খেলাঘর_৫

0
502

#খেলাঘর_৫

কায়নাত মুখে ফেসপ্যাক লাগাতে লাগাতে নিজের পাচশ টাকা ফেরত পাওয়ার ফন্দি আটছিলো মনে মনে কিন্তু কি করে? সাহেবের তো দেখাই মেলে না এমন সময় কায়নাতের ফোন এ কল এলো আননোউন নম্বর থেকে কায়নাত রিসিভ করে বলল,
—হ্যালো?
—কায়নাত?
কায়নাত শুকনো ঢোক গিলে বলল,
—প্রহর?
—আপনি কি ব্যস্ত?
অর্ধেকটা ফেসপ্যাক মুখে মাখা অবস্থায় উঠে গিয়ে বললো
—মোটেই না….
তাদের কথা বাড়তে লাগলো সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে দুজনের ছোটবেলার কথা,স্কুলের কথা কলেজের কথা,প্রয়োজনীয় কথা অপ্রাসঙ্গিক কথা।

অনেক চেষ্টা করেও বাদশা ঘুমুতে পারছে না দুই মাস যাবত হাজতে থেকে এখন আর নরম বিছানায় তার ঘুম আসছে না, রাগ হয়ে সে উঠে পড়লো।

সাহেব সন্ধ্যার পরে এসে একটা কাজ সেরে মন খারাপ করে ঘুমিয়ে পড়েছিলো,ঘুম ভাঙলো রাত ১১ টার দিকে ফোন কলে সাহেব ঘুম জড়ানো কণ্ঠে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে ফিসফিস করে কারো গলা শোনা গেলো,
—হ্যালো আমিই আরে আমি
সাহেব মুচকি হাসলো ও জানে এটা ছোট্ট মিলি আজ সারাদিনে মিলির সাথে ওর খুব ভাব হয়ে গেছে মিলি প্রচুর কথা বলে কথা বলতে বলতে ওর মাথার অর্ধেক শেষ করে দিয়েছে অথচ সন্ধ্যার পর থেকে ওর জন্যেও সাহেবের কেমন ফাকা ফাকা লাগছিলো অথচ যতই হোক ও তো আর শরীফুল ইসলামের বাড়িতে ফোন করে বলতে পারে না মিলিকে দিন একটু কথা বলি,
—সাহেব তুমি ঘুমিয়ে গেছো?
সাহেব তরল হেসে বললো,
—না তো! আমি তো ঘুম থেকে উঠলাম মাত্র,তোমার মা কেমন আছেন মিলি?
—আমার মাকে দিয়ে তোমার কি কাজ বাপু? তোমায় কি আমার মা ফোন করেছে? তোমায় ফোন করেছি আমি তুমি আমায় জিজ্ঞেস করো মিলি তুমি কেমন আছো?
—তাইতো! আমার তো ভুল হয়ে গেছে খুব! মিলি তুমি কেমন আছো?
—আমি ভালো নেই
—কেন ভালো নেই কেন?
—আমার মেয়েটাকে তো তোমার গাড়িতে রেখে এসেছি
—ওই যে পুতুল টা?যেটা তোমার হাতে ছিল?
—ওইটা পুতুল না আমার মেয়ে, শোনো সাহেব তুমি আমার মেয়েকে কিছু খেতে দিও তো
—আচ্ছা দেব তোমার মেয়ে কি খায়?
মিলি এবার চুপ করে গেলো ও তো এমনি এমনি ই মুখের কাছে কল্পনায় খাবার ধরে আসলেই তো ওর মেয়ে কি খায়!আপুর কাছে শোনা যেতে পারে আপু সব জানে।
—কি হলো মিলি? তুমি বলো তোমার মেয়ে কি খায়? আমি তাই খাইয়ে দেব।
লিলি ওর মাকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে সবে বারান্দায় গিয়ে দাড়িয়েছে অনেক দিন পর আজ লিলির গলা ধরে আসছে, অর্থ বিত্ত সম্পদ এইসব কিছুর মধ্যে থেকে ওর দম বন্ধ হয়ে আসছে, আচ্ছা ওর একটা সাধারণ ছিমছাম পরিবারে জন্ম হতে পারতো না! যেখানে একসাথে বাবা মায়ের সাথে বসে সকালের খাবার খাওয়া যেতো হয়তো ওর বাবার অনেক টাকা থাকতো না কিন্তু বাইরে থেকে এলে ও বাবার ঘাম শুকাবার আগেই তাকে জড়িয়ে ধরতো,ওর তো বাহ্যিক কোনো মোহ নেই ও তো পরিবার নিয়েই খুশি থাকতে চেয়েছিলো ওর কেন একটা সুস্থ সুন্দর স্বাভাবিক পরিবার হলো না!
মিলি লিলির কাছে গিয়ে বলল,
—আপু তুমি একটু ওকে বলে দাও তো আমার মেয়ে কি খায়
লিলি অবাক হয়ে বলল,
—কাকে মিলি!
—তুমি কথা বলো…
—তুমি ঘুমাও নি কেন?
—আপু তুমি এত কথা বলো কেন?একটু বলে দিলেই তো হয়,আমি যাচ্ছি ঘুমাতে।
লিলি নম্বর টা দেখলো, একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেললো,
—হ্যালো সাহেব
সাহেব বুঝতে পারলো না কি বলবে,
—আমি দুঃখিত এত রাত্রে মিলির জন্যে আপনাকে বিরক্ত হতে হলো
—বলুন কি খাওয়াবো মিলির মেয়েকে
লিলি একটু হাসলো,
—সুজি পাতলা করে রান্না করে খাইয়ে দেবেন,
সাহেবও হাসলো।
—সাহেব?
—জ্বী
—আজকে আপনি আমার বান্ধবী আচলের বয়ফ্রেন্ড কে শাসিয়েছেন?
সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—আমি শাসায়নি,আর আপনিও খুব ভালো করে জানেন যে ছেলেটা কিছুদিন যাবত আচল কে ব্লাকমেইল করছিলো, আর আপনাকেও ডিস্টার্ব করছিলো আশা করি আর ডিস্টার্ব করবে না।
লিলি চুপ রইলো
—লিলি
—জ্বী?
—আপনি এই কথা আপনার বাবাকে কেন বলেন নি? নিজে কষ্ট না করে তাকে বললে বড় বিপদ হওয়ার আগেই তিনি এগুলো সমাধান করে ফেলতে পারতেন।
—আমার জীবনে সবচেয়ে বড় বিপদ আমার বাবা, আর কোনো কষ্টই আমার কাছে কষ্ট মনে হয় না।
সাহেব চুপ করে গেলো… এই মেয়েটার নিজের বাবার ওপর এত ক্ষোভ!

