আরশিযুগল প্রেম # লেখনীতে — নৌশিন আহমেদ রোদেলা # পর্ব – ৬৪ ( অতিরিক্ত)

0
668

# আরশিযুগল প্রেম
# লেখনীতে — নৌশিন আহমেদ রোদেলা
# পর্ব – ৬৪ ( অতিরিক্ত)

—-‘ দশদিন পর ডেলিভারি, এই সময়ে কেউ ফড়িংয়ের মতো ঘুরে বেড়ায়? ক’দিন পর বাচ্চার মা হবি অথচ নিজের মধ্যে কোনো পরিবর্তন নেই? এই সময় আমার মা আমাকে এলাকা পেরুতে দেয় নি। আর তুই?’

মায়ের কথায় ফুঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল শুভ্রতা। পুরাতন ঢাকায় যাওয়ার কথাটা কানে পৌঁছানোর পর থেকেই বিরতিহীনভাবে মায়ের বেদবাক্য শুনছে সে। এতোক্ষণ সাদাফ ঘরে ছিল বলে রাদিবা খানিকটা মিইয়ে গিয়েছিলেন। সাদাফকে আজকাল বেশ সমীহ করে চলেন রাদিবা। হুট করেই কিছু বলতে পারেন না। ভেবেচিন্তে তারপর কথা বলতে হয়। সাদাফ কখনো রাগারাগি বা উঁচু গলায় কথা বলে না। তবুও রাদিবার অন্তরাত্মা কাঁপে। কেন কাঁপে জানা নেই, তবে কাঁপে। শুভ্রতা বিরক্ত গলায় বলল,

—-‘ মা প্লিজ। এই রাজধানী শহরে বসে কিসব কুসংস্কার ধরে বসে আছো বল তো? তাছাড়া, আমি তো একা যাচ্ছি না। ও তো আমার সাথেই যাচ্ছে। এতো চিন্তা করো না তো। কাল সকালে যাব। সারাদিন আর রাতটা থেকে সকালে ফিরে আসবো। রাস্তায় রাস্তায় তো আর ঘুরবো না। ওটাও তো একটা বাসা নাকি?’

রাদিবা দমলেন না। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মেয়ের এতো ঘুরাঘুরি তার পছন্দ হচ্ছে না। আজকালকার ছেলেমেয়েদের ‘অতি আধুনিক’ চিন্তাধারার ঘোর বিরোধী উনি। কিছু কিছু বিষয়ে আঞ্চলিক গোড়ামী থাকলেই বা কি? একটু আধটু নিয়ম মেনে চলাটা তো দোষের কিছু নয়। রাদিবা কিছুক্ষণ গুজগুজ করে বিতৃষ্ণ গলায় বললেন,

—-‘ অর্পিদের বাসাটা কোথায়? তোর শিল্পী খালামণিদের বাসার কাছাকাছি? শোন, জামাইকে নিয়ে রাতে শিল্পীদের বাসায় চলে যাস। এসব অপরিচিত জায়গায় থাকার দরকার নেই। কে জানে কোথায় কোন খারাপ দৃষ্টি ওত পেতে আছে।’

শুভ্রতা হেসে ফেলল। বসার ঘরের জানালার ফর্সা পর্দাগুলো উড়ছে। জানালা ভেদ করে ওপাশের বিল্ডিংয়ের আলো এসে পড়েছে বারান্দার ফ্লোরে। মুখোমুখি ফ্ল্যাটটার বারান্দায় কেউ একজন চুপিসারে ফোনালাপ সারছে। সতর্ক চোখে বারবার দরজার দিকে উঁকি দিচ্ছে, হাসছে, মাথা নোয়াচ্ছে। শুভ্রতা সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে মায়ের দিকে তাকাল। মিষ্টি হেসে বলল,

—-‘ তোমার মেয়ের দিকে নজর দেওয়া ছাড়া মানুষের কি আর কোনো কাজ নেই আম্মু? আর অর্পণদের বাসাটা মোটেও শিল্পী খালামণিদের বাসার পাশে নয়। অর্পনদের ফ্ল্যাটটা চকবাজারের চুড়িহাট্টায়। শিল্পী খালামনিদের বাসা থেকে বেশ দূরে।’

মেয়ের কথায় রাদিবার মেজাজ খারাপ ভাবটা আরো একটু চড়া হলো। তছবিতে আল্লাহর নাম জপায় বিরতি নিয়ে বললেন,

—-‘ এই সময় নজর দিতে হয় না। এমনিতেই লেগে যায়। একটু নিয়ম মানলেই বা কি হয়? আমার কথা তো জীবনেও শুনিস না তোরা।’

শুভ্রতা জবাবে হাসল। টেলিভিশনের দিকে মনোযোগী দৃষ্টি রেখে বলল,

—-‘ তুতুনের জন্য কাঁথা সেলাই করতে চেয়েছিলে, ওগুলো শেষ? আমার শাশুড়ী মা সেদিন এক ব্যাগ কাঁথা পাঠিয়ে দিয়েছে। বাচ্চাদের অতো কাঁথা লাগে নাকি আম্মু?’

