#না_চাহিলে_যারে_পাওয়া_যায় পর্ব ১০

0
211

#না_চাহিলে_যারে_পাওয়া_যায় পর্ব ১০
#ফারহানা ইয়াসমিন

মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপ্টায় প্রায় লাফিয়ে উঠলো রুহি। রাযীন বিরক্ত মুখে হাতে পানির গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রুহি চেচিয়ে উঠলো-
“আপনার কি অন্যের শান্তিতে এলার্জি? ভদ্রতা শেখেননি জীবনে? বারবার এরকম আচরণের মানে কি?”
“শশশশশ, আস্তে কথা বলো। তুমি এখন কোথায় আছো সেটা কি বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে? কোন আক্কেল নেই নাকি? বেলা কত হলো সে খেয়াল আছে? তোমার জন্য সাতসকালে ঘুম ভাঙলো আমার। মা কয়েকবার এসে তোমার খোঁজ নিয়ে গেছেন।”
রাযীন ক্ষুব্ধ গলায় কথাগুলো বলতেই রুহি ঘড়ি দেখলো। নয়টা বাজে, বেশ বেলাই বলা চলে। ঢাকায় থাকলে এই সময় সে অফিসে যাওয়ার পথে থাকে। সে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললো-
“ভালোমতো ডাকলেই হতো।”
রাযীন জবাব দিলো না। রুহি মেঝের বিছানা গুছিয়ে রেখে নিজের লাগেজ খুলে কাপড় নেবে এমন সময় রাযীন কথা বলে-
“শোন, মা তোমার জন্য কাপড় দিয়ে গেছে। বলেছে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে তৈরী হতে। বাবা তোমায় দেখতে চেয়েছেন।”
রুহি অবাক হয়ে জানতে চাইলো-
“আশরাফ আঙ্কেল বাড়িতে আছে? তাহলে কাল তাকে দেখলাম না যে?”
রাযীন সে প্রশ্ন এড়িয়ে নিজের রুমে ফেরত গেলো। রুহি রাযীনের পিছু পিছু এলো। বিছানার উপর ভীষণ গর্জিয়াস শাড়ী আর ভারী গহনা দেখে অবাক হলো রুহি-
“এসব কি আমার জন্য? এগুলো পড়তে হবে আমায়?”
রাযীন আবার কম্ফর্টারের নিচে ঢুকতে ঢুকতে জবাব দিলো-
“তুমি ছাড়া এ রুমে আর কেউ নেই কাজেই ওগুলো তোমারই হওয়ার কথা।”
“কিন্তু এসব ভারী জবড়জং জিনিস পড়ে থাকা যায় নাকি?”
রাযীন রুষ্ট হয়ে উঠে বসলো, রুহির পানে চেয়ে বললো-
“শোন, পড়তে না চাইলে মাকে যেয়ে বলো। তবে আমার মনে হয়না এটা খুব ভালো ব্যাপার হবে। কারণ এই মুহূর্তে তোমাকে দেখার জন্য বাসায় প্রচুর মানুষ এসেছে।”
রুহি বিস্মিত কন্ঠে বলে-
“কে এসেছে?”
“ওটা মার ডিপার্টমেন্ট।”
“কোনটা?”
“মানে সবার সাথে তোমার পরিচয় করিয়ে দেওয়া।”
“ওহহহ।”
রুহি কথা না বাড়িয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলো।

