#প্রেমে_পড়া_বারণ পর্ব ১২

0
256

#প্রেমে_পড়া_বারণ পর্ব ১২
লেখা: জেসিয়া জান্নাত রিম

সবার সাথে ছাদে বসে আছে আবিদ। তিন্নি কে আসে পাশে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। তিথি ওকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। পুরো বাড়ি ঘুরিয়ে দেখিয়েছে তারপর সবার সাথে ছাদে নিয়ে এসেছে। তিন্নির ঘর ছাদেই। তিথি দের দোতলা বাড়ির সবথেকে সুন্দর জায়গা হচ্ছে এই ছাদ। ছাদের একতৃতীয়াংশ জায়গা জুড়ে তিন্নির ঘর। বাকিদের ঘর নিচে। বাড়ির ভেতর দিয়েই ছাদে ওঠার সিঁড়ি। সিঁড়ি দিয়ে উঠে সবার আগে একটা হল রুমের মত জায়গা। তার একপাশে তিন্নির বেডরুম। অন্য পাশে ওয়াশরুম। হল রুমের একদম কোনার দরজাটা খুললেই ছাদ। তিথির কাছে শোনা ওপরের পুরোটাই নাকি তিন্নির দখলে। আগে ছাদে অনেক ফুলের গাছ ছিল। তিন্নি ঢাকা সেটেল্ড হওয়ার পর গাছগুলো নিচের বাগানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ছাদের মাঝখানে সবার বসার জন্য গোল করে সিমেন্টের সিঁড়ি আছে। আর এককোণায় একটি দোলনা। এইসবই তিন্নির ইচ্ছা মতো করা। বেশ অনেক্ষণ পর ইমতিয়াজ কে সাথে নিয়ে ছাদে এলো তিন্নি। ও ইমতিয়াজ কে নিয়ে ডেকোরেশনের কিছু জিনিস আনতে গিয়েছিলো। কাল থেকে সমস্ত কাজ শুরু করে দিতে হবে। তিন্নি এসে সবার উদ্দেশ্যে বলল,
— কাল থেকে অনেক কাজ। তো আজ সবাই তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়বে। ভোরে উঠতে হবে সবার। মুরুব্বি সবাই নিচে ঘুমাবে। আর তোমরা এখানে। মেয়েরা আমার রুমে থাকবে। আর ছেলেদের জন্য মাঝে ঢালা বিছানা করা হবে। আর সোহেলি আর রুনা তো আপার সাথেই থাকবে। আরেকটা কথা সবাই নদীতে গোসল করতে যাবে। ওয়াশ রুম ব্লক করা যাবে না।
কথাটা শুনে আবিদ বলল,
— আমি তো সাঁতার জানিনা। আমি কিভাবে নদীতে গোসল করবো।
— আচ্ছা ঠিক আছে। আমি আর উনি বাদে বাকি সবাই নদীতে যাবে।
আবিদ বলল,
— তুমিও সাঁতার জানো না?
— আমি গ্রামে বড় হয়েছি সো সাঁতার না জানার কোন প্রশ্নই উঠে না। সব কাজ শেষ করে গোসল করতে আমার রাত হয়ে যাবে। তাই ওয়াশ রুমেই গোসল করবো। যাই হোক, এ বিয়েতে কার কি কাজ সেটা আমি খাবার পর বুঝিয়ে দেব। এখন তোমরা সব খেতে এসো। আম্মা ফুপিরা অপেক্ষা করছে।
সবাই নিচে চলে গেল। তবে তিন্নির ফোন বেজে ওঠায় ও সেখানেই থেকে গেল। আবিদ নামতে গিয়েও ফিরে এলো। তিন্নি তখন ফোন রিসিভ করে দোলনায় গিয়ে বসেছে। আবিদ ছাদের দরজায় থেমে গেল। তিন্নির কথা শেষ হোক তারপর তিন্নির কাছে যাবে। ফোন দিয়েছে রওনক। তিন্নি ফোন রিসিভ করেই বললো,
— তুমি বললে বিয়ের ডেট আগে থেকে জানিয়ে দিস ছুটি নিয়ে নেবো। এই তোমার ছুটির নমুনা।
— আরে আর বলিস না। খাগড়াছড়ি থেকে ফোন এলো এক রেয়ার ব্যাঙ খুঁজে পাওয়া গেছে। তার একপাশ কমলা অন্যপাশ বেগুনী। আমার কলিগ সাইদ ভাইয়ের জ্বর এজন্য আমাকে আসতে হলো। চিন্তা করিস না এখান থেকে সোজা তোদের বাড়ি যাবো।
— ব্যাঙের ছবি তুলছো?
— আর ব্যাঙের ছবি।
— কেন কি হয়েছে?
— আরে এখানে এসে দেখি একটা কুনো ব্যাঙ কে রঙ করে রাখা হয়েছে। যার বাড়িতে পাওয়া গেছে সেই লোকের ছেলে বোনকে ভয় দেখাবে বলে ওভাবে রঙ করেছে।
— তাহলে তো আজই চলে আসতে পারো।
— এখানে আসা তো একেবারে বিফলে যায় নি। ব্যাঙ খুঁজতে এসে সাপ পেয়ে গেছি। বিরল প্রজাতির সাপ।
— তুমি ঐ সাপ ব্যাঙের ছবিই তুলো। আসতে হবে না তোমার। দেখা গেল মরে গেছি মাটি দিতেও আসতে পারবে না। বলবে একটা রেয়ার গাধা পেয়েছি তুই একটু পরে কবরে যা।
— রেয়ার গাধা! আছে নাকি কোথাও?
— রওনক ভাই!
— রাগ করিস না। পরশু রওনা দিবো প্রমিস।
— ঠিক আছে। আসো তুমি।
— ওদিকে সবকিছু কেমন চলছে?
— আজকে আফিফ ভাইরা এসে পড়েছে। কাল থেকে ডেকোরেশনের কাজ শুরু করবো। খাবার দাবারের দায়িত্ব তোমাকে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তোমার তো খবরই নেই।
— আরে বললাম না পরশু আসছি। আর এখান থেকেই আমি কয়েক জনের সাথে কথা বলে রাখবো। মেন্যু সিলেক্ট করা হয়েছে?