___________________

ছাঁদের এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে সাদাফ। হাতে সিগারেটের আলো, মুখভর্তি ধোঁয়া। শুভ্রতা কনসিভ করার পর থেকে সপ্তাহে একটা সিগারেটও খাওয়া হয় নি তার। শুভ্রতার সমস্যা হয় বলে ইচ্ছে করেই খায় নি। আজ প্রায় একমাস পর হঠাৎই সিগারেটে হাত দিয়েছে সাদাফ। কিন্তু, স্বাদ পাওয়া যাচ্ছে না। পানসে আর অহেতুক লাগছে। সাদাফ এক-দুটো টান দিয়ে সিগারেটটা দূরে ছুঁড়ে ফেলল। শুভ্রব রেলিং এ ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। হাতদুটো বুকের ওপর ভাঁজ করা। ঠোঁটে মৃদু হাসি।

—-‘ শুভির মতো ইমোশনাল ফুলের প্রভাবে আপনার একটু হলেও লাভ হয়েছে বলতে হয়, সাদাফ ভাই। সিগারেটটা এবার আর ফিরবে না। পার্মানেন্ট সেপারেশনের ব্যাপারটা বোধহয় ঘটে যাবে।’

সাদাফ মৃদু হেসে চুয়িঙ্গাম মুখে পুরলো। বলল,

—-‘ একটু নয় ভাই। তোমার বোনের প্রভাবে আমার পুরোটাই লাভ। তাছাড়া, স্ত্রীদের একটু ইমোশনালই মানায়। তা তুমি হঠাৎ কোথা থেকে? খাবার টেবিলে অপেক্ষা করেও দেখা পেলাম না।’

শুভ্রব হাতদুটো ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

—-‘ একটা কাজে আটকে গিয়েছিলাম।’

সাদাফ প্রথমেই কিছু বলল না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—-‘ পরিস্থিতি থেকে পালাতে চাইছ নাকি নিজের থেকে?’

শুভ্রব উদাস গলায় বলল,

—-‘ জানি না।’

সাদাফ প্রত্যুত্তরে কিছু বলল না। শুভ্রব কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে নিজে থেকেই বলল,

—-‘ আমি পৃথার মুখোমুখি হতে চাইছি না সাদাফ ভাই। মেয়েটা বারবার আমার মুখোমুখি হলে আমায় ভুলতে পারবে না। আর আমি চাই, পৃথা আমাকে ভুলে যাক। আমার দ্বারা বিয়ে, সংসার হবে না। আবার হতেও পারে। তবে, কবে হবে জানা নেই। পৃথার অপেক্ষা করে থাকাটা আমার ভালো লাগছে না। আমি চাই না কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকুক। আমি আর কারো কষ্টের জন্য দায়ী হতে চাই না। লেট মি ফ্রী।’

সাদাফ কিছুক্ষণ শুভ্রবের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে হাসলো। মৃদু গলায় বলল,

—-‘ মনের স্বাধীনতায় বড় স্বাধীনতা শুভ্রব। তোমার মনটা কোথাও আটকে আছে। তাই হয়তো, ফ্রী হতে পারছ না। মনটাকে মুক্ত করে দাও, দেখবে মুক্তিটা আপনাআপনিই জুটে গিয়েছে। পাস্ট ইজ গোল্ড বাট পাস্ট ইজ নট আওয়ার লাইফ। বর্তমানই জীবন। এইযে বেঁচে আছি, এটাই জীবন। অতীত আঁকড়ে রাখতেই পারো কিন্তু অতীতটাকে নিজের গুটা জীবন ভেবে ভুল করো না। অতীত কখনো জীবন হয় না আর জীবন কখনো অতীত হয় না। আমার মতে, জীবন সদা বর্তমান। আচ্ছা, ওসব শক্ত কথা বাদ দিই। প্রায় এগারোটা বাজে। তোমার বোন হয়তো অপেক্ষা করছে। থাকো, আমি আসি।’

