শিশির_ভেজা_রোদ্দুর Part_08

0
556

শিশির_ভেজা_রোদ্দুর
Part_08
#Writer_NOVA

কিন্তু সেখানে গিয়ে আমি পুরো ভদ্র হয়ে গেলাম।কতক্ষণ ধরে মাথা নিচু করে রওনকের দলের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এই মুহুর্তে আমাকে দেখলে যে কেউ বলবে,এই মেয়ে ভাজা মাছ উল্টে খেতে পারে না। পাশে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তন্বী।ওর দিকে কয়েকবার চোখ পাকিয়ে তাকিয়েছি।কিন্তু বেচারী ভয়েও আমার দিকে তাকায়নি।এই ছেমরি আমার বিষয়ে সবকিছু রওনককে জানিয়ে দিয়েছে। নয়তো আমিও তো বলি ওরা আমার নাম জানলো কি করে!! রওনক এক হাতে ধীরে-সুস্থে সিগারেট টানছে আরেক হাতে মোবাইল চালাচ্ছে। খুব সম্ভবত ফেসবুকিং করছে।কারণ ওর হাতের বুড়ো আঙুলটা উপর-নীচ উঠানামা করছে।দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা ব্যাথা হওয়ার পথে।অথচ মহাশয়ের কি একটা ভাব! মনে হচ্ছে ইরাকের প্রেসিডেন্ট তাকে দেশ সামলাতে দিয়েছে।

অবশেষে রওনক মুখ খুললো।সিগারেটে একটা টান দিয়ে ধোঁয়াগুলো উপর দিকে ছেড়ে দিলো।তারপর মাথা না তুলেই তখন আমাকে যে ছেলেটা ধমকি-ধামকি দিয়ে নিয়ে এলো সেই ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলো,

—কি ব্যাপার, সমস্যা কি শাওন?

—ভাই, আপনি নোভা নামের মেয়েটাকে ডেকে আনতে বলেছিলেন।

—হুম বলেছিলাম।

—নিয়ে এসেছি।

—হুম দেখতে পেয়েছি।(তন্বীকে উদ্দেশ্য করে) এই মেয়ে নাম কি তোমার?

—তনীমা রহমান তন্বী।(ভয়ে ভয়ে)

—কোন ইয়ার?

—ম্যানেজমেন্টের ফার্স্ট ইয়ার।

—ওহ আচ্ছা। তুমি এখন ক্লাশে যাও।নিজের ক্লাশ করো।আর তোমার এই বোনের ক্লাশ আমরা নেই।

তন্বী ঠায় দাঁড়িয়ে আমার দিকে অসহায় চোখে তাকালো।আমি একটা খাইয়া ফালামু লুক দিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলাম।আজ ওকে বাগে পেলে কিমা বানাবো।আগে এখান থেকে ছাড়া পেয়ে নেই। তারপর বাকিটা।তন্বীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রওনক ধমকে উঠলো,

—কি হলো যাচ্ছো না কেন?আমি কি এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে বলছি?

—যাযাযাচচ্ছি ভাইয়া।

আমতাআমতা করা কথা শেষ করেই তন্বী দ্রুত পায়ে প্রস্থান করলো।যাওয়ার আগে এক হাতে কান ধরে আমার দিকে তাকিয়ে সরি বললো।আমি চোখ পাকিয়ে ইশারায় বললাম,”তোর সরির গুল্লি মারি।”
কে জানে তন্বী আমার কথা বুঝতে পেরেছে কিনা।রওনক মোবাইলটা পকেটে রেখে সোজা হয়ে পেছনের গাছের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো। তারপর চোখ দুটো ছোট ছোট করে আমাকে বললো,

