সিঁদুরশুদ্ধি #নাফিসামুনতাহাপরী #পর্বঃ৬

0
144

#সিঁদুরশুদ্ধি #নাফিসামুনতাহাপরী #পর্বঃ৬

.

যেখানে সমস্ত শক্তি পরাজিত হয়ে অন্ধকার নেমে আসে সেখান থেকেই বিশ্বাস, ভক্তি আর ভালোবাসার শক্তি উজ্জ্বল আলো হয়ে ঐ সব অপশক্তির বিরুদ্ধে কাজ করতে শুরু করে দেয়………….

সমস্ত প্রেত শক্তিকে শেষ করে বিদ্যা তার অগ্নি দৃষ্টি বিজয়ের মামার দিকে ফেলল।

বিজয়ের মামা তো থরথর করে কাঁপতে শুরু করে দিল। এমন সময় অপুর জ্ঞান ফিরে আসলো আর বিদ্যা হঠাৎ করেই ওর নিজের কন্টোল হারিয়ে ফেলে অপুর গায়ের উপর পড়ে যায়।

কেউ আর বিদ্যার কাছে ভয়ে এগিয়ে গেল না। অপুই বিদ্যাকে সহ উঠে বলল,” বিজয়, ও এখানে এল কিভাবে! ওর কি হয়েছে?”

ওকে আপাতত রাখ। আগে আমাদের সমস্যার সমাধান হোক বলেই বিজয় ওর মামার দিকে তাকিয়ে বলল,” মামা, কিছু সুরাহ্ পেলেন?”

আগে ওরে অন্য ঘরে রেখে আয়। ও থাকলে আর কিছু করা সম্ভব হবেনা। এমনি আমার অনেক শক্তি ও নষ্ট করে ফেলেছে। শিঘ্রই ওকে অন্য ঘরে নিয়ে যা। তুই যেন ওকে ছুসনা। অপুকে বল রেখে আসতে।

বিজয় ওর মামার কথা শুনে অপুকে বলল,” অপু ওকে অন্য ঘরে নিয়ে চল।”

অপুও দেরী না করে বিদ্যাকে অন্য রুমে রেখে আসলো। তারপর আবার আসনে বসে পড়ল।

এবার সময় নষ্ট না করে বিজয়ের মামা চোখ বন্ধ করে খুব সাবধানে মন্ত্র পড়তে শুরু করলো। এবার যাতে আর ভুল না হয় সেদিকে বেশ নজর দিয়েই কাজ করতে লাগল। প্রায় ২০ মিনিট পর উনি মুখ খুললেন,

” অপু, সামনে তোমার সহোধর্মিনী আর তুমি দু’জনই মহা বিপদের মধ্য রয়েছ। ভাগ্য পরির্বতন হয় সেটা কঠোর তপস্যাতে। তোমার বাবা আগামী অমাবস্যাতিথিতে ১১ জন মহাশক্তিধর অঘোরীদের তোমাদের বাড়িতে আমন্ত্রন করেছেন। আমার বা কোন সাধারন তান্ত্রিকের সাধ্য নেই সেই পূজা বন্ধ করার। বিদ্যার জিবনের বিনিময়ে তারা কাজ করবে। বিদ্যার শরীর তাদের কাছে খুব মহামূল্যবান।

তারা আগামশাস্ত্রের কুন্ডলীচক্রের মাধ্যমে “তনোতি ক্রায়োতি তন্ত্র” সৃষ্টি করবে। যা ৬৪ তন্ত্র নামে পরিচিত।
এর থেকে রেহাই পাওয়া খুব খুব কঠিন।”

বিজয়ের মামার কথা শুনে অপু ঘাবড়ে যায়। অপু আধুনিক ছেলে। তাই সব কিছু বিশ্বাস করতে না চাইলেও কিছুদিন ধরে বিদ্যার মাঝে অনেক পরিবর্তন দেখেছে। অপু চট করে বলে উঠলো, এই সমস্যার কি কোনই সমাধান নেই?

