সিঁদুর শুদ্ধি #নাফিসা মুনতাহা পরী #পর্বঃ৩৬

0
122

#সিঁদুর শুদ্ধি
#নাফিসা মুনতাহা পরী
#পর্বঃ৩৬
.

মহিলাটির কথা শুনে শর্মিষ্ঠা চলে গেল সেখান থেকে। এদিকে মহিলাটি বিদ্যার রুপ ধরে রুম থেকে বের হল। আর বিদ্যার রপী অবয়বটির লম্বা চুলের বেনী সাপের মত লকলক করতে লাগলো। এমন দৃশ্য দেখলে যে কেউ ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মারা যাবে।

মহিলাটি উল্টা পায়ে চলছে। ব্যাপক তৃষ্ণা পেয়েছে। আগে গলা ভিজিয়ে নেওয়া যাক। তারপর না হয় বিদ্যাকে দেখা যাবে। মহিলাটি এদিক ওদিক চাইতেই দেখলো, কাজের মেয়ে আলতা কেবল ওর সমস্ত কাজ শেষ করে রুমের দিকে যাচ্ছে। হাতে চুটকি মেরে মহিলাটি হাঁসতে হাঁসতে বলল,

—“শিকার পেয়ে গেছি। আজ এটাকে দিয়েই চালিয়ে নিব। কাল অন্যকিছুর ব্যবস্থা করা যাবে। আপাতত তৃষ্ণা মেটাই। এখানে তো আর আহারের অসুবিধা হবেনা। বাসা ভর্তি আহার আমার জন্য অপেক্ষা করছে।”

যেই কথা সেই কাজ বলেই মেয়েটার দিকে যেতেই, এমন সময় শ্যামল রুম থেকে বের হল। তারপর চেঁচিয়ে বলল,

—” শান্তি, ঘুমিয়েছিস তোরা? যদি না ঘুমাস তাহলে, আমাকে এক জগ জল দিয়ে যা তো?”

কথাগুলো বলে শ্যামল বাবু অপেক্ষা করতে লাগলো। এদিকে শান্তি ঘুমিয়ে পড়েছে তাই আলতা রুম থেকে বের হয়ে বোতলে জল ভরাতে গেল।

বৃদ্ধ মহিলাটি রেগে গিয়ে শ্যামলকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলো,

—” যা কাল করতে চাইলাম,তা দেখছি আজই করতে হবে। তোর দেখ্ছি মরার জন্য তর সইছেনা। এত জলদি উপরে যেতে চাইছিস! দ্বারা আমি আসছি।”

কথাগুলো বলে মহিলাটি এক নিমিষেই শ্যামলের কাছে গিয়ে হাজির হলো। তারপর লোলুপ দৃষ্টিতে শ্যামলের দিকে চেয়ে বলল,

—” তুই বৃদ্ধ হয়ে গেছিস, তাই তোর রক্তে স্বাধ নেই। কিন্তু বিদ্যাকে আমার ফাঁদে পা দেওয়ার জন্য তোর রক্তই টেষ্ট করতে হবে।”

শ্যামল বাবুর চোখ দু’টি অলরেডি মার্বেলের মত হয়ে গেছে। সে তার চোখের সামনে বিদ্যাকে দেখছে। এ যে বিদ্যা নয় সে সেটা খুব ভালো করেই বুঝে গেছে। বিদ্যারুপী অবয়বের দিকে তাকিয়ে জোড়ে চিৎকার দিয়ে বলল,

—” এই তুই কে! আর আমার মেয়ের রুপ ধরে কেন এখানে এসেছিস? কি তোর মতলব বল?”

