অদ্ভুত_প্রেমবিলাস পর্ব-২ ৩

0
317

#অদ্ভুত_প্রেমবিলাস
#Writer_Sarjin_Islam [ সারজীন ]
#Part:2 + 3

ধারা অচেতন হয়ে পড়ে আছে বিছানায়। ধারার বিছানার পাশে দাড়িয়ে দুই একজন প্রতিবেশী নিন্দাজনক কথাবাত্রা বলছে। অভি ডাক্তার নিয়ে রুমে ঢুকতে দুই একটা কথা ওর কানে আসে। ওখানে দাড়িয়েই চেঁচিয়ে বলল,

‘ আমার বোনকে নিয়ে আর একটা খারাপ কথা বললে আমার থেকে খারাপ আর কেউ হবে না। আমার বোনের হাতের সমস্যা তো আর জন্মগত নয়। দাদাজান যে বছর মারা গিয়েছেন সে বছর ওর হাতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। ভালো উন্নত মানের চিকিৎসা করালে ওর হাত ঠিক হয়ে যাবে। এ নিয়ে আপনাদের এত মাথাব্যথা কিসের? আমাদের বোন আমরা বুঝে নেব। আপনাদের যদি নিন্দামন্দ করা হয়ে থাকে তাহলে আপনারা এখন আসতে পারেন।’

প্রতিবেশীরা অভির দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। অভি চোখ বন্ধ করে ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বলল,

‘ আপনি আসুন চাচা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখুন তো আমার বোনটার কি হয়েছে? কথা বলতে বলতে হঠাৎ করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। আপনি একটু ভালো করে দেখুন ওকে।’

ডাক্তার গিয়ে ধারার বিছানার পাশে বসে। ধারার আম্মা ওর মাথার পাশে বসে সামনে হাত পাখা দিয়ে বাতাস করে যাচ্ছে। ফাঁকে আঁচলের কোণে দিয়ে চোখের পানি মুছলেন তিনি। ধারার আম্মা ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বলল,

‘ দেখুননা ডাক্তারসাব আমার একমাত্র মেয়েটা কি হলো। ওযে এ বাড়ির কলিজার টুকরা, ওর কিছু ভালোমন্দ হয়ে গেলে সবাই পাগল হয়ে যাবে।’

ধারার আম্মার কথা শুনে অভি ধমকের সুরে বলল,

‘ উফ আম্মা তুমি একটু চুপ করবে। ডাক্তার চাচাকে তার কাজ করতে দাও‌।’

ওদের কথার মাঝে ডাক্তার ধারার হাত টিপে নাড়ি পরীক্ষা করছেন। এরমধ্যে ধারার ভাবি জোনাকি আর ধারার মেজ মামি এসে দাঁড়ায় অভির পাশে। রুমের হালচাল দেখে জোনাকি তার শাশুড়ি আম্মার দিকে তাকিয়ে উদ্বেগ হয়ে বলল,

‘ আম্মা ওদিকে তো দাদি আম্মা কে আব্বাজান সামলাতে পারছে না, তিনি বারবার ধারাকে দেখতে চাইছেন।’

ধারার আম্মা জোনাকির কথা শুনে আবার ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,

‘ বৌমা তুমি গিয়ে দেখো না তোমার দাদি আম্মা কে সামলাতে পারো কী না! এদিকে ধারার এই অবস্থা, ওকে ফেলে আমি এখান থেকে যাই কি করে!’

