#না_চাহিলে_যারে_পাওয়া_যায় পর্ব ৭

0
219

#না_চাহিলে_যারে_পাওয়া_যায় পর্ব ৭
#ফারহানা ইয়াসমিন

রুহির হাতজোড়া শক্ত করে ধরে আছে শুভ। এতো শক্ত করে ধরে আছে যেন কোনদিন ছাড়বে না। লেকের পাড়ের খোলা হাওয়ায়ও যেন শুভ আর রুহির দমবন্ধ লাগছে।
“রুহি চল আমরা পালিয়ে যাই দূরে কোথাও। এই সমাজ সংসার, নিয়মকানুন সব থেকে এতো দূরে যেখানে কেউ আমাদের খুঁজে পাবে না। শুধু তুই আর আমি ছাড়া যেথায় পরিচিত কেউ থাকবেনা। তোকে হারিয়ে ফেলার ভয় থাকবেনা। যাবি রুহি? প্লিজ রুহি চলনা? রুহি! শুনতে পাচ্ছিস?”
শুভ চিৎকার করে ওঠে। রুহি বোবা দৃষ্টিতে তার নেত্রের জলে ভিজে যাওয়া মুখ তুলে চাইলো। হাহাকার জড়ানো গলায় বললো-
“আমি বধির হলে ভালো হতো শুভ। কারো কথা কানে যেত না। কারো অন্যায় আবদারে মাথা নোয়াতে হতোনা। কারো ভালোবাসা ফিরিয়ে দেওয়ার দায় নিতে হতো না। আমি বধির হতে চাই শুভ, আমায় বধির বানিয়ে দে। আর পারছি না সইতে শুভ, আর পারছি না।”
রুহি হুহু করে কাঁদে, অক্ষম আক্রোশে দু’হাত সজোরে দেয়ালে বাড়ি দেয়, তবুও তীব্র ব্যাথায় একফোঁটা শব্দ বের করে না মুখ থেকে। এ ব্যাথা কিছুই না রুহির কাছে, এর চাইতে হাজারগুন বেশি ব্যাথা হৃদয় ফালাফালা করে ফেলছে তার। পার্থক্য শুধু এই যে হৃদয়ের টা দৃষ্টিগোচর হয় না। রুহির চোখ থেকে ক্রমাগত নোনাজলের ফোয়ারা বইছে। এমনিতেই কাল সারারাত দুচোখের পাতা এক হয়নি রুহির। কি করবে ও, এই ভাবনায় সারারাত এপাশ ওপাশ করেছে। নির্ঘুম রাত আর বুক জুড়ে চেপে বসা দায়ের ভারে সে ন্যুজ, চোখ দুটো রক্তজবার মতো লাল হয়ে ছিলো। এখন কান্নাকাটি করার ফলে চোখ ফুলে ঢোল হয়ে গেছে। আলুথালু বেশের রুহিকে কেমন পাগল পাগল দেখায়। শুভ এই প্রথম বারের মতো রুহিকে জড়িয়ে ধরলো-
“রুহি, চলনা আমার সাথে। বিশ্বাস কর ভালো রাখবো তোকে। কখনো কোনো দুঃখ ছোবে না তোকে। নিজেদের মতো করে একটা জীবন গড়ে নেবো। আমাকে বন্ধু ভাবিস তো? এই বন্ধুকে বিশ্বাস করে দেখ তুই ঠকবি না।”
রুহি শুভর কাঁধে মাথা রেখে হু হু করে কাঁদে। অনেকটা সময় পার হওয়ার পর মুখ তুলে শুভকে দেখলো। শুভর ফর্সার গালে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির আভা। লালচে ঠোঁট জোড়ায় রাজ্যের মায়া লুকিয়ে আছে। রুহির ঘোর লাগে, শুভর থেকে দৃষ্টি ফেরাতে পারে না। এতো মন দিয়ে কোনোদিন দেখা হয়নি শুভকে। নিজের চারপাশে সবসময় একটা দেয়াল তুলে রেখেছে রুহি। বন্ধু হিসেবে শুভ কখনো সে দেয়াল পেরিয়ে যায়নি। ভালোবাসি বলার পরে রুহির হ্যা শোনার অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতেই জীবন পাল্টে গেলো। শুভর চোখেও জলের ছায়া। রুহির তাকানো দেখে শুভ মুখ ঘুড়িয়ে নিলো। আশেপাশে কতো সুখী জোড়া বসে আছে। হাসছে গল্প করছে চা খাচ্ছে খলবলিয়ে হাসছে আর তারা কিনা আলাদা হওয়ার দৃশ্য রুপায়ন করছে? এই সুন্দর পরিবেশে বিচ্ছেদের নাটক রচিত হচ্ছে? রুহি শুভর থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে একটু দূরত্ব রেখে বসলো-