______________________

ঘড়িতে বারোটা বাজে। আকাশে রোদের তেজ নেই। আবহাওয়া সুন্দর। ততক্ষণে অর্পণদের চুড়িহাট্টার ফ্ল্যাটটাতে জড়ো হয়েছে সবাই। ছেলেরা বসার ঘরে বসে দেশ-বিদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা চালাচ্ছে। নানা পেশায় অধিষ্ঠিত পুরুষদের এই তর্ক-বিতর্ক অনেকটাই জমে এসেছে। কিছুক্ষণ পর পরই রান্নাঘর থেকে মেয়েদের চাপা খিলখিল হাসি কানে আসছে। একসময় রান্নাঘরের পর্দা ঠেলে বেরিয়ে এলো তনয়া। তিনমাসের আরহামকে তার বাবার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,

—-‘ ওকে নিয়ে বসে থেকে গল্প করো। রান্না ঘরে গরম অনেক।’

আরহান প্রত্যুত্তর না করে ছেলেকে কোলে তুলে নিলো। তবে চোখে-মুখে ক্ষণিকের বিরক্তিও খেলে গেল। এমন গুরুগম্ভীর আলোচনায় স্ত্রীর অযাচিত হস্তক্ষেপে খানিকটা বিব্রত এবং বিরক্ত সে। তনয়া-আরহানের অদৃশ্য মন কষাকষি খুব একটা খারাপ লাগল না সাদাফের। মুহূর্তেই মনের কোণে উঁকি দিল নিজের সাজানো গোছানো ছোট্ট সংসারটির দৃশ্য। আর তো মাত্র কয়েকদিন বাকি! কথাগুলো ভেবে প্রশান্তিমাখা নিঃশ্বাস ফেলল সাদাফ। বরকে ছেলের পেছনে নিযুক্ত করে দ্রুত পায়ে রান্নাঘরে ঢুকে গেল তনয়া।

—-‘ ধুর! আমরা সবগুলো মিঙ্গেল হয়ে যাচ্ছি আর তুই মামা সিঙ্গেলের সিঙ্গেল। এগ্লা কিছু হইলো? এসব তো মেনে নেওয়া যায় না। তনু আর শুভি অলরেডি বাচ্চা ফুটিয়ে ফেলেছে। আমিও বেশিদিন নষ্ট টষ্ট করব না, বুঝলি? প্রেমার তো আকদ হয়েই আছে। তারমানে বুঝ, দু’দিন পর তুই জাতীয় খালাম্মা হয়ে যাবি৷’

পুষ্পি শশা কাটতে কাটতে ভ্রু উঁচিয়ে তাকাল। কপাল কুঁচকে বলল,

—-‘ হইলে হইলাম তাতে তোর কি? আজাইরা পেঁচাল না পাইড়া তুই তোর বাচ্চা ফুটানোতে মনোযোগ দে। বাচ্চা ফুটাইতে ফুটাইতে বাংলাদেশ- অষ্ট্রেলিয়া সব উদ্ধার কর। ‘

অর্পণ মেকি আর্তনাদ করে বলল,

—-‘ ছি! কিসব দুষ্ট টক করছো তুমি! অশ্লীল।’

অর্পণের কথা বলার ভঙ্গিতে হেসে ফেলল বাকি তিনজন। তনয়া আমোদিত কন্ঠে বলল,

—-‘ আমার কিন্তু দেবর আছে। চাইলেই বর্শি ফেলতে পারিস। কিন্তু শর্ত একটাই। দেবরটাকে একটু কোলে পিঠে করে মানুষ করে নিতে হবে৷’

অর্পণ হৈহৈ করে বলল,

—-‘ আরে আরে মাস্টারমশাই থাকতে পুষি তোর পিচ্চি দেবরের মুখে বর্শি কেন ফেলবে বল তো? এই শুভি? ওই মাস্টারে কি বিয়ে টিয়ে করে ফেলছে নাকি রে?’

শুভ্রতা অদ্ভুত ভঙ্গিতে তাকাল। চোখ-মুখ কুঁচকে বলব,

—-‘ আমি কি করে জানব?’

—-‘ জানবি না কেন? বেচারা একসময় তোর হবু বর ছিলো। তোর একটা রেসপন্সিবিলিটি আছে না?’

