#চোরাবালির_পিছুটানে (৩৪)
#জেরিন_আক্তার
মিষ্টি রাদিফের লাগেজ থেকে পারফিউম টা বের উঠে দাড়িয়ে রাদিফের সামনে ধরে। রাদিফ পারফিউমটা গায়ে লাগিয়ে চলে যায় রুম থেকে। মিষ্টি রুমের দরজা চাপিয়ে দিয়ে বিছানায় এসে শুয়ে পড়ে। এই সেই ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়েও পড়ে।
রাত তিনটার সময় রাদিফ আর সাইমন ফিরে আসে বাড়িতে। দুজনে অনেকটাই টায়ার্ড থাকায় যে যার রুমে চলে যায়। রাদিফ এসে দেখে মিষ্টি ঘুমিয়ে আছে। তখন স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে নিজেও মিষ্টিকে ঘেঁষে শুয়ে পড়ে।
সকালে রাদিফের ঘুম ভাঙতেই মিষ্টিকে কাছে পায় না। রুমেও নেই। রাদিফ এই মেয়েকে বুঝতে পারে না কখন কি করে। সকালে একটু তার পাশে শুয়ে থাকলে কি এমন ক্ষতি হবে।
রাদিফ বিছানায় থেকে নেমে ওয়াশরুমে চলে যায়। ফ্রেশ হয়ে এসে সামনে চোখে পড়ে লাগেজ গুলো। রাদিফ কালকে তো বলেছিলো সে জামাকাপড় গুলো গুছিয়ে রাখবে কিন্তু এখন তার গোছানোর কোনো মুডই নেই। এখন মিষ্টি রুমে নেই সেই ফাঁকে রাদিফ কাভার্ড খুলে নিজের রিভলবারগুলো ও কিছু ডকুমেন্টস গুলো আলাদা একটা ড্রয়ারে লক করে রাখে এবং সেই ড্রয়ারের চাবি বিছানার পাশে ল্যাম্প লাইটের ভিতরে লুকিয়ে রাখে। এরপরে রাদিফ রুম থেকে বেরিয়ে যায় মিষ্টির উদ্দেশ্যে।
মিষ্টি কিচেনে ঢুকে রাদিফের জন্য রান্না করছে। মেইড বারণ করেছিলো। কিন্তু মিষ্টি তা শুনেনি। মেইডকে অন্য একটা কাজ দিয়ে নিজে রান্না করছে।
রাদিফ চুপচাপ কিচেনে এসে মিষ্টিকে পেছনে থেকে জড়িয়ে ধরে। হুট্ করে জড়িয়ে ধরাতে মিষ্টি চমকে উঠে। রাদিফ জড়ানো গলায় বলে,
“এই জন্যই বলি বউ আমার পাশে নেই কেনো? এখন এসে দেখি কাজে ব্যাস্ত।”
মিষ্টি পেছনে ফিরে রাদিফের হাতে কফির মগ দিয়ে বলে,
“মাত্রই কফিটা নিয়ে উপরে যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু তুমিই তো চলে এসেছো। যাক ভালোই হলো। আর আমারও তো ইচ্ছে করে তোমাকে রান্না-বান্না করে খাওয়াতে। আগে তো আম্মুরা রান্নাঘরে ঢুকতেই দিতো না। আর এখন তো কোনো বাঁধা নেই।”
রাদিফ গ্যাস বন্ধ করে মিষ্টির হাত ধরে টেনে নিয়ে বলে,
“বাধা নেই মানে? পা ভেঙে রেখে দিবো। চল আমার সাথে!”
“ক কি কোথায় যাবো?”
“রুমে!”
“কিন্তু কেনো?”
“চল গেলেই দেখতে পাবি।”
রাদিফ মেইডকে ডেকে কিচেনে যেতে বলে মিষ্টিকে নিয়ে রুমে চলে গেলো। এরপরে মিষ্টিকে কাভার্ডের কাছে দাঁড় করিয়ে বলে,
“জামাকাপড় গুলো গুছিয়ে ফেল। তোর আর কাজ নেই।”
মিষ্টি কোমরে হাত রেখে বলে,
“তুমি না রাতে বললে নিজে গুছিয়ে রাখবে এখন আমাকে বলছো কেনো?”
