#চোরাবালির_পিছুটানে (২২)
#জেরিন_আক্তার
মিষ্টি নাক-মুখ খিচে বন্ধ করে বলে উঠে,
“ছিহ, কি বলে!”
রাদিফ চোখ বন্ধ করে কর্কশ গলায় বলে,
“এই সময় নষ্ট করা বাদ দিয়ে যা নিজের রুমে থেকে ড্রেস নিয়ে আয়। আর শোন, এখন ড্রেস নিয়ে এসে যদি আবার বলিস অন্য একটা জিনিস আনতে যাবি তখনি মার খাবি। এমনিতেই মেজাজ খারাপ। যা যা জিনিস লাগবে সব নিয়ে আয়!”
মিষ্টি মুখ ভেঙচি কেটে বলে,
“যাচ্ছি!”
মিষ্টি চলে গেলো। রাদিফ নিজের লাগেজ খুলে জামাকাপড় বের করে কাভার্ডে তুলে রাখলো। মিনিট দশেক পরে মিষ্টি রুমে এলো। একটা ওড়নায় করে সব জিনিসপত্র বেধে নিয়ে এসেছে। সেগুলো বিছানায় রেখে ওড়নার গিট খুললো। শাড়ি, থ্রি-পিস, স্নো, পাউডার যা যা লাগে সবই নিয়ে এসেছে।
রাদিফ টি-শার্ট, টাউজার আর টাওয়াল নিয়ে ওয়াশরুমে যেতে যেতে বলে,
“তোর জিনিস গুলো কাভার্ডে তুলে রাখ। আমি শাওয়ার নিয়ে আসছি!”
মিষ্টি সাথে সাথে রাদিফের দিকে এগিয়ে এসে বলে উঠে,
“তুমি এই শীতের মধ্যে এখন শাওয়ার নিতে যাবে!”
রাদিফ ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা না লাগিয়ে মিষ্টির দিকে তাকিয়ে বলে,
“না, তোর বাপকে বল! আমার বদলে শাওয়ার নিতে!”
এই বলে সাথে সাথে ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিলো। মিষ্টি বিড়বিড় করে বকতে লাগলো। সবসময় বাপ তুলে কথা বলে। শয়তান একটা।
মিষ্টি নিজের জামাকাপড় তুলে রাখলো কাভার্ডে। রাদিফের কাপড়-চোপড়ের থেকে অন্য থাকে নিজের কাপড়-চোপড় রাখলো। বলা তো যায় না আবার এই নিয়ে রাদিফের রাগ উঠে যাবে। মিষ্টি হাতে একসেট থ্রি-পিস নিয়ে বিছানায় বসে রইলো। রাদিফ বের হলেই চেঞ্জ করতে ঢুকবে।
এর কিছুক্ষন পরেই মিষ্টির দুই বান্ধবী ফিমা আর রিমু আসে। ওরা দুজনে মিষ্টির কাছে এসে দাঁড়ায়। রিমু হেসে হেসে বলে,
“কিরে নতুন দুলাভাই কই রে? উনার সাথে একটু পরিচিত হই!”
মিষ্টি মনে মনে বলে,,, হাহ আসছে পরিচিত হতে। সাপের লেজে সইচ্ছায় পা দিতে এসেছে।
ফিমা বলে,
“কিরে দুলাভাই পালিয়ে গিয়েছে নাকি আমাদের ভয়ে?”
রাদিফ ওয়াশরুম থেকে বের হতে হতে বাকা হেসে বলে,
“উফস ভুল বলে ফেললে? কে পালাবে তোমাদের ভয়ে?”
ফিমা আর রিমু দুজনেই কেমন চুপ হয়ে গেলো। রাদিফ চুল মুছতে মুছতে খোঁচা মেরে বলে,
“তোমাদের ভয়ে তো মনে হয় একটা তেলাপোকাও পালাবে না। আর এই রাদিফ পালাবে? হাউ ফানি!”
মিষ্টি মনে মনে বলে,,, হয়েই গেলো! ওর কিছু বলার আগে এই দুটোকে বের করে দিতে হবে।
মিষ্টি উঠে দাড়িয়ে ফিমা আর রিমুকে বলে,
“এই তোরা যা তো! পরে কথা বলবি, যা এখন!”