—-‘ তোর মাথা আছে।’

অর্পণ শুভ্রতার কথাকে পাত্তা না দিয়ে বলল,

—-‘ তোর ফোনে না নাম্বার ছিল? দে দেখি।’

শুভ্রতা বিরক্ত মুখে বলল,

—-‘ ওই ব্যাটার নাম্বার দিয়ে তুই কি করবি? ডিলিট ফিলিট করে দিয়েছি হয়তো।’

অর্পন কেবিনেটের ওপর বসে ছিল। শুভ্রতার কথা শেষ হতেই লাফিয়ে নেমে শুভ্রতার হাতের ফোনটা একপ্রকার ছিনিয়ে নিলো। কিছুক্ষণ ঘাটাঘাটি করে খুশি হয়ে বলল,

—-‘ এইতো পেয়েছি। কল করি, অপেক্ষা।’

পুষ্পি শশা কাটা বাদ দিয়ে সন্দিহান গলায় বলল,

—-‘ ওই লোককে তুই ফোন দিবি ক্যান? তোর মতলবটা কি?’

অর্পণ পুষ্পির দিকে তাকিয়ে দাঁত কেলিয়ে বলল,

—-‘ জামাইয়ের টাকা খরচের মতলব। কলটা আমার ফোন থেকে দেব। আমার টাকা না, হবু জামাই রিচার্জ করে দিছে। জামাইয়ের টাকা বেশি বেশি খরচ করতে হবে। ফোন দেওয়ার মানুষ নাই তাই ওই ব্যাটাকে কল দিই। তোর সমস্যা? তুই শশা কাট।’

কথাটা শেষ করতেই ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ হলো। অর্পন খুশিতে গদগদ হয়ে বলল,

—-‘ হ্যালো।’

ওপাশ থেকে নম্র গলায় উত্তর এলো,

—-‘ হ্যালো। কে বলছেন?’

—-‘ আমি অর্পি ফেরদৌসী ইন শর্ট অর্পণ। আপনার স্পেশাল ক্রাশ আর জোরপূর্বক শালী, চিনতে পারছেন?’

ওপাশে নিশ্চুপতা। কিছুক্ষণ নীরবতা কাটিয়ে হঠাৎই উচ্ছল কন্ঠে বলে উঠল ওপাশের মানুষটি,

—-‘ আরে আপনি! কেমন আছেন? ‘

অর্পণ দাঁত কেলিয়ে বলল,

—-‘ আপনাকে ছাড়া কি ভালো থাকা যায়? কত্তো মিস করছিলাম।’

ওপাশ থেকে ফিচেল কন্ঠে জবাব এলো,

—-‘ আহারে! আমি তো আপনার বিরহে অলমোস্ট মারাই যাচ্ছিলাম। লাস্ট মোমেন্টে বাঁচিয়ে দিলেন।’

অর্পণ খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসিমাখা গলায় বলল,

—-‘ তাই নাকি?’

—-‘ একদম। তা, হঠাৎ এই অদমকে মনে পড়ার কারণ?’

অর্পণ মেকি অভিমান নিয়ে বলল,

—-‘ হঠাৎ বলছেন কেন? আমি কি আপনাকে ভুলতে পারি? চোখের আড়াল হলেই কি আর মনের আড়াল হওয়া যায়? তো, এখনও আমার দুলাভাই হয়েই আছেন নাকি অন্যকারো হয়ে গিয়েছেন?’

ওপাশ থেকে হাসির শব্দ এলো। হাসিমাখা কন্ঠে উত্তর এলো,

—-‘ আপনার জন্য তো আমি চিরকুমার।’

—-‘ আর আপনার জন্য আমার বান্ধবী চিরকুমারী।’

কথাটা বলার সাথে সাথেই অর্পণের পিঠে ধুম করে একটা কিল বসালো পুষ্পি। দাঁতে দাঁত চেপে জোর গলায় বলল,

—-‘ হারামি। তোরে ধরে চারতলা থেকে ফেলে দেব আমি। ফোন রাখ।’

শুভ্রতা আর তনয়া আটকে রাখা হাসিকে এবার মুক্তি দিলো। রান্নাঘর কাঁপিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল। ওপাশ থেকে ফারদিনের হাসির শব্দ এলো। বলল,

—-‘ আপনার বান্ধবী অন ফায়ার। পাশে নাকি?’

অর্পণ নিরীহ গলায় বলল,

—-‘ দেখছেন? আপনার জন্য কত অত্যাচার সহ্য করছি আমি।’

—-‘ ইশ! কি ভালোবাসা।’

—-‘ প্রচুর।’

ফারদিন হাসে। অর্পণ আবারও ষড়যন্ত্র করার মতো ফিসফিসিয়ে বলল,

—-‘ বিয়ে-শাদি করেন নি এখনও? মাঝে তো আরো একবছর কেটে গেল। আমার বিরহে অন্য কাউকে বিয়ে টিয়ে করে ফেলেন নি তো?’