ওয়াশরুম থেকে কাপড় পড়ে বেড়িয়ে রাযীনকে না দেখে খুশিই হলো। শান্তিমতো শাড়ী পড়া যাবে।
কোন রকমে শাড়ীটা পেচিয়ে এসেছে। একা একা শাড়ী পড়া বেশ কষ্টসাধ্য তার উপর শাড়ী যদি হয় জর্জেটের ভারী কাজের। আবার ব্লাউজটাও ঢিলেঢালা। রুহি কোনমতে নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছিলো তখনই রুমের দরজায় টোকা পড়লো। রুহি বেশ উচ্চস্বরে জবাব দিলো-
“দরজা খোলা আছে।”
রোজী মর্জিনাকে সাথে নিয়ে ঢুকতেই রুহি তটস্থ হলো, কাপড় হাতে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে রইলো। রোজী হাত দেখালো-
“বসো। তুমি একা একা পারবেনা বলেই মর্জিনাকে নিয়ে এলাম। ও তোমার শাড়ী গহনা পড়ায় হেল্প করবে।”
রুহি ঘাড় কাত করে সায় দিলো। রোজী রুহির পাশে বসলো-
“তোমার আসার খবর পেয়ে সবাই এসেছে তোমাকে দেখতে। রাজ তো খবর না দিয়েই হুট করে চলে এসেছে তাই কাল কাউকে দেখোনি। অবশ্য একদিকে ভালোই হয়েছে। কাল তুমি টায়ার্ড ছিলে।”
রোজী থামলো একমিনিটের জন্য, মর্জিনাকে ইশারা করলো-
“ভাবির জন্য এককাপ আদা চা বানিয়ে নিয়ে আয় আর হালকা গরম পানি একগ্লাস।”
মর্জিনা বেরিয়ে যেতেই রোজী উঠে দাড়ালো। রুহি মুখ তুলে একনজর রোজীকে দেখে আবার চোখ নামিয়ে নিলো। রোজী গয়নার বাক্স খুলে গলার জড়োয়া হার বের করে রুহির গলায় পড়িয়ে দিতে দিতে বললো-
“শোন রুহি, ধরে নিচ্ছি রাজের সাথে ফিরে এসেছো মানে এবাড়ির সাথে তোমার সম্পর্কটা মেনে নিচ্ছ। কাজেই গতবার যা হয়েছে সেটা ভুলে যাও। কারন ভুল শুধু রাজের না তোমার ও ছিলো। রাজের অনুপস্থিতিতে একদিনেই তুমি ফিরে গেলে, এমনকি এতোদিনে একবারের জন্য দেখা করা তো দূর উল্টো গায়েব হয়ে ছিলে। যে মানুষটা শখ করে তোমায় বউ করে নিয়ে এলো তার খোঁজ পর্যন্ত নাওনি। আমরা যে তোমার সাথে একটা সম্পর্ক জুড়েছিলাম, তুমি এ বাড়ির বউ হয়েছিলে তোমার কি কোন দায়িত্ব ছিলোনা আমাদের প্রতি? অথচ এই তোমার জন্যই আমার ছেলে বাড়ি ছেড়েছিলো। যাক সে কথা, এখন যখন এসেছো সবকিছু নতুন করে শুরু কর। আশা করি নতুন বউ হিসেবে যা যা করা দরকার সেসব তুমি করবে। আমাদের বাড়ির রেওয়াজ বউভাত অবধি বউকে সেজেগুজে থাকতে হয়। আত্মীয় স্বজন আসবে দেখবে, সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলবে। কেউ যেন তোমায় নিয়ে মন্দ না বলে। আগামী শুক্রবার তোমাদের বিয়ে পরবর্তী অনুষ্ঠান হবে। ঢাকা থেকে তোমার বাবা মা বোনেরা সবাই আসবে। তবে আগেই বলে রাখি, আপাতত ঢাকায় ফেরার কথা ভেবোনা। এমনিতেই রাজের কারনে যথেষ্ট হ্যানোস্থা হতে হয়েছে আমাদের। তোমার শশুরের মানসম্মান নিয়ে টানাটানি হয়েছে বিস্তর। এখন সেসব পুনরুদ্ধার করা তোমার আর রাজের দায়িত্ব বলা যায়। কাজেই কিভাবে চলবে কি করবে সেসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমার কথাগুলো ভাববে।”
রুহি হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে রোজির দিকে।
তার মেজাজ খারাপ হচ্ছে ক্রমশ। মন চাইছে সব কিছু ছুড়ে ফেলতে। এ কেমনতর কথা? শুনে মনে হচ্ছে এ বিয়ের পর যা যা হয়েছে সব দায় তার? বিয়ের পর তাকে রেখে তাদের ছেলে পালিয়ে গেছে অন্যায় করা হয়েছে তার প্রতি। অথচ সেসব নিয়ে কোন কথাই নাই উল্টো এমনভাবে কথা বলছে যেন যা কিছু হয়েছে সব কিছুর পেছনে কারণ রুহি। রুহি বলতে চাইলো, দোষ করেছেন আপনারা আর দায় চাপাচ্ছেন আমার ঘাড়ে? এ কেমন বিচার?

