#চোরাবালির_পিছুটানে (৩২)—স্পেশাল পার্ট
#জেরিন_আক্তার
রুমানা চৌধুরী মিষ্টির কান্না দেখে নিজেকে ঠিক রাখতে পারলেন না। তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন। তিনি ভাবলেন,,, এই মেয়ে তো সহজে কাদে না। কি এমন হয়েছে যার জন্য কাদছে। রাদিফ কি কিছু বলেছে? কিন্তু ও তো মনে হয় বাড়িই ফিরেনি। ফিরলে তো টের পেতাম।
রুমানা চৌধুরী কথাগুলো ভেবে সাথে সাথে মিষ্টিকে সোজা করে চোখ-মুখ মুছে দিয়ে নরম গলায় বলেন,
“মিষ্টি, কিরে কি হয়েছে বল আমায়? শরীর খারাপ, নাকি রাদিফ কিছু বলেছে?”
মিষ্টি নাক টেনে বলে,
“না রাদিফ কিছু বলেনি।”
“তাহলে কাঁদছিস কেনো?”
মিষ্টি কাদতে কাদতে বলে,
“ছোট আম্মু অনেক বড় ভুল হয়ে গিয়েছে আমার!”
রুমানা চৌধুরী কপালে ভাজ এনে বলেন,
“ভুল! কি ভুল হয়ে গিয়েছে? আর একটুও কাদতে দেখলে মার খাবি। আমি তোর মা তো, আমাকে বল কি হয়েছে! আমার বড্ড চিন্তা হচ্ছে।”
মিষ্টি চোখ মুছে বলতে নিয়ে আবার কেঁদে উঠে। রুমানা চৌধুরী মিষ্টির কান্না দেখে বুঝতে পারলেন মেয়েটার সত্যি কিছু হয়েছে। রুমানা চৌধুরী বলেন,
“রাদিফের সাথে কিছু হয়েছে?”
মিষ্টি কেঁদে কেঁদে বলে,
“ছোট আম্মু, তোমার ছেলে আমাকে বলেছিলো সে এখনই বাচ্চা-কাচ্চা নিবে না। আমিও ওর কথা মতোই চলেছি। কিন্তু এর মাঝে কি করে কি হয়ে গেলো আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।”
এই বলে মিষ্টি একটা প্রেগনেন্সি কিট বের করে। কোমরে গুজে রেখেছিলো। প্রেগনেন্সি কিটটা রুমানা চৌধুরীকে দেখায়। রুমানা চৌধুরী কিটটা ভালো করে দেখে পরক্ষনেই খুশি হয়ে উঠেন।
এদিকে মিষ্টি কেঁদেই যাচ্ছে। রুমানা চৌধুরী মিষ্টিকে কিছু বলার আগেই মিষ্টি বলে উঠে,
“ছোট আম্মু আমি এখন কি করবো। বিশ্বাস করো আমি ইচ্ছে করে কিচ্ছু করিনি। রাদিফ শুরু থেকে যা যা বলেছে আমি তাই তাই করেছি। ওর কথামতো আমি ওর সাথে ডক্টরের কাছেও গিয়েছিলাম। এরপরে ডক্টরের কথামতোই চলছিলাম কিন্তু কি থেকে কি হয়ে গেলো ছোট আম্মু আমি কিচ্ছু বুঝতে পারিনি।”
রুমানা চৌধুরী মিষ্টির কথা শুনে অবাক হয়ে গেলেন। দুজনে ডক্টরের পরামর্শ নিয়েছে তা ঠিক আছে কিন্তু রাদিফ মিষ্টিকে এতো কড়া ভাবে রেখেছে যা শুনে তার সত্যিই খারাপ লাগছে।
রুমানা চৌধুরী হাত বাড়িয়ে পানির গ্লাস এনে মিষ্টিকে দিলেন। মিষ্টি গ্লাস টা হাতে নিয়ে পুরো পানি টুকুই খেয়ে খালি গ্লাসটা দিয়ে দিলো। অতঃপর রুমানা চৌধুরী খালি গ্লাসটা রেখে মিষ্টির দিকে তাকিয়ে হেসে বলেন,
“যা হয়েছে হয়েছেই। এখন রাদিফকে জানিয়ে দিবি। দেখবি ও বুঝতে পারবে।”
“না ছোট আম্মু ও আরও রেগে যাবে। তুমি তো ওর রাগ দেখোনি। ও আমাকে একবারে মেরে ফেলবে।”
রুমানা চৌধুরী মিষ্টির মাথায় হাত দিয়ে বলেন,
“কিচ্ছু বলবে না। আর ও যেমন রেগে যায় তার থেকে বেশি তো তোকেই ভালোবাসে।”
“কিন্তু ও তো চাইনি বাচ্চা। তবুও আল্লাহ দিয়েছে। এখন ওকে জানানোর মতো সাহস পাচ্ছি না আমি।”
“পাগলী কোথাকার, আমি রাদিফকে বলবো! ও ফিরেনি এখনও?”
