চোরাবালির_পিছুটানে (২১)—স্পেশাল পর্ব #জেরিন_আক্তার

0
2

#চোরাবালির_পিছুটানে (২১)—স্পেশাল পর্ব
#জেরিন_আক্তার

মিষ্টি ড্যাব ড্যাব করে রাদিফের দিকে তাকিয়ে রইলো। না জেনে রাদিফ কি বলছে তাকে। কষ্টও হচ্ছে। তবুও মিষ্টির কোনো আফসোস নেই। রাদিফ যে ফিরে এসেছে এই অনেক। রাদিফ বিছানায় বসে পড়লো। মিষ্টি রাদিফের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। নিচু স্বরে বলে,

“তুমি তো আসছিলে না তাই আমি তুহিনের সাথে কথা বলতে এসেছিলাম। আমি ওকে বলতে চেয়েছিলাম বিয়েটা না করার জন্য।”

রাদিফ তপ্ত শ্বাস ফেলে বলে,

“চোখ মুছে, সোফায় গিয়ে বস!”

মিষ্টি ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে সোফায় বসে। রাদিফ উঠে দরজা খুলে দিয়ে সাজিদকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“সাজিদ ভিতরে আয়!”

সাজিদ কাজীকে নিয়ে ভিতরে আসে। রাদিফ গিয়ে মিষ্টির পাশে বসে পড়ে। সাজিদ বলে,

“রাদিফ কাজী বললো বিয়ের সাক্ষি লাগে দুইজন। আমি আলিফকে ডেকে আনছি!”

“যা!”

সাজিদ আলিফকে ডেকে নিয়ে আসে। রুমের দরজাও লাগিয়ে দেয়। কাজী বিয়ে পড়াতে শুরু করে। কাজী শেষ বাক্যে মিষ্টিকে কবুল বলতে বলে,

“বলো মা আলহামদুলিল্লাহ কবুল!”

মিষ্টি এক সেকেন্ডও দেরি করে না। রাদিফের হাত শক্ত করে ধরে সাথে সাথে বলে উঠে,

“আলহামদুলিল্লাহ কবুল!”

কাজী লোকটা হেসে বলে,

“আরেকবার বলো!”

“আলহামদুলিল্লাহ কবুল!”

“আরেকবার!”

“আলহামদুলিল্লাহ কবুল!”

কাজী সাথে সাথে আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠলো। একই সাথে রাদিফকেউ বলতে বলা হয়। রাদিফ ঠিক একই ভাবে বলে।

কাজী বিয়ে পড়ানোর পর্ব শেষ করে চলে যায়। রাদিফ মিষ্টি আসার আগেই কাজীকে টাকা দিয়ে বসিয়ে রেখেছিলো। সাজিদ আর আলিফও রাদিফের সাথে হাত মিলিয়ে কংগ্রাচুলেশন বলে চলে যায়। ঠিক তখনও রাদিফের একহাত শক্ত করে ধরে ছিলো মিষ্টি।

রাদিফের ফোন বেজে উঠে তাই মিষ্টির হাত ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ায়। মিষ্টি তো মহাখুশি। তার খুশি প্রকাশ করার কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না।

রাদিফকে তার আরেকটা বন্ধু রোহান। আজ তার বন্ধু গুলো ছিলো বলেই এই প্ল্যান সাকসেস করতে পেরেছে। রাদিফ কল রিসিভ করে।

“হ্যালো! রাদিফ তু্ই কি তোর বাড়িতে?”

“হুম। কেনো?”

“তোর লাগেজ রয়েছে। নিয়ে আসছি আমি!”

“ঠিক আছে। নিয়ে আয়।”

রাদিফ ফোন কেটে দিয়ে পেছনে ফিরে দাঁড়াতেই মিষ্টি এসে তাকে জড়িয়ে ধরে। মিষ্টি কাদছে। রাদিফও হাত উঠিয়ে মিষ্টিকে জড়িয়ে ধরে। রাদিফ ধীর গলায় বলে উঠে,

“অনেক কেঁদেছিস। তোকে আর কাদতে দেবো না। তাকা আমার দিকে!”

