শিশির_ভেজা_রোদ্দুর Bonus_Part

0
201

শিশির_ভেজা_রোদ্দুর
Bonus_Part
#Writer_NOVA

— রাই, তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।

তাদের দুজনকে এভাবে দেখে আমি কিছুটা অবাক হলাম। সাথে রাগও হলো।রোশান ও জারার হাতের দিকে তাকিয়ে আমি কিছুটা কঠিন গলায় বললাম,

— কথা পরে বলেন। আগে বলেন ওর হাত কেন ধরেছেন?

— তার কৈফিয়ত আমি তোমাকে দিতে বাধ্য নই।

— আপনি বাধ্য।

— চুপ করো। আমি তোমার কথা শুনতে আসিনি। আমার কথা বলতে এসেছি।

ওর বাজখাঁই গলা শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। রোশান কখনো আমার সাথে এমন বিহেভ করিনি। আমি ছলছল চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। সে আমার দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বললো,

— আমি তোমাকে ভালোবাসি না। এতদিন তোমার সাথে অভিনয় করেছি। আসলে আমার ও জারার ছোটবেলা থেকে বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। বন্ধুদের সাথে বাজি ধরে তোমার সাথে প্রেম করেছিলাম। অনেক দিন ধরে বলবো করে সত্যি কথাগুলো বলা হয়নি।

আমি স্তব্ধ চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে আছি। বাহ্, কি সুন্দর কথা! চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি পরছে। আজ তারাও আমার কথা শুনতে রাজী নয়।আমি চোখের পানি মুছে এগিয়ে গিয়ে রোশানের হাত ঝাঁকি দিয়ে বললাম,

— মজা করছেন আমার সাথে। আমার এরকম মজা ভালো লাগে না। জারা তুইও আমার সাথে মজা করছিস? আমি না তোর বেস্টফ্রেন্ড। তুই কি করে এসব করছিস?

— রাই, আমরা মজা করছি না। এগুলো সত্যি কথা।

— আমি বিশ্বাস করি না। আমার বেস্টফ্রেন্ড কখনও আমার সাথে এমন করতেই পারে না। আর আপনি, আপনি না আমায় ভালোবাসেন? আপনি আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন আমাকে বিয়ে করবেন।আমাদের ছোট একটা সংসার হবে।

রোশান আমাকে ঝাটকা মেরে সরিয়ে গালে ঠাস করে এক থাপ্পড় মেরে বললো,

— তোর মতো মেয়েতো আমার পায়েরও যোগ্য নয়। আর তোকে বিয়ে, ওয়াক থু। আমার চয়েজ এতটাও খারাপ হয়নি।ভালো করে কথা বলছিলাম ভালো লাগেনি।আসলে তুই ভালো কথার মানুষই না।তোর সব সত্যি জেনে গেছি আমি। তাই এসব ন্যাকামো অন্য কোথাও কর।

— কি সত্যি জেনে গেছেন আপনি? কি যা তা বলেন এসব? আমি তো আপনার কাছ থেকে কোন কথা লুকায়নি।

— লুকিয়েছিস, অনেক কথা লুকিয়েছিস।তুই সপ্তাহে সপ্তাহে বয়ফ্রেন্ড পাল্টাস, তোর তো কোন মান-সম্মান নেই, নিজেকে তো কিছুদিন পর নিলামে উঠাবি, নিজের শরীর দেখিয়ে কত ছেলেদের আকর্ষণ করছিসরে? তোর থেকে ভালো তো ঐ পতিতারা। তোর মতো মেয়েকে কখনও ভালোবাসা যায় না। আরে তোর থেকে প্রস্টিটিউড মেয়েদের ভালোবাসলেও একটা ছেলে ভুল করবে না। আমার বদ কিসমত যে তোর মতো মেয়েকে আমি ভালোবেসতে নিয়ে ছিলাম। ভাগ্য ভালো সময় থাকতে তোর আসল চেহারা দেখে নিয়েছি। এখন আমি ও জারা একে অপরকে ভালোবাসি। তোর ঐ নোংরা চেহারাটা না আমাকে দেখাস না। আমি তো আমার চেহারা তোকে কখনও দেখাবো না। নিজের মধ্যে যদি নূন্যতম মান-সম্মান থাকে তাহলে আমার থেকে দূরে থাকিস। হা কাকে কি বলছি আমি? যে কিনা নিজের শরীর দেখিয়ে অন্যকে আকর্ষণ করতে পারে তার আবার মান-সম্মান!