বিদ্যারুপী মহিলাটি ভয়ংকর একটা হাসি দিয়ে বলল,

—” এখন আপাতত তোর যম। তোর রক্ত টেষ্ট করতে এসেছি। আমার কাজের সাফল্যর জন্য তোকে মরতেই হবে।”

কথাগুলে বলেই মহিলাটি চোখ বড় বড় করে তাকালো শ্যামলের দিকে। শ্যামল আর নড়াচড়া করার শক্তি পেলোনা। স্থির হয়ে দাড়িয়ে রইলো। মহিলাটি ওর হাতের দুটি নখ দিয়ে শ্যামলের ঘাড়ে দুটি ছিদ্র করেই দুর থেকে হা করতেই শ্যামলের ঘাড় থেকে রক্ত ছিটকে বের হয়ে ওর মুখে যেতে লাগলো। শ্যামল আস্তে আস্তে নিস্তেজ হতে লাগলো। এগুলো দৃশ্য দেখে পিছন থেকে আলতা গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠলো।

আলতার চিৎকারে মহিলাটি পিছন ফিরে আলতার দিকে চাইতে শ্যামল ফ্লোরে পড়ে গেল। আলতা দেখলো বিদ্যা ওর বাবার রক্ত এতক্ষন ধরে পান করছিল। এদিকে মহিলাটি আলতাকে দেখে রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ল। কিন্তু ততক্ষনে অনেকে তাদের রুমের দরজা খুলে বাহিরে এসেছে তাই সে সাথে সাথে অদৃশ্য হয়ে গেল।

সাথে সাথে ডাইনিং রুমের আলো জ্বালিয়ে দেখলো, শ্যামল নিচে পড়ে গঙ্গাচ্ছে। সাধনা দেবী একটা চিৎকার দিয়ে শ্যামল বাবুর কাছে এসে বলল,

—” এই তোমার কি হয়েছে, এত রক্ত কোথা থেকে এল?”

শ্যামল বাবুর ছেলেরা ধরাধরি করে বাবাকে গাড়ীতে তুলে সেই রাতেই হাসপাতালে নিয়ে গেল। আর আলতা জ্ঞান হারিয়ে ফ্লোরে পড়ে আছে। বাসায় এত কিছু হয়ে গেল কিন্তু বিদ্যাকে দেখা গেলোনা। বিদ্যা গভীর ঘুমে মগ্ন।

রিয়ার মা আলতার জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করতে লাগলো। খানিক বাদে জ্ঞানও ফিরে এল। জ্ঞান ফিরতেই আলতা হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলল,

—” আমি এই বাড়িতে কাম করুম না। এই বাড়িতে রাক্ষস আছে। ও সবাইকে একে একে খেয়ে ফেলবে।”

আয়ান আলতাকে ধমক দিয়ে বলল,

—” কি এসব বলিস? তোর মাথা পাগল হয়ে গেছে!”

আমি পাগল হই নাই। পাগল আন্নেরা হইছেন। আপনাগো বাড়ির মাইয়া একটা রাক্ষস। আমি নিজ চোখে দেখছি তারে। সে কর্তা বাবুর রক্ত চুষে খাচ্ছিল। আমি থাকবোনা এখানে। সকাল হলেই চলে যাব। বিদ্যা দিদি মানুষ না। সে মানুষ হতেই পারেনা বলে কাঁদতে লাগলো আলতা।

আলতার কথা শুনে প্রথমে শর্মিষ্ঠা কেঁপে উঠলো। সে তাহলে কাকে বাসাতে এনেছে। ওহ্ ভগবান, রক্ষা করো আমায়। আমি কতবড় ভূল করেছি তাকে এনে। সে তো মানুষ না। আমি এখন কি করবো? যদি এরা জেনে যায় তাহলে আমাকে এক মুহুত্তের জন্যও বাসায় রাখবেনা।

বাসায় এহেন কান্ডে কেউ আলতার কথা বিশ্বাস করতে পারলোনা যে, বিদ্যাই এমন কান্ড ঘটিয়েছে। সাজিত আলতার কথা শুনে থমকে গেছে। তাহলে তার ধারনা ভূল ছিল? বিদ্যা ওর মায়ের মতই পিশাচ হয়ে উঠেছে! নাহ্ এটা হতে পারেনা। পিশাচ হলে তো অনেক আগেই ওর রুপ দেখাতে পারতো। তাহলে ও এখন কেন এসব দেখাতে যাবে, তাও দাদার সাথে। যে দাদাকে ও বাবা বলে জানে! তাছাড়া ও দাদাকে প্রচন্ড ভালোবাসে। ওর দ্বারা এটা সম্ভব নয় বলে সাজিত বিদ্যার রুমের দিকে ছুটলো। কিন্তু বিদ্যার রুম লক দেখে আবার ছুটলো চাবি আনতে।
সাজিত চাবি এনে সবার অগচরে দরজা খুলে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে লাইট জ্বালিয়ে দেখলো, বিদ্যার মুখ ভর্তি রক্ত। এমন দৃশ্য দেখে সাজিতই ভয় পেয়ে গেল। তারপরও সাজিতের মন বলছে, বিদ্যা কিছুতেই এসব করতে পারেনা। সবাই ওকে দেখে ফেলার আগে আমাকেই সব করতে হবে। সাজিত একটা কাপড় জল দিয়ে ভিজে এনে বিদ্যার মুখ মুছে দিল। তারপর বিদ্যাকে আস্তে আস্তে ডাকতে লাগলো।

