সিঁদুরশুদ্ধি #নাফিসামুনতাহাপরী #পর্বঃ৮

0
120

#সিঁদুরশুদ্ধি #নাফিসামুনতাহাপরী #পর্বঃ৮

.

এই অমূল্য পানি থেকে বৃন্দার বাঁচা একদম অসম্ভব। বৃন্দা একনিমিষেই কালো কুচকুচে ছোট্ট সাপ হয়ে গেল এবং একটা রুপোর ছোট্ট পানি ভর্তি পেয়ালার মধ্য পড়ে গেল। পানির সংস্পর্শে আসতেই বৃন্দার শরীর দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগল।

এমন সময় অবয়করুপী বিদ্যা অপুর রুম থেকে বের হতেই দেখল, ওর মা আগুনে জ্বলছে। বিদ্যার উপস্থিতি মানে, বৃন্দার শক্তি আরও বৃদ্ধি পাওয়া। আর সেই সুযোগ বৃন্দা একদমই নষ্ট করলোনা। নিজেকে অবয়ক রুপে এনে ঐ পাত্র থেকে বের হয়েই বিদ্যার শরীরে প্রবশ করলো।

সাথে সাথে বিদ্যার চোখ দু’টি কালো হয়ে গেল তারপর অদৃশ্য।

এক অঘোরী তান্ত্রিক দৌড়ে এসে দেখল, শিকার পালিয়ে গেছে। শত্রুর কাছে এমন পরাজিত হতে দেখে ক্ষেপে গেল সে। বাড়ান্দার কিনারায় দাড়িয়ে মাথা নিচু করে বলল,” গুরুদেব, শিকার মুক্ত হয়ে গেছে।”

কিহ্ বলেই চোখ বন্ধ করলো শংকর গুরু। ১৬ বছর তপস্যা করে আজ সে সাফল্য হয়েছে। তাই এতগুলো অঘোরীর গুরু হতে পেরেছে সে। একটা সামান্য পিচাশ তাকে পরাজিত করলো?

শংকর গুরু চোখ খুলে বলল,” অনেক সময় আছে তাই ভেব না।”

বাসার সবাই ব্যস্ত হয়ে গেল তাদের আপ্যায়ন করার জন্য। সব পুরুষ মানুষ তাদের সেবা যত্ন করলো। ওদের সামনে নারীদের প্রবেশ করা নিসিদ্ধ। এমন কি বিপরীত লিঙ্গের চিত্রকর্ম দেখাও নিষেধ। ওদের আয়না দেখাও নিষেধ। তাই বৃন্দা আয়নাবিদ্যা প্রয়োগ করেছে। প্রথম চ্যালেই এক শত্রু খতম। এটা বৃন্দার জন্য একটা প্লাস পয়েন্ট।

অঘোরীদের প্রধান খাদ্য পঁচা-গলা মৃত দেহের মাংস, শশ্মানে মানুষের পোড়া দেহের অবশিষ্ট মাংস। তবে তারা দুর্ঘনার শিকার মৃত দেহের মাংস ভক্ষন করেনা। যেমন, সাপে কাটা লাশ, ডাইরিয়ায় মরা লাশ। তবে এরা মাথার ঘিলুটা ভক্ষন করে থাকে। তারা মানুষের মাথার খুলিতে করে খাবার খেয়ে থাকে। তাদের এসব নোংরামি জিবন ধারনের জন্য তারা আজ সমাজ চ্যুত।

একজন ভক্ত একটা ফুলের মালা এনে শংকরগুরুকে পড়াতে যাবে, এমন সময় শংকর হাত দিয়ে বাধা দিয়ে বলল,” আমি নিষ্কাম তান্ত্রিক। তাই লোকে আমায় ফুলের মালা দিলে সেটা আমার কাছে জুতোর মালার সমতূল্য। আর জুতোর মালা গলায় দিলে ফুলের মালা মানতে হবে। আমার কাছে পদ্ম ফুল আর ধুতরা ফুল একই। তাই এসব জিনিস আমাকে দেসনা।”

রঘুনাথ ইশারা করে ঐ লোকটিকে চলে যেতে বলল।

বৃন্দা চিলেকোঠার অন্ধকার রুমে এসে বসে পড়ল। সাথে বিদ্যার অবয়কও চলে আসল। বৃন্দা কষ্টে কাৎরাচ্ছে।

” মা তোমার কি হয়েছে?”