বিজয়ের মামা সুধারাম হতাশার সুরে বলে উঠলো, দুইটা উপায় আছে। এক, বিদ্যার কাছে একটা শক্তি রয়েছে। সেটার পূর্ন ব্যবহার করতে হবে। ২য়, বিদ্যার কুমারীত্ব নষ্ট করে ফেলতে হবে। ও কুমারী বলেই ওকে দিয়ে এই পূজা সম্ভব। তোমার বাবা বুঝে শুনেই বিদ্যাকে পছন্দ করে নিয়ে এসেছে। তোমার বাবা জানে, তোমার সাথে বিদ্যার মিলন কিছুতেই সম্ভব নয়। এখন বল, তুমি কি কাজগুলো করতে পারবে?

অপু মুখ পাংশু করে উঠে দাড়ালো। বিদ্যার সাথে অন্তরঙ্গ হওয়া অসম্ভব কথা। আঙ্কেল এটা আমি পারবোনা। কিছুতেই পারবোনা।

আচ্ছা, এমন করছিস কেনো বলতো! এত অধৈর্য হলে কি হয়? একটু ভেবে দেখ তারপর না হয় সিদ্ধান্ত নিস? এখন বাড়ি যা বলে বিজয় অপুকে বিদ্যার রুমে নিয়ে গিয়ে বলল,” দেখ তুই নিজে একজন ডাক্তার। তাও এহেন তেহেন ডাক্তার নয়। বিলেতফেরত ডাক্তার। তুই চাইলে অনেক কিছুই করতে পারিস। এবং সুন্দর ভাবে সবকিছুর সমাধান করতে পারিস। কিসে বিদ্যার বেশি সমস্যা হবেনা সেটা তুই আমাদের থেকে ভালো জানিস।”

অপুর হাতে পানির ঘটিটা দিয়ে বিজয় একটু দুরে গিয়ে দাড়ালো। এখন ওর বিদ্যাকে খুব ভয় লাগে। যা ভেলকি দেখালোনা! আর একটু হলে নিজেই হার্টফেল করতাম।

অপু পানি ছিটিয়ে দিতেই বিদ্যার জ্ঞান ফিরে আসে। বিদ্যাকে আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ওকে নিয়ে বাসার পথে রওনা দিল অপু।

অপু বাসায় এসে নানা চিন্তায় ব্যস্ত। বিদ্যাকে নিয়ে যে বাসা হতে বের হয়ে যাবে তারও কোন পথ নেই। বাবা বার বার নিষেধ করেছে, এমন কাজ যেন আমি না করি। তাহলে এখন কি করবো? বিদ্যাকে বাঁচাতে পারবো তো?

এদিকে বিদ্যা জানালা দিয়ে দেখল, বাসার পিছনের দিকে হরিনাথ পাশের পুকুরে একটু জল যাওয়ার রাস্তা করে দিয়ে তাতে কয়েকটা মাছ ধরার “চাই” পুতেঁ দিয়ে চলে গেল।

বুড়ো, কাল না আমায় দাদার কাছে বকা খেয়ে নিয়েছিলি! আজ তোর মাছ খাওয়া জন্মের মত উগাড়ে তোলব। দাড়া, দাড়ানা বাছাধোন। আমি আসছি বলেই বিদ্যা অপুকে তোয়াক্কা না করেই বাহিরে দৌড় দিল। অপুও পিছনে ডেকে উঠলো। কিন্তু অপুর কথা শোনার মত তার সময় নেই।

বাসার পিছন দিকে বাঁশ ঝাড় পেরিয়ে বিদ্যা সেখানে গিয়ে হাজির। মাছ ধরার চাইটা জল থেকে তুলে ভেঙ্গে মুচড়ে একদম পুকুরেই ডুবে দিল বিদ্যা। তারপর জলদি বাসায় ফিরে আসল। আবার জানালা দিয়ে লক্ষ করতে লাগল এর পর বুড়ো কি করে!