জোনাকি ছোট নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

‘ আমি দেখছি আম্মা।’

জোনাকি ঘুরে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করলে হঠাৎ ডাক্তারের কথাশুনে পা থামিয়ে পিছন ঘুরে তাকায়। ডাক্তার চাচা প্রেসক্রিপশন টা অভির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে হাসি মুখে বলল,

‘ অভি চিন্তার কোন কারণ নেই। ধারা মা একদম ঠিক আছে। আসলে সারাদিন আজ খালি পেটে ছিল তার উপরে অতিরিক্ত চিন্তায় জ্ঞান হারিয়েছে। ঘন্টা কয়েক এর মধ্যে জ্ঞান ফিরে আসবে ধারা মায়ের। আর প্রেসক্রিপশনে যে ওষুধ তিনটের নাম লিখেছি তা সপ্তাহ দুয়েক খাওয়ালেই ধারা মায়ের শরীরের দুর্বলতা কেটে যাবে আশা করি।’

অভি চিন্তার মাঝে হালকা হেসে বলল,

‘ ধন্যবাদ ডাক্তার চাচা। আপনি একটু পাশের একটু রুমে আসুন, দাদি আম্মা কে দেখে যাবেন।’

ডাক্তার চাচা তার ব্যাগ পত্র তুলে বলল,

‘ আচ্ছা চলো।’

অভির সাথে ডাক্তার চাচা রুম থেকে বেরিয়ে যায়। সাথে সাথে বেরিয়ে যায় জোনাকি এবং ধারার মামি। ধারার আম্মা তার শ্বাশুড়ীর কাছ থেকে শুনেছে এই বংশের তিন পুরুষের ঘরে নাকি কোন মেয়ে সন্তান জন্মায় নি। ধারা তিন পুরুষ পরে ওদের ঘর আলো করে জন্ম নিয়েছে। এ বাড়ির সকলের কলিজার টুকরা ধারা। ওর বিন্দু পরিমাণ কষ্ট কেউ সহ্য করতে পারে না। ধারার আম্মা এসব ভাবতে ভাবতে ধারার মুখের আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

সারাদিনের উত্তপ্ত করা গরমের শেষে সাঁঝের বেলার মৃদু বাতাস মনকে একদম শীতলতম করে দেয়। মিতা বেগম তার ছাদে লাগানো গাছে পানি দিতে দিতে সাঁঝের বেলার পরিবেশ উপভোগ করছে। এত বড় বাড়িতে থাকার মতো আছে দুইটি মানুষ। মাঝেমধ্যে মিতা বেগম একা একা ভাবে, সালমা যদি তার সঙ্গে এ বাড়িতে না থাকতো তাহলে হয়তো সে এতদিনে বাকশক্তিহীন হয়ে যেত। মিতা বেগমের স্বামী ছিলেন একজন মস্ত বড় ব্যবসায়ী। তিনি তার পছন্দ অনুযায়ী বড় দুই ছেলের বিয়ে দিয়েছিলেন। মিতা বেগম এই অঞ্চলের হাইস্কুলের শিক্ষকতা করতেন। মিতা বেগম শিক্ষকতা করার জন্য শ্বশুরবাড়ি থেকে বেশ সাপোর্ট পেয়েছেন। সবথেকে বেশি সাপোর্ট করেছেন তার শশুর শাশুড়ী এবং স্বামী। বড় ছেলে জুনায়েদ জুয়েল। মেজো ছেলে জুনায়েদ লাবিদ। আর তাঁর সব থেকে প্রিয় সন্তান তাঁর ছোট ছেলে জুনায়েদ ইভান। কতইনা হাসিখুশিতে ভরপুর ছিল তাদের সংসারটা। ধীরে ধীরে এক এক করে সব কিছু অতীত হয়ে যায়। এসব ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিতা বেগম। গাছ গুলোতে পানি দেওয়া শেষ হলে পাশে রাখা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে নিখুঁত চোখে তাকায় গাছগুলোর দিকে। গোলাপ গাছটায় কয়েকটা মরা ডাল দেখা দিয়েছে। সালমা কে বলতে হবে এগুলো পরিষ্কার করতে। মিতা বেগম চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়, ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে দোলনায় বসে মিতা বেগম। এই দোলনার সাথে হাজারো স্মৃতি তার। প্রিয় মানুষটার সঙ্গে কত রাত জেগে জ্যোৎস্নাবিলাস করা। ছেলেগুলোর না খাওয়ার বাহানা ধরলে এখানে বসে গল্প করে ওদের খাইয়ে দেওয়া। মিতা বেগমের ভাবনার সমাপ্তি ঘটে কারো হুড়মুড়িয়ে তার পাশে এসে দাঁড়ানোতে। তাকিয়ে দেখে সালমা দাঁড়িয়ে আছে। কিছু বলতে চাইছে কিন্তু জোরে জোরে নিঃশ্বাস ওঠানামার কারণে বলতে পারছে না। কোনমতে নিজেকে সামলে নিয়ে হাতে থাকা ফোনটা মিতা বেগমের দিকে এগিয়ে দিয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলল,

