#আলতা_রাঙা_পা পর্ব ৫

0
51

#আলতা_রাঙা_পা পর্ব ৫
#রোকসানা_রাহমান

বিয়ে শেষে বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বরের গাড়িতে উঠে বসলাম। চোখের পানি মুছাবস্থায় বেখেয়ালিতে ডান হাতটা পড়ল অমিতের বাম হাতে। আমি চমকে তাকিয়ে হাত সরিয়ে নিলে তিনি আমার দিকে চেয়ে থাকলেন। আমি ভেজা চোখদুটো নামিয়ে নিলাম। মুখ ফিরিয়ে নিলে তিনি আমার দিকে চেপে আসলেন খানিকটা। আলতো করে আমার হাত চেপে ধরে বললেন,
” ভেবে নেও, এটা কোনো পুরুষের হাত নয় ভরসার হাত। এই স্পর্শে কাম নয় নির্ভরতা আছে। ”

আমি মুখ ফেরালাম তার দিকে। ভেজা চোখদুটোতে আবারও অশ্রু জমা হলো। তবুও মন নরম হলো না। নিজের বিশ্বাসে এক বিন্দুও বদল আসল না। তার আস্থাপূর্ণ চাহনিতে চোখ রেখে বললাম,
” আর আমাকে পুতুল ভেবে নিবেন। আমার অনুভূতিকে নিয়ে খেলা করবেন। ভূত-ভবিষ্যৎকে চুরমার করে দিবেন, তাই তো? ”

অমিত বোধ হয় খানিকটা ধাক্কা খেলেন। চাহনি বদলে গেল। চুপসে গেল উদারতা। আমার হাত থেকে হাতটা সরিয়ে নিলেন স্বইচ্ছায়। দূরত্ব তৈরি করলেন পূর্বের চেয়েও অধিক। নীরবে বসে থাকলেন ওপাশটায় অনেক্ষণ। আমি চুপচাপ তার সবটায় নজর বুলাচ্ছিলাম। এক সময় আমিও দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম। জালানার কাচে কপাল ঠেকাতে তিনি বললেন,
” আমাদের মোটামুটি ভালোই কথা হয়েছে। তারপরও আমার সম্পর্কে এমন ধারণা? তোমার একবারের জন্যও মনে হয়নি আমি আলাদা? তোমার চেনা-জানা পুরুষদের দলে আমি নেই? ”

আমি না ফিরেই সরাসরি বললাম,
” না। ”

অমিত আবারও চুপ হয়ে গেলেন। যেন আমার জবাবগুলো মেনে নিতে পারছেন না। কয়েক সেকেন্ড পর আমার নাম ধরে ডাকলেন,
” তায়্যিবাহ? ”

আমি চাইলাম তার দিকে। এক মুহূর্তের জন্য দৃষ্টি স্থির হলো তার চোখদুটিতে। সে দৃষ্টি ছুটতে চাইল না কিছুতেই। মনে মনে প্রশ্ন করলাম, এই কণ্ঠ কি তারই নাকি অন্যকারও? উচ্চারণে এত সম্মোহন! এত মাদকতা!

” আমি কি তোমার সাথে কখনও খারাপ আচরণ করেছি? খারাপ ভাষা ব্যবহার করেছি? ”

আমি চোখের পলক ফেললাম। সে অবস্থায় উত্তর দিলাম,
” না। ”
” তাহলে অন্যদের সাথে কেন জড়াচ্ছ? ”

আমি চোখ বুঝা অবস্থায় কোনো এক মেয়েকে কল্পনা করলাম। যার বিয়ে হয়েছিল ভালোবেসে। বিয়ের আগে কত-শত স্বপ্ন বুনেছিল দুজন। একজনের স্বপ্নে আরেকজন লুটোপুটি খেয়েছে হেসে হেসে। মেয়েটির পরিবার তাদের সম্পর্ক মানছিল না বলে পালিয়ে বিয়ে করল। তিন বছরের চেনা-জানা মানুষটা কয়েক দিনের মধ্যেই বদলে গেল। যে ছেলেটা কথায় কথায় নিজের প্রাণ-পাখিটা তুলে দিত মেয়েটির হাতে সেই ছেলেই রাগে বশবর্তী হয়ে মেয়েটার গলা টিপে ধরল। সাফ জানিয়ে দিল, তাদের বৈবাহিক জীবন এখানেই শেষ। মানিয়ে নিতে পারছে না। দুইজন নাকি দুই মেরুর প্রাণী! তালাকনামায় সই করার সময় ছেলেটির হাত কাঁপেনি একবারের জন্যও। মনে পড়েনি, গত তিন বছরের করা প্রতিজ্ঞার তালিকা, তার এক ডাকে মেয়েটির পরিবার ত্যাগ করার কথা, বিশ্বাস, ভরসা, নির্ভরতা নামক ভারি শব্দগুলো!