—-‘ আরে ন্যাহ্। এই একবছর তো আপনার জন্য কাজি অফিসের দরজায় অপেক্ষা করতে করতেই কাটিয়ে দিলাম।’

অর্পণ হেসে ফেলে বলল,

—-‘ আপনি মশাই মাস্টার মানুষ হয়ে এতো ফ্লার্টিং কোথা থেকে শিখলেন বলুন তো?’

ফারদিন হাসলো। প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বলল,

—-‘ তো? বিয়ের দাওয়াত টাওয়াত দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়ার প্ল্যান করছেন নাকি?’

—-‘ হাহ্। কি করে জানলেন? আগে বলুন বিয়ে করেছেন নাকি সিঙ্গেল?’

—-‘ আপনার বান্ধবীর পাশের সিট এখনও ফাঁকা নাকি?’

অর্পণ ঠোঁট উল্টিয়ে বলল,

—-‘ আগের মতোই পরিষ্কার, ফকফকা। পিউর সিঙ্গেলের থেকেও পিউর।’

সাথে সাথে গর্জে উঠলো পুষ্পি। আস্ত একটা শশা অর্পণের গায়ে ছুঁড়ে মেরে তেড়ে আসতেই দৌড়ে বেরিয়ে গেল অর্পণ। এপাশের পরিস্থিতিটা উপলব্ধি করে হেসে ফেলল ফারদিন। অর্পণ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

—-‘ এখন কই আছেন? ঢাকা নাকি চট্টগ্রাম?’

—-‘ খাগড়াছড়ি।’

—-‘ ওখানে কেন? হানিমুন টানিমুন?’

—-‘ সেকেন্ড টাইম।’

—-‘ ট্রেন তবে ছুটে গেল?’

—-‘ মনে হচ্ছে। ‘

—-‘ সেকেন্ড হানিমুন সেরে সেকেন্ড বিয়েটাও সেরে নেন।’

—-‘ আহা! বউ আপনি হলে তৃতীয় হলেও সই।’

—-‘ ধুর! আমি শালী না? শালী বিয়ে করলে শালী কই পাবেন?’

—-‘ তাও কথা। তাহলে আর সেকেন্ড বিয়েটা করা হচ্ছে না।’

—-‘ সামনের মাসে বিয়ে। ম্যাসেজে আপনার ঠিকানাটা পাঠিয়ে দিবেন প্লিজ। কার্ড পাঠানোর জন্য ঠিকানা প্রয়োজন। বউ নিয়ে আসবেন।’

—-‘ বউয়ের কি প্রয়োজন? আপনি আছেন না?’

—-‘ বিয়ে করে হার্ট ব্রেক করে এখন ভালোবাসা দেখানো হচ্ছে? বিরহে মরে যাচ্ছি।’

ফারদিন শব্দ করে হাসলো। বলল,

—-‘ তার নামটা যেন কি?’

—-‘ কার?’

ফারদিন ফিচেল হেসে বলল,

—-‘ তার!’

অর্পণ চেঁচিয়ে উঠে বলল,

—-‘ পুষ্পি?’

তারপর গলার স্বর সংযত করে ফিসফিস করে বলল,

—-‘ পুষ্পির কথা বলছেন?’

ফারদিন হেসে বলল,

—-‘ কি মনে হয়?’

অর্পণ উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,

—-‘ আপনি লোকটা তো খুব সুবিধার নন মশাই। এতোক্ষণ মিথ….’

অর্পণের কথাটা শেষ করার সুযোগ না দিয়েই হাত থেকে ফোনটা ছিনিয়ে নিলো পুষ্পি। অর্পণের দিকে রক্তচক্ষু দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ফোন কানে নিলো। অতিশয় নম্র গলায় বলল,

—-‘ আসসালামু আলাইকুম।’

—-‘ ওয়ালাইকুম আসসালাম।’

পুষ্পি এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলল,

—-‘ দেখুন ভাইয়া, অর্পণের ফালতু কথাগুলো একদম বিশ্বাস করবেন না। ও টোটালি একটা মেস। ও যা বলেছে সব মিথ্যা।’

ফারদিন নিরীহ গলায় বলল,

—-‘ উনি কি বলেছেন?’

