সিঁদুর শুদ্ধি #নাফিসা মুনতাহা পরী #পর্বঃ২৭

0
134

#সিঁদুর শুদ্ধি
#নাফিসা মুনতাহা পরী
#পর্বঃ২৭

.
সচ্ছ খুব সুন্দর একটা কাচের জার। এমন জার কোন মানুষ দেখেছে কিনা, তা বলা কঠিন। গোলাকার জারের উপরে খোদাই করা আর সেসব খোদায়ে সোনার ও রুপার পাত বসানো। জারের মধ্য এক আঙ্গুল সমান একটা ধোঁয়াশা অবয়ব ছটপটিয়ে চলছে। জারটি হাতে নিয়েই একটা পুরুষ তার সুবিশাল পরিপাটী বিছানায় সুয়ে পড়ে চোখ বন্ধ করলো। তারপর তৃপ্তিভরে বলে উঠলো,

–” আমি এসে গেছি বিদ্যা। কত সময় ধরে তোমার জন্য অপেক্ষায় আছি, শুধু নিদিষ্ট সময় অবদি। আমি তোমাকে কখনো নিজের চোখে দেখিনি কিন্তু এবার দেখতে চলছি একদম তোমার কাছে থেকে। আমি তো শুধু তোমার দ্বিতীয় সত্ত্বাকে নিজের কব্জাতে রেখেছি। এখন শুধু ঐ মানুষ সত্ত্বাকে আমার চাই।”

এমন সময় ঋষি বলে ডেকে উঠতেই পুরুষটি কাঁচের জারটি সরিয়ে ফেলল চোখের সামনে থেকে। হুইল চেয়ারে করে একটি মেয়ে মিসেস. রত্না সান্যালকে ঋষির রুমে নিয়ে এল। রক্ত বর্ন চোখে ঋষির দিকে চেয়ে বেশ দরাজ কন্ঠে বলে উঠলো,

–” ঋষি, তুই কি ঐ জার আমার রুম থেকে নিয়ে এসেছিস? নিয়ে থাকলে এখুনি আমাকে ফেরত দে।”

ঋষি ধরা পড়ে গেছে তাই ওর মাকে জারটা ফেরত দিল। তারপর বলল,

–” মা, বিদ্যাকে আমাদের হত্যা করতেই হবে?”

–” হুম, তাছাড়া আমরা এই দ্বিতীয় সত্ত্বাকে কোন কাজে লাগাতে পারবোনা। কাজটা আমাদের দ্রুত করতে হবে।”

–” ওকে মা, আমি কালই ওর সাথে দেখা করতে যাব।”

হুম, তবে খুব সাবধানে কাজ করবি। ২৫ বছর আগে ওর মা আমার দু’টো পা কেটে ফেলেছে। তার শোধ কি আমি নিবোনা! তার জন্য ওর স্বামী অপুকে আমি হত্যা করেছি আমার ছোবল মরন বিষে। আজ থেকে ওর পালা শুরু।

ঋষি শুধু কথাগুলো শুনে মন ভার করে রইল। কতদিনের সুপ্ত ভালবাসা সে মানুষ সত্ত্বা বিদ্যার জন্য তুলে রেখেছিল কিন্তু তাকেই হত্যা করতে হবে। তাকে হত্যা না করলে চলবেওনা।

সকাল আটটা,
ফোনে কলের উপর কল আসছে কিন্তু রিসিভ হচ্ছেনা। বিদ্যা তাড়াহুড়া করে ওয়াসরুম থেকে বের হয়ে এসে দেখলো, বিজয়ের নাম্বার স্কীনে ভাসছে। বিদ্যা একবুক আশা নিয়ে কলটা রিসিভ করলো। হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে বিজয় কেটে কেটে বলল,

–” বৌদি, আমি পারলামনা কাজটা করতে। যে ছেলে দু’টোকে পাঠিয়েছিলাম তাদের সেন্সলেস অবস্থায় শশ্মান ঘাট থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো তাদের জ্ঞান ফিরেনি। আমি বুঝতে পারছিনা এখন কি করা উচিত আমার।”

