#চোরাবালির_পিছুটানে (৩৩)
#জেরিন_আক্তার
রাদিফ রুমে এসে দেখে মিষ্টি ব্যালকনিতে বসে আছে। হয়তো কিছু নিয়ে ভাবছে। রাদিফ মিষ্টির দিকে এগিয়ে গেলো। মিষ্টি রাদিফকে পাশে বসতে বললো। রাদিফ বসলো। মিষ্টি রাদিফের কাঁধে মাথা রাখে। রাদিফ ধীর কণ্ঠে বলে উঠে,
“কিছু নিয়ে চিন্তা করছিস নাকি?”
“হুম!”
“কি নিয়ে?”
“তোমার সাথে জাপানে যাওয়ার সব কিছু তো রেডি কিন্তু এই অবস্থায় যাবো কি করে?”
রাদিফ হেসে বলে,
“রাহাও তো প্রেগন্যান্ট ছিলো। ওউ তো ওই অবস্থায় জাপানে ঘুরে এলো। আর তু্ই চিন্তা করছিস? আমি আছি তো! নাহলে তু্ই থাক, আমি জোরও করবো না যেতে।”
মিষ্টি রাদিফের হাত শক্ত করে ধরে বলে,
“না, আমি যাবো তোমার সাথে। তোমাকে ছাড়া থাকবো না।”
দুজনে কথা বলতে শুরু করলো। এমন সময় রুমে এলো রাহা। রাহা রুমে থেকেই মিষ্টিকে ডাকলো,
“মিষ্টি আপু, কই তুমি?”
দুজনে ব্যালকনি থেকে রুমের ভিতরে চলে এলো। রাহা রাদিফের দিকে তাকিয়ে বলে,
“ভাইয়া তোমাকে বাবা ডাকছে। রেডি হয়ে নিচে যেতে বলেছে।”
রাদিফ কাভার্ড থেকে শার্ট-প্যান্ট বের করে ওয়াশরুমে চলে যায়। রাহা মিষ্টিকে জড়িয়ে ধরে বলে,
“আপু, কংগ্রাচুলেশন! জানো কত খুশি হয়েছি!”
মিষ্টি হেসে বলে,
“তাই!”
“হুম। খুব খুব খুশি হয়েছি। বলার বাহিরে।”
“পাগলী কোথাকার!”
“আপু তুমি তো এখনও খাওনি, নিচে চলো খাবে!”
“পরে খেয়ে নিবো। এখন নিচে বাবা-ছোট আব্বু আছে। ওরা বেরিয়ে যাক এরপরে নিচে যাবো।”
“বড় আব্বু, আর বাবা এক্ষুনি চলে যাবে! চলো তুমি।”
রাদিফ ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে চুল ঠিক করে, পারফিউম গায়ে দিয়ে রেডি হলো। এরপরে দরজার দিকে যেতে যেতে বলে উঠে,
“তোদের দুজনের কিছু লাগবে?”
রাহা মাথা নাড়িয়ে বলে,
“না! আমার কিছু লাগবে না।”
“আর মিষ্টি তোর?”
“না কিছু লাগবে না।”
“ঠিক আছে। পরে কিছু লাগলে কল দিস!”
_____________
এর কিছুদিন পরেই রাদিফ আর মিষ্টির জাপানে যাওয়ার ডেট হয়। দুজনেই প্রস্তুতি নিয়ে নিয়েছে যাওয়ার জন্য। সব রেডি। বাড়ির কেউ তেমন কোনো বাধা দেয়নি ওদের যাওয়া নিয়ে।
রাদিফ আর মিষ্টি জাপানে চলে আসে। এয়ারপোর্টে সিফাত আর সাইমন ফুলের বুকে হাতে নিয়ে দাড়িয়ে আছে ওদের অপেক্ষায়। রাদিফ আর মিষ্টিকে দেখেই সাইমন আর সিফাত ফুলের বুকে দুটো দুজনের দিকে এগিয়ে দেয়। সিফাত রাদিফের সাথে কোলাকুলি করতে করতে বলে,
“ভাই শেষমেশ বউ নিয়ে এলি!”
সাইমন মিষ্টিকে বলে,
“ভাবি ভালো আছেন?”
“হ্যা, ভালো। আপনি কেমন আছেন?”