পুষ্পি থতমত খেয়ে গেল। কিছুক্ষণ থম ধরে দাঁড়িয়ে থেকে ফোনটা অর্পণের দিকে ছুঁড়ে মারলো। অর্পণ কোনোরকম ফোনটা ক্যাচ করতেই পিঠের ওপর চড়-থাপ্পড়ের ঝড় শুরু হলো। টানা দুই-মিনিট বিরতিহীন মাইর খেয়ে হাঁপিয়ে উঠল অর্পণ। কোনরকম নিজেকে বাঁচিয়ে আবারও রান্নাঘরের দিকে ছুঁট দিলো সে। বসার ঘরে থাকা ছেলেরা কয়েক সেকেন্ড অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে আবারও আড্ডায় মশগুল হলো। অর্পণ রান্নাঘরে পৌঁছে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

—-‘ আপনাকে দুলাভাই বানাতে গিয়ে একের পর এক গণধোলাই খেতে হচ্ছে আমায়। আপাতত আর রিস্ক নিতে চাচ্ছি না। বিয়েতে চলে আসবেন। দেখা হচ্ছে।’

—-‘ ইনশাআল্লাহ। রাখছি, আল্লাহ হাফেজ।’

—-‘ আল্লাহ হাফেজ।’

অর্পণ ফোন রেখেই হাফ ছেড়ে বাঁচলো। জোরে একটা শ্বাস টেনে নিয়ে বলল,

—-‘ উফ্ মাইরা ফেলছে একদম। রাক্ষসী একটা।’

তনয়া ঠোঁট টিপে হেসে বলল,

—-‘ তোর যে ক্রাশ খাওয়া আর ফ্লার্ট করা রোগ আছে তা তোর জামাই জানে?’

অর্পণ মাছি উড়ানোর মতো হাত নেড়ে বলল,

—-‘ আরে জানে জানে। তোদের মতো বিস্তারিত না জানলেও হালকা-পাতলা জানে।’

ঠিক সেই সময় চাপা রাগ নিয়ে ভেতরে ঢুকলো পুষ্পি। ফুঁস ফুঁস করতে করতে বলল,

—-‘ খাবার রেডি করবি নাকি এম্নেই বইসা থাকবি? বেলেহাজ মাইয়া। আমার মানসম্মানটাকে ওল কচু বানিয়ে ছেড়েছিস। তোরে তো আমি দেইখা নিমু।’

অর্পণ উদাস গলায় বলল,

—-‘ দেখলে এখনই দেখ। বাসর ঘরে উঁকিঝুঁকি মারিস না। ব্যস্ত থাকব।’

অর্পণের কথায় খিলখিল করে হেসে উঠলো তনয়া আর শুভ্রতা। পুষ্পি চোখ-মুখ কুঁচকে বলল,

—-‘ অশ্লীল!’

____________________

দুপুরের খাবার শেষে বসার ঘরে গোল হয়ে বসেছে সবাই। অর্পণের মুখ পুরোদমে ছুঁটছে। তনয়ার ছেলে এতোক্ষণ তারস্বরে কান্নাকাটি করে মাত্রই ঘুমিয়েছে। ছেলেকে নিয়ে এদিক-ওদিক হাঁটাহাঁটি করছে সে। অর্পণকে থামিয়ে দিয়ে হঠাৎই কথা বলে উঠল অর্পণের বাগদত্তা ফায়াজ। সাদাফকে উদ্দেশ্য করে বলল,

—-‘ সবই তো হলো এবার সাদাফ ভাই গান গান। আপনাদের ভালোবাসার গল্প কিন্তু সুদূর অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। অর্পণ তো নিজের থেকে আপনাদের নিয়েই গল্প করে বেশি। সেই খুশিতে শুভ্রতাকে ডেডিকেট করেই নাহয় একটা গান হয়ে যাক।’

সাদাফ আৎকে উঠে বলল,

—-‘ আমি গান টান পারি না।’

—-‘ গাইলেই পারবেন। ট্রাই তো করুন।’

সাদাফ তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলল,

—-‘ অসম্ভব।’

ফায়াজ হতাশ নিঃশ্বাস ফেলল। শুভ্রতার মুখ চেয়ে বলল,

—-‘ তাহলে শুভ্রতা এটলিস্ট গাও একটা গান। না করবে না প্লিজ। এখানে সবাই জানে তুমি ভালো গান গাও। বাহানা চলবে না।’

শুভ্রতা হাসলো। সাদাফের দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে একবার তাকালো। তারপর ভরসার নিঃশ্বাস ফেলে সুর তুললো,

—-‘ প্রাণ দিতে চাই, মন দিতে চাই
সবটুকু ধ্যান সারাক্ষন দিতে চাই
তোমাকে, ও… তোমাকে।

স্বপ্ন সাজাই, নিজেকে হারাই
দুটি নিয়নে রোজ নিশুতে যাই
তোমাকে, ও… তোমাকে।

জেনেও তোমার আঁখি চুপ করে থাকে..
রোজ দুইফোঁটা যেন আরও ভালো লাগে
গানে, অভিসারে, চাই শুধু বারে-বারে
তোমাকে, ও… তোমাকে।

যেদিন কানে-কানে সব বলবো তোমাকে…..’