সাজিতের ডাকে বিদ্যা চোখ মেলে দেখলো, ওর কাকাই ওকে ডাকছে। বিদ্যা বিছানা থেকে উঠার চেষ্টা করলো কিন্তু উঠতে পারলোনা। অবসাদে ওর গা পরিপূর্ন হয়ে গেছে। চোখ মেলাতেই ওর কষ্ট হচ্ছে।

সাজিত বিদ্যাকে ঝাকিয়ে বলল,

—” মা, এমন করছো কেন! তোমার কি হয়েছে?”

বিদ্যা আরেকবার উঠার চেষ্টা করলো, কিন্তু কিছুতেই উঠতে পারলোনা। বিদ্যা অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠলো,

—” কাকাই, আমার শরীরে শক্তি পাচ্ছিনা। আমি উঠতে পারছিনা কেন? আমার কি হয়েছে?”

সাজিত বিদ্যার কথা শুনেই একমুহুত্ত্ব দেরী না করে বিদ্যা পায়ের তালু জোড়ে জোড়ে মাসেজ করতে লাগলো। বৃন্দার এমন হত আগে। মাঝে মাঝে সাজিতকে এই কাজ করতে হত। সাজিত মনে মনে ভগবানকে ডেকে বলল,

—” আমার মেয়েটাকে সুস্থ করে দাও ভগবান। আমি আমার মেয়েকে আর হারাতে চাইনা।”

সাজিতের চেষ্টায় বিদ্যা আস্তে আস্তে ঠিক হতে লাগলো। শেষে পুরোদমে ভালো হয়ে গেল বিদ্যা। এবার সাজিত বিদ্যার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

—” মা, তোমার যা যা সমস্যা হবে, সেগুলো তুমি আমায় নির্দিধায় বলো। আর তোমার সাথে যাই ঘটুকনা কেন তুমি নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করবে। এটা সব সময় মনে রাখবা, পুরো পৃথিবী তোমার বিপক্ষে চলে গেলেও এই আমি তোমার পাশে সর্বদা সবসময় থাকবো। নিজেকে কখনো একা ভাববেনা।”

কথাগুলো বলে সাজির আর এক মুহুত্ত্বও দেরি করলোনা। রুম থেকে বের হয়ে গেল। এদিকে চিৎকার চেঁচামিচি যেন বেড়েই গেল। এত শব্দ হচ্ছে কেন! কি হয়েছে নিচে বলেই বিদ্যা বেড থেকে নেমেই ছুটলো সেখানে।

বিদ্যাকে সবাই দেখে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো ওর দিকে। বিদ্যার ভিতর কোন খারাপ লক্ষন দেখলোনা তারা। কিন্তু আলতা চিৎকার দিয়ে বলল,

—” এই পোষাক পড়েই দিদি তার বাবাকে আক্রমন করেছিল। আজ কর্তা বাবুকে মারার চেষ্টা করেছে, কাল আমাকে মারবে। একে একে বাড়ীর সব মানুষকে সে খেয়ে ফেলবে। আমি আজই বাড়ী থেকে চলে যাব।”

এদের এমন কথা শুনে বিদ্যা বিশ্মিত হয়ে বলল,

—” বাবা, বাবার কি হয়েছে?