মিষ্টি জোরপূর্বক ফিমা আর রিমুকে বের করে দিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয়।
রাদিফ চুল মুছে টাওয়াল বিছানায় ছুড়ে মারে। মিষ্টি দরজার কাছে থেকে এগিয়ে আসে। রাদিফ মিষ্টির হাতে থ্রি-পিস দেখে বলে,
“তু্ই কি এখন থ্রি-পিস পড়বি?”
“হুম!”
রাদিফ মিষ্টির হাতে থেকে ছো মেরে কেড়ে নিয়ে বলে,
“তোর ড্রেসচেঞ্জ করতে হবে না। তু্ই এভাবেই থাক!”
রাদিফ ড্রেসটা নিয়ে কাভার্ডে রাখে। এরপরে বিছানায় এসে শুয়ে পড়ে। মিষ্টি হাবার মতো তাকিয়ে আছে রাদিফের দিকে। এরপরে খানিকটা সাহস নিয়ে বলে,
“তুমি তো আগে এমন রাগী ছিলে না। আর এখন কথায় কথায় ছ্যাত করে উঠো কেনো? নতুন বউকে মিষ্টি করে কথা বলতে পারো না।”
রাদিফ উঠে বসে বাজখাই গলায় বলে,
“শয়তানের বাচ্চার সাহস কত বড়, আমার ওপর দিয়ে কথা বলিস! তোর বাপও আমার ওপরে কথা বলতে পারেনি আজ। আর তু্ই বলিস আমি কথায় কথায় ছ্যাত করে উঠি। বেশ করি ছ্যাত করে উঠি। যখন নরম ছিলাম তখন তো তোর বাপ নিজের মতো যা পারে তাই করে গিয়েছে। এখন শুধু দেখবি আমি কি জিনিস!”
মিষ্টি বিড়বিড় করে বকতে লাগলো। রাদিফ কথাগুলো বলে আবার শুয়ে পড়লো। এর একটু পরে রাদিফ নিজের ফোনটা মিষ্টির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,
“আমার ফোনটা চার্জ দে! চার্জার দেখ আমার ব্যাগে।”
মিষ্টি ফোনটা নিয়ে রাদিফের ব্যাগ থেকে চার্জার বের করে চার্জ দেয়। এরপরে বিছানায় বসে থাকে। রাদিফ গম্ভীর গলায় বলে,
“বসে আছিস কেনো শুয়ে পড়!”
“আমি এভাবে শোবো?”
“কেনো আমার পাশে শুলে মান চলে যাবে?”
“আমি তা বলিনি! বলেছি এই লেহেঙ্গা পড়ে শোবো!”
“তাহলে কি পড়ে শুতে চাস তু্ই? নাইটি!”
মিষ্টি মিনমিন করে বলে,
“না, মানে বলছিলাম থ্রী-পিস হলে হবে! নাইটি পড়তে চাই না।”
রাদিফ উঠে বসে আবারও। এরপরে মিষ্টির দিকে তাকিয়ে বলে,
“ইচ্ছে করছে তোকে মেরে ফেলি। একটু আগে বিয়ে হয়েছে, কই শাড়ির পড়ার কথা বলবি তা না! কিসব পড়ার কথা বলছিস!”
মিষ্টি এবার বুঝতে পারছে রাদিফ কি বোঝাতে চেয়েছে। মিষ্টি রাদিফকে বলে,
“ঠিক আছে শাড়িই পড়বো।”
মিষ্টি চলে যায়। শাড়ি বের করে ওয়াশরুমে ঢুকে যায়। এইটা আগে বললেই হতো যে শাড়ি পড়িস। এতো বকাঝকা করার কি দরকার ছিলো। মিষ্টিকে তার মা বলে গিয়েছে চুপচাপ থাকতে নাহলে কখন রাদিফকে বকে উঠতো।
রাদিফ পুনরায় আবার শুয়ে পড়ে। বিড়বিড় করে বলে,,, এমনিতেই মেজাজ ভালো নেই। তার মধ্যে এই মহারানীর কথা। মেজাজ খারাপ বলে কই একটু কাছে এসে ভালো করে কথা বলবে তা না! ওই দশ হাত দূরে থেকে কথা বলবে। যা করা উচিত তা করবে না। মাথা গরম হওয়ার মতো কাজ ঠিকই করবে। শুধু এখানে শুয়ে দেখ! দেখবি কি করি!