এটুকু গেয়েই থেমে গেল শুভ্রতা। সবাই উৎসুক চোখে তাকাতেই বড় বড় শ্বাস ফেলে বলল,

—-‘ শরীর খারাপ লাগছে। সুর ধরে রাখতে পারছি না।’

শুভ্রতার কথায় সাদাফ চাপা অস্থিরতা নিয়ে হাত চেপে ধরলো। নিচু গলায় বলল,

—-‘ বেশি খারাপ লাগছে?’

শুভ্রতা হাসার চেষ্টা করে বলল,

—-‘ উহু। একটু টায়ার্ড লাগছে। তেমন কিছু না।’

সাদাফ চিন্তিত গলায় বলল,

—-‘ তুমি শিওর?’

—-‘ একদম।’

তারপর আবারও শুরু হলো আড্ডার বহর। হাসি-মজা, তর্ক-বিতর্কে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। সবাই মিলে প্ল্যান করল সোডিয়ামের আলোয় চা আর ফেরার পথে আইসক্রিম খাবে। কিন্তু বাধ সাধলো শুভ্রতা। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় এতো ঘুরাঘুরিতে তার মা এবং শাশুড়ি মা দুজনেরই তীব্র আপত্তি। এই আপত্তি ঠেলে বাইরে যাওয়া সাজে না। তাছাড়া,শরীরটাও খুব ক্লান্ত তার। এই ক্লান্ত শরীরে চারতলা থেকে নেমে অতদূর যাওয়া একেবারেই সম্ভব নয়। অর্পণ ঠোঁট উল্টে বলল,

—-‘ তাহলে এই প্ল্যান ক্যান্সেল। আমরা বরং বাসায়ই কিছু একটা করি।’

সাদাফ ব্যস্ত হয়ে বলল,

—-‘ প্ল্যান ক্যান্সেলের কি প্রয়োজন? তোমরা ঘুরে এসো। আমি তো তোমাদের বান্ধবীর সাথে আছিই। আবার কবে না কবে দেখা হয় সবার। যাও তোমরা। সমস্যা নেই।’

পুষ্পি কপাল কুঁচকে বলল,

—-‘ তাই হয় নাকি? শুভি আর আপনাকে রেখে কি করে যাই? আপনাদের ছাড়া একদম মজা হবে না।’

সাদাফ হেসে বলল,

—-‘ হবে শালী সাহেবা। গিয়েই দেখুন। ফেরার সময় আমাদের জন্য খাবার দাবার প্যাক করে আনবেন নাহয়।’

শুভ্রতাও তাড়া দিয়ে বলল,

—-‘ ও ঠিকই বলছে। তোরা শুধু শুধু প্ল্যান নষ্ট করিস না। তাহলে আমারই খারাপ লাগবে। মনে হবে, আমি আছি বলেই মজা করতে পারছিস না।’

দু’পক্ষের তুমুল তর্কা-তর্কির পর অর্পণরা বাইরে যাওয়ার জন্য তৈরি হলো। যাওয়ার আগে সাদাফের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে দিয়ে বললো,

—-‘ ইঞ্জয় ইউর প্রাইভেট টাইম গাইস। তবে বেশিক্ষণ নয় আমরা জলদি ফিরে আসব।’

সাদাফ হাসলো। ঘড়িতে তখন আটটা বাজে। ওরা বেরিয়ে যেতেই দরজা লক করে বিছানায় এলো সাদাফ। শুভ্রতাকে সাবধানে বালিশে ঠেস দিয়ে বসিয়ে দিয়ে নিজের মাথাটা শুভ্রতার কোলের ওপর
রাখলো। শুভ্রতার তুলতুলে হাতটা নিজের মাথায় রেখে আদুরে গলায় বলল,

—-‘ একটু স্বামী সেবা করো তো। ভীষণ টায়ার্ড লাগছে। এত্তো কথা বলে সবাই, উফ্। আমার বউয়ের মতো লক্ষ্মী হলে কি হতো, বল তো?’

শুভ্রতা হেসে ফেলল। সাথে সাথেই মুখ-চোখ কুঁচকে আর্তনাদ করে উঠলো। সাদাফ ঘাবড়ে গিয়ে বলল,

—-‘ কি হলো? ঠিক আছো?’

