সুখের_নেশায় #পর্ব___১১

0
317

#সুখের_নেশায়
#লেখিকাঃআসরিফা_সুলতানা_জেবা
#পর্ব___১১

চৈত্রিকার ধপ করে বসে পড়ল বিছানায়। চোখে জল। টলমল চক্ষু নিয়ে মিমের দিকে তাকাল। ধরা গলায় বললো,
‘ তাহাফ ভাই কবে এসেছে?উনি না মিশনে গিয়েছিলেন? ‘
‘ জিজ্ঞেস করি নি আপু। একটু আগেই এসেছে। প্রায় দশ মিনিট হবে। এখন কি করবি?আমার মনে হচ্ছে তাহাফ ভাইয়ার সাথে তোর বিয়েটা হয়ে যাবে।’

চৈত্রিকার অন্তঃস্থলে কম্পন ছড়িয়ে দেয় মিমের কথাগুলো। বিয়ে!এই পর্যন্ত কতগুলো পাত্রের সামনে যেতে হয়েছে? মাত্র একজনের সামনেই তো। তবুও মা-বাবার জোড়াজুড়ি তে। চৈত্রিকা সেদিন মনপ্রাণে চেয়েছিল পাত্রপক্ষ তাকে রিজেক্ট করুক। অপমানিত হওয়ার পরও চৈত্রিকার ভীষণ শান্তি পেয়েছে রিজেক্ট হওয়ার ফলে। কিন্তু এখন!তাহাফ কখনও রিজেক্ট করবে না তাকে। কখনও না। কারণ টা চৈত্রিকার ভালো করেই জানা।
‘ এখন কি করবি আপু?সাফারাত ভাইকে মনের কথা বলে দে।’

মিমের কথায় চৈত্রিকার চক্ষু কোটর হতে বেরিয়ে আসার উপক্রম। প্রতুত্তরে কিছু বলতে নিলে ফাহমিদা বেগম হুড়মুড়িয়ে রুমে ঢুকলেন। হাতে একটা নীল রঙের তাঁতের শাড়ি। বিছানায় রেখে তড়তড় করে বলে উঠলেন,
‘ শাড়ি টা পড়ে নে চৈত্র। তাড়াতাড়ি করিস।’
চৈত্রিকা এক পলক বিছানার দিকে চেয়ে চোখ সরিয়ে নিল। দৃষ্টি নিবদ্ধ করল মায়ের দিকে। ছোট্ট করে বললো,
‘ কেন আম্মু?’
‘ তাহাফের আব্বু-আম্মু অপেক্ষা করছে। জলদি কর।’

মায়ের নির্লিপ্ত ভঙ্গিমা দেখে হতবাক চৈত্রিকা। ভিতরে ভিতরে অশান্তি বয়ে যাচ্ছে তার। দম বন্ধ হয়ে আসছে। ফাহমিদা তাড়া দিয়ে বেরিয়ে যেতেই বসে পড়ল মেঝেতে। মিমের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো। মিম নড়েচড়ে উঠল। বোনের মুখে কষ্টের প্রতিফলন স্পষ্ট। আমতা আমতা করে বললো,

‘ সাফারাত ভাইকে আমি সবটা বলি আপু?নাম্বার আছে তোমার কাছে?আমি উনাকে বুঝিয়ে বলব তুমি উনাকে ভালোবাসো।’
‘ তোমার বোনকে কি তোমার কাছে ছেঁচড়া মনে হয়?সাফারাত আমাকে ভালোবাসলে অবশ্যই বলত। যে বাসে না তাকে যেচে গিয়ে বিরক্ত করার মানে হয় না।’