“ভালো।”
কুশল বিনিময় শেষে সবাই পার্কিং জোনে চলে এলো। সিফাত এয়ারপোর্টে থেকে অন্য জায়গায় যাবে বলে নিজের গাড়িই নিয়ে এসেছে। আর তাছাড়াও এক গাড়িতে যাওয়াটা বেমানান। তাই সিফাত আর সাইমন দুজনে দুটো গাড়ি নিয়ে এসেছে।
সিফাত রাদিফ সাইমন আর মিষ্টির থেকে বিদায় নিয়ে নিজের গাড়ি নিয়ে চলে গেলো। সাইমন গাড়িতে উঠতে উঠতে বলে,
“আমি ড্রাইভ করছি। তোরা বস!”
রাদিফ বলে,
“দে আমি করি!”
“না ভাই, তু্ই চুপচাপ বউ নিয়ে বসে থাক!”
রাদিফ আর মিষ্টি গাড়ির ব্যাক সিটে বসে আর সাইমন ড্রাইভিং সিটে। সাইমন, রাদিফ আর মিষ্টি তিনজনেই টুকটাক কথা বলতে থাকলো। সাইমন কথার মাঝে মিষ্টিকে আপনি করে সম্ভোধন করছে যার জন্য মিষ্টির একটু ইতস্তত লাগছে। কারণ এর আগে সাইমনের সাথে যতবার কথা হয়েছে বা দেখা হয়েছে ততবারই সাইমন মিষ্টিকে তুমি করে বলছে। আর এখন বন্ধুর বউ বলে আপনি করে বলছে। মিষ্টি রাদিককে হালকা চিমটি কেটে কাছে ডেকে ফিসফিস করে বলে,
“সাইমন ভাইয়া আমাকে আপনি করে বলছে কেনো? আগে না তুমি করে বলতো। তুমি করে বলতে বলো!”
“যাহ, ও আমার বন্ধু হয়। আমি বললে কেমন দেখায় তু্ই বল!”
মিষ্টি রাদিফের হাতে হালকা চাপড় মারলো। কিছুক্ষন যাওয়ার পরে মিষ্টি নিজেই বলে উঠে,
“সাইমন ভাইয়া!”
“হুম। বলুন!”
“কি আপনি আপনি করে কথা বলছেন! আমার কেমন যেনো লাগছে। নিজেকে বড় বড় মনে হচ্ছে। আর আপনি না আগে আমাকে তুমি করে বলতেন। এখন তুমি করেই বলবেন।”
সাইমন পেছনে ফিরে বলে,
“সত্যি বলতে আমারও আপনি করে বলতে কেমন যেনো লাগছে। তবুও বন্ধুর বউ বলে বললাম। আর তুমিই বেটার।”
“হুম তুমি করেই বলবেন।”
রাদিফ মিষ্টিকে নিয়ে বাড়িতে ঢুকতেই মেইড সদর দরজার সামনে ফুল নিয়ে দাড়িয়ে আছে। তিনি মিষ্টিকে দেখার সাথে সাথে ফুলের বুকে দিয়ে বলেন,
“ওয়েলকাম ম্যাডাম!”
“থ্যাংক ইউ!”
মেইড মিষ্টিকে নিয়ে ভিতরে ঢুকলো। রাদিফ যেই পা বাড়াবে ঠিক তখন সাইমন রাদিফকে টেনে ধরে বলে,
“ভাই, আন্টিকে দেখেছিস। আমরা কতবার দেশে থেকে এসেছি। তিনি কিন্তু আমাদের জন্য কোনো ফুল-টুল এনে দেয়নি। আর আজকে দেখ তোর বউকে দেখে কি সুন্দর ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানালো।”
রাদিফ বলে,
“তু্ইও বিয়ে করে বউ নিয়ে আয়, দেখবি তোর বউকেউ ফুল দিবে।”
রাদিফ ভিতরে ঢুকবে ঠিক তখন আবার সাইমন টেনে ধরে রাদিফকে। এরপরে রাদিফকে নিয়ে যেতে যেতে বলে,
“বাগানে চল! কথা আছে!”
দুজনে বাগানে চলে এলো। রাদিফ সাইমনের সাথে হাঁটতে হাঁটতে বলে,
“কি বলবি বল!”
“ভাই সামনে বড় একটা ডিল আছে। সেটা মনে হয় রায়ান বাঁধা দিবে। ওর মতিগতি ঠিক লাগছে না।”
“কি বলছিস?”
“হুম। দুইদিন আগে দেখা হয়েছিলো। ভালো-মন্দ জিজ্ঞাসা করলো। যখন শুনলো তু্ই আসবি তখন থেকে কেমন ক্ষেপে আছে। প্রকাশ করছে না তবুও বোঝা যাচ্ছে।”
“তু্ই চিন্তা করিস না। আমি দেখছি!”