মিষ্টি মাথা তুলে তাকায়। রাদিফ আদেশ করে বলে,

“চোখের পানি মুছ! এই নে টিস্যু!”

মিষ্টি টিস্যু নিয়ে চোখের পানি মুছে ফেলে। রাদিফ বলে,

“তোকে যদি এরপরে কোনো কারণে কাদতে দেখি তাহলে তোর খবর আছে। এখন তোর উপরে সম্পূর্ণ অধিকার আমার। এখন আমার অনুমতি ছাড়া কাদতেও পারবি না।”

মিষ্টি মাথা নাড়িয়ে বলে উঠে,

“ঠিক আছে! আর কাদতে দেখবে না।”

“এখন এদিকে আয় ছবি তুলবো।”

রাদিফ মিষ্টিকে সাথে নিয়ে সেলফি তুলে। সেটা সাথে সাথে রাজের হোয়াটস্যাপ নাম্বারে পাঠিয়ে দেয়। সাথে সাইমনের হোয়াটস্যাপ নাম্বারেও পাঠিয়ে দেয়। সাইমন দেখে সাথে সাথে মেসেজ দেয়—-ভাই কংগ্রাচুলেশন। এবারের মতো বেঁচে গেলি। যদি মিষ্টিকে বিয়ে না করতি তাহলে তোর খবর ছিলো। আর ভাই, তোরা অনেক ভালো থাক। তোদের বিবাহিত জীবন সুখের হোক।

এই মেসেজ পড়ে রাদিফ কিছু লিখতে যাবে ঠিক তখন সাইমন আবার আরেকটা মেসেজ দেয়—-ভাই তোর খাট কি নতুন!

এই মেসেজটা পড়ে রাদিফ দাঁতে দাঁত চেপে মেসেজ লিখে—-শালা তোর বউ নিয়ে এসে পরীক্ষা করে যাস নতুন নাকি পুরোনো।

সাইমন রাদিফের মেসেজ পড়ে হাসতে থাকে এরপরে কল দেয়। রাদিফ কল রিসিভ করে কানে নিতেই সাইমন বলে,

“ভাই, কি করছিস এখন? ভাবি কি তোর সাথেই আছে?”

রাদিফ মিষ্টির দিকে তাকিয়ে বলে,

“হুম। সাথেই আছে।”

“একটু লাউডে দে! কংগ্রাচুলেশন বলি!”

রাদিফ লাউডে দেয়। ওপাশে থেকে সাইমন বলে,

“ভাবি কংগ্রাচুলেশন!”

“থ্যাংক ইউ ভাইয়া!”

এরপরে রাদিফ ফোনটা লাউডস্পিকার অফ করে বেলকনিতে চলে যায়। এরপরে বলে,

“রাহা আর রাজ কোথায়?”

“রুমেই আছে।”

“ওহ। ভাই ওদের দেখে রাখিস। আর আমি এখন তাহলে রাখছি। পরে কথা বলবো!”

“এই রাদিফ শোন শোন, একটা কথা শোন!”

“কি বল!”

সাইমন হেসে হেসে বলে,

“ভাই তোর যেই রাগ মনে তো হয়না আজ এতো ঝামেলা করে বউয়ের সাথে কিছু করবি। মাথায় রাগ উঠেই থাকবে। তবুও বলি, ভাই বাসর রাতের বিড়াল বাসর রাতেই মারিস!”

এই শুনে রাদিফ ধমকে উঠে বলে,

“শালা ফোন রাখ!”