বৃন্দা অনেক কষ্টে মুখে হাসি টেনে বলল,” আমার কিচ্ছু হয়নি বাবা। আজ আমাদের কিন্তু অনেক বড় কঠিন কাজ করতে হবে। মনে আছে তোমার?”

” হ্যাঁ মা, মনে আছে তো!”

তোমার বিদ্যা দিদির সুরক্ষার জন্য আমার অনেক শক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। তাই তোমাকে সব কিছু করতে হবে কিন্তু!

” জ্বী মা।”

তাহলে এখুনি চল বলে বৃন্দা ওকে নিয়ে অজানা পথে চলে গেল।

পুরোটা দিন আর রুম থেকে বের হলোনা অপু। খাবার অবদি খায়নি। বিদ্যা আর ওঠেনি ঘুম থেকে। কি হতে চলছে অপু কিছুই বুঝতে পারছেনা। সবাই অঘোরীদের সেবায় ব্যস্ত আছে। তাই অপুর খোঁজ নেওয়ার মত কেউ নেই। একদিক থেকে অপুর জন্য ভালয় হল।
বিদ্যার মায়ের সাথে পরিচয় হয়ে অপুর মনটা হালকা হয়ে গেছে। এতদিন জানত, শুধু অপুই বিদ্যার ভাল চায়। কিন্তু বিদ্যাকে রক্ষা করার জন্য সয়ং ওর মা নিজেই উপস্থিত আছে। এখন আর বিদ্যাকে নিয়ে খুব একটা ভয় হচ্ছেনা অপুর।

সন্ধ্যার একটু আগে পুরো গ্রামে রটে গেল ১৭ জন জুয়ান ছেলেমেয়ে মারা গেছে। তাদের মৃত্যুটা অস্বাভাবিক। একই দিনে একসাথে এতগুলো প্রাপ্তবয়ষ্ক ছেলেমেয়ে মারা যাওয়া চাট্টিখানী ব্যাপার নয়। পুরো গ্রামে হৈচৈ উঠে গেল। সবার ধারনা চ্যাটার্জী বাড়ীতে যে অঘোরীরা এসেছে তাদের এসব কৃর্তিকালাপ। কেউ ভয়ে বাসা থেকেও বের হয়না। কিন্তু পুলিশের আনাগোনা বেড়ে গেল।

গ্রামের প্রঞ্চায়েত প্রধান এসে রঘুনাথ চ্যাটার্জীকে সাবধান করে বলে গেল, তারা যেন আগুন নিয়ে না খেলে। তাহলে সেই আগুনেই তাদের পুরে মরতে হবে। অঘোরীরা বিনিময় ছাড়া কোন কাজ করেনা। এতগুলো মানুষের সর্বনাশ করেছ তুমি, সয়ং ঈশ্বর এসে তোমার ক্ষতি করবে।

রঘুনাথ কথাগুলো গায়ে মাখলেন না। কোন কথায় তিনি কানে নিলেন না। আগামী কাল শুল্কপক্ষের গোপনীয় ৪র্থ নবমীর রাত। খুবই তাৎপর্য একটা রাত। আশ্বিন মাসে এই রাত পড়ে। সব সমস্যা সমাধান হলে এবার এই বাড়ীতে সবচেয়ে বড় দূর্গা উৎসব পালিত করবো।

বৃন্দা আর ছোট বিদ্যা একটা বিশাল কড়ই গাছের মগডালে বসে আছে। আজ তারা ২ হাজার বছর বয়সী পিশাচকে শিকার করবে। যা ওদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ শিকার। সবাই মানুষের রক্ত খায় কিন্তু বিদ্যার শক্তি বাড়ানোর জন্য বৃন্দা পিশাচদের শিকার করে তাও অতি গোপনে। কোন প্রমান রাখার সুযোগ নেই এখানে। যদি কেউ ঘুনাক্ষরে টের পায় তাহলে সব শেষ হয়ে যাবে।