“বাবা চায় আমি তার ঋণ শোধ করি যেন। আমাকে পৃথিবীতে আনার ঋণ শোধ। আমার এই এতোদূর পথচলায় তার সহযোগিতার ঋণশোধ। এখন তুই আমাকে বল আমি কি করবো? জন্মদাতা যদি এমন কিছু চায় তবে সন্তান হয়ে আমি কি করতে পারি বলে দে।”
শুভর চোখের তারায় রাগের ঝিলিক-
“এ পৃথিবীতে তুই কি নিজ ইচ্ছায় এসেছিস নাকি তারা এনেছে? এমন অন্যায় আবদার মেনে নিবি কেন?”
রুহি ফ্যাকাসে মুখে হাসলো-
“এ প্রশ্ন অবান্তর শুভ। ঠিক বুঝবি না, তোর বাবা মা নেইতো তাই তাদের গুরুত্ব ঠিক বুঝতে পারবি না। আমার বয়স যদি এখন আঠারো হতো আর তুই যদি আমার প্রথম প্রেম হতি তাহলে হয়তো আমি তোর সাথে পালিয়ে যাওয়ার কথা দু’বার ভাবতাম না। আমার তেইশ চলছে, পড়ালেখা শেষ করে চাকরি শুরু করেছি এখন কি ছেলেমানুষী মানায়? আমার মধ্যে ভালোবাসা আছে তবে তীব্র পাগলামি করার মতো মানসিকতা নেই রে। বিয়েটা একটা মেয়ের জীবনে কতোটা পরিবর্তন আনে তা নিয়ে কোন ধারণা ছিলোনা আমার। কিছু বোঝার আগে বিয়ে তারপর একদিনের মধ্যেই আবার শশুর বাড়ি থেকে ফিরে আসা। এরপর আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব পাড়াপ্রতিবেশির যত কথা গিলেছি তাতে আর কোন সাহসী পদক্ষেপ নিতে ভীষণ ভয় আমার। খুব অল্প সময়ে জীবনের অনেক অদেখা দেখে ফেলেছি। নতুন করে কিছু দেখবো বা করবো সে সাহস করতে পারি না শুভ। তুই সব জানিস তবুও বলছি কারন তুই জানিস আর আমি সেটা সহ্য করেছি।”
“এসব কেন বলছিস রুহি? আমাকে এতোদিন দেখেও কি আমাকে ভুল মানুষ মনেহয়? এতোটুকুও আস্থা নেই আমার উপর?”
শুভর কন্ঠে আর্তনাদ। রুহি কান্না হাসির মাঝামাঝি একটা মিশ্র হাসি হাসলো-
“ব্যাপারটা ঠিক বিশ্বাসের না রে শুভ। আমার মনের কথা শোনার কোন এখতিয়ার কি আছে আমার? মেয়েরা কতোদিন দিয়ে অসহায় হয় তা কি তোরা বুঝবি? আমরা তিনবোন, সংসারে বাবাই ভরসা। বাবার সাথে মা আর আমাদের তিন বোনের জীবন জড়িয়ে আছে। আমি না হয় তোর সাথে জীবন গড়লাম কিন্তু আমার জন্য বাবার কিছু হলে বাকীদের কি হবে বলতো? ওরা কি তখন সারাজীবন আমাকেই দোষী ভাববে না? পরিস্থিতি এমন দাঁড়ালে আদৌও কি আমি ভালো থাকতে পারবো?”
শুভ কি বলবে ভেবে পেলোনা। নিজেকে সেই হেরে যাওয়া ঘোড়ার মতো লাগছে যে প্রতিযোগিতা শুরুর আগেই রেস থেকে হারিয়ে যায়। সে অদ্ভুত বিষন্ন গলায় বলে-
“আমি জানতাম তুই আমাকে বন্ধুর চেয়ে বেশি কিছু ভাবিস, ভালোবাসিস। এখন মনেহচ্ছে তোর পক্ষে কাউকে ভালোবাসাই সম্ভব না।”
“ভুল বললি শুভ, ভালোবাসা সম্ভব কিন্তু সেই ভালোবাসা নিজের করে পাবো এমনটা আশা করা সম্ভব না। বিয়ের ইনসিডেন্টের পর আমার জীবন নিয়ে খুব একটা আশা ছিলো না কখনোই। আমি নিজের অজান্তেই এমন হয়ে গেছি শুভ। তবুও ক্ষনিকের জন্য মনেহয়েছিলো তোর সাথে হয়তো সত্যি একটা ভালো জীবন কাটানোর সৌভাগ্য হবে কিন্তু…”
রুহির হৃদয় নিঙড়ানো হাহাকার ধ্বনি বেড়িয়ে এলো-
“আমায় ক্ষমা করিস শুভ। তোর এই অকৃতজ্ঞ বন্ধুটিকে ক্ষমা করে দিস। তোর আমার না হওয়া সংসারের জন্য ক্ষমা করিস। আমায় নিয়ে মনে কোন আফসোস রাখিস না রে। ভালো থাকিস বন্ধু।”