রাদিফ ফোন নিজেই কেটে দিয়ে রুমে আসে। এরপরে মিষ্টির হাত ধরে ওকে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। সিঁড়ির রেলিংয়ের কাছে এসে দাঁড়ায় মিষ্টিকে নিয়ে। রাদিফ সবাইকে এলার্ট করতে উপরে থেকে একটা ফুলদানি নিচে ফেলে দেয়। সবাই বিকট শব্দ পেয়ে ভাঙা ফুলদানির দিকে তাকায়। ঠিক তখন রাদিফ আরেকটা ফুলদানি ফেলে দেয়। সবাই এবার উপরে তাকায়। রাদিফ আর মিষ্টিকে দেখে সায়মা চৌধুরী আর রুমানা চৌধুরী দুজন-দুজনার দিকে তাকিয়ে হেসে উঠলো। আবার কেউ কেউ ওদের দেখে অবাক হলো। তুহিনের বাড়ির লোক ওদের দেখে রেগে গিয়ে একপাশে দাড়িয়ে রইলো। চলে যেতেন কিন্তু তুহিনরা আসছে বলে ওদের অপেক্ষায় রয়েছেন।

রাদিফ রাশেদ চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে তাকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“দেখলে তো আমি আমার ভালোবাসা পেয়েই ছাড়লাম। তুমি কিচ্ছুটি করে আমাদের আলাদা রাখতে পারলে না।”

রাশেদ চৌধুরী নিচু স্বরে বলেন,

“হুম। তোমাদের ভালোবাসার কাছে আমি ব্যার্থ।”

রাদিফ বাঁকা হেসে বলে উঠে,

“যাক যা হয় ভালোর জন্যই হয়। কথা বাড়াতে চাইছি না। আর হ্যা, আমার মানে এই বাড়ির ছেলের আর এই বাড়ির জামাইয়ের খিদে পেয়েছে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে যেনো খাবার উপরে আসে।”

এই বলে রাদিফ আবার মিষ্টিকে নিয়ে নিজের রুমে চলে যায়।

রাজ আর রাহা দুজনেই শুয়ে আছে। রাহা রাজের বুকে মুখ লুকিয়ে শুয়ে আছে। ঘুমায়নি। রাজ হাত বাড়িয়ে ফোন নিয়ে রাদিফের পাঠানো ছবিটা দেখা মাত্রই রাহাকে ডেকে বলে,

“এই উঠো তো, দেখো কি দিয়েছে রাদিফ!”

রাহা পট করে মাথা উঠিয়ে বসে। রাজও বসে। এরপরে ছবিটা রাহাকে দেখায়। রাহা ছবিটা দেখে খুশিতে কথা বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। প্রায় লাফাতে থাকে। বিছানায় থেকে নেমে লাইট জ্বালিয়ে আবার রাজের কাছে এসে জোরে করে বলে উঠে,

“ইশ কি যে খুশি লাগছে। খুশিতে কি যে করতে ইচ্ছে করছে!”

রাহা খুশিতে রাজের গালে চুমু খেয়ে, রাজকে জড়িয়ে ধরে বলে,

“ভাইয়া অবশেষে বিয়ে করেছে মিষ্টিকে। জানো খুব খুব খুশি হয়েছি।”

রাহা এই বলে সাথে সাথে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে,

“চলো, সাইমন ভাইয়াকে আর মেইডকে বলে আসি। তাড়াতাড়ি চলো!”

রাজ নেমে যায় রাহার সাথে। রাহা খুশিতে প্রায় নাচতে নাচতে যাচ্ছে। রাজ ওকে ধরে বোঝানোর কণ্ঠে বলে,

“আস্তে আস্তে হাটো। তুমি কি ভুলে যাচ্ছো তোমার মাঝে আরও একজন আছে। এভাবে হাঁটতে গিয়ে যদি পড়ে যাও তখন ও ব্যাথা পাবে তো।”

রাহা রাজকে ধরে দোপাটি দাঁত বের করে হেসে বলে,

“আসলে খুশিতে মনেই ছিলো না। আর অমন করে হাটবো না। চলো!”