একটু পর তাদের অপেক্ষার প্রহর গুটিয়ে নিয়ে গাছ থেকে নামলো দু’জনেই। তারপর সামনের দিকে এগিয়ে গেল। বিদ্যা এক কালো কিশকিশে ছোট বাটি নিয়ে চলে গেল গন্তব্য স্থলে। আর বৃন্দা সেখানেই অপেক্ষা করতে লাগলো।

বিদ্যার চোখ বন্ধ অবস্থায় চলতে লাগলো আর ওর চোখে শক্তি জমাতে লাগলো।
এক পর্যায়ে চলে আসলো বিদ্যা সেই হাজার বছর বয়সী পিচাশ নারীর কাছে। সে রাতের আহার করতে ব্যস্ত ছিল। বিদ্যা কাছে আসতেই সে খাবার ফেলে বিদ্যার দিকে চোখ কটমট করে তাকালো। সে বিদ্যার উপস্থিতি পছন্দ করছেনা। আবার ছোট পিচাশ কন্যা বলেও কিছু বলছেনা। বিদ্যা এটারই সুযোগ নিল।

এবার বিদ্যা চট করে চোখ খুলল। সাথে সাথে অসহ্য যন্ত্রনাময় আলোর ঝলকানি বিদ্যার চোখ থেকে বের হয়ে পিশাচের চোখে গিয়ে আঘাত করলো। কিছুক্ষনের জন্য পিশাচ শক্তিহীন ও অন্ধ হয়ে গেল।

বিদ্যা চেঁচিয়ে উঠলো, মা জলদি করো?

একটা লক্ষ্য, একটাই অস্ত্র, একবারই সুযোগ। এই কাজে যদি বৃন্দা ব্যার্থ হয় তাহলে ওর নিজের জিবন তো যাবেই সাথে ছোট্ট বিদ্যাকেও প্রান হারাতে হবে।
বৃন্দা নিষানা লাগিয়েই অস্ত্র ছুড়লো পিচাশের দিকে। ইয়েশ! নিষানা সফল। অস্ত্রটা একদম পিচাশের কপালে গিয়ে গেঁথে গেল।

ইয়াহু, আমরা পেরেছি বলে লাফিয়ে উঠলো বিদ্যা। তারপর সেই কালো কষ্টিপাথরের পেয়ালা পিশাচের কপালে ধরতেই সেখান থেকে টপটপ করে রক্ত পড়তে লাগল। সেটা বিন্দা আর বিদ্যা পান করলো। শেষ্ট বিন্দু পর্যন্ত শুষে নিয়ে বিদ্যা বলল,” মা, আমরা এবার আরো শক্তিশালী হয়ে গেলাম তাই না?”

” জ্বী মা, আমরা অনেক শক্তিশালী হয়ে গেলাম। এবার আমরা প্রস্তুত ওদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে।”
এখনি এখান চলে যেতে হবে বলেই বৃন্দা বিদ্যাকে নিয়ে ভ্যানিস হয়ে গেল আর পিশাচের শরীর হাওয়ায় মিলে গেল।

অপুদের বাসার পিছনে বড় বাঁশঝাড়ের কিছু জায়গা পরিষ্কার করা হয়েছে যজ্ঞের জন্য। পুরো জায়গা একরকম ভুতুরে পরিবেশ। এমনি এই জায়গাটা দিনের বেলায়ও অন্ধকার হয়ে থাকে তাহলে রাতের হাল তো আরো খারাপ। চাঁদের আলো আসাও দায়।

অঘোরীরা যজ্ঞের সমস্তু জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে রঘুনাথ কে বলল,” যান, আপনার পুত্রবধুকে নিয়ে আসেন।”

রঘুনাথ নিজে অপুর রুমে এসে দেখে বিদ্যা ঘুমিয়ে আছে। ও ঘুমিয়ে আছে বলে রঘুনাথের জন্য বেশ ভালয় হলো। নিয়ে যেতে সুবিধা হবে। অপু রুমে ছিলনা। এই সুযোগে রঘুনাথ বিদ্যাকে কোলে নিয়ে সেই যজ্ঞের কাছে হাজির হল।