এভাবে তিনদিনে, বুড়ো হরিনাথের মোট সাতটা মাছ ধরার চাই নষ্ট করে ফেলল বিদ্যা। কে এমন করছে কিছুতেই ধরতে পারছেনা বুড়ো হরিনাথ।
শেষের দিন বিদ্যাকে কেউ একজন দেখে ফেলে ঐ পুকুর থেকে উঠে আসতে। আর সেই গিয়ে হরিনাথকে সব কিছু বলে দেয়।

বেচারা হরিনাথ তার মাছ ধরার চাই হারানোর শোকে অস্থির। এমন খবর পেয়ে হরিনাথ পায়ের রক্ত মস্তকে তুলে সোজা অপুদের বাড়ির দিকে হাটা ধরল। আজ এর হেস্তনেস্ত করেই ছাড়বে। অতটুকু পুচকে মেয়ের সাহস কি করে হয় আমার জিনিসে হাত দেওয়া। আজ যদি অপু ওর বউয়ের বিচার না করে তাহলে এলাকায় এ নিয়ে শালিস বসাবো।

অপু বিদ্যার চুলে তেল দিয়ে কেবল দু’টো বিনি বেঁধে দিয়েছে এমন সময় হরিনাথ চিক্কুর দিতে দিতে অপুদের বাসায় হাজির।

ঐ রঘুনাথ আয় বের হ আজ। তোর ছেলের বউয়ের বিচার যদি আজ না হয়, তাহলে আমি কি করবো সেটা জানিনা।

অপু চোখ বড় বড় করে বিদ্যার দিকে চেয়ে বলল,” বিদ্যা, আবার কাকার পিছনে লেগেছিস?”

” না দাদা, আমি কি করেছি?”

” কিছু না করলেই ভালো।”

অপু রুম থেকে বের হয়ে নিচে নেমে আসল। বিদ্যা আর আসলো না। বিদ্যা এই সুযোগে সেই ডিমগুলো খুজতে লাগল। কিন্তু ডিম থাকলে তো সেগুলো পাবে! বিদ্যা জানেইনা সেগুলো সারা জিবনের জন্য চলে গেছে।

বুড়ো হরিনাথ জোড়ে জোড়ে সব কিছু খুলে বলল অপুকে। এর মধ্য বাসার সবাই এসে জড়ো হল হরিনাথের চিৎকারে। তোর বউকে ডাক এখানে। ও নিজে এসব কাজ করেছে। এখন ঘরের মধ্য লুকিয়ে ভালো মেয়ে সেজে থাকলে, আমি মানবো নাকি?

অপু নিচ থেকেই বিদ্যাকে কয়েকবার ডাকল। বিদ্যা ভয়ে ভয়ে এসে অপুর সামনে দাড়ায়।

বিদ্যাকে দেখেই হরিনাথ হুংকার দিয়ে বলে উঠলো,কিরে বল! তুই আমার মাছ ধরার চাইগুলো কি করেছিস?

“আমি কেন তোমার চাইগুলো নিব? গিয়ে দেখ তোমার চাইগুলো ভুতে নিয়েছে। গিয়ে ভূতকে জিঙ্গাসা করো না! অযথায় আমার দোষ দাও।”

” চুপ কর বজ্জাত মাইয়া। এত মিথ্যা কথা বলিস কেমনে?”

হরিনাথের এমন ধমকে বিদ্যা ক্ষেপে গেল। এমনি ডিমগুলো খুজে পায়নি তারমধ্যে এই বুড়োটা তার প্যাচাল শেষ করছেনা। বিদ্যা হরিনাথের দিকে তেড়ে যেতেই অপু রেগে গিয়ে বিদ্যাকে ধরেই গালে একটা কষে থাপ্পর মেরে জোড়ে ধমক দিয়ে বলল,” বড়দের সাথে এমন কেউ ব্যবহার করে? যা ভিতরে যা।”

” অপুর থাপ্পড় খেয়ে ঐ যে কান্না ধরল আর থামার নাম নেই। গলা ফেঁটে চিৎকার দিয়ে কাঁদতে লাগলো বিদ্যা। অপু কখনো ওর গায়ে হাত তোলেনি। এই প্রথম হাত তুলেও নিজে বেকুব বনে গেল। কেন যে রাগের মাথায় ওকে মারতে গেল এখন বেশ পস্তাচ্ছে অপু। বিদ্যাকে যতই থামতে বলে বিদ্যা ততই গলা ফাঁটিয়ে চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠে।”