আয়নার পড়নে কমলা রঙের একটা শাড়ি, রাতের অজস্র তারার দিকে তাকিয়ে আছে সে,এলোমেলো বাতাসে ও ছাদের কোনায় দাঁড়িয়ে আছে, ইদানীং নিজেকে চিনতে পারে না আয়না, এতটা ভঙ্গুর তো ও কখনো ছিলো না আজীবন ওর সংসার করার কি সাধটাই না ছিল কোমড়ে শাড়ির আচল গুজে গিন্নী হওয়ার সাধ!এখন সব এমন ফ্যাকাশে লাগে কেন?! আজ এত বাতাস কেন! ঝড় হবে নাকি!?ডাক্তার সাহেব কি বাসায় গেছেন? আয়না চোখ বন্ধ করে ফেললো দুনিয়া এরকম বিচিত্র কেন! একই সাথে এতরকম অনুভূতি মানুষের নিজস্বতা কে গিলে ফেলে কেন!
আয়না চোখ বন্ধ করে গান গাইতে লাগলো,

কার্নিশে ভুল অবেলা বকুল
থাকো ছুঁয়ে একুল ওকুল
থাকো ছুঁয়ে শহুরে বাতাস
ছুঁয়ে থাকো নিয়ন আকাশ

আবছায়া চলে যায় হিজলের দিন
অভিমান জমে জমে আমি ব্যথাহীন

আহারে জীবন, আহা জীবন
জলে ভাসা পদ্ম যেমন
আহারে জীবন, আহা জীবন
জলে ভাসা পদ্ম জীবন।।

আহা পারতাম, যদি পারতাম
আঙুলগুলো ছুঁয়ে থাকতাম
বিষাদেরই জাল টালমাটাল
এ কোন দেয়াল, এ কোন আড়াল
ছাই হয় গোধূলি কারে যে বলি
এ কোন শ্রাবণ আজ বয়ে চলি

আহারে জীবন, আহা জীবন
জলে ভাসা পদ্ম যেমন
আহারে জীবন, আহা জীবন
জলে ভাসা পদ্ম জীবন।।

কায়নাত আর প্রহর এতক্ষণে আপনি থেকে তুমি তে চলে গেছে, কায়নাত চুপ করে গিয়ে বলল,
—শুনতে পাচ্ছো প্রহর? মা বেচে থাকতে আপা গান শিখতো মা মারা যাওয়ার পর আর গায়নি।

লিলি ফোনের ওপাশ থেকে সাহেবকে বললো,
—এত কষ্ট নিয়ে কে গান গাইছে?
—আয়না আপা
—যতক্ষণ গানটা শেষ না হয় আপনি কি…
—আমি রাখছি না, জানালার পাশে যাচ্ছি স্পষ্ট শুনতে পাবেন।
লিলি একটু নিঃশ্বাস ফেললো

বাদশা সিগারেট ধরিয়ে ছাদের দরজায় এসে দাড়ালো।

আহা সংশয়, যা হবার হয়
বোঝেনা হৃদয় কত অপচয়
কংক্রিট মন মিছে আলাপন
বিসর্জনে ক্লান্ত ভীষণ
মেঘে মেঘে জমে আজ বেদনার বাঁধ
ঢেউয়ে ঢেউয়ে থেকে থেকে জলের নিনাদ।

আহারে জীবন, আহা জীবন
জলে ভাসা পদ্ম যেমন
আহারে জীবন, আহা জীবন
জলে ভাসা পদ্ম জীবন।।

সামিয়া খান মায়া
চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here