—এই যে মিস ঝগড়ুটে এদিকে এসো।

আমাকে ঝগড়ুটে বলতেই আমি ফোঁস করে উঠলাম।তা দেখে রওনক চোখ পাকিয়ে তাকালো।তাতে আমি মিইয়ে গেলাম।আশেপাশে মানুষের আনাগোনা কম।এমনি কলেজে আজ বেশি মানুষ আসেনি।ওরা যদি আমাকে দুই-চারটা চড় মেরে অজ্ঞান করে ফেলে তাহলে আমাকে বাঁচানোর কেউ নেই। আমি ধীর পায়ে তার বরাবরি দাঁড়ালাম। শাওন নামের ছেলেটি রওনকের কাছে আমার বিচারের ঝুলি খুলে বসলো।

—জানেন বড় ভাই কি হয়েছে? এই মেয়েকে যখন আমি বললাম ভাই তোমাকে ডাকছে তখন আমাকে বলে পরে যাবে।ওর সাহস দেখছেন।আপনার কথা অমান্য করে।আমার মুখে মুখে তর্কও করছে।

রওনক শাওনকে হাত উঠিয়ে থামিয়ে দিলো।শান্ত কন্ঠে বললো,

—আমি তোকে কিছু জিজ্ঞেস করছি শাওন?

—না মানে আমি এমনি বললাম।

—এই মেয়ে সেদিন আমার সাথেও এমন করছে।আমি নাম জিজ্ঞেস করছি তার জন্য কত কথা শুনিয়ে দিয়েছে। (আমাকে উদ্দেশ্য করে) তা মিস ঝগড়ুটে, তোমার নাকি কোন নাম নেই। বাবা-মা আকিকা করার ভয়ে নাম রাখেনি।তাহলে নোভা কার নাম?

আমি কোন উত্তর দিলাম না।চুপ করে এদিক সেদিক তাকিয়ে পালানোর রাস্তা খুঁজতে লাগলাম।তাতে রওনক কিছুটা ধমকের সুরেই আমাকে বললো,

—এদিক সেদিক তাকিয়ে কি দেখো?আমার দিকে তাকাও। সেদিন তো মুখ দিয়ে খই ফুটছিলো।আজ মুখের বুলি কোথায়?সিনিয়রদের সাথে কি করে কথা বলতে হয় তা কি তুমি জানো না?

আমার ইচ্ছে করছে বেশ করে কতগুলো কড়া কথা শুনিয়ে দিতে।কিন্তু এতে হীতের বিপরীত হবে।তাই চুপ করে থাকায় শ্রেয়।আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে শাওন তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলো। গলা ঝাঁঝিয়ে রওনককে বললো,

—দেখছেন ভাই, দেখছেন।আপনার সামনেও কিরকম বেয়াদবি করতাছে।আপনি শুধু একবার হুকুম দেন।এই মাইয়ারে এমন শায়েস্তা করমু ২য় বার আপনার সাথে তর্ক করার সাহস করবো না।

এবার আমার রাগ সপ্ত আসমানে।এই রওনকের চামচা শাওন এবার বেশি বেশি করছে।একে তো এক ডোজ না দিলেই নয়।ভেবেছিলাম ছেড়ে দিবো।কিন্তু একে আজ ছেড়ে দিলে আরো বেড়ে যাবে।ওর দিকে তাকিয়ে দেখলাম ও আমার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দুজনের মাঝে এক হাতেরও কম দুরত্ব। তৎক্ষনাৎ আমার মাথায় শয়তানি বুদ্ধি এসে হানা দিলে।কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়ে শাওনের পায়ের মধ্যে দিলাম জোড়ে এক পারা।উঁচু গোড়ালির জুতা থাকায় পায়ে বেশ ভালোই লাগলো।শাওন চিৎকার করে উঠলো।ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই বোকা বনে গেলো।কি হয়েছে বুঝতে সবার দুই মিনিট লাগলো।আর এই দুই মিনিটে আমি দিয়েছি ছুট।এখানে দাঁড়িয়ে থেকে বিপদে পরবো নাকি!!