কথাগুলো বলে আর এক মুহুর্তও স্থির থাকল না চৈত্রিকা। এলোমেলো পায়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল। মিম পরিষ্কার আঁচ করতে পারে তার বোনের কথার ভাঁজে লুকিয়ে আছে তীব্র অভিমান। সাফারাতের প্রতি নয়। নিজের প্রতি। নিজের প্রতি অভিমান ক’জন করে!কিন্তু চৈত্রিকার মনে নিজের জন্যই অভিমানের পাহাড়। ভালোবাসা প্রকাশ করতে না পারার ক্রোধ।
.
.
নীল শাড়ি টা পড়ে চৈত্রিকা জানালার কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। মায়ের কথামতো শাড়ি তো পরিধান করে নিয়েছে কিন্তু মনটা পড়ে আছে সাফারাতের কাছে। ছুটে যেতে ইচ্ছে করছে। বাবা-মা,বোন সবার মায়া ত্যাগ করে শুধু সাফারাতের বুকে লুটিয়ে পড়তে স্পৃহা জাগছে মনে। পৃথিবীর সব থেকে স্বার্থপর মানুষটা যদি হতে পারত তবে বোধহয় সবচেয়ে সুখী ব্যক্তির নাম হতো চৈত্রিকা। বুক ছিন্ন ভিন্ন করে বেরিয়ে এলো দীর্ঘশ্বাস। চৈত্রিকার দ্বারা সম্ভব নয় পৃথিবীর সব থেকে স্বার্থপর মানুষটা হয়ে উঠা। পদধ্বনি কর্ণে পৌঁছাতেই উদাস মনে ঘাড় কাত করে চাইল চৈত্রিকা। ফাহমিদার মুখে বিস্তর হাসি। মায়ের মনে প্রশান্তি ছুঁয়ে যাওয়া হাসির প্রেক্ষিতে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুলল অধর কোণে।

‘ মাশাল্লাহ! তোকে তো খুব সুন্দর লাগছে মা। এখন চল। বসার ঘরে অপেক্ষায় সবাই। ‘

ফাহমিদা চৈত্রিকার মাথায় ঘোমটা টেনে দিলেন। মন ভরে দেখলেন মেয়েকে। হাত ধরে বাহিরে নিয়ে যেতে উদ্যত হওয়া মাত্র চৈত্রিকা মায়ের হাত ধরে আঁটকে দিল। তাৎক্ষণিক ফাহমিদা প্রশ্ন সূচনা চাহনি নিক্ষেপ করলেন। ভ্রুঁ কুঁচকে তাকালেন চৈত্রিকার পানে।

‘ কি হয়েছে চৈত্র?’
চৈত্রিকা তৎক্ষনাৎ জবাব দিতে পারল না। অনেক ভেবেছে সে। কিন্তু কোনো রকমেই নিজেকে অন্যের বউ হিসেবে কল্পনা করতে পারে নি। হৃদযন্ত্রের অনুভূতির নিকট বাজে ভাবে হেরে বসেছে।তাছাড়া পরিবারের দায়িত্ব তার উপর।
‘ কিছু বলছিস না কেন?’
‘ আমি বিয়ে নামক ভেজালে জড়াতে চাই না আম্মু। তাহাফ ভাইদের ফিরিয়ে দাও।’

বিস্ফোরিত নয়নে চাইলেন ফাহমিদা। চৈত্রিকাও নিরলস ভাবে তাকিয়ে আছে। মা’কে বলতে পারছে না সাফারাত কে ভালোবাসে। কোন মুখে বলবে!ভালো তো সে বাসে, সাফারাত না। ফাহমিদা উত্তেজিত সুরে প্রশ্ন ছুঁড়লেন,

‘ কেন চাস না?’
নিশ্চুপ,নিস্তেজ চৈত্রিকা!বলার মতো শব্দের অভাব পড়েছে তার কাছে। হকচকানো বন্ধ করে ধাতস্থ কন্ঠে বললো,
‘ আমার বিয়ে হয়ে গেলে তোমাদের কি হবে আম্মু?বাবার অবস্থা ভালো না। ‘
‘ তোমাকে আর আমাদের চিন্তা করতে হবে না। বিয়ে করতেই হবে তোমাকে। তাহাফ খুব ভালো ছেলে। ‘
‘ কিন্তু! ‘
‘ কোনো কিন্তু না চৈত্র। আমি আর চাই না তুই এভাবে আমাদের জন্য ধুকে ধুকে জীবন পাড় কর। মা হিসেবে আমি আমার মেয়েকে কারো বউ রূপে দেখতে চাই। আমার মেয়ের সুখের সংসার দেখতে চাই।’
‘ সংসার হলেই যে আমি সুখী হবো এমনতো নয় আম্মু। ব্যতিক্রমও তো হতে পারে। হতে পারে দুঃখ আমার জন্য চিরকাল থাকবে। ‘

ফাহমিদা বিচলিত কন্ঠে বললেন,
‘ এমন কিছুই হবে না। সুখই আসবে তোর জীবনে। তাহাফের বাবা যখন তোর হাত চেয়েছে তাহাফের জন্য তোর বাবার কাছে।তোর বাবা কি বলেছে জানিস?’
চৈত্রিকা চাতক পাখির ন্যায় স্থির চেয়ে রইল বাবার জবাব কি ছিল তা শুনার নিমিত্তে। ফাহমিদা মেয়ের অস্থিরতা বাড়তে দিলেন না। বললেন,
‘ বলেছে- তুই যা সিদ্ধান্ত নিবি তা-ই হবে। আমি জানি তুই হ্যাঁ বললে তোর বাবা খুশি হবে। উনার সম্মান টা নষ্ট করিস না মা।আমি তোকে বধূ বেশে দেখতে চাই। ‘