শংকরগুরুর নির্দেশে এক অঘোরী গিয়ে বিদ্যাকে কোলে নিয়ে এক স্থানে রেখে আবার আসনে এসে বসলো।
শংকরগুরু মন্ত্র পড়তেই বিদ্যার চারদিকে বিশাল একটা চক্র তৈরি হল। এবার বিদ্যাকে এর ভিতর থেকে কারো সাধ্য নেই বের করবার।

বিদ্যার শরীর যখন মহা মৃত্যুঞ্জয় কবজ আর নীল সরস্বতী কবজ দিয়ে বন্ধন করা হয় তখন সাথে সাথে বৃন্দা টের পেয়ে যায়, ওদের কাছে বিদ্যার শরীর আবদ্ধ হয়ে গেছে। এখন হয় বাঁচার মত বাঁচবে না হয় নিজের প্রান বির্সজন দিয়ে ওদের প্রানও হরন করতে হবে। যুদ্ধের ঘন্টা বেজে গেছে।

বৃন্দা অপুর রুমে হাজির হয়ে দেখে অপু পাগলের মত বিদ্যাকে খুঁজছে।

বিদ্যা ওদের হাতে সোপার্দ হয়েছে। এখন যুদ্ধ করা ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় নেই।
তুমি এখানেই অবস্থান করবে। আমি বিদ্যাকে তোমার কাছে রেখে যাচ্ছি। এই সত্ত্বা যদি দুর্বল হয়ে যায় তাহলে সাথে সাথে এই জারে তোমার কয়েক ফোটা রক্ত দিও। ও সাথে সাথে শক্তিশালী হয়ে যাবে। বৃন্দা জারটা অপুর হাতে দিয়ে চলে গেল।

অপু জানেনা আজ তার সাথে কি কি ঘটতে চলছে। অপু শুধু চায় বিদ্যা যেন ঠিক থাকে।

যজ্ঞে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। শংকর একটা মানুষের মাথার খুলি আর হাড় নিয়ে পুরো যজ্ঞ চক্রপাক দিয়ে মন্ত্র পড়ছে আর অন্যরা একসাথে মন্ত্র জপ করেই চলছে। যজ্ঞ সম্পন্ন হলে বিদ্যাকে পিশাচে পরিনিত করে তার থেকে সমস্ত শক্তি হরন করে তারপরই বিদ্যাকে বলি দেওয়া হবে।

বিদ্যার কাছে এসে বৃন্দা হাজির হল। অনেক চেষ্টা করেও বৃন্দা বিদ্যার কাছে যেতে পারছেনা। বৃন্দা রেগে গিয়ে চিৎকার দিয়ে বলল,” এই ৬ বছরে আমি হাজার হাজার বয়সী পিচাশদের রক্ত পান করে নিজের শক্তি আরো বৃদ্ধি করেছি। তোরা যদি বাঁচতে চাস তাহলে এক্ষুনি এখান চলে যা।”

যাবতো অবশ্য, তবে যাওয়ার আগে তোর আর বিদ্যার ঐ মহাশক্তি খর্ব করেই যাবো। প্রস্তত হ বলেই শংকর আবার মন্ত্র পড়া শুরু করলো।

নাহ, কথায় কাজ হবেনা বলে বিন্দা ওখানেই বসে পড়ল। সাথে সাথে বৃন্দার আশেপাশে শতশত মোমবাতি জ্বলে উঠলো।

তন্ত্রে বিদ্যায় সাধারনত দুটি মার্গ থাকে। দক্ষিন মার্গ ও বাম মার্গ।
অঘোরীরা যেহেতু কালোজাদুকর তাই তারা বাম মার্গ অর্থাৎ মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী কিছু জিনিসপত্র যেমন, শশ্মানে পড়ে থাকা বস্তু, কাপড়, মৃতদেহ ইত্যাদির সাহার্য্য কালো জাদু সম্প্রদান করে থাকে। বাঁকি রইল দক্ষিন মার্গ। এটা সাধারনত পূজা, যজ্ঞ, প্রার্থনা, সংগীত দ্বারা করা হয়।