💖💖💖

ইচ্ছে ছিলো না সব ক্লাশ করার।কিন্তু আজ মাসিক টিউটোরিয়াল পরীক্ষার সাজেশন দিবে।যার কারণে সবগুলো ক্লাশ করতে হলো।আড়াইটা অব্দি ক্লাশ চললো।তন্বীর একটা পর্যন্ত ক্লাশ ছিলো।এতক্ষণ ও কি করবে?তাই ওকে বাসায় চলে যেতে বলেছি।শারমিনকে রিকশায় তুলে দিয়ে আমি দাঁড়িয়ে আছি। আমার বাসা ও শারমিনের বাসা উল্টোদিকে।একটা রিকশাও পাচ্ছি না।তায়াং ভাইয়াকে যে কল করবো তারও উপায় নেই। মোবাইলে ব্যালেন্স নেই। এই ভরদুপুরে কোন ফেক্সিলোডের দোকানও খোলা নেই। কথায় আছে না বিপদ যখন আসে তখন সবদিক থেকে আসে।আমারও তাই হলো।

পাঁচ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে থেকেও কোন রিকশা পেলাম না।হঠাৎ ৭-৮টা ছেলে কোথা থেকে এসে আমাকে গোল ঘেরা দিয়ে ফেললো।এরা রওনকের দলের।
একজনের হাতে অনেকগুলো প্রাকটিকাল খাতা।আমার সামনে এসে দাঁড়ালো রওনক।শাওন আমার দিকে চোখ লাল করে তাকিয়ে আছে। রওনক আমার সামনে এসে একগালে শয়তানি হাসি দিয়ে বললো,

—অবশেষে ঝগড়ুটে ম্যাডামের আসার সময় হলো।সেই কখন থেকে তোমার জন্য ওয়েট করছি।আর তুমি এখন এলে?দিস ইজ নট ফেয়ার।

রওনককে উদ্দেশ্য করে শাওন বললো,
—ভাই,এরে এখন ছাড়বেন না।আমার পায়ে অনেক জোরে পারা দিছে। পা-টা এখনো জ্বলতাছে। কিরকম ফুলে গেছে। বরফ ডলেও ফোলা কমলো না।

আমি দাঁত কিড়মিড় করে শাওনকে বললাম,
—মনে হচ্ছে ডোজটা অনেক কম হয়ে গেছে।মুখে একনো চটাং চটাং কথা ফুটছে। আরো খাওয়ার ইচ্ছে আছে নাকি?

—দেখছেন ভাই,দেখছেন।আবার আমারে থ্রেট দিতেছে।তাও আপনার সামনে।আপনি কিছু বলতাছেন না বলে এতো বাড়ছে।

রওনক আমাকে দিলো এক বিশাল ধমক।তাতে আমি কিছুটা কেঁপে উঠলেও তার থেকে বেশি রাগ হলো।কলেজের ভিপি হয়েছে বলে কি মাথা খাবে নাকি।চুপ করে রইলাম।রওনক জোরে চেচিয়ে বললো,

—তখনও আমাদের সাথে ফাইজলামি করলে,এখনো আবার মুখে মুখে তর্ক করছো।এতো সাহস পেলে কোথা থেকে? এর জন্য তোমাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।প্রথমে ভেবেছিলাম মাফ করে দিবো।কিন্তু এখন আর না।তোমাকে দুইটা অপশন দিচ্ছি। ১.আমার কাছে মাফ চাইবে।আর সাথে দশবার কান ধরে উঠবস করবে।২. এখানে ১০টা প্রাকটিকাল আছে। যেগুলো তোমাকে একরাতের মধ্যে কমপ্লিট করে আগামীকাল সকাল দশটার মধ্যে কলেজে এসে দিয়ে যেতে হবে।এখন কোনটা বেছে নিবে?এজ ইউর চয়েজ।

আমি কড়া গলায় উত্তর দিলাম,
—একটাও না।

—যেকোন একটা তো তোমাকে মেনে নিতেই হবে।নয়তো তুমি এখান থেকে আজ যেতে পারবে না। আচ্ছা যাও তোমার কানেও ধরতে হবে না। আর আমার কাছে মাফও চাইতে হবে না। তুমি এই দশটা প্রাকটিকাল করে এনো।তোমার কাজ সহজ করে দিলাম।ঐ তামিম, প্রাকটিকাল খাতাগুলো মিস ঝগড়ুটের হাতে তুলে দে।