“না!”
“দাড়া আমি কল দিচ্ছি ওকে!”
রুমানা চৌধুরী হাত বাড়িয়ে ফোন এনে রাদিফকে কল দিলেন। রাদিফ কল রিসিভ করতে বেশি সময় নিলো না।
“হ্যালো, রাদিফ কই তু্ই?”
“রাস্তায় আছি।”
“কতক্ষন লাগবে আসতে?”
“পনেরো মিনিট!”
“ঠিক আছে। আয়!”
রুমানা চৌধুরী ফোন রেখে মিষ্টিকে বলেন,
“রাদিফ আসছে। পনেরো মিনিটের মতো নাকি লাগবে।”
মিষ্টি রুমানা চৌধুরীকে ঘেঁষে বসে বলে,
“ছোট আম্মু আমি কিন্তু ওর সামনে যাবো না। আমি তোমার কাছেই থাকবো আজকে। তুমি ছোট আব্বুকে অন্য একটা রুমে নাহয় আমার রুমে গিয়ে থাকতে বলো।”
“ঠিক আছে। আগে রাদিফ আসুক দেখি কি বলে।”
রুমানা চৌধুরী মনে মনে বলেন,,, আমি তো রাদিফকে কিচ্ছু বলবো না। তোকে দিয়েই বলাবো। আমার মনে হচ্ছে রাদিফ অতো টাও রিএক্ট করবে না। শুধু শুধু ভয় পাচ্ছিস তু্ই।
রাদিফ বাড়িতে ফিরলো। গাড়ি পার্ক করে এসে বাড়ির সদর দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকলো। এরপরে দরজা লাগিয়ে দিয়ে ড্রইং রুমে এলো। সেখানে সোফায় বসে ছিলেন রুবেল চৌধুরী। রাদিফ তার বাবাকে বসে থাকতে দেখে বলেন,
“বাবা, জেগে আছো এখনও! ঘুমাওনি?”
“ঘুমাবো!”
“ওহ!”
রাদিফ উপরে চলে যায়। নিজের রুমে ঢুকে মিষ্টিকে দেখতে পায় না। ব্যালকনির দরজাও ভিতরে থেকে বন্ধ। সাথে ওয়াশরুমও। তাহলে মিষ্টি গেলো কোথায়? গল্প করতে গিয়েছে নাকি?
রাদিফ কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ওয়াশরুমে চলে যায় ফ্রেশ হতে। ফ্রেশ হয়ে রুমে এসে যখন দেখে মিষ্টি আসেনি তখন নিজেই রুম থেকে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু এর মধ্যে রুমানা চৌধুরী রাদিফের রুমে ঢুকে। রাদিফ তার মাকে দেখে বলে উঠে,
“মা,, মিষ্টি কোথায়?”
“আমার রুমে শুয়ে আছে!”
“তোমার রুমে! কিন্তু কেনো?”
“ওসব ছাড় তোকে যা বলতে এসেছি শোন!”
“কি বলো!”
রুমানা চৌধুরী ছেলের কাছে এসে দাঁড়ালেন। এরপরে ছেলের কাঁধে হাত রেখে শুধানো গলায় বলেন,
“দেখ, আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে। এতে আমাদের করার কিছুই থাকে না। যা হয়েছে হয়েছেই মিষ্টিকে বকিস না। ওউ তো এর জন্য দায়ী না।”
রাদিফ বুঝতে পারে না তার মা ঠিক কি বলছে। তাই সোজা গলায় বলে,
“মিষ্টিকে আমার রুমে পাঠিয়ে দাও!”