‘ জুয়েল বাবা ফোন!’

এইটুকু বলে আবার হাঁপাতে শুরু করে সালমা। সেই বসার ঘর থেকে দৌড়ে ছাদে এসেছে। এতবার চাট্টিখানি কথা নয়। তার উপরে সালমার বয়স হয়েছে। মিতা বেগমের থেকে কয়েক বছরের ছোট হবে সালমা‌। মিতা বেগম সালমার অবস্থা বুঝতে পেরে হাত বাড়িয়ে ফোন টা নেয়। ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখেন তার বড় ছেলে জুয়েল ফোন করেছে। চোখের ভ্রু জোড়া আপনাআপনি কুঁচকে আসে মিতা বেগমের। বেশ কয়েক দিন হয়েছে তাঁর বড় ছেলের সঙ্গে তাঁর কথা হয়না। আজ কি মনে করে ফোন দিলো? এসব ভাবতে ভাবতে ফোনটা কানের কাছে নেয় মিতা বেগম। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর মিতা বেগম বলল,

‘ হ্যালো।’

ওপাশ থেকে জুয়েল খুবই ধীর গলায় বলল,

‘ আসসালামু আলাইকুম, আম্মু। কেমন আছো তুমি?’

না চাইতেও মিতা বেগমের ঠোঁটে তাচ্ছিল্য হাসি ফুটে উঠে। মিতা বেগম উত্তরে বলল,

‘ ওয়ালাইকুম আসসালাম। আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। তা তোমরা কেমন আছো?’

জুয়েল হালকা সুরে বলল,

‘ আমরাও ভালো আছি। তা তোমার….

জুয়েলের কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে মিতা বেগম মৃদু স্বরে বলল,

‘ আমার দিনকাল কেমন যাচ্ছে তা জানার জন্য তুমি আমাকে ফোন করো নি তা আমি বেশি জানি। যে কথা বা কারনে জন্য ফোন করেছো সে কথা বলে ফোন রাখো।’

জুয়েল মিন মিন করে বলল,

‘ আসলে আম্মু লামিয়া আমাকে বলছিল তুমি যদি লিমা আর ইভানের বিয়ে নিয়ে আর একবার যদি ভেবে দেখতে। লিমা তো খুব ভালো মেয়ে, বর্তমান যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে। আমাদের ইভানের পাশে এমন একটা মেয়েকে মানায়। তুমি যদি আর একটিবার ভেবে দেখতে প্লিজ।’

মিতা বেগম সব শুনে ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে। মনে মনে যা ভেবেছিলাম তাই হল। মিতা বেগম মৃদু স্বরে বলল,

‘ ফোনটা স্পিকারে দেও। লামিয়া নিশ্চয়ই তোমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, আমি কি বলছি তা শোনার জন্য। শোনো বৌমা আমি জানি লিমা খুব ভালো মেয়ে। তুমি বারবার আমার কাছে তোমার বোন লিমার কথা বলেছ ইভানের জন্য। কিন্তু আমি চাইনা আত্মীয়তার মধ্যে আত্মীয়তা হোক। আশা করি তোমরা আমার কথাটা বুঝতে পারবে। এই নিয়ে অদূর ভবিষ্যতে যেন আলোচনা না হয়।’

এইটুকু বলে মিতা বেগম ফোন কেটে দেয়। পাশে দাঁড়িয়ে সালমা হাসছে। মুখ টিপে হাসছে। মিতা বেগম চোখ থেকে চশমা খুলে শাড়ির আঁচল দিয়ে পরিষ্কার করতে করতে সালমা কে বলল,

‘ তখন থেকে পাগলের মত হাসছিস কেন?’