মিষ্টি ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। কাঁচা হলুদ রঙের শাড়ি পড়েছে। গায়ের রঙের সাথে প্রায় মিলে গিয়েছে। মিষ্টি এগিয়ে এসে রাদিফের ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ায়। টুল টেনে বসে চুলের খোপা খুলে
তে থাকে। অনেক গুলো গোলাপ গুজে দিয়েছিলো। সেগুলোও একটা একটা করে খুলে রাখে। এরপরে চুলগুলো ভালো করে আচড়িয়ে বিনুনি করে নেয়।
রাদিফ মিষ্টিকে দেখছে। মিষ্টি সেটা হয়তো খেয়াল করেনি। রাদিফ যেভাবে তাকিয়ে ছিলো মিষ্টি যদি দেখতো তাহলে অন্তত একটু মুচকি হেসে উঠতো।
মিষ্টি উঠে বিছানায় এসে শুয়ে পড়ে। রাদিফ উঠে বসে। মিষ্টিও বসে। রাদিফ মিষ্টির দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক ভাবে বলে,
“পানি খাবো!”
মিষ্টি হাত বাড়িয়ে বিছানার সাইড টেবিলে থেকে পানির গ্লাসটা এনে রাদিফকে দেয়। রাদিফ অল্প একটু খেয়ে গ্লাসটা দিয়ে দেয়। মিষ্টি গ্লাসটা রেখে আবারও শুয়ে পড়ে। রাদিফ আবারও মিষ্টিকে বলে,
“আমার ফোনটা এনে দে!”
“মাত্র না চার্জ দিলে!”
“তবুও নিয়ে আয়!”
মিষ্টি উঠে বিছানায় থেকে নেমে ফোনটা এনে দেয়। এরপরে শুয়ে পড়ে। রাদিফ আবার বলে উঠে,
“চার্জার টা নিয়ে আয়!”
মিষ্টি কপাল কুঁচকে বলে উঠে,
“চার্জার দিয়ে কি করবে?”
“ফোন সাইড টেবিলের কাছে চার্জ দিবো!”
“নিয়ে আসছি!”
মিষ্টি চার্জার এনে রাদিফকে দেয়। মিষ্টি যেই শুয়ে পড়তে যাবে ঠিক তখনই রাদিফ ফোন আর চার্জার মিষ্টির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে উঠে,
“ফোনটা চার্জ দে!”
মিষ্টি রাদিফের দিকে তাকিয়ে লম্বা শ্বাস ছেড়ে বলে,
“দিচ্ছি!”
মিষ্টি ফোন চার্জ দিয়ে শুয়ে পড়তে পড়তে ঠিক করে আবার যদি কিছু আনতে বলে তাহলে রাদিফকে দিয়েই আনাবে সে উঠবে না।
রাদিফ শুয়ে পড়ে। কমফোর্টার এর অর্ধেকের বেশি রাদিফ নিয়ে নেয়। যাতে মিষ্টি একটু কাছে আসে। মিষ্টি রাদিফকে ঘেঁষা শুলো। মিনিট পাঁচেক এভাবেই কথা ছাড়া গেলো। এরপরে রাদিফ হুট্ করে মিষ্টির উপরে উঠে মিষ্টির গলায় মুখ গুজে। রাদিফের আচমকা এই কাজে মিষ্টি খানিকটা ঘাবড়ে যায়। রাদিফের গরম শ্বাস মিষ্টি অনুভব করতেই কেঁপে উঠে। নতুন একটা অনুভূতি। মিষ্টি কিছু বলার জন্য মুখ খুললে রাদিফ নেশালো কণ্ঠে বলে উঠে,
“কথা বলিস না। আজ তু্ই শুধু আমার। আমিও আজ তোর!”