_____________

রাদিফ মিষ্টিকে নিয়ে রুমে আসে। মিষ্টি বিছানায় বসে। রাদিফ আয়নার সামনে গিয়ে নিজেকে দেখতে দেখতে মিষ্টিকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠে,

“খেয়েছিস?”

“না!”

“খাসনি কেনো? তোকে খেতে দেয়নি কেউ?”

“দিয়েছিলো। ইচ্ছে হয়নি খাইনি!”

_______________

রাদিফ আর মিষ্টি চলে যাওয়ার পরই রাশেদ চৌধুরী সায়মা চৌধুরীকে বলেন,

“তুমি আর ভাবি মিলে রাদিফের জন্য খাবার নিয়ে যাও! আর রুবেল তু্ই রাদিফের বন্ধুগুলোর খাওয়ার ব্যবস্থা কর!”

রুবেল চৌধুরী রাদিফের বন্ধুদের ডেকে সাথে নিয়ে চলে যায়।

সায়মা চৌধুরীও রাশেদ চৌধুরীর কথায় সম্মতি জানিয়ে রুমানা চৌধুরীকে নিয়ে চলে যান। রাদিফের জন্য খাবার নিয়ে উপরে আসে দুজনই। দুজনই যে কতটা খুশি হয়েছে বলার বাহিরে।

তারা দুজনেই রাদিফের রুমে ঢুকে। মিষ্টি বিছানায় বসে ছিলো। রাদিফ তখন ওয়াশরুমে ছিলো। দুজনে খাবার সোফার টি-টেবিলে রেখে মিষ্টির কাছে আসে। সায়মা চৌধুরী মেয়ের মাথায় হাত রেখে কান্নাজরিত কণ্ঠে বলে উঠেন,

“আল্লাহ তোদের আবার এক করেছে। দোয়া করি, তোরা যেনো ভালো থাকিস।”

রুমানা চৌধুরীও কান্নামাখা গলায় বলে উঠেন,

“ভাবতেই পারিনি ও এই ভাবে ফিরে এসে তোকে বিয়ে করবে।”

সায়মা চৌধুরী মিষ্টির হাত ধরে বলেন,

“ওর আজ রাগ উঠে আছে। ও যা বলে তাই করিস। মিলেমিশে থাকিস। আমরা এখন যাই! এই রুমানা চল!”

“হুম চলো ভাবি। ওদের নিজেদের মতো থাকতে দাও।”

দুজনে চলে গেলেন। রাদিফ ওয়াশরুম থেকে বের হলো। ব্লেজার খুলে ওয়াশরুমে গিয়েছিলো। এখন শুধু কালো টি-শার্ট আর কালো প্যান্ট পড়া রয়েছে। মিষ্টি একধ্যানে রাদিফের দিকে তাকিয়ে আছে। এই বেশে এত্ত সুন্দর লাগছে রাদিফকে যে চোখ ফেরানো মুশকিল মিষ্টির কাছে।

রাদিফ টাওয়াল রেখে মিষ্টির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,

“আমাকে দেখা বাদ দিয়ে চুপচাপ খেয়ে নে!”

মিষ্টি চোখ নামিয়ে নিয়ে বলে,

“তুমি আগে খেয়ে নাও। তারপর খাবো!”

রাদিফ বাকা হেসে বলে,

“বাব্বাহ, এখন থেকেই আমাকে মেনে চলা শুরু করেছিস। খুবই ভালো।”

মিষ্টি নাক-মুখ কুচকে বলে উঠে,

“মানে?”