বিদ্যা শুধু চুপ করে কথাগুলো শুনলো। তারপর খানিকক্ষণ চুপ থেকে থেকে আবার বলে উঠলো,

-” বিজয় দা, মোড়ের জিগা তলায় যে মসজিদটা আছে সেই ঈমামের নাম্বারটা আমাকে দিন তো? আর শোনেন, আপনি আমার সাথে আর যোগাযোগ করবেন না। তাছাড়া সুধারাম মামা যদি কিছু জানতে পারে তাহলে সব নষ্ট হয়ে যাবে।”

ওকে বৌদি বলে বিজয় কল কেটে দিয়ে বিদ্যাকে ঐ ঈমামের নাম্বার মাসেজ লিখে সেন্ড করে দিল। বিদ্যা দ্রুত সেই নাম্বারে কল দিল।

মসজিদের ঈমাম সাহেবের নাম বেলাল হোসেন। উনি কল রিসিভ করতেই বিদ্যা বলে উঠল,

–” আসসালামু আলাইকুম ভাই। আমি বিদ্যা, চ্যাটার্জী বাড়ীর অপু আছে না! আমি ওনার ওয়াইফ।”

বেলাল হুযুর অপুকে খুব ভালো করেই চিনতো। বেচারা ছেলেটা অল্প বয়সে মারা গেছে। এক সাথে কত খেলাধুলা করেছি একসময়। একসাথে পড়াশোনা করেছে তারা। ওর কথা মনে পড়তেই সারা শরীর বিস্বাদে ভরে উঠলো। তারপর ঢোক চিপে বলল,

–” হ্যা বৌদি চিনতে পেরেছি। কিছু দরকার ছিল?”

আমার কিছু কাজ করে দিতে হবে বলে সব কথা খুলে বলল বিদ্যা। বিদ্যা শুধু বলল, অপুর কবর থেকে কিছু খারাপ তান্ত্রিক ওর দেহাবশেষ নিয়ে কালোজাদুতে প্রয়োগ করতে চায়। ওরা যেন কবর থেকে কিছু সংগ্রহ করতে পারেনা। কেউ যেন বিষয়টা জানতে না পারে।
আমার এই উপকারটা করেন ভাই।

–” জ্বী বৌদি, কাজটা আমি করে দিব। আপনি চিন্তা করবেন না। আমি কাজটা করেই আপনাকে জানাবো।”

–“আপনার এই উপকার আমি কোনদিনও ভুলবোনা। আমি রাখছি। আপনি কাজটা করে আমাকে জানাবেন প্লিজ।”

–” বৌদি, আপনি কি দেশে নেই?”

–” না ভাই, আমি বাংলাদেশে আসছি। আমি ওখানে থাকলে তো কোন কষ্টই আপনাকে করতে হতোনা। আমার নিজের সমস্যা নিজেই মিটিয়ে ফেলতাম।”

ওকে বৌদি ভাল থাকবেন বলে বেলাল হুযুর ফোনটা কেটে দিয়ে চুপ করে বসে পড়লেন। আমাদের বাচ্চা বয়সী মেয়ে সেই কবে বিধবা হয়েছে কিন্তু এখনো পর্যন্ত বিয়ে করেনি। ছোট বেলায় ক’দিন সময় কাটিয়েছে অপুর সাথে! তারপরও এখনো সেই মায়া কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

গতকাল অফিসে যাওয়া হয়নি। আজ যেতেই হবে। কলকাতা থেকে স্যার অনেকবার কল দিয়েছেন। এখনো কথা বলা হয়নি। অফিসে গিয়ে কথা বলতে হবে। বিদ্যা একটা সাদা শার্ট সাথে ব্লাক কালার ব্লেজার, প্যান্ট, ব্লাক সু এবং গলায় টাই বেঁধে সব দরকারি ফাইল নিয়ে নিচে নেমে আসল।

সাধনা দেবী নাস্তা রেডী করেই রেখে ছিলেন। এখনো কেউ খাবার খেতে নিচে আসেনি বলে সাধনা দেবী মনে কিছুটা সাহস জুগিয়ে বিদ্যার মুখে মাখন মেশানো ব্রেডটা তুলে দিয়েই বলল,

–” একটা কথা বলি মা?”

