অনুভবে আজো তুমি🍁🍁 পর্ব-৯

0
185

#অনুভবে_আজো_তুমি🍁🍁
পর্ব-৯
ফাবিহা নওশীন

ফায়াজ মেহেরের দিকে এগিয়ে আসে।তারপর ইমরুলের কাধে হাত রেখে বললো,

–ওকে ছেড়ে দে।বাচ্চা মেয়ে কেদে কেটে চোখের কাজল নষ্ট করে ফেলেছে।

একথা শুনে মেহের কান্না থামিয়ে মাথা উচু করে ফায়াজের দিকে তাকালো।দুজনের চোখে চোখ পড়লো।ফায়াজ যেন ওর চোখে আটকে গেছে।চোখের গভীরতায় ডুবে যাচ্ছে।আর কিছুক্ষণ থাকলে হয়তো মারা পড়বে।তাই চোখ সড়িয়ে নিলো।
ফায়াজের ফ্রেন্ড ইমরুল বললো,
–ইউ ক্যান গো নাও।বন্ধুর জন্য ছাড়া পেয়ে গেলে।

মেহের পিছু ঘুরে হাটা শুরু করলো।ফায়াজ ওকে ডাকলো,
–এই কাদুনি মেয়ে,,
মেহের পিছু ঘুরে ভয়ে ভয়ে ফায়াজের দিকে এগিয়ে গেলো।তারপর মাথা নিচু করে বললো,
–জ্বী বলুন।
ফায়াজ মেহেরকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার চোখ বুলিয়ে টিস্যু এগিয়ে দিলো।
মেহের একবার ফায়াজের দিকে চেয়ে টিস্যু হাতে নিয়ে নাক মুছে ফেলে ফায়াজকে ধন্যবাদ দিয়ে হাটা ধরলো।ফায়াজ হতবাক হয়ে মেহেরের দিকে চেয়ে রইলো।

–যাক বাবা,চোখ মুছতে দিলাম আর নাক মুছে চলে গেলো।

ফায়াজের বন্ধুরা সবাই এক সাথে উচ্চস্বরে হেসে দিলো।জিসান বললো,
–এই মেয়ে তো তোকে ঘোল খাইয়ে চলে গেলো।
ফায়াজ এই প্রথম কোনো মেয়েকে টিস্যু দিলো আর মেয়েটা নাক পরিস্কার করে চলে গেলো??নাক??হাহা!!
ফায়াজ সবার দিকে রাগী দৃষ্টি দিয়েই সবাই হাসি বন্ধ করে দিলো।

মেহের ওয়াশরুমে গিয়ে মুখ ধোয়ে কাজল ঠিক করে নিলো।আর তখনই ওর মনে পড়ল তামিল হিরোর কথা।আর আনমনে বলে উঠলো,

–উনি আমাকে ছেড়ে দিলেন?কিন্তু কেন?আমার কাজলের দিকেও তার নজর ছিলো।ভাগ্যিস ওদের হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করেছিলো নয়তো কি যে হতো??
আমিও না কেদে ফেললাম।তাছাড়া আর কি ই বা করতাম।যাইহোক কেদেকেটে মামলা জিতে গেছি।
হায় আল্লাহ!!আমি কি করেছি?আমাকে টিস্যু দিলো আর আমি চোখ না মুছে নাক মুছে চলে এলাম?ছিঃ।আমি কি গাধা হয়ে গিয়েছিলাম।নাক মুছেছি??আমাকে কি ভাববে সবাই?নিশ্চয়ই সবাই হাসাহাসি করেছে।
মেহেরের এখন খুব লজ্জা লাগছে।

রাতে ফায়াজ দুচোখের পাতা এক করতে পারছেনা।যখনি চোখ বন্ধ করছে মেহেরের কান্নারত মুখটা বারবার ভেসে উঠছে।ঠোঁট ফুলিয়ে একটা লাল পরী কাদছে।চেহেরাটা ঠিকঠাক মনে করতে পারছেনা।কিন্তু ওই লেপ্টে থাকা কাজল,ফুলানো ঠোঁট আর ঠোঁটের নিচে তিলটা স্পষ্ট মনে আছে।মনে হয়না এগুলো কখনো ভুলতে পারবে।প্রচন্ড অস্থিরতা নিয়ে উঠে বসে পড়লো।

–উফফ,এভাবে ঘুমানো যায়?সামান্য একটা মেয়ে এভাবে আমার ঘুম কেরে নিতে পারলো?কিভাবে সম্ভব?এই মেয়েকে এখন আমার ঠাটিয়ে চড় মারতে ইচ্ছে করছে।কে বলেছিলো এভাবে ঠোঁট ফুলিয়ে কাদতে?আগামীকাল যদি ওই মেয়েকে দেখি প্রথমেই ঠাটিয়ে একটা চড় মারবো।ফাজিল মেয়ে কোথাকার ফায়াজের ঘুম কেড়ে নেওয়া??