রুমানা চৌধুরী বলেন,
“আমি বললে আসবে না। তু্ই গিয়ে নিয়ে আয়। নাহয় ডাক দে! আমি গেলাম। আর ওকে কিন্তু বকিস না। আমি যেনো সকালে এসে না শুনি যে তু্ই বকেছিস।”
রাদিফ তার মায়ের সাথে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। মিষ্টি শুয়েই ছিলো। এর মাঝে রুমানা চৌধুরী ও রাদিফকে একসাথে রুমে ঢুকতে দেখে বিশেষ করে রাদিফকে দেখে ভয় পেয়ে যায়। রাদিফ সোজা মিষ্টির কাছে এসে দাড়িয়ে বলে,
“রুমে চল!”
মিষ্টি উঠে বসে। মনে মনে ভাবে,,, তার ছোট আম্মু হয়তো বলে দিয়েছে। রাদিফ হয়তো রাগ করেনি। তাই হয়তো নিয়ে যেতে এসেছে। কিন্তু রাদিফ শান্ত রয়েছে এটা ভাবাচ্ছে মিষ্টিকে। পরে যদি রুমে নিয়ে গিয়ে কিছু বলে তখন!!
রাদিফ মিষ্টির থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে আবারও বলে,
“তু্ই কি যাবি না?”
মিষ্টি নিচু গলায় বলে,
“আজ থাকি ছোট আম্মুর কাছে।”
রাদিফ কোনো কথা বাড়ালো না। মিষ্টিকে পাঁজা কোলে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। দুজনের সামনেই এসে দাঁড়ায় রুবেল চৌধুরী। তাকে দেখে মিষ্টি লজ্জায় রাদিফের বুকে মুখ লুকালো। রুবেল চৌধুরী দেখেও না দেখার ভান করে চলে এলেন নিজের রুমে। রুমানা চৌধুরী তখন শুয়ে পড়ছিলেন। রুবেল চৌধুরী রুমের দরজা লাগাতে লাগাতে বলেন,
“মিষ্টির কি হয়েছে আর রাদিফই বা কেনো ওকে এভাবে নিয়ে গেলো?”
রুমানা চৌধুরী হেসে বলেন,
“খুশির খবর আছে!”
রুবেল চৌধুরী বিছানায় এসে বলেন,
“কি খুশির খবর?”
“দাদা হবে তুমি।”
“কিহ!”
“হুম।”
রুবেল চৌধুরী সাথে সাথে আলহামদুলিল্লাহ বললেন। কি যে খুশি লাগছে তার বলার বাহিরে। তিনি রুমানা চৌধুরীকে বলেন,
“এতো খুশির খবর। তবে দুজনে ওভাবে চলে গেলো কেনো?”
“আমি শুরু থেকে বলছি,,মিষ্টি আছে ভয় পেয়ে যে, রাদিফকে বললে হয়তো রাগারাগি করবে। তাই বলেছিলাম যে রাদিফকে আমি বলবো। কিন্তু আমি তো বলিনি। শুধু বলেছি যা হয়েছে হয়েছেই। মিষ্টিকে যেনো না বকিস। এই শুনে তোমার ছেলে তার বউকে নিতে এসেছিলো। মিষ্টি বলছিলো সে আজ যাবে না। তাই তোমার ছেলে মিষ্টিকে ওভাবে নিয়ে গেলো।”
রুবেল চৌধুরী বলেন,
“ওসব ছাড়ো! এখন সবাইকে জানিয়ে আসি চলো!”
রুমানা চৌধুরী না হেসে পারলেন না। এরপরে বলে উঠেন,
“সকাল হতে দাও। তারপর জানাবো। এখন ঘুমাও!”
রাদিফ মিষ্টিকে রুমে এনে বিছানায় বসায়। এরপরে মিষ্টির পাশে বসে। মিষ্টি ভয়ে ভয়ে তাকায় রাদিফের দিকে। রাদিফ মিষ্টিকে ধরে বলে,
“মিষ্টি কি হয়েছে আমায় বল! আমি বকেছি কি? বকিনি তো তাহলে কি হয়েছে আমায় বল! মা বললো মিষ্টিকে বকিস না, যা হওয়ার হয়েছেই এর জন্য তু্ই নাকি দায়ী না। কি হয়েছে আমায় খুলে বল!”