দেখ, দেখ এখন আবার নাটক করছে বলেই ঐ মহিলাটি উপর থেকে নিচে নেমে আসলো। তারপর বিদ্যার সামনে এসে দাড়িয়ে বলল,

—” আলতা বলছে, তুমি নাকি পিশাচকন্যা। ও নিজের চোখে দেখে তুমি নাকি তোমার বাবার রক্ত চুষে খেয়েছ। সে এখন হসপিটালে মৃত্যুর প্রহর গুনছে।”

মহিলাটির কথা শুনে বিদ্যা রেগে গিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলো,

—” আপনি পাগলের মত কি প্রলাপ বকছেন? আমি কেন বাবাকে এসব করতে যাব!”

কেন করেছ সেটা তুমি নিজেই ভালো জানো। আমার কথা না বিশ্বাস হলে তুমি তোমাদের কাজের মেয়ে আলতাকে জিঙ্গেস করোনা। সেই তোমার প্রশ্নের জবাব দিবে।

শর্মিষ্ঠা তোমার জেঠিকে আমার পরিবারের ব্যাপারে নাক গলাতে নিষেধ করো। অযথায় উনি বেশি বেশি কথা বলছেন। কথা গুলো বলতে বলতে সাজিত বিদ্যার কাছে আসলো। তারপর বিদ্যাকে বলল,

—” আমি দাদার কাছে যাচ্ছি। তুমি যাবে আমার সাথে?”

বিদ্যা কোন কথা বলার সুযোগ পেলোনা তার আগেই সাজিত ওর হাত ধরে টেনে বাহিরে নিয়ে গেল। আয়ানও পিছন পিছন ছুটলো ওদের সাথে।

ওদের এহেন কান্ড দেখে মহিলাটি রেগে থমথম করে উপরে উঠে গেল। পিছন পিছন শর্মিষ্ঠাও চলে গেল। মহিলাটি রুমে ঢুকতেই শর্মিষ্ঠা রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে বেশ রাগের সাথে বলল,

—” আপনি কে, আর দাদার সাথে কি করেছেন বলেন তো! আমি ভালো করেই বুঝতে পেরেছি, আপনাকে বাসায় এনে আমি কতবড় ভুল করেছি। না জানি এই ভুলের মাসুল আমায় কিভাবে দিতে হবে? আপনি এখুনি আমার সামনে থেকে চলে যান।”

মহিলাটি শর্মিষ্ঠার কথা শুনে প্রচন্ড রেগে গেল। আমাকে নিয়ে আসার আগে তোর মনে ছিলোনা! এখন এসে আমার সামনে তোখম দেখাস! আমার মেজাজ প্রচন্ড খারাপ তাই আমাকে রাগাবিনা। নিজের ভালো চাসতে এখান থেকে এখুনি চলে যা।

আমার বাসায় থেকে আমাকে ধমকান বলেই শর্মিষ্টা মহিলাটিকে ঠাস্ করে একটা চড় বসিয়ে দিল। এই, তুই এখুনি বাসা থেকে বের হ। তোর সাহার্য্য আমার দরকার নেই।

আমার গায়ে হাত তোলা! তোর এত সাহস হয়ে গেছে যে আমার মত এক রক্ত খেকো জানোয়ারের গায়ে হাত তুলিস! কথা গুলো বলে মহিলাটি খপ করে শর্মিষ্ঠার গলা চেপে ধরে শূন্যতে তুলেই শর্মিষ্ঠার মুখের সামনে নিজের মুখটা নিয়ে গিয়ে ওর আসল চেহারায় চলে আসলো।

শর্মিষ্ঠা মহিলাটির চেহারা দেখেই আৎকে উঠলো। ভয়ংকর মুখশ্রী দেখে শর্মিষ্ঠা চিৎকার দিতেই মহিলাটি শর্মিষ্ঠার গলায় জোড়ে চাপ দিল। সাথে সাথে শর্মিষ্ঠার আওয়াজ অফ হয়ে গেল।
শোন, তুই আমার উপকার করেছিস এই বাড়িতে এনে। তাই তোকে কিছু বলতে চাইনা। আর ফের যদি আমার কাজে বাঁধা দিতে আসিস তাহলে তোর ধর থেকে মাথাটা আলাদা করে আমি তোর কাটামাথা দিয়ে ফুটবল খেলবো। কথাটা মনে রাখিস বলেই মহিলাটি শর্মিষ্ঠাকে ছুড়ে মেরে হাওয়া হয়ে গেল।

টুইংকেলের সামনে রত্না আর তার স্বামী ধীরাজ সান্যাল দাড়িয়ে আছে। ঋষি টুইংকেল কে আঘাত করেই বলল,

—” বল, অভি কে! ওর আসল পরিচয় কি? ওর বাবা-মা কে? ও কোথা থেকে এসেছে?”