অপরদিকে মেহের তার কলেজ পড়ুয়া ছোট বোন মিহুকে টিস্যু দিয়ে নাক মুছার কথা বলছে আর দুবোন হাসিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।

পরেরদিন ফায়াজের কোনো কাজেই মন নেই।সকাল সকাল কলেজে গিয়ে উপস্থিত।বন্ধুরা এত সকালে ওকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো।
কনিক বললো,
–তুই এত তাড়াতাড়ি সব ঠিকঠাক তো?
–হুম।
ফায়াজ আর কিছু না বলে সিগারেট জ্বালালো।আর এদিক ওদিক তাকাচ্ছে।ওর চোখ মেহেরকে খুজছে।আজকেউ কিছু সংখ্যক ছেলেমেয়ে জড়ো করেছে কিন্তু ফায়াজের সেদিকে খেয়াল নেই।ও এদিক সেদিকে মেহেরকে খুজছে।
–দোস্ত তোরা থাক।আমি একটু আসছি।

ফায়াজ গেটের কাছাকাছি এসে দাড়িয়ে আছে।যাতে মেহের ঢুকলেই ওকে দেখতে পায়।অনেক ক্ষন দাঁড়িয়ে থাকার পরও মেহেরকে দেখতে পেলো না।কারণ ওর পুরো চেহারা ওর কাছে স্পষ্ট নয়।চোখ,ঠোঁট আর তিল ছাড়া।ফায়াজ আবারো চোখ বন্ধ করে মেহেরকে মনে করার চেষ্টা করছে।লাল ড্রেস আর কালো হিজাব পড়া কিন্তু পুরো চেহারা মনে পড়ছে না।তাই ও কালো হিজাব খুজতে লাগলো।কিন্তু এতেও দেখা না মিললে হতাশ হয়ে ফিরে এলো।
পুরো দিন চাপা অস্থিরতা মধ্যে কাটালো।কাউকে কিছু বলতেও পারছেনা।কোন ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্ট তাও জানা নেই।

দুপুর ২টা কলেজ ছুটির সময় মেহের ওই তামিল হিরোকে দেখতে পেলো আর তখনই গতকালের ওই টিস্যু দিয়ে নাক মুছার কথা মনে পড়ে গেলো।লজ্জায় মেহের অন্য দিকে চেয়ে হাটা ধরলো।হটাৎ করেই ফায়াজের নজর পড়লো ওর দিকে।কেমন চেনা চেনা লাগছে।নীল ড্রেস,নীল হিজাব তাই কিছুটা কনফিউজড।তবুও ডাকলো,,
–ওই নীল ড্রেস?
সব মেয়েরা ফায়াজের দিকে দৃষ্টিপাত করছে।কিন্তু ফায়াজের সেদিকে খেয়াল নেই সে তো মেহেরকে দেখায় ব্যস্ত।মেহের মনে মনে বলছে,
–যেখানে বাঘের ভয় সেখানে ই রাত্রি হয়।একদম বাঘের মুখে এসে পড়লাম।কি করি?যাবো না চলে যাবো?
এরি মধ্যে ফায়াজের আবার ডাক,
–ওই নীল ড্রেস।
মেহের বাধ্য মেয়ের মতো ফায়াজের সামনে গিয়ে মাথা নিচু করে দাড়ালো।
–তুমি সেই না টিস্যু দিয়ে নাক মুছেছিলে?
মেহের ভয়ে ভয়ে মাথা ঝাকিয়ে হ্যা বললো।