মিষ্টির বুঝতে বাকি নেই তার ছোট আম্মু কিছুই বলেনি।মিষ্টি অসহায় হয়ে তাকালো রাদিফের দিকে। রাদিফ রেগে গেলো না। নরম হয়ে বলে উঠে,
“কিছু নিয়ে টেন্স?”
মিষ্টি না চাইতেও কান্না করে দেয়। রাদিফের কপালে চিন্তার ভাজ পড়লো। মিষ্টি তো সহজে কাদে না। কি এমন হয়েছে যার জন্য কাদছে।
মিষ্টি উঠে দাঁড়ায়। রাদিফও উঠে দাড়িয়ে মিষ্টির দুগালে হাত রেখে শুধায়,
“আমায় বলনা একবার কি হয়েছে? তোর চোখের পানি সহ্য হয়না আমার।”
মিষ্টি রাদিফের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে ভয় নিয়ে বলে,
“তু তুমি বাবা হবে। আমি কনসিভ করেছি।”
এই কথা শুনে রাদিফ নিশ্চুপ হয়ে যায়। মিষ্টি কাপা গলায় বলে,
“বিশ্বাস করো আমি বুঝতে পারিনি কি ক…..!”
মিষ্টির কথা শেষ হওয়ার আগেই রাদিফ ঠাস করে মিষ্টির গালে থাপ্পড় মারে। বাজখাই গলায় বলে উঠে,
“শয়তানের বাচ্চা এই একটা কথা বলতে এতো দেরি হয়!”
মিষ্টি রাদিফের এমন কথায় কেঁপে উঠে। সাথে সাথে কান্নার গতি বাড়তে থাকে। রাদিফ ধমকে উঠে,
“কাঁদছিস কেনো বকেছি আমি? চুপ কর!”
মিষ্টি মুখে হাত দিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করে। রাদিফ কোমরে হাত রেখে তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলে উঠে,
“অন্যের বউকে দেখি নিজের প্রেগনেন্সির কথা তার স্বামীকে কত সুন্দর করে বলে, সাথে সারপ্রাইস এরেঞ্জ করে। আর তোর এখানে কাঁদার কি আছে? মনে হচ্ছে আরও দুইটা থাপ্পড় মারি।”
মিষ্টি ভাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। কান্না থেমে যায়। এই রাদিফকে বুঝতে পারে না।
রাদিফ মিষ্টির দিকে তাকিয়ে বলে,
“নিচে চল! খিদে পেয়েছে!”
মিষ্টি নাক টেনে চোখ-মুখ মুছে চলে গেলো। রাদিফ মুখ টিপে হেসে রুম থেকে বের হয়। রাদিফ এসে টেবিলে বসে। মিষ্টি পুরো অন্যমনস্ক হয়ে আছে। রাদিফ মিষ্টির দিকে তাকিয়ে বলে,
“আমাকে কি প্লেট নিয়েই বসে থাকতে হবে?”
মিষ্টি রাদিফের দিকে তাকিয়ে খাবার বেড়ে দিতে থাকে। রাদিফের প্লেটে ভাত না দিয়ে তরকারি দিলো আগে। যা দেখে রাদিফের চক্ষু চড়ক গাছ। রাদিফ কিছু বলার আগেই মিষ্টি প্লেটের দিকে তাকায়। সাথে সাথে বলে উঠে,
“ওহ, ভুলে দিয়ে ফেলেছি।”
মিষ্টি আরেকটা প্লেট এনে আগে ভাত দেয়, এরপরে তরকারি দেয়। রাদিফ খেতে খেতে মিষ্টিকে বলে,
“এখনই ভুলে যাস আবার না জানি সন্তানের হাতে ফিডার দেওয়া বাদ দিয়ে ভুলে অন্য কিছু দিয়ে বসিস।”
মিষ্টি ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে রইলো।
রাদিফ খাওয়া শেষ করে উঠে দাড়িয়ে বলে,
“আমি বসছি তু্ই খেয়ে নে!”