শুভ্রতার চোখ থেকে দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। চোখে জল নিয়েই মৃদু হাসলো সে। পেটে হাত রেখে অভিযোগ করার মতো করে বলল,

—-‘ তুতুন লাথি মেরেছে। এতো জোরে, আল্লাহ!’

সাদাফ হেসে বলল,

—-‘ নির্ঘাত ছেলে। গায়ে বাপের মতো জোর হবে মনে হচ্ছে। কিন্তু মায়ের প্রতি তার এমন অবিচার মেনে নেওয়া যাচ্ছে না।’

সাদাফের কথাটা শেষ হতেই আবারও আৎকে উঠল শুভ্রতা। ব্যথায় অনিচ্ছা সত্বেও চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। শুভ্রতা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,

—-‘ উফ্! তোমার ছেলে কি ফাজিল!’

সাদাফ হো হা করে হেসে উঠলো। শুভ্রতার ঢোলা, লম্বা জামাটা একটু উপরে তুলে বলল,

—-‘ দাঁড়াও বকে দিচ্ছি। আমার শুভ্রাণীকে ব্যথা দিচ্ছে কত্তোবড় সাহস।’

সাদাফ জামার কাপড়টা সরানোর পর পর আবারও আর্তনাদ করে উঠলো শুভ্রতা। সাদাফ বিস্ময় নিয়ে শুভ্রতার দিকে তাকাল। ঘোরলাগা গলায় বলল,

—-‘ তুতুনের পায়ের ছাপ দেখতে পেলাম মাত্রই। কি আশ্চর্য!’

শুভ্রতা অবাক হয়ে বলল,

—-‘ কি বলছো?’

সাদাফ উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল,

—-‘ সত্যিই। একদম স্পষ্ট পায়ের ছাপ। দাঁড়াও আরেকবার লাথি দিলে তোমাকেও দেখাব।’

সাদাফ-শুভ্রতা দু’জনেই তুমুল উৎসাহ নিয়ে বসে রইলো। চোখে-মুখে তাদের রাজ্যের ছেলেমানুষী আর উচ্ছ্বাস। দেখতে দেখতে একঘন্টা কেটে গেল তবুও পেটে চতুর্থ লাথি পড়লো না। শুভ্রতা মাথাটা পেছন দিকে এলিয়ে দিয়ে ক্লান্ত গলায় বলল,

—-‘ কি ফাজিল দেখেছ? বাবা-মাকে অপেক্ষা করিয়ে শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। ইররেসপন্সিবল।’

শুভ্রতার কথায় শব্দ করে হেসে উঠল সাদাফ। হাসতে হাসতে বিছানায় এলিয়ে পড়ল। হাসিমুখেই বলল,

—-‘ তোমার পক্ষেই সম্ভব শুভ্রা। বের হওয়ার আগেই তুতুনকে দায়িত্বজ্ঞান শেখাতে লেগে পড়েছ।’

শুভ্রতা গম্ভীর গলায় বলল,

—-‘ হওয়ায় উচিত। তুতুন যদি ছেলে হয়ে থাকে তাহলে আমি তাকে ঠিক তার বাবার মতো করে গড়ে তুলবো। যাতে, বিশ অথবা পঁচিশ বছর পর আমার মতোই এক রমণী ঠিক আমার মতো করেই সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া জানায়। আমার মতো তারও যেন, এমন একটা ছেলের মাকে অন্তরাত্মা থেকে বার বার শুকরিয়া জানাতে ইচ্ছে করে। আমি যতটা সুখী সে যেন ততটাই সুখী হতে পারে।’

সাদাফ উঠে এসে শুভ্রতার গা ঘেঁষে বসলো। শুভ্রতাকে বুকে চেপে ধরে বলল,

—-‘ তুমি আমার সাথে সুখী শুভ্রা?’

—-‘ পৃথিবীর সবথেকে বেশি। তোমাকে আমি আরো একশো বছর ঠিক এভাবেই পেতে চাই। এই সুখটা আমায় লোভী করে দিচ্ছে। আমার মাঝে তোমাকে পাওয়ার কি তীব্র লোভ!’

সাদাফ মুচকি হাসলো। শুভ্রতার মুখটা দু’হাতের তালুর মাঝে নিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর গভীর এক চুমু খেল শুভ্রতার কম্পিত ওষ্ঠে। শুভ্রতার সারা শরীর কেঁপে উঠলো উন্মত্ততায়।

#চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here