“চিন্তা আমাদের নিয়ে না চিন্তা ওই রায়ানকে নিয়ে। ওর তো বদ অভ্যাস হুটহাট বাড়িতে চলে আসে। আর এখন মিষ্টি আছে।”
রাদিফ ভাবুক গলায় বলে,
“হুম। এখন তো মিষ্টি আছে। আরও রিস্ক। তবে ওই শালা এরপরে এলে একবারে উপরে পাঠিয়ে দিবো। শালা ভন্ড।”
রাদিফ আর সাইমন কথা শেষ করে বাড়িতে ঢুকলো। সাইমন সোজা উপরে চলে যায়। মিষ্টি মেইডের সাথে কথা বলছে। এইটুকু সময়ের মধ্যে দুজনেই ভালোই পরিচিত হয়েছে। মিষ্টি তাকে বলে দিয়েছে সে যেনো আপনি করে না বলেন, তুমি করে বলে। আর মায়ের বয়সী মানুষের থেকে কি করে আপনি আপনি করে কথা শুনবে।
রাদিফ বুঝতে পারে মিষ্টি সবার আপনি করে কথা বলাতে বেশ ইতস্তত। এখন রাদিফও ঠিক করে যদি মিষ্টির সাথে আপনি করে কথা বলে একটু জ্বালাতে। রাদিফ মিষ্টির কাছে এসে বলে,
“তাহলে মিষ্টি রানী চলুন। অনেক জার্নি করে এসেছেন রেস্ট নিবেন। আর আন্টি আপনি খাবার রেডি করুন!”
মিষ্টি চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে বিড় বিড় করে বলে,
“চলুন যাওয়া যাক!”
রাদিফ মিষ্টিকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে আসে। রাদিফ নিজের রুমে আগে না ঢুকে মিষ্টিকে বলে উঠে,
“আপনি আগে যান!”
মিষ্টি রুমের দরজা ধাক্কা দিয়ে ভিতরে ঢুকে হতভম্ব হয়ে গেলো। রুমটা এতো সুন্দর করে ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে যা দেখে মিষ্টি খুশি হয়ে উঠে। মিষ্টি পুরো রুম জুড়ে গুটিগুটি পায়ে হেটে বেড়ালো। রাদিফ মিষ্টির দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
মিষ্টি খুশি হয়ে রাদিফের কাছে এসে বলে,
“দেখেছো কি সুন্দর করে সাজিয়েছে।”
রাদিফ মিষ্টির দিকে তাকিয়ে গভীর গলায় বলে,
“তোর পছন্দ হয়েছে?”
“খুব পছন্দ হয়েছে।”
রাদিফ বিছানার কাছে যেতে যেতে বলে উঠে,
“তাহলে প্রতিদিনই সাজালে কেমন হয়?”
“কিহ?”
“এখানে আয়! বস!”
মিষ্টি রাদিফের কাছে এসে বসে। রাদিফ বলে,
“তোর যদি এইরকম রুম সাজানো ভালো লাগে তাহলে প্রতিদিনই সাজাবো।”
“কিন্তু আমি তো এমনি বলেছি।”
এই শুনে রাদিফ আয়েসি ভঙ্গিতে বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে বলে,
“কি একটা ভাগ্য দেখ! প্রথম বাসর করলাম ফুল ছাড়াই। আর এখন ফুল আছে কিন্তু বউকে কাছে ডাকতে পারবো না।”
মিষ্টি লজ্জায় মাথায় নুইয়ে ফেলে। যা দেখে রাদিফ ঠোঁট কামড়ে হাসে। নিয়ে এরপরে বিছানায় থেকে উঠে লাগেজের কাছে গেলো। এরপরে জামা-কাপড় বের করে ফ্রেশ হতে চলে গেলো। ড্রেস চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে আসে। রাদিফও ফ্রেশ হতে ঢুকে।
মিষ্টি এই ফাঁকে লাগেজের সব জিনিস কাভার্ডে রাখার জন্য কাভার্ড খুলতে যায়। কিন্তু লক থাকায় সেটা আর খুলতে পারে না। মিষ্টি ওয়াশরুমের কাছে এসে রাদিফকে বলে,
“এই শুনছো, কাপড়-চোপড় গুলো কাভার্ডে রাখবো চাবি কোথায়?”
