#তোকে চাই পর্ব ২৪

0
320

#তোকে চাই❤পর্ব২৪
#নৌশিন আহমেদ রোদেলা❤



ওয়াশরুমে চুপচাপ বসে আছি,,,,পাশের ট্যাব থেকে অঝোরে পানি ঝরছে তার সাথে তাল মেলাচ্ছে আমার চোখ।।।জানি না আমি কেন কাঁদছি,,,,নিজের জন্য নাকি শুভ্রর জন্য।।আমার এই ভাগ্যটার জন্য কে দায়ী??শুভ্র??শুভ্রকে আমি কিভাবে দোষ দেবো??সত্যিই তো ভালোবাসার মানুষকে ভুলে যাওয়া কি এতো সহজ??আমি উনার জায়গায় থাকলে কি পারতাম মেনে নিতে???যে সয় সেই বুঝে কষ্ট কাকে বলে,,শুভ্রর কষ্টের সামনে আমার কষ্টটা নিতান্তই তুচ্ছ।।।নিজেকে খুব অসহায় লাগছে,,মনে হচ্ছে যদি কোনোভাবে শুভ্রর কষ্টগুলো ধুয়ে মুছে দিতে পারতাম,,,,কিন্তু আমি হেল্পলেস।।।আমারও আজ খুব করে মনে হচ্ছে,,, নীলিমা আপু,,ফিরে আসো তুমি,,,একবার ফিরে আসো,,তোমার শুভ্রকে আমি তোমার কাছেই ফিরিয়ে দেবো,,,,আমি উনার হাসিটাকে পেতে চাই,,উনাকে না পেলেও আমার চলবে,,,কান্নাভেঁজা শুভ্রকে আমি আর নিতে পারছি না,,,প্লিজ ফিরে আসো।।।তুমি তো সবসময় বলতে,,আমার কোনো কথায় তুমি ফেলতে পারো না,,,দেখো তুমি মিথ্যে বলতে আমাকে।।।সবসময় মিথ্যে বলতে।।হঠাৎ উনার গলার আওয়াজ পেয়ে উঠে দাঁড়ালাম,,,আমাকে ডাকছেন।।মুখে-চোখে পানি দিয়ে বেরিয়ে আসতেই দেখি উনি ওয়াশরুমের ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।।।চোখগুলো লাল হয়ে আছে,,মুখটাও মলিন,, হয়তো কেঁদেছেন।।।আমাকে দেখেই বলে উঠলেন,,

তুমি ঠিক আছো?

হুম(মাথা নেড়ে)কেন???

না,, তোমার চোখ-মুখ ফুলে আছে যে তাই বললাম??

এ,,এমনি,,ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তাই হয়তো।।

ওহ

উনার “ওহ” কথাটা আমার বুকে গিয়ে লাগলো।।অন্য সময় হলে হয়তো,,এখন আমাকে ইচ্ছে মতো বকে দিতেন,,,,কিন্তু আজ শুধু একটা “ওহ”।।

নীলিমা আপুকে খুব মিস করছেন তাই না???(টলমলে চোখে)

আমার কথাটা শুনেই উনি উল্টোদিক ফিরে ব্যালকনির দিকে পা বাড়ালেন,,, হয়তো চোখের জল লুকানোর চেষ্টায় আছেন।।

আমিও মিস করছি খুব,,,,

কথাটা শুনেই উনি ফিরে তাকালেন,,চোখে ভার হয়ে থাকা অশ্রুগুলো নেমে গেল গাল বেয়ে,,আমার চোখেও জল।।উনি ধীরে ধীরে বিছানায় গিয়ে বসলেন,,মাথা নিচু করে দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে রেখেছেন,,,শরীর হালকা কেঁপে কেঁপে উঠছে,,,বুঝতে পারছি কাদঁছেন।।।মাঝে মাঝে অবাক হয়,,, কাউকে এতোটাও ভালোবাসা যায়???আমার বুকটা ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত,,নিজের স্বামীকে এভাবে কাদঁতে দেখলে নিজেকে যে কতোটা অসহায় বলে মনে হয় সেটা কাউকে বুঝানোর ক্ষমতা আমার নেই।।সাহস নিয়ে উনার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম,,কাঁপা কাঁপা হাতে উনার কাঁধে হাত রাখতেই বাচ্চাদের মতো কাদঁতে লাগলেন।।।হয়তো আমার হাতের ছোঁয়ায় ভরসা খুঁজে পেয়েছেন।।আমি হাত রাখতেই উনি ভাঙা ভাঙা কন্ঠে বলে উঠলেন,,,