বৃন্দা একজন পিশাচ, তাই তার বাম মার্গ তন্ত্র দিয়ে ওদের আঘাত করা উচিত কিন্তু ওদের বিপরীত চ্যাল দিতে হবে বলেই বৃন্দা দক্ষিন মার্গ অবলম্বল করে একের পর এক মন্ত্র পড়তে শুরু করে। তারপর সামনে সমস্ত অঘোরীর উদ্দেশ্য একটা ফু দিতেই সেই ফু আগুনের গোলকের ন্যায় হয়ে অঘোরীদের আঘাত করে। এতে শংকর ব্যতীত সব অঘোরীরা পুড়ে ভষ্ম হয়ে যায়।

শংকর খিট খিট করে হেঁসে উঠল। আমি যা পরিকল্পনা করেছি তাই তুই করেছিস।
আমি জানতাম তুই একজন শক্তিশালী পিচাস। তোর সাথে পেরে ওঠা কঠিন। তাই এদের আত্ত্বার শক্তির আমার খুব প্রয়োজন ছিল। এবার আমায় কে আটকায়? দেখ কি করি বলেই বৃন্দার দিকে ওর মরনোস্ত্র নিক্ষেপ করলো। বৃন্দার কপালে গিয়ে সেটা আঘাত করতেই বৃন্দা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। বৃন্দা আস্তে আস্তে মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ছে।

এদিকে রুমের ভিতর অপু ফ্লোরে বসে আছে বিদ্যার অবয়কের জার নিয়ে। অপু লক্ষ্য করল বিদ্যা হাঁপিয়ে চলছে আর ছটপট করছে। অপু বুঝতে পারলো হিতে বিপরীত হয়ে যাচ্ছে। অপু ওর নিজের হাতটা কেটে ফেলে। হাত দিয়ে চুয়ে চুয়ে রক্ত পড়া শুরু করলো। অপু কেবল সেই রক্ত বিদ্যাকে দিতে যাবে এমন সময় লালপ্রভা কোথা থেকে যেন এসে অপুর পা ধরে টেনেই অপুকে দুরে ছুড়ে ফেলে। তারপর অপুকে পরপর তিনটা ছোবল দিয়ে বলল, তুই যদি সেই দিন না আমার সন্তান হত্যা করতিস, না আমার জেদ চেপে ধরতো, না তুই এভাবে মরতি, না আমি আমার অর্ধেক শক্তি হারাতাম। না বিদ্যা মরতো, না ওর মায়ের এতকিছু হত। এই জন্মের মত তোর এখানেই জিবন সমাপ্ত। লালপ্রভা আর একমুহুত্ত্বও দেরী করলোনা। লালপ্রভার বিষাক্ত ছোবলে অপু প্রান হারালো। আর বিদ্যার জার শংকরের হাতে চলে গেল।

বৃন্দার চোখের সামনে ওর ছোট্ট মেয়ে ছটপট করতে লাগল। বৃন্দা আর সহ্য করতে পারলোনা। বৃন্দা হাতের ইশারা করতেই একটা পাখি উড়ে গেল। মেয়েটাকে বাঁচানোর এই একটাই রাস্তা।
বৃন্দার শরীরে আগুন ধরে যায় আর ও পুড়ে ভষ্ম হয়ে গেল এবং ওর শক্তি শংকর হরন করে নেয়। এবার বিদ্যার পালা কিন্তু তার আগে তাকে সোমলতার রস পান করতে হবে।
সোমলতার রস যা দেখতে একদম দুধের মত। শংকর কেবল সোমলতার রস পান করবে এমন সময় সেখানে হাজির হল এক জুব্বা পরিহিত উজ্জ্বল চেহারার জ্বীন। যার চোখমুখ দেখা যায়না শুধু চেহারা থেকে নূরের আলো ঠিকরে পড়ছে। জ্বীনটির নাম গালিব ইবনে জাব্বার।