মিষ্টি মাথা নাড়িয়ে টেবিলে বসে পড়ে। অল্প খাবার খেয়ে উঠে দাঁড়ায়। মিষ্টির উঠে দাঁড়ানো দেখেই রাদিফ বলে,
“রুমে যা। আমি আসছি বাহিরে থেকে।”
মিষ্টি সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেলো। রাদিফ ফোন বের করে সাজিদকে কল দেয়।
“এই সাজিদ তু্ই কোথায় রে?”
“বন্ধু আসছি।”
“তাড়াতাড়ি আয়, ভাই!”
“আর দশ মিনিট!”
রাদিফ ফোন রেখে ওয়েট করতে থাকে সাজিদের জন্য। পনেরো মিনিট পরে সাজিদ কল দেয়।
“এই বন্ধু আমি এসে গিয়েছি।”
“দাড়া আসছি!”
রাদিফ উঠে চলে যায় সদর দরজার কাছে। দরজা খুলে বাহিরে গেলো। সাজিদ বাইক নিয়ে দাড়িয়ে আছে। রাদিফ সাজিদের কাছে গিয়ে বলে,
“ফুল কই?”
সাজিদ লাল গোলাপের তোড়া টা রাদিফের হাতে দিয়ে বলে,
“বন্ধু ফুলের দোকান সব বন্ধ করে দিয়েছে। আর শেষে অনেক কষ্টে এইটা আনতে পেরেছি। এই নিয়েই খুশি থাক। কালকে এনে দিবো।”
রাদিফ হেসে বলে,
“কালকে আমি নিজেই আনতে পারবো। আর আজকের জন্য বন্ধু থ্যাংক ইউ। খুব উপকার করলি ভাই!”
সাজিদ হেলমেট পড়ে বলে,
“থাক তাহলে আজ আসি।”
সাজিদ চলে যায়। রাদিফ ফুল হাতে নিয়ে বাড়ির ভিতরে চলে আসে। সদর দরজা বন্ধ করে চলে যায় উপরে। নিজের রুমে এসে দেখে মিষ্টি সেখানে নেই। ওয়াশরুম থেকে পানির শব্দ আসছে। রাদিফ মিনিট পাঁচেক অপেক্ষা করলো, মিষ্টির বের হওয়ার নাম নেই।তাই ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে,
“তু্ই যদি না বের হোস তাহলে সারারাত ওয়াশরুমেই রাখবো কিন্তু!”
মিষ্টি চোখ-মুখে পানি দিয়ে মুছতে মুছতে বের হয়। কিন্তু রাদিফকে দেখতে পায় না। দরজার কাছে থেকে রাদিফ কড়া গলায় বলে উঠে,
“ছাদে চলে আয়! দেরি যেনো না হয়!”
মিষ্টি শীতের চাদর গায়ে দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। এরপরে ছাদে এসে দেখে রাদিফ উল্টো দিকে ফিরে দাড়িয়ে আছে। মিষ্টি এগিয়ে গিয়ে পেছন থেকে রাদিফকে জড়িয়ে ধরে। রাদিফ মুচকি হেসে পেছনে ফিরে। সেদিনের মতো মিষ্টির থেকে চাদর নিয়ে রাদিফ বেতের চেয়ারে বসে। রাদিফের কিছু বলার আগেই মিষ্টি রাদিফের কোলে বসে জড়িয়ে ধরে। রাদিফ চাদরের বাকি অংশটুকু দিয়ে মিষ্টিকে ঢেকে নেয়। এরপরে রাদিফ জড়ানো গলায় বলে,
“তু্ই কি ভেবেছিস আমি বাচ্চার কথা শুনে রাগ করবো! না, একদম না। আমি কয়েকদিন ধরে তোকে লক্ষ করছিলাম। বুঝেও গিয়েছিলাম। তবে তোর মুখ থেকে শোনার অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু তু্ই কি করলি! ভয়ে, কান্নায় একাকার হয়ে বললি।”
মিষ্টি মাথা তুলে তাকিয়ে বলে,
“তাহলে তুমি রাগ করোনি?”