___________
ভোরবেলা রাদিফের ঘুম ভাঙতেই সামনে চোখে পড়লো মিষ্টিকে। আয়নার সামনে দাড়িয়ে ভেজা চুলগুলো মুছছে। রাদিফ মিষ্টিকে দেখতে দেখতে উঠে বসলো। মিষ্টি আয়নায় রাদিফকে দেখে মুচকি হেসে চুল মুছতে লাগলো। রাদিফ বিছানায় থেকে নেমে চলে যায় ওয়াশরুমে।
মিনিট বিশেক পরে ওয়াশরুম থেকে বের হয় শুধু এক টাওয়াল পড়ে। চুল থেকে টুপ্ টুপ্ করে পানি পড়ছে। রাদিফ কাভার্ড থেকে সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট বের করে পড়তে থাকে। মিষ্টি অন্যদিকে তাকিয়ে রইলো। লজ্জা লাগছে।
রাদিফ জামাকাপড় পড়ে রুম থেকে বের হয়ে যায়। মিষ্টি পেছনে থেকে ডেকে উঠে,
“কোথায় যাচ্ছো?”
“কাজ আছে!”
রাদিফ চলে যায়। মিষ্টি রাদিফের যাওয়ার পানে তাকিয়ে মুচকি হেসে উঠে। কারন রাতের পরে আর রেগে যায়নি। স্বাভাবিকই রয়েছে।
বেলা ৯ টা,,,
রাদিফ বাড়ি ফিরে আসে। ড্রইং রুমে দাড়িয়ে দেখে মিষ্টি কিচেনে। রাদিফ মিষ্টির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠে,
“মিষ্টি রুমে আয় তো, কাজ আছে!”
মিষ্টি কিচেনে থেকে বেরিয়ে আসে। রাদিফের পেছনে পেছনে হাঁটা দেয়। দুজনে রুমে আসে। রাদিফ রুমের দরজা লাগিয়ে দিয়ে মিষ্টির সামনে দাড়িয়ে বলে,
“পানি নিয়ে আয়!”
মিষ্টি তৎক্ষণাৎ পানির গ্লাসটা নিয়ে এসে রাদিফের সামনে ধরে। রাদিফ পকেটে থেকে কিছু একটা বের করে বলে,
“এই ওষুধটা খেয়ে নে!”
মিষ্টি ওষুদের পাতাটা হাতে নিতে নিতে বলে,
“কিসের ওষুধ!”
মিষ্টি ওষুদের নাম দেখতেই পরক্ষনে বুঝে উঠে কিসের ওষুধ। মিষ্টি রাদিফের দিকে তাকিয়ে ভিত কণ্ঠে বলে,
“খাবো?”
“হুম, খেয়ে নে!”
মিষ্টি চুপচাপ ওষুধটা খেয়ে নেয়। রাদিফ মিষ্টির সামনে থেকে চলে যায় দরজার কাছে। দরজা খুলে দাড়িয়ে যায়। এরপরে মিষ্টির দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলে,
“আমি এখনই বাচ্চা-কাচ্চার জন্য প্রস্তুত নই। আর আমি এখন যা চাইনা সেটা আশা করি তু্ইও চাইবি না। তু্ই একজন মেয়ে তু্ই এগুলো কি করে এবোইট করতে হয় তু্ই ভালো করেই জানবি। না জানলেও জেনে নেওয়ার উপায়ও আমি জানি।”
এই বলে রাদিফ তপ্ত শ্বাস ফেলে বলে,
“বছর দুই অন্তত যাক। এরপরে আমি নিজেই চেয়ে নিবো!”
মিষ্টি রাদিফের কথা গুলো শুনে প্রথমে মন খারাপ করলেও শেষের কথাটা ‘চেয়ে নিবো’ শুনে মুচকি হেসে বলে,
“ঠিক আছে। তুমি যা চাও তাই হবে!”
“হুম, এটাই যেনো মাথায় থাকে।”
“হুম, থাকবে।”
রাদিফ নিচে চলে আসে। ড্রইং রুমে পা রাখতেই দেখে রাশেদ চৌধুরীকে ঘিরে সবাই বসে আছে। রাদিফ এগিয়ে গিয়ে তার মাকে বলে,
“মা কি হয়েছে?”
রুমানা চৌধুরী চিন্তিত কণ্ঠে বলে উঠেন,
“দেখ না, একটু আগে অফিসের ম্যানেজার কল দিয়ে বলে যে আজ নাকি আমাদের অফিস-কোম্পানি নিলামে উঠবে!”
চলবে….
পরবর্তী পর্ব কালকে আসবে। সন্ধ্যার পরে।
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। আর এই পার্টটা ভালো লাগলে রেসপন্স করবেন!!!!!!
[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]