সালমা হাসি থামিয়ে মিতা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,

‘ আপা আপনি বুঝলেন কিভাবে জুয়েল বাবার পাশে বড় বৌমা দাঁড়িয়ে আছে। ইস এখন যদি আমি বড় বৌমার মুখখানার অবস্থা একটু দেখতে পেতাম।’

মিতা বেগম চশমা পরে বলল,

‘ খুব আফসোস হচ্ছে তার জন্য!’

সালমা হাসি দিয়ে বলল,

‘ হ্যাঁ তো, কিন্তু তার থেকে বেশি জানতে ইচ্ছে করছে আপনি কিভাবে বুঝলেন বড় বৌমা যে জুয়েল বাবার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।’

মিতা বেগম পূর্ব আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,

‘ নিচে গিয়ে দুকাপ চা বানিয়ে নিয়ে ছাদে আয়। তারপরে বলছি।’

মিতা বেগমের কথা শেষ হওয়ার আগে সালমা নিচে যাওয়ার জন্য হাঁটতে শুরু করে। মিতা বেগম এক নজর সালমার দিকে তাকিয়ে আনমনে হেসে আবার পূর্ব আকাশের দিকে তাকায়।

চলবে….

#অদ্ভুত_প্রেমবিলাস
#লেখিকাঃ সারজীন ইসলাম

|পর্ব-০৩|

বউ সেজে ধারা মিটিমিটি করে হাসছে। কত সুন্দর দেখতে লাগছে ওকে আজ। একটু পরে ওর রাজপুত্র আসবে ওকে নিয়ে চলে যাবে তার রাজ্যে। এর মধ্যে কেউ এসে ধারাকে বলল বর এসে গেছে। একটু একটু করে উত্তেজনা বাড়তে থাকে ধারার। ধারার বর সোজা এসে ধারার সামনে দাঁড়ায়। হাসি হাসি মুখ করে ধারার হাত নিজের হাতের মধ্যে নেয়। পাঞ্জাবির পকেট থেকে আংটি বের করে ধারার হাতে পরিয়ে দিতে গেলে ধারার হাতের অবস্থা দেখে বরের চেহারা ক্রমশ হিংস্র হতে শুরু করে। ধারার ভীষণ ভয় করছে তার চোখ গুলো দেখে। ধারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধারার বর ওকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। ধারা পড়ে গিয়ে চিৎকার করছে। কিন্তু ধারার বর রুপি হিংস্র জানোয়ার ধারার দেখি একটিবারও ফিরে না তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে চলে যায়।

চোখ খুলে তাকায় ধারা। বিছানা থেকে উঠে আশেপাশে তাকায়। ও তো ওর বড় ভাইয়ার রুমে আছে। চোখ যায় বিছানার অপর পাশে। বড় ভাবি ঘুমিয়ে আছে। তাহলে এতক্ষণ ধারা স্বপ্ন দেখেছিল? তাই হবে! উফ কী ভয়ানক দুঃস্বপ্ন। ভাবতেও গা কাঁটা দিচ্ছে। ধারা একনজর ওর ভাবির দিকে তাকায়। বেচারী মনে হয় কাল সারারাত ওর জন্য ঘুমাতে পারেনি। ধারা কাঁথা টা টেনে ভাবির গায়ে দিয়ে ঘর থেকে বের হয়। ঘর থেকে বেরিয়ে চোখ যায় বাড়ির দরজার দিকে। ওর বড় ভাইয়া সম্রাট মাথায় টুপি পরা অবস্থায় বাড়ির দিকে আসছে। ফজরের নামাজ পড়ে হয়তো হাঁটাহাঁটি করে বাড়ির দিকে এসেছে। ধারা কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সম্রাট দ্রুত পায়ে ওর সামনে এসে দাঁড়ায়। ধারার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

