#না_চাহিলে_যারে_পাওয়া_যায় পর্ব ২১

0
61

#না_চাহিলে_যারে_পাওয়া_যায় পর্ব ২১
#ফারহানা ইয়াসমিন

ওষ্ঠদ্বয়ের ব্যবধান দুই ইঞ্চিরও কম। দু’জনেই দু’জনার নিশ্বাসের উত্থান পতন টের পাচ্ছে। রুহির হার্ট এতো দ্রুতলয়ে বিট করছে যে নিজেকে কন্ট্রোল করতে ও বুকের উপর থাকা ওড়না খামচে ধরে চোখ বুজলো। কেন যেন রাযীনকে আজ থামাতে মন চাইছে না। লোকটা এই এতো দিনে একবারও ওর কাছাকাছি আশার চেষ্টা করেনি। আজ যখন অপ্রত্যাশিত ভাবে কাছে এলো তখন রুহিও বাঁধা দেবে না ভাবলো। অথচ অন্তরের ভেতরটায় অস্থিরতা ঘুরপাক খাচ্ছে। ওষ্ঠদ্বয় কাঁপছে তিরতির করে। রাযীন চোখ বোজা রুহিকে দেখে মুচকি হাসে। কপালের উপর থাকা সেলাইটাতে নিজের হাতের স্পর্শ দিতেই রুহি কেঁপে উঠলো থরথর। রাযীন আরেকটু এগোয়, রুহির অধরজোড়ায় আঙুল ছোঁয়াতেই রুহি চোখ খোলে। চোখে চোখে চোখাচোখি অতঃপর স্থির দৃষ্টিতে পলক না ফেলে তাকিয়ে থাকা। রাযীন মুখটা আরেকটু এগিয়ে নিতেই দরজায় শব্দ হলো। একবার দু’বার তিনবার এরপর রোজীর গলা শোনা গেলো-
“রাজ, আসবো?”
দু’জনে প্রায় ছিটকে সোফার দুপ্রান্তে চলে গেলো। রুহি পড়িমরি করে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের জামা ঠিকঠাক করছিলো দেখে রাযীন হেসে দিলো ফিক করে। রুহি লাজুক হেসে দৌড়ে ওয়াশরুমে ঢুকতেই রাযীন দরজা খুলে দিলো।
“তোমার সাথে কথা ছিলো একটু। বউমা কোথায়? ওকেও লাগবে।”
“ও মনেহয় ওয়াশরুমে আছে। তুমি বসো মা, বলো কি বলবে।”
রোজীকে বিরক্ত দেখাচ্ছে, অস্থির গলায় বললো-
“আজ যা হলো মোটেও ভালো হলোনা। আমাদের পরিবারে রেষারেষি কখনো এমন পর্যায়ে যায়নি আগে। এরকম ঘটনা বারবার হলে কি হয় জানো?”
রাযীন উত্তর না দিয়ে মায়ের মুখ পানে চেয়ে রইলো। জানে মায়ের কথা শেষ হয়নি কাজেই মুখ খোলা বৃথা। রুহি ওয়াশরুম থেকে বেরুতেই রোজী কাছে বসার জন্য ইশারা করলো-
“চোখের পর্দা নষ্ট হয়ে যায়। তখন সবাই নিজের ইচ্ছে মতন চলতে শুরু করে। চেইন অফ কমান্ড ভেঙে পড়ে। এতে করে পারিবারিক সুনাম তো যাবেই সেই সাথে ব্যবসা মুখ থুবড়ে পড়বে। তোমার বাবা নিজের সমস্ত জীবন এইসব নিয়মনীতি মানতে আর মানাতে কাটিয়ে দিয়েছে। তাতে ঘরে বাইড়ে সিংহভাগ লোকের বিরাগভাজন হয়েছিলেন। তবে সংসার আর ব্যবসা সামলেছিলেন দক্ষ হাতে। এতোটুকু আচঁড় লাগতে দেননি কোথাও। সেই তার ছেলে হয়ে আজ তুমি এমন কাজ করলে এটা আমার কেন যেন বিশ্বাস হয় না। তবুও নিজ চোখে দেখা জিনিস অস্বীকার করি কি করে।”
বলে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন রোজী। হাতের নখ দেখছিলেন চুপচাপ তারপর রাযীনের দিকে মুখ তুলে চাইলেন, ক্লান্ত চেহারায় হাসার চেষ্টা করলেন-
“আমার আর এসব ভালো লাগে না রাজ। আমি চাই না দ্বিতীয়বার এমন ঘটনা ঘটুক। তুমি তো সব ফেলে চলেই গেছিলে হয়তো আর ফিরতেই না। এখন হঠাৎ এসে যদি এমন আচরণ করো তাহলে সবারই মেনে নিতে কষ্ট হবে। আর মনে রাখবে সম্পর্ক টাকার চাইতে অনেক দামী জিনিস। কাজেই ব্যবসা টাকা এসবের মায়ায় জড়িয়ে সম্পর্ক নষ্ট করো না।”
রাযীন চুপচাপ মায়ের কথা শুনে গেলো। মায়ের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যেয়েও বললো না। আজ মাকে একটু বেশিই ক্লান্ত দেখাচ্ছে। মায়ের এই ক্লান্তিতে কি তারও ভুমিকা নেই? তারা সবাই কেবল নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থেকেছে। মায়ের দিকটা কখনো ভেবে দেখেনি। রোজীর ক্লান্তিকর মুখের দিকে তাকিয়ে রাযীনের বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠলো।