— আমি একটা করেছি।
— নেটে পাঠিয়ে দিস।
— আচ্ছা। রাতের খাবার খেয়েছো?
— না খেতে যাবো।
— আমিও খাবো এখন। তাই ফোন রাখছি।
— আচ্ছা।
ফোন রেখে দিয়ে ও ওখানে বসে রইল তিন্নি। মন টা ভীষণ খারাপ হয়ে গেছে ওর। ভালোবাসা কি এতটাই সহজ যেমনটা আবিদ মনে করে। আবিদের অনূভুতি কি সত্যিই ভালোবাসা। ওর অনূভুতি যদি ভালোবাসা হয় তাহলে ইফতেখার আর রওনকের অনূভুতিটাকে কি নাম দেবে ও। এই দুটি মানুষ ভালোবাসতে বাসতে নিঃশেষ হয়ে গেছে। একজন তো এই অনূভুতি নিয়েই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলো। রওনক ও কি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই অনূভুতিটা নিজের মাঝে রেখে দেবে?
আবিদ এসে তিন্নির পাশে বসলো। তিন্নি কোনো রকম রিয়্যাক্ট করল না। আবিদের দিকে তাকিয়ে ওকে বলল,
— আপনার কেন মনে হয় আপনি আমাকে ভালোবাসেন? এটা নিছক পছন্দও হতে পারে। অথবা আপনাকে রিজেক্ট করায় আপনার মেল ইগো হার্ট হয়েছে বলে আপনার জেদ।
এ ধরনের কথা আবিদ একদমই আশা করেনি। ও ভেবেছিল তিন্নি কিছু কড়া কথা শুনিয়ে দেবে ওকে। তবে তিন্নির এ প্রশ্নে কিছুটা সাহস পেল ও। পাল্টা প্রশ্ন করল,
— তুমি কোনদিন কাউকে ভালোবেসেছো?
— হ্যা।
— কাকে?
— কতজন কেই তো।
— কিহ??
— আমি বলতে চাচ্ছি আম্মা, সানভি, আপা।
— ওহ। আমি বলতে চাচ্ছি পরিবারের সদস্যদের বাদে অর্থাৎ যার সাথে তুমি নিজের জীবন কাটাতে চাও বা বিয়ে‌ করতে চাও এমন ভালোবাসা তোমার লাইফে আগে এসেছে?
— না।
— তোমার পরিবারের বাইরে তুমি পরিবারের মতো কাউকে ভালোবেসেছ?
— হুম।
— ইফতেখারকে?
— হুম।
— ওকে বিয়ে করার কথা কেন ভাবোনি?
— কারণ কোনো দিন বিয়ের বিষয়েই আমি ভাবিনি।
— যদি ভাবতে তাহলে তাকে তার মতো ভালোবাসতে?
— না।
— কারণ?
— জানিনা। তবে তাকে ইফতি ভাই হিসেবেই আমি ভালোবাসি। অন্য কোনো ভাবে ভালোবাসা কখনো সম্ভব হয়নি। চেষ্টা করেছি তবুও না।
— এখানেই তোমার উত্তর লুকিয়ে আছে। শোন ভালোবাসা অনেক রকমের হতে পারে। পরিবারের সদস্যদের জন্য একরকম, বন্ধুদের জন্য একরকম এই ভালোবাসা গুলো কমন। একসাথে অনেক কে এরকম ভালোবাসা যায়। কিন্তু কিছু ভালোবাসা থাকে স্পেসিফিক একজনের জন্যই। যা শত চেষ্টা করেও একজনের বেশি কাউকে দেওয়া যায় না। যেটা প্লান করে আমাদের জীবনে আসে না। হুট করে কাউকে দেখে, অথবা তার কোন চিহ্ন এমনকি তার নাম শুনেও এমন একটা ফিলিংস আসে মনে হয় সে আমাদের অনেক চেনা। কোনো একটা অদৃশ্য টান অনুভব হয় তার প্রতি। প্রতিটি মূহুর্তে যেকোনো সিচ্যুয়েশনে শুধু তাকেই মনে পড়ে। সে জীবনে আসুক বা না আসুক তার প্রতি ভালোবাসা সারাজীবন থাকে। নিজের ক্ষতি করে ও আমরা তার ভালো করতে চাই।
— আপনি বলতে চাইছেন আপনি আমাকে সেভাবেই ভালোবাসেন?
— আমার লাইফে অনেক মেয়েরা আসতে চেয়েছে। তাদের মধ্যে অনেককে আমার পছন্দও হয়েছে। কিন্তু কাউকেই সারাজীবন পাশে রাখার মতো টেন্ডেন্সি আমার ছিল না। তোমার সাথে আমার প্রথম দেখার কথাটা মনে করতো, ঐ সিচ্যুয়েশনে তোমার প্রেমে পড়ার কোনো কারণ আমার ছিলোনা। আমি আমার ক্যারেক্টার জানি। একটা মেয়ে আমাকে কথা শুনাচ্ছে আর আমি তাকে কোনো পাল্টা উত্তর না দিয়ে এমনি চলে যেতে দেবো।
— আপনি বুঝতে পারছেন যে আমি আপনাকে বিয়ে করবো না তবুও আপনি আমার পিছু ছাড়ছেন না কেন? এটাকে আপনি ভালোবাসা বলছেন?
— তুমি যদি অন্য কাউকে ভালো বাসতে তাহলে আমি কোনোদিনই তোমার রাস্তায় আসতাম না। কিন্তু এখন আমার একটা সুযোগ আছে তোমার মন পরিবর্তন করার।
— আমি আপনাকে রেসাল্ট অলরেডি বলে দিয়েছি। শুধু শুধু চেষ্টা করছেন। এতে আপনার কষ্ট বাড়বে।
— আমার কষ্ট বাড়বে বলে তোমার কষ্ট হচ্ছে।
কিছু বললো না তিন্নি। ওর সবকিছু কেমন গোলমেলে লাগছে। ও বুঝতে পেরেছে আবিদের প্রতি ওর একটা উইকনেস তৈরি হয়েছে। যেটা ও কারো প্রতি অনুভব করেনি। কিন্তু সেটাই ভালবাসা কিনা সেটা ও জানতে চায় না। আবিদের কষ্ট হলে ওর খারাপ লাগবে কিনা এর উত্তর টাও ও এক্সেপ্ট করতে চায় না। তাই কিছু না বলেই সেখান থেকে চলে এলো ও।