ভীষন কষ্ট হচ্ছে রোদ।।আমার সাথেই কেনো হলো এমন??বলতে পারো??আমি আজ সবার কাছে অপরাধী,,, আমার দিকে সবাই আঙ্গুল তুলে দাঁড়িয়ে আছে।।।বাবার কাছে আমি অপরাধী,,তোমার কাছে অপরাধী,,, সাব্বির রোহান ওদের কাছেও আমি অপরাধী,,, ওদের ধারনা আমি আমার জেদ আঁকড়ে ধরে আছি।।।এটা আমার জেদ নয় রোদ,,,বিশ্বাস করো।।সবাই আমাকে দোষী করে,,নিশ্চিতে নিশ্বাস নিচ্ছে,,,কিন্তু আমার যে দম বন্ধ হয়ে আসছে।।।আমি ছেলে বলে আমার কষ্টগুলোর কোনো মূল্যই নেই,,,আমি কাকে দোষী বলবো,,,কাকে বলবো হ্যা তুমিই অপরাধী,,, বলতে পারো???প্রতিটি নিশ্বাস যেন বুকে কাঁটার মতো বিঁধছে,,,আমি বাঁচতে পারছি না রোদ,,,আর পারছি না।।।

উনার কথার প্রতিউত্তরে কিছু বলার ভাষায় খুঁজে পাচ্ছি না,,,শুধু কেঁদেই যাচ্ছি,,,জানি না কি মনে করে হঠাৎই উনাকে জড়িয়ে ধরলাম,,,খুব শক্ত করে,,হয়তো উনি ছুড়ে ফেলে দেবেন আমায় তাতে কি,,,তবু যেনো উনার সাথে মিশে গিয়ে উনার কষ্টগুলোকে ধুমড়ে মুচড়ে দিতে ইচ্ছে করছে।।কিন্তু উনি তেমন কিছুই করলেন না,,,উল্টো আমাকে আলতো হাতে জড়িয়ে নিলেন নিজের সাথে,,,, কষ্টগুলোকে ভাগ করে দিতে চাচ্ছেন হয়তো।।।দুজনেই কাঁদছি,,,দুজনের কান্নায় একটা মানুষকে ঘিরে,,,উনার চোখের জলে আমার চুল,,আর আমার চোখের জলে উনার টি-শার্ট ভিজে একাকার।।।উনি একটি হেঁচকি তুলে বাচ্চাদের মতো বলে উঠলেন,,,

নীলিকে এনে দিবা রোদ??প্লিজ,,,,একবার এনে দাও না।।আমি না আর পারছি না।।বিশ্বাস করো,,একটুও সহ্য হচ্ছে না আমার।।।আমি মরতেও পারছি না আবার বাচঁতেও পারছি না।।আমাকে বাঁচাও রোদ,,,আমার নীলিকে চাই,,শুধু একটু দেখবো ওকে,,একটা নজর।।কতোদিন দেখি না।।।

উনার কথায় হুহু করে কেঁদে উঠলাম,,বুঝতে পারছি উনি উনার মাঝে নেই।।আবরার শুভ্র কখনো নিজের ইমোশন গুলো দেখায় না।।।নীলি আপু মারা গেছেন চারমাস হতে চললো,,,এরমধ্যে কেউ উনাকে কাঁদতে দেখেনি শুধু আমি ছাড়া।।।হঠাৎই খেয়াল করলাম উনার শরীর বড্ড গরম,,,আবারো জ্বর উঠে গেছে,,সেদিনও এমন হয়েছিলো আজ আবারো।।।একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উনাকে উঠিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলাম,,,রাত ১২ঃ৩০ বাজে,,এতো রাতে মামানিকে ডাকা ঠিক হবে না।।উনি তো নিজেই অসুস্থ।।।তাই এক বাটি পানি আর একটা কাপড়ের টুকরো নিয়ে পাশে বসতেই উনি আমার কোলে মাথা রেখে কোমর জড়িয়ে ধরলেন,,,উনার গায়ের তাপে আমার শরীর কেঁপে উঠছে,,,উনি বিরবির করে কিছুএকটা বলছিলেন,,,কান পেতে যেটুকু শুনতে পেলাম,,তা হলো….

নীলি,,এবার আর যেয়ো না,,, তুমি,, চলে গেলে আমি কাঁদবো,,,

সম্পূর্ণ বাচ্চাদের মতো কথা,,,সবার মাঝেই একটা বাচ্চা লুকিয়ে থাকে,,,সেটা হঠাৎ হঠাৎ বেরিয়ে আসে,,,বিষয়টা কিন্তু খারাপ না,,বেশ ইন্টারেসটিং।। আমি মনের অজান্তেই হেসে দিলাম,,,,নিজেই পিচ্চি আবার আমাকে পিচ্চি বলে,,,হুহ,


কারো হেঁচকা টানে ঘুম ভেঙে গেলো,,কোনোরকম চোখটা খুলেই দেখি শুভ্র অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে তাঁকিয়ে আছে,,আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই বলে উঠলেন,,,

হোয়াট দ্যা হেল রোদ,,,তোমাকে না বলছি আমার থেকে দূরে থাকবে,,তবু এভাবে আমার কলিজার উপর শুয়ে আছো কেন??