” তায়্যিবাহ? ”

অমিতের ডাকে আমি চোখ মেললাম। সাথে সাথে সেই মেয়েটির নাম মনে পড়ল। তখনই অমিতের অসহিষ্ণু গলা পেলাম,

” কিছু বলো। ”

আমি সহজ কিন্তু অটল চাহনি রেখে বললাম,
” বিয়ের আগে সব ছেলের মধ্যেই ভালোমানুষি ভাব চলে আসে। কথা-বার্তায় মধুর ফলে। আপনার কী মনে হয়? এসব মিষ্টি মিষ্টি কথায় আমার মন ভুলাবেন? অসম্ভব! তায়্যিবাহ এত সহজে ভুলার মতো মেয়ে না। ”

অমিত ভ্রূ উঁচালেন। ঠোঁটে এক ফোঁটা হাসি ছড়িয়ে পড়ল যেন অস্পষ্টভাবে। কৌতুকের মতো করে বললেন,
” তারমানে তুমি ভুলোনি? ”
” না। ”
” তাহলে বিয়ে করেছ কেন? ”

তার দ্রুত করা প্রশ্ন আমাকে অপ্রস্তুত করে ফেলল। অটল চাহনি কেঁপে পাতাজোড়া এক হলো ঘন ঘন। আমতাভাব ছড়িয়ে পড়ল কণ্ঠস্বরে। মুখ ফিরিয়ে নিতে নিতে বললাম,
” বড় আপুর কথা রাখতে। ”
” তাই? ”

আমি অমিতের দিকে না তাকিয়েও টের পেলাম সে ঘাড় কাত করে আমার দিকে ঝুকে এসেছে। ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমি। যেন আমার মন পড়ে ফেলে দারুন জব্দ করেছে। তার এই গুপ্ত খুশিটুকু আর বাড়তে দিতে পারলাম না। তাই নিরুত্তর থাকলাম। মনে হলো, পরিস্থিতি স্বাভাবিকে আনার এটিই একমাত্র উপায়। অমিতও কেন জানি আর কিছু বললেন না। বাকি রাস্তাটুকু নীরবেই পার করে দিলাম দুজনে।