রাদিফ হেসে বলে,
“ধুর, রাগ করবো কেনো? মানুষ একটা সন্তান চেয়ে পায়না আর তিনি আমাদের দিয়েছে এতে রাগ কোনো প্রশ্নই আসে না।”
রাদিফ নিজের হাত বের করে পাশে থেকে গোলাপের তোড়া টা হাতে নিয়ে মিষ্টিকে বলে,
“মিষ্টি দেখ!”
মিষ্টি সোজা হয়ে বসে। রাদিফ মিষ্টির হাতে গোলাপগুলো দেয়। সাথে মিষ্টির কপালে একটা চুমু দিয়ে বলে,
“তু্ই আমাকে দুনিয়ার সবথেকে দামি জিনিস উপহার দিতে চলেছিস। আল্লাহর কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া।”
পরদিন সকালবেলা,,,
পুরো বাড়িটা কেমন থম মেরে আছে। রুমানা চৌধুরী এখনও কাউকে বলেননি। তিনি রাদিফের জন্য অপেক্ষা করছেন। আর রুবেল চৌধুরী শুধু আসফাঁস করছেন। এতো খুশির একটা সংবাদ চেপে রাখা কি যায়?
রাদিফের ঘুম ভাঙতেই সামনে চোখে পড়ে মিষ্টিকে।মিষ্টি আয়নায় পরিপাটি হচ্ছে। রাদিফ উঠে বসে খুব মন দিয়ে মিষ্টিকে দেখতে থাকে। মিষ্টি আয়নায় থেকে সরে এসে রাদিফের দিকে তাকায়। রাদিফ বিছানায় থেকে নামতে নামতে বলে,
“নিচে যাসনি কেনো এখনও?”
মিষ্টি কিছুটা লজ্জায় পড়ে বলে,
“ছোট আম্মু হয়তো সবাইকে এতক্ষনে বলে দিয়েছে। সবার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে লজ্জা করছে।”
রাদিফ গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলে,
“যাক ভালোই হয়েছে। মা বলে দিয়েছে। বিষয়টা আমার বলতেও লজ্জা লাগতো।”
রাদিফ ওয়াশরুমে চলে যায়। মিষ্টি বিছানা গুছাতে থাকে। এর মাঝে রাহা আসে। মিষ্টি রাহার দিকে তাকিয়ে বলে,
“কিরে কিছু বলবি?”
“আপু ভাইয়া কোথায়?”
“ওয়াশরুমে গেলো মাত্র।”
“ওহ। তোমরা আজ নিচে গেলে না। সবাই এখন একসাথে খাবার খেতে বসবে। তোমরা নেই বলে ডাকতে পাঠালো।”
মিষ্টি তড়িৎ চোখে তাকালো রাহার দিকে। রাহা কি এখনও জানে না। জানলে তো এসে জড়িয়ে ধরে একদফা হৈচৈ বাঁধিয়ে দিতো।
মিষ্টি কিছু বলার আগেই রাদিফ বলে,
“যা, আমরা আসছি!”
“ঠিক আছে।”
রাহা চলে যাবে ঠিক তখন রাদিফ রাহার উদ্দেশ্যে বলে উঠে,
“এই ম্যাডাম, সিঁড়িগুলো দেখে নামবেন। ঠাস করে পড়ে গেলে কিন্তু ডাক্তার ডাকা হবে না। সোজা পাগলা-গারদ পাঠিয়ে দিবো।”
রাহা ভাইয়ের দিকে চোখ পাকিয়ে তাকালো। মিষ্টি রাহাকে বলে,
“তু্ই রেগে যাসনা। তোর ভাই পাগল হয়ে গিয়েছে।”
রাহা বলে,
“বোঝাও ভাইয়াকে এইবারই শেষ। এরপরের বার দেখো ভাইয়াকে রুমে বেধে রাখবো।”
রাহা চলে রেগে চলে গেলো। ভাই-বোনের মাঝে এমন হাসি-ঠাট্টা, জ্বালানো, ঝগড়া লেগেই থাকবে এটাই স্বাভাবিক।
রাহা নিচে চলে আসে। সায়মা চৌধুরী বলেন,
“কিরে তোর আবার কি হলো?”
“কিছু হয়নি!”