রোশান তাচ্ছিল্যের সহিত কথাগুলো বলে নিচে একদলা থুথু ফেললো।সাদ্দাম এসব কথায় চটে গেলো। আমি তো পাথর হয়ে গেছি। কি বলে এসব? সাদ্দাম জোরে চেচিয়ে বললো,

— অনেক বলছেন থামেন এবার। কি প্রমাণ আছে এসবের? আপনি না জেনে কেন ওকে মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছেন? এই জারা এই তুই কি মানুষ? তোর সামনে তোর বেস্টফ্রেন্ডকে সে কথা শুনাচ্ছে আর তুই চুপচাপ শুনে নিচ্ছিস।

জারা ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বললো,
— রোশান ভুল কিছু বলেনি।

জারা কথাটা বলতে দেরী ওর গালে একটা থাপ্পড় পরতে দেরী নয়। ভেবেছিলাম থাপ্পড়টা সাদ্দাম দিয়েছে। কিন্তু না থাপ্পড়টা মেরেছে তামিম। সাদ্দাম হাত উঠিয়েছিলো। তার আগেই তামিম মেরে দিয়েছে। তামিমও রাগে ফুঁসছে। শাকিল জারার সামনে গিয়ে বললো,

— তোকে আমাদের ফ্রেন্ড ভাবতেও লজ্জা করছে। ওয়াক থু। তোর মতো কাল নাগিনকে নিজের বেস্টফ্রেন্ড ভাবতাম। তার জন্য নিজের ওপর ঘৃণা হচ্ছে।

জারা গালে হাত দিয়ে ফুঁসতে লাগলো। আমি এগিয়ে গিয়ে রোশানের পায়ের কাছে হাঁটু মুড়ে বসে দুই হাত জোর করে কাঁদতে কাঁদতে বললাম,

— আপনার দোহাই লাগি রোশান। আপনি এসব কথা বলেন না। আপনার পায়ে পরি আমি। আপনি চুপ করুন। আপনার যদি আমার প্রতি কোন অভিযোগ থাকে তাহলে মারুন,কাটুন যা খুশি করুন। কিন্তু দয়া করে এসব মিথ্যে অপবাদ দিয়েন না। আপনার যদি মনে হয় আপনি সম্পর্ক রাখবেন না। তাহলে শেষ করে দিন।আমি কিচ্ছু বলবো না। তবুও আমার নামে এতগুলো অপবাদ দিয়েন না।আমি সত্যি আপনাকে অনেক ভালোবাসি। আপনাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না। প্লিজ আপনি একটু বোঝার চেষ্টা করুন।

অলরেডি আমাদের ঘিরে সারা কলেজের স্টুডেন্ট জড়ো হয়ে গেছে। সবাই এতে দাত কেলিয়ে বিনোদন নিচ্ছে। কয়েকটা ছেলে মোবাইল চালু করে ভিডিও করতে নিয়েছিলো।শাকিল দৌড়ে ওদের হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নেয়।ভালোবাসলে যে কতটা বেহায়া হতে হয় সেদিন আমি বুঝতে পেরেছি। রোশান আমাকে ধাক্কা দিয়ে ওর সামনে থেকে সরিয়ে বলেছিলো,

— শরম থাকলে তোর এই চেহারা আমাকে ২য় বার দেখাস না। খুব শীঘ্রই আমি ও জারা বিয়ে করছি। তোর মতো মেয়ের সাথে টাইম পাস করা যায়, বিয়ে করা নয়।

সাদ্দাম এগিয়ে এসে রোশানের কলার ধরে বললো,
— কুত্তার বা** মুখ সামলাইয়া কথা বল। কিছু বলছি না বলে বেড়ে গেছিস। আগে নিজের দিক দেখ। তারপর ওরে নিয়া বাজে কথা বলিস।আমার বোনকে নিয়ে আরেকটা কথা বললে জিহ্বা টেনে ছিঁড়ে ফেলবো।বড় বলে সম্মান করছিলাম। কিন্তু তুই সম্মানের যোগ্য নস। (জারার দিকে তাকিয়ে) জারা তোরে আমি জানে মাইরা ফালামু। তুই হলি যত নষ্টের গোড়া।