গালিব ওখানে হাজির হতেই ওনার পিছনে শতশত মুমীন জ্বীন এসে দাড়ালো। গালীব সবাইকে নির্দেশ দিল পবিত্র আল কুরানের বিভিন্ন আয়াত দ্বারা এসব সমস্ত ব্যান কেটে দাও। আগে মেয়েটাকে বাঁচাতে হবে। তার মায়ের শেষ ইচ্ছা সফল করতেই হবে।

শংকর বিপদ উপস্থিতির টের পেয়ে জলদি সোমরস পান করেই বিদ্যার শরীরে তার ২য় সত্ত্বার চালান করে দিল। বিদ্যা সাথে সাথে ওর শীতঘুম থেকে বের হয়ে এল।
বিদ্যার জ্ঞান ফিরতেই ও চোখ খুলল আর ওর পা দু’টি উল্টা দিকে ফিরে গেল। একদম শক্তিশালী ছোট্ট পিশাচ কন্যাতে পরিনিত হল বিদ্যা। এখন জলদি শয়তানের উদ্দেশ্যতে বিদ্যাকে বলি দিতে পারলেই শংকরের সাফল্য লাভ হবে।

এই শয়তান পূজারী খামোস! এখন যদি তোর মন্ত্র পড়া বন্ধ না করে দিস তাহলে তোকে এমন শাস্তি দিব যা দেখে তোর রুহু কেঁপে উঠবে সাথে তোর শয়তান দুনিয়াকেও কাপাবো।

গালিবের এমন হুংকার শুনে শংকর মন্ত্রপড়া থামিয়ে দিয়ে বলল, “হে মুসলিম জ্বীন জগতের অধিপুরুষ, আমার কাজে আপনি বাঁধা দিতে আসলে আপনাকে এখানেই পুঁতে ফেলব। আপনার লাশের জানাযার ভাগ্যও হবেনা। তাই আমার পথ থেকে সরে দাড়ান।”

এই গ্রামের নিরাপরাধ ১৭ জন নরনারী কে হত্যা করেছিস, এক অসহায় নারীকে হত্যা করেছিস এবং তার নিষ্পাপ সন্তানকে হত্যা করার চেষ্টা করছিস। আমার পবিত্র কোরআন সাক্ষ্য দেয়,” বিনা অপরাধে একটা মানুষকে যে হত্যা করে, সে যেন পুরো পৃথিবীর মানুষকেই হত্যা করলো।”
আমি তোকে সাজা দেওয়ার ক্ষমতা রাখিনা কিন্তু আমার প্রভু নিশ্চয় তোকে কঠিন থেকে কঠিনতম সাজা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। সবচেয়ে কঠিন সাজা দিতে আমার প্রভুর থেকে উত্তম আর এই পৃথিবীতে কে আছে?

গালিব এক নারী জ্বীনকে আহ্ববান করে বলল,” তাহেরা, তুমি ঐ শিশুকন্যার পা সোজা করে চেপে ধর, বাঁকিটা আল্লাহ্ সুবহানাতালার রহমতে আমি সমাধান করছি।”

গালিবের কথা অনুযায়ী তাহেরা গিয়ে বিদ্যাকে ওর মায়াবলে আবদ্ধ করেই ওর পা দু’টি সোজা করে চেঁপে ধরলো। এতে বিদ্যা এমন গগনবিদারী চিৎকার দিল যার চিৎকার এই অন্ধকার রাতেও বহুদুর পর্যন্ত শোনা গেল।

গালিব একটা শুকনো হাঁসি দিয়ে বলল,” শংকর, আমি কেন তোর সাথে লড়াই করব! লড়াই করবে তো, আল্লাহ্ প্রদত্ত সেই শ্রেষ্ট ও পবিত্র বাণী, যা তিনি উপহার হিসেবে তার বান্দাদের দিয়েছেন। আমি সেই পবিত্রবানী দিয়ে তোকে আর তোর শয়তান দুনিয়াকে আঘাত করবো।”

“হে আমার প্রিয় মুমিন জ্বীন ভ্রাতাগন, তোমরা প্রস্তুত তো?”