★★★

“বড়পা, শুভ ভাইয়াকে ছেড়ে কেন যাচ্ছ? ভাইয়া অনেক কষ্ট পাবে। তোমাকে অনেক ভালোবাসে ভাইয়া।”
রুহি একমনে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে নিচ্ছে। রুমির কথার কোন জবাব দিলো না। রুমি এগিয়ে এসে সামনে দাঁড়ালো-
“আমার কথা শুনছোনা তুমি? ওই ঘরে বসে থাকা লোকটা মোটেও ভালো না। তুমি যেয়ো না ওনার সাথে। ওনার কারণেই তো চিটাগং ছেড়ে ঢাকায় আসতে হয়েছে আমাদের। তুমি কেন ফিরে যাচ্ছ আপু?”
রুহি উল্টো ঘুরে নিজের কাজে মন দিলো-
“আমি চলে গেলে এই রুমটা তোর হবে রুমি। আরাম করে পড়তে পারবি।”
“আমার আরাম করে পড়ার দরকার নেই আপু। তুমি শুভ ভাইকে কষ্ট দিয় না প্লিজ।”
রুহি জবাব দিলো না। রুনি চুপচাপ দু’বোনের কীর্তি দেখছে-
“মানুষের ও ভাগ্য রুমি। স্বামী থাকে বন্ধু থাকে, কখনো একা থাকতে হয় না। আর আমাদের দিকে মানুষ ফিরেও তাকায় না। কি অদ্ভুত অবস্থা দেখেছিস?”
“হিংসুকদের এমনই হয় ছোটপা। মনটা পরিস্কার করো দেখবে তোমার জন্যও কেউ না কেউ আছে।”
রুমি ভেবেছিলো একথা শুনে রুনি বুঝি তেড়েফুঁড়ে আসবে। কিন্তু সে কিছুই বললো না, অগ্নি দৃষ্টি হেনে দুপদাপ পা ফেলে চলে গেলো। রুহি নিজের কাজ করতে করতে সবটাই দেখলো চুপচাপ। বিনা দোষে নিজের বোনের কাছে দোষী হয়ে বসে আছে। এখন আর কারো কাছে কৈফিয়ত দেওয়ার ইচ্ছে হয় না। সব গুছিয়ে তৈরী হয়ে বেড়িয়ে এলো।