বাবার উত্তর শুনে খুশি হলেও সেই খুশি স্থায়ী হলো না বেশিক্ষণ। সম্পূর্ন উবে গেল মায়ের শেষ বাক্যে। প্রত্যেক বাবা-মা চায় সন্তান সুখে থাকুক। চৈত্রিকা জানে,ফাহমিদা চায় তার পরিপূর্ণ সংসার জীবন দেখতে। কিন্তু!চৈত্রিকার বুক ভারি হয়ে আসতে লাগল ক্রমশ। জীবনের এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল সে এক মিনিটের মাথায়। মনে পাথর চেপে বললো,
‘ বাহিরে চলো আম্মু।’
ফাহমিদা মেয়ের দিকে গভীর চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
‘ তোর জীবনে কেউ আছে চৈত্র?কাউকে পছন্দ করিস তুই? ‘

কয়েক মুহুর্তের জন্য হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া থমকে গেল চৈত্রিকার। পরক্ষণেই সংকোচন -প্রসারণ হতে লাগল দ্রুত গতিতে। পছন্দ? পছন্দ নয় বরঞ্চ সবটুকু ভালোবাসা নিজের দখলে নিয়েছে সাফারাত অজান্তেই। চৈত্রিকার নিকট সাফারাত এখন শুধুই রাতের আকাশের চাঁদের মতো,যা ধরা ছোঁয়ার বাহিরে। চোখ দুটো বুঁজে নিল চৈত্রিকা। তটস্থ কন্ঠে আওড়ালো একটা মিথ্যে বাক্য,
‘ না আম্মু।’
.
.
সোফার এক কোণে শ্যামলা বর্ণের একটা ছেলে বসে আছে। মাথার চুলগুলো ছোট ছোট। চৈত্রিকা সবাইকে সালাম দিয়ে আঁড়চোখে ছেলেটার দিকে তাকাল। চোখে চোখ পড়ে গেল দু’জনের। চৈত্রিকা দ্রুত চোখ সরিয়ে আনল। তাহাফের বাবা বিলম্ব না করে বলে উঠলেন,
‘ যেহেতু চৈত্রিকা বিয়েতে রাজি। আমরা আর দেরি করব না ভাবী। আজকেই ওকে আংটি পড়িয়ে যাব। আর পরের মাসে তাহাফ ছুটি পেলে তখন শুভ কাজ টা সেড়ে ফেলব। তাহাফ আংটি টা পড়িয়ে দাও চৈত্রিকার আঙ্গুলে।’

চৈত্রিকার হাত মুঠো করে রেখেছে। সাহস পাচ্ছে না বাড়িয়ে দেবার। লজ্জা পাচ্ছে ভেবে ফাহমিদা আস্তে করে বললেন,
‘ হাত টা বাড়া।’

ধীরগতিতে হাত টা এগিয়ে দিল চৈত্রিকা তাহাফের দিকে। তাহাফ স্মিত হাসল। আলতো করে হাত টা স্পর্শ করল। আঁকড়ে ধরে আংটি টা পড়িয়ে দেয় আঙ্গুলে। নিঃসংকোচে বলে উঠল,
‘ আন্টি আপনাদের আপত্তি না থাকলে আমি চৈত্রর সাথে কিছু কথা বলতে চাই।’
‘ চৈত্র তাহাফ কে নিয়ে যা। এখানে তো আমরা কথা বলছি। মিমের ঘরে নাহয় তোর ঘরে নিয়ে যা।’

কিছু না বলে উঠে দাঁড়াল চৈত্রিকা। তাহাফও উঠে দাঁড়াল। পিছু পিছু রুমে এলো। দূরে হতাশ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা চৈত্রিকার দিকে বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
‘ তোমাকে আগের চেয়েও বেশি সুন্দর লাগছে চৈত্র। ‘
‘ কেন করছেন এসব?’