পাশে থেকে রাজ বলে,
“ও কিছুনা মা। ও রাদিফকে ডাকতে গিয়েছিলো না, রাদিফ হয়তো ওকে সাবধানে থাকার কথা বলেছে আর ও রাগ করতে করতে চলে এসেছে।”
রাহা চোখ পাকিয়ে তাকায় রাজের দিকে। রাজ মুচকি হেসে চোখ টিপ মারে।
কিছুক্ষন পরে রাদিফ নিচে নেমে আসে। ওর সাথে মিষ্টিও নেমে আসে। এর মধ্যে মিষ্টি রাদিফকে বলবে যে, কেউ এখনও জানে না খুশির খবরটা। সেটা রাদিফকে বলতেই ভুলে যায়।
রাদিফ এসে তার বাবার পাশের চেয়ারটায় বসে। রুবেল চৌধুরী আর রুমানা চৌধুরী রাদিফকে স্বাভাবিক থাকতে দেখে মনে মনে খুশিই হলেন। রুমানা চৌধুরী মিষ্টির কাছে এসে ফিসফিস করে বলেন,
“রাদিফ রেগে ছিলো কি?”
মিষ্টি মুচকি হেসে মাথা নাড়িয়ে না বোঝায়।
রুমানা চৌধুরী রাশেদ চৌধুরীর দিকে কি যেনো ইশারা করেন।
মিষ্টি সবাইকে স্বাভাবিক থাকতে দেখে এটা নিশ্চিত কেউ জানে না। রাদিফও হালকা টের পায়।
রুবেল চৌধুরী খাওয়ার মাঝে গলা খাকারি দিয়ে রাশেদ চৌধুরীকে বলেন,
“ভাই, আজ অফিসে একটু লেট্ করে যাবো কিন্তু!”
রাশেদ চৌধুরী খেতে খেতে জবাব দেন,
“কেনো? কোনো কাজ আছে নাকি?”
রুমানা চৌধুরী বলেন,
“ভাইজান মিষ্টি কিনতে যাওয়ার ডিউটি আপনাদের দুজনের!”
কেউই তেমন কথাটা বুঝতে পারলো না। রাদিফ বুঝতে পেরে মিষ্টির দিকে তাকিয়ে ভ্রু উঠিয়ে বাকা হাসে। মিষ্টি শাড়ির আঁচল কচলাতে কচলাতে মনে মনে বলে,,, যা ভেবেছিলাম তাই। এখন কি করি। সবার সামনে লজ্জা পেয়ে যাবো। মিষ্টির কথাগুলো ভাবতে যতক্ষণ এরপরে সাথে সাথে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে যায়।
রাশেদ চৌধুরী পুনরায় প্রশ্ন করেন,
“ভাবি বুঝতে পারলাম না কিসের ডিউটি আর কিসের মিষ্টি? কোনো স্পেশাল রিজন?”
রুবেল চৌধুরী হেসে বলেন,
“তোমাদের ঘরে যেমন মেহমান আসছে ঠিক তেমন আমাদের ঘরেও মেহমান আসছে।”
রাশেদ চৌধুরী কথাটা শুনে রাদিফের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“রাদিফ কংগ্রাচুলেশন!”
রাদিফ হালকা হাসি দিয়ে বলে,
“থ্যাংক ইউ!”
খুশিতে সায়মা চৌধুরীর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। তার পাশে এসে দাঁড়ালেন রুমানা চৌধুরী। দুজনে খুশিতে দুজনাকে জড়িয়ে ধরলেন।
রাদিফ খাওয়া শেষ করে চলে গেলো। সবার খাওয়া এখনও হয়নি। রাদিফ চলে যাওয়ার পরে সবাই হেসে উঠে। রাশেদ চৌধুরী বলেই উঠেন,
“যাক, এই রাগী ছেলেটাও নরম হচ্ছে বৈকি। কি বলো।”
চলবে….
এই পর্বটা কেমন হয়েছে জানাবেন আপনারা…!! আর পরবর্তী পর্ব কালকে সন্ধ্যার পরে আসবে। এর আগে কোথাও ৩৩ নাম্বার পর্ব পেয়ে গেলে ভাববেন, সেটা আমার লেখা না।
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। আর এই পার্টটা ভালো লাগলে রেসপন্স করবেন!!!!!!
[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]