বিদ্যা খেতে খেতেই অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠলো,

–” হুম, বলো।”

–” তুই যে গতকাল বললি, তোর নাকি রক্তের পিপাসা লাগে! কথাটা কি সত্যা? মিথ্যা বলবিনা কিন্তু?”

–” মা কি সব বল! আমার রক্তের পিপাসা জাগবে কেন? কি সমস্যা বলতো! কয়েকদিন থেকে তুমি এমন কথা বলছো? আমি কি পিশাচ?”

সাধনা দেবী চট করে মেয়ের মুখ চেপে ধরে বললেন,

–” খবর দার এমন কথা মুখেও তুলবিনা। আমিতো এমনি কথাগুলো বলেছি। আর বলবোনা। আজ থেকে তোকে সাজিত অফিসে নিয়ে যাবে এবং নিয়ে আসবে।”

–” মা আমিতো একাই যেতে পারবো। শুধু শুধু ওনাকে কেন কষ্ট দিবে বলতো! তাছাড়া কাকি জানলে সবার সামনে বলে উঠবে, তার বরকে তুমি আমার ডাইভার বানিয়ে ছেড়েছো।”

এদের মা মেয়ের কথা শেষ না হতেই সাজিত চলে আসলো। সাধনা দেবী ওর খাবার বাড়তেই সাজিত না করে বলল,

–” অফিস গিয়ে খাব। বিদ্যা, তোমার হয়েছে?”

বিদ্যা অসুন্তষ্ট চিত্তে ওর মায়ের দিকে চাইলো। কি আর করা, বাধ্য হয়ে ওর কাকাইয়ের সাথেই যেতে হবে। বিদ্যা দ্রুত বের হয়ে গাড়ীতে গিয়ে বসলো। সাজিতও এসে বসেই গাড়ী নিয়ে বাসা হতে বের হল।

গাড়ী চলছে, এমন সময় সাজিত একটা ছোট বক্স বিদ্যার হাতে দিয়ে বলল,

–” মা, দেখতো! এটা তোমার পছন্দ হয় কিনা?”

বিদ্যা বক্সটি হাতে নিয়ে ওটা খুলে দেখলো, রুপার একটা খুব সুন্দর চেন। তার সাথে বি অক্ষরে লেখা একটা লকেট। লকেটের উপর ডায়মন্ডের পাথর বসানো। অপূর্ব দেখতে কথাটি বিদ্যার মুখ থেকে বের হতেই সাজিত বলল,

–” ওটা একটু গলায় দিবে মা? তোমাকে আমি এই প্রথম দেখেছি কিন্তু এতদিনেও কিছু দিতে পারিনি তাই এটা গতকাল কিনেছি।”

বিদ্যা কিছু মনে না করে চেনটা পড়েই ওর কাকাকে দেখিয়ে বলল,

–” খুব সুন্দর এটা।”

এই চেন সাজিত বৃন্দার জন্য কিনেছিল। একদিন হঠাৎ করেই সাজিত ওকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য পড়িয়ে দিয়েছিল আর সেদিনই বৃন্দার শরীর পুরে গিয়েছিল। সেদিন থেকেই সে জানে, ও একটা পিশাচ। আজ সেটা দিয়েই বিদ্যাকে পরখ করছে সাজিত। কিন্তু বিদ্যার মধ্য কোন পরিবর্তনই দেখতে পেলনা। তারমানে বিদ্যা কোন পিশাচ না। সে তার বাবার মত মানুষ হয়ে জন্ম নিয়েছে। সাজিতের মুখে এক ঝলক হাসি ফুটে উঠলো।
সাজিত বিদ্যাকে ওর অফিসের গেটে নেমে দিয়ে নিশ্চিন্তে চলে গেল এবং রাস্তার মাঝখানে ওর বৌদিকে সব জানিয়ে দিল।