উনার কথায় ব্যাপক রাগ লাগছে,,আরে ব্যাটা বলে কি??আমি উনার কলিজার উপর শুয়েছিলাম নাকি উনি আমার কলিজার উপর শুয়েছিলেন,,,এতো দেখি চোরের মায়ের বড় গলা,,,

আমি না আপনি শুয়েছিলেন,,তাও আবার আমার কলিজার উপর,,,,

বাজে কথা বলবে না,,আমি বোকা নই,,,পড়াশোনা বাদ দিয়ে শুধু বাজে চিন্তা,,,

হোয়াট??আমি বাজে চিন্তা করছি,,আর আপনি যে কাল রাতে…..

কাল রাতে কি হ্যা??পড়া কমপ্লিট করছো তুমি???ফাজিল মাইয়া,,,পড়াশুনা বাদ দিয়ে শুধু মাখামাখি করার চেষ্টা,,,

উনার কথা শুনে মনে হচ্ছে,,, উনার সবগুলো চুল টেনে টেনে ছিঁড়ি।। সারাটা রাত নায়কা সাবানার মতো সেবা করার পর সকালবেলা ব্যাটা নায়ক উমরসানির মতো স্মৃতিশক্তিই হারায় ফেলছে,,,কেমনডা লাগে??ফাজিল পোলা,,,এতোকষ্ট করে কেন করলাম সেবা??হোয়াই??আগে জানলে ব্যাটাকে এমনি ফেলে রাখতাম,,মরে ভূত হয়ে নীলি আপুর সাথে,,লা,,লালা,,লা,, লা করে ঘুরে বেড়াতি,,সেটাই বেস্ট হতো।।।।হুহ।।

আচ্ছা এই পানিভর্তি বাটি এখানে কেন??(ভ্রু কুচকে)

ওখানে ডুবে মরবো তাই,,,(মুখ ভেঙিয়ে)

কথাটা বলেই ওয়াশরুমে চলে গেলাম,,এই অসহ্যকর লোকটার সামনে বসে থাকার কোনো মানেই হয় না।।।


ডায়নিং রুমে বসে আছি।।।সবাই খাবার নিয়ে ব্যস্ত আর আমি “হা” করে তাকিয়ে থাকতে ব্যস।।।খাবারের প্রতি আমার ইন্টারেস্ট আপাতত জিরো,,,আমার সামনে শুভ্র বসে আছে,,ছেলেরা যে কতোটা সুন্দর হতে পারে তার প্রমান দিতেই হয়তো উনাকে এতোটা সুন্দর লাগছে,,,উফফ,,,ব্ল্যাক ড্রেসাপে এতো ড্যাশিং লাগছে,,ইচ্ছে হচ্ছে জোস বানিয়ে খেয়ে নিই।।।হঠাৎই উনি বলে উঠলেন,,,

মুখটা অফ করে খাওয়ার দিকে মনোযোগ দাও,,,

কত্তোবড় অপমান,,,ছিহ,,,মামু,, মামানি তো আছেই,,,আরিফ চাচা পর্যন্তও মুখ চেপে হাসছে,,,ব্যাটা খাটাস।।।মুখটা গোমড়া করে বসে আছি।।কিন্তু তাতে কারো কোনো ভাবান্তর হলো বলে মনে হলো না,,,সবাই সেই আগের মতোই হেসে চলেছে,,,উনি আবারও বলে উঠলেন,,,

আমার আজ ইম্পর্টেন্ট মিটিং আছে,,,সো আজ আমি তোমাকে ড্রপ করতে পারবো না,,,ড্রাইবার চাচাকে বলে রাখছি,,উনি তোমাকে পৌঁছে দিবে,,,

কি এমন ইম্পর্টেন্ট মিটিং যে ওকে ড্রপ করতে পারবি না।।

বললাম তো ইম্পর্টেন্ট,,আমি আসছি।।।

কথাটা বলেই উনি উঠে গেলেন।।।আমার তো যথেষ্ট সন্দেহ হচ্ছে,,মিটিং হলেই এতো সাজুগুজু করে যেতে হবে নাকি??নির্ঘাত কোনো মেয়ের সাথে মিটিং,,হুহ,,জানি তো।।।

মামানিকে বলে আমিও বেরিয়ে পড়লাম কোচিং এর উদ্দেশ্যে,,, মাঝপথে গিয়েই আমার চোখ চড়কগাছ,,,,

#চলবে,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here