রোশান ঝাড়া মেরে সাদ্দামের হাত থেকে কলার ছাড়িয়ে নিয়ে বললো,

— প্রমাণ আমি নিজে। আমি নিজের চোখে অনেক কিছু দেখেছি।

তামিম আমাকে ধরে উঠিয়ে বললো,
— রিলেশনে যাওয়ার আগে বলছিলাম তোরে। এই মানুষরূপী জানোয়ারের থেকে সাবধানে থাকিস। তুই তো আমাদের কথা শুনলি না। এখন বিশ্বাস হইছে তো। আর তোর বেস্টফ্রেন্ডের পরিচয় দেখছিস।এদের জন্য আমাদের থেকে দূরে যেতে চেয়েছিলি তুই।

আমি কিছু বলার মতো অবস্থায় নেই। কাঁদতে কাঁদতে আমার হেচকি উঠে গেছে। সাফা,ঝুমা আমার পাশে এসে দাঁড়ালো। যেখানে সাদ্দাম, শাকিল,তামিম কথা বলে সেখানে আমরা কোন মেয়ে কথা বলি না। তাই সাফা, ঝুমা চুপ করে নিরব দর্শকের ভুমিকা রেখেছে। রোশান জারার হাত ধরে সেখান থেকে চলে গেল। আমি দৌড়ে সেদিকে যেতে নিলে সাদ্দাম, তামিম আটকে ফেলে।

আমি মুখে ঢেকে কাঁদতে কাঁদতে বসে পরি।জীবনের প্রিয় দুটো মানুষ বিশ্বাসঘতকতা করলো।যাদেরকে চোখ বুজে অন্ধবিশ্বাস করতাম। তারাই আমাকে ধোকা দিলো।১.বেস্টফ্রেন্ড ২.ভালোবাসার মানুষ। তারাই আমার কাছে বৈইমান নামে পরিচিত পেলো। আমার ভুল ছিলো না তা আমি বলবো না। হ্যাঁ, আমারও ভুল ছিলো। একজনকে পাগলের মতো ভালোবাসতাম, আরেকজনকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতাম। তার যোগ্য উপহার আমাকে তারা দিয়েছে।

তারপর ঘটে যায় অনেক ঘটনা। আমি বেহায়ার মতো কতবার রোশানের কাছে গিয়েছি।কিন্তু অপমান,ধিক্কার ছাড়া কিছু পাইনি। এই ঘটনা যখন সারা কলেজে ছেয়ে যায় তখন প্রিন্সিপাল আব্বুকে ইনফর্ম করে। সাথে রোশানের বাবাকেও। সেদিন প্রিন্সিপালের রুমে আমার সাথে সাথে আমার বাবাও অপমানিত হয়। ক্ষমতার দাপটে সেদিন আমাদের বাপ-বেটির কথার কোন গুরুত্ব থাকে না। চেয়ারম্যানের ছেলে হওয়ায় সে পার পেয়ে যায়। আর সব দোষ হয় আমার।আমি নাকি রোশানকে ডিস্টার্ব করতাম, ওর পেছন পেছন ঘুরতাম। আরো কত কি! এমনকি সব মিথ্যে অপবাদগুলো সত্যি রূপে পরিণত হয়। সেদিন বাসায় আসার পর বাবা আমার দুই গালে দুটো শক্ত চড় বসিয়েছিলো। আর বলেছিলো তার সাথে কোনদিন কথা বলতে না। গ্রামের লোকেরাও তিলকে তাল করে আমাকে দোষারোপ করা শুরু করে। কিন্তু কেউ ঘেটে দেখে না আসলেই আমার দোষ কিনা। এতো এতো মানসিক চাপে আমি নিজেকে চার দেয়ালে বন্দি করে ফেলি।ডিপ্রেশন চারদিক থেকে আমাকে ঘিরে ধরে।তাই একদিন পৃথিবীর সব মায়া ত্যাগ করে, আব্বুর হাই পাওয়ারের ঘুমের ঔষধের পাতা থেকে পুরো এক পাতা ঔষধ একসাথে খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করি।