★★★

পাতলা ফিনফিনে শাড়ীর আঁচল কাঁধে তুলে ঘুরে ফিরে নিজেকে বারবার আয়নার দেখছে ঝিলিক। সাতসকালেও মুখে মেকাপের ছোঁয়া। হালকা লিপস্টিক দিয়েছে যাতে মনেহয় ন্যাচারাল লুক আসে। শেষ মেষ নিজেই নিজেকে দেখে মুগ্ধ হলো-
“বাহ ঝিলিক তোকে বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে? তোর রুপের তুলনা কেবল তুই। আর কারো সাধ্য নেই তোকে টেক্কা দেয়।”
আচমকা পেছন থেকে একটা হাত এসে জাপ্টে ধরলো ঝিলিককে। আরেক হাত দিয়ে ওর ঘাড়ের ওপর থাকা চুলগুলো মুঠি করে ধরে আলতো করে ঠোঁটের স্পর্শ দিলো। ধীরে ধীরে ঠোঁট সরে গিয়ে দাঁত চেপে বসছে ঝিলিকের কাঁধে। ঝিলিক ছটফট করছে, নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার আপ্রান চেষ্টা করছে। ঝিলিক যত ছটফট করছে, ওর কাঁধে পেছনের জনের দাতেঁর চাপ ততই বাড়ছে। না পেরে চিৎকার করলো ঝিলিক-
“ছাড়ো প্লিজ।”
বাঁধন আলগা হতেই ঝিলিক কাঁধে হাত দিয়ে ঘুরে দাঁড়ালো-
“উফফ, সাতসকালে এমন রাক্ষুস কাজ না করলে হতোনা? জ্বলে যাচ্ছে একেবারে।”
সৌরভ দাঁত বের করে বদমায়েশী হাসি হাসলো-
“সাতসকালে এমন হটকেক হয়ে ঘুরে বেড়ালে এমনই হাল হবে। কখন থেকে দেখছি নিজেকে নানাভাবে সাজানোর চেষ্টা করে যাচ্ছ। বলি তুমি তো এমনিতেই সুন্দর এতো সাজার কি আছে? আর এতো পাতলা শাড়ি, আমি থাকতে কাকে দেখাবে এই দেহবল্লরী? লজ্জা শরমের মাথা খেয়েছ?”
সৌরভের কথায় ঝিলিকের চোখে ঝিলিক দিয়ে গেলো। সে আয়নায় ক্ষত দেখতে দেখতে সৌরভের পানে অগ্নি দৃস্টি নিক্ষেপ করলো-
“এখন লোকে জানতে চাইলে কি বলবো? এমন লজ্জার কাজ করোনা?”
“বাহ বেশ বললে তো? পাতলা শাড়ীতে শরীর দেখাতে লজ্জা লাগে না?”
সৌরভ নির্বিকার হয়ে আলমারি থেকে কাপড় বের করতে করতে জবাব দিলো। রাগে দুঃখে ঝিলিকের চোখে জল এলো। সৌরভটা সবসময় এমন করে। ওকে একটু সুন্দর দেখালেই যেন সৌরভের গাত্র দাহ হয়। এমন এমন কান্ড করে যে ঝিলিকের ভালো মন খারাপ হয়ে যায়। সৌরভ অবশ্য ঝিলিকের চোখের জল দেখলো না। সে পোশাক পরতে পরতে নিস্পৃহ গলায় বললো-
“যা সত্যি তাই বলবে। বলবে স্বামী সোহাগের দাগ।”
ঝিলিক সৌরভের কথার জবাব না দিয়ে কাঁধের চুম্বনের দাগ মেকাপের আড়াল করার চেষ্টায় মন দিলো। রুম থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার আগে ঝিলিকের কপালে আলতো চুমো দিয়ে ওর মুখ তুলে নিজের দিকে ফিরালো-
“শোনো, কারো সাথে কম্পিটিশনে যাওয়ার কি দরকার বলোতো? তোমার চাইতে সুন্দরী এই বংশে একটাও নেই। আর অন্য কারো চোখে নিজেকে খোঁজার চেষ্টা করেই বা কি লাভ? নাও ইউ আর মাই ওয়াইফ এটা ভুলে যেয়ো না। ভুলে যেয়ো না আমার গায়েও কিন্তু শাহ বংশের রক্ত বইছে!”