বিদ্যার অমন কান্না দেখে হরিনাথ বিদ্যাকে ধমক দিয়ে বলল,” কিরে কাঁদিস কেন! অপু যদি এই শাসনটা তোরে আগে করতো, তাহলে এত বজ্জাত তুই হতিনা। বিয়াদপ মেয়ে একটা। বাপ-মায়ে তোরে শিক্ষা দিয়ে পরের ঘরে পাঠাইনি।”

হরিনাথের কথা আর শেষ হলনা। শেষ হওয়ার আগেই বিদ্যা সবাইকে অবাক করে দিয়ে উঠানের বালতিটা তুলেই হরিনাথের মাথা বরাবর বালতিটা ছুড়ে মারল।

হরিনাথ সাথে সাথে মুখ বিকৃতি করেই মাথায় হাত দিয়ে চেঁপে ধরে বসে পড়ল। হাতের ফাঁক দিয়ে ফিকনি বেয়ে রক্ত বের হতে লাগল।

সবাই বিদ্যাকে কিছু বলার আগেই বিদ্যা এক দৌড়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়ে রাগে থরথর করে কাঁপতে লাগল। আজ মন চাইছিল বুড়োকে একদম শেষ করে ফেলে দেই।

বিদ্যার এহেন কান্ডে অঞ্জনা অপুকে ছেড়ে কথা বললোনা। শুধু তোর জন্য অপু তোর জন্য আজ ঐ মেয়েটা এতবড় একটা কান্ড ঘটিয়ে ফেলল। কোন শাসন নাই কিছু নেই। বাড়ির মান-সম্মান দেখি আর রাখবেনা।

অপু সেদিকে কান না দিয়ে হরিনাথ কাকাকে তুলে দেখল সামান্য কেটে গেছে। কাকা ভয় নেই কাল থেকে ও এমন কোন কাজ আর করবেনা। ওর হয়ে আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।

রাখ তোর ক্ষমা! জুতো মেরে গরু দান করছিস? আগে বৌকে দিয়ে ম্যার খাওয়ায় নিয়ে এখন এসে ক্ষমা চাওয়া হচ্ছে? জিবনেও ঐ মাইয়াকে নিয়ে সুখী হবিনা এই বলে রাখলাম বলে হরিনাথ আরও কিছু বলতে বলতে চলে গেল।

অপু হরিনাথের কথা শুনে মন একটু খারাপই করলো। দুরে অনুরাধা হেঁসে হেঁসে যেন কুটি হয়ে পড়ছে। অপু আর সেদিকে খেয়াল না করে সোজা ওর নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালো।
রুমে এসে দেখে ভিতর থেকে দরজা লাগিয়ে দিয়েছে বিদ্যা।
খানিকটা মুখে বিরক্তির ভাব এনে ঠান্ডা গলায় অপু বলল,

” বিদ্যা দরজা খোল।”

“””””””””””””””””””””””””???

” বিদ্যা, দরজা খোল। আমি কিন্তু ভিষন রেগে আছি !”

“”””””””””””””””””””””””””???

” বি….. দ্যা………!!!

” আমি দরজা খুলব না। তুমি আবার আমায় মারবে।”

” স্যরি বিদ্যা! আর মারবোনা তোকে। এবার দরজা খোল।”

” তুমি আমায় মারবেনা তো দাদা! বকবেনা নাতো আবার।”

” আমি কিছু জিনিসপত্র নিয়েই আবার চলে আসবো বিদ্যা! দরজা খোল।”

এবার বিদ্যা দরজা খুলে দিয়েই আবার দৌড়ে জানালার কাছে দাড়িয়ে কাঁদতে লাগল।

অপু রুমের ভিতর ঢুকে বিদ্যার কাছে গিয়ে ওর গায়ে হাত দিতেই বিদ্যা হাত সরিয়ে দিয়ে বলল,” আমি বাড়ি যাব। বাবার কাছে গিয়ে তোমার নামে নালিশ দিব। তুমি শুধু আমায় মারো আর বকা দাও।”

অপু বিদ্যাকে এবার জোড় করে কাছে টেনে এনেই মুচকি একটা হাঁসি দিয়ে বলল,” কাকাকে ওভাবে মারলি কেন বল! বড়দের সম্মান করতে হয়।”