____________
অমিতদের বাসায় পৌঁছালাম অনেক রাতে। হাতের কাছে ঘড়ি কিংবা ফোন না থাকায় সময়টা জানা হলো না। অনুমান করে নিলাম দুইটা কী তিনটা হবে। অমিত গাড়ি থেকে নেমে পড়লেও আমাকে নামার ব্যাপারে কিছু বললেন না। এদিকটায় এলেন না একেবারেই। আমিও নামব কী নামব না বুঝতে পারলাম না। একরকম দ্বিধাচ্ছন্ন হয়ে জানালার কাচ দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকলাম। অমিতকে বাড়ির ভেতরে ঢোকার আগে মাঝবয়সী দুইজন মহিলার সাথে কথা বলতে দেখলাম। তাদের শরীরে রঙিন শাড়ি, গয়না ও সাজগোজ থাকলেও চোখে-মুখে ভীষণ উদ্বিগ্নতা। হাতের ইশারা বার বার গাড়ির দিকে আসলে আমি কৌতূহলী হয়ে পড়লাম। তীক্ষ্ণ চোখে তাদের শারীরিক অঙ্গভঙ্গি পর্যবেক্ষণ করতে অমিত ভেতরে ঢুকে গেলেন। বেশ কয়েক মিনিট পার হওয়ার পরও যখন বাইরে এলেন না তখন আমি চিন্তায় পড়লাম। বুকের ভেতরটা হাঁসফাঁস শুরু হলো। খেয়াল করলাম আমার কর্ণপাশ বেয়ে ঘাম বেয়ে পড়ছে। নিশ্বাস দ্রুত হয়ে আসছে। সর্বাঙ্গে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়তে আমার বড় আপুর বিয়ের দিনটি আবছা আবছা ভেসে উঠল চোখের পাতায়। আপুর বিদায়বেলায় আমি কান্না করতে করতে অজ্ঞান হয়ে যাই। দুলাভাই তখন পারিপার্শ্বিক চাপে বাধ্য হয়ে আমাকে তাদের সাথে গাড়িতে তুলেন। আপুর শ্বশুরবাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে বারোটা পার হয়ে যায়। আমাদের অপেক্ষায় রেখে দুলাভাই বাড়িতে ঢুকেন। প্রায় ঘণ্টাখানিক পর এসে বলেন, ‘ মা তো ঘুমিয়ে পড়েছে! এখন আর উঠবে না। আর তার অনুমতি ছাড়া ভেতরেও যাওয়া যাবে না। তোমরা বাকি রাতটা গাড়িতেই কাটিয়ে দেও। আমি নাহয় ভেতর থেকে কাঁথা-বালিশ এনে দিচ্ছি। ‘ সেই রাতে দু-জোড়া চোখ এক অদ্ভুত পুরুষের দেখা পেয়েছিল, যে কিনা মায়ের কথার বাইরে এক চুলও চলে না। আমি বড় আপুর কোলের উপর ঘুমিয়ে পড়লেও সে ঘুমাল না। অসহায়ত্বে সারারাত অশ্রু ঝরাল। ফজরের আযানের সময় আপুর শাশুড়ি ঘুম ভেঙে উঠলেও বধূবরণ করলেন না। ধমকে-ধামকে রান্নাঘরে পাঠালেন। বার বার মনে করিয়ে দিলেন, এ বাড়ির সবাই সাতটা বাজে নাস্তা করে। এক মিনিটও যেন দেরি না হয়। সেই ষোড়শী বয়সের আমি বড় আপুর বানানো নাস্তা খেতে খেতে এক ভীষণ সময় হিসেবি এক নারীর দর্শন করেছিলাম।

আচমকা দরজা লাগানোর শব্দে আমি কেঁপে উঠলাম। ভীত চোখে দেখলাম গাড়ির ড্রাইভার নেমে পড়েছে। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
” আপনারে কি সারারাত বাইরেই রাখব নাকি? স্যার আসে না ক্যান? ”

আমি উত্তর দিতে পারলাম না। আমার মন আরও ভীত হয়ে পড়ল। কলিজাটা বুঝি তিল পরিমাণে নেমে আসল। সত্যিই কি সারারাত বাইরে থাকতে হবে? অমিত আমাকে নিতে আসবে না? তার মাও কি আপুর শাশুড়ির মতো সময় হিসেবি? আমি আমার পাশের জায়গাটাই তাকালাম। শূণ্য! কেউ নেই। আমাকে সঙ্গ দেওয়ার মতো কেউ নেই। সেরাতে আপুর সাথে আমি থাকলেও আমার পাশে কেউ নেই।

” মনে কয়, ডাইল যোগাইতাছে। ”

ড্রাইভার কাকার কথায় বাইরে তাকালাম। সে আগ বাড়িয়েই বলল,
” মসুর ডাল, খেসারি ডাল, মুগ ডাল, মাসকলাই ডাল সব একসাথে করতাছে। আপনারে দিয়া বাছাইয়া আলাদা করাইব আর ধৈর্য্য পরীক্ষা করবো। ”

আমি ব্যাপারটি বুঝতে না পেরে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকালে তিনি আগ্রহ নিয়ে বললেন,
” বিয়া বাড়িতে এমনই হয়। শাশুড়ি বউয়ের পরীক্ষা নেয়। আপনি বাছতে পারেন তো? নাইলে কিন্তু রাত পার হইয়া যাইব। তখন দেখবেন সত্যি সত্যি রাত কাটাইছেন ঘরের বাইরে। ”

ড্রাইভার সশব্দে হেসে উঠেই থেমে গেল। নিজেকে সামলে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল,
” আপনার শাশুড়ি চইলা আসছে, রেডি হোন। ”

চলবে

[ বাসা বদলানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। তাই গতকাল দিতে পারিনি। আমি খুব দুঃখিত। ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here