কনফিউশন পর্ব ২৪

0
159

কনফিউশন পর্ব ২৪
লেখকঃ মৌরি মরিয়ম

পার্সেলটা এসেছিলো বিকেলে। কিন্তু এখন অনেক রাত। ইতোমধ্যে ‘গড অফ স্মল থিংস’ বইটির বেশকিছু অংশ আরশির পড়া হয়ে গেছে কিন্তু এখনো প্রাপ্তিস্বীকার বা ধন্যবাদ দেয়নি। আরশির প্রতি কাব্যর ভালোলাগা তার কাজকর্মে আগে বোঝা গেলেও এই প্রথম সে সরাসরি কিছু বললো। গুণমুগ্ধ শব্দটা সাধারণ কিন্তু শব্দটাকে বিশ্লেষণ করলে তা আর সাধারণ থাকেনা। কাব্য লিখেছে সে আরশির গুণমুগ্ধ এটা ভাবতেই তার কী ভীষণ লজ্জা যে লাগে! যদি কাব্য সামনাসামনি কিছু বলে তখন আরশি কি দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে তার সামনে? পরক্ষণেই মনে হলো, সে কি খুব বেশি ভেবে ফেলছে? কাব্য হয়তো শুধুই গুণমুগ্ধ, অন্যকিছু নয়। হয়তো সাধারণভাবেই লিখেছে। সেই অতিরঞ্জিত করে ভাবছে!

আরশি জানালা খুলে নিচে তাকালো, কাব্যর ঘরের লাইট জ্বলছে তার মানে সে জেগে আছে। আরশি ফোন করলো। কয়েকবার রিং হওয়ার পরে ধরলো। ধরেই হেসে বললো,
“কেমন গেল বার্থডে গার্লের দিন?”
“ভালো। আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ। এরচেয়ে সেরা উপহার আর হয়না।”
“মাই প্লেজার। জানি বই পেলেই তোমার সবচেয়ে ভালো লাগবে।”
“আপনি আমার জন্মদিন কীভাবে জানলেন?”
“দুপুরবেলা তোমাদের বাসায় যে দারুণ সব রান্নাবান্না হয়েছে তার কিছু অংশ আমার কাছেও এসেছে। ভাবিকে উপলক্ষ্য জিজ্ঞেস করতেই বললো আজ তোমার জন্মদিন।”
“ওহ আচ্ছা।”
“অনেকদিন তোমার সাথে দেখা হয়না। বাসায় ছিলে না?”
“ছিলাম। বের হইনি কোথাও।”
“ঘরের জানালাও সবসময় বন্ধই দেখতাম।”
“আলো সহ্য করতে পারছিলাম না কিছুদিন।”
কাব্য অবাক হয়ে ভাবতে লাগলো রঙ সহ্য করতে পারেনা, এখন আবার আলো! তবে কিছু বললো না। আরশি জিজ্ঞেস করলো,
“আপনি কক্সবাজার থেকে কবে ফিরলেন?”
“যেদিন গিয়েছি সেদিনই ফিরে এসেছি।”
“মাত্র একদিনের জন্য এতোদূর গিয়েছিলেন?”
“না তবে যাওয়ার পর খুব অপ্রীতিকর একটা পরিস্থিতিতে পড়েছিলাম। খুব বিরক্ত লাগছিলো তাই চলে এসেছি।”
“একটানা অনেক জার্নি হয়ে গেল!”
“তা গেল অবশ্য। যাই হোক, আমরা কি একদিন দেখা করতে পারি আরশি?”
“হঠাৎ?”
“অনেকদিন দেখা হয়না তাই।”
“সকালবেলা হাঁটতে যাবো, যাবেন?”
“কোথায়?”
“কোথাও না, রাস্তায়।”
“ফোন করে উঠিয়ে দিও।”
“আচ্ছা।”

রশ্নি সকালবেলা সবার আগে উঠে চুলা জ্বালাবে। তাই আরশি চিরকুট টা চুলার উপরে চামচ চাপা দিয়ে রাখলো। চিরকুটে লেখা,
“আমার খুব হাঁটতে যেতে ইচ্ছে করছে ভাবি। বাইরে হাঁটতে গেলাম। তোমরা ঘুমে তাই জাগালাম না।”
তারপর বেরিয়ে পড়লো। কাব্য তৈরি হয়ে নিচেই দাঁড়িয়ে ছিলো। আরশি যখন সিঁড়ি দিয়ে নামছিলো কাব্য অবাক হয়ে দেখছিলো৷ এ কদিনে আরশির মুখে বিষণ্ণতা আরো বেড়ে গেছে, চোখের নিচে কালি পড়েছে। তবে অদ্ভুত ব্যাপার হলো সব মিলিয়ে ওকে আগের চেয়ে আরো বেশি সুন্দর লাগছে। নাকি অনেকদিন পর দেখেছে বলে কাব্যর দুচোখ তৃষ্ণা মেটাতে গিয়ে ভুলভাল দেখছে? নাকি আরশির সব রূপই কাব্যকে মুগ্ধ করে?