বিদ্যা অফিসের ভিতরে ঢুকতেই মৌপ্রিয়া দৌড়ে এসে বলল,

–” বিদ্যা জানো, আমাদের নতুন বস এসেছেন। কি হট দেখতে। তাকে দেখলেই গায়ে আগুন লেগে যাবে।”

বিদ্যা মুখে অপ্রসন্নতার হাসি দিয়ে বলল,

–” মৌপ্রিয়া, তাকে তোমার বাসায় নিয়ে যাও। তাকে রান্নাঘরে রেখ সবসময়। কারন তার শরীরতো হট। সেই হটেই তোমার খাবার রান্না হয়ে যাবে। এতে তোমার গ্যাসের খরচাও কমে যাবে।”

মৌপ্রিয়ার মুখের হাসি যেন ঠুস করে উড়ে গেল। মুখ গম্ভীর করে বিদ্যার সাথে অফিস কক্ষে এল। দিপ্তী এসে বিদ্যাকে সেই নতুন স্যারের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। তারপর দরজার সামনে দারিয়ে বলল,

–” স্যার আসতে পারি?”

–” মি. ঋষি সান্যাল চট করই তাদের দিকে চাইল।”

স্যার ইশারা করে ভিতরে আসতে বলতেই দিপ্তী বিদ্যাকে নিয়ে প্রবেশ করলো। মি. ঋষি বিদ্যাকে চিনেনা তাই দিপ্তীকে বলে উঠলো, হু ইজ সী।

বিদ্যা সাথে সাথে বলে উঠলো,

–” আমি বিদ্যা ত্রিবেদী।”

বিদ্যা নাম শুনতেই ঋষির শরীর দিয়ে হিম শীতল বাতাস বেয়ে গেল। এই সেই বিদ্যা! যার এত শক্তি যে কিনা এক নিমিষেই আমার মত এত শক্তিশালী পিশাচ নাগকে ও ফিনিস করে দিতে পারে। তার সৌন্দর্যতার প্রসংসা না হয় নাই করলাম। আমাদের কাছে যে বিদ্যা আছে তাকে ধুয়া আকারে ছাড়া কখনো দেখা যায়না। এটাই তাহলে বিদ্যার আসল রুপ। এই মেয়ের শক্তি আর সৌন্দর্যতার গোলাম হয়ে গেলাম। একে আমি হত্যা করবো কিভাবে?

ঋষির ভাবনাকে চুটকি মেরে উড়ে দিয়ে বিদ্যা বলল,

–” স্যার আমরা আসছি। পরে দরকার হলে আমাদের ডাকবেন।”

বিদ্যা বের হতেই দিপ্তী ওর হাত ধরে বলল,

–” স্যারের সাথে কি এভাবে কেউ ব্যবহার করে?”

বিদ্যা ওর ডেক্সে বসতে বসতে বলল,

–” ওনার নজর খারাপ। দু’দিন পর তুইও বুঝতে পারবি। আর কথা বাড়াসনা কাজে মন দে।”
সারাদিন বিদ্যার কাজে কাজেই দিনটা কাটলো।

সন্ধ্যার একটু আগে বিদ্যা বাসায় ফিরেছে। প্রচুর ক্লান্ত সে। কোনায় ঝুলিয়ে রাখা বাথরোব গায়ে জড়িয়ে নিয়ে বাথরুমের দিকে পা বাড়ালো। সুসজ্জিত সিরামিক বাথটাবে শরীর ছেড়ে দিল বিদ্যা। অ্যারোমেটিক সুগন্ধি জলের স্পর্শে শরীরের ক্লান্তি যেন নিমিষেই দুর হয়ে গেল।
আরামে যেন চোখটা বুজে আসলো। আধা ভেজা ক্লান্ত চোখে নিজের শরীরটা জলে সিক্ত করতে করতে বিদ্যা ডুব দিল স্মৃতির মুকুরে,
অভির সাথে এতদিন ঘটে যাওয়া সব সুখের স্মৃতিতে। কিন্তু অভি আমাকে খুজে পেল কোথা থেকে?