“আমি অফিসে যাবো। নাহলে তো গুছিয়েই রাখতাম।”
মিষ্টি মিন মিন করে বকতে বকতে জামাকাপড় গোছাতে শুরু করে। রাদিফও কিছু বলে না এতে।
মিষ্টির সবকিছু গোছানো শেষ হলে রাদিফ মিষ্টিকে ডাকে। ব্যালকনি তে রাদিফ। মিষ্টিও সেখানে যায়। রাদিফ মিষ্টির দিকে একটা ফোন এগিয়ে দেয়। এরপরে বলে,
“ফোনটা কালকে রাতে তোর জন্য কিনে এনেছি। ঘুমিয়ে ছিলি বলে জাগাইনি। আর ফোনটা নিজের কাছে রাখিস। আমি কল দিলে ধরিস।”
“ঠিক আছে।”
মিষ্টি নতুন ফোনটা উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে দেখতে দেখতে মশকরা করে বলে,
“ভাবতেই পারিনি তুমি আমাকে ফোনের মুখটা দেখাবে। সেদিন যেভাবে রাগ দেখালে ভেবেছি এই জন্মে হয়তো ফোন দেখতে পারবো না।”
রাদিফ বলে,
“দেখতেই তো পেতেন না। আমি জীবনেও ফোন কিনে দিতাম না। শুধু আপনার আর আমাদের সন্তানের খোঁজ নেওয়ার জন্য কিনে দিলাম। আর শোনেন, আমি যখন ফ্রি হবো তখনই কল দিবো। তাই ফোনটা নিজের কাছেই রাখবেন।”
“ঠিক আছে, রাখবো। আর অফিসে থেকে কখন ফিরবে?”
“সন্ধ্যায়!”
“ঠিক আছে।”
রাদিফ রেডি হয়ে চলে যায় অফিসে। মিষ্টি নিচে এসে মেইডের কাছে এসে কথা বলে, টুকটাক কাজ করে। মেইড কাজ শেষে মিষ্টিকে পুরো বাড়িটা ঘুরে দেখায়। এমনকি বাগানটাও ঘুরে দেখায়। মিষ্টি বাগানে কিছুক্ষন বসে থাকে।
________________
রাদিফ সন্ধ্যার পরে বাড়ি ফিরে। মিষ্টি তখন বিছানায় শুয়ে ছিলো। রাদিফ আসতেই সে নিচে ড্রইং রুমে আসে। রাদিফের জন্য সযত্নে খাবার রেডি করতে থাকে। রাদিফ ফ্রেশ হয়ে নিচে নামে। সাইমন নিচে আসে না। ঠিক করে পরে গিয়ে খেয়ে নিবে। আর দুজন স্বামী-স্ত্রীর মাঝে তার যাওয়া মোটেও ভালো দেখাবে না।
রাদিফ খাওয়া শেষ করে আবারও রুমে ফিরে আসে। অফিসের একটা প্রজেক্ট রেডি করতে হবে। তাই ব্যাস্ত হয়ে পড়ে সেটা নিয়ে।
মিষ্টিও একেবারে রাতের খাবার খেয়ে উপরে চলে আসে। নিচে আর দরকার নেই।
রাদিফ বিছানায় হেলান দিয়ে বসে কাজ করছে। মিষ্টি তার পাশেই ঘেঁষে শুয়ে আছে। রাত দশটার পরে রাদিফ ফ্রি হয়। মিষ্টিও জেগে আছে। রাদিফ ল্যাপটপ, ফাইল সব ওয়ারড্রপের উপরে রেখে বিছানায় এসে শুয়ে পড়ে। এরপরে মিষ্টিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে, মিষ্টির বুকে মুখ গুজে মিষ্টিকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকে। মিষ্টি রাদিফের মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে বলে,
“রাদিফ জানো আমার না নিজেকে অনেক ভাগ্যবতী মনে হয়। আমি তোমার সাথে অনেক অনেক হ্যাপি আছি। আল্লাহ আমাকে তোমার মতো একজন যত্নবান জীবনসঙ্গী দিয়েছে। আল্লাহর কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া।”
রাদিফ মুচকি হেসে বলে,
“হঠাৎ এমন কথা বলছিস?”