ঋষির কথায় টুইংকেল কোন মুখ খুললোনা কিন্তু যা কান্ড ঘটালো, সেটা ছিল ওদের ধারনার বাহিরে। টুইংকেল হা করেই ওর মুখ থেকে বিষাক্তময় ধোয়া ছাড়লো। তাতেই ঋষি চোখ মুখ ধরে একটা চিৎকার দিল। মা আমার চোখমুখ জ্বলে যাচ্ছে। আমি কিছু দেখতে পাচ্ছিনা।

রত্না দ্রুত ঋষিকে সরিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল। কিন্তু যাওয়ার আগে বলে গেল,

—” এই মহিলাকে তো আমি দেখেই ছাড়বো। ওর জ্বীভ যদি টেনে না ছিড়তে পেরেছি তো আমার নাম লালপ্রভা নয়।”

ওদের অসহায়ত্ত্ব দেখে টুইংকেল শুধু মিটমিটিয়ে হেঁসেই গেল। তারপর মনে মনে বলল, “তোদের আরো খেলা দেখানোর আমার বাঁকি আছে।”

পরেরদিন বিকেল বেলায় শ্যামল বাবুকে হসপিটাল থেকে আনা হলো। ওনাকে প্রচুর রক্ত দিতে হয়েছে। শরীরে রক্ত শূন্যতা দেখা দিয়েছিল। বেশ রক্তক্ষরনে পুরো শরীর প্যারালাইজড হয়ে গেছে। শুধু ছলছল চোখে সবাইকে দেখে। ভালো মানুষ ঘুমালো আর কিছুক্ষন পড়েই এমন অবস্থা সেটা বাসার কেউ মেনে নিতে পারছেনা। বিদ্যাকে তেমন কেউ কিছু বলেনি কিন্তু সন্দেহের চোখে সবাই ওকে দেখছে। বাসায় নিয়ে আসার পর থেকে বিদ্যা ওর বাবার হাত ধরে আছে। বিদ্যা কাঁদছে আর বলছে,

—” বাবা, এসব কি করে হল?”

এমন সময় শর্মিষ্ঠা এসে বলল,

—” তুমি এসব করে আজ বলছো, এসব কি করে হল? এত মিথ্যা কথা তুমি কিভাবে বলতে পারো বিদ্যা। তোমার কি লাজলজ্জা বলতে কিছুই নেই?”

—” কাকি কি বলছেন এসব? বিদ্যা এগুলো করতে যাবে কেন? আপনি এসব কথা আর বলেন না প্লিজ।”

রিয়ার মায়ের কথা শুনে শর্মিষ্ঠা কিছু না বলে চলে গেল। কারন সে জানে, বিদ্যা এসব কিছুই করেনি। কিন্তু ঐ মহিলার ভয়ে সব কিছু করতে হচ্ছে।”

বিদ্যা বুঝতে পারছেনা ওরা কেন এসব কথা বলছে। কিন্তু বিদ্যা জানেনা আজ ওর জন্য আরও কি সারপ্রাইজ লুকিয়ে আছে।

রাতে সবাই সবার খাওয়া দাওয়া শেষ করে যে যার রুমে সুয়ে পড়েছে। যখন রাত গভীর হলো তখন একটা বিকট শব্দ হল। শব্দটা ছিল আয়ানের চিৎকার। আয়ানের চিৎকার শুনে ওর মা ধড়পর করে উঠে বিছানায় বসল। আজ আয়ানের সাথে ওর বাবা-মাও ঘুমিয়ে ছিল। তারা উভয়ে দেখে বিদ্যা আয়ানের বুকের উপর বসে ওর রক্ত পান করছে।