নীল পড়েছো আর আমি কালো খুজেছি তাই তো পাইনি।(মনে মনে)
–কি নাম তোমার?
–মেহেরিন তাবাসসুম।
–শর্টকাট বলো,,
–মেহের।
–নাইচ নেইম।কোন ডিপার্টমেন্ট?
–ইকোনমিকস।
–গুড।তুমি এভাবে কাদো কেন?
মেহের কিছুটা অবাক হয়ে ফায়াজের দিকে তাকিয়ে বললো,
–কিভাবে?
ফায়াজ ধমক দিয়ে বললো,
–কিভাবে জানো না?বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ফুলিয়ে?তুমি কি ২বছরের বাচ্চা??
–…..
ফায়াজ আবারও ধমক দিয়ে বললো,
কথা বলছো না কেন?আমি কি বলেছি শুনতে পাওনি?তুমি কি ২ বছেরের বাচ্চা?আর কখনো তুমি এভাবে কাদবেনা।মনে থাকবে?
মেহের আবার ফেচফেচ করে কেদে দিলো।শুধু কান্নাই না আবারও ঠোঁট ফুলাতে লাগলো।
ফায়াজ তা দেখে মনে মনে বললো,
–হায় আল্লাহ এ কি মসিবত?আমি ওকে এভাবে কাদার জন্য ধমকাচ্ছি আর এই মেয়ে ধমক খেয়ে আবারও সেভাবেই কেদে দিলো।এক কান্নাই তো ভুলতে পারি নি আবার এই কান্না?
এই মেয়ে চুপ।কান্না থামাও।আর যাও।

মেহের চোখ মুছে মনে মনে হাজারো গালি দিতে দিতে বাসার উদ্দেশ্যে হাটা দিলো।তখনই একটা মেয়ে এসে মেহেরের হাত ধরলো।
–হায় আমি সামিরা।তোমার ক্লাসমেট।
–হায়,আমি মেহের।
–তোমাকে ফায়াজ ভাইয়া কি বললো?
মেহের বিস্ময় নিয়ে বললো,–কে ফায়াজ?
সামিরা চোখ বড়বড় করে বললো,
–তুমি ফায়াজ ভাইয়াকে চিনো না?এই কলেজে এমন কম ই আছে যে ফায়াজ ভাইকে চিনেনা।
–কে তিনি?
–তুমি একটু আগে যার সাথে কথা বলছিলে।
–কি??😯😯
–হুম।পুরো নাম ফারদিন নওয়াজ খান।শর্ট করে ফায়াজ।ফারদিনের ফা নওয়াজের য়াজ ফায়াজ।তোমাকে কি বলছিলো?
–নাম,ডিপার্টমেন্ট।
–বলো কি??যেখানে সব মেয়েরা ওনার সাথে একটু কথা বলার জন্য পাগল তাদের কাউকেই তিনি পাত্তা দেন না আর তোমাকে ডেকে নিয়ে নাম,ডিপার্টমেন্ট জিজ্ঞেস করছে??ব্যাপারটা কি?
–আই ডোন্ট নো।
বলেই মেহের হাটা ধরলো আর মনে মনে বলছে
তোমাকে আমি কি করে বলি সামিরা আমি গতকাল কি করেছি,টিস্যু দিয়ে নাক মুছেছি।তাই ওনি আমাকে ডেকেছেন।
সামিরা মেহেরের যাওয়ার দিকে চেয়ে আছে।ওর মাথায় কিছুই ঢুকছে না।

ফায়াজ পড়েছে আরেক বিপদে।এই কান্না ওকে পাগল করে দিচ্ছে।কিছুতেই মাথা থেকে মেহেরের ভাবনা বের করতে পারছে আর কেনই বা ওর সাথে এমন হচ্ছে বুঝতে পারছেনা।
কয়েকদিন পর ফায়াজের থার্ড ইয়ার ফাইনাল এক্সাম কিন্তু পড়াশুনায় মনোনিবেশ করতে পারছেনা।বইয়ের পাতায় সব জায়গায় মেহেরকে দেখছে।কত মেয়ে ওর আশেপাশে ঘুরে কই তখন তো এমন হয়না।
ফায়াজ রোজ নিয়ম করে মেহেরকে দেখে চলেছে মেহেরের অজান্তে।লুকিয়ে আড়ালে সবার অগোচরে ফায়াজ মেহেরকে দেখে।যেই ড্রেস যেভাবেই আসুক না কেন হাজার লোকের ভীড়েও মেহেরকে চিনতে ফায়াজের ভুল হয়না।
এভাবে ফায়াজের পরীক্ষা চলে এলো তাতেও মেহেরকে দেখা বাদ নেই তার।পরীক্ষার মধ্যেও মেহেরকে দেখা চাই।মেহেরকে একদিন না দেখলে ওর দম বন্ধ হয়ে আসে।অস্থিরতায় পুরো দিন কাটে।

অপরদিকে মেহের এসবের কিছুই জানে না ও ওর মতো ক্লাস,পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত।এটাও জানেনা ওর সাথে কি হতে চলেছে,,,,

চলবে,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here