” নিকুচি করেছি ঐ বুড়াকে সম্মান করতে।”

” আচ্ছা বাদ দে, আমি একটু বাজারে যাচ্ছি তোর কিছু লাগবে? আর শোন, রুম থেকে কিন্তু একদমই বের হবিনা।”

বিদ্যা আর কোন কথা না বলে আবার জানালার কাছে গিয়ে চুপ করে রইল। অপুও কিছু না বলে রেডী হয়ে চলে গেল।

একটু বেলা বাড়তেই বিউলি এসে বলল,” বৌদি দাদা টেলিফোন করেছে, তুমি একটু গিয়ে কথা বলতো?”

” বিদ্যা নির্বাক ভঙ্গিতে বলল,” কোন দাদা?”

” তোমার অপু দাদা।”

বিদ্যা এবার এক দৌড়ে গিয়ে টেলিফোন কানে নিয়ে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে অপু বলে উঠল,
” বিদ্যা, তোর কিছু লাগবে?”

দাদা, আমি মুরগির মাংস খাব। কথাটি অবিলায় বলে উঠল বিদ্যা। কাছেই অপুর বৌদি আর ওর মা দাড়িয়ে ছিল।

আমি পুরো বাজার খুঁজেছি। আজ কোথাও মুরগির মাংস নেই বলতেই এক দোকানি বলে উঠলো, কি বলেন দাদা? ঐ দিকে তো সব ধরনেরই মাংস আছে। আপনি ঐখানে যান তাহলে মাংস পাবেন।

দোকানির কথা শুনেই অপুর মুখ শুখে গেল। বিদ্যাকে মিথ্যা কথা বলতে গিয়ে এই ব্যাটার জন্য ধরা পড়ে গেল। ধরা পড়ে গিয়ে অপু চুপ করে রইল। আর মনে মনে দোকানিকে হাজারটা গালি দিল।

” দাদা, আমি কিন্তু মাংস খাব। তুমি আমাকে মিথ্যা কথা বলেছ।”

” আমি মিথ্যা বলিনী। আমি জানতামনা ওখানে মাংস পাওয়া যায়।”

বিদ্যা টেলিফোন রেখে দিয়েই আবার চলে আসে রুমে। ও জানে আজ ওর দাদা যেভাবেই হোক ওর জন্য মাংস নিয়ে আসবে।

দুপুরে আর অপু এলোনা। বিউলি অনেক চেষ্টা করলো বিদ্যাকে খাবার খাওয়াতে। সে খেলনা। ওর একই কথা, দাদা ছাড়া সে কারো হাতে খাবেনা। দাদা আসলে সে খাবে।

দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হল। হরিনাথ আর ওর ছেলে সেই মাছ ধরার জায়গায় গিয়ে দাড়িয়ে আছে। আজ এখানে অনেক বড় বড় মাগুর মাছ দেখেছে। একটু পড় দেখলো সেই মাছগুলো মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। অমনি হরিনাথ একটা বড় পলি হাতে করে জলে নেমে গেল। আর ওর ছেলে বিধু ডাঙ্গায় দাড়িয়ে থাকল। হরিনাথ কেবল মাছটার গায়ে পলির ঝাঁপ দিবে ওমনি মাছটা বিকট রকমের বড় হয়ে ওর লেজ দিয়ে হরিনাথকে একটা বারি দিয়েই জলে মুখটা খুসে ধরল। হরিনাথ ছটপঠ করতে করতে শুধু একবারই বলতে পারল, বিধু আমায় ধর।

বিধুও চিৎকার দিয়ে ঝাপিয়ে জলে নেমে পড়ল। বিধুর চিৎকারে আসেপাশের সব মানুষ দৌড়ে আসতেই মাছগুলো অদৃশ্য হয়ে গেল। সবাই মিলে হরিনাথ আর বিধুকে জল থেকে টেনে উপরে তুলল। ওরা দু’জনে ভয়ে থর থর করে কাঁপছে। তাদেরকে বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। হরিনাথের জন্মের মত মাছ ধরার শিক্ষা হয়ে গেছে। জিবন থাকতে আর জলে নামবেনা।

রাতে অপু বাসায় এল। বাসায় এসে ফ্রেস হতেই হারিকেন হাতে হরিনাথ উঠানে এসে অপুর নাম ধরে চিৎকার করে ডাকতে লাগলো।

অপু প্রচন্ড ক্লান্ত। তা শর্তেও বের হয়ে আসলো। এসে দেখলো হরিনাথ ভীত অবস্থায় দাড়িয়ে আছে।

” অপু তোর বউ কই?”