আয়ানের বাবা আর মা দু’জনেই বিদ্যাকে সরানোর জন্য চেষ্টা করলো কিন্তু কিছুতেই কিছু হলোনা। আয়ানের বাবা ট্রী টেবিল তুলেই বিদ্যা রুপী অবয়কের
মাথায় একটি বাড়ি বসিয়ে দিল। তাতেই কাজ হল। বিদ্যা রুপী অবয়বটি ওদের দিকে পিছন ফিরেই দাঁত বের করে ফ্যাস ফ্যাস গলায় বলল,

—” আমাকে আঘাত করে ভালো করলিনা। এর জন্য তোদের সবাইকে পস্তাতে হবে।”

কথাগুলো বলেই সে ভ্যানিস হয়ে গেল। এদিকে আয়ান কাটা মুরগীর মত ছটপট করতে লাগলো। এদিকে বাহিরে সবাই এসে ওদের দরজা ধাক্কাতে লাগলো। আয়ানের বাবা আয়ানকে কোলে নিতেই আয়ানের মা দরজা খুলেই বলল,

—” দাদা গাড়ী বের করুন। আয়ানের অবস্থা খুব খারাপ।”

আয়ানের আবার কি হলো বলতেই আয়ানকে নিয়ে ওর বাবা দৌড়ে নিচে গেল। সবাই এমন ঘটনা ঘটায় ভিষন ভয় পেয়ে গেল। শেষে সাজিত আয়ানের সাথে হসপিটালে চলে গেল। কিন্তু আয়ানের মা না গিয়ে সোজা বিদ্যার দরজায় গিয়ে নক করলো। খুলতে দেরী হচ্ছে বলেই জোড়ে জোড়ে দরজা ধাক্কাতে লাগলো আয়ানের মা আকাশী ত্রিবেদী।

এমন দরজা ধাক্কানো শব্দে বিদ্যার ঘুম ভেঙ্গে গেল। দরজায় এমন কড়া ঘাত হচ্ছে যার জন্য মনে হচ্ছে এখুনি দরজা ভাঙ্গলো বলে। বিদ্যা বেড থেকে উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই আকাশী বিদ্যার চুল ধরে টেনে হিচড়ে সবার সামনে এনে দাড় করালো। তারপর ঠাশঠাশ করে কয়েকটা থাপ্পড় মেরে বলল,

—” আজ যদি আমার ছেলের কিছু হয় তাহলে তোকে জান্ত আগুনে পুরে মারবো।”

বিদ্যা গালে হাত দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—” বৌদি, আমি কি করেছি! আমার সাথে তোমরা সবাই কেন এমন ব্যবহার করছো?”

এমন সময় কাজের মেয়ে শান্তি চিৎকার দিয়ে ওঠে। দৌড়াতে দৌড়াতে সবার কাছে এসে থেমে ভয়ার্ত কন্ঠে বলে উঠলো,

—” আলতা, আলতার কি যেন হয়েছে। আ…মি এখানে থাকবোনা। স…কা..ল হলেই আমি চলে যাব। বাড়িতে সত্যিই রাক্ষস এসেছে।”

বাকি কথাগুলো আর বলতে পারেনা। তার আগেই জ্ঞান হারিয়ে ফ্লোরে পড়ে যায় শান্তি। রিয়ার বাবা আর সেজো কাকা দৌড় দিল আলতার ঘরে। গিয়ে দেখে ওর ছিন্ন-বিন্ন লাশ পড়ে আছে। এতিম মেয়েটার শেষ পরিনিতি যে এটা হবে সেটা কেউ ভাবতে পারেনি। ওরা ওখান থেকে এসে বলল,

—” আলতা মারা গেছে। মনে হচ্ছে ওর শরীর কেউ খুবলে খুবলে খেয়েছে।”

আকাশী পাগলের মত হয়ে গেল এ কথা শুনে। আমি জানি, বাবা আর আলতার মত আমার ছেলেটারও এমন কিছু হবে। বিদ্যাকে একটা ধাক্কা দিয়ে বলল,

—” এই মেয়েটা সত্যি কি আপনার সন্তান! মুখ খুলুন মা! আজ আমার সন্তান গেছে কাল রিভা বা তমালের উপর আঘাত হানবে। সময় থাকতে বলুন মা ও কে?”