প্রায় ঘন্টা খানেক সুখমুহুত্ত্ব সাওয়ার শেষে শুখনো তোয়ালে দিয়ে গা মুছতেই হঠাৎ শুনতে পেল ওর রুমে কারা যেন চেঁচামেচি করছে। বিদ্যা দ্রুত হাউজকোটটা গায়ে জড়িয়েই ওয়াসরুম থেকে বের হয়ে আসলো।

রিয়া, রিতু, মিতু আর রিভা একটা গিফ্ট পেপারে মোড়ানো বিশাল বক্স নিয়ে মারামারি করছে। বিদ্যা এগিয়ে এসে বলল,

–” তোমাদের সমস্যা কি? তোমরা ঝগড়া করছো কেন? আর তোমরাই বা আমার রুমে কেন?”

রিভা দৌড়ে এসে বিদ্যার হাত ধরে বলল,

–” আন্টি দেখোনা, তোমার নামে কুরিয়ার হতে বক্সটি এসেছে কিন্তু ওরা ওটা খোলা নিয়ে ঝগড়া করছে।”

বিদ্যা এবার সবাইকে ধমক দিয়ে বলল,

-” তোমরা চুপ করবে? তোমরা জানোনা! কারো পার্রসোনাল জিনিসে হাত দিতে নেই! আমি খুলে দেখছি, দেখি ওখানে কি আছে।”
কথাগুলো বলে বিদ্যা বক্সটি খুলে ফেলতেই সবার চোখ উপরে উঠলো। পুরো সপিংমল মনে হয় এর মধ্য করে তুলে এনেছে। পুরো বক্স জুড়ে বিভিন্ন ডিজাইনের চুড়ি, ইয়ার রিং, নুপুর, লিপিষ্টিক সহ শুধু মেয়েদের সাজার প্রসাধনী। একটা মেয়েকে কেউ এত কসমেটিক দিতে পারে সেটা এদের জানা ছিলোনা। সবাই এক সাথে বলে উঠলো,

–” তোমার কি পরিচিত কেউ আছে এই দেশে? কে দিল এত গিফট্?”

বিদ্যা নিজেও অবাক হয়ে গেছে। কে দিতে পারে এত গিফ্ট। সে তো কাউকে চিনেনা এখানে। তাহলে?

রিভা বক্সের সব কিছু বের করতেই এক জোড়া শাখা, বালা আর সিঁদুরদানী বের হয়ে এল। রিভা উল্লসিত কন্ঠে বলল,

–” রিয়াদি, এটা মনে হয় কাবিরদা দিয়েছে। দেখ শাখাও আছে।”

বিদ্যা রিয়ার হাত থেকে ওগুলো নিয়ে বলল,

–” এটা আমার বান্ধবীর নামে আসছে। এবার বুঝতে পেরেছি কে পাঠিয়েছে।”

বিদ্যা শুধু শাখা সিঁদুর নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের কাঁচের মধ্য রেখে দিল। আন্টি এই ঝুমকা জোড়া নেই বলতেই বিদ্যা বলল,
-” যার যা ইচ্ছা নিয়ে নাও। বৌদিদেরও দাও।”

তোমার বন্ধু রাগ করবোনাতো? (মিতু)

সেটা পরে আমি দেখবো বলে বিদ্যা ড্রেস নিয়ে ওয়াসরুমে চলে গেল। দরজাটা বন্ধ করে মনে মনে বলল,

-” অভির চয়েস এত ভাল?”
ধ্যুর এত কিছু ভাবার সময় নেই। বেলাল ভাইকে কল দিতে হবে। ওনার কাজ হলো কিনা জানতে হবে। বিদ্যা ঝটপট করে ড্রেস পড়ে আসতেই রিয়া বলে উঠলো, পিসি, আজ আমাদের ইনভাইট আছে।

বিদ্যা ফোন হাতে নিয়েই ভ্রু কুচকে বলল,

–” কিসের ইনভাইট?”