“আমার এতো কিছু বলার সময় নেই। খিদে পেয়েছে।”

রাদিফ খেতে বসে পড়ে। সেই এয়ারপোর্টে থেকে বেরিয়েছে, এরপরে শুধু বিয়েটাকে আটকানোর জন্য কত কিছু করে যাচ্ছে। রাদিফের খাওয়া শেষ হওয়ার পরে উঠে দাঁড়ায়। হাত ধুতে আবার ওয়াশরুমে ঢুকে। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসে টিস্যু দিয়ে হাত মুছে। বিছানায় থেকে ব্লেজার নিয়ে পড়ে নেয়। এরপরে মিষ্টির দিকে তাকিয়ে বলে,

“রুমের দরজা ভিতরে থেকে লাগিয়ে চুপচাপ খেয়ে নে। আর হ্যা, আমি ছাড়া অন্য কেউ এলে দরজা খুলবি না। মাথায় থাকে যেনো!”

মিষ্টি উঠে দাড়িয়ে বলে,

“ঠিক আছে।”

রাদিফ ফোনটা বিছানায় রেখেই চলে যায়। মিষ্টি রুমের দরজা লাগিয়ে খেতে বসে পড়ে। বিয়ের চিন্তায়, রাদিফের চিন্তায় খাওয়াই ভুলে গিয়েছিলো। এখন আর ওর কোনো চিন্তা নেই। রাদিফকেউ পেয়ে গিয়েছে। আবার তার সাথে বিয়েও হয়ে গিয়েছে।

রাদিফ নিচে নেমে আসে। এরপরে এগিয়ে এসে সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসে। রাশেদ চৌধুরী ওর একটু দূরেই বসে ছিলো। তিনি রাদিফকে দেখে মাথা নত করে বসে রইলেন।

রাদিফ আয়েসি ভঙ্গিতে বসে রইলো। আশেপাশের কেউ ওকে কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না।

এদিকে খাওয়ার প্যান্ডেল বলতে ছাদে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে বসে বিয়ের খাবার খাচ্ছে রাদিফের বন্ধুরা। আলিফ খেতে খেতে আফসোসের সুরে বলে,

“বন্ধুর বিয়েতে খাচ্ছি। ইশ, কত পরিশ্রম করে এই খাওয়া। সাইমন থাকলে কি যে ভালো লাগতো। মিস করে গেলো।”

সাজিদ বলে,

“সাইমন নেই তো কি হয়েছে ওর ভাগের গুলো আমরা খাবো।”

দুজনের কথার মধ্যে রুবেল চৌধুরী আসলেন। তিনি তিনজনকে উদ্দেশ্য করেই বলে উঠেন,

“তোমাদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো?”

সাজিদ মাথা নাড়িয়ে বলে উঠে,

“না না আঙ্কেল কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।”

রুবেল চৌধুরী হাই তুলে একটা লোককে ডাক দিলেন। এরপরে সেই লোকটাকে বলেন,

“ওদের যা যা লাগে দাও! আর ওদের খাওয়ার যেনো কোনো ত্রুটি না রাখো।”

“ঠিক আছে ভাইজান। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আমি আছি এখানে।”

রুবেল চৌধুরী চলে গেলেন। আর সাথে সাথে লোকটা ওদের বলে উঠে,

“তোমাদের কিছু লাগবে?”

সাজিদ বলে উঠে,

“হুম, লাগবে। এইযে দেখুন প্লেটে মাংস নেই, রোস্ট নেই।”

লোকটা “এক্ষুনি নিয়ে আসছি” বলে সাথে সাথে চলে গেলো।

সোহাগ সাজিদকে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলে,

“তু্ই কি বলছিস, চেয়ে চেয়ে খাবি!”

সাজিদ আস্তে করে ধমক দিয়ে বলে,

“চুপচাপ খেয়ে যা এতো কথা বলিস কেনো? এমনিতেই সকালে থেকে এইটা-সেইটা করেই যাচ্ছি। খাবো না তো কি করবো। আর তোরা তো বিয়ে করে খাওয়াবি না। রাদিফের বেলায় যখন সুযোগ পেয়েছি তাহলে হাতছাড়া করবো কেনো?”