মিষ্টি বলে,
“জানো আজ ফোনটা পেয়ে আমার বান্ধবীকে কল দিয়েছিলাম। সে বললো আমাদের আরেক বান্ধবী নাকি রিলেশন করে বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে করেছে। সবকিছু ঠিকঠাক চলছিলো। এরপরে নাকি আমার ওই বান্ধবীর হাসব্যান্ড রাতে নেশা করে আসতো। এমনকি আমার বান্ধবীর গায়ে প্রতিদিন হাতও তুলে। তাই বলছিলাম সেই হিসেবে তুমি আমাকে অনেক ভালো রেখেছো। সবার মতো না তুমি। মাঝে মধ্যে আমার ভুলেই দুই-একটা থাপ্পড় খেয়েছি। তবে সেখানে ভালোবাসার শাসন পেয়েছি। ওই বান্ধবীর জন্য খারাপ লাগছে। ওর হাসব্যান্ডই বা কেমন, ভালোবেসে বিয়ে করে এখন মাতাল হয়ে গায়ে হাত তুলে। আর তুমি তো নেশাও করো না। টুকটাক সিগারেট খাও তবে সেটা নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই।”
রাদিফ মিষ্টির কথা শুনে কিছুক্ষন থম মেরে রইলো। মিষ্টি তাকে এতটা বিশ্বাস করে ভেবেই রাদিফ চুপ হয়ে যায়। মিষ্টি রাদিফের থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে বলে উঠে,
“তুমি কি ঘুমিয়ে গিয়েছো?”
“না, শুনছি তু্ই বল!”
“কি বুঝলে এতে?”
“বুঝলাম শুধু স্বামী হলেই হয়না। যত্নশীল হতে হয়। প্রিয় মানুষটার সাথে টাইম স্পেন্ড করতে হয়। তার মন বুঝতে হয় তাকে ভালোবেসে সবটা দিয়ে আগলে রাখতে হয়।”
মিষ্টি রাদিফকে জড়িয়ে ধরে বলে,
“হুম ঠিক বলেছো। এর সবগুলো আমি তোমার থেকে পেয়েছি। এখনও পাচ্ছি। আর এভাবে আমাকে আর আমাদের বাবুকে আগলে রেখো।”
রাদিফ মুচকি হেসে মিষ্টির তলপেটে হাত রেখে বলে,
“নিজের জীবনের শেষটুকু দিয়ে হলেও তোদের আগলে রাখবো।”
এর একটু পরেই রাদিফ থমথমে গলায় প্রশ্ন করে,
“মিষ্টি তু্ই আমাকে অনেক বিশ্বাস করিস তাইনা?”
“হুম। অনেক অনেক অনেক বিশ্বাস করি।”
রাদিফ কিছু একটা ভেবে বলে,
“কখনও সেই বিশ্বাস ভেঙে গেলে কি করবি?”
মিষ্টি সোজা গলায় বলে,
“তুমি ভাঙার মতো কাজই করবে না। আর যদি করো তাহলে সেদিন আর নিজেকে রাখবো না।”
রাদিফ ধমকের সুরে বলে,
“চুপ! কি আজেবাজে কথা বলছিস? আমাকে ছেড়ে যাওয়ার ধান্দা করছিস?”
মিষ্টি মিনিট দুই চুপ থেকে জড়ানো গলায় বলে,
“আমি তোমায় অনেক বিশ্বাস করি। তুমি বিশ্বাস ভাঙার মতো কাজ করবে এটা কোনোদিন বিশ্বাস করবো না।”
রাদিফ কিছু বলে না। মিষ্টিও কিছু বলে না। দুজনেই চুপচাপ দুজনাকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
আজ সকালবেলা মিষ্টির আগেই রাদিফের ঘুম ভাঙে। মিষ্টির থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে বসে। রাতের মিষ্টির বলা কথাগুলো ভাবতে থাকে। ভাবতে ভাবতে বিছানায় থেকে নেমে ওয়াশরুমে চলে যায়। ফ্রেশ হয়ে এসে রুমের দরজা খুলে নিচে চলে আসে। ড্রইং রুমে এসে মেইডকে বলে কফি দিতে। মেইড রাদিফের জন্য কফি বানিয়ে দেয়।