ক্রুদ্ধ চোখে তাকিয়ে কাঠ কাঠ গলায় প্রশ্ন করে চৈত্রিকা। তাহাফ এতে আরো খুশি হয় যেন। উত্তরে সহজ সরল ভাষায় বললো,
‘ ভালোবাসি। ভালোবাসার কারণ টা কি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসার জন্য যথেষ্ট নয় চৈত্র? ‘
‘ আমি তো আপনাকে ভালোবাসি না তাহাফ ভাই। একদমই বাসি না। একবছর আগেও আপনি যখন আমাকে বলেছিলেন ভালোবাসেন তখন সরাসরি না করে দিয়েছি। তারপরও এসবের কোনো মানে হয় না।’

তাহাফ চৈত্রিকার কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। খুব কাছাকাছি। হকচকিয়ে দুই পা পিছিয়ে গেল চৈত্রিকা। হাতে টান অনুভব করল। শক্ত করে হাতের মুঠোয় চেপে ধরেছে তাহাফ। তাহাফের স্পর্শে চৈত্রিকা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে পারছে না। ঘৃণায় ভরে যাচ্ছে মন। হাত ছাড়ানোর প্রয়াস করতেই তাহাফ গভীর ও গাঢ় করে বাঁধন। হাতের আংটি টা কে লক্ষ্য করে বললো,
‘ তুমি আজ থেকে আমার চৈত্র। এই আংটি টা তারই সাক্ষী।’
‘ একটা আংটি দ্বারা আমি আপনার হয়ে যাব না তাহাফ ভাই। আমার মন যেদিন চাইবে সেদিনই আমি আপনার হবো সম্পূর্ণ রূপে। কিন্তু আমার মন কখনও চাইবে না। মায়ের খুশির জন্য রাজি হলেও,আপনাকে আমার হাত ধরার অধিকার অথবা অনুমতি কোনোটাই আমি দেই নি।’

তাহাফ কে তিক্ত কথাগুলো শুনিয়ে হাত টা ছাড়িয়ে আনল চৈত্রিকা। মেয়েটার এমন ব্যবহারে তাহাফ রোষপূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
‘ বউকে স্পর্শ করতে স্বামীর অনুমতির প্রয়োজন নেই। বর্তমানে তুমি আমার বাগদত্তা। কয়েকদিন বাদে বউ হবে৷ তখন তোমার এসব বলার মুখ আমি রাখব না। মাইন্ড ইট।’

চৈত্রিকা দমে যায় নি তাহাফের রূঢ় আচরণে। তাহাফ কে তার একটুও সহ্য হচ্ছে না। একটুখানিও না। মৃদু চিৎকার করে বলে উঠল,

‘ বেরিয়ে যান আমার রুম থেকে। এখুনি বেরিয়ে যাবেন।’

তাহাফের চোখ লাল হয়ে এলো। ঠাটিয়ে চড় মারতে ইচ্ছে করছে তার সামনে দাঁড়ানো মেয়েটা কে। হাত দু’টো মুঠো করে চলে যেতে নিয়েও থেমে গেল। নজর আটকালো ফুলদানিতে। যেখানে কতগুলো শুকনো জারবেরা পড়ে আছে স্থির। বাঁকা হাসল তাহাফ। ঘাড় ফিরিয়ে বললো,
‘ তোমার কি জারবেরা পছন্দ চৈত্র? ‘
চৈত্রিকা কটমট চোখে চেয়ে উত্তর দিল,
‘ না।’
‘ আমার পছন্দ। ভীষণ পছন্দ। ‘

কথাটা শেষ করে দ্রুত গতিতে প্রস্থান করে তাহাফ। চৈত্রিকা বাকরুদ্ধ!নির্নিমেষ দৃষ্টি মেঝেতে রেখে মিনমিন স্বরে বলে উঠল,

‘ আমি মনে প্রাণে দোয়া করি -আপনি যেন সেই মানুষ টা না হন। শুকনো এই জারবোরার মালিক টা ভিন্ন হোক। তবুও আপনি নয়।’

#চলবে,,,!

(আসসালামু আলাইকুম। প্রথমেই আমি খুবই দুঃখিত। তিনদিন গল্প দিতে পারি নি। এতে আপনারা বোধ হয় আমার সাথে রেগে আছেন। কিন্তু আমি নিরুপায় ছিলাম। এই তিনটে দিন ঠিকভাবে অনলাইন আসার সুযোগ পর্যন্ত হয়ে উঠে নি। আমি নিজেও রেগুলার গল্প দিতে না পারলে হতাশ হয়ে যায়। ইনশাআল্লাহ এখন থেকে রেগুলার দেওয়ার চেষ্টা করব। ভুল- ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here