‘ ঘুম ভাঙলো তোর! আমিতো মনে করছিলাম ঢাকঢোল পিটিয়ে তোর ঘুম ভাঙ্গাতে হবে।’

ধারা হেসে দিয়ে বলল,

‘ আমি তো কুম্ভকর্ণের বোন তাই, একবারও ঘুমোলে আর ঘুম ভাঙতেই চায়না।’

সম্রাট চোখগুলা ছোট ছোট করে বলল,

‘ তোর কি কথাটা আমাকে ইঙ্গিত করে বলেছিস?’

ধারা মাথা দুলিয়ে বলল,

‘ কোথায় আমি তোমাকে বললাম। আমি তো বলেছি আমি কুম্ভকর্ণের বোন। আমারতো দুই দুইটা ভাই। আমিতো ছোট ভাইয়া কেও কথাটা বলতে পারি।’

সম্রাট হেসে দিয়ে বলল,

‘ তোর মত দুষ্টুর সঙ্গে কথায় আমি কখনো পারব না। আচ্ছা তোর ভাবি কোথায়? আর তুই এত সকাল বেলা কোথায় যাচ্ছিস?’

ধারা আলতো ভাবে বলল,

‘ ভাবি ঘুমিয়ে আছে। মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে আছে হয়তো আমার জন্য সারারাত ঘুমাতে পারিনি। তাই আমি আর ডাকিনি ভাবিকে। আর আমি হাত মুখ ধুতে কলতলায় যাচ্ছি।’

সম্রাট কিছু একটা ভেবে বলল,

‘ তুই হাত মুখ ধুয়ে তৈরি হয়ে আয়। আমি আর তুই কার্তিক কাকার দোকানে যাব। একটু পরে গরম গরম জিলিপি ভাজতে শুরু করবে।’

ধারা একগাল হেসে বলল,

‘ আচ্ছা, আমি এখনই হাত মুখ ধুয়ে তৈরি হয়ে আসছি। তুমি ততক্ষণ ঘরে গিয়ে জিরিয়ে নাও।’

ধারা ওখান থেকে চলে গেলে। সম্রাট স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিজের রুমে ঢুকে। চোখ যায় বিছানায়। জোনাকি ঘুমিয়ে আছে। চোখ মুখ শুকিয়ে গেছে। সম্রাট মাথা থেকে টুপিটা খুলে রেখে জোনাকির পাশে গিয়ে বসে। জোনাকির গালে আলতো করে হাত রাখে। এই বিয়ে বিয়ে করে জোনাকির একয়দিন ঠিকমত খোঁজ ও নিতে পারেনি সম্রাট। জোনাকি চোখ খুলে তাকায়। সম্রাটকে ওর সামনে বসে থাকতে দেখে তড়িঘড়ি করে উঠে পড়ে‌। বিছানার ওপাশে তাকিয়ে ধারা কে দেখতে না পেয়ে জোনাকি চিন্তিত হয়ে সম্রাট কে বলল,

‘ ধারা কই? ওতো এখানে ঘুমিয়ে ছিল?’

সম্রাট জোনাকির হাত ধরে মৃদু স্বরে বলল,

‘ চিন্তা করো না তোমার ননদ ঠিক আছে। ধারা কলতলায় হাতমুখ ধুতে গেছে।’

জোনাকি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

‘ ও কী কালকের বিষয়টা নিয়ে মন খারাপ করে আছে?’