রাদিফ কফি খেতে খেতে ভাবে,,, মিষ্টি তাকে অনেক বিশ্বাস করে। তার বিশ্বাস ভাঙা মোটেও ভালো কাজ হবে না। দুজনের এই সিক্রেট বিজনেসের কথা মিষ্টি জানতে পারলে, মিষ্টি অনেকটা কষ্ট পাবে। ভেঙে পড়বে। রাদিফের প্রতি তার এই অঘাত বিশ্বাসটা আর থাকবে না। আর মিষ্টি নিজেকে শেষ করে দেবে। তাছাড়া এখন মিষ্টি প্রেগন্যান্ট। রাদিফ আর মিষ্টির সন্তান আসবে। এখন রাদিফের এই বিজনেসটা বাদ দেওয়া উচিত। এখানে মিষ্টি থাকাকালীন আজ হোক আর কাল মিষ্টি জানবেই। তখন মিষ্টি খুব কষ্ট পাবে। তার এই বিজনেসটা বাদ দিতেই হবে। বিশেষ করে মিষ্টিকে ভালো রাখতে এটা তার করতেই হবে। আর তাছাড়া জব করার পরও তো রাদিফের সিক্রেট বিজনেস করার কোনো প্রশ্নই উঠে না তবুও একসময়ে জড়িয়ে পড়েছিলো এটার সাথে। এখন জব করাই বেটার।
এর মাঝে সাইমন এসে রাদিফকে ডাক দেয়,
“ভাই তু্ই কি শুধু কফি খেয়েই অফিসে চলে যাবি? ব্রেকফাস্ট করে নে! পরে দেরি হবে।”
রাদিফ উঠে দাঁড়ায়। এরপরে ডাইনিং টেবিলে এসে বসে ব্রেকফাস্ট করে নেয়। দুজনে রেডি হওয়ার জন্য উপরে চলে যায়। রাদিফ নিজের রুমে এসে দেখে মিষ্টি বিছানা গোছাচ্ছে। রাদিফ পেছনে থেকে মিষ্টিকে জড়িয়ে ধরে। মিষ্টি মুচকি হেসে বলে,
“আমাকে এভাবে ধরে থাকলে তোমার অফিসে কিন্তু লেট্ হয়ে যাবে!”
রাদিফ মিষ্টির গালে চুমু খেয়ে ছেড়ে দিয়ে বলে,
“যদি পারতাম বউকে সারাদিন এভাবে জড়িয়ে ধরে থাকতে। কি যে ভালো হতো!”
মিষ্টি রাদিফের বুকে চাপড় মেরে বলে,
“হুম, থাকবে। অফিসে থেকে এসে যত ইচ্ছে তত জড়িয়ে ধরে থাকবে।”
________________
সন্ধ্যায় রাদিফ আর সাইমন একসাথে বাড়ি ফিরছে।রাদিফ রাতে মিষ্টির কথা শোনার পর থেকে এখন পর্যন্ত গুমোট বেধে আছে। বারবার মিষ্টির কথাগুলো কানে বাজছে। সাইমন রাদিফকে অন্যমনস্ক হতে দেখে বলে,
“কিরে তোর আবার কি হলো। সকাল থেকে দেখছি বেশি কথা বলছিস না।”
কই! কথা তো বলছিই!”
“তবুও তোকে কেমন যেনো লাগছে। বিশেষ করে কিছু ভাবছিস নাকি?”
“হুম ভাবছি! আচ্ছা শোন, আমাদের যে বড় ডিল ছিলো। সেটার ডেলিভারি কবে?”
“কালকে রাতে!”
“ঠিক আছে।”
রাদিফ কিছুক্ষন আবারও মিষ্টির কথাগুলো ভেবে বলে,
“সাইমন কালকের ডিলটাই শেষ। আর এসবে জড়াবো না।”
সাইমন পানি খাচ্ছিলো। রাদিফের কথাগুলো শুনে বিষম খেয়ে উঠে। নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
“কি বললি আবার বল!”
“কেনো কানে শুনিসনি?”
“শুনেছি। কিন্তু হঠাৎ এসব বাদ দেওয়ার কথা বলছিস কেনো? মিষ্টি এসেছে বলে?”
“হুম।”
সাইমন সিটে হেলান দিয়ে বলে,
“ঠিক আছে। তোর যা ইচ্ছে। অবশ্য আমাদের ওগুলো না করলেও তো টাকা-পয়সার অভাব হবে না। অফিসই এনাফ।”
রাদিফ বলে,
“হুম।”
“তাহলে আমাদের কালকের ডেলিভারিই শেষ তাইনা!”
“হুম।”
“যাক অফিসে থেকে এসে নিশ্চিন্তে শুয়ে, বসে থাকতে পারবো দুজনে। রাত-বিরেতে হুটহাট করে বের হতে হবে না।”
এই শুনে রাদিফ হেসে বলে,
“তা ঠিক আছে। তবে কালকের ডেলিভারি শেষে মিষ্টির জন্য একটা সারপ্রাইস এরেঞ্জ করবো।”
চলবে….
পরবর্তী পর্ব কালকে সন্ধ্যায় আসবে। ইনশাআল্লাহ।
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। আর এই পার্টটা ভালো লাগলে রেসপন্স করবেন!!!!!!
[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]