–” আজ বাইক রেস প্রতিযোগিতা আছে। আমাদের অভিদাও সেখানে নাম দিয়েছে। কাবির আমাদের ৫জনকেই যেতে বলেছে। তাছাড়া আমাদের সাথে আরো কিছু ফ্রেন্ড রয়েছে। চল রেডী হও……”

আমার অনেক কাজ আছে, তোমরা এখন যাও বলে ফোন নিয়ে রুম থেকে বের হতেই মিতু এসে বিদ্যার হাত ধরে বলল,

–” অহ্ বিদ্যা দিদি চলোনা আমাদের সাথে। কয়েক ঘন্টারই তো ব্যাপার! ”

মিতুর দেখাদেখি সবাই জোর করতে লাগলো দেখে বিদ্যা আর না করতে পারলোনা।বেলাল হুযুরকে আর কল দেওয়া হয়ে উঠলোনা। বিদ্যা শেষে রেডী হতে লাগলো। একটা সুতি ব্লাক কালার শাড়ী পড়লো বিদ্যা। চুলের ভাঁজে এক চুটকী সিঁদুর ছোয়াল। অন্ধকারে কেউ দেখার ভয় থাকবেনা। তারপর ব্যাগ, ফোনটা নিয়ে ওদের সাথে বের হয়ে গেল।

বিদ্যা নিজে ড্রাইভ করছে। সামনে রিয়া আর পিছনে রিভা,মিতু রিতু। রাস্তায় কাবির কয়েকবার কল দিল, কত দুর আছে তারা। রিয়া রাস্তা দেখিয়ে দিচ্ছে আর বিদ্যা ওর কথামত ড্রাইভ করছে। ৫ মেয়েকে দেখে মনে হচ্ছে একঝুড়ি সদ্য উঠানো ফুল।

গন্তব্য স্থানে এসে গাড়ী পার্কিং করে ওরা গাড়ী থেকে নেমে পড়ল। অনেক লোকজন এসেছে। এমন রোড রেসিং বাংলাদেশে হয় সেটা জানা ছিলনা। ১৭ জন বাইক রাইডার দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এসেছে। এর মধ্য দুজন বিদেশি। অভি আর জ্যাক নামের একটা ছেলে। বাঁকিগুলো দেশি ছেলে।

হাউয়ের ৩ কিলো.মি রাস্তা অবদি সমস্ত যানবাহন বন্ধ। বিকল্প রাস্তা দিয়ে যানবাহন চলছে। জনবহুল দেশ হিসেবে একদিকে ভাল, ফ্রী খেলা দেখা হলে তো কোন কথায় নেই। বাসার বাচ্চা কাচ্চা সহ ১৪ গোষ্টীর আগমন হয় রাস্তার পাশের ওপেন মাঠময় গ্যালারিতে।

এত লোকজন যে, ভিড়ের মধ্য চলায় দায় হয়ে পড়লো। শেষে রিয়া কাবিরকে কল দিল। কিছুক্ষন পর কাবির এসে ওদের শর্টকাট রাস্তা দিয়ে মেইন স্থানে নিয়ে গেল।

১৭ জন বাইকার বাইক নিয়ে দাড়িয়ে আছে। মাথায় full face helmet, হাতে রাইডিং গ্লাভস্, বুট জুতো, পরনে ফুলহাতা রেড লেদার জ্যাকেট ও প্যান্ট। শীতের আমেজ পড়েছে কিছুটা তাই এগুলো পড়া সম্ভব হয়েছে। কিন্তু অভি কোনটা বলতেই অভি বিদ্যার দিকে চেয়ে হাত দিয়ে হাই বলে ইশারা করলো। অভির এমন ব্যবহারে বাঁকি ১৬ জন বাইক রাইডার একসাথে বিদ্যার দিকে চাইলো। সাথে সাথে বিদ্যা পার্স দিয়ে মুখটা ডেকে চুপ করে রইল।