সম্রাট মৃদু স্বরে বলল,

‘ আমার মনে হয় না ও মন খারাপ করে আছে। ও তো আমার সঙ্গে বেশ হাসিখুশি ভাবে কথা বলেছে তখন।’

জোনাকি সম্রাটের থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,

‘ তুমি থাকো আমি একটু ওকে দেখে আসি।’

জোনাকি বিছানা থেকে নেমে কাপড় ঠিক করে নেয়। সম্রাট জোনাকের দিকে তাকিয়ে বলল,

‘ শোনো।’

জোনাকি সম্রাটের দিকে তাকিয়ে বলল,

‘ বলো।’

সম্রাট মৃদু স্বরে বলল,

‘ ধারা এখন হাতমুখ ধুয়ে এলে, আমি এখন ওকে নিয়ে কার্তিক কাকার দোকানে যাব। তুমি তো জানো ধারা গরম গরম জিলিপি ভীষণ ভালোবাসে।’

জোনাকি এগিয়ে এসে সম্রাটের গালে আলতো করে হাত রেখে বলল,

‘ বুঝেছি, এইজন্য বুঝি আমার কর্তা আমার ননদিনী কে নিয়ে যাবে কার্তিক কাকার দোকানে!’

সম্রাট হালকা হেসে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলে। জোনাকি মৃদু স্বরে বলল,

‘ তুমি বস, আমি গিয়ে দেখে আসি ধারা কি করছে? সকালের নাস্তা তৈরি করতে হবে।’

জোনাকি সম্রাটের থেকে উত্তরের অপেক্ষায় না বসে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

মিতা বেগম ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠার পরে বাড়ির সামনের বাগানে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে। আজ মিতা বেগম অল্প কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে বাড়ির ভিতরে চলে যান। কোন কারনে আজ হয়তো তার মন ভালো নেই। ছোট ছেলেটার সঙ্গে কাল রাতে কথা হয়েছে। তার পরীক্ষা শুরু হবে কিছুদিন পরে। পরীক্ষা শেষ হলে কিছুদিনের জন্য সে দেশে আসবে। কিন্তু এখনো যে দুই তিন মাস! এসব ভেবে হাটতে হাটতে রান্নাঘরের দিকে যায় মিতা বেগম। সালমা সকালের নাস্তা তৈরি করছে। সালমা মিতা বেগমকে দেখে হাতের কাজ থামিয়ে বলল,

‘ আপা আপনি আজ এত তাড়াতাড়ি বাগান থেকে চলে গেলেন যে?’

মিতা বেগম ডাইনিং এর চেয়ার টেনে বসে বলল,

‘ ভালো লাগছে না রে আজ।’

সালমা এগিয়ে এসে এক গ্লাস পানি দিয়ে চিন্তিত গলায় বলল,

‘ আপা আপনার শরীর ঠিক আছে তো? না আমি বাবুকে ফোন করে দেশে আসতে বলবো?’

মিতা বেগম গ্লাস হাতে নিয়ে বলল,

‘ না রে তেমন কিছু না। আমার শরীর ঠিক আছে। অসুখটা হয়েছে আমার মনের।’

সালমা উত্তেজিত হয়ে বলল,

‘ আপা আপনি এসব কি কথা বলেন?’

মিতা বেগম পানির গ্লাসের পানি টা শেষ করে বলল,

‘ তুই সবকিছুতেই বেশি উত্তেজিত হয়ে পরিস। আগে আমার পুরো কথাটা তো শুনবি। আমার এই শহরের দূষণ ময় পরিবেশ আর ভালো লাগছে না। মনে হয় অক্সিজেনের বদলে আমরা কোন বিষাক্ত ধোঁয়া গ্রহণ করছি। ধুলোবালি গাড়ির শব্দ শান্ত সৃষ্ট পরিবেশ থাকে আরো বিষাক্ত করে তুলে। আমি এগুলোর থেকে একটু নিস্তার চাই। আর ভালো লাগছেনা শহরের জীবন।’

সালমা আফসোস করে বলল,

‘ আপা আপনি কথাটা ভুল কিছু বলেনেনি। আমি যখন গ্রামে যাই না তখন আমার মনে হয় আমি আমার দেহে প্রান ফিরে পেয়েছি। প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে পারি।’