★★★

“সৌরভ একা একা এতোবড় কাজ করলো কি করে? আমাকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি?”
আফজাল বিস্ময় নিয়ে শিখার দিকে তাকালো। শিখা গম্ভীর হলো-
“আহ এতো বেশি মনে লাগাচ্ছ কেন? ছেলে বড় হয়েছে নিজের মনের মতো কোন কাজ যদি করে তাহলে এতো রাগ করা উচিত না। ওরা নিজে নিজে কাজ না শিখলে চলবে কি করে?”
আফজাল শিখার চেহারার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো-
“তুমি জানতে ব্যাপারটা?”
শিখা ইতস্তত করে মাথা নাড়লো। আফজাল অবাক হলো-
“ওকে মানা করোনি কেন? সবাই যদি ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য নিয়ে ঘুরে বেড়ায় তবে বিজনেস কি টিকে থাকবে?”
“সে তো এমনিতেই টিকবে না। আজকালকার জেনারেশন একসাথে মিলে মিশে থাকে কোথায় বলো? তাছাড়া অতীতে যা হয়েছে সেটা কারো পক্ষেই ভোলা সম্ভব না। তুমি দেখলেনা রাজ কি করলো? আমার মনেহয় নিজেদের ভবিষ্যৎ গুছিয়ে নেওয়াটা কোন ভুল কিছু না।”
“তুমি কি বুঝে এসব বলছো জানি না। তবে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিলে সবাইকে ভুগতে হবে শিখা। আমি চাই না আলিফ কিংবা নুরীর মতো কোন ভুল কেউ করুক।”
“ওরা কেউ ভুল করেনি ভুল ছিলো ভাইজানের। ভাইজান নিজের মত সবার উপর চাপিয়ে দিয়ে সবাইকে অত্যাচার করেছে। ওরা সহ্য করতে পারেনি সেটা।”
শিখা চাপা কন্ঠে গর্জে উঠলো। আফজাল দীর্ঘ শ্বাস ফেলে উঠে দাড়ালো-
“সেই পুরনো ইস্যুতে আঁটকে আছো। শিখা ভুলে যাও পুরনো ঘটনা।”
“তুমি ভুলতে পারো কিন্তু আমি না। আমি মা, এতো সহজে কি করে ভুলবো। মেয়েটা বেঁচে থাকার পরও তাকে দূরে সরিয়ে রাখতে হয় এর চাইতে কষ্টের কি আছে?”
শিখার চোখ দুটো লাল, ছলছল আঁখি থেকে জল গড়ায়। আফজাল শিখার পানে না চেয়ে বেড়িয়ে এলো।