” উপরে আছে কাকা। আবার কি আপনাকে ও জ্বালাতন করেছে ?”

” ওকে একটু ডাক দে অপু।”

” কি হয়েছে বলবেন তো!”

” ওকে ডাক।”

অপু বিরক্তি ভাব নিয়ে বিদ্যাকে কয়েকবার ডাকতেই বিদ্যা এসে অপুর পিছনে দাড়ালো। আজ কি আবার কোন নালিশ নিয়ে এসেছে! আমি তো আজ কিছুই করিনি।

বিদ্যাকে দেখেই হরিনাথ হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলল,” সেদিন মিথ্যা অভিযোগে মেয়েটাকে ম্যার খাওয়ায় নিছি। ঈশ্বর তার ফল আজ নিজ হাতে দিয়েছে। ঐ মাছ ধরার চাই ভূতে এসে উধাও করে দিছে । তোর বৌ সেদিন ঠিকি বলেছে, ওটা ভূতের কাজ। শুধু শুধু বিদ্যাকে সেদিন অতগুলো বকা দিলাম। আমাকে মাফ করে দে মা।

এবার বিদ্যা সাহস পেল। আমি বলিনি দাদা, ও মিথ্যা কথা বলছে। শুধু শুধু আমায় বকা দিছ।

আচ্ছা ঠিক আছে, কাকা যান তো! অনেক রাত হয়েছে। যা হবার হয়েছে। কাল এসব নিয়ে আলোচনা করবো বলে বিদ্যাকে নিয়ে অপু উপরে চলে এল।

রুমে আসতেই বিদ্যা বলল,” দাদা আমার মাংস!”

এই বাসায় মাংস খাওয়া নিষেধ। তাই এসবে আমাকে জোড়াজুড়ি আর করবিনা। অপু থেমে আবার বলল,
“আগে বলতো! কাকার মাছ ধরার চাই ভুতে নিয়ে গেছে এটা তুই কিভাবে জানলি?”

” কারন ভূতটা আমি ছিলাম। আমাকে সেদিন বকা দিছিল। তারজন্য ওর সব চাই ভেঙ্গে ফেলে পুকুরের জলে ডুবে দিয়েছি।”

” তুই আবার ঐদিকে গিয়েছিস? তোকে না কতবার নিষেধ করেছি? আমার কথা কি তুই শুনবিই না?”

” তুমি আমার কথা শোন! তার জন্য আমি তোমার কথা শোনব?”

যা ইচ্ছা তাই কর বলে অপু রুম থেকে বের হয়ে গেল।

|

রাতের খাবারের সময় আর বিদ্যা খেতে এল না। রঘুনাথ জিঙ্গাসা করলো বিদ্যা কেন আসলোনা। চটকরে অনুরাধা বলে উঠল, ঐ বজ্জাত মেয়ে মাংস ছাড়া ভাত খাবেনা। দুপুরেও কিছু খায়নি।

অপু কিছু বললোনা। খাবার শেষ করে দ্রুত রুমে এসে দরজা বন্ধ করে দিয়ে দেখল, বিদ্যা খাটে বসে চুপ করে আছে। এই মেয়ে কেন যে এত জেদি, জিবনে বুঝে উঠতে পারলাম না বলে অপু ওর পাশে এসে বসল।

“বিদ্যা…???”

” আমার সাথে তুমি একদম কথা বলবেনা। আমি বাড়ি যাব।”

” আমাকে ছেড়েই চলে যাবি?”

” আমার খুদা লেগেছে, আমি মাংস দিয়ে ভাত খাব।”

অপু উঠে গিয়ে একটা পেপারে মোড়ানো বক্স এনে বলল,” বিদ্যা তুই আমাকে ভালোবাসিস?”

“””””””””””””””””””'”””””””???