“হ্যাঁ ভাই আমরা প্রস্তুত। আমরা শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে প্রস্তুত।”

“তাহলে দেরী কেন! আল্লাহু আকবার বলে শুরু করো।”

শতশত জ্বীন, যে যেখানে ছিল সেখান থেকেই
“আল্লাহু আকবার” বলে মধুর কন্ঠে আযান দিতে শুরু করলো।

হে আমার বন্ধুগন এই শয়তান ধংস না পর্যন্ত তোমরা আযান বন্ধ করোনা বলে গালিব পবিত্র জমজম পানি শংকরের উপর নিক্ষেপ করলো।

শংকরও থেমে নেই। ওর সমস্ত শক্তিকে আহ্ববান করে ও একবার হাতির রুপ ধরে আবার বিশাল সাপের রুপ ধরে ছোবল মারতে আসে। কখনওবা বিকট চেহারায় গালিবকে ওর পায়ের নিচে পৃষ্ট করতে চায়। কিন্তু কোন কিছুতেই কিছু হয়না। আযানের শব্দে শংকরের শরীরের চামড়া খসে পড়ে তারপর মাংস তারপর হাড়। এভাবে সব ঝলসে পড়ে সেখানে আগুন জ্বলে যায়। এক কালো অধ্যায় শেষ হয়ে গেল।

যে জাতি নিরাপরাধ শিশু ও নারীর উপর অত্যাচার করে সে জাতির ধংস অনিবার্য। ওরা সবাই বিদ্যাকে রেখেই ওখান থেকে চলে যায়।

খানিক পড়ে রঘুনাথ সহ ওর দুই ভাই এসে দেখে সেখানে পুজার সামগ্রী আর বিদ্যা ছাড়া কেউ নেই। বিদ্যার পা দিয়ে রক্ত ঝড়ছে। বিদ্যার কোন সেন্স নেই। রমেশ গিয়ে বিদ্যাকে কোলে তুলেই বলল,” দাদা, তোমার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা মনে হয় ভূল ছিল। জানিনা এর খেসারত আমাদের কি দিতে হবে।”

এমন সময় বাসা থেকে চিৎকার চেঁচামিচির শব্দ আসে। রঘুনাথ সহ সবাই দৌড়ে বাসায় গিয়ে দেখে অঞ্জনা অপুর লাশ নিয়ে চিৎকার করে বিলাপ করে কাঁদছে। রঘুনাথ ধপ করে মাটিতে পড়ে গেল। যার জন্য এত কিছু করা সেই তাদের ছেড়ে গেল।

পুরো বাসায় শোকের মাতাম চলতে লাগলো। শেষ রক্ষাও আর করা গেলনা। ঈশ্বর আমায় শাস্তি দিয়েছেন, ঈশ্বর আমায় শাস্তি দিয়েছেন বলে মাথা চাপড়াতে লাগলো রঘুনাথ। তারপর সেন্সলেস হয়ে পড়ে যায় রঘুনাথ।

একই দিন আর রাত মিলে মোট ১৯ জনের জিবন গেল শুধু মাত্র রঘুনাথের ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য।

তিন দিন পরে,

আজ তিনদিন পর বিদ্যার জ্ঞান ফিরেছে। পাশে অঞ্জনা সহ রঘুনাথ বসে আছে। ডাক্তার বাবু বিদ্যাকে চেকাপ করে বলল,” সমস্যা হওয়ার কথা নয়। যদি হয় আমাকে একবার খবর দিবেন।”

ডাক্তার চলে যেতেই অঞ্জনা বিদ্যাকে তুলে বলল,” কিছু খাবি বিদ্যা?”

“অপু দাদা কই?”