বলতে সেই লোকটা সাথে আরও একটা লোক আসে। দুজনের দুহাতে পোলাও, রোস্ট, মাংস আরও খাবার।

খাওয়ার মাঝে আলিফ বলে উঠে,

“তোরা কি রোহানের কথা ভুলে গিয়েছিস। বেচারাও তো আমাদের সাথে ছিলো। ইশ, সাইমনের মতো ওউ মিস করে গেলো।”

সোহাগ বলে,

“তোর বেচারার কাজ শেষ হয়নি। হলে দেখবি চলে আসবে।”

সাজিদ ফোন বের করে তিনজনে মিলে একটা ছবি তুলে। সেই ছবিটা স্টোরি দেয়। বাম হাতে ক্যাপশন লিখে—-বন্ধুর বিয়ের দাওয়াত খাওয়া ডান!!

__________

হঠাৎ চৌধুরী বাড়িতে বরবেশে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে তুহিন। পেছনে সোহেল শিকদার আর নয়ন। রাত হওয়ার কারণে তুহিনের চাচারা চলে গিয়েছেন। আর থাকবেনই বা কেনো!

তখন ড্রইং রুমে ছিলো রাশেদ চৌধুরী, রুবেল চৌধুরী, আর রাদিফ। আর কেউ নেই। রাদিফের কথায় সবাই নিজেদের রুমে চলে গিয়েছেন।

তুহিন, সোহেল শিকদার আর নয়ন ড্রইং রুমে সেই রায়হান নামের ছেলেকে দেখতে পেয়ে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো। এই ছেলেই ওদের ভুল জায়গায় রেখে গাড়ির চাকা পাংচার করে দিয়ে এসেছে।

সোহেল শিকদার রাগী কণ্ঠে রাদিফকে বলেন,

“এই ছেলে তুমি এখানে কি করছো? আর রাশেদ জানিস এই ছেলেই আমাদের ওইখানে রেখে এসেছিলো।”

রাশেদ চৌধুরী ও রুবেল চৌধুরী একটুও অবাক হলেন না। তারা জানতেন এটা রাদিফের কাজ।

সোহেল শিকদার রাদিফের দিকে তাকিয়ে বলেন,

“কি দরকার ছিলো তোমার এসব করার? আর রাশেদ ও এই বাড়িতে কি করে? আর তু্ই কিছু বলছিস না কেনো?”

রাদিফ চোয়ালে শক্ত করে বসে রইলো। রাশেদ চৌধুরী বলেন,

“ও এই বাড়ির ছেলে। ও রুবেলের একমাত্র ছেলে রাদিফ। ওকে কি বলবো?”

সোহেল শিকদার কপালে ভাজ ফেলে বলেন,

“কি বলছিস ও রুবেল ভাইয়ের ছেলে। তাহলে ও আমাদের সাথে এমন করলো কেনো? কতটা সময় পেরিয়ে গেলো বিয়ের। নিশ্চই সবাই এমনকি কাজীও চলে গিয়েছে?”

রাশেদ চৌধুরী ইতস্তত নিয়ে বলেন,

“হুম। কাজী বিয়ে পড়িয়ে চলে গিয়েছে। ।”

তুহিন এগিয়ে এসে বলে,

“আপনার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। ওর বিয়ে আমার সাথে হওয়ার কথা ছিলো। আমি এইখানে। তাহলে কার সাথে বিয়ে পড়িয়ে চলে গিয়েছে?”

রাশেদ চৌধুরী রাদিফের দিকে একনজর তাকিয়ে সোহেল শিকদারকে বলেন,

“রাদিফ আমার মেয়েকে ভালো বাসতো। আমি ওদের আলাদা করে দিয়েছিলাম। এরপরে রাদিফ আজ ফিরে এসে তোদের সাথে এমন করেছে। আর রাদিফের সাথেই মিষ্টির বিয়ে দিয়ে দিয়েছি।”

সোহেল শিকদার সাথে সাথে বলেন,

“কি বলছিস এগুলো?”