কাবির এসে বিদ্যার পাশে দাড়িয়ে বলল,

–” তুমি সত্যিই অভিকে পাগল করে দিয়েছ। তোমাকে ছাড়া যেন পৃথিবীর অন্যকিছু দেখা তারজন্য নিষিদ্ধ। আমি ভেবেই পাইনা কি দিয়ে তুমি ওকে এত পাগল করলে।”

কাবির ভাষা মার্জিত করো। সবাই এখানে আছে। বিশেষ করে তোমার ছোট বোন। তাকে অন্তত কষ্ট দিওনা বলতেই কনক এসে বিদ্যার পাশে দাড়াল।
হেই বিদ্যা পি… বলতেই অভির কথা মনে পড়ল। বড়সড় একটা ঢোক গিলে বলল,

–” বিদ্যা দি কেমন আছ?”

–” আমি ভাল আছি, তুমি?”

বিদ্যার নজর এখন পুরোটাই অভির দিকে। এমন সময় বিদ্যার ফোনে রিং বেজে উঠলো। বিদ্যা চটজলদি কল রিসিভ করেই ওখান থেকে সটকে গেল। ততক্ষনে রেস শুরু হয়ে গেছে। মাত্র ১৫ মিনিটের রেস।

হ্যালো বলতেই বেলাল হুযুরের কথা ভেসে আসলো। বৌদি, কাজ এখুনি সম্পন্ন করে আসলাম। চিন্তা করবেননা। আল্লাহ্ ভরসা। তবে বৌদি একটা কথা ছিল। অপুর ব্যবহৃত জিনিসপত্র যদি নষ্ট করে দিতে পারতেন তাহলে সমস্যা হতোনা।

আচ্ছা ভাই আমি এখুনি সব ব্যবস্থা করছি বলে বিদ্যা কল কেটে দিয়ে বিজয়কে কল দিল। কল কেটে গেল তবুও রিসিভ হলোনা। বিদ্যা পরপর কয়েকবার কল দিল তারপরও রিসিভ হলোনা। বিদ্যা কথা বলতে বলতে অনেক দুরে আসছে। রেস শেষ হয়ে গেছে। লোকজনের ভিড় ভাঙ্গতে শুরু করে দিয়েছে। বিদ্যা রিয়াকে চট করে মাসেজ করলো, ওরা যেন বাসায় চলে যায়। কোন কাজে মৌপ্রিয়ার কাছে যাচ্ছে সে। তারপর আর একটু সরে গিয়ে আবার বিজয়ের কাছে কল দিল। এবার কল রিসিভ হল। হ্যা বৌদি বলেন। আমি একটু বাজারে ছিলাম।

বিজয়কে পেয়ে যেন বিদ্যা প্রান ফিরে এল। মনের সব দুঃশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলে বলল,

–” দাদা, আজ যে করে হোক আমি যেই রুমে থাকতাম ঐ রুমে আগুন জ্বালাতে হবে। সবকিছু যেন পুড়ে যায়। নাহয় শুধু রুমের বড় আলমারিতে আগুন লাগাতে হবে। ওটা পুরে গেলেই সব সমস্যা শেষ। আমি যতদুর জানি ঐ রুমে চাবি দেওয়া নেই। আপনি যেভাবে হোক কাজটা করে দেন দাদা।”

–” এত দাদা দাদা বলে ডাকো, আর তোমার এই দাদা তোমার ডাকে সাড়া না দিয়ে থাকতে পারে? মনে করো আজই কাজ হয়ে যাবে।”

ওকে দাদা বলে কল কেটে দিয়ে কেবল পিছন ফিরবে এমন সময় কে যেন এসে ওর হাত ধরলো। বিদ্যা চমকে উঠলো। তারপর চেয়ে দেখলো, মৌপ্রিয়া এসে হাত ধরেছে। মৌপ্রিয়া তুমি এখানে?