ঝিলিকের শরীরটা মাঝে মাঝেই কেঁপে উঠছে। উল্টো হয়ে শুয়ে থাকা ঝিলিক ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। কিছুক্ষণ আগেই সৌরভের কাছে তীব্র শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তার দোষ, রাযীন কিভাবে হোটেলে ইনভেস্ট এর খবর পেলো? অথচ ঝিলিক এ ঘটনার বিন্দুবিসর্গও জানে না। বারবার বলার পরও সৌরভ ওর কথা বিশ্বাস করেনি। ঝিলিকের অনুমতির তোয়াক্কা না করেই জোর করে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছে। চুলের মুঠি টেনে ধরে বারকয়েক প্রশ্ন করেছে, কেন বললি? এখনও ভুলিসনি নাগরকে? মনে এখনো ওকেই জায়গা দিয়ে রেখেছিস? শরীর জুড়ে ব্যাথায় ঝিলিক নড়াচড়া করতে পারে না। ভাবে, কোন কুক্ষণে সৌরভকে বিশ্বাস করেছিলো পাঁচ বছর আগে? বিশ্বাস করে সৌরভের ডাকে সারা দিয়ে চলে গিয়েছিলো নির্জন বাড়িতে। কেন বোকার মতো ভুল বুঝেছিলো রাজকে? আর কেনইবা রাজকে দূরে ঠেলে সৌরভকে বিয়ে করতে রাজি হলো? রাগের মাথায় হুট করে নেওয়া সিদ্ধান্ত আজ বিষফোড়ায় রুপ নিয়েছে। না পারছে গিলতে না পারছে উগলাতে। সৌরভ কেমন মানুষ ভেবে পায় না ঝিলিক। এতো কিছু করার পরও একটুও অনুতপ্ত নয় নিজের কাজে। উল্টো দিনরাত ঝিলিককে রাজের কথা বলে মানসিক চাপে রাখে। বউ হিসেবে এতোটুকু সন্মান পায়নি সৌরভের কাছ থেকে। পুরনো স্মৃতি মনে করে ঝিলিক হুহু করে কেঁদে উঠলো। বাথরুম থেকে ঘুরে এসেও ঝিলিককে কাঁদতে দেখে সৌরভের মাথা যেন আগুন হয়ে গেলো-
“এখনো এতো নাকি কান্না কিসের? উঠে পড়ো অনেক ঢং হয়েছে।”
“ঢং আমি ঢং করছি? আর কতো অত্যাচার করবে আমাকে? ইউ ফ্রড, লায়ার, চিটার। চিট করে আমাকে বিয়ে করেছো।”
ঝিলিক ঝাজিয়ে উঠলো। সৌরভ শয়তানি বিটকেল হাসি দিলো-
“আহারে আমার সতী সাবিত্রী রে। কেন এসেছিলে আমার ডাকে সারা দিয়ে? রাজের সাথে দিনরাত এই করতে তা কি বুঝিনি? তা না হলে আমি ডাকতেই দৌড়ে চলে এলে কেন?”
“রাজ কোনোদিন স্পর্শ করেনি আমাকে। ও তোমার মতো নিচ নয়। আমি তোমাকে ভাই মনে করে তোমার ডাকে সারা দিয়ে এসেছিলাম, বিশ্বাস করেছিলাম। তুমি আমার বিশ্বাস ভঙ্গ করে আমাকে রেপ করেছিলে বাধ্য করেছিলে বিয়েতে রাজি হতে।”
ঝিলিকের কথা শুনতে শুনতে সৌরভের চেহারা পাল্টে গেলো। রাগে চন্ডাল মুর্তি হয়ে ঝিলিকের মাথার চুল খামচে ধরে গালে সপাত করে দুটো চড় বসায়-
“আমি নিচ? আমি খারাপ? খা..কি….মা… আজ তোকে উচিত বুঝিয়ে ছাড়বো আমি কি? রাজের নাম তোর মন থেকে চিরদিনের মতো ভুলিয়ে ছাড়বো।”
সৌরভ দ্বিগুণ আক্রোশে ঝিলিকের উপর ঝাপিয়ে পড়লো।

চলবে—
©Farhana_Yesmin

(বইমেলায় আমার দ্বিতীয় বই ‘অনসূয়া’ পাবেন এশিয়া পাবলিকেশন্স এর স্টল ৯১-৯৪ এ। আমার প্রথম বই তিয়াস পাওয়া যাচ্ছে বইমেলায় ১৪৯ নং স্টলে। দুটো বই রকমারিতেও পাবেন। চাইলে সংগ্রহ করতে পারেন। রকমারি অর্ডার লিংকঃ
তিয়াসঃ
https://www.rokomari.com/book/211757/tiyas
অনসূয়াঃ
https://www.rokomari.com/book/226534/anosoya)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here