বেশ ভোরে ঘুম ভেঙ্গে গেল তিন্নির। সূর্য তখন ও উঠতে পারেনি। আকাশ ফর্সা হতে শুরু করেছে। পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ শোনা যাচ্ছে। তিন্নি উঠে পড়লো। রুমে উপস্থিত সবাই মরার মত ঘুমাচ্ছে। সবাই কে টপকে সাবধানে রুমের দরজা খুলল তিন্নি। দরজা খুলেই ও সর্বপ্রথম আবিদ কে দেখতে পেল। দরজা বরাবর বিছানা করে ঘুমিয়েছে। তিন্নি সেখানেই বসে পড়লো। আবিদের ঘুমন্ত মুখটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো ও। ঘুমোলে মানুষকে সুন্দর লাগে কিনা জানে না তিন্নি তবে নিষ্পাপ লাগে। দুনিয়ায় সমস্ত চিন্তাভাবনা থেকে সাময়িক কিছুক্ষণ মুক্তি। একটা শান্তির ঘুম মানুষের চোখে মুখে ফুটে ওঠে। যেমনটা আবিদের মুখে ফুটে উঠেছে। হঠাৎ করেই আবিদের ঠোঁট ঘুমের মধ্যে কিছুটা প্রসারিত হয়ে উঠলো। তিন্নি ও নিরবে হাসল কিছুক্ষণ। ওকে সারাদিন জ্বালিয়ে আবিদ এখানে শান্তিতে শুধু ঘুমাচ্ছেই না বরং হাসছেও। তিন্নি উঠে পড়লো। এখানে আরেকটু সময় থাকলে নিশ্চিত ও আবিদের প্রেমে পড়ে যাবে। নাকি ইতিমধ্যেই ও প্রেমে পড়ে গেছে। কে জানে, তবে আবিদের জন্য ওর মনে একটা দুর্বলতা তৈরি হয়েছে যা অন্য কারো জন্য কোনোদিন তৈরি হয়নি। কি অদ্ভুত না, ওর কাছে প্রেমে না পড়ার হাজারটা কারণ আছে আর পড়ার একটা ও নেই। কিন্তু তবুও ওর মন চাইছে আবিদের প্রেমে পড়তে। যাই হোক তিন্নির অসম্ভব নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা আছে। ওর মন ওকে কখনোই নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। বরং ও ওর মনকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখবে।

চলবে………….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here