রাশেদ চৌধুরী নিচু গলায় বলেন,

“বন্ধু তু্ই মাথা ঠান্ডা কর! আমাকে বলতে দে, ওদের বিয়ে দেওয়া ছাড়া আমার হাতে আর কোনো পথ ছিলো না। ওরা দুজন দুজনকে ভালোবাসতো। ওদের আলাদা করেছিলাম ঠিকই কিন্তু ওদের ভালোবাসার কাছে আমি ব্যার্থ। ভেবে দেখ, মিষ্টি আর তুহিনের বিয়ে হতো ঠিকই কিন্তু মিষ্টি রাদিফকে মন থেকে সরিয়ে কোনো দিনও তুহিনকে মেনে নিতো না আর মেনে নিয়েও সুখে থাকতে পারতো না এমন কি তুহিনও সুখে থাকতে পারতো না। আর রাদিফও সুখে থাকতে পারতো না। তাই ওদের তিনটা জীবন নষ্ট হওয়ার মতো ভুল থেকে আগেই ভুলটা শুধড়িয়ে নিয়ে রাদিফ আর মিষ্টিকে এক করে দিয়েছি। আর তুহিন বাবা, তুমি আমায় মাফ করে দাও। তবে তোমার জীবন নষ্ট হওয়ার থেকে তোমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছি।”

রাশেদ চৌধুরী ও রুবেল চৌধুরী সোহেল শিকদারকে বোঝালেন। তিনি প্রথমে রাগ করে ছিলেন ঠিকই কিন্তু পরে আর রাগ করে থাকতে পারলেন না। তিনি একদিকে বেশ নরম মনের মানুষ। তিনি সবটা বুঝতে পেরে বলেন,

“যাক আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে। ভালো থাকুক মিষ্টি রাদিফের কাছে। আল্লাহ ওদের কষ্টের পরে সুখ দিক!”

এর মাঝে বাড়িতে ঢুকলো রাদিফের বন্ধু রোহান। রাদিফের লাগেজ নিয়ে এসেছে। ওকে দেখে সোহেল শিকদার, তুহিন আর নয়ন চমকে উঠলো। এই ছেলে ছিলো ওদের গাড়ির ড্রাইভার। দুইদিন আগে এই রোহান অনেক আকুতি-মিনুতি করে ড্রাইভারের কাজ নিয়েছিলো।

সোহেল শিকদার বলে,

“তুমি না তোমার বউয়ের ডেলিভারি হবে বলে চলে গেলে?”

রোহান বাঁকা হেসে বলে,

“কি যে বলেন আঙ্কেল! আপনি এতো কিছু দেখার পরও বুঝতে পারেননি কথাগুলো মিথ্যে ছিলো। আর আমি এখনও বিয়েই করিনি।”

সোহেল শিকদার এগিয়ে আসেন রাদিফের দিকে। রাদিফ বসা থেকে উঠে দাড়ালো। সোহেল শিকদার রাদিফের কাধে হাত রেখে বলেন,

“তোমার বুদ্ধির প্রশংসা করতে হয়। অনেক অনেক ভালো থাকো। আর মিষ্টিকেউ ভালো রেখো। ও কিন্তু আমারও মেয়ে। ওর অযত্ন করো না।”

রাদিফ স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে,

“হুম, রাখবো। দোয়া করবেন।”

“অবশ্যই। সবসময় করবো।”

সোহেল শিকদার এগিয়ে এসে রাশেদ চৌধুরীকে বলেন,

“বন্ধু আজ তাহলে আসি। তু্ই ভাবিস না এই ঘটনার পরে তোকে ভুল বুঝবো। তু্ই আমার বন্ধুই থাকবি।”