দিলারা স্বামীর সাথে কথা বলে না আজ তিনদিন। মেয়েকে নিয়ে দু’জনার মধ্যে তুমুল বচসা হয়েছে। ইয়াকুব আলী তার সিদ্ধান্তে অটল। মেয়েকে শশুরবাড়ী ফিরে যেতে হবে, একবার সুযোগ দিতে হবে রাযীনকে। শেষমেষ বুঝাতে না পেরে কথা বলা বন্ধ। ভেবেছিলেন ইয়াকুব আলী যদি তাতে পিছিয়ে আসে। কিন্তু সাতসকালে রাযীনকে দেখে বুঝলেন তার সব চেষ্টা বিফলে গেছে। তিনি সত্যিকার অর্থেই স্বামীর উপর রুষ্ঠ হলেন। এ কেমন বাবা? মেয়ের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে বাঁধছে না? দিলারা সবচেয়ে অবাক হলো রুহির আচরণে। সে নিশ্চুপ বাবার সব কথা মেনে নিচ্ছে। দিলারার চোখ ভিজে আসে জলে। মেয়ে গত কয়েকটা বছর কতোটা মানসিক কষ্টে দিন কাটিয়েছে সেটা সে মা হয়ে যতটা বুঝেছে ততটা আর কেউ না। এখন বাবার কথা মেনে নিলেও মেয়ের বুকে কতটা ক্ষরন হচ্ছে তাও তার চাইতে ভালো কেউ বুঝবে না। একবার মনে হলো মেয়েকে শুভর সাথে পালিয়ে যেতে বলবে। পরক্ষণেই মনে হলো, রুহি রাজি হবে না। মেয়েটার মানসিক দিক দিয়ে অতোটা সবল নয়। বাবার বিরোধিতা করা ওর পক্ষে সম্ভব না। ব্যথীত হৃদয়ে দিলারা দুয়ার আঁটকে বসে রইলেন। ইয়াকুব আলী বারকয়েক ডেকে ফিরে গেলেন। মেয়ে জামাই নামক কুলাঙ্গারটাকে তিনি আপ্যায়ন করবেন না কিছুতেই। এই ছেলে শাশুড়ীর আদরের যোগ্য না।

বিদায় মুহুর্তে একফোঁটা কাঁদল না রুহি। পাথরের মতো মুখ করে রাযীনের পাজেরোতে উঠে বসলো। অনেকটা পথ লুকিং গ্লাসে তাকিয়ে দেখলো পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মা বাবা বোনদুটোকে। ওরা চোখের আড়াল হতেই চোখের কোলে আসা জল আলগোছে নিজের আঙুলে মুছে নিলো। রাযীন আড়চোখে দেখে ড্রাইভিয়ে মন দিলো। মেয়েটাকে আজ একদমই অন্যরকম লাগছে। গতদিনের দেখা রুহি আর আজকের রুহির মধ্যে পার্থক্যটা কি সেটা না বুঝলেও বুঝলো কিছু একটা ঠিক নেই। গাড়ি হাইওয়েতে ওঠা পর্যন্ত চুপচাপ রইলো রাযীন।
“আমরা কুমিল্লায় যাত্রা বিরতি দেবো। তার আগে কোন প্রয়োজন মনে করলে আমাকে বলবে।”
রাযীনের কথার উত্তরে নিশ্চুপ রইলো রুহি। এমনিতেই গাড়ীতে চড়ার অভ্যাস নেই তার উপর
টানা তিনদিন তিনরাত না ঘুমানোর ফলে মাথা ঘুরছে ক্রমাগত। পেট ফাঁকা থাকায় বমি পাচ্ছে ভীষণ। রুহির নিজের ব্যাগ থেকে পানি বের করে খেলো কয়েকবার। তাতে বমি ভাব না কমে আরো বাড়লো। সে ব্যস্ত হয়ে রাযীনের পানে চাইলো-
“শুনুন, আমার না খুব খারাপ লাগছে…বমি পা…”
কথা শেষ করার আগেই রুহি হড়বড়িয়ে বমি করলো রাযীনের গায়ে।

চলবে—
©Farhana_Yesmin

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here