সাধনা দেবী কিছু না বলে নিঃশব্দে কেঁদেই চলছে। তার নিরবতা বলে দিচ্ছে বিদ্যা তার সন্তান না। বিদ্যা চুপ করে ওর মায়ের দিকে এক নজরে চেয়ে আছে। আকাশী এবার সাধনা দেবীকে চেঁপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—” মা, আমাদের ২/৩ করে সন্তান নেই। আমাদের এই একটা করেই সন্তান রয়েছে। ঐ ১জনকে বাঁচাতে গিয়ে আমাদের সন্তানদের জিবন শেষ করে দিয়েননা। আপনিও একজন মা। তাই আমাদের কষ্ট আপনি বুঝতে পারবেন।”

সাধনা দেবী কিছু বলতে পারছেনা। মাথা নিচু করে শুধু কেঁদেই চলছে। এমন সময় রিয়ার বাবা মুখ খুলল। বিদ্যা আমাদের কেউই না। মা ওকে কোথায় থেকে এনেছে তা আমরা জানিনা। ওর সাথে আমাদের রক্তের কোন সম্পর্ক নেই।

আকাশী বিদ্যার হাত ধরে আরো কয়েকটা থাপ্পড় মেরে বলল,

—” যেই বাসার মানুষগুলো তোকে এত আদর দিয়ে মানুষ করলো, তাদেরও তুই ছাড়লিনা! মানুষ তো ঋনও শোধ করার ও কথা ভাবে আর তুই কিনা তাদেরই রক্ত পান করলি!”

রিয়ার মা এসে আকাশীকে ধরেই একটা থাপ্পড় মেরে বলল,

—” মা অস্বীকার করছে বিদ্যা মার মেয়ে নয়। কিন্তু আমি বলছি, বিদ্যা আমার মেয়ে। আমি কখনো বিশ্বাস করিনা বিদ্যা এমন কাজ করেছে।”

এবার সাধনা দেবী আর থেমে থাকতে পারলোনা। সব প্রমাণ বিদ্যার বিপক্ষে। তাছাড়া বিদ্যা একজন পিশাচ কন্যা। একজনের জন্য এতগুলো প্রান হারাতে দেওয়া যায়না। সাধনা দেবীর মুখ থেকে শুধু একটা কথায় বের হল। বিদ্যা এখান থেকে তুই সারা জিবনের জন্য চলে যা।

এমন কথায় ঐ বৃদ্ধা মহিলাটি বলে উঠলো,

—” মা, অমন কথা মুখে তুলবেনা। আজ তোমার পরিবার খেয়েছে কাল সে অন্যর পরিবার খাবে। তাই ওকে মেরে ফেলার ব্যবস্থা করো। আমার একজন চেনা তান্ত্রিক মা আছে। সে এরকম বহু পিশাচদের শেষ করে দিয়েছে।”

শুধু রিয়ার মা বাদে সবাই বিদ্যার বিপক্ষে। তারা এর শেষ দেখতে চায়। ইতিমধ্য ৩ প্রানে সে হামলা করেছে। বিদ্যাকে তারা শিকল দিয়ে বেঁধে ফেলল। কাল সকাল হলে ঐ তান্ত্রিক মা এর বিহিত করবে।

বিদ্যার কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। এত বড় ধাক্কা সে নিতে পারেনা। কাঁদতে কাঁদতে চোখের জল শুখিয়ে গেছে। একমনে তার শেষ সম্বল অভিকে ডেকেই চলছে। অভি, তোমাকে আমার খুব প্রয়োজন। তুমি ছাড়া আমার আর পৃথিবীতে কেউ নেই।
I miss your face Ovi.
your smile, voice, Easy,message, Everything
Please don’t Ignore me.
please don’t leave me.
I really miss you.