আমার সাথে কথা বলবিনা তো! ওকে না বল…!তাহলে এই খাবার গুলো আমি উঠানে বসে থাকা বিল্লুকে দিয়ে আসি। ও বেচারা মাংস পেলে খুব খুশি হবে।

মাংসর কথা শুনতেই বিদ্যার চোখে মুখে হাসির ঝলক দেখা দিল। মাংস….বলেই বিদ্যা অপুর হাত থেকে প্যাকেট কেড়ে নিতে যাবে এমন সময় অপু চট করে প্যাকেট সহ ওর হাত সরালো।

” এটা দিব, একটা শর্ত আছে।”

বিদ্যা কৌতুহল মুখে অপুর দিকে তাকালো।

” আমি দেখতে কেমন বিদ্যা? আমাকে তোর কেমন লাগে?”

বিদ্যা অপুর পা থেকে মাথা অবদি দেখে বলল,” আমি তোমার মত সুন্দর আর ভালো মানুষ কোনদিনও দেখিনি দাদা।”

উমহু সেটা নয়। আমাকে তোর কেমন লাগে!

” খুব ভালো। আমি ভাত খাব।”

” হুম দিব তো! আগে আমাকে চুমো দে তো? দেখি তুই আমায় কেমন ভালোবাসিস।”

বিদ্যা কোন শর্ত ছাড়াই অপুর গালে টপ করে একটা চুমো খেয়ে বলল,” আমার খুদা লাগছে দাদা।”

জিবনে প্রথম তার বালিকা বধূর চুমো অপু অনিচ্ছায় গ্রহন করলো। অপু আর কথা না বাড়িয়ে প্যাকেট খুলে বিদ্যাকে খাইয়ে দিতে লাগল।

কতদিন পর বিদ্যা মাংস খাচ্ছে। তৃপ্তি সহকারে বিদ্যা খাবার খেয়ে অপুর বুকের মধ্য ঘুমিয়ে পড়ল ।

বিদ্যা ঘুমানোর সাথে সাথে অপু ওকে বিছানায় রেখে ডায়রী নিয়ে বসে পড়লো লিখতে।

” আজ বিদ্যার মনে আমার কতটা জায়গা আছে সেটা পরখ করলাম। খুব কঠিন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু আমি বিদ্যাকে কিভাবে আঘাত করবো? আমি এক দুটানার মধ্য পড়ে গেছি। কিন্তু এই রাস্তা ছাড়া বিদ্যাকে বাঁচানো সম্ভব নয়। বিদ্যা কি কখনো তার এই অপু দাদাকে ক্ষমা করবে…..”

গভীর রাত, অনুরাধার মা মালতী ওর মাকে নিয়ে ঐ তান্ত্রিকের সামনে বসে আছে। তান্ত্রিক যজ্ঞ শুরু করে দিয়েছে। একাধারে জোরে জোরে মন্ত্র পড়ছে আর আগুনে অদ্ভুত অদ্ভুত জিনিস আহুতি দিচ্ছে তান্ত্রিকটা। সামনে যজ্ঞের আগুন দাউ দাউ করো জ্বলছে। এমন সময় সামনের ফাঁকা জায়গায় একটা আগুনের সার্কেল জ্বলে উঠলো। আর তার কিছুক্ষন পড়েই ঐ আগুনের গোলক বৃত্তের মধ্য বিদ্যা উপস্থিত হল।

মালতী আর ওর মা বিদ্যাকে দেখে প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেল। কারন এটা কোন স্বাভাবিক বিদ্যা ছিলনা। যার রূপই অন্যরকম ছিল…….।

[] চলবে…….[]

………………………………..
লেখিকা,
নাফিসা মুনতাহা পরী
———————————
© কপিরাইট: উক্ত কন্টেন্টটি লেখিকার সম্পদ। লেখিকার নাম এবং পেজ এর ঠিকানা না দিয়ে কপি করে নিজের নামে চালিয়ে অন্য কোথাও পোষ্ট করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ।
———————————-

পার্রসোনাল ফেইসবুক পেইজ: https://www.facebook.com/nafisa.muntaha.73
ওয়েবসাইট: https://nafisarkolom.blogspot.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here