—আচ্ছা ভাই।

তামিম নামের ছেলেটা আমার হাতে দশটা খাতা তুলে দিলো।বাপরে এগুলো কি খাতা?আমার তো মনে হচ্ছে কেউ আমার হাতে দশকেজি আটার বস্তা তুলে দিলো।একেকটা কি মোটা মোটা!!আমার এখন কান্না পাচ্ছে। এখন যদি এগুলো নিতে মানা করি তাহলে কান ধরে উঠবস করিয়ে আমার মান-সম্মান ফালুদা বানাবে।রওনকের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে কাতর গলায় বললাম,

—ভাইয়া!!!এবারের মতো ছেড়ে দিন না।

রওনক ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বললো,
—কালকের মধ্যে সব খাতা কমপ্লিট চাই।নয়তো অনেক খারাপ হয়ে যাবে। তুমি এ কলেজে থাকতেও না পারো।ভেতরে ইন্সট্রাকশন দেওয়া আছে। কিভাবে কি করতে হবে তার একটা নোটসও ছাপানো আছে। সেগুলো দেখে দেখে চিত্রগুলো আঁকবে আর লিখবে।

—আমি একাউন্টিং-এর স্টুডেন্ট। আপনাদের বায়োলজির চিত্র আঁকবো কি করে?একেকটা যা কঠিন কঠিন নাম। সেগুলো উচ্চারণ করতে গেলেই আমার দাঁত ভেঙে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়।আর চিত্র আঁকতে গেলে পেন্সিলের আগা ভেঙে যাবে আর খাতার পৃষ্ঠা নষ্ট হবে।এর থেকে ভালো কিছু হবে না।

—আগামীকালের মধ্যে সবগুলো কমপ্লিট চাই। তুমি কি করে আঁকবে, লিখবে সম্পূর্ণ তোমার ব্যাপার।এই চল সবাই।

শাওন খুশিমনে আমার দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে
বললো,

—একদম ঠিক হয়েছে। ভাইয়ের সাথে পাঙ্গা নেওয়ার ফল এবার বুঝবে।আমাকে যা পারা দিয়েছে না।আহ্ এখনো ব্যাথা করছে।পা নাড়াতে পারছি না।

আমি একবার শাওনের দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে রওনককে অনুরোধের সুরে বললাম,

—ভাইয়া প্লিজ এবারের মতো মাফ করে দিন না!আমি এরপরের থেকে আপনাদের সাথে কোন ঝামেলা করবো না।

—কথাটা তো আগে ভেবে দেখা উচিত ছিলো।এখন কোন কাজ হবে না। লক্ষ্মী মেয়ের মতো সবগুলো কমপ্লিট করে এনো।তাহলে একটা ললিপপ দিবো। নয়তো টি.সি পেয়ে যাবো।(সাথের ছেলেগুলোকে উদ্দেশ্য করে) এই তোরা এখনো দাঁড়িয়ে আছিস কেন?চল যাই।আজ আমি তোদের ট্রিট দিবো।মনটা ভালো আছে।

হাসতে হাসতে সবগুলো চলে গেলো।এবার আমার কি হবে?এক রাতের মধ্যে এতগুলো প্রাকটিকাল আমি কমপ্লিট করবো কি করে?একটা চিত্র আঁকতেই তো আমার অর্ধেক রাত পার হয়ে যাবে।নিজের ওপর রাগ হচ্ছে,ইচ্ছে করছে নিজের চুল নিজেই ছিঁড়ি। কেন যে তখন ওদের সাথে লাগতে গেলাম।এখন ঠেলা সামলাই। যদি আমি হাত-পা ছুঁড়ে রাস্তায় বসে কাঁদতে পারতাম,তাহলে হয়তো একটু ভালো লাগতো।ধূর,
অসহ্যকর সবকিছু!! এর জন্য বলে অতি চালাকের গলায় দড়ি।

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here