সোহেল শিকদার চলে যাওয়ার জন্য হাঁটা দিলেন। নয়নও সাথে গেলো। তুহিন ফিরে এসে রাদিফের সামনে দাড়ালো। রাদিফ তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বসলো। রাদিফের বসে পড়াতে তুহিন একটু অপমানবোধ করলো। তুহিন হালকা ঝুকে রাদিফকে বলে,

“আজ যা করলি, আমার বাবা বিষয়টা নিয়ে মনে হয়না আর কিছুই বলবে। এই বলে ভাবিস না যে আমি তোকে ছেড়ে বলে আমিও তোকে ছেড়ে দিবো। তোকে আমি দেখে নিবো।”

রাদিফ দাঁতে দাঁত চেপে নিজের রিভলবার বের করে। পাশে থেকে রুবেল চৌধুরী ইশারা করে চুপ থাকতে বলে। রাদিফ দাঁত চেপে তুহিনকে বলে,

“দেখতে এসে আবার নিজের প্রাণ হারাসনা।”

তুহিন মাথা নাড়িয়ে বলে,

“চ্যালেঞ্জ!”

রাদিফ শক্ত কণ্ঠে বলে,

“একসেপ্টেড!”

বাহিরে থেকে সোহেল শিকদার তুহিনকে ডেকে উঠে। তুহিন আর কিছু না বলে সোজা চলে গেলো।

রাদিফ রাগে ফুসছে। তুহিন হাতের কাছে থেকে চলে যাওয়ায় আজ ছাড়া পেয়ে গেলো। কিন্তু এরপরে রাদিফ ওকে ধরবেই। রাদিফ কথা গুলো ভাবতে ভাবতে যেনো আরও রাগ উঠছে। ইচ্ছে করছে চোখের সামনে সবাইকে ধুমধাম করে গুলি করতে। রাশেদ চৌধুরী আর রুবেল চৌধুরী দুজনেই বুঝতে পারেন এই ছেলের রাগ উঠে গেছে। রাশেদ চৌধুরী সাহস নিয়ে এগিয়ে এসে রাদিফকে বলেন রুমে গিয়ে শুয়ে পড়তে, অনেক রাত হয়েছে।

রাদিফ কোনো উত্তর না দিয়ে উঠে হনহন করে চলে গেলো। মিষ্টি বসে থাকতে থাকতে মাত্র ঘুমিয়ে পড়েছে। রাদিফ এসে দুইবার নক করেছে। ওর থেকে উত্তর না পেয়ে একটু জোরে বলে,

“এই দরজা খোল!”

রাদিফের ডাকে মিষ্টির কাঁচা ঘুমটা ভেঙে যায়। সাথে সাথে দরজা খুলে দেয়। রাদিফ রুমে ঢুকে। মিষ্টি তৎক্ষণাৎ রাদিফকে বলে,

“আমি একটু নিজের রুমে যাচ্ছি। ড্রেস চেঞ্জ করে আসছি!”

রাদিফের মেজাজ এমনেই তিরিক্ষে তার মধ্যে আবার এই কথা। রাদিফ চোখ পাকিয়ে তাকায় মিষ্টির দিকে। আর দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বলে,

“আমাকে কি পরপুরুষ মনে হয় তোর! এখানে চেঞ্জ করলে আমি দেখে নিবো আর তাতে তোর মান-সম্মান চাঙ্গে উঠে যাবে? নিজের রুমে থেকে ড্রেস নিয়ে এই রুমে আসবি। আজ দেখবো তোর মান-সম্মান কোথায় যায়!”

চলবে….

পাঠক মহল,, আপনাদের কাছে এই পর্বটা কেমন লাগলো জানাবেন।……পরবর্তী পর্ব কালকে সন্ধ্যায় আসবে। অন্য কোনো সময় আসবে না।

ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। আর এই পার্টটা ভালো লাগলে রেসপন্স করবেন!!!!!!

[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here