★★★

রাযীনের হাতে হাত রেখে দোতলার সিড়ি বেয়ে নিচে নামতে যেয়ে অদ্ভুত এক অনুভবে স্থবির হয়ে যাচ্ছিলো রুহি। নিচতলায় হলরুমে চোখ পড়তেই পা থেমে যেতে চাইছিলো। পনের থেকে বিশজন মানুষের নজর তাদের দিকে। তাদের দু’জনকে দেখে গুঞ্জন শুরু হলো, কারো কারো চোখে মুগ্ধতা। রুহির বুকের ভেতর ধরাস ধরাস আওয়াজ, মুখে হাসি। নিচে নামতেই রোজি এগিয়ে এলো। রুহির হাত ধরে সবচেয়ে বয়সী মানুষটার সামনে নিয়ে এলো-
“তোমার শশুরের সবচেয়ে বড় বোন খুকু বুবু।”
রুহি পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতেই খুকু নামের বৃদ্ধা ওর মাথায় হাত রেখে দোয়া করলো, কোঁচড় থেকে একটা স্বর্নের একজোড়া মোটা বালা বের করে রুহির হাতে পড়িয়ে দিলো-
“আমার আশুর পচ্ছন্দের তুলনা হয় না। রাজের জন্য তোমার চাইতে সুন্দরী আর কেউ হতেই পারে না। মাশাল্লাহ, দু’জনকে মানাইছে ভালো কি বলো বড়বউ?”
“জ্বি বুবু।”
রোজী ছোট্ট করে উত্তর দিলো।
“যাও যাও ওদের সাথে পরিচিত হও। তোমার ননদরা সব সকাল সকাল শশুর বাড়ি থেকে এসে বসে আছে তোমাকে দেখার জন্য।”
বৃদ্ধা হাত নাড়তেই রোজী রুহিকে নিয়ে আগায়-
“এই যে তোমার ছোট ননদ রেনু আর ওর স্বামী নকিব। ওদের দুই বাচ্চা মিনি আর নওমি। তোমার বড় ননদ বেনু ওর স্বামী জামসেদ আর নিরো নীলি ওদের দুই ছানা। তোমার একমাত্র ভাসুর সৌরভ আর ওর বউ ঝিলিকের সাথে তো কালই পরিচয় হয়েছে।”
রুহি মাথা ঝাকায়।
“আরো একজন আছে তো বড়ভাবি তার কথা বলবেন না?”
শিখা পেছন থেকে জানতে চাইতেই আফজালের মৃদু তিরস্কার শোনা গেলো-
“আহ শিখা, কি হচ্ছে কি? ও তো আসেনি বাদ দাও ওর কথা।”
“কেন বাদ দেবো কেন? ও আসেনি কেন? ও তো এ বাড়ির মেয়ে, সবচেয়ে বড় মেয়ে।”
“ছোট বউ চুপ থাকো। সব জায়গায় সব কথা বলতে নাই এই জ্ঞান তোমার কবে হবে?”
খুকুর মৃদু হুঙ্কার শোনা গেলো। পুরো হলরুম জুড়ে নিরবতা নেমে এলো।
“আমার একটা জরুরি ফোন এসেছে আসছি আমি।”
রাযীন বাইরে চলে গেলো। খুকু গলা শোনা গেলো-
“ওকে আশুর কাছে নিয়ে যাও বড় বউ।”
এতোক্ষণের নাটকীয়তার কোন কিছু না বুঝলেও পুরো ব্যাপার রুহিকে দিশেহারা করে দিয়েছে। সবার মধ্যে কেমন একটা অস্থিরতা বিরাজ করছে মনেহচ্ছে। আশরাফ আঙ্কেলের কাছে নিয়ে যাওয়ার মানেই বা কি? গতদিন থেকে আজ পর্যন্ত তাকে কোথাও দেখলো না কেন? ভাবতে ভাবতে শাশুড়ীর সাথে যে রুমে এসে দাঁড়ালো সেটা দোতলার পুর্ব দিকের কামড়া।
“তুমি একটু দাঁড়াও এখানে। আমি ডাকলে ভেতরে এসো।”
শাশুড়ী মা ভেতরে চলে গেলো। ঠিক দুমিনিট পরেই রুহির ডাক পড়লে। ভেতরে যেয়ে যা দেখলো তা দেখার জন্য ও প্রস্তুত ছিলোনা কখনোই। বাবা কি তবে এই কারনেই ওকে এখানে ফেরত পাঠালো?

চলবে—
© Farhana_Yesmin

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here