কিন্তু সঠিক সময়ে হসপিটালে নেওয়ায় বেঁচে যাই। হসপিটালে থেকে আসার পর সবার কথার অত্যাচারে আমি অতিষ্ঠ হয়ে যায়। আবার আত্মহত্যার কথা মাথায় আসে। সেদিন সাহস করে ফলের ছুড়িটা হাতে নিয়ে মাত্রই পোঁচ দিবো তখুনি ঝড়ের গতিতে তায়াং ভাইয়া এসে থামিয়ে ফেলে। তারপরের ঘটনাগুলো স্বপ্নের মতো ঘটতে থাকে। তায়াং ভাইয়া ও পরিবারের সাপোর্টে আমি ডিপ্রেশন কাটিয়ে ধীরে ধীরে সুস্থ হতে থাকি। আহাদ ভাইয়াও রোশানের বিরুদ্ধে এসে আমাকে অনেক হেল্প করেছে। আব্বু আমার সাথে কথা না বললেও বাসায় এলে পুরো সময় আমার খেয়াল ও যত্ন নিতো। পুরো ছয় মাস পর আব্বু আমার সাথে কথা বলে। যেদিন আমার পরীক্ষার রেজাল্ট দেয় সেদিন। রোশান এসব খবর পেয়েও একবারও আমার সাথে দেখা করতে আসেনি। না এসে ভালো করেছে। জারার সাথে আমরা সব ফ্রেন্ড বন্ধুত্ব শেষ করে দেই। জারা পরীক্ষা শেষ করে ঢাকা চলে যায়। রোশান হাই স্টাডির জন্য ইউ.কে তে চলে যায়। আহাদ ভাইয়ার মুখে এতটুকুই জেনেছিলাম।এরপর ঢাকা ভর্তি হলাম। তায়াং ভাইয়া, খালামণি,তন্বীর সংস্পর্শে, সবার ভালোবাসায় মনের জোড় ফিরিয়ে এনে আবার আগের আমিতে ফিরে এলাম।এবার আপনারাই বলুন তো রোশান,জারাকে কি আমার মাফ করা আদোও উচিত? যদিও তাদের সাথে আরেকজনও আছে। যে এসবের মেইন কালপ্রিট। আমাকে নিয়ে সেই মুলত খেলেছে। রোশান,জারাতো ছিলো তার খেলার গুটি। আমি তার কথা পরে জানতে পেরেছি।যে কিনা ভালোর মুখোশ পরে আমার মনে জায়গা নিতে চেয়েছিলো।কিন্তু তার আগেই সব সত্যি আমি জেনে যাই। আমি এই তিনজনকে কখনো মাফ করবো না। কখনো না।

ফ্লাশব্যাক এন্ড……

এক দমকা হাওয়ায় বেবী চুলগুলো চোখের সামনে আসতেই ধ্যান ভাঙলো। চোখের পানি মুছে নিলাম।সিএনজির শব্দ পেতেই নিচের দিকে তাকালাম। আমাদের দালানের সামনে সিএনজি থেমেছে। সেখান থেকে দুজন নামলো। আমি ভাবলাম কার না কার ফ্লাটে মেহমান এসেছে সেদিকে তাকিয়ে আমি কি দেখবো?তাই আর আমি সেদিকে তাকালাম না। ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলাম। বাসার ভেতর ঢুকতেই দেখি তন্বী পিঠ ধরে সোফায় বসে আছে। ওকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগে আমার পিঠে দুম করে এক তাল পরলো। আমি “আল্লাহগো” বলে চিৎকার জুড়ে দিলাম। ততক্ষণাৎ তার দিকে তাকিয়ে ব্যাথার কথা ভুলে খুশিতে জোরে চেচিয়ে বললাম,

—তুমি!

#চলবে

(আমি বলেছিলাম একটা বোনাস পর্ব দিবো তাই দিয়ে দিলাম। কিন্তু এখনো যদি নেক্সট, নাইস, স্টিকার কমেন্ট পাই তাহলে সন্ধ্যার পর্ব পাবেন না🥱।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here