এই কাকডাকা ভোরে আরশি কাব্য ফুটপাত ধরে পাশাপাশি হাঁটছে। আরশি বাসা থেকে বের হয়ে এতদূর আসা পর্যন্ত একবারো কাব্যর মুখের দিকে তাকায়নি। কীভাবে তাকাবে, সেই তখন থেকে কাব্য অনবরত ওর দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। এই ছেলেটার চোখে চোখ রাখার সাহস আরশির নেই। কিন্তু মাঝেমাঝে খুব ইচ্ছে করে। কাব্য বললো,
“সকালটা সুন্দর।”
“হুম।”
“কেউ যদি তোমাকে আমার সাথে দেখে ফেলে?”
“দেখলে কী হবে?”
“কিছুই হবে না?”
“না।”
“না হলেই ভালো।”
“আপনি সিগারেট একদম ছেড়ে দিয়েছেন?”
“কেন বলোতো?”
“গন্ধ পাচ্ছিনা!”
“চেষ্টা করছি। তিনবেলা তিনটা খাই। এছাড়া রাগ উঠলে, টেনশনে পড়লে বা একাকিত্ব অনুভব করলে একটু বেশি খাওয়া হয়। এই আরকি।”
আরশি হেসে বললো,
“আমার মনে হয় আপনি চাইলে ছেড়ে দিতে পারবেন।”
কাব্য অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আরশির হাসির দিকে। একটা মানুষের মৃদু হাসিই এতো সুন্দর। মানুষটার প্রাণখোলা হাসি কেমন হবে? কাব্য অপেক্ষা করছে আরশি কখন একবার তার দিকে তাকাবে। কাব্য ওই চোখে একবার চোখ রাখতে চায়, ওই চোখের ভাষাটা একবার পড়তে চায়। কিন্তু আরশি একবারো তার দিকে তাকাচ্ছে না।

দুজন একসাথে হাঁটছে কিন্তু তেমন কথা বলছে না। তবুও দুজনেরই খুব ভালো লাগছে। ধীরে ধীরে স্কুলগামী ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে। রিক্সা গাড়ী চলতে শুরু করেছে। ভির বাড়তেই আরশি বললো,
“চলুন ফেরা যাক। এক্ষুণি জ্যাম লেগে যাবে।”
“চলো।”

ফিরতে গিয়েই অঘটনটা ঘটলো। রাস্তায় হাঁটার জায়গা কম থাকায় আরশি কাব্য আগেপিছে হাঁটছিলো। আরশি সামনে, কাব্য তার পেছনে। হঠাৎ একটা অটোরিকশা তাদের পাশ দিয়ে এতো বেপরোয়াভাবে গেলো যে আরশির গায়ে ধাক্কা লেগে আরশি পড়ে গেলো। সাথে সাথে কাব্য চিৎকার করে উঠলো,
“এই মিঁয়া চোখ কি বাসায় রেখে আসছো? এতো তাড়া কীসের?”
এদিকে আরশি ব্যথায় চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলো। যখন চোখ খুললো তখন খেয়াল করলো তার জামার হাতাটা ছিঁড়ে গেছে। সাথে সাথে ওড়না দিয়ে হাতটা ঢেকে ফেললো। সে কখনো ফুল হাতা বা থ্রি কোয়ার্টার হাতা ছাড়া জামা পড়ে না। তাই এই অবস্থায় খুব অস্বস্তি লাগছে।

রিক্সা ততক্ষণে চলে গেছে। কাব্য আরশিকে ধরে উঠালো। একটা বন্ধ চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসিয়ে রিক্সা খুঁজতে লাগলো। কাব্য রিক্সা খুঁজছে, এদিকে ভয়ঙ্করভাবে আরশির বুক ধুকপুক করছে। নিশ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম। কাব্য একটু আগে তার হাতের বাহু ধরে তাকে উঠিয়েছে। এই স্পর্শ তাকে মেরে ফেলার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here