মৌপিয়া বিদ্যার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল। মোটামুটি সবাই চলে গেছে। হাতে গোনা কয়েকজন রয়েছে। দুরে দিপ্তী, ঋষি স্যার সহ আরো অনেকে রয়েছে। মৌপ্রিয়া সেখানেই বিদ্যাকে টেনে আনলো। একি বিদ্যা তুই এখানে বলতেই বিদ্যা দিপ্তীর দিকে চাইল। বিদ্যা পাল্টা প্রশ্ন ওর দিকে ছুড়ে দিয়ে বলল,

–” তোমরা এখানে?”

–“আমরা রেস দেখতে এসেছিলাম মিস. বিদ্যা।”

বিদ্যা বিরক্ত ভঙ্গিতে বলল,

–” অহ্।”

বিদ্যা এদিক ওদিক চাইতেই দেখল অভি বাইকে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে খানিকটা দুরে। ওর পাশে আরও কয়েকজন বাইক নিয়ে দাড়িয়ে আছে। অভিকে দেখে বিদ্যার মনটা শীতল হয়ে গেল। ঠোটের এক কোনে হাসির ঝলক ফুটে উঠলো। কিন্তু সেই হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলোনা। বিদ্যার চোখের সামনেই গিয়ার তুলে ওর পাশ দিয়েই অভি সহ ওরা চলে গেল। বিদ্যার মনটা ভিষন খারাপ হয়ে গেল। অভি কি এখনো আমার উপর রেগে আছে? বিদ্যা মাথা নিচু করলো। চোখে জল ছলছল করছে। একটা বারতো কথাও বলতে পারতো। বিদ্যা কথাগুলো ভাবতেই হঠাৎ এমন সময় খুব জোড়ে একটা শব্দ হল। মনে হল কেউ বড় ট্রাকের সাথে ধাক্কা খেল। তাছাড়া রোডে গাড়ি চলাচল শুরু করে দিয়েছে।

বিদ্যা পিছন ফিরে চাইতেই ওর কলিজা কেঁপে উঠলো। অভির আক্সিডেন্ট হয়েছে। আসেপাশে অনেক মানুষজন জরো হয়েছে। অভি বলেই বিদ্যা প্রানপনে দৌড়াতে লাগল। ঋষিরাতো অবাক হয়ে গেল কি হল এর!

রাস্তার কোন গাড়ী চলাচল মানছেনা বিদ্যা। ওর মধ্যই দৌড়ে অভির কাছে গেল। অভি নিথর হয়ে পড়ে আছে। বিদ্যা অভির পাশে এসে ধপ করে বসেই অভি বলে ওকে ঝাকাতে লাগল। অভি তোমার কি হয়েছে বলেই পাগলের মত কাঁদতে লাগলো। এমন সময় অভি চোখ মেলেই ওর হাত দিয়ে বিদ্যার গাল ছুয়েই হাঁসতে লাগল।

এসব কি! তুমি আমাকে আর কত কষ্ট দিবে বলেই বিদ্যা অভিকে ছেড়ে দিয়ে দাপিয়ে হাত নেড়ে চিৎকার দিয়ে কাঁদতে লাগলো। অভিও সুযোগটা মিস করেনা। অভি উঠে বসেই বিদ্যাকে খপকরে ধরে বুকের ভিতর নিতেই বিদ্যা ওর শরীরের সমস্ত ভর অভির উপর দিয়ে কান্নার আওয়াজ বাড়িয়ে দিল। অভি সবার সামনেই বিদ্যার গালে কিস করেই বলল,

–” এত ভালবেসেও তুমি কিভাবে আমাকে নিজের কাছ থেকে দুরে রাখো বিদ্যা! আমি হলে কখনো পারতামনা।”

[] চলবে……….[]

সরাসরি ওয়েবসাইট এ পড়ুন: https://nafisarkolom.com/2020/10/sidur-suddhi-20/

আমার ব্যক্তিগত ফেইসবুক একাউন্ট: https://www.facebook.com/nafisa.muntaha

চাইলে আমার গ্রুপে জয়েন করতে পারেন: https://www.facebook.com/groups/nafisarkolom

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here