে না।…..আর এই পর্ব কেমন হলো অবশ্যই জানাবেন।
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। আর এই পার্টটা ভালো লাগলে রেসপন্স করবেন!!!!!!
[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]