মিতা বেগম কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল,

‘ শোন এবার বাবু দেশে ফিরলে ওকে নিয়ে গ্রামে ঘুরতে যাব। বাবুও গ্রাম ভীষণ পছন্দ করে। কিন্তু ওর ভাগ্যক্রমে কখনো যাওয়া হয়ে ওঠেনি গ্রামে।’

সালমা খুশি হয়ে বলল,

‘ সত্যিই আপা।’

মিতা বেগম মৃদু স্বরে বলল,

‘ হ্যাঁ, ভাবছি এই সুযোগে ছোট ফুফুর বাড়ি থেকে ঘুরে আসবো‌। ছোট ফুফুর নাতনি বিয়ের সময় আমাদের নিমন্ত্রণ করেছিল। কিন্তু আমাদের যাওয়া হয়ে ওঠেনি। সেই থেকে ফুফু আমার সঙ্গে রেগে আছে। এই সুযোগে ফুফুর রাগটাও ভেঙে দিতে পারব।’

সালমা হাসি মুখে বলল,

‘ তাহলে তো খুব ভাল হবে আপা। এই সুযোগে বাবুটাও গ্রাম ঘুরে দেখতে পারবে একটু।’

মিতা বেগম মৃদু স্বরে বলল,

‘ তার সময় মত দেখা যাবে। তুই আমাকে খবরের কাগজটা দিয়ে এক কাপ চা দে।’

সালমা তাড়াতাড়ি করে বলল,

‘ এখনই দিচ্ছি আপা।’

ধারা আর সম্রাট হাঁটতে-হাঁটতে ওদের কার্তিক কাকার দোকানের সামনে এসে হাজির হয়। সম্রাট কার্তিক কাকাকে ডেকে বলল,

‘ ও কার্তিক কাকা, কার্তিক কাকা। তোমার জিলিপি ভাজা হলো?’

দোকানের ভেতর থেকে কার্তিক বেরিয়ে এসে ওদের দেখে হাসি মুখে বলল,

‘ আরে আজ দুই ভাই বোন এক সাথে আমার দোকানে। তা অভি কে নিয়ে এলে না?’

সম্রাট দোকানের একটা টুলে বসে বলল,

‘ ওই কুম্ভকর্ণের কথা আর বোলো না কার্তিক কাকা। এত বেলা হয়ে গেছে আর ও এখনো পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে। ওর জন্য অপেক্ষা না করে আমি আর ধারা তোমার দোকানে চলে এসেছি গরম গরম জিলিপি খেতে।’

কার্তিক কাকা একগাল হেসে বলল,

‘ তোমরা বসো এখানে আমি তোমাদের জন্য জিলাপি নিয়ে আসছি।’

কার্তিক কাকা যাওয়ার আগে ধারা মৃদু স্বরে বলল,

‘ তুমি যদি আজকের গরম গরম জিলিপি ভাজা না দিয়ে গতকালের জিলাপি ভাজা দাও তাহলে তোমার খবর আছে। এই বলে দিলাম তোমায়।’

কার্তিক কাকা জোরে হেসে দিয়ে বলল,

‘ তুই এখনো ঠিক ছোটবেলার মতো আছিস। তোকে গরম জিলিপি না দিলে রেগে গিয়ে বলতি আমার খবর আছে। সঙ্গে তো প্রতিবার তোর একটা সাকরেদ থাকতো। সে তোর থেকেও বেশি চঞ্চল। তুই এখন বস তোর ভাইয়ার পাশে আমি তোর জন্য গরম গরম জিলিপি ভাজা পাঠিয়ে দিচ্ছি।’

কার্তিক কাকা দোকানের ভিতরে চলে গেলে। ধারা ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে ওর ভাইয়ার পাশে বসে পড়ে।

চলবে….

ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইলো। গঠনমূলক মন্তব্য করলে লেখা উৎসাহ আসে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here