রাদিফ শাওয়ার নিচ্ছিলো তাই শুনতে পায়নি। মিষ্টি পানি ছাড়ার শব্দ পেয়ে আর কিছু বলে না। মিনিট বিশেক পরে রাদিফ বের হয়ে আসে। এরপরে দুজনে খাবার খেতে নিচে চলে যায়।
রাতের দিকে মিষ্টি আর রাদিফ নিজেদের ঘরে ঢুকে। মিষ্টির চোখে পড়ে লাগেজগুলো। সাথে সাথে রাদিফকে বলে,
“রাদিফ কাভার্ডের চাবিটা দাও তো! জামাকাপড় গুলো উঠিয়ে রাখি।”
রাদিফ তালে তালে বলে উঠে,
“চাবি দেখ ওইযে বিছানার সাইড টেবিলে।”
মিষ্টি তৎক্ষণাৎ চাবিটা নিয়ে কাভার্ড খুলতে যায়। রাদিফ মিষ্টির দিকে তাকিয়ে সাথে সাথে একটু জোরেই বলে উঠে,
“ওইটা খুলিস না!”
মিষ্টি পেছনে ফিরে তাকিয়ে বলে,
“কেনো?”
রাদিফ এগিয়ে এসে মিষ্টির হাতে থেকে চাবিটা নিয়ে বলে,
“তু্ই গিয়ে শুয়ে পড়! ওগুলো আমি উঠিয়ে রাখবো।”
“কিন্তু তুমি পারবে না।”
“পারবো তু্ই গিয়ে শুয়ে পড়!”
মিষ্টি রাদিফের কথায় বিছানায় এসে বসে। রাদিফের কথায় কেমন একটা খটকা লাগছে। কোনো পার্সোনাল জিনিস রেখেছে নাকি যার জন্য চাবিটা নিয়ে নিলো।
মিষ্টি রাদিফকে দেখতে দেখতে শুয়ে পড়লো। রাদিফ লম্বা শ্বাস ফেলে চাবিটা নিয়ে চলে গেলো রুমের বাহিরে। দেখলো সাইমন রেডি হয়ে তার রুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। রাদিফ সাইমনকে পেছনে থেকে ডাক দিয়ে বলে,
“সাইমন একা যাচ্ছিস?”
সাইমন পেছনে ফিরে রাদিফকে দেখা বলে,
“হুম। আজকে ডেলিভারি একটা হোটেলে মালগুলো ডেলিভারি দিতে হবে।”
“আমি আসবো সাথে?”
“না ভাই, আজ ফিরলি তোর এখন রেস্টের প্রয়োজন আর মিষ্টিকে রেখে আজ বের হতে পারবি। আজ ওর কাছে থাক।”
রাদিফ দ্বিমত পোষণ করে বলে,
“কিচ্ছু হবে না। ও ঘুমিয়ে পড়বে।”
সাইমন আশেপাশে তাকিয়ে আস্তে করে বলে,
“ভাই তবুও মিষ্টি এসেছে তু্ই রাত বিরাতে বের হোস না। আমরা যে লুকিয়ে এলকোহলের বিজনেস করি। ও জানতে পারলে কষ্ট পাবে।”
রাদিফ গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলে,
“জানবে না। তু্ই নিচে যা আমি আসছি।”
রাদিফ রুমে এসে ঝটপট রেডি হতে থাকে। মিষ্টি রাদিফের এই সময়ে রেডি হওয়া দেখে বলে,
“এখন কোথায় যাচ্ছো?”
“কাজ আছে!”
“কি কাজ এতো রাতে? আর সাথে সাইমন ভাইয়া যাবে না?”
“হুম যাবে। ও রেডি হয়ে নিচে আছে।”
সাইমন সাথে যাচ্ছে বলে মিষ্টি রাদিফকে নিয়ে আর চিন্তা করলো না। মিনিট দুই পরে রাদিফ মিষ্টিকে বলে,
“মিষ্টি, একটা কাজ করে দিবি?”
“কি কাজ?”
“লাগেজ থেকে আমার পারফিউমটা বের করে দে তো।”
“দিচ্ছি।”
মিষ্টি বিছানায় থেকে নেমে রাদিফের লাগেজ থেকে পারফিউম খুঁজতে থাকে। খুঁজতে খুঁজতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। রাদিফ সেই সুযোগে কাভার্ড খুলে একটা রিভলবার বের করে কোমরে গুজে নেয়। মিষ্টি তখনও অন্য খেয়ালে। রাদিফ পুনরায় কাভার্ড লক করে চাবি পকেটে ভরে নেয়। বলা যায় রাদিফ ইচ্ছে করে মিষ্টিকে কাজের বাহানা দিয়ে রিভলবার নিলো।
চলবে….
দেরি করে দেওয়ার জন্য দুঃখিত। পরবর্তী পর্ব কালকে ঠিক সন্ধ্যায়ই আসবে। ইনশাআল্লাহ।
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। আর এই পার্টটা ভালো লাগলে রেসপন্স করবেন!!!!!!
[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]