এবার অঞ্জনা ডুকরে কেঁদে সেখান থেকে বের হয়ে গেল। রঘুনাথ বিদ্যাকে কাছে টেনে বলল,” তোর দাদা নেই বিদ্যা, সে তো বিদেশ গেছে।”

” ই, বললেই হল! দাদা আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবেনা। দাদা কই বলেই বিদ্যা খাট থেকে নেমে হাটতে গিয়েই ধপ করে পড়ে গেল। সেখান থেকে কষ্ট করে উঠেই আবার দৌড় দিল অপুকে খুঁজতে। পুরো রুম, সাবার রুম, পুরো বাস সহ বাহিরের রাস্তা পর্যন্ত, বিজয়দের বাসাও খুঁজতেও বাদ দিলনা। কিন্তু কোথাও অপুকে খুঁজে পেলনা। ছোট্ট বিদ্যার বুকের ভিতর ধকধক করতে লাগল। এবার বিদ্যা অঞ্জনার কাছে গিয়ে অঞ্জনার আচল ধরে বলল,” ও জেঠি আমার দাদাকে কোথায় লুকিয়ে রাখছো, আমি আর তোমাদের জ্বালাতন করবোনা তবুও দাদাকে বের করে দাও।”

অঞ্জনা শুধু কেঁদেই চলছে কিছু বলতে পারছেনা। শেষে ওখান থেকে হাঁপাতে হাঁপাতে অনুরাধার কাছে গিয়ে বলে,” অনু দিদি তুমি জানো, আমার দাদা কোথায়? তুমি দাদাকে লুকিয়ে রাখছো, তাই না? ”

কেউ কোন কথা বলেনা। শুধু কেঁদেই চলে সবাই। বিদ্যা এবার রেগে গিয়ে উঠানে দাড়িয়ে দাদা,দাদা বলে চিৎকার দিতে লাগলো। কিন্তু ওর দাদা আসেনা।কাঁদতে কাঁদতে বিদ্যার গলা ভেঙ্গে গেল। যার জন্য এতদিন বিদ্যা এই বাসায় ছিল আজ সেই নেই। বিদ্যা যে জানেনা, তার অপু দাদা আর পৃথিবীতেই নেই। তাকে দু,দিন আগে কবর দেওয়া হয়েছে। সাপে কাটা রোগী বলে তাকে আর পোড়া হয়নি।

বিদ্যার সিঁদুর মুছে দেওয়া হল, শাঁখা খুলে নেওয়া হল। শাখা খুলতেই বিদ্যা চেঁচিয়ে উঠলো, “এটা আমার দাদা দিয়েছে, তোমরা কেন খুলে নিচ্ছো?”

” এটা আর পড়তে নেই মা বলে এক মহিলা বিদ্যার কাছ থেকে সধবার সমস্ত চিহ্ন মুছে ফেলল।”

বিদ্যাকে সবাই মিলে ধরে উঠানে বসে গোসল দিয়ে দিল। মাথার চুল কামিয়ে দেওয়া হল। সাদা ধবধবে ফ্রগ পড়ে দেওয়া হল। শুধু সাদা ভাত খেতে দেওয়া হল। বিদ্যা যে এখন শিশুবিধবা।

অপুকে ছাড়া বিদ্যাতো ভাত মুখেই তুলবেনা। দাদা এবার আসলে বলে দিব, তোমরা আমার চুল কেটে দিয়েছ, আমাকে খেতে দাওনা বলে বিদ্যা কেঁদে উঠলো।

বিদ্যার এমন দিন রাত আর্তনাদে সবার চোখের জল ঝরে। তারা বিদ্যার অপু দাদাকে কই পাবে! বিদ্যার যে তার অপু দাদাকে চাই চাই। অপুদাকে ছাড়া যে তার চলেনা……

চলবে………….[]

সরাসরি ওয়েবসাইট এ পড়ুন: https://nafisarkolom.com/2020/09/sidur-suddhi-07/

………………………………..
লেখিকা,
নাফিসা মুনতাহা পরী
———————————
© কপিরাইট: উক্ত কন্টেন্টটি লেখিকার সম্পদ। লেখিকার নাম এবং পেজ এর ঠিকানা না দিয়ে কপি করে নিজের নামে চালিয়ে অন্য কোথাও পোষ্ট করা আইনত দন্ডনীয়।
———————————-
আমার ব্যক্তিগত ফেইসবুক একাউন্ট: https://www.facebook.com/nafisa.muntaha

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here