বিদ্যার মন বলছে এই বুঝি অভি তাকে এখুনি এখান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে। কিন্তু অভি আর আসেনা। বিদ্যার কান্নার আওয়াজ বেড়ে যায়। রাতের নিঃস্তব্ধতাকে ছেদ করে ওর কান্নার আওয়াজ অনেকের কানে পৌছে যায় কিন্তু কারো দয়া হয়না ওর উপর।

বিদ্যা দেয়ালে মাথা লাগিয়ে চুপচাপ বসে আছে। এমন সময় একটা মাঝারি ছাড়া ওর দিকে আসতে লাগলো। ছায়টা আরো স্পষ্ট হয়ে রিভার রুপে রুপান্তরিত হলো। এ যে রিভা।

রিভা এসে দ্রুত শিকলের চাবি খুলে বিদ্যার শরীর থেকে শিকল সরিয়ে দিয়ে বিদ্যাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। পিসি, আমি কখনো বিশ্বাস করিনা তুমি এমন কাজ করবে। ওরা তোমাকে কাল মেরে ফেলবে। তুমি এখুনি এখান থেকে চলে যাও।

—“না রিভা, আমি যদি পালিয়ে যাই তাহলে এরা ভাববে আমিই কাজটা করেছি। আমি চাইনা এমন তারা ভাবুক। তুই চলে যা এখান থেকে।”

তুমি বেঁচে থাকলেতো প্রমান করবে তুমি নির্দোশ! আগে তুমি নিজে বাঁচো তারপর প্রমান করো। রিভা বিদ্যার হাত ওর মাথার উপর রেখে বলল,

—” প্লিজ পিসি, কেউ দেখার আগে তুমি এখান থেকে চলে যাও। আচ্ছা তোমার বাঁচার ইচ্ছা নেই তো! ঠিক আছে, আমি একটা জব পেয়ে তোমার কাছে শিফট্ হয়ে যাবো। আমিও এখানে আর থাকবোনা। ততোদিনে পর্যন্ত আমার জন্য হলেও বাঁচো।”

বিদ্যা রিভাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল,

—” ভালো থাকিস বাবা, আর সবার খেয়াল রাখিস।”

রিভা বিদ্যাকে নিয়ে পরপর দুটো সাড়ি একসাথে ব্যালকোনিতে বেঁধে সেদিক দিয়ে বিদ্যাকে চলে যাওয়া রাস্তা করে দিল।
বিদ্যা সাড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল। তারপর রাস্তায় নেমেই প্রানপনে দৌড়াতে লাগলো।

বৃদ্ধ মহিলাটি ছাদের উপর থেকে বিদ্যার দৌড়ানো দেখে বিকট শব্দে হেঁসে উঠলো। দৌড়া বিদ্যা দৌড়া। যত দৌড়াতে পারিস দৌড়া। চেষ্টা কর, আমার হাত থেকে বাঁচতে পারিস কিনা! আমার শুধু তোর মৃত বডি চাই।

এবার মহিলাটি ওর আসল রুপে এসেই উড়াল দিল বিদ্যার পিছু পিছু। মহিলাটি বাসার সীমানা পার হতেই , সাথে সাথে মহিলাটির দুই পাখায় হকিষ্টির মত কিছু একটা দিয়ে প্রচন্ড শক্তিতে বারি বসাল। অচমকায় এমন আঘাত মহিলাটি সহ্য করতে না পেরে ঠাস করে মাটিতে পড়ে গেল এবং অসহ্য ব্যাথায় গোঙ্গানির আওয়াজ তুলতে শুরু করলো। অভি এসে মহিলাটির টুটি চেপে ধরে বলল,

—” আমি হলাম বাজ পাখি
মুক্ত আকাশে সবচেয়ে উঁচু স্তরে উড়ি এবং
শূন্যতে শিকার করি।”

আজ তোকে শিকারের পালা। অপেক্ষায় ছিলাম তুই কখন বাসা থেকে বের হবি। আজ তোর আর্তচিৎকারই হবে আমার সুখ।

[] চলবে……[]

বিদ্রঃ পোষ্ট ইডিট করা হয়নি। ভুলক্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখে পড়ে নিবেন।

সরাসরি ওয়েবসাইট এ পড়ুন: https://nafisarkolom.com/2020/11/sidur-suddhi-36/

আমার ব্যক্তিগত ফেইসবুক একাউন্ট: https://www.facebook.com/nafisa.muntaha

চাইলে আমার গ্রুপে জয়েন করতে পারেন: https://www.facebook